গৌরনদী সংবাদ

রাজাকার মুক্ত দেশ দেখে মরতে চান গৌরনদীর বীরাঙ্গনা বিভা রানী

১৯৭১ সালে পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর আল-বদর, রাজাকারদের লালসার শিকার হয়েছেন গৌরনদীর টরকীর চর গ্রামের বিভা রানী মন্ডল(৬০)। হায়েনার দল তার নারী জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ লুটে নিয়েছে শকুনের মতো। দেশের স্বাধীনতার সুখ ভোগ করার অতৃপ্ত আশা নিয়ে সে সময় সব নির্যাতন আর যন্ত্রণা নীরবে সহ্য করেছেন। স্বাধীনতার ৪৩ বছর পার হলেও বিভা রানীর খবর নেয়নি কেউ। বিরাঙ্গনা হিসেবে তার নাম আজও তালিকা ভুক্ত হয়নি।

সোমবার সকালে বিভা রানীর আশ্রয়স্থলে গেলে প্রথমে তিনি কোন কথা বলতে রাজি হননি। তিনি রোগে, শোকে না খেয়ে আধমরা অবস্থায় বেঁচে আছেন। অনেক চেষ্টার পর মুখ খোলেন বিভারানী। তিনি মরার আগে দু’বেলা দু’মুটো ভাত আর রাতে মাথা গোঁজার ঠাঁই চান। একটি ঝুপড়ি ঘরে বসে একমাত্র প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়ে যন্ত্রনায় অস্থির হয়ে উঠলেও অর্থের অভাবে তিনি নিজের ও পুত্রের চিকিৎসা করাতে পারছেন না।

গৌরনদী পাশ্ববর্তি কালকিনি উপজেলার চরআইরকান্দি গ্রামের রমেশ মন্ডলের কন্যা বিভা রানী মন্ডল। স্বাধীনতার সময় তিনি ছিলেন ১৬/১৭ বছরের যুবতী। একদিন এলাকায় পাকবাহিনীর দোসররা এলাকায় প্রবেশ করে যুবতী নারীদের খুঁজছে খবর পেয়ে তিনি পার্শ্ববর্তী বীরেন্দ্র মজুমদারের বাড়িতে আত্মগোপন করেন। সেখানে পালিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি তার।

তিনি জানান,পাক সেনাদের দোসর স্থানীয় রাজাকার আইউব আলী বেপারীর নেতৃত্বে ৭/৮ জন আল-বদর রাজাকাররা তাকে ধরে তার ওপর চালায় বর্বরোচিত পাশবিক নির্যাতন। দেশ স্বাধীনের পর পরই গৌরনদীর টরকীর চর এলাকার বৃন্দাবন মজুমদারের পুত্র নকুল মজুমদরের সাথে বিভা রানীর বিয়ে হয়। বিয়ের পর স্বামী ও তার পরিবারের লোকজন বিভা রানীর ওপর পাক বাহিনি ও রাজাকারদের পাশবিক নির্যাতনের খবর জানতে পারে। এর পর থেকেই শুরু হয় দাম্পত্য কলহ।

১৯৭২ সালের শেষ দিকে নকুল মজুমদার বিভা রানীকে ফেলে ভারতে আত্মগোপন করেন। দীর্ঘদিনেও সে ফিরে না আসায় ১৯৭৪ সালে স্বামীর খোঁজে ভারতের উত্তর প্রদেশে যান বিভা। সেখানে বিভিন্ন বাসায় ঝিয়ে কাজ করার ফাঁকে স্বামীকে খুঁজতে থাকেন। একপর্যায়ে স্বামীর দেখাও মিলে যায়। তার পর তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হন বিভা। দেশে ফিরে এসে বিভা দিশেহারা হয়ে পরেন। পরবর্তীতে তিনি বিভিন্ন মাধ্যমে সেলাই প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। তবে যেখানেই তিনি কাজ শিখতে গিয়েছেন সেখানেই তিনি নানা হয়রানির স্বীকার হয়েছেন।

১৯৭৮ সালে তার (বিভার) বাবা রমেশ মন্ডল মারা যাওয়ার পর বিভার জীবনে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। মা, চার বোন ও এক ভাইয়ের সংসারের সবচেয়ে বড় সন্তান বিভার কাঁধে ওঠে সংসারের পুরো দায়িত্ব। এজন্য তাকে (বিভাকে) রাজমিস্ত্রির সহকারি, জমিতে দিনমজুরের কাজসহ সব ধরনের শ্রম বিক্রি করতে হয়েছে।

১৯৮৮ সালে বিভার স্বামী নকুল দেশে ফিরে আসেন। কয়েক মাস বিভার সাথে ঘর-সংসার করার পর তিনি বিভাবে গর্ভবর্তি অবস্থায় ফেলে আবারও ভারতে চলে যান এবং সেখানে গিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করেন। পরবর্তীতে বিভার গর্ভে জন্মনেয় বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী পুত্র সন্তান সাগর। স্বামীর আত্মগোপন, দ্বিতীয়তো জন্মনেয়া ছেলে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী হওয়ায় বিভা রানী আরো দিশেহারা হয়ে পরেন। পরবর্তীতে সেলাই কাজের ওপর গুরুত্বদিয়ে সংসারের হাল ধরেন বিভা। বর্তমানে বয়স বেড়ে যাওয়ায় তাও করতে পারছেন না।

বিভা রানী বলেন, রাজাকার মুক্ত স্বাধীন দেশ ও তার প্রতিবন্ধী ছেলের সু-চিকিৎসা, দু’মুঠো ভাতের ব্যবস্থা এবং রাতে মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দিয়ে মরতে পারলে তিনি মরেও শান্তি পাবেন। সম্প্রতি সময়ো বীরাঙ্গনাদের স্বীকৃতি দেয়ার জন্য সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী অনলাইনে আবেদনও করেছেন বিভা রানী।

সংবাদ : মোঃ জামাল উদ্দিন

আরও সংবাদ...

Leave a Reply

Back to top button