আর্কাইভ

বরিশালে রাত জেগে মন্দির ও গ্রাম পাহারা

নিজস্ব সংবাদদাতা ॥ র্শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী সাঈদীর ফাঁসির রায় ঘোষণার পর থেকে মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে বরিশালের সংখ্যালঘু অধ্যুষিত আগৈলঝাড়া, গৌরনদী ও উজিরপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের তিনটি মন্দির, দুটি বসত ঘর, একটি পাকের ঘর ও একটি খরের গাঁদায় অগ্নিসংযোগের ঘটনায় শান্তি প্রিয় গ্রামবাসীর মধ্যে চরম আতংক দেখা দিয়েছে। ১৯৭১ সনের পর ২০০১ সনে এসব এলাকার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নির্মম নির্যাতনের ক্ষতের চিহ্ন ঘুচতে না ঘুচতেই আবার ২০১৩ সনে হঠাৎ করে জামায়াতী রাজাকারদের তান্ডব শুরু হওয়ায় গ্রামের নিরিহ মানুষেরা এখন নিঘূর্ম রাত কাটাচ্ছেন। তাই গত কয়েকদিন থেকে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে ওইসব গ্রামের মানুষ জামায়াতী তান্ডব ও নাশকতা ঠেকাতে এখন গ্রামে গ্রামে পাহারা বসিয়েছেন।

সূত্রমতে, সর্বশেষ গত ১২ মার্চ আগৈলঝাড়ার বাকাল ইউনিয়নের বাকপাড়া গ্রামের সরকার বাড়ির সার্বজনীন কালী মন্দিরের মূর্তি ভাংচুর করা হয়। এরপূর্বে গৌরনদীর পিঙ্গলাকাঠী সার্বজনীন দূর্গা মন্দির, বাসুদেবপাড়ার খোকন ঘরামীর বসত ঘর, চাঁদশী গ্রামের একটি পাকের ঘর, একটি খরের গাদা ও উজিরপুরের গুঠিয়া গ্রামের সার্বজনীন দূর্গা মন্দিরে অগ্নিসংযোগ করে দুস্কৃতকারীরা। ফলে গ্রামের হিন্দু-মুসলমান একতাবদ্ধ হয়ে সন্ধ্যার পর থেকে ভোর পর্যন্ত কমিটি গঠনের মাধ্যমে গ্রামঘুরে পালাক্রমে রাত জেগে লাঠি ও বাঁশি হাতে গ্রাম সুরক্ষায় পাহারা দিচ্ছেন। কিছুক্ষন পর পর গ্রাম ঘুরে এসব পাহারাদারদের একজনে বলে ওঠেন “খবর দাবি হে…সহযোগীরা একত্রে বলেন-খবর দার…হুশিয়ার…সাবধান”। হঠাৎ করে ওইসব গ্রামে রাতে কেহ গেলে ভয়ে আতঁকে ওঠার মতো অবস্থা। বুধবার গভীর রাত পর্যন্ত গৌরনদীর চাঁদশী গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, ওই গ্রামের উত্তর চাঁদশী, কুমারডোবা ও দক্ষিণ চাঁদশী গ্রামে পাহারা দিচ্ছেন গ্রামের তরুন-যুবক থেকে শুরু করে বয়োবৃদ্ধরাও। হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রীষ্টান ঐক্য পরিষদের চাঁদশী ইউনিয়ন শাখার সভাপতি জীবন কৃষ্ণ কর জানান, ইতোমধ্যে তাদের গ্রামের মানিক করের পাকের ঘর ও পাশ্ববর্তী কুমারডোবা গ্রামের গৌতম করের খরের গাঁদায় রাতের আঁধারে অজ্ঞাতনামা দুস্কৃতকারীরা অগ্নিসংযোগ করেছে। তাই তারা আতংকগ্রস্থ হয়ে হিন্দু-মুসলমান একত্রিত ভাবে গ্রাম সু-রক্ষায় পাহারা বসিয়েছেন। প্রতিদিন রাতে আটজন করে একেকটি দলে মোট চারটি দলে বিভক্ত হয়ে পাহারা দিচ্ছেন। দক্ষিণ চাঁদশী সার্বজনীন দূর্গা মন্দির কমিটির সভাপতি পরিমল মন্ডল জানান, তারা প্রতিদিন রাত নয়টা থেকে ভোর চারটা পর্যন্ত ৩২ জনে চারটি দলে ভাগ হয়ে পাহারা দিচ্ছেন। উত্তর চাঁদশী ত্রীনাথ মন্দির কমিটির সভাপতি গুরুদাস গোস্বামী জানান, তাদের পাড়ার লোকজনেও আতংকিত হয়ে গত এক সপ্তাহ থেকে লাঠি ও বাঁশি নিয়ে পাহারা দিচ্ছেন।

চাঁদশী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা পূজা উদযাপন কমিটির সাধারন সম্পাদক কৃষ্ণ কান্ত দে বলেন, ২০০১ সনের নির্বাচনের পরবর্তী সময়ে জামায়াত-বিএনপির চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা চাঁদশী ইউনিয়নে ব্যাপক ধ্বংষযজ্ঞ চালিয়েছে। যার ক্ষতের চিহ্ন এখনো ঘুচিয়ে উঠতে পারেনি এসব এলাকার নির্যাতিতরা। এবারও একইভাবে তান্ডবলীলা শুরু করার পর স্থানীয় থানা পুলিশের সাথে পরামর্শ করে গ্রাম সু-রক্ষায় রাত জেগে পাহারা বসানো হয়েছে। একইভাবে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত গৌরনদীর পিঙ্গলাকাঠী, বিল্লগ্রাম, আগৈলঝাড়ার প্রায় প্রতিটি গ্রাম ও উজিরপুরে পাহারা দিচ্ছেন ওইসব গ্রামের নিরিহ গ্রামবাসীরা।

বরিশাল জেলা পুলিশ সুপার একেএম এহসান উল্লাহ বলেন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার মানুষ গ্রাম সুরক্ষায় পাহারা দিয়ে পুলিশকে সহযোগীতা করার ফলে দ্রুত যেমনি আতংক কেটে যাচ্ছে, তেমনি করে গ্রামের কয়েকটি ঘটনায় জড়িত থাকার সন্দেহে ইতোমধ্যে অসংখ্য দুস্কৃতকারীকে সনাক্ত করে গ্রেফতার করে জেল হাজতেও প্রেরন করা হয়েছে।

আরও পড়ুন

মন্তব্য করুন

Back to top button
Translate »