আর্কাইভ

আমার পরাণ যাহা চায়

আবদুল্লাহ-আল-নোমান ॥ এক

আমার মন খারাপ। কেন যে খারাপ তা বুঝতে পারছিনা। প্রায়ই এমন হয়। কোন কারন ছাড়াই হুট করে মন খারাপ হয়ে যায়। এমনটা হলে আমি একা থাকি। দরজা জানালা বন্ধ করে শুয়ে থাকি। মাঝে মাঝে কান্না করি। কান্না করতে করতে বালিশ ভিজিয়ে ফেলি। বাসার মানুষ বলে আমি নাকি স্বার্থপর, খাণ্ডার শ্রেণীর মেয়ে। খাণ্ডার শ্রেণী মানে বুঝলেন তো? না বুঝলেও অসুবিধা নেই। আমি বুঝিয়ে দিচ্ছি। খাণ্ডার হল যারা মরে গেলে শাঁকচুন্নি হয়। মানে কঠিন দজ্জাল। আমি নিজেও তাই মনে করি। আমি আসলেই খাণ্ডার। যদি কখনো খাণ্ডারদের প্রতিযোগিতা হত, সেখানে আমি অনায়াসে প্রথম হতাম। পান থেকে চুন খসলে তুলকালাম কাণ্ড করি। হাতের কাছে যা পাই, তাই নিয়ে আছার মারি। আমার বন্ধুরা বলে আমি দেমাগি। দেমাগে নাকি আমার পা মাটিতে পরেনা। আমার বিরুদ্ধে সব অভিযোগ আমি মাথা পেতে নেই। কখনো তর্ক করিনা। কারন কে কি বলল বা কে কি ভাবল তাতে আমার কিছু যায় আসেনা। আমি কি চাই, আমি কি ভাবি সেটাই আমার কাছে আসল। অন্যসব ভুয়া। আমার প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির মাঝে মিল না থাকলে তুলকালাম ঘটাই।

যারা আমাকে দেমাগি বলে ডাকে তাদের মধ্যে রুবিনা মেয়েটা খুব ভালো। তার সাথে আমার খুব ভাব। রুবিনা প্রায়ই বিরক্তি ভরা কণ্ঠে বলে, তুই এমন কেন?
আমি একগাল হেসে বলি, কেমন?
বড্ডবেশি ঠোঁটকাটা স্বভাবের। লাজলজ্জার বালাই নাই। কমনসেন্স নাই। সিচুয়েশন বুঝিস না। যখন তখন মুখে যা আসে তাই বলিস।

রুবিনা এসব বললে আমি চুপ করে থাকি। মুচকি হাসি পায় আমার তখন। আমি প্রান ভরে রুবিনাকে দেখি। আস্ত একটা রাগী মাস্টারনীর মত লাগে ওকে। কথা বলার সময় চুপ করে থাকলে ওর বিরক্তি বেড়ে যায়। চোখ মুখ কুঁচকে বুনো ষাঁড়ের মত তেড়ে আসে আমার দিকে। অস্থিরভাবে আমার দু’বাহু ঝাঁকাতে থাকে। চোখে চোখ রেখে বলে, চুপ করে থাকিস না। কথা বল।
কি বলব?
তোর না আছে রূপ, না আছে গুন, না আছে পড়ালেখা। তারপরেও এত দেমাগ কেন?
আমি শীতল গলায় বলি, ওহ রুবি, সুইট ডার্লিং! আমার রূপ নেই কে বলেছে? স্বর্গের অপ্সরী হয়ত নই। তোমার মত ধবধবে সাদাও নই। আমি শ্যামবর্ণ। আমার ফিগার সুন্দর। পেটে তোমার মত তিন ভাজ পরেনা। দেখোনা বাইরে বেরুলে ছেলেরা কেমন হা করে তাকিয়ে থাকে। আমি বুঝি ওদের লোভী চোখগুলো আমার শরীরে ঘুরঘুর করে। এরপর আস গুনে। কোন মানুষই গুন ছাড়া জন্মায় না। ভালো বা খারাপ দুটোর মধ্যে যে কোন একটা তার মধ্যে থাকবেই। আমার গুনগুলো হয়ত খারাপ। আর পড়ালেখা বললে! সেটা যদি নাই থাকত তবে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হতে পারতাম না।
আমার এসব কথা শুনে রুবিনা দাঁত কিড়িমিড়ি দিয়ে বলে, চুপ কর ইতর। তোর সাথে কথা বলাই বেকার।

এই হল আমার বান্ধবী রুবিনা। ও কেন ভাল, তা ব্যাখ্যা করা হয়নি। ও ভাল, কারন ও আমার মন কেন খারাপ তা বলে দিতে পারে। আমার বিশ্বাস আজও বলে দিবে। আমি এখন বাড়ির ছাদে রুবিনার জন্য অপেক্ষা করছি। একটু আগে সখিনার মা টি পট, টি ব্যাগ, কাপ, পিরিচ, বিস্কুট ও এই মুহূর্তে আমার যা যা দরকার তার সব কিছু দিয়ে গেছে। সে আমদের বাড়িতে থাকে অনেক বছর। খুবই বিশ্বস্ত। আমদের কখন কি লাগবে সব তার মুখস্ত। আরও একটা ব্যাপার হল সে খুবই নির্ভেজাল। এই যেমন আমাকে এগুলো দিয়ে বলল, আফা, আর কিছু লাগলে বইলেন। খালুজান অফিসে গেছে। আম্মা ভাইজানরে নিয়া গেছে। ভাইজানরে স্কুলে দিয়া ছোড আফারে কলেজ থিকা আনব। আইজকা ওনারা মার্কেটে যাইতে পারে। কিছু লাগলে ফোন করতে বলছে।
আমি বলি, আচ্ছা। তুমি যাও এবারে।

আমার অস্থির লাগছে। রুবিনা নবাবজাদি ফোন বন্ধ করে রেখেছে। সকালবেলা না ঘুমালে নাকি সারাদিন ওর ঘুম ঘুম লাগে। অনেক আগে ওকে টেক্সট করেছি। কোন রিপ্লে দেয়নি। ওর আসার রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছি অনেকক্ষণ। মেজাজটা যাচ্ছেতাই রকম খারাপ হয়ে যাওয়ার আগে রুবিনা পৌঁছল। একটা চেয়ার টেনে বসে হাপাতে হাপাতে বলল, সুপ্রভাত বর্ষা।
রাখ তোর সুপ্রভাত। অসভ্য কোথাকার। আমার মন খারাপ, এই টেক্সটা পাওয়ার পরেও এত দেরি করলি কেন?
দেখ গালি দিবিনা। প্রথমত, তোর মন খারাপ কেন তা চিন্তা করে খুজে বের করলাম। দ্বিতীয়ত, রাস্তায় প্রচুর জ্যাম।
এত সকালে কিসের জ্যাম?
মর্নিং শিফটের আণ্ডা বাচ্চারা স্কুলে যাচ্ছে। তাই রাস্তায় খুব জ্যাম। গাড়ি আগাতেই পারেনি আমার ড্রাইভার।
আচ্ছা বাবা থাম। এখন জলদি বল, আমার কেন মন খারাপ?
জাহিদ ভাইয়ের শরীর খারাপ। এই জন্য মনে হয়।
কি হয়েছে ওর?
জ্বর।
খুব বেশি?
হ্যাঁ। বেশিই মনে হয়। বলে, এক কাপ চা নিল রুবিনা।

আমি আর কোন কথা বলতে পারলাম না। আমার গলাটা ধরে এল। জাহিদ আমার জান। আমার প্রাণ। আমার আত্মা। ওর পিছনে আমি জ্ঞান হবার পর থেকে ঘুরছি। ওকে আমি অন্তর দিয়ে ভালোবাসি। আমার ভালোবাসা কখনো আমি বুঝাতে পারিনি। ওকে দেখলেই আমার ভিতর বাহির সব ওলট পালট হয়ে যায়। তাছাড়া ওর মা খুব বদরাগী। যতবার ফোন করেছি ততবার কঠিন ঝাড়ি খেয়েছি। শেষে কোন উপায় না দেখে জাহিদদের বাসার কাজের মেয়ের সাথে খাতির করেছি। মেয়েটার নাম মর্জিনা। রুবিনা ডাকে ঘুষখোর মর্জিনা। কারন ও প্রতিটা তথ্যের জন্য একশ টাকা করে নেয়। মাঝে মাঝে ওর মোবাইলেও টাকা রিচার্জ করে দিতে হয়। জাহিদের ব্যাপারে সবকিছু রুবিনা ছাড়া কেউ জানেনা। রুবিনা না থাকলে বোধহয় আমি একা কখনো এতদূর এগুতে পারতাম না।

রুবিনা চা খেয়ে বলল, মন খারাপ করিস না।
আমি ঘাড় কাত করে বললাম, আচ্ছা।
রুবিনা আমার একটা হাত ধরে বলল, তুই না কেমন আজব। আমি তোকে দেখে মাঝে মাঝে খুব অবাক হই।
হু।
আসলেই অবাক হই। আবার আমার হিংসাও লাগে। যদি তোর মত ভালবাসতে পারতাম কাউকে। কিংবা যদি কেউ ভালবাসত আমাকে। সত্যি সত্যি পাগলের মত!
রুবি এসব কথা বাদ দে। আমি একটু একা থাকতে চাই। তুই বরং চলে যা।
না, আমি যাবনা। আরেকটু থাকব। প্লিজ তুই না করিস না।
আচ্ছা তাহলে থাক।
রুবিনা একটু সময় বসে থাকল না। বেশ ভালো সময়ই বসে থাকল। বসে বসে আমার মন ভালো করার চেষ্টা করতে লাগল। কোন কাজই হলনা। আমার মন আরও বেশি খারাপ হতে লাগল। শেষে বিকেলের দিকে একটা খবর এনে দেয়ার ওয়াদা করে বিদায় নিল।

ও চলে যাওয়ার পর আমি হাঁফ ছেড়ে বাচলাম। উফ, আল্লাহ্‌। এত কথা বলতে পারে মেয়েটা। আমার অবশ্য ওকে ভাল লাগে। এ কারনেই সহ্য করি। তবে মন খারাপ হলে ব্যাতিক্রম। তখন আমি একা থাকতে চাই। এই সময়টাতে কেউ বিরক্ত করুক তা আমি চাইনা। মাঝে মাঝে বাসার জিনিসপত্র ভাংচুর করে করে রাগী একটা ভাব ধরি। কিন্তু আসলে তখন আমার মন খুব খারাপ থাকে। এই যেমন একটু আগে যা ঘটল তার বর্ণনা দেয়া জরুরী মনে করছি। রুবিনা চলে যাওয়ার পর আমি ছাঁদ থেকে বাসায় ফিরি। ড্রয়িংরুমে আমাকে আটকায় সখিনার মা। বলে নাস্তা খেতে। ডাইনিং টেবিলে যেয়ে দেখি খাবারের উপর চুল। মুহূর্তে মাথায় রক্ত চড়ে গেল। নিজেকে আর সামলাতে পারলাম না। টেবিলের উপর যা ছিল সব ধাক্কা মেরে নিচে ফেলে দিলাম। সখিনার মা ভয়ে চুপচাপ দাড়িয়ে রইল। সে আর কোন কথা বলার সাহস পেলনা। তারপর আমি আমার রুমে চলে এলাম।

কেমন যেন অস্বস্তি লাগছে। বারবার জাহিদের মলিন মুখটা ভেসে উঠছে। জ্বরে না জানি কেমন করছে। আমি যে ফোন করে কথা বলব তারও উপায় নেই। কারন দুটো। প্রথমত, জাহিদের মাও খাণ্ডার শ্রেণীর। শুধু খাণ্ডারই না জঘন্য প্রকৃতির খাণ্ডার। আজ যেহেতু জাহিদ অসুস্থ। তাই ওর ফোন তার কাছেই থাকবে। তিনি ফোন ধরলে নানান প্রশ্ন করবেন। কে আমি, বাবার নাম কি, বাসা কোথায়, কিভাবে চিনি, ইত্যাদি। প্রশ্নের জবাব দিতে দেরী হলে ওনি খট করে ফোন রেখে দিবেন। দ্বিতীয়ত, যদিও বা জাহিদ ফোন ধরে কথা বলে, তাহলে ও আমাকে চিনবেনা। আর ও ফোন ধরলে আমি গুছিয়ে কথা বলতে পারবনা। আমার সব উল্টোপাল্টা হয়ে যায় ওর কণ্ঠ শুনলে।

এবার জাহিদ বিষয়ে খুলে বলি। জাহিদকে আমি প্রথম দেখি একটা কোচিং সেন্টারে। তখন আমি ক্লাস এইটে পড়তাম। কোচিং সেন্টারের নামটা এখন মনে নেই। তবে ওখানে সব বিষয় পড়ানো হত। যতদূর মনে পরে জাহিদ ওখানকার খুব জনপ্রিয় শিক্ষক ভাইয়া ছিল। ‘শিক্ষক ভাইয়া’ বললাম কারন এ যুগে কোচিং এর টিচারদের কেউ স্যার বলেনা। সবাই ভাইয়া বলে। যা হোক সেদিন আমার ঐ কোচিংয়ে প্রথম ক্লাস ছিল। আবার প্রথম ক্লাসটাই জাহিদের ছিল। ও ক্লাসে ঢুকার পর দেখলাম ক্লাসের পরিবেশ বদলে গেল। সবাই খুব হাসি খুশি হয়ে গেল। ক্লাসে হৈ-হুল্লোড় বেড়ে গেল। রুটিন দেখে জানলাম জাহিদ ম্যাথ পড়াবে। তাকে দেখে আগে থেকে কিছু অনুমান করতে পারলাম না। একবার ভেবেছিলাম মাথাভর্তি উষ্কখুষ্ক চুল, আবার ম্যাথ পড়াবে। তাহলে হয়ত তিনি ভুলো মনের। কিংবা খুব গল্প করতে পছন্দ করেন। কাঠখোট্টা হওয়ার সম্ভাবনা কম। আমার সব ধারনা ভুল প্রমানিত হতে সময় লাগল না। সে ক্লাসে ঢুকে কোন রকম সৌজন্য আলাপের ধারধারি গেলনা। সবাইকে বলল, হোমওয়ার্ক দাও। তার কণ্ঠস্বরে কোন কাঠিন্য কিংবা খুব বেশি শীতলতা ছিলনা। সবাই হোমওয়ার্ক দিল। বলাই বাহুল্য আমি দিতে পারলাম না। জাহিদ আমাকে দাড়া করালো।
কি ব্যাপার হোমওয়ার্ক কোথায়?
স্যার, আমি নতুন ভর্তি হয়েছি। আজকেই প্রথম ক্লাস করছি।
আমার মুখে স্যার শব্দ শুনে সারা ক্লাস অট্টহাস্যে ফেটে পরল। আর সে ভ্রু কুঁচকে আমার দিকে তাকাল। কিছুক্ষন পর জাহিদ স্টপ বলতেই পুরো ক্লাসে সুনশান নিরবতা নেমে এল। ঠিক এ সময়ে একটা অঘটন ঘটল। আমার মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল। জাহিদের বিরক্তির সীমা রইল না।
আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ক্লাসে মোবাইল ফোন অন রাখা ঠিকনা।

আমি তড়িঘড়ি করে মোবাইল অফ করলাম। মিনমিনে গলায় বললাম, আর হবেনা স্যার।
আবার স্যার শুনে হাসির রোল উঠতে যাচ্ছিল। জাহিদ হাত তুলে থামিয়ে দিল। আমাকে উদ্দেশ্য করে বলল, আমার ক্লাসে হোমওয়ার্ক নিয়ে আসবে। এছাড়া বের করে দিব। মনে থাকবে?
জি, থাকবে।
আর আমকে স্যার বলবেনা। ভাইয়া বলবে। এখানের সব টিচারকেই ভাইয়া বলবে। বুঝেছ?
জি, বুঝেছি।

তারপর ক্লাস শুরু হল। সবাই একমনে কথা শুনছিল। এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে আবার আমার মোবাইল বেজে উঠল। জাহিদ ঘাড় ঘুড়িয়ে বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে আমাকে দাড়া করালো। বরফ শীতল কণ্ঠে বলল, তুমি এখনও মোবাইল অফ করনি? আশ্চর্য!

আমি চুপ করে রইলাম। কি বলব আমি। আমার আসলে বলার কিছু ছিলনা। কারন মোবাইল আমি অফ করেছিলাম এটা যেমন সত্য, দ্বিতীয় বার আমার মোবাইলই বেজেছে এটাও সত্য। মুল ব্যাপারটা হচ্ছে আমার দুটো মোবাইল ছিল। আমি খুব অপমানিত বোধ করলাম। তাই দাঁত মুখ খিটিয়ে চুপ করে রইলাম। জাহিদ আরেকটু কাছে এসে বলল, কি হল কথা বলছ না কেন?
সরি।
সরি বললেই তো হবেনা। এটার জন্য তোমাকে ওয়ার্নিং দেয়া হয়েছে।

আমি মাথা নিচু করে দাড়িয়ে রইলাম। জাহিদ আমার জবাবের জন্য কিছুক্ষন অপেক্ষা করল। তারপর বলল, তোমাকে এর শাস্তি পেতে হবে। তবে হ্যাঁ, যেহেতু তুমি নতুন এবং আজকেই প্রথম ক্লাস- তাই তোমার শাস্তিটাও একটু ভিন্নধর্মী হবে। তোমাকে একটা প্রশ্ন করা হবে। যদি উত্তর দিতে পার, তবে ক্লাসে থাকবে। আর না পারলে বেরিয়ে যাবে।

আমি আগের মত চুপচাপ দাড়িয়ে রইলাম। ক্লাসের সবাই হাসাহাসি করছে। আমার মজা নিচ্ছে। অপমানে আমার গা জ্বলে যাচ্ছিল। তারপর একসময় সময় জাহিদ থেমে থেমে বলল, তোমার জন্য প্রশ্ন- বল দেখি সমগ্র বাংলাদেশের ওজন কত?

প্রশ্নটা শুনে আমার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল। লজ্জায় মারা যাচ্ছিলাম আমি। আর এই ফালতু প্রশ্নের কি উত্তরই বা দিব আমি। আমি আগের মত মাথা হেট করে দাড়িয়ে রইলাম। আমাকে এভাবে দাড়িয়ে থাকতে দেখে জাহিদ খানিকটা সামনে এগিয়ে এসে বলল, পারবে কিনা? ইয়েস অর নট?
আমি বললাম, পারব না।
ওকে। তাহলে এখন তুমি বেরিয়ে যেতে পার। ক্লাসের অনেক সময় নষ্ট হল।
আমি ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে যাব প্রায়, এমন সময় আবার বলল, দাঁড়াও। তোমার প্রশ্নটার উত্তর শুনে যাও। সমগ্র বাংলাদেশের ওজন পাঁচ টন। ট্রাকের গায়ে লেখা থাকে। বুঝলে! ক্লাসের সবাই আবারো অট্টহাস্যে ফেটে পড়ল। আমি চরম অপমানিত হয়ে দৌড়ে ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেলাম। এর একটা বদলা যে আমাকে নিতেই হবে।

বাসায় এসে সটান হয়ে শুয়ে থাকলাম। চোখ খোলাও রাখতে পারছিনা, আবার বন্ধও না। সব অবস্থাতেই জাহিদের ছবি ভাসে। রাগটা একটু কমাতে তখনকারমত আমি আমার ডায়েরিটা নিলাম। লিখতে থাকলাম- “কটকটে নীল রঙের জিন্স প্যান্ট আর সস্তা মানের ঢিলে ঢিলে হাওয়াই শার্ট পড়ে থাকা হ্যাংলা পাতলা ছেলেটির নাম জাহিদ। আজ ও আমাকে এত অপমান না করলেও পারত। দেখে নিব আমি। থার্ডক্লাস ইডিয়ট ছেলে। মাথার চুলও ঠিকমত আঁচড়ায় না। গায়ের থেকে হাগুর গন্ধ আসে। বেয়াদব বলদ। কত্ত বড় সাহস আমাকে অপমান করে”।

সেদিন ডায়েরি লিখতে লিখতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। উঠে দেখি আমার মা ডায়েরিটা হাতে নিয়ে দাড়িয়ে আছে। আমি চোখ মুখ কচলে বললাম, মা ডায়েরিটা দাও। এক্ষুনি দাও। কারো পারসোনাল ডায়েরিতে হাত দেয়া উচিত না, এটা জানোনা? জলদি দাও।
মা বলল, নাও। এত চেচামেচি করছ কেন?
করব না, আমার ডায়েরি তুমি পড়বে কেন?
কি হয়েছে তাতে?
কি হয়নি বল? পারসোনাল জিনিস কখনো না বলে ধরতে হয়না।
মা মুখ ভেংচে বলল, একরত্তি মেয়ের আবার পারসোনালিটি।
মা ক্ষেপিও না। এমনিতেই মেজাজটা খারাপ।
তোমার মত পাগলের মেজাজ কবে ঠিক থাকে!
মা ভালো হবেনা বলছি। চুপ কর।
আচ্ছা চুপ করলাম। এবার আমাকে বল জাহিদ কে?
তুমি তো পড়েই ফেলেছ।
হুম। ক্লাসে ঠিক কি ঘটেছে সব আমাকে খুলে বল।

তারপর আমি সম্পূর্ণ ঘটনা খুলে বলি। সবশুনে মা বলল, এখানে তো ছেলেটার কোন দোষ দেখিনা। তুমি নিজেই ভাবছ তোমাকে অপমান করা হয়েছে। আচ্ছা একটা কথা বলত, ছেলেটার গায়ে কি আসলেই হাগুর গন্ধ?
যাও মা। আমি কি ওর গায়ের গন্ধ নিয়ে গবেষণা করেছি নাকি।
তাহলে যে লিখেছ!
তাতো রাগ করে লিখেছি। আচ্ছা মা, জাহিদ স্যার যদি আমাকে বাসায় এসে পড়ায় তাহলে কেমন হয়?
খুব ভালো হয়।
সত্যি মা?
হ্যাঁ, সত্যি। আমি কি আমার মেয়ে কে চিনিনা! তাহলে ছেলেটাকে আচ্ছামত নাকানি চুবানি খাওয়ানো যাবে। ডাবল, ট্রিপল অপমান করে বদলা নেয়া যাবে।
ধুর মা। আমার মাথায় সেই প্ল্যান নেই। ও খুব ভালো পড়ায়।
ভালো পড়ায় না ছাই। তুমি ওর উপর প্রতিশোধ নিয়েই ছাড়বে, তাইতো?
না। ওর মত থার্ডক্লাসের সাথে আমার কি লেনদেন?
লেনদেন না থাকাই ভালো। তোমাকে একটা কথা বলি, অযথা ছেলেটার পিছু নিওনা। ও কোন অন্যায় কাজ করেনি। এত জিদ ভালনা। তাও বাসায় কর ঠিক আছে। বাইরে করা একদম ঠিক না। মানুষ ফালতু ভাববে।
তোমার সাথে তো আমার এই জীবনে ম্যাচ হয়নি। আর হবেও না। তাই তোমার সাথে আর কথা নয়। বাবাকে লাগবে।
হ্যাঁ, তাকে তো লাগবেই। তার প্রশ্রয়েই তো তোমার এই অবস্থা।
চুপ কর তো মা। একদম বাজে কথা বলবেনা। সব রাবিশের দল। আসলে তোমার ঘড়ে জন্ম নেয়াই ভুল হয়েছে।
এই মেয়ে তুমি চুপ কর। আমি কি তোমার বাবা? যে, তুমি আমাকে যা খুশি তাই বলে যাবে আর আমি মুখ বুঝে সহ্য করে যাব। পেয়েছটা কি তুমি?
কি পাব আবার!
না পেয়ে থাকলে আমাকে রাবিশ বললে কেন? তুমি রাবিশ। তোমার বাবা রাবিশ। তোমার চৌদ্দগোষ্ঠী রাবিশ।
খবরদার মা। আমার গোষ্ঠী নিয়ে কথা বলবে না।
বললে কি করবে?
বললে গলা টিপে মেরে ফেলব।

মায়ের সাথে তর্ক করে মেজাজটা আরও বেশি বিগড়ে গেল। এই সব কিছুর মুলে জাহিদ। আমি ওকে কোন মতেই ছাড়বনা। আমার বাবা খুব ব্যস্ত মানুষ। অনেকগুলো ব্যবসা তার। রাতে খাবার টেবিল ছাড়া তার সাথে আমার দেখা হয়না। সেদিনও রাতে বাবার সাথে দেখা হয়েছিল। আমার চোখ মুখ ফোলা ছিল। তাই আমাকে দেখেই বাবার মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল। তিনি খাওয়া না শুরু করে আমার দিকে আসলেন। আমাকে বুকে চেপে ধরলেন। আর যায় কোথায়! হাউ মাউ করে কান্না শুরু করে দিলাম। আমার মা ছোট ভাইবোন নিয়ে টেবিলে বসেছিলেন। তিনি খুব বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে গেলেন। আমাকে কাঁদতে দেখে আমার ছোট ভাইটিও কেঁদে উঠল। মা তাকে সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। বাবা আমার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল, মা। আমার লক্ষ্মী মা। কাঁদেনা। তুমি কাঁদলে বাবার খারাপ লাগে। প্লিজ মা, কান্না থামাও। আমাকে বল কি হয়েছে?
কিছু হয়নি।
তাহলে কান্না থামাও।
না থামাব না।
আচ্ছা মা। ঠিক আছে। একটু শান্ত হও।
না, শান্ত হবনা।
তাহলে কি করবে?
আমি এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাব।
ছিঃ মা। তুমি কোথায় যাবে? এটা তোমার বাড়ি। নিজেই বাড়ি ছেড়ে কেউ কোথাও যায়?
হে যায়। আর এটা আমার বাড়ি না। আমার বাড়ি হলে আমার ইচ্ছেমত সব হত। কিন্তু এখানে আমার কোন মূল্যায়নই নাই। মা সারাক্ষন আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করে।
আমার এ কথা শুনে মা বললেন, কি খারাপ ব্যবহার করি তোমার সাথে?
বাবা সাথে সাথেই মাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, আহা। তুমি চুপ কর। বাচ্চা মেয়ে। বড় হলে ঠিক হয়ে যাবে।
ঠিক হয়ে যাবে না ছাই। এই মেয়ে তোমার বংশের মুখে চুনকালি দিবে। কি জঘন্য স্বভাবের বাবা। মেয়ে মানুষ অথচ কোন ধৈর্য, সহ্য, নম্রতা, ভদ্রতা নেই।
আমি ফোঁপাতে ফোঁপাতে বললাম, দেখলে বাব দেখলে।
বাবা বললেন, হ্যাঁ দেখলাম।

কিচুক্ষনপর আবার সব ঠিক হয়ে গেল। আমার বাবার এই এক আশ্চর্য গুন। সব কঠিন পরিস্থিতি কেমন করে যেন সামলে ফেলেন। মুহূর্তেই হাসি-খুশি পরিবেশ হয়ে গেল। খাওয়া দাওয়া শেষ করার পর পুরো ব্যাপারটা মন দিয়ে শুনলেন। আমার একটাই চাওয়া ছিল, জাহিদ যেন আমাকে বাসায় এসে পড়ায়। বাবা বললেন হয়ে যাবে। পরদিন তার অফিসের ম্যানেজারকে নিয়ে কোচিং এ যেতে বললেন।

পরদিন বাবার অফিসের ম্যানেজারকে নিয়ে আমি কোচিং এ গেলাম। কোচিং এর ডিরেক্টরের সাথে বেশ হম্বি তম্বি শুরু করলেন তিনি। বুঝতে পারলাম ম্যানেজারটা আমার চাইতেও এক কাঠি বেশি সরেস! ডিরেক্টর বার বার আমদের বলছিল জাহিদ কাউকে বাসায় গিয়ে পড়ায় না। বাবার ম্যানেজার মানতে নারাজ। তার বিশ্বাস টাকা থাকলে বাঘের দুধও মিলে। তাই আমাদের চাপাচাপিতে ডিরেক্টর জাহিদের বাসায় ফোন দিতে বাধ্য হল। কিন্তু জাহিদের মা কিছুতেই রাজি হলনা। সপ্তাহে একদিন এবং অনেক টাকার হাতছানি কিছুই তাকে টলাতে পারলনা। শেষে ম্যানেজার আংকেল ডিরেক্টরকে বললেন, তুমি এই বদ ছেলেকে বাদ দাও। তার পরিবর্তে অন্য কাউকে নাও।
ডিরেক্টর আতঙ্কিত হয়ে বললেন, কি বলছেন স্যার? এটা না বলে আমাকে আপনার পায়ের জুতা দিয়ে মারেন। তারপরেও এটা বইলেন না।
কি আজব! তুমি এমন করছ কেন?
স্যার জাহিদ ছাড়া আমার কোচিং অচল। ও চলে গেলে আমি না খেয়ে মরব। কোন ছাত্র ছাত্রী ভর্তি হবেনা। আমি শেষ হয়ে যাব।
বাজে বকোনা। আমি তোমার ব্যাকআপ দিব। এক বছরের ইনকাম যা হয় আজই তা দিয়ে যাব। তারপরেও আমার কথা তোমাকে শুনতে হবে।

এক বছরের ইনকাম এডভান্স পাবে শুনে ডিরেক্টরের চোখ লোভে চক চক করে উঠল। সে জাহিদকে তৎক্ষণাৎ ডিসমিস করার সিদ্ধান্ত নিল। ম্যানেজার আংকেলের মুখে মুচকি হাসির রেখা ফুটে উঠল। ডিরেক্টর জাহিদের মাকে আবার ফোন করে তাকে ডিসমিস করার কথা জানাল। এ পর্যায়ে কিছুটা উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হল। সবশেষে জাহিদকে ক্লাস থেকে ডেকে এনে কথাটা বলা হল আমাদের সামনে। আশ্চর্য বিষয় ও একবারও কাকুতি মিনতি করল না। ডিসমিস করার কারন জানতে চাইলনা। ডিরেক্টর ছাড়া ঐ রুমে যে আরও দুজন আছে তাদের দিকে তাকাল না পর্যন্ত। হাসিমুখে থ্যাঙ্ক ইউ স্যার বলে বেরিয়ে গেল। ওর হাসিমুখের আড়ালে গভীর বেদনার ছাপ ছিল। তা আর কারো চোখে না পরলেও আমার চোখ এড়ালো না। কিছুক্ষনের জন্য ঝিম মেরে বসে থাকলাম। ও বের হয়ে যাওয়ার পর সম্বিত ফিরে পেলাম। আর একটু একটু করে বুঝতে শুরু করলাম আমার কিশোরী হৃদয় ভেঙ্গে খান খান হয়ে যাচ্ছে। কেন এমন হচ্ছে তা ধরতে পারলাম না।

কোন মানুষ যদি কাউকে এড়িয়ে চলে, তাহলে ঐ মানুষটার প্রতি তার আকর্ষণ বেড়ে যায়। আমার ক্ষেত্রেও তা হল। জাহিদের প্রতি আমার আকর্ষণ বেড়ে গেল। ডিরেক্টরকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম জাহিদ মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। অনার্স পড়ছে ফার্স্ট ইয়ার। ওর বাবা একজন শিক্ষক। আর মা গৃহিণী। ওর একটা ছোট ভাইও আছে। ওর ভাইয়ের নাম জুনায়েদ। ওদের বাসার ঠিকানা ও ফোন নাম্বার নিয়ে আসলাম।

বাসায় ফিরে আমার অবস্থা খারাপ হয়ে গেল। কেন জানি মনে হল একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে। দু চোখের পাতা এক করতে পারিনা। মেজাজ আরো বেশি খিটখিটে হয়ে গেল। পড়াশোনা গোল্লায় গেল। চোখের নিচে কালি পড়ে গেল। বাবা-মা কিছুই ধরতে পারল না। তারা বরং একের পর এক ডাক্তার দেখাতে থাকল। জাহিদের কথাটা কেউ একবারও জানতে চাইল না। তারা হয়ত ভেবেছিল আমার অনেক পাগলামির চ্যাপ্টারের মত ঐ চ্যাপ্টারও ক্লোজ। কাকে শেয়ার করব খুজে পাচ্ছিলাম না। একদিন স্কুলে রুবিনা চাপাচাপি করাতে তাকে বললাম কথাটা। সব শুনে রুবিনা তো হেসেই খুন। বলল, এটাই নাকি প্রেম। প্রেমের কথাটা ওর মুখে শুনে আমি খুব লজ্জা পেয়ে গিয়েছিলাম। সাত পাঁচ না ভেবে স্বীকার করে নিলাম হয়ত এটাই প্রেম। হয়ত কি, আসলে এটাই প্রেম! কারন এই জিনিসটা কখনো বলে কয়ে বা শর্ত দিয়ে হয়না। এটা জাস্ট হয়ে যায়। কখন হয় কেউ টের পায়না। কারো এক জীবন, আর কারো এক মুহূর্ত। কিন্তু অস্বীকার করার উপায় নেই। এটাই প্রেম।

রুবিনাকে জাহিদের বাসার হোল্ডিং নাম্বার দিলাম। আর ও বলল, জাহিদকে ফোন করে প্রপোজ করতে। ব্যাপারটা কেমন উল্টো হয়ে গেল তাইনা! সাধারনত ছেলেরা মেয়েদের প্রপোজ করে। আর এ ক্ষেত্রে আমাকে করতে হবে। প্রচণ্ড উত্তেজনায় আমার হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে গেল।

ঐ দিন রাতে জাহিদদের বাসায় একটার পর একটা মিসকল দিতে থাকলাম। জাহিদের মা ব্যাক করে। কিন্তু আমি কথা বলিনা। কি বলব ওনাকে? একপর্যায়ে ওনি এত ক্ষেপে গেলেন যে কি বলব! অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু করলেন। এমন গালি যে শুনে আমার চোখ দিয়ে পানি চলে আসল। আমাদের পরিকল্পনা সফল হলনা। রুবিনা কে বললাম। সব শুনে ও বলল ধৈর্য ধরতে, আর মিসকল দেয়া চালিয়ে যেতে। এরকম এক সপ্তাহ চলল। পরে এক ছুটির দিনে রুবিনা আমাদের বাড়ি বেড়াতে এল। গুরুত্বপূর্ণ পড়া আছে বলে আমরা দরজা বন্ধ করে দিলাম। রুবিনার পরকল্পনা মত কাজ শুরু করলাম। এবারে মিসকল না দিয়ে ডিরেক্ট কল দিলাম। আবারো ফোন ধরল জাহিদের মা। আর এদিকে আমার হাত থেকে ফোন কেড়ে নিল রুবিনা। রুবিনা সালাম দিল। জাহিদের মা সালামের উত্তর দিলেন না। সরাসরি বললেন, এই বেয়াদব তাহলে তুই-ই এতদিন আমাকে জ্বালাতন করেছিস?

কি বলছেন আন্টি! আমি তো আপনাকে আজই প্রথম ফোন করলাম।
চুপ কর। এই তুই কে? কেন এমন করছিস? তোরে কি পাগলা কুত্তায় কামড়ায়?

আন্টি আপনি একটু ঠাণ্ডা হন। এমন তুই তোকারি করছেন কেন?
না, তুই তোকারি করব না। তোকে চুমাব হারামজাদি কোথাকার।

আন্টি আপনি কিন্তু খুব খারাপ ব্যবহার করছেন আমার সাথে। আমি কে জানেন? এসব বলার জন্য কি করতে পারি আপনার জানেন?

ওহো তাইতো! আপনি কে? আপনি তো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাইনা। সরি ম্যাম, এক্সট্রিমলি সরি। আমার অনেক বড় ভুল হয়ে গেছে। নবাবজাদি আপনি কি চান?

আমি জাহিদের সাথে কথা বলতে চাই।
উফ আল্লাহ্‌। আমার ছেলেকেও ছাড়বিনা। ওর সাথে তোর কি কথা?
দেন না ওর কাছে। ওরটা ওরেই বলি।
কেন ওর কাছে দিতে হবে? ও কি তোর বাপ লাগে?
ছিঃ ছিঃ আন্টি, কি বলছেন এসব! ও তো আপনার বাপ।
এই তুই আমারে এত মধুর সুরে আন্টি ডাকবিনা।
তাহলে কি শ্বাশুড়ি আম্মা ডাকব?
চুপ কর। আর একটা কথা বললে তোর জিব টেনে ছিঁড়ে ফেলব।
জিব টেনে ছিঁড়ে ফেলবেন! ওমা, আপনি তো দেখি মহিলা কসাই। আপনার বাবা বুঝি কসাই ছিল?
তোর এত বড় সাহস? আমাকে আমার বাবাকে কসাই বললি? তোকে আমি……
হ্যাঁ, কি করবেন? বলেন।
তোর পাছায় আগুন লাগিয়ে দিব। মুখে ফুটন্ত তেল ঢেলে দিব। তোর বাবার মাথা ন্যাড়া করে আলকাতরা দিয়ে দিব।
তারপরও বলব আমি জাহিদকে চাই।
বেহায়া মেয়ে। রিকশাওয়ালার বউ হবার যোগ্য তুই। বামুন হয়ে চাঁদে হাত দিতে চাস? বিটকেল ইতর কোথাকার।

অবস্থা বেগতিক দেখে আমি জোর করে ফোন নিয়ে লাইন কেটে দিলাম। ওদের কথা শুনে আমার হাত পা কাঁপছিল। রুবিনা দেখলাম ঢক ঢক করে এক গ্লাস পানি খেল। মেয়েটার সাহস দেখে আমি চমকে গেলাম। ওর পানি খাওয়া শেষ হলে বললাম, এসব কি করলি?
যা করেছি বেশ করেছি।
তোর কি মনে হয়না, একটু বেশি হয়ে গেছে?
একদম না। জাহিদ ভাইয়ের মা এর তাকে নিয়ে অনেক গর্ব। তবে একটা জিনিসরে।
কি?
তোদের মধ্যে জমবে ভালো। তোর শ্বাশুড়ি যেমন হবে, তুই ও তেমন। একদিন পর পর একে অন্যের পাছায় আগুন দিবি। কারো থেকে কেউ একবিন্দু কমনা।
যাহ্‌, তুই না কি!
ওরে বাবা। এত লজ্জা পাও তুমি।
থাম দোস্ত। এখন কি করবি সেটা বল।
এখন রাতে তুই ফোন দিবি। আমার বিশ্বাস আজ জাহিদ ভাই ফোন ধরবে।
তুই নিশ্চিত?
মোটামুটি।

রাতে আবার ফোন দিলাম। সত্যি সত্যি জাহিদ ফোন ধরল। ওর হ্যালো শুনে আমি ফ্রিজ হয়ে গেলাম। অনেক চেষ্টা করেও গলা দিয়ে কোন স্বর বের করতে পারলাম না। ও ক্রমাগত হ্যালো, হ্যালো করেই যাচ্ছে। আর আমাকে যেন বোবায় ধরেছে। ফুল এসি করা রুমে থেকেও আমি ঘামতে থাকলাম। শেষে কান্না শুরু করলাম। রুবিনা আমাকে থামাল না। আর জাহিদ কান্না শুনতে লাগল। প্রায় আধঘণ্টা পার হয়ে যাবার পর জাহিদ বলল, এবার থামুন প্লিজ। আমার কথা শুনুন।

আমি কান্না থামাতে চেষ্টা করলাম। ফোঁপানি চলছিল তখনও। জাহিদ বলল, দেখুন আমাকে কি দরকার বলুন। তারপরও আমার বাসায় ফোন দিয়ে এমন বিরক্ত করবেন না। আমার মায়ের হার্টের অসুখ। ডাক্তার তাকে উত্তেজিত হতে না করেছে। যা বলার আমাকে বলে ফেলুন। আর নাহয় কোনোদিন ফোন দিবেন না।

আমি কিছুই বললাম না। আসলে বলতে পারলাম না। শেষে জাহিদ ফোন কেটে দিল। সারারাত ওকে নিয়ে ভাবলাম। কেমন আজব ছেলে। কে আমি? কোথায় থাকি? কিছুই জানতে চাইল না। এ যুগেও এমন ছেলে হয়!

এরপর থেকে ফোন করা বা মিস কল দেয়া বন্ধ করি। ও যে পথে আসা যাওয়া করে তা খুজে বের করি। প্রায়ই ওকে দেখার জন্য রাস্তায় দাড়াই। ও অবশ্য কিছুই বুঝতে পারেনা। কত মেয়েই তো রাস্তা দিয়ে আসা যাওয়া করে। তাই হয়ত কেউ আমাকে সেভাবে লক্ষ্য করেনি। এর জন্য আমাকে অনেক বিড়ম্বনা পোহাতে হয়েছে। রাস্তায় দাঁড়ালে ছেলেরা বিভিন্ন মন্তব্য ছুড়ে দিত। আর রুবিনা থাকলে ও সেসবের প্রতিবাদ করত। একদিন এমনি করে ওকে দেখছি আর হাঁটছি। ভিড়ের মাঝখানে হঠাৎ কে যেন শক্ত করে আমার একটা হাত চেপে ধরল। আমি চমকে গেলাম। দেখি আমার মা হাত ধরে আছে। আর সামনেই একটা গাড়ি। মানে আর একটু হলেই এক্সিডেন্ট হত। মা আমাকে বাসায় এনে পুলিশি জেরা শুরু করল।

তোর কি হয়েছে? সত্যি করে বল।
আমার কিছু হয়নি।
রাস্তায় কি চিন্তা করে হাটছিলি? আর তোর জন্য তো আলাদা গাড়ি আছে। তাছাড়া তোর স্কুলের পথও এটা না। আজ যদি কিছু হয়ে যেত।

আমি মাথা নিচু করে বসে থাকলাম। মা আমার কাছে এসে আমাকে বুকে জড়াল। একটু পর দেখলাম মার চোখে পানি। মাকে কাঁদতে দেখে খুব খারাপ লাগল। চোখ মুছে দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কাঁদছ কেন?
মা বলল, ছেলেটা কে?
আমি চমকে উঠলাম। বললাম, কোন ছেলেটার কথা বলছ?
যার দিকে তাকিয়ে মরতে বসেছিলি।
জানিনা।
সত্যি করে বল। আমার কাছে লুকাস না। আমি একজন নারী এবং তোর মা। তাই আমি বুঝি। বল সত্যি করে বল।

মায়ের চোখের পানি দেখে আমি থাকতে পারলাম না। দুম করে নামটা বলে দিলাম। শুনে মা যেন আকাশ থেকে পড়লেন। মাকে সব খুলে বললাম। কি, কি করেছি। জাহিদের জন্য কেমন লাগে। মা আমাকে বুঝাতে চেষ্টা করলেন। বললেন এই বয়সটা খারাপ। এ বয়সে ভালো মন্দ বিচার করা যায়না। কাউকে মনে পড়তেই পারে। তাই বলে এটা প্রেম না। এটা এক ধরনের মোহ। বড় হলে কেটে যাবে। তাছাড়া তেল আর জল কোনোদিন মিশতে পারেনা। যতই হিরার টুকরা ছেলে হোক, কিছুই হবেনা। আমার বাবার স্ট্যাটাস আর জাহিদের স্ট্যাটাসে আকাশ পাতাল পার্থক্য। এটা কোনমতেই সম্ভব না, ইত্যাদি। এরপর থেকে মা আমার উপর কড়া নজরদারি শুরু করলেন। আমিও যোগাযোগের চেষ্টা করে কোন রিস্ক নেইনি। শুধু ওর জন্মদিনে, ঈদের দিনে কিংবা বিশেষ কোন দিনে ওকে ফোন করতাম। আমি চুপ করে থেকে ওর হ্যালো, হ্যালো শুনতাম। তাও হয়ত বড়জোর এক মিনিট। ব্যস এভাবেই কেটে গেল জীবনের কয়েকটা আনন্দহীন বসন্ত।

কৈশোর শেষ করে যৌবনে পা দিলাম। শরীরে তখন নতুন জোয়ার। জাহিদকে মনে পড়লে তছনছ করে দিতে ইচ্ছে করে সব। আবারো সাহায্য করল রুবিনা। তবে এবার আর কোন ছেলেমানুষি করিনি। রুবিনাকে সাথে নিয়ে একটা জম্পেশ প্ল্যান তৈরি করলাম। প্ল্যান মোতাবেক এগিয়ে ওদের বাসার কাজের মেয়ে মর্জিনাকে হাত করলাম। ও এখন আমার ট্রাম্প কার্ড। সুযোগ বুঝে ব্যবহার করব। আর বেচারা জাহিদ, কোথায় যে ভর্তি হয়েছিল! ওর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স মাস্টার্স শেষ করতে করতে আমি প্রাইভেট থেকে অনার্স শেষ করে ফেললাম। বাব তো বিয়ে দেয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন। কিন্তু আমি যে জাহিদকে ছাড়া বাচবনা। আমার শরীর, মন, আত্মা সবকিছু ওর জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। ব্যাপারটা এমননা যে আমি ওকে ভুলে যেতে চাইনি। বা আমার বাবার কথা মাথায় রাখিনি। অনেক চেষ্টার পরও ভুলতে পারিনি। তাই ওকেই নিয়তি মেনে নিয়েছি। যেদিন ওর বুকে মাথা রাখব, যেদিন ওর কাছে নিজেকে উজাড় করে সপে দিব , সেদিন আমার মানবজীবন ধন্য হবে। আমাকে আর কত কাল অপেক্ষা করতে হবে? আমার জাহিদকে আমি একান্তভাবে কবে পাব? একটার পর একটা মধুচুম্বনে কবে তাকে সিক্ত করব? ইস, কবে আসবে সেই মুহূর্তটা!

 

দুই

ড্রয়িং রুমের বিশাল জানালার পাশে শুয়ে আকাশ দেখছি। জানালা দিয়ে একটা ছাদও দেখা যায়। ছাদটার কর্নারে একটা দাঁড়কাক বসা। ওখানে ড্রামে সারি সারি গাছ লাগানো। খুব শৌখিন বাড়িওয়ালা। এতদিন চোখ পড়েনি। আজ চোখ পড়তেই বুঝলাম কতটা যত্ন করে ঐ গাছগুলো লাগিয়েছে কেউ। আনমনেই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। আমি অনেকক্ষণ যাবৎ দেখছি। কাকটা উঠছেনা। আমিও উঠছিনা। কখন যে মা আর ছোট বোন এসেছে বলতেই পারবনা। তারা কেমন অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। যেন আমি চিড়িয়াখানায় অন্তর্ভুক্ত হওয়া নতুন কোন চিড়িয়া! তাদের অবাক হওয়া নিয়ে আমি মাথা ঘামালাম না। না দেখার ভান করে হনহন করে পাশ কাটিয়ে আমার রুমে চলে এলাম। এসে দেখি আমার ফোনে দুইটা মিস কল। সাথে সাথে ব্যাক করি। ফোন রিসিভ করে মর্জিনা।
হেলু আফা, কিরাম আঁচেন?
ভালো। তোমার কি খবর?
বালা। একখান জরুলি খবর আঁচে।
কি খবর বল। তার আগে বল তোমার ভাইজানের শরীর কেমন?
আমরার ভাইজানের জ্বর আগেরতন বালা। সাইরা যাইব। তয় যেই খবর দিমু আন্নেরে, হেইডা হুনলে আন্নের নিজেরই জ্বর ওডি যাইব।
বেশি কথা না বলে খবরটা বল।
এইডা কিরাম কতা কইলেন আফা? আই আন্নের লগে বেশি কতা কইয়াম কিল্লাই? আর কি কোন কাম নাই?
আহা মর্জিনা, আমার মনটা একটু খারাপ। কিছু মনে করোনা।
আই তো জানি আন্নের মন খারাফ। আমরার ভাইজানের শরিল খারাফ থাকলে আন্নেরও মন থাকব। এইডা আর নতুন কি। আফনের কারেন্টের লাহান ভালোবাসা।
হুম। এবার খবরটা দাও।
আমরার ভাইজানের বিয়া ঠিক অইতাছে।
কি?
হ আফা। আন্নে আরে যত টিহা দিছেন তার কছম। একদম হাছা কতা।
মেয়েটা কে?
ভাইজান যেই অপিসে চাকরি করে, হেই অপিসের বড় সাবের মাইয়া। বেডায় আইজকা আইছিল। গুণ্ডার মতন চেহারা। লুইচ্চা লুইচ্চা একটা ভাব আঁচে।
বড় সাহেবের চেহারার কথা না বলে তিনি কি বলেছেন তা বল।
হুনেন না আফা। বেডায় পরথম ভাইজানরে দেখল। হেরপর আমরার আম্মার লগে বিয়ার কতা কইল। কয় ভাইজানরে বিদেশ পাডাইব। আরও বলে পড়ব। আম্মা মনে অয় রাজি অইয়া যাইব।
তুমি নিশ্চিত?
হ আফা। বেডায় ফল, ফুরুট, মিষ্টি, দই কত কিছু যে লইয়া আইছে। আমি খালি লাল বড় মিষ্টি খাইতাছি।
হুম। তোমার সাথে আমার দেখা করতে হবে।
আইজ সম্ভব না। কাইল বাইর অমু। কলোনি বাজারের কোনায় আইবেন।
আচ্ছা।
আফা আমার বিল অইছে বারশ টেহা। কবে দিবেন?
কাল দিব।

মর্জিনার কথা শুনে আমার পায়ের নিচে আর কোন মাটি নাই। আমার এতদিনের অপেক্ষা, এত চেষ্টা কি তাহলে বৃথা যাবে? বিছানায় উপুর হয়ে শুয়ে ভাবছি। এখন কি হবে? পিঠে একটা হাতের স্পর্শ পাই। ঘাড় ঘুড়িয়ে দেখি আমার ছোট বোন বৃষ্টি। আমার জন্য কফির মগ হাতে দাড়িয়ে আছে। ওর হাত থেকে মগটা নিলাম। কি মনে করে ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম।
আপুনি তোমার কি হয়েছে? এমন দেখাচ্ছে কেন তোমাকে?
কই, কি হবে আবার! আমি ঠিক আছি।
তুমি ঠিক নাই। কফিটা খাও। মাথা ব্যথা করলে বল আমি টিপে দেই। আর নাহলে লম্বা শাওয়ার নাও।

ওর কথা শুনে আনমনে আরও একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল।আজকে লক্ষ্য করলাম বোনটা যেন হঠাৎই আমার বান্ধবী হবার যোগ্য হয়ে গেছে। সেদিনের ছোট্ট বৃষ্টি আজ অনেক বড় হয়ে গেছে। অথচ এখনও কলেজের গণ্ডিও পার হয়নি। কি আশ্চর্য! জাহিদের কথা ও জানেনা। ভাবছি আজ ওকে বলব। আমার নিরবতায় ও অস্থির হয়ে উঠার আগেই মুখ খুললাম। বললাম, বৃষ্টি বস। আমার কাছে এসে বস। তোমার সাথে আমার কথা আছে।
কি কথা?
খুব মন দিয়ে শুনবে।
আচ্ছা।
তারপর একটু বিরতি নিয়ে বললাম, আমি একটা ছেলেকে ভালোবাসি।
কি!
কথাটা শুনে আমার বোন বসা থেকে দাড়িয়ে গেল। বারবার বলল, আমাকে তুমি আগে কোনোদিন বলনি। পুরো ব্যাপার শুনে বলল, কি আশ্চর্য! জাহিদের ছবি দেখে ও খুব পছন্দ করল। ততক্ষনে আমি মনে মনে একটা প্ল্যান করে ফেলেছি। রুবিনাকে ছাড়াই করে ফেললাম। কিছু কিছু সিদ্ধান্ত আছে, যা নিজেরই নিতে হয়। আমার হাতে একটাই চান্স। এটা মিস করা যাবেনা। যেভাবেই হোক প্ল্যানটা সফল করতে হবে। বৃষ্টিকে আমি কথাটা এমনি এমনি জানাই নি। ওকে জানানোর কারন হচ্ছে ওর মুখ পাতলা। পেটে কথা থাকেনা। সব বমি করে উগড়ে দেয়। আমি চাই জাহিদের ব্যাপারটা সবাই জানুক। এখন নিজের ঢোল তো আর নিজেই সরাসরি পিটাতে পারিনা। তাই ওকে ব্যবহার করলাম। আমি চাইছিলাম কথাটা ওর মাধ্যমে সবাই জানুক। এবং আমার পরিকল্পনার একটা অংশ সফল হল। মোটামুটি সন্ধ্যার মধ্যে বাবা ছাড়া সবাই জেনে গেল। অবাক হয়ে একেকজনের রিঅ্যাকশন দেখতে থাকলাম। মা গম্ভীর মুখ করে বসে আছেন। তিনি বোধ করি বাবা আসলে মুখ খুলবেন। বৃষ্টি খানিকটা উত্তেজিত। আর আমার ছোট ভাই বাদল সবচেয়ে বেশি উত্তেজিত। ভাইটা আমার মাত্র ক্লাস টেন এ পড়ে। না হলে সে কি করত আল্লাহ মালুম। তারপরেও সে কয়েকবার বলেছে ঐ সব জাহিদ ফাহিদ কে মেরে ঠ্যাঙ ভেঙ্গে দিবে। এসব তার জন্য ব্যাপার না।

যাহোক রাতে বাবা আসার পর ড্রয়িং রুমে মিটিং বসল। বিষয়বস্তু আমি এবং আমার প্ল্যান। বাবা অন্যদিকে তাকিয়ে আছেন। মা আমাকে দেখছেন। বৃষ্টি এবং বাদল নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। কিছুক্ষন পর বাবাই কথা বলা শুরু করলেন।
বর্ষা।
জি বাবা।
আমি এসব কি শুনছি?
কি শুনেছ?
আমাকে প্রশ্ন না করে সরাসরি উত্তর দাও। একদম ন্যাকামো করবে না।
বাবা আমি ন্যাকামো করছি না। যা শুনেছ সত্যি শুনেছ।
তুমি কি তোমার সিদ্ধান্তে অটল?
হ্যাঁ।
তোমার কাছে জীবনের মানে কি? শুধুই হেয়ালিপনা, পাগলামি অথবা ছেলেখেলা?
না।
তবে কি? কেন এমন করছ তুমি?
(নিশ্চুপ)
চুপ করে থেকনা। কথা বল।
(নিশ্চুপ)
আমাকে তোমার ষ্টুপিড প্ল্যানটা খুলে বল।
তুমি তো জেনেই গেছ।
আমি তোমার মুখ থেকে শুনতে চাই।
(নিশ্চুপ)
তুমি কেমন করে এমন একটা ষ্টুপিড প্ল্যান বানালে?
বাবা, প্ল্যানটা ষ্টুপিড না।
তাহলে কি?
আমার হাতে একটাই চান্স। আমি সেটা মিস করতে চাইনা।
আমার মান সম্মানের দিকে একবারও তাকাবে না।
(নিশ্চুপ)
মিডিয়াওয়ালারা ব্যাপারটা কিভাবে নিবে জান? একটার পর একটা প্রশ্নে আমাকে অস্থির করে তুলবে। খবরটার ফলোআপ দিয়ে আমাকে আকাশ থেকে টেনে মাটিতে নামাবে।
(নিশ্চুপ)
আচ্ছা বাদ দাও আমার কথা। একবার ছেলেটার কথা ভাব। ওতো তোমাকে চিনেই না। ভালোবাসা তো বহু দুরের কথা।
(নিশ্চুপ)
তোমার প্ল্যান মত কাজ হলে ওর পরিবার, ও নিজে এবং তুমি কলঙ্কিত হবে। ওরা এলাকায় মুখ দেখাতে পারবেনা। সামাল দিতে পারবে এত কিছু?
(নিশ্চুপ)
তুমি কি মনে কর, এতকিছুর পরও ছেলেটা তোমাকে নিয়ে সংসার করবে?
জানিনা।
উফ আল্লাহ। এই পাগল মেয়েকে আমি কি বোঝাব। তোমার যা খুশি কর। আমি কিছু জানিনা।

এতক্ষণে মা চিৎকার করে উঠলেন। বললেন, যা খুশি করবে মানে কি? এটা কি মগের মুল্লুক? এই মেয়ে তোমাকে আমি জন্ম দেইনি? তোমাকে জন্ম দিতে আমার কষ্ট হয়নি? তোমাকে লালন পালন করতে কষ্ট হয়নি?
(নিশ্চুপ)
কথা বল। নাহলে থাপড়ে গাল ফাটিয়ে ফেলব।
(নিশ্চুপ)
আয়নায় নিজের চেহারা দেখেছ? একটা মধ্যবিত্ত পরিবারের তথাকথিত হিরার টুকরা ছেলের মায়েরা সব সময় একটা সুন্দরী পুত্রবধু চায়। তুমি কিভাবে তাকে বিয়ে করতে চাও? নাকি ভেবেছ বাবার অর্থের জোরে পার পেয়ে যাবে?
(নিশ্চুপ)
মনে রেখ মেয়ে, তুমি যা বলেছ তা যদি কর তাহলে তোমাকে একটা ফুটো কড়িও দিবনা।
আচ্ছা।
কি আচ্ছা? তুমি বেরিয়ে যাও। এক্ষণ বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাও। আমার চোখের সামনে থেকে চলে যাও। বেহায়া মেয়ে। নির্লজ্জ কোথাকার।
মা, আমাকে বকাঝকা করনা প্লিজ।
ভালো না লাগলে বেরিয়ে যাও।
তোমাদের মান-সম্মান?
মানসম্মান তো তুমি এমনিতেই শেষ করে দিবে। আর ভেবে লাভ কি? ভাবব, আমার দুটো ছেলেমেয়ে। বর্ষা নামে আমার কোন মেয়ে নাই। যাও, তুমি এখনই বেরিয়ে যাও।
মা, এই নিয়ে তিনবার এখনই বেরিয়ে যেতে বললে। আমি কি চুরি করেছি? না গোপনে কিছু করেছি? তারপরও আমার সাথে এমন করছ কেন?
কেন এমন করছি বুঝতেই পারছনা!
না পারছিনা। আর শোন বেরিয়ে যাওয়ার কথা বললে না।
হ্যাঁ, বলেছি।
সংশোধন কর। আমি এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাব। তবে এখন না। বড়জোর দুদিন থাকব। তুমি চিন্তা করোনা। আমি চিরদিনের জন্য চলে যাব।
যাও চলে যাও। নরকে যাও। গোল্লায় যাও। যেখানে খুশি সেখানে যাও।

মা রাগের চোটে গণগণ করতেই থাকলেন। আমি আমার রুমে চলে এলাম। বাবা তার রুমে চলে গেলেন। বাদলটা শুধু চিৎকার করতে থাকল। বৃষ্টি ওকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিচ্ছে। রাতের খাওয়াটা মনে হয় পণ্ড হয়ে গেল।

আজ শুক্রবার। গতকাল রাত থেকে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা ভাব। অন্য সময় হলে বেশ উপভোগ করতাম। অন্তত লম্বা একটা ঘুম দিতাম। এখন তা পারছিনা। একটু আগে ঘুষখোর মর্জিনার সাথে দেখা করেছি। আগে ও আমার ট্রাম্প কার্ড ছিল। প্ল্যানটা চেঞ্জ করলাম। ওর বদলে অন্য কেউ মুল ভুমিকা নিবে। তবে ওকে দিয়েও আমি একটা দান জিতব!

মর্জিনাকে বিদায় দিয়ে দেখা করলাম রুবিনার সাথে। ওকে সাথে নিয়ে ভরপেট নাস্তা করলাম। পেট শান্তি তো দুনিয়া শান্তি। গতকাল সারাদিনে ঠিকমত খাওয়া হয়নি। রাতে তো তুলকালামই ঘটল। সকালের নাস্তা শান্তিমত করার পর রুবিনা একটা লম্বা ঢেকুর তুলল। ও চুপচাপ বসে আছে। এখন পর্যন্ত আমি আমার প্ল্যানটা কয়েকজনকে জানিয়েছি। এর মধ্যে দুজন খুব একটা অবাক হয়নি। তারা ভয় পেয়েছে। আর রুবিনা একদম ভয় পায়নি। শুধু অবাক হয়েছে। যদি সম্ভব হত তাহলে ওর চোখ কপালে তুলে আমাকে দেখত। চুপ করে সেই কখন থেকে আমাকে দেখছে। আমার হাতে সময় কম। সময় থাকলে রুবিনার অবাক হওয়া বের করতাম। আফসোস হারামজাদী সারা জীবন আমার সাথে থেকেও আমাকে চিনতে পারলনা।

সকাল দশটা বাজে। প্ল্যান মত সব চলছে। শুধু গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির বদলে অঝোরে বৃষ্টি হচ্ছে। যতদূর জানি আজ জাহিদদের বাসায় ওর অফিসের বস আসবে। এতক্ষণে হয়ত এসেও গেছে। আমি আর কিছুক্ষনের মধ্যে জাহিদদের বাসায় ঢুকব। আমার সাথে আছে রুবিনা ও বাবার অফিসের সেই ম্যানেজার আংকেল। তাকে গতকাল রাতে ম্যানেজ করেছি। আরও একজনকে ম্যানেজ করেছি। তিনি হচ্ছেন ডাঃ দিলরুবা খানম ও তার হাসপাতাল। সময়মত তারা ভূমিকা নিবে। শুধুমাত্র তাকে আর মর্জিনাকে পুরো দৃশ্যপট বোঝাতে আমার যা কষ্ট হয়েছে তা আর বলে বোঝানো যাবেনা। আমার পার্সে একটা ছোট্ট বোতল আছে। বোতলে পিউর মিনারেল ওয়াটার ভর্তি। শুধু লেভেলটা লাগানো সায়ানাইডের। সাংঘাতিক বিষ। শেষবারের মত বোতলটা ঠিক আছে কিনা দেখে নিতে নিতে জাহিদদের বাড়ি চলে আসল। ডোর বেল টিপতেই দরজা খুলে দিল একটা অল্প বয়সী কিশোর ছেলে। কতক্ষন জেরা করল। শেষে ড্রয়িং রুমে নিয়ে বসাল। সেখানে একজন স্যুটেড বুটেড লোক বসা। মনে হয় ইনি জাহিদের বস। তার মুখটা হাসি হাসি। বেচারা! হয়ত মেয়ের বিয়ের পাকা কথা দিতে এসেছে। একটু পর লোকটার চেহারা কেমন হবে তা ভেবে আমার হাসি পেল। রুবিনা ও ম্যানেজার আংকেল বেশ মুড নিয়ে সোফায় বসে আছে। কিছুক্ষন পর একজন মধ্যবয়স্ক মহিলা রুমে ঢুকল। মুখটা বেশ হাসি খুশি। বুঝে গেলাম ইনিই জাহিদের মা। তাকে আমি আজকের আগে না দেখলেও মর্জিনার কাছ থেকে চেহারার বর্ণনা নিয়েছি বহুবার। তাই চিনতে ভুল হলনা। ওনি আসার পর আমি দাড়িয়ে সালাম দিলাম। রুবিনা ও ম্যানেজার আংকেল আগেরমত চোয়াল শক্ত করে বসে রইল। জাহিদের মা সালাম নিল। আমাকে বসতে বলে নরম গলায় বলল, কে তুমি মা? ঠিক চিনতে পারিনি তো তাই জানতে চাইলাম। কিছু মনে করোনা আবার।
না, না। কি মনে করব আবার? ঠিক আছে। আমি “সেঁজুতি সুলতানা বর্ষা”।

রুবিনা কথা কেড়ে নিয়ে বলল, বর্ষা গ্রুপ অব ইন্ড্রাস্টিজের মালিকের মেয়ে ও। আমি ওর বান্ধবী। আর ইনি আমাদের একজন আংকেল।

বুঝলাম। তোমরা মনে হয় বড় স্যার কিংবা ছোট স্যারের ছাত্রী। কাকে ডেকে দিব বল। আজ আবার একটা শুভ দিন। আমার অনেক কাজ। হাতে একদম সময় নেই। জলদি বল মা, কাকে চাই?

মানে আন্টি ঠিক বুঝলাম না।

আরে বোকা মেয়ে না বোঝার কি আছে? আমার ঘড়ে দুইটা স্যার আছে। একজন আমার স্বামী। তিনি বড় স্যার। আরেকজন আমার বড় ছেলে। সে ছোট স্যার। এখন তোমরা কার কাছে এসেছ বল। ডেকে দিয়ে কাজে যাই। আজ দুপুরে স্পেশাল রান্না হবে। তোমরাও খেয়ে যাবে কিন্তু।

রুবিনা আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল। আমি থামিয়ে দিয়ে বললাম, আপনাকে আজ খুব খুশি লাগছে।

হ্যাঁ। আসলেই খুশি মনে আছি। আজকে আমার বড় ছেলের বিয়ের জন্য পাকা কথা দিব। ঐ দেখছনা কর্নারের সোফায় বসে আছে এক লোক, তারই মেয়ের সাথে। মেয়েটা খুব সুন্দরী। একদম পুতুলের মত। আমার জাহিদের সাথে খুব মানাবে।
হুম।
আচ্ছা, মামণিরা তোমরা তো কাকে চাও তা বললে না। একটু জলদি বল।
আসলে আমার বিয়ে দেখা হচ্ছে বাসা থেকে।
তা বেশ তো।
হ্যাঁ বেশ। কিন্তু……
কিন্তু কি?
কিন্তু, জাহিদ কি আপনাকে কিছুই বলেনি।

এ কথা বলার সাথে সাথে জাহিদের মা’র হাসি মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। মধুর সুর পাল্টে মোটামুটি গর্জন করার মত করে বললেন, কি বলতে চাও? পরিষ্কার করে বল।
আমি এবং জাহিদ একে অপরকে পছন্দ করি।
তো তাতে কি! এখন থেকে আর করবে না। কারন জাহিদের বিয়ে হয়ে যাবে।
মানে কি?
মানে তো তুমিই ভালো বুঝবে।
আমিই সব বুঝব। আর আপনি কিছুই বুঝবেননা। সব কথা খুলে বলতে হবে। এ যুগের পছন্দ করা মানে কি বুঝেন না?
এই মেয়ে মুখ সামলে কথা বলবে। আমার ছেলেকে আমি হারে হারে চিনি। ও এত কিছু করবে আর আমি কিছুই জানব না, এটা তো হতেই পারেনা। তবুও আমি ওকে ডাকছি।

জাহিদের মা ওকে ডাকল। তার ডাক শুনে জাহিদ এবং ওর ছোট ভাই জুনায়েদ ড্রয়িং রুমে আসল। এখানে বলে রাখি আমি জুনায়েদকে আগে দেখেছি। কিন্তু ও আমাকে কোনোদিন দেখেনি। ড্রয়িং রুমে ঢুকার সাথে সাথে ওকে ‘হাই জুনায়েদ’ বললাম। আমার কাছ থেকে হাই শুনে ওরা খুব অবাক হল। জুনায়েদের কৌতুহলি মন কিছু বলতে চাইছিল। তাকে মাঝ পথে তার মা থামিয়ে দিল। ডান হাতের তর্জনী দিয়ে জাহিদকে দেখিয়ে বলল, এই হল আমার ছেলে জাহিদ। আমি জানি ও নির্দোষ। তবুও আমি তোমার সামনে ওকে জিজ্ঞাসা করব।
হ্যাঁ করেন।

জাহিদের মা তাকে বলল, এই জাহিদ, তুই ওদের চিনিস?
না তো মা। কি হয়েছে?
তেমন কিছুনা। এই পাগল মেয়ে বলছে তোর সাথে নাকি ওর সম্পর্ক আছে।
ছিঃ। মা, আমি ওদের চিনিই না। আগে কোনোদিন দেখেনি।
আমি বললাম, সত্যি তুমি আমাকে চিনোনা?
জুনায়েদ বলল, আশ্চর্য! আপনি কথা বাড়াচ্ছেন কেন? ভাইয়া তো বলল আপনাকে চিনেনা।
জাহিদের মা বলল, জুনায়েদ তুই থাম। বড়দের ব্যাপারে নাক গলাবি না। এদের পুলিশে দিতে হবে।

এতক্ষণে কথা বলে উঠলেন ম্যানেজার আংকেল। হুংকার ছেড়ে বললেন, কে কাকে পুলিশে দেয় দেখা যাবে। আমাদের হাতে সাক্ষী, প্রমান সব আছে। নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে মামলা করব। তিন মাসের মধ্যে শাস্তি হবে। যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড হবে।

জাহিদের মা বলল, থামুন আপনি। একদম বাজে বকবেন না। মুখে যা আসছে তাই বলে যাচ্ছেন।

ম্যানেজার আংকেল আবার বললেন, বলব না তো কি আঙ্গুল চুষব? আমাদের সহজ সরল মেয়েটাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে কি সর্বনাশই না করেছে আপনার ছেলে। আমরা কিছু বুঝিনা মনে করেছেন? কেন করেছে আপনার ছেলে এসব, আমরা সব বুঝি।
কেন করেছে? আর করেছে কি আসলে?
কেন আবার সম্পত্তির লোভে করেছে। কোটিপতির মেয়েকে ফাঁদে ফেলে মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেরা যা করে তাই করেছে।
আমার ছেলের প্রতি আমার পূর্ণ আস্থা আছে। আমি জানি পৃথিবী উল্টে গেলেও এমনটা হতে পারেনা। তবুও দেখি আপনাদের প্রমান।
প্রমান আপনাকে দেখাতে হবে কেন? প্রমান দেখাব আদালতে। পুলিশের রিমান্ডে যখন মার খাবেন তখন বুঝবেন। জলে বাস করে কুমীরের সাথে লড়াই করতে চান।
উফ আল্লাহ। খালি কলসি বাজে বেশি জানতাম। তাই বলে এত বেশি বাজে তা জানতাম না। এখন বুঝতে পারছি আপনাদের হাতে কোন কচুর প্রমানও নাই।
কচুর প্রমান যদি দেখাতে পারি তাহলে কি করবেন?
আপনারা যা চান তাই হবে।
আমরা চাই আজই বিয়ে হবে। কাজী অফিসে আপনি নিজে উপস্থিত থেকে বিয়ে পড়াবেন।
আর না দেখাতে পারলে?
আপনি যা বলবেন তাই হবে। কি রাজি?
হ্যাঁ রাজি।

প্রমান দেখানোর প্রথম পর্যায়ে মোবাইলে কিছু টেক্সট দেখানো হল। এগুলো বেশ আপত্তিকর। মানে গার্ডিয়ানদের দেখার উপযুক্ত না। প্রিয় পাঠক, কি ভাবছেন? জাহিদ আমাকে টেক্সট করেছে? না, ব্যাপারটা তা নয়। এটা করিয়েছি মর্জিনাকে দিয়ে। মোবাইল এর প্রমান একদম পাত্তাই পেলনা। এরপর ডাকা হল মর্জিনাকে। মর্জিনার অভিনয় আমার প্রত্যাশাকেও হার মানিয়ে গেল। কাপড় টেনে লম্বা ঘোমটা দিয়ে, ভয়ে একেবারে জড়সড় হয়ে সামনে এসে দাঁড়াল।
জাহিদের মা বলল, মর্জিনাকে আবার ডাকা হল কেন?
রুবিনা বলল, এক্ষুনি পরিষ্কার হয়ে যাবে।
জুনায়েদ বাজখাই গলায় বলল, কি পরিষ্কার হবে? হচ্ছেটা কি আসলে?

জাহিদের মা বিরক্তি নিয়ে কপাল কুঁচকে বলল, উফ। তোকে নিয়ে আর পারিনা। চুপ থাকতে বলেছি তো। দয়া করে চুপ থাক। একটু থেমে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, হ্যাঁ তো বল এবার। মর্জিনা কি জানে।

আমি বললাম, মর্জিনা একজন চাক্ষুষ সাক্ষী।
কিসের সাক্ষী? ন্যাকামি করোনা। ঝেড়ে কাশ।
আসলে কিভাবে যে বলি।
আর কোন ভদ্রতা দেখাতে হবেনা। বল সব শুনি।
আপনার ছেলের সাথে আমার সব রকম সম্পর্ক আছে। আপনার এ বাড়িতেও বহুবার এসেছি। সেসবের সাক্ষী মর্জিনা। বুঝেছেন?

এ কথা শুনে জাহিদের মা ঘৃণাভরা চোখে আমার দিকে তাকাল। আর জাহিদ গোবেচারার মত মাথা হেট করে থাকল। কিছু সময় সবাই চুপ করে রইল। একটু পর জাহিদের মা মর্জিনার মুখোমুখি দাঁড়াল। অস্থিরভাবে ওর দু’বাহু ঝাকিয়ে বলল, এই মর্জিনা বল। সত্যি করে বল। তুই কি এসবের সাক্ষী?
মর্জিনা বলল, হ আম্মা। এই এডি আর নিজের চহে দেখছি।
কি দেখছিস?
শরমের কতা আম্মা। বাসায় আফনেরা কেউ না থাকলেই ভাইজান এই আফারে নিয়া আসত।

একথা বলার সাথে সাথে জুনায়েদ ছুটে এসে মর্জিনার চুলের মুঠি ধরে একটানে মেঝেতে ফেলে দিল। আচ্ছা মত চড়, থাপ্পড় দিয়ে চিৎকার করে বলতে থাকল, কুত্তার বাচ্চা, তোর এত বড় সাহস? আমার সামনে মিথ্যা বলিস? আমার ভাইরে অপবাদ দিস! তোকে মেরেই ফেলব।

আর মর্জিনা চিৎকার করে বলতে থাকল, ও আম্মাগো, ও আফাগো আরে বাছান। আই মইরা গেলাম গো। ও আম্মা। ও আফা। ও ভাইজানগো আই মইরা জামু। আর মাইরেন না। আরে ছাইড়া দেন।

জাহিদের মা, ম্যানেজার আংকেল প্রায় সাথে সাথে ছুটে গেল। জুনায়েদ কে শান্ত করতে বেশ বেগ পেতে হল। পরিস্থিতি চরম ঘোলাটে হয়ে গেল। ঠিক এ মুহূর্তে ড্রয়িং রুমের কোনায় থাকা ভদ্রলোকটা জাহিদের মা কে বলল, আপা আমি বরং যাই। লোকটার দু’চোখ পানিতে টলমল করছে। জাহিদের মা কিছু বলল না। তার দু গাল বেয়ে শুধু পানি পড়তে থাকল।

জুনায়েদ আবারো চেঁচামেচি শুরু করল। ভদ্রলোকটাকে নানা ভাবে থামানোর চেষ্টা করল। ভদ্রলোক নির্বিকার ভাবে ওদের বাসা ছেড়ে চলে গেল। জুনায়েদ অসহায় হয়ে ওর বাবার কাছে গেল। কাঁদতে কাঁদতে বলল, বাবা তুমি কিছু বল। প্লিজ বাবা। আমাদের যে আর মান সম্মান থাকবে না বাবা।

ওদের বাবা বলল, আমি কি বলব। মান সম্মান দেয়ার মালিক আল্লাহ। নেয়ার মালিক ও আল্লাহ। তিনি যা করেন ভালোর জন্যই করেন। তবে কেন যেন মনে হচ্ছে জীবনে অনেক বড় একটা পাপ করেছি।

জাহিদের বাবার শেষ কথাটা শুনে খারাপ লাগল। কিন্তু কি করব? আমি নিরুপায়! ভালোবাসা আর যুদ্ধক্ষেত্রে সবই যে ঠিক। আমি খুব কঠিন একটা পরিস্থিতিতে দাড়িয়ে আছি। জাহিদের মা নিঃশব্দে কাঁদছে। জুনায়েদ হাউ মাউ করে কাঁদছে। আর জাহিদ ও তার বাবা আশ্চর্য রকম শীতল। ম্যানেজার আংকেল জোর দিয়ে বিয়ের কথা বলছেন। দেখলাম কেউ খুব একটা কর্ণপাত করছে না। আরে বাবা আসল কাজ হচ্ছে বিয়ে। এখনই থেমে গেলে তো হবেনা। তাই ব্যাগ থেকে বোতলটা বের করে ঢক ঢক করে খেয়ে ফেললাম। খাওয়ার সাথে সাথে চোখ বুজে হাঁটু ভেঙ্গে পড়ে গেলাম। হাতের মুঠি থেকে সায়ানাইডের লেভেল লাগানো বোতল টা মুক্তি দিলাম। ওটা গড়িয়ে গড়িয়ে কোথায় যেন চলে গেল। কে যেন বলে উঠল, আরে কি আশ্চর্য? মেয়েটা এমন করল কেন হঠাৎ? কি খেল এটা? বিষ নাকি? এই বোতলটা খুজে আন।
ম্যানেজার আংকেল বললেন, কাউকে ছাড়বনা। সব কটাকে ফাঁসিতে ঝুলাব। মেয়েটার যদি কিছু হয়- সবাইকে দেখে নিব।

রুবিনার হাতে মনে হয় বোতলটা পড়ল। সে আঁতকে উঠার ভান করে বলল, আল্লাহ। পটাশিয়াম সায়ানাইড। এটা এবার কখন কিনল। এই এটা সাংঘাতিক বিষ। জলদি অ্যাম্বুলেন্স ডাক। ওকে বাঁচাও। প্লিজ।

সন্ধ্যা সাতটা বাজে। হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছি। সামনে বসে আছে ডাঃ দিলরুবা খানম। মাথার পাশে রুবিনা। গত দু ঘণ্টায় চমৎকার অভিনয় হয়েছে। আমাকে হাসপাতালে এনে ওয়াশ করা হয়েছে। জীবন বিপন্ন ইত্যাদি খবর দিয়ে সবাইকে চিন্তিত রাখা হয়েছে। একটু পর জ্ঞান ফিরেছে বলে ওদের ভিতরে ঢুকানো হবে। আমি তৈরি হয়ে নিলাম। হেড নার্স খবর দেয়ার পর দরজা খুলে ভিতরে ঢুকল জাহিদ, জুনায়েদ ও তাদের মা। ডাঃ দিলরুবা খানম তার হাতের ফাইলটা বন্ধ করে জাহিদের দিকে অতি চেনা মানুষের মত তাকালেন। মোলায়েম কণ্ঠে বললেন, বাবা জাহিদ। এস, এস। এখানে বর্ষার কাছে এসে বস।

জাহিদ তো পুরা “থ”। মুখ দিয়ে কোন কথাই বের করছে না। ওর ফর্সা গাল মুখ লাল হয়ে গেছে। ডাঃ দিলরুবা খানম একটু থেমে বললেন, বাবা তোমরা বড্ড বেশি ঝগড়া কর। এটা ঠিক না।

জাহিদের মা বলল, ডাক্তার আপা, আপনি কি ওদের চিনেন?
কি আশ্চর্য! চিনবনা মানে। খুব চিনি।
কিভাবে চিনেন?
কতবার আমার চেম্বারে এসেছে দুজনে।
ও।
আপনি বুঝি জাহিদের মা?
হ্যাঁ।
আপনি ওদের বুঝাতে পারেন না একটু?
কি বুঝাব?
এ সময় এমন করা ঠিক না।
এ সময় মানে? ঠিক বুঝলাম না।
আরে আশ্চর্য! দুষ্টগুলি দেখি এটাও বলে নাই। বর্ষা ইজ এক্সপেক্টিং। আপনি দাদি হতে চলেছেন।

জাহিদের মা আর কিছু বললেন না। জুনায়েদের হাত ধরে বাইরে বেরিয়ে গেলেন। ম্যানেজার আংকেল জাহিদের হাত ধরে তাকে বললেন, আপা ওদের বিয়েটা……। তিনি কথা শেষ করতে পারলেন না। তার আগেই করিডোর ছেড়ে চলে গেল জাহিদের মা।

তিন ঘণ্টা পর
আমার বিয়ে হয়ে গেছে। এখন থেকে জাহিদের মাকে আমি শ্বাশুড়ি বলে ডাকব। আমার মাকে ফোন করে জানিয়েছি সব। তিনি কোন কথা বললেন না। শুধু শুনলেন। রুবিনা ও ম্যানেজার আংকেল চলে গেছে। আমার শ্বাশুড়ির একটু শরীর খারাপ। আমি এখন জাহিদের রুমে বসে আছি। শুনেছি এই জাহিদ ও জুনায়েদ ঘুমায়। আজ কি হবে কে জানে। রুম নিয়ে হয়ত জুনায়েদ খুব ঝগড়া করবে। ঝগড়া করুক আর যাই করুক আমি মাথা গরম করব না। ওকে বুঝিয়ে বলব যে, আমি ওর ভাবী। এসব ভাবতে না ভাবতেই জুনায়েদ এসে হাজির। নিচু গলায় বলল, কি ব্যাপার আমার জায়গা দখল হল কেন?
আমি হেসে বললাম, জানিনা। কিন্তু তুমি ফিসফিস করে কথা বলছ কেন?
মা অসুস্থ। জোরে কথা বললে সমস্যা।
ও।
আপনি প্লিজ আমার রুম ছেড়ে দেন।
রুম ছেড়ে কোথায় যাব!
আপনি কই যাবেন সেটা আমি কি জানি?
এত আপনি আপনি করছ কেন?
তাহলে কি করব?
ভাবী বলবে। আমার তো একটা মাত্র দেবর। আর সেটা হচ্ছ শুধু তুমি। তুমি ভাবী না ডাকলে কে ডাকবে?
ইস, শখ কত!
কেন কি হয়েছে? সমস্যা কি? আমি কি তোমার ভাবী না?
না। কোনোদিন না। আপনার মত বদ মেয়ে আমার ভাবী হতে পারেনা।
ছিঃ জুনায়েদ। এভাবে বলতে হয়না। আচ্ছা তোমার ভাইয়া কোথায়?
ভাইয়া ছাদে।
ছাদে কি করে?
বুবলি আপুর সাথে কথা বলে।
বুবলি আপু কে?
আপনি এরকম গণ্ডগোল না করলে যার সাথে ভাইয়ার বিয়ে হত সে।

আমার বুকটা ধড়াস করে উঠল। এটা কি কোন কথা হল? আতঙ্কিত আবেগসহ খপ করে জুনায়েদের হাতটা ধরে বললাম, ও মাই গাড। এত রাতে ঐ মেয়ে এসেছে, আর তুমি এখন বলছ আমাকে? আগে আমাকে ছাদে নিয়ে চল প্লিজ।
আহ। বিরক্ত করবেন না তো। ছাড়ুন আমার হাত ছাড়ুন।
একশ বার করব। হাজার বার করব। আমার স্বামীর সাথে অচেনা যুবতী মেয়ে কথা বলবে আর আমি চুপ করে বসে থাকব? কখনো না। নেভার।
শুনুন, বুবলি আপু ভাইয়াকে খুব ভালোবাসে। ভাইয়ার যেহেতু বিয়ে হয়ে গেছে সেহেতু আজ মনে হয় ওদের শেষ কথ হবে। এর মাঝে কি বিরক্ত করা ঠিক?
না ঠিক না। তবুও আমি একটু শুনতে চাই। আচ্ছা লুকিয়ে শোনা যাবেনা ছাদে?
যাবে।
তবে আমাকে নিয়ে চল তারাতারি করে। শুনি ওরা কি বলে।
আচ্ছা চলেন। কিন্তু একটা অনুরোধ। আপনি কোন কথা বলবেন না। মনে থাকবে?
থাকবে।

জুনায়েদ আর আমি পা টিপে টিপে ছাদে এলাম। ছাদের পরিবেশটা ভূতুরে। আধো আলো, আধো অন্ধকার। একপাশে দাড়িয়ে আছে আমার জাহিদ আর ঐ বুবলি না টুবলি মেয়েটা। হিংসায় আমার বুকটা জলে যাচ্ছে। তবুও দাতে দাঁত চেপে আছি। একটু স্থির হয়ে কান পাতার পর শুনতে পেলাম ঐ মেয়েটা বলছে, জাহিদ সাহেব।
বল।
কি বলব?
তোমার যা ইচ্ছা।
আমার তো ইচ্ছা করে অনেক কিছু বলতে। সব কথা কি আর বলে শেষ করা যায়?
না।
আপনি আমার সাথে এমনটা না করলেও পারতেন।
হুম।
কেন এমন করলেন আমার সাথে?
(নিশ্চুপ)
শুনেছি অভাবে নাকি স্বভাব নষ্ট হয়। আপনারও কি তা হয়েছে?
(নিশ্চুপ)
না হলে আপনি এমন করলেন কেন?
জানিনা।
আপনি সব জানেন।
(নিশ্চুপ)
আপনি একটা লোভী, ইতর, ছোটলোক।
(নিশ্চুপ)

আমার স্বামীর সম্পর্কে এত বাজে কথা আমার পক্ষে সহ্য করা কষ্টকর। কিছু বলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু জুনায়েদ করজোড়ে না করল। তাই আবারো চুপ করে শুনতে লাগলাম। মেয়েটা আবারো বলল, আপনি যাকে বিয়ে করেছেন তার বাবার কি অনেক টাকা?
(নিশ্চুপ)
তার বাবার কি আমার বাবার চাইতেও বেশি টাকা? সে কি বিশ্বসুন্দরী?
(নিশ্চুপ)
কতবার বিছানায় গিয়েছেন ওর সাথে? হিসাব আছে নাকি তাও ভুলে গেছেন?
বুবলি……
চুপ। একদম চুপ। আমার নাম আপনি উচ্চারন করবেন না।
(নিশ্চুপ)
আসলে ভুল আমারই হয়েছিল। কেন যে আপনার মত একটা নীচ, জঘন্য মানুষের সাথে বিয়েতে রাজি হয়েছিলাম!
(নিশ্চুপ)
আপনি তো আমার যোগ্যই নন। কি আছে আপনার আমাকে দেয়ার মত?
(নিশ্চুপ)
আমার এক ঘণ্টার হাত খরচ, আপনার পুরো মাসের বেতন।
(নিশ্চুপ)
ছোটলোক কোথাকার। কথা বলছেন না কেন? বোবায় ধরেছে?
(নিশ্চুপ)
অন্য দিকে না তাকিয়ে আমার দিকে তাকান। আপনার একটা ভুল ধারনা ভেঙ্গে দেই।
কি ধারনা?
আপনার ধারনা আমি আপনাকে পছন্দ করি? ভালোবাসি?
(নিশ্চুপ)
মোটেই না। আপনার মত গবেটের প্রেমে পরার প্রশ্নই আসেনা।
(নিশ্চুপ)
আসলে আমি আপনাকে ঘৃণা করি। খুব ঘৃণা করি।
হুম।
নাকি ভেবেছেন দু-চারদিন কফি শপ, সিনেমা হলে গিয়েছি বলে আমি আপনাকে খুব ভালোবাসি?
(নিশ্চুপ)
আমি আপনাকে কোন দিনও মিস করিনি। ভালোবাসিনি। আপনাকে ছুয়ে দেখিনি। কারন আপনাকে আমি সত্যি ঘৃণা করি।
(নিশ্চুপ)

একটা শেষ অনুরোধ করি। রাখা না রাখা আপনার ব্যাপার।
হুম। কর।
যতদিন বাঁচবেন আনন্দ নিয়ে বাঁচবেন। কোনদিন মুখ গোমড়া করে বা মন খারাপ করে থাকবেন না। আপনার মলিন মুখ দেখতে কুৎসিত লাগে।
(নিশ্চুপ)
আপনাদের নতুন জীবন শুভ হোক। আমি যাই।
হুম। কোথায় যাবে এখন?
জানিনা।
মানে?
আপনাকে বলতে হবে এত কিছুর মানে?
না।
তাহলে গেলাম।

জাহিদ চুপ করে দাড়িয়ে রইল। আর ঐ মেয়েটা হনহন করে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। আমাকে কিছু না বলে জুনায়েদও দেখলাম চলে গেল। আমি ধীর পায়ে জাহিদের কাছে গেলাম। প্রথম বার নির্জনে জাহিদের সাথে। তাই খানিকটা নার্ভাস লাগছে। আমার বেশি নার্ভাস হওয়া লাগল না। আমাকে দেখতে পাওয়া মাত্র জাহিদই প্রথম নিরবতা ভাঙল।
কিছু বলবে?
না, খেতে চল। অনেক রাত হয়েছে।
আমি এখন খাবনা। ক্ষিদে নেই।
সারাদিন তো কিছু খাওনি।
সেঁজুতি সুলতানা, একটা রিকোয়েস্ট রাখবে?
শুনি আগে।
আমি একটু একা থাকতে চাই।
না। এই রিকোয়েস্ট রাখতে পারবনা। এখন থেকে কোনোদিন তুমি একা থাকবে না। এক্ষুনি খেতে চল।
জোর করছ?
হ্যাঁ। আর শোন আমার ডাক নাম বর্ষা। সেঁজুতি সুলতানা এত বড় নামে না ডেকে আমার ছোট নামটাতে ডেকো।

জাহিদ এ কথার কোন উত্তর দেয়না। ভাবলেশহীন মুখে কি যেন বিড়বিড় করতে থাকে। পরে আমার সাথে নিচে নেমে আসে। নিচে নেমে এসে দেখি মর্জিনা জাহিদের রুমে খাবার দিয়েছে। খাবার প্লেটে জাহিদ এক লোকমা মুখে দেয় আর কি যেন বলে। বিড়বিড় করে বলা কথাগুলো আমি শুনতে চাই। কিন্তু পারিনা। হঠাৎ দেখি জাহিদ খুব জোরে কাশছে। কাশতে কাশতেই সে বমি করে ভাসিয়ে দিল সব।

 

তিন

ভোর রাতে ঘুম ভাঙল আমার। মাঝ রাতে জাহিদের খুব জ্বর এসেছিল। ওকে অনেকবার মাথায় পানি দিয়েছি। এখন জ্বরটা একটু কম। আমার বাসর রাত স্বামীর সোহাগ ছাড়াই কাটল। অবশ্য বেশিরভাগ নারীরই তা হয়। কারন আনুষ্ঠানিক বিয়েতে ঝক্কি ঝামেলা হয়। বর কনে খুব ক্লান্ত থাকে। বাসরঘরে বেশি কিছু হয়না। বড়জোর হালকা পাতলা কিস! এসব পূর্বে বিবাহিত বান্ধবীদের কাছ থেকে শুনেছি। সত্যি হতে পারে আবার নাও হতে পারে। আচ্ছা যদি সত্যি না হয় তবে কেন আমার মাথায় আসল? মনে হয় আমি খুব তৃষিত। জাহিদের কাছ থেকে আদর আশা করেছিলাম। পাইনি বলে আমার মনের ডিফেন্স ম্যাকানিজম এমনটা করেছে। জাহিদের সাথে আমার মনের মিল পরে হবে। আগে শরীরের মিল হোক। মনে হচ্ছে একটু সময় লাগবে। আজ যতবার ওর কপালে হাত রেখেছি ততবার ও কেঁপে উঠেছে। তাই পাশে বসে থেকে ফ্লাইং কিস করেছি আর ওকে কাছ থেকে দেখেছি। ফর্সা একটা মানুষ। গালের নিচে হাত দিয়ে ঘুমায়। শোয়ার অভ্যাস অসম্ভব রকমের ভালো। একদম সোজা হয়ে ঘুমায়। নাক ডাকেনা। ওর নাকের উপর চিনির রোয়ার মত বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে। শুনেছি এমন ছেলেরা নাকি বউয়ের আদর বেশি পায়। এই কথাটা মনে হয় একশ ভাগ সত্যি। কারন আমি তো সত্যিই ওকে অনেক আদর দিব! ওকে আমার কোলবালিশ বানাব। যাকনা আর কিছুদিন। সব ঠিক হয়ে যাবে।

বাবা, মা, ভাইবোনের জন্য একটু খারাপ লাগছে। সবচেয়ে বেশি মিস করছি আমার এসি করা রুম। তবুও ভালো লাগছে জাহিদ আমার পাশে আছে বলে। বারান্দা দিয়ে খুব সুন্দর একটা বাতাস আসছে। প্রাকৃতিক বাতাস। এ বাতাসে আমার শরীর জুড়াতে বারান্দায় এসে দাড়াই। বারান্দায় এসে দাড়াতেই দেখি অবাক কাণ্ড। জাহিদদের বাড়ির উল্টোদিকে বাড়ির গেটে জুনায়েদ দাড়িয়ে আছে। আমাকে দেখেই বলল, সব কথা পরে হবে। আগে আমাকে ভিতরে ঢুকাও। আমার টেবিলের ড্রয়ারে গেটের চাবি।

আমি ভেবে পেলাম না, জুনায়দের কি হল? ও বাইরে কেন? আর হঠাৎ আপনি থেকে তুমিতে নেমে এল কেন? তবুও এসব প্রশ্ন মনে চেপে ওর কথা মত চাবি খুজে ওকে বাড়ির ভিতরে ঢুকালাম। রুমে ঢুকে ও প্রথমে জাহিদের কপালে হাত রাখল। যেন ও জানত যে জাহিদের জ্বর। তারপর আমার মুখোমুখি বসল। আমি বললাম, কি ব্যাপার? কোথায় ছিলে?
বুবলি আপুর সাথে।
সারারাত ছিলে?
হু।
কি বল!
হু সত্যি। ভাবী তুমি বিশ্বাস করবে না আজ কি হয়েছে। অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে।
আসলেই তো অদ্ভুত। আমি না বদ মেয়েছেলে। কখনোই ভাবী হতে পারিনা।

জুনায়েদ লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে। আমার হাত ধরে বলে, সরি ভাবী। আমি হাত ছাড়িয়ে ওর চুল এলোমেলো করে দেই। বলি, ঠিক আছে। এবার বল কি হয়েছে?
শোন বলছি। বুবলি আপু বের হওয়ার সময় আমিও সাথে সাথে গিয়েছিলাম।
হ্যাঁ, দেখেছিলাম। কিন্তু আমি ভেবেছিলাম তুমি ফিরে এসেছিলে।
না, আমি ফিরে আসি নাই। বাইরে বেড়িয়ে দেখলাম বুবলি আপুর মন খুব খারাপ। সাথে গাড়ীও নাই। কোথায় যাবে জানতে চাইলে বলে, হাটতে হাটতে যেদিক যাওয়া যায়।
তাই নাকি?
হ্যাঁ। আমিও সাথে যেতে চাইলে ওনি বাধা দিলনা। আমার পকেটে কোন টাকা নাই। খালি একটা পাঞ্চিং নিকেল ছিল। আর ওনার পার্সে ক্রেডিট কার্ড আর অল্প কিছু খুচরা টাকা। প্রায় আধঘণ্টা হাটার পর বলল, বারে যেতে চান। তার আগে টাকা তুলতে চান। কারন পার্সে মাত্র দু’শ টাকার মত আছে। কিন্তু বিধিবাম। টাকা তোলার বুথের নেটওয়ার্ক ফেল। আমরা কয়েকটা বুথে গেলাম। লাভ হলোনা।
হুম। পরে কি হল?
পরে হাটতে হাটতে রাত দেড়টার দিকে ধানমণ্ডি পৌঁছলাম। মেইন রোড থেকে একটু ভিতরে। একটা বাড়িতে ডিজে পার্টি হচ্ছিল। তার পিছনে একটা বিশাল দিঘী। দিঘীটার কাছে পৌছতেই বুবলি আপুর আচরন বদলে গেল।
মানে?
মানে ঠিক বুঝাতে পারবনা। কেমন জানি উল্টোপাল্টা হয়ে গেল আপু। আমার দিকে তাকিয়ে সুর করে বলল, I take to thee candy shop. গানটা শেষ না করেই পুকুরের এক পারে বসে পড়ল ঘাসের উপর। পা থেকে জুতা খুলে ফেলল। স্ট্রীট লাইটের আবছা আলোতে তার মুখটা দেখে আমি খুব ভড়কে গেলাম। হঠাৎ দেখি তার হাতে একটা আংটি।

এটুকু শুনে আমি বললাম, তো তাতে কি হয়েছে? মানুষ কি আংটি পরতে পারেনা?
জুনায়েদ বলল, আগে শুনে নাও। ঐ আংটিতে একটা পাথর বসানো। পাথরটা লাল রঙের। আংটির কথা জিজ্ঞেস করতেই খিল খিল করে হেসে উঠল। তারপর যা বলল তা রীতিমত ভয়ানক।
কি সেই ভয়ানক ব্যাপারটা?
ভয়ানক ব্যাপারটা হল, তাকে নাকি একটা জ্বীন পছন্দ করে। অনেক চেষ্টা করেও এই জ্বীন ছাড়ানো যায়নি। পরে হাতে এই পাথরের আংটি দেয়া হয়েছে। আংটি দেবার পর থেকে জ্বীনটা বেশি জ্বালাতন করতে পারত না। তবে শর্ত ছিল এই আংটির রহস্য যেন কেউ না জানে। জানলে বিপদ হবে।
তো তুমি যে জানলে?
জেনে তো আমিও বিপদে পড়েছি।
কি বিপদ?
আংটির কথা বলতে শুরু করা মাত্রই ধরল টহল পুলিশ। খুব বিশ্রী ভাবে জেরা করল। পুলিশের জেরা শেষ হওয়া মাত্র বুবলি আপু বলল, এগুলো আংটির কথা ফাঁস হওয়াতে হচ্ছে। ভয় পাওয়ার কিছু নাই।

এমন একটা আজগুবি আর বিদঘুটে গল্প শুনে আমি কিছুটা অবিশ্বাসের ভান করে বললাম, তুমি ওসব বিশ্বাস করেছ?
প্রথমে করিনি। পরে করতে বাধ্য হলাম।
কেন?
কারন, পুলিশ ধরার পর জেদ চেপে গেল। যা হয় হবে, আমি শুনবই। বুবলি আপু আবারও বলল, আজ ভাইয়ার মুখ জ্বীনটা চেপে ধরেছিল। যাতে ভাইয়া কোন কথা না বলতে পারে। আর তোমার সাথে যেন ভাইয়ার বিয়ে হয়ে যায়। শোন ভাবী, আমি সব জানি। তুমি ভাইয়াকে বিয়ে করার জন্য কি কি করেছ, একদম সব জেনে গেছি।
কিভাবে?
বুবলি আপু বলেছে।
কি কি বলেছে?
সব। ঘুষখোর মর্জিনা থেকে শুরু করে ডাঃ দিলরুবা খানম। এমনকি আজ রাতে ভাইয়া খুব বমি করেছে প্লাস তার জ্বর এসেছে। এসব তো সত্যি। তাই না ভাবী?
হু সত্যি। আচ্ছা এতসব শুনলে আর বিপদে পরনি?
পরেছি তো। এসব শুনতে শুনতে আবার ধরল র্যাব। তারপর হাটতে হাটতে চলে এলাম শাহবাগ। রাত আনুমানিক তিনটা হবে। ওখান থেকে গরম গরম পরোটা, ডিম ভাজি খেলাম। ওহ! সুপার ছিল খাবারটা।
এত রাতে পরোটা, ডিম পাওয়া যায়?
রেগুলার পাওয়া যায় কিনা জানিনা। তবে আজ পাওয়া গেল। এরপর হাটতে হাটতে আমরা রমনার দিকে এলাম। জ্বীন সম্পর্কিত কথা কিন্তু চলছিল। রমনা পার্কের দিকের জায়গাটা অন্ধকার। ওখানে জীবনের আজব ঘটনা দেখলাম।

জুনায়েদের এমন নাটকীয় উপস্থাপনার কথা তারাতারি শুনতে মন চাইছে আমার। তাই ওকে বললাম, ওফ জুনায়েদ! তুমি বড্ড বেশি নাটক করে কথা বল। খালি আগ্রহ বাড়াও। তাড়াতাড়ি বলনা কি হয়েছে।

জুনায়েদ বর্ণনার আগের ভঙ্গি ঠিক রেখে বলতে থাকল, বলছি ভাবী শোন। ওখানে দেখি পার্ক থেকে পুরুষ মানুষের কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছে। চারিদিকে শুধু হিজড়া ভর্তি। কিছু হিজড়া হঠাৎ আমাদের পিছু নিল। হাতে তালি দিয়ে বলে উঠল, “ভালো মাল দেখলে ভালো লাগে”।

জুনায়েদের মুখে এমন কথা শুনে আমি হাসি থামাতে পারলাম না। শব্দ করে হেসে ফেললাম। জুনায়েদ কপট রাগের ভান করে বলল, ভাবী হাসবেনা কিন্তু।
হি হি হি।
আমার হাসি থামছেনা দেখে জুনায়েদ কথা থামিয়ে দিল। এটা দেখে বাধ্য হয়ে জোর করে হাসি থামিয়ে বললাম, আচ্ছা। তারপর বাকি ঘটনা বল।

আমি হাসি থামাতেই জুনায়েদ আবার পূর্ণ আগ্রহে বর্ণনা শুরু করল। ও বলল, হিজড়া দেখে আমার পা কাঁপতে লাগল। আমি জীবনে তিনটা জিনিস খুব ভয় পাই। আর তা হল হিজড়া, কুকুর ও সাপ। আর তার মধ্যে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হিজড়া আমাদের পিছু নিয়েছিল। এক পর্যায়ে ওরা আমাদের ধরার জন্য দৌড় দিল। ওদের হাত থেকে বাঁচতে আমরাও দৌড় দিলাম। রাস্তায় কোন গাড়ি বাস নাই। হঠাৎ হঠাৎ যাও আসে সেগুলো ট্রাক। প্রায় ধরে ফেলবে এমন সময় কোথা থেকে একটা রিকশা এসে আমাদের দুজনকে তুলে নিল। পরে ঐ রিকশা দিয়ে বুবলি আপুর বাসায় যেতে যেতে ঐ রিকশাওয়ালার কাছ থেকে শুনলাম হিজড়া দুই প্রকার। একটা পুরুষ হিজড়া, আরেকটা মহিলা হিজড়া। পুরুষ হিজড়ার উপরের অংশ মেয়েদের মত। আর মহিলা হিজড়ার নাকি কিছুই নাই।

হুম। পরে কি হল?

পরে আর কি! রিকশা করে বাসার সামনে এসে দাড়িয়ে থাকলাম। গেট বন্ধ তাই ঢুকতে পারছিলাম না। একটু আগে তোমার দয়া হল। তাই বারান্দায় গেলে এবং আমাকে ভিতরে নিয়ে আসলে।
হুম। তোমার সাথে আজ সত্যিই আজব ঘটনা ঘটেছে। জুনায়েদ, ভাবছি তোমাকে কিছু কথা বলব। খোলাখুলিভাবে বলি।
বল।
তুমি মেয়েমানুষের গায়ে হাত তোলা কিভাবে শিখেছ? এটা কি ঠিক বল?
না।
তাহলে আজ কি করলে? আধুনিক যুগে বাস করে মধ্যযুগীয় বর্বরতা দেখানো উচিত না। মর্জিনাকে এমন ভাবে মারলে যে ভাবলে এখনো শিউরে উঠি।
সরি ভাবী। আসলে রাগ দমাতে পারিনি। তাই এমনটা হয়েছে। আর হবেনা।
আরেকটা কথা। তুমি সাপ, কুকুর ভয় পাও ঠিক আছে। কিন্তু হিজড়া ভয় পাও কেন?
ভাবী, এটা তুমি বুঝবেনা। কারন হিজড়া তো আর মেয়ে মানুষদের পিছু নেয়না। কোনোদিন তাদের পাল্লায় পড়লে বুঝতে।
তুমি বোকার মত কথা বল কেন? একবার ভেবে দেখ তো হিজড়াদের কি আলাদা বাবা মা আছে? তারা তো আমাদের মত ভালো মানুষের ঘড়েই জন্মায়। তারাও কিন্তু মানুষ। তাদেরও অধিকার আছে। আর তারা সাপ কিংবা কুকুরের মত ভয়ঙ্কর নয়।
এমন ভাবে তো কোনোদিন ভেবে দেখেনি।
ভেবে দেখনি, কিন্তু এখন ভাববে। আর তাদেরকে হিজড়া বলবেনা। শুনতে খারাপ শোনায়। তাদেরকে “যৌন প্রতিবন্ধী” বলবে।
ঠিক আছে। ভাবী আমার ঘুম পাচ্ছে। ঘুমাব।
ঘুমানোর আগে একটা কথা বল।
কি?
এই যে এত কিছু করলাম। এখন কি হবে?
ভাবী শোন, তুমি ভাইয়াকে “একটু বেশি ভালোবাস”। তাই দেখো সব ঠিক হয়ে যাবে।
তাই যেন হয়।

কথা শেষ করে জুনায়েদ ওদের রুম সোফাতে ঘুমিয়ে পড়ল। আমিও জাহিদের পাশে শুয়ে পড়লাম। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি বলতেও পারলাম না। ঘুম থেকে উঠে দেখি অনেক বেলা হয়ে গেছে। জাহিদ আমার পাশে নেই। মনে হয় অফিসে গেছে। ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে আসার পর দেখা হল জুনায়েদের সাথে। ওর কাছেই জানতে পারলাম আমার শ্বাশুড়ির শরীর এখন একটু ভাল। তবুও আমাকে সাবধান করে দিল, আমি যেন আমার শ্বাশুড়ির সামনে না যাই। আমাকে দেখলে হয়ত উত্তেজিত হয়ে যেতে পারেন।

সারাদিন আমার মোটামুটি কাটল। জুনায়েদ সাধ্যমত সঙ্ঘ দিল। তাছাড়া মর্জিনা তো আছেই। রাতে বাসায় ফিরল জাহিদ। তেমন কোন কথা বার্তা হলনা। খাওয়া দাওয়া করে এক বিছানায় খুব কাছাকাছি শুয়ে আছি। শুয়ে শুয়ে আমার মনে হল, এত কাছে তবুও কত দূরে আমরা! আজ আর জুনায়েদ রুম নিয়ে কোন ঝামেলাই করল না। নিজ থেকেই অন্য রুমে চলে গেল। জাহিদ বিছানায় শোয়ার কিছুক্ষনপর ঘুমিয়ে গেল। ও ঘুমাবার পর আমি চোখ খুললাম। বারবার ইচ্ছা করছে একটা চুমু দেই। কেন জানি পারছি না। রাতটা বলতে গেলে আমার নির্ঘুমই কাটল।

সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে চমকে গেলাম। বেলা প্রায় দশটা বাজে। জাহিদ এখনও ঘুমে। তাড়াতাড়ি ওকে ধাক্কা দিয়ে ঘুম থেকে জাগালাম। ও ঘুম জড়ানো চোখে বলল, কি? কি হয়েছে?
কি হয়েছে মানে? অফিসে যাবেনা?
না।
আজ তো ছুটির দিন না। তোমাদের অফিস কি বন্ধ নাকি?
না।
তাহলে?
এমনি।
আরে এমনি কি? যাও অফিসে যাও।
সেঁজুতি সুলতানা।
বড় নামে ডাকতে নিষেধ করেছি না? যা হোক বল।
আমার আর অফিসে যাওয়া লাগবে না।
কেন?
আমার চাকরি চলে গেছে। গতকালই আমাকে ডিসমিস করা হয়েছে।
কি বল? এতবড় ঘটনা ঘটে গেল, আর কেউ জানতে পারল না?
এখন তো জানা হল।
এখন জানা হল মানে? না জিজ্ঞেস করলে বলতে?
তা হয়ত বলতাম না।
এখন কি হবে?
কি হবে আবার!
মানে তুমি এখন কি করবে?
একটা কিছু তো করবই। একেবারে কিছু না হলে লেবার ভিসায় আরব আমিরাত চলে যাব। মাসে মাসে রিয়েল পাঠাব।
কি সব আজে বাজে বকছ? নেশা টেশা করেছ নাকি?
নাহ। এখন পর্যন্ত করি নাই। তবে ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা নাই।
এই এমন করোনা। অন্য কোথাও ট্রাই কর। সিভি ড্রপ কর। তোমার যোগ্যতা আছে। বাসায় বসে থাকলে চলবে না। আমি কি তোমার জন্য ট্রাই করব? ম্যানেজার আংকেল কে বললে কালই একটা চাকরি হয়ে যাবে। ওনার নিজেরই অনেক প্রতিষ্ঠান আছে।
নো থ্যাংকস। আমার চাকরির জন্য কারো রিকোয়েস্ট লাগবেনা।
রিকোয়েস্ট না লাগলে তো বেটার। নিজে কিছু কর।
সময় লাগবে। এক যায়গায় কথা বলেছি। হয়ত হয়ে যাবে।
কোথায় সেটা?

জাহিদ কথার কোন জবাব দিলনা। ও পাশ ফিরে উপুড় হয়ে কানের উপর বালিশ চাপা দিল। এর অর্থ সে এখন আর কোন কথা বলতে চায়না। আমার মনটা একটু খারাপ হয়ে গেল। আনমনে দেখি একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। ব্যাপারটা জুনায়েদকে জানালাম। তার খুব একটা রিঅ্যাকশন পেলাম না। সে বলল, ভাইয়া আর বাবা এমনই।

আমার মনটা কেমন জানি লাগছে। মনে হয় বড় কোন বিপদ আসবে। সৃষ্টিকর্তা মানুষের মন খুব আজব জিনিস দিয়ে তৈরি করেছেন। সেখানে কেমন করে যেন সব কিছুর খবর পৌঁছে যায়। এ খবর কেউ টের পায় আবার কেউ পায়না। যারা টের পায়না তারা মনে হয় খুব দুর্ভাগা।

সারাদিন এলে বেলে করে কাটল। এক রুমে বন্দী। জাহিদের সাথে টুক টাক কথা বার্তা হল। তবে কথাবার্তা কখনোই নব-দম্পতির মত মধুর হলনা। যেটুকু হয়েছে সেটাকে স্রেফ সৌজন্যতা বলা যায়। আশা করি ঠিক হয়ে যাবে সব।

বুকটা ঢিব ঢিব করছে। হৃদপিণ্ডটা খুব জোরে লাফাচ্ছে। যেন বাইরে বেরিয়ে আসতে চায়। একটু আগে আমার শ্বাশুড়ি আমাকে ও জাহিদকে ডেকেছেন তার রুমে। এখন আমরা যাব। কি জানি কি হবে? কে আগে কথা বলবে? বা কি বলব? এসব ভাবতে ভাবতে তার রুম চলে এল। আমাকে খুব একটা বিব্রত হতে হলনা। রুমে ঢুকে জাহিদই প্রথমে কথা বলল আমার শ্বাশুড়ির সাথে। তিনি তার বিছানায় আধশোয়া হয়ে আছেন। মুখটা কেমন ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। গায়ের উপর একটা কাথা দেয়া। আমার শ্বশুর তার পাশে বসে আছেন। আমরা দুজনে এক পাশে বসলাম। একটু পর মর্জিনা ও জুনায়েদ ঢুকল। বাসার কেউ আর বাকি রইল না। আমার শ্বাশুড়ী কথা শুরু করলেন।
জাহিদ, তোর নাকি চাকরি চলে গেছে?
হু।
ডিসমিস লেটারে কি বলেছে?
বলল, আমি অসৎ, ভণ্ড, প্রতারক। আমার মত কেউ ঐ প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার যোগ্যতা রাখেনা।
বুবলির বাবা কিছু বলল?
বেশি কিছু না। শুধু বলল- আমি যেন তার সামনে না পরি।
ও। আচ্ছা জাহিদ তোরা কি কিছু ভেবেছিস?
কি ব্যাপারে?
কোথায় থাকবি এখন বা এমন কিছু।

জাহিদ জবাব দেয়ার আগেই আমি বললাম, কোথায় যাব আবার? এখানেই থাকব।
আমার শ্বাশুড়ী আমার দিকে তাকালেন। স্পষ্ট গলায় বললেন, এখানে থাকবে কেন?
কোথায় থাকব?
কোথায় থাকবে তার আমি কি জানি? নাকি বলতে চাও এ বাড়িটাও তোমার হয়ে গেছে?

কথাটা শুনে খুব কষ্ট লাগল। দাঁত কিড়িমিড়ি দিয়ে সামলে নিলাম। শীতল গলায় বললাম, না আমি এটা বলতে চাইনা।
ও আচ্ছা। এ বাড়ির ইতিহাস জানো?
না।
শুনবে?
বলুন।
এ বাড়িটা আমার শ্বশুর আমার নামে লিখে দিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি আমাকে খুব স্নেহ করতেন। ঐ সময় বাড়িটা টিনশেড ছিল। এরপর রক্ত পানি করা টাকা দিয়ে এ পর্যায়ে এসেছি।
হুম।
আচ্ছা, বলত এ বাড়ির সর্বেসর্বা কে?
আপনি।
ধন্যবাদ, বুঝতে পারার জন্য। এখন আমি এ বাড়ির সর্বেসর্বা হিসেবে একটা ঘোষণা দিচ্ছি। সবাই মন দিয়ে শোন।

সবাই উৎকণ্ঠিত চোখে তাকায়। একটু থেমে আমার শ্বাশুড়ী আবার বলেন, আজ থেকে এ বাড়িতে জাহিদ নাম কেউ নিবেনা। আগামিকাল সূর্য উঠার আগে জাহিদ এ বাড়ি ছেড়ে চিরদিনের জন্য চলে যাবে।

এ কথা শুনে জাহিদ মা বলে কিছু একটা বলতে চাইল। আমার শ্বাশুড়ী তাকে দুই হাত উচু করে থামিয়ে দিল। আবার বলল, এক্ষণই বের করে দিতাম। দিলাম না কারন, শুনেছি ওর বউ অসুস্থ। এ অবস্থায় তাই রাতে বের করলাম না। তাছাড়া সবার সাথে শেষ দেখা বলেও তো একটা কথা আছে।

জাহিদ বলল, মা বলছ টা কি এসব?

জাহিদের মা আস্তে আস্তে বলল, তুই আমাকে আর মা বলে ডাকবি না। একসময় তোর মুখে মা ডাক শুনতে খুব ব্যাকুল ছিলাম। কবে তুই মা ডাকবি! খুব ছোটবেলায় যখন তুই অনেক ছোট ছিলি। যখন তোর মুখে কোন স্পষ্ট কথাই ফুটেনি। একটা দুইটা শব্দ বললে যখন আনন্দে সারা বাড়ি মাথায় নিতাম, তখন তুই আমাকে মা বলে ডাকলি। সেই থেকে তোর মুখে মা ডাক শুনলে আমার বুকটা ভরে যেত। আর এখন এই ডাকটাই বিষের মত লাগে।
জাহিদ মাথা নিচু করে দাড়িয়ে রইল। আমার শ্বাশুড়ী আবার বললেন, এক সময় আমার তোকে নিয়ে খুব গর্ব হত। এখন আমার খুব লজ্জা হয়। টাকার লোভে তুই এমন কাজ করতে পারলি?

জাহিদ বলল, মা আমি কিছু জানিনা। বিশ্বাস কর মা।

জুনায়েদ বলল, মা, যা হবার তাতো হয়েই গেছে। ভাইয়াকে বের করে দিওনা।

আমার শ্বাশুড়ী ঝাঁঝালো গলায় বললেন, তোর কাছ থেকে পরামর্শ চাইনি। আর একটা কথা মনে রাখ, আজ থেকে তোর কোন ভাই নাই। জাহিদ নামের বেলেহাজ কুত্তা তোর ভাই হতে পারেনা। তারপরেও যদি কুত্তাটার সাথে সম্পর্ক রাখিস তাহলে আমি এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাব।

জুনায়েদ বলল, মা তুমি থামো। এখন আর কথা বল না। তোমার শরীর খারাপ করবে।

আমি তো কিছু বলার সাহসই করতে পারছিলাম না। তবুও মিনমিনে গলায় বললাম, ভুল তো মানুষই করে। আমরাও করেছি। আমাদের মাফ করে দেন। একটা সুযোগ দেন।

আমার শ্বাশুড়ী এবার দ্বিগুণ ঝাঁঝালো গলায় বললেন, আমি বারবার এককথা পছন্দ করিনা। এ বাড়িতে আমার কথার নড়চড় হয়নি আর হবেও না।
আর কোন কথা নড়চড় হবেনা। শুধু আমাদের বের করে দিবেন না।
অযথা কথা বাড়ানোর চেষ্টা করোনা। এমনিতেই তুমি আমার সাজানো বাগানে ঢুকে বন্য হাতির ঝড় তুলেছ। এক মুহূর্তে সব লন্ড ভণ্ড করে দিয়েছ। নিঃস্ব করে দিয়েছ। এখন কি আমার প্রাণটাও নিয়ে ষোলোকলা পূর্ণ করতে চাও?

আমি কোন জবাব দিলাম না।

আমার শ্বাশুড়ী আবার বললেন, তুমি তো জানো যে আমার হার্টের অসুখ আছে। আমাকে ইচ্ছে করে উত্তেজিত করোনা। আমার উপর দয়া কর। আমি আরও কিছুদিন বাঁচতে চাই। আমাকে ছাড়া জুনায়েদ চলতে পারেনা। ওর জন্য হলেও কিছুদিন বাঁচতে দাও।
জাহিদও তো আপনার ছেলে। ও কি আপনাকে ছাড়া চলতে পারবে?
তোমার সাথে আর একটা কথাও নয়।

আমি চুপ করে গেলাম। জাহিদ উঠে এসে আমার শ্বাশুড়ীর পা জড়িয়ে ধরে বলল, মা তুমি এমন করোনা। সবাইকে অবাক করে দিয়ে আমার শ্বাশুড়ী জাহিদের দুই গালে ইচ্ছামত চড় মারতে লাগলেন। হিস্ট্রিয়াগ্রস্ত রোগীর মত কাঁপতে কাঁপতে ওর মুখে থুতু ছিটিয়ে দিয়ে চিৎকার করে বললেন, তোর এত বড় সাহস? তুই আমার পা ধরিস। আজকের পর তুই আর এ বাড়ির ছায়াও মারাবি না। আমার ছায়া মারাবি না। আমি মরে গেলেও মুখ দেখবি না। আমার কবরে হাত ছোঁয়াবি না। লোভী কুত্তা কোথাকার। দূর হ তুই।

ঘটনার তীব্রতা এত মারাত্মক যে সবাই কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে গেল। আমার শ্বশুর মাঝখানে আমার শ্বাশুড়ীকে বাধা দিলেন। ফর্সা জাহিদের গালে মুখে আঙ্গুলের ছাপ পরে গেল। সে আর কোন কথা না বলে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। আমিও ধীর পায়ে উঠে হাটতে চেষ্টা করলাম। আমার পা চলছেনা। কেমন যেন অবশ অবশ লাগছে। চারদিকের জগতটা যেন ঘুরছে। বের হয়ে আসতে আসতে শুনতে পেলাম মর্জিনা বলছে, আম্মা, আইও চইল্লা জামু। অ্যারে বিদায় দেন।
তুই কোথায় যাবি?
জেদিক চউখ যায়। বিদায় দিয়া দেন অ্যারে।
দিতে পারি একটা শর্তে।
আই জেকন শর্তে রাজি।
যেকোন শর্ত দিবনা। শুধু তোর সম্পর্কে একটা কথা বলব। কথাটার মানে বুঝতে পারলে তুই চলে যাবি।
কন কতাডা।
“ঢেউ এর উপর ঢেউ, মাঝখানে বসে আছে লাট সাহেবের বউ”- তুই হচ্ছিস সেই লাট সাহেবের বউ। বলত জিনিসটা কি?
জানিনা আম্মা।
না জানলে তো তোকে বিদায় দিতে পারলাম না। এখন যা সামনে থেকে । মন দিয়ে কাজ কর।

জিনিসটা কি আমি নিজেও বুঝতে পারলাম না। আমার কানে আর কোন শব্দ এলনা। মুখ দিয়ে গভীর বেদনায় বের হয়ে এল, আহারে। এই “আহারে” শব্দটি জাহিদ ও আমার শ্বাশুড়ীর জন্য। মা ছেলের খুব মিল। মানুষকে ধাধা জিজ্ঞেস করে। কঠিন পরিস্থিতিতে রসিকতা করে।

জাহিদের রুমে ঢুকতে ঢুকতে দেখি আমার দু গাল পানিতে ভেজা। কখন যে কাঁদতে শুরু করেছি নিজেও বলতে পারবনা। মাথাটা খুব ধরেছে। ঘাড়ের পিছনেও ব্যথা করছে। জাহিদকে কোথাও দেখছি না। নিজেরই কান্না থামাতে পারছিনা, ওর সামনে কোন মুখে যাব। ওকে একটু সান্ত্বনা দেয়া দরকার। আজ মনে হয় ৫ মি. গ্রা. এর একটা ঘুমের ট্যাবলেটই খেতে হবে। এতসব কিছু আমার জন্য হচ্ছে ভাবলেই বুকটা মোচর দিয়ে উঠে। অন্তর্যামী কে দোষ দিতে ইচ্ছে করে। আমার অন্ধকার ভুবনে আলোর ছটা তিনি দয়া করলেই আসবে। তিনি নিশ্চয়ই আমাকে আলোর পথ দেখাবেন।

ধড়মড় করে উঠে বসলাম বিছানায়। গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। মনে হয় কোন দুঃস্বপ্ন দেখেছি। রুমে পুরো ঘুটঘুটে অন্ধকার। হাতড়ে হাতড়ে পানির জগ খুজে বের করে এক গ্লাস পানি এক নিঃশ্বাসে শেষ করলাম। ঘড়িতে সময় দেখলাম। রাত এগারটা বাজে। জাহিদের কথা মনে হল। ও নিশ্চয়ই ছাদে আছে। আজ আকাশটা পুরো মেঘে ঢাকা। চাঁদ, তাঁরা কারোর খবর নেই। সবাই যেন রাগ করেছে। প্রকৃতির এমন থমথমে রূপ আমি কখনো দেখিনি। ছাদে গিয়ে দেখলাম আমার অনুমান ভুল হয়নি। জাহিদ সেখানেই আছে। ছাদের রেলিংএ দু’হাত প্রসারিত করে পা দুটো সামনে ছড়িয়ে বসে আছে। আজ মনে হয় ওর জীবনের সবচাইতে কষ্টের দিন। ওকে এমনভাবে দেখে আমার মরে যেতে ইচ্ছে করছে। বুক ফেটে আবারও কান্না চলে আসল। ওর দিকে তাকাতেই পারছিনা। তাই ও যে পাশে বসে আছে তার উল্টো দিকে আমি বসলাম। দু’হাতের তালুতে মুখ গুজে কান্না থামাতে চাইলাম। কতক্ষন এভাবে কেটেছে জানিনা। হঠাৎ মাথায় একটা হাতের স্পর্শ পেলাম। মাথা তুলে দেখি জাহিদ। ওর চোখে চোখ পড়তেই বলল, কেঁদোনা। কাঁদলে তোমাকে বিশ্রী লাগে।

কথাটা শোনার পর নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে সাথে সাথে ওকে জড়িয়ে ধরলাম। হাউ মাউ করে কান্না শুরু করে দিলাম। কাঁদছি আর ওকে বলছি, আই এম সরি। আমার জন্য এত কিছু হল।
ও আমাকে এক হাতে চেপে ধরে বলল, ধুর বোকা। সংসারে এমন একটু আধটু হয়েই থাকে। এগুলো ব্যাপার না।
আমি মনে হয় একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলেছি।
আহা। বাদ দাও। যা হবার তা হয়ে গেছে। এখন কাঁদলে তো আর কিছু পরিবর্তন হবেনা।
তবুও নিজেকে ক্ষমা করতে পারছিনা। বিশ্বাস কর আমি চাইনি তোমাকে কষ্ট দিতে। তোমার মাকেও কষ্ট দিতে চাইনি।
এত জোরে কান্না করোনা। আশেপাশে মানুষ খারাপ ভাববে। থামো।

আমি বহু কষ্ট করে কান্না থামালাম। তবে ফোঁপানি থামলনা। আমরা এখন পাশাপাশি হাঁটছি। আমি জাহিদের বুকের বাম পাশে মাথা রেখে আছি। আর ও আমাকে এক হাত দিয়ে ধরে রেখেছে। আমার জন্য পৃথিবীর সেরা মুহূর্ত এটা। প্রকৃতি কি আজব খেলা খেলে! এই যেমন আমাকে নিয়ে খেলছে। আজকের দিনের এই মুহূর্তটা আমার কাছে আসলেই সেরা। একটা কঠিন পরিস্থিতিতে এল আরকি। ধীর পায়ে হাটতে হাটতে ছাদের এক কোনায় এসে দাঁড়াল জাহিদ। আমাকে একই ভাবে ধরে রেখে বলল, সেঁজুতি সুলতানা।
হু।
অনেক ভালোবাস আমাকে?
না। মোটেই না।
তবে?
একটু বেশি ভালোবাসি।
দুষ্ট কোথাকার! অনেক যন্ত্রণা পোহাতে হবে। পারবে তুমি?
আমি প্রস্তুত আছি।
এখনও সময় আছে। ঘড় বাধার আগে আরেকটু ভাব। যে সুখ পেয়ে বড় হয়েছ তার সিকিও দিতে পারব না।
দুঃখ তো দিতে পারবে? তুমি শুধু দুঃখই দিও আমাকে।
তা কি হয়? তোমাকে যে বলতে গেলে সত্যিই কিছু দিতে পারবনা।
আমার কিছু চাইনা। শুধু তুমি পাশে থেকো।
বাইরে থাকতে পারবে আমার সাথে? নাকি বাবার বাসায় চলে যাবে?
কি বল তুমি? কেন থাকতে পারবনা। বাবার বাসায় আপাতত ঠাই নেই। আর কোনোদিন যেতেও চাইনা। তুমি যেখানে থাক আমিও সেখানে থাকব।
আমি যদি বেদেদের মত নৌকা নিয়ে যাযাবর জীবন শুরু করি?
ওয়াও। তাহলে তো খুবই মজা হবে। দুজনে মিলে সাপ খেলা দেখাব। সাপ ধরতে যেয়ে নিজেরাই ভয়ে কুঁকড়ে যাব। গ্রামের মানুষের কাছে তাবিজ বিক্রি করব।
হা হা হা। সত্যি?
হুম সত্যি। কিছুদিন পরপর নতুন যায়গায় যাব। প্রকৃতির খুব কাছাকাছি থাকব। নদীর বাতাসে গা জুড়াবো। রাজহাঁসের মত সাতার কাটব। একে অন্যের গায়ে পানি ছিটাব।
তুমি সাতার জান!
না, আমি জানিনা। তো কি হয়েছে? তুমি শিখাবে। অথবা শিখে নিব।
আর কি কি করবে?
অনেক কিছু। এত কথা বলে শেষ করতে পারবনা।
তাই?
হ্যাঁ তাই। আচ্ছা, তুমি আমাকে “সেঁজুতি সুলতানা” এত বড় নামে ডাক কেন? বর্ষা নামটাতে ডাকতে পারনা?
কেন বড় নামটাতে ডাকলে কি সমস্যা?
আমার কেমন জানি লাগে। মনে হয় তুমি আমাকে অপমান করছ।
অপমান বোধ করলে ডাকব না। তবে ঐ নামটা আমার ভাল লাগে। তোমার ভাল লাগলে তুমি ডাকবে। অবশ্যই ডাকবে। কারন তোমার ভালোলাগাই আমার ভালোলাগা। তোমার মন্দ লাগাই আমার মন্দ লাগা।
আমি মনে হয় খুব লাকি।
হঠাৎ এ কথা বললে যে?
কারন “সেঁজুতি সুলতানা” আমার বউ।
স্বপ্ন দেখছি না তো? এই আমাকে একটা চিমটি দাও তো।
চিমটি দেয়া লাগবে না। এটা বাস্তব।
কিভাবে হল?
জুনায়েদ কিছু কথা বলেছে। আর তোমাকে কেমন করে যেন ফিল করা শুরু করেছি।
বল কি?
হ্যাঁ সত্যি। যে রাতে বমি করে সব ভাসিয়ে দিলাম, সে রাত থেকে এমন হয়েছে। মনে হয় তুমি আর আমি একই আত্মা। শুধু দেহ দুইটা।
এই আমাকে ধর। আমি মনে হয় পড়ে যাব।
আমি তোমাকে ধরে রেখেছি। কোনদিনও পড়তে দিবনা।
(নিশ্চুপ)
জুনায়েদ কি বলেছে শুনবে?
বল।

জুনায়েদ বলেছে, ভাইয়া কেউ একজন তোমার দিকে তাকিয়ে সমুদ্রে চলে গেছে। পানি গভীর অথচ সে সাতার জানেনা। তার জীবন বিপন্ন। এখন তোমার কি করা উচিত? হা হা হা। এরপর তোমার সব কথা বলল।
ও বড্ড নাটক করে কথা বলে।
হুম। পাগলটাকে খুব মিস করব।
আমিও।
চল নিচে যাই। তৈরি হতে হবে।
এখনই যাবে?
হ্যাঁ।

আমি ঘোরের মধ্যে আছি। ব্যাপারটা কি ঘটল বুঝতে পারলাম না। তবে এটুকু বুঝতে পারছি, আল্লাহ আমার দিকে তাকিয়েছেন। কষ্ট একটাই শ্বাশুরির কাছ থেক আলাদা হয়ে যাব। মানুষ একসঙ্গে সব পায়না। কিছু না কিছু ঘাটতি থাকে। আমারও থাকুক। আমি এর বেশি কিছু চাইনা। আমার জাহিদকে পেয়েছি এটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় পাওয়া। একটু পর আমি জাহিদের সাথে অজানার উদ্দেশে বের হব। ও কোথায় যাবে জানিনা। শুধু জানি আমি ওর সাথে যাব। বাসা ছেড়ে বের হওয়ার আগে আজ অবশ্যই নফল নামাজ পড়ব। আল্লাহ অনেক বড় একটা স্বপ্ন পুরন করেছেন। তাই আজ তাকে কৃতজ্ঞতা জানাতেই হবে।

 

চার

জীবনের প্রথম ট্রেন ভ্রমন করছি। রংপুর যাব। সকাল সাতটা বাজে ট্রেন ছাড়বে। জাহিদ আমার শ্বাশুড়ির কথা মত সূর্য উঠার আগে বাসা থেকে বেরিয়েছে। স্টেশনে আমাদের কেউ বিদায় জানাতে আসেনি। জাহিদ অনেক কষ্ট করে চেয়ার কোচের টিকিটের ব্যবস্থা করেছে। ট্রেনটির নামটিও বেশ সুন্দর। “মিতালি এক্সপ্রেস”। যেন আমার নতুন জীবনের নাম! খুব ভালো লাগছে আমার। মনে হয় মধুচন্দ্রিমায় যাচ্ছি। একটু আগে রুবিনা ফোন করেছিল। ও খুব রাগ করেছে। আমি ওকে কিছুই জানাইনি বলে। জাহিদকে জিজ্ঞেস করে জানতে পেরেছি আমরা রংপুরের সোবনদহ গ্রামে যাচ্ছি। ওখানকার একটা এন. জি. ও তে জাহিদের চাকরি হয়েছে।

আমি জীবনেও রেল স্টেশন দেখিনি। আজ দেখলাম প্রথম। রেল স্টেশন খুব আজব জায়গা। অনেক ধরনের মানুষ আছে এখানে। মিতালি এক্সপ্রেসে উঠার আগে আমরা চা খেয়েছি। বাদাম, পানির বোতল, জুস ইত্যাদি কিনে নিয়েছি। জাহিদকে দেখলাম বড় একটা তোয়ালে কিনল। কেন জিজ্ঞেস করতেই বলল, পরে বুঝব। আমরা সাথে বলতে গেলে কোন কাপড় চোপড়ই নেইনি। আমি আমার হাত ব্যাগে কিছু অতি প্রয়োজনীয় ব্যাক্তিগত জিনিস নিয়ে বেরিয়েছিলাম। তা নিয়েই এখন রংপুর যাচ্ছি। আর জাহিদও তেমন কিছু নিলনা। যা নিল তা দিয়ে মোটামুটি এক দুবার চেঞ্জ করতে পারবে।

স্বপ্নের ভুবনের মত ঘটতে থাকা ঘটনাগুলো দেখতে দেখতেই “মিতালি এক্সপ্রেস” চলতে শুরু করেছে। জাহিদের হাত ধরে আশেপাশের দৃশ্য দেখছি। ও আমাকে মুগ্ধ চোখে দেখছে। আমার অসাধারন লাগছে। ট্রেনটার দেখি আস্তে আস্তে গতি বাড়ছে। জোড়ে চলতে শুরু করার পর বুঝতে পারলাম জাহিদ কেন তোয়ালে কিনেছে। কনকনে ঠাণ্ডা বাতাসে প্রায় মারা যাচ্ছি। আশ্চর্য হচ্ছে আমি কিছু বলার আগেই জাহিদ তোয়ালেটা আমার গায়ে জড়িয়ে দিল। চেয়ার কোচের জোড়া সিটের মাঝখানের হাতলটা উঠিয়ে দিয়ে আমি দূরত্ব কমালাম। পা দুটো উপড়ে তুলে হাঁটু মুড়ে এক কাত হয়ে ওর গায়ে গা এলিয়ে দিলাম। ও দেখলাম একটু নড়েচড়ে উঠল। সুড়সুড়ি লাগছে বোধহয়। আমি সুযোগটা কাজে লাগিয়ে বেশি করে সুড়সুড়ি দিতে থাকলাম। ও শব্দ করে হেসে উঠল। ওর নির্মল হাসিটা দেখে আমার প্রাণটা ভরে গেল। ওকে জিজ্ঞেস করলাম, এই আমরা কোথায় নামব?
কেন ম্যাডাম? ভয় হচ্ছে?
জি না স্যার। এমনি জানতে চাইলাম। বলনা কোথায় নামব?
কাউনিয়া নামব।
এরপর?
এরপর কাউনিয়া থেকে বাসে করে যেতে হবে ঘোগাদহ।
সর্বমোট কয় ঘণ্টা লাগবে?
তাতো বলতে পারছিনা।
ওখানে আমরা কোথায় থাকব?
আছে, ব্যবস্থা আছে।
ও। এই তোমার শীত করছে না?
একটু একটু করছে।
তো বাইরে বসে আছ কেন? তোয়ালের ভিতরে আস।

জাহিদ তোয়ালের ভিতরে আসে। ওর পিঠের উপর দিয়ে তোয়ালেটা এসে আমার পায়ের কাছে শেষ হয়। আমার নিঃশ্বাস ভারি হয়ে আসছে। প্রচণ্ড আবেশে চোখ বুঝে ফেলেছি। আমি আর পারছি না। তাই তোয়ালের ভিতর ওর হাত দুটি খামচে ধরি। এভাবে ধরার পর ও নিজের মুখটা আমার ঘাড়ের কাছে নামায়। তোয়ালের ভিতর আমার হাত দুটি শক্ত করে চেপে ধরে বলে, সেঁজুতি সুলতানা। আমরা পাবলিক ট্রেনে আছি!

আমি ওর গলাতে মুখ ঠেকিয়ে অস্ফুট স্বরে বলি, আমি জানিনা। এত কিছু জানিনা।
কন্ট্রোল!
যাহ্‌ দুষ্ট। আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে রাখ।
রেখেছি তো।
আরও শক্ত করে। আমার যেন একটু শীতও না লাগে।
না, তোমার একটুও শীত লাগবে না।
লাগছে তো।
ধুর পাগলি। লাগছেনা।
হুম আমি পাগলি। আমি তোমার পাগলি। তোমার পাগলি কে এমনভাবে সারাজীবন ধরে রাখবে তো?
রাখব।
না রাখলে কিন্তু কাঁদতে কাঁদতে মরে যাব।
চুপ। একদম চুপ। কোনোদিন কাদবে না। তুমি কাঁদলে আমি ভেঙ্গে চুরে একাকার হয়ে যাব। তুমি চাও আমি ভেঙ্গে যাই?
না কোনোদিন না।
তুমি বরং রেগে থাকবে। রাগলে তোমাকে সুন্দর লাগে।
আমার রাগ তুমি দেখেছ?
না দেখিনি, তবে অনুমান করেছি।

মিতালি এক্সপ্রেস এগিয়ে চলছে। শহরের কোলাহল ছেড়ে গ্রামে ঢুকে পড়ছে। আমাদের মিতালিও বাড়ছে। মনের দিক থেকে একদম মিশে গেছি। কারো এক জীবন আর কারো এক মুহূর্ত কথাটা আমার সাথে একদম মিশে গেছে। সম-মনা জীবন সাথী পাওয়া খুব দুষ্কর ব্যাপার। আমি পেয়ে গেছি আমার অর্ধাঙ্গ। বেগম রোকেয়ার সেই দ্বি-চক্র শকটের উর্ধাশ। সবাইকে আমার ভালোবাসার ভাগ দিতে ইচ্ছে করছে। জানালা দিয়ে গলা বের করে চিৎকার করতে ইচ্ছে করছে। প্রকৃতিকে আমার এত ভালো আর কোনোদিন লাগেনি। ধন্যবাদ প্রভু।

সোবনদহ গ্রামে এসে পৌঁছেছি দু’ঘণ্টা হল। লম্বা ট্রেন যাত্রায় বেশ ক্লান্ত। সব মিলিয়ে প্রায় দশ ঘণ্টার মত লাগল। এ গ্রামেই আমাদের নতুন নিবাস। জাহিদের জন্য বরাদ্দ করা বাড়িটাও বেশ সুন্দর। বাংলো প্যাটার্নের দোতলা বাড়ি। নিচ তলায় হল রুমের মত বিশাল ড্রয়িং রুম, একটা অফিস রুম আর একটা বাথরুম আছে। দোতলায় দুইটা বেডরুম, এটাচড বাথ, ডাইনিং রুম ও একটা কিচেন আছে। তবে কিচেন থাকলেও মনে হয় ব্যাবহার হয় না। একদম ঝকঝকে তকতকে সব কিছু। ব্যাপারটা একটু পরে বুঝতে পারলাম। মুল বাড়ির থেকে একটু দূরে একটা রান্নাঘর। ওখানে লাকড়ি দিয়ে রান্না হয়। গ্যাস নেই। তাই এ উপায় করা হয়েছে। বাড়ির পিছনের দিকে একটা বাঁশঝাড় আছে। তার সাথে একটা পুকুর আছে। পুকুরের পাড় বাধানো ঘাট আছে। পুকুরের পরেই ফসলি জমি। সব মিলিয়ে ভালোই পছন্দ হল জায়গাটা। আমার আরো ভালো লাগছে কারন শহরের কোলাহল মুক্ত এ ধরনের পরিবেশ প্রথম বারের মত দেখে। আমি এর আগে কোনোদিন গ্রামে আসিনি। গ্রাম সম্পর্কে শুধু বইয়ে পড়েছি। গ্রাম এত সুন্দর হতে পারে তা আমার ধারনার বাইরে ছিল।

আমরা এখন স্থানীয় এক চেয়ারম্যানের বাড়িতে আছি। তিনিই আমাদের রিসিভ করেছেন। পৌছতে পৌছতেই সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল। তাই থাকার জায়গাটা দেখেই চেয়ারম্যানের সাথে চলে এসেছি। ভদ্রলোক বেশ আন্তরিকভাবে আমাদের খাতির যত্ন করছেন। খাওয়া দাওয়ার পরে দেরি না করে বিছানায় চলে আসলাম। অপরের বিছানায় ঘুমাতে একটু আপত্তি করলাম। জাহিদ বলল, কিছু করার নেই। অন্তত আজ রাতটা কষ্ট করতেই হবে, কারন আমরা কিছুই আনিনি।

আমাদের যে রুমে থাকতে দেয়া হয়েছে সে রুমটা বেশ পরিপাটি করে সাজানো গোছানো। রুমে দেখলাম পল্লীবিদ্যুৎ এর সাথে সৌরবিদ্যুৎও আছে। আর কিছু পর্যবেক্ষণ করার আগেই ঘুমিয়ে গেলাম।

এক ঘুমে রাত পার হয়ে গেল। সকালের নাস্তা ঐ বাড়িতে করে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। নিজেদের বর্তমান বাড়ি কাল রাতের আলোয় দেখেছিলাম। এখন দিনের আলোয় দেখছি। তেমন কোন পার্থক্য নেই। শুধু একটা জিনিস চোখে পড়েনি। তা হল আমাদের বাসার সাথে একটা টিউবওয়েল আছে। নিচ তলার রুমে ঢুকে দেখি বেশ সাজানো গোছানো। ওখানে সোফার সেট, কয়েকটা পেইন্টিং, দেয়াল ঘড়ি, ক্যালেন্ডার ইত্যাদি আছে। আর উপরতলা পুরো ফাকা। যে অফিসার আসে তার নিজের মালামাল ওখানে রাখা হয় তাই ফাকা।

আমার হাতে এখন মোটামুটি অনেক কাজ। নিজের সংসার শুরু হতে যাচ্ছে বলে কথা। আপাতত একটা খাট, জাজিম, তোশক, চাদর, বালিশ কেনার প্ল্যান করে বেরিয়ে পড়লাম। সারাদিন ঘুরাঘুরি করে করে অনেক জিনিস কিনলাম। অনেক যায়গায় ঘুরেছি। সোবনদহ বাজার, ঘোগাদহ বাজার, পাটেশ্বরী বাজার ও কাচিচর বাজার। সবার প্রথমে খাট কিনে অন্যান্য জিনিসপত্র কিনলাম। জাহিদ আমার পড়ার জন্য কয়েক সেট জামা কিনল। ওর নিজের জন্যও বেশ অনেক কিছু কিনল। দুপুরে আমরা বাইরেই খেলাম। সস্তা হোটেলে। তবে খাবার অনেক মজা। আসার সময় জাহিদ একটা তাঁতের শাড়ি কিনে দিল। আমার মনটা অসম্ভব খুশি হয়ে গেল। মনে হল আমার মত সুখী এ জগতে আর কেউ নেই। শাড়িটা কম দামি দেখে জাহিদ একটু লজ্জা পাচ্ছিল। আমি ওকে কিছু বলিনি। বোকাটা বুঝতেই পারেনি এই কমদামি শাড়িটাই আমার কাছে অমূল্য। আজ রাতে আমি অবশ্যই এ শাড়িটা পড়ব। যদিও আমি আগে কোনদিন শাড়ি পরিনি। এমনকি পড়তে জানিও না। তবুও আমি পড়ব। কেমন করে পড়ব, তা জানিনা। শুধু জানি শাড়িটা আজ রাতে আমাকে পড়তেই হবে।

বাসায় ফিরতে ফিরতে মোটামুটি সব কাজ করা শেষ হল। বাচ্চু নামের একটা ছেলেও পেয়ে গেলাম টুকটাক কাজের জন্য। বাচ্চুর বাবা নেই। ওদের অভাবের সংসার। তাছাড়া যে জায়গাতে এসেছি, এখানে প্রচুর অভাব। দেশের এই অঞ্চলটা সম্পর্কে আমার ধারনাই ছিলনা। বাচ্চুর মায়াভরা মুখটা দেখে কষ্ট লাগল। তাই বাচ্চুর মায়ের সাথেও দেখা করলাম। মহিলাকে দেখে আরও বেশি কষ্ট লাগল। তাই বাচ্চুর মাকেও রেখে দিলাম। আর তাছাড়া আমি তো রান্নাও জানিনা। বাচ্চু ও বাচ্চুর মাকে ঘড় গোছানোর দায়িত্ব দিয়ে আমি মোটামুটি ফ্রি হলাম। ওদের সাথে আরও কয়েকজন যোগ দিয়েছে। জাহিদ ওর অফিসের খোজ নিতে গেছে। বাসার সাথে যে অফিস আছে তার থেকে বেশ দূরে ওটা। বাসার অফিসটা জরুরী ব্যবহারের জন্য।

আমি একটু পুকুর পাড়ে এসে বসলাম। বাঁশঝাড়টা খুটিয়ে খুটিয়ে দেখলাম। আজ সারাদিন বাঁশঝাড় নিয়ে অনেক ভয়ঙ্কর গল্প শুনেছি। ঐ সব গল্প শুনে ভয়ে গা গুলিয়ে আসে। বসে পা নাড়াতে নাড়াতে হঠাৎ চোখ পড়ল টিউবয়েলটার দিকে। ওখান থেকে অনেকে পানি নেয়। একজন মহিলা পানি নিতে এসেছে। গায়ের বেশ ভুসা একটু ঢিলে ঢালা। সম্ভবত তার বাচ্চা হবে। এই অবস্থায় কেন কলসি দিয়ে পানি নিতে আসল বুঝলাম না। কৌতূহলবশত এগিয়ে গেলাম। আমি এগিয়ে যেতেই ভদ্র মহিলা বলল, নমস্কার দিদি।

আমিও বললাম, নমস্কার। এতক্ষণ শাঁখা, সিঁদুর লক্ষ্য করিনি। কাছে এসে বুঝতে পারলাম তিনি একজন সনাতন ধর্মী। মহিলাকে দেখে খারাপ লাগল। গর্ভকালের একেবারে শেষ সময়ে আছেন। অথচ এখন তাকে দিয়ে কাজ করানো হচ্ছে। মানতেই পারলাম না ব্যাপারটা। ওনাকে টিউবয়েল চাপতে না দিয়ে একপাশে এনে বসালাম। জানতে চাইলাম, ব্যাপার কি? ওনি বললেন, কোন ব্যাপার না। সংসারের কাজ করছেন। কথায় কথায় জানতে পারলাম তার নাম “বীণা রানী রায়”। তার স্বামীর নাম “তারিণী কান্ত রায়”। তিনি পরিবার পরিকল্পনা অফিসে চাকুরী করেন। এখন মেটার্নিটি লিভ এ আছেন। আমাদের কথা বার্তায় সময় নষ্ট হওয়ায় দেখলাম ওনার শ্বাশুরি “স্মরণিকা রায়” খোজ নিতে এসেছেন। বিটকেল মহিলাকে পেয়ে কয়েকটা নগদ কথা বললাম। ওনি কিছু যুক্তি দিলেন। তারপর ঘ্যানর ঘ্যানর করে বললেন, আমার কি ছাওয়া পোয়া হয়নি?

আমি বললাম, হ্যাঁ হয়েছে। কিন্তু এখন তো যুগ পাল্টেছে। আপনি একটু ছাড় না দিলে তো আপনার নাতনিরই ক্ষতি হবে।

আমার মুখে নাতনির কথা শুনে মহিলা তো খুশিতে গদগদ। আমি কিন্তু এমনিতেই বলেছি। কথার টানে চলে এসেছে। আর ঐ মহিলা খুশিতে প্রায় লাফিয়ে উঠে বলছেন, আপনার মুখে ফুল চন্দন পড়ুক। আমার ঘড়ে যেন মা লক্ষ্মী আসে। ভগবান যেন আমার প্রার্থনা শুনে। মোর বেটার বউও আর কোন কাজ করতে দিবার নং।

শেষমেষ বউ শ্বাশুরি চলে গেল। তাদের মিল দেখে আমার বুকটা হাহাকার করে উঠল। দজ্জাল শ্বাশুরিটাকে খুব মিস করছি। কাছে থাকলে নিশ্চয়ই আমাকেও অনেক শাসন এবং আদর করতেন।

আজ আমাদের অফিসিয়াল বাসর রাত! আমি অনেক কষ্ট করে শাড়িটা পড়েছি। জাহিদ আমাকে শাড়ি পড়া অবস্থায় দেখে পলকহীন চোখে তাকিয়ে রইল। আমি কাছে এগিয়ে গিয়ে বললাম, কি দেখ এমন করে?

জাহিদ বলল, সেঁজুতি সুলতানাকে দেখি। আমার পাগলিকে দেখি।
অসভ্য কোথাকার, একদম লজ্জা নেই!
তোমার আছে লজ্জা?
হ্যাঁ আছে।
কোথায় লজ্জা? দেখিতো কোথায় লজ্জা?
আমি ভীষণ লজ্জা পেয়ে হাতের তালুতে মুখ ঢাকলাম। জাহিদকে বললাম, আমি পারবনা। দোহাই তোমার, আমি পারবনা।
জাহিদ আরো কাছে এগিয়ে এসে বলল, কেন পারবেনা?
জানিনা। আগে লাইট টা অফ করো।
লাইট অন থাকলে কি হবে?
আমি কিন্তু খুব লজ্জা পাচ্ছি। একদম দুষ্টুমি করবে না বলে দিলাম। যাও জলদি লাইট অফ কর।
ওকে ম্যাডাম।

জাহিদ উঠে যেয়ে লাইট অফ করে দেয়। বিছানায় এসে আমাকে কাছে টেনে নেয়। ধীরে ধীরে আমার দু হাত শক্ত করে চেপে ধরে। আমাদের দুজনেরই নিঃশ্বাস ভারী হতে থাকে। হঠাৎ দেখি জাহিদের মুখটা আমার মুখের কাছে নেমে এল। এরপর যা হবার হল। কিন্তু আমি আর লিখতে পারছিনা!!!

সকালবেলা আগে ঘুম ভাঙল আমার। দেখি জাহিদ ঘুমিয়ে আছে। তাই ওকে আর ডাকলাম না। সিড়ি বেয়ে নিচে নামতেই দেখা হল বাচ্চুর মায়ের সাথে। তার কাছ থেকেই শুনলাম বীণা রায়ের মেয়ে হয়েছে গতকাল রাতে। বাচ্চুর মায়ের সাথে কথা বলতে বলতে পুকুর ঘাটে এসে বসলাম। এ জায়গাতে বসতে দেখে মহিলার মুখ কেমন ফ্যাকাসে হয়ে গেল। কি হয়েছে জানতে চাইলে বলল, না কিছু না। জায়গাটা ভালনা। আমার কেমন সন্দেহ হল। মনে হয় কোন ঘটনা আছে। আমার সন্দেহ ভুল হলনা। এখানে অনেক ভয়ঙ্কর ঘটনা আছে। বহু কষ্টে তার কাছ থেকে শুনেছি পুরোটা। ঘটনাটা এরকম- এ গ্রামে বিনয় বর্মণ নামে একজন লোক ছিল। তার অনেক টাকা পয়সা ছিল। এক সময় সে অসুস্থ হয়ে পড়ে। সাথে তার মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। পরিবারের লোকজন সহ্য করতে না পেরে তাকে একটা আলাদা ঘড়ে রাখার বন্দোবস্ত করে। ঘড়টা বাইরে থেকে তালা লাগানো থাকত। এক ঝড়ের রাতে ঐ ঘড়ে বিনয় বর্মণকে খাবার দিতে গেলে দেখা যায় সে নাই। নাই নাই তো মানে কোথাও নাই। সব যায়গায় সাধ্যমত খোজা হল। গ্রামের প্রতিটা বাড়িতে তন্ন তন্ন করে খোজা হল। কোথাও পাওয়া গেলনা। শেষমেষ পুকুর গুলিতে পর্যন্ত জাল ফেলা হল। কোন লাভ হলনা। প্রায় দু’সপ্তাহ পরে নাকি তার লাশ পাওয়া যায় এই পুকুরে। এই পুকুরটাতে আগে সব মানুষ ময়লা আবর্জনা ফেলত। ময়লার নিচ থেকে হঠাৎ করে তার লাশ ভেসে উঠে। লাশটা একদম তাজা ছিল। গায়ে কোনরূপ আচর কিংবা আঘাতের চিহ্ন ছিলনা। যে রাতে বিনয় বর্মণ নিখোঁজ হয় সে রাতেই তার খুব কাছের বন্ধু বিধান রায় অসুস্থ হয়ে পড়ে। বিধান রায়ের কথা বন্ধ হয়ে যায়। বিনয় বর্মণের লাশ পাওয়া গেছে শুনে বিধান রায় দেখতে আসেন। লাশ দেখে আশ্চর্যজনক ভাবে তার মুখে কথা ফুটে উঠে। বলেন ঐ ঝড়ের রাতে তিনি নিজের চোখে দেখেছেন ঘটনাটা। কালো কি যেন একটা বিনয় বর্মণের পা ধরে টেনে হিচড়ে এই পুকুরে ফেলে দিয়েছিল। এটা দেখে ভয় পেয়েই তার এই অবস্থা হয়েছিল। অথচ আজও তার লাশে পচন ধরেনি। পরে সবাই দ্রুত লাশটার সৎকার করে। কিন্তু সৎকারের পরেও এই পুকুরে তার লাশ ভাসতে দেখা যায়। অবশ্য এই পুকুর এখন অনেক পরিষ্কার। মাঝে মাঝে নাকি বিনয় বর্মণকে বাঁশঝাড়ে বসে কাদতেও দেখা যায়। কেউ যদি ভুল করে তার কান্না থামানোর চেষ্টা করে তবে তার নাকে মুখে রক্ত উঠে মারা যায়।

গল্পটা শুনে ভয়ে আমার গা গুলিয়ে এল। শরীরের সমস্ত লোমকূপ দাড়িয়ে গেল। মেরুদণ্ড দিয়ে ভয়ের একটা শীতল স্রোত নেমে গেল। আমি ভো দৌড় দিয়ে উপরে জাহিদের কাছে চলে এলাম। এসে দেখি ও জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। আমার চোখে চোখ পড়তেই একটু হাসল। প্রতুত্তরে আমিও জোর করে হাসার চেষ্টা করলাম। আমার ভয় এখনও কাটেনি। আমি জাহিদের কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়লাম। ও আমার চুলে হাত বুলাতে লাগল। আদুরে গলায় বলল, কি হয়েছে? অস্থির দেখাচ্ছে কেন?
আমি চুপ করে রইলাম। জাহিদ আবার বলল, ঘুম থেকে উঠতে কি বেশি দেরি করে ফেলেছি?
আমি আবারো চুপ করে রইলাম। জাহিদ একটু ঝুকে আমাকে তার বুকে টেনে নিল। ওর দুহাতে আমার হাত চেপে ধরে কানের কাছে ফিস ফিস করে বলল, সেঁজুতি সুলতানা কি রাগ করেছে?
এবার আমি কথা বললাম। আস্তে করে বললাম, না।
ও বলল, ঠিক আছে চল তাহলে নাস্তা করি।

নাস্তার টেবিলে বসে দুজনের টুকটাক কথা বার্তা হল। আমার ভয়টা একটু কমল। জাহিদকে ভয়ের কথাটা বললাম না। জুনায়েদের কাছ থেকে শুনেছি ও ভূত খুব ভয় পায়। তাই নিজেই সামলে নিলাম। নাস্তা খেয়ে জাহিদ অফিসে চলে গেল। আমি একা এক শুয়ে আছি। এমন সময় ফোন করল রুবিনা। আমি ফোন ধরে বললাম, হ্যালো রুবি।
ওপাশ থেকে রুবিনা বলল, চুপ কর কুত্তী। কে রুবি? কোন রুবি টুবি নাই। রুবি মারা গেছে।
দোস্ত তুই রাগ করিস না। এত ঝক্কি ঝামেলা গেছে যে তোর সাথে যোগাযোগের সময় পাইনি।
চুপ কর স্বার্থপর। শোনলাম তোর শ্বাশুরি নাকি তোদের বের করে দিয়েছে?
হ্যাঁ। কার কাছ থেকে শুনলি?
তোর দেবর জুনায়েদের কাছে থেকে।
ওর দিকেও হাত বাড়িয়ে দিয়েছিস!
অসুবিধা কি দিলে? কি সুন্দর অ্যাথলেট বডি। হ্যান্ডসাম ম্যানলি।
থাক থাক থাক। থাম এবার। নইলে একটু পর বলবি আমার দেবরটা তোর ঘুম হারাম করে দিয়েছে। ওকে তোর চাই।
হা হা হা। না তা বলব না রে। জুনায়েদ ভালো ছেলে। তোকে ফোনে পাচ্ছিলাম না। পরে তোর শ্বাশুরবাড়িতে গিয়েছিলাম। গিয়ে দেখি তোর শ্বাশুরির শরীর খারাপ। এরপর জুনায়েদের কাছ থেকে সব শুনলাম।
ও। এই আমার শ্বাশুরির শরীর কি খুব খারাপ?
তাইতো মনে হল। বাই দি ওয়ে, এখন তোরা একজ্যাক্ট কোথায় আছিস?
রংপুরে। এখানে একটা এন.জি.ও তে জাহিদের চাকরি হয়েছে।
ও। তা কেমন কাটছে তোদের? জাহিদ ভাইয়ের সাথে কিছু হয়েছে?
যা দুষ্টু। এগুলো জানতে হয়না।
এই এই বলনা। সত্যি করে বল প্রথম কি হয়েছে? কবে হয়েছে? কিভাবে হয়েছে? সব বলবি। কিছু বাদ দিবিনা।
হা হা হা। যা হয়েছে কিছু বলব না তোকে।
তোকে বলতেই হবে।

রুবিনা চাপাচাপি করাতে আমাকে বলতে হল। অবশ্য যা বলেছি বেশিরভাগই বানানো। রুবিনাকে খুশি করার জন্য বলেছি। সত্যি কথা বলিনি। আমি জাহিদকে ভালোবাসি। আমার ভালোবাসার মানুষের সাথে কাটানো ব্যাক্তিগত মুহূর্তের কথা ওকে বলব কেন? এটা আমার একান্ত ব্যাক্তিগত অনুভূতি। এ কথা কাউকে শেয়ার করা যায়না। এ অনুভূতির ভাগ আমি কাউকে দিতে চাইনা। আজ অনেকদিন পর ওর সাথে কথা বলে বেশ ভালো লাগল। ওকে ভুতের ঘটনাটাও বলেছি। শুনে তো ও ভীষণ এক্সাইটেড। আমাকে বলল, তোরা তো দেখি হন্টেড হানিমুন করছিস। আমি বললাম, হুম।

রুবিনার সাথে কথা বলা শেষ করে দেখি দুপুর হয়ে গেছে। কখন যে দুপুর হয়ে গেল টেরও পাইনি। একা একা দুপুরের খাবার খেলাম। জাহিদ তার অফিসে আছে। দুপুরের খাবারের পর বাচ্চুর মাকে নিয়ে ঘুরাঘুরি করলাম। ভূতের গল্প শুনতে ভয় লাগলেও আরো বেশি করে শুনলাম। বাচ্চুর মাকেও দেখলাম বেশ আগ্রহ করে এসব গল্প শোনায়। বিকেলের দিকে একটু বৃষ্টি হল। তাই রাতে ভুনা খিচুড়ি আর মুরগির মাংশ রান্না করতে বললাম। বাচ্চুর মায়ের রান্নার হাতও চমৎকার। তরকারীর রঙ, গন্ধ যেমন হয় স্বাদও তেমন হয়। কিন্তু রাতে খাবার প্লেটে জাহিদকে মুরগির মাংশ তুলে দিতেই ও কেমন অদ্ভুত চোখে তাকাল। কিছুক্ষন পর দৌড়ে বেসিনে যেয়ে বমি করে দিল। আমি তো কিছুই বুঝতে পারলাম না। অনেক চেষ্টা করেও তাকে আর রাতে কিছু খাওয়াতে পারলাম না। বিছানায় এসে দেখলাম ও কেমন মনমরা হয়ে আছে। ওর চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললাম, কি হয়েছে তোমার?
ও বলল, কিছুনা।
আমি কিছু বললাম না। কারন রুবিনার কাছ থেকে শুনেছি আমার শ্বাশুরির শরীর খারাপ। আহা মা ছেলের আত্মার সম্পর্ক কত গভীর। কত দূরে মা অসুস্থ। এদিকে ছেলের মায়ের কথা মনে পড়ছে হয়ত।

একটু পরে জাহিদ আমার দিক থেকে উল্টো দিকে ফিরে বলল, জানো আজ না আমি দুপুরে খাইনি।
কেন? খাবার নিয়ে যাওনি বলে?
না। খাবার তো কিনে এনেছিলাম। তবুও খাইনি।
কাল থেকে বাচ্চুকে দিয়ে খাবার পাঠাব। এখন বল কেন খাওনি?
খাবারের অপেক্ষায় আছি আমি, এমন সময় কোথা থেকে যেন এক বুড়ি মহিলা আসল। কিছু টাকা ভিক্ষা চাইল। আমি বললাম, টাকা দিয়ে কি করবে? তিনি বললেন, খাবেন। পরে আমি তাকে দুপুরের খাবার আমার সাথে খেতে বললাম। মহিলা খাচ্ছিল আর আমি আগ্রহ ভরে দেখছিলাম। মাঝখানে এসে হঠাৎ তিনি খাওয়া বন্ধ করে দিলেন। প্লেটের বাকি ভাতগুলো একটা পলিথিনে নিতে চাইলেন। আমি জানতে চাইলাম, আর ক্ষুধা নেই? তিনি বললেন, আছে। তবে বাকিটা রাতে খাবেন। রাতে নাকি তিনি কিছু খেতে পাননা। প্রচণ্ড ক্ষুধায় তার ঘুম আসেনা।

এ কথা বলে জাহিদ আর কিছু বলতে পারলনা। ওর গলা ধরে এসেছে। কথাটা শুনে আমারও খারাপ লাগছে। কিছু কিছু মানুষ হয় সফট মাইন্ডেড। তাই বলে আমার জাহিদ এতটা সফট মাইন্ডেড তা বুঝতে পারিনি। ওর মন বেশ খারাপ তা বুঝতে পারছি। ওর মন ভালো করতে একটু কাছাকাছি যেয়ে ওকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম। বললাম, আচ্ছা বুড়িটার কি কেউ নাই?
আছে। কিন্তু কেউ বুড়িকে ভাত দেয়না।
তুমি বুড়িকে এখানে নিয়ে আসতা?
আমি চেয়েছিলাম। তিনি আসেননি। বলেছেন কাল সকালে আসবেন।
যাক। তাহলে তো এখন আর তাকে ক্ষুধার জন্য তাকে নির্ঘুম কাটাতে হবেনা।
তা হয়ত হবেনা। কিন্তু আমি ভাবছি তার মত এমন হাজারো বুড়ি আছে। তাদের কে আশ্রয় দিবে?
জটিল প্রশ্ন। আমি উত্তর দিতে পারব না। আচ্ছা তুমি রাতে খেলেনা কেন?
ভাল কথা মনে করেছ। আমি খাবার বিষয়ে একটু সচেতন। এগুলোর ব্যাতিক্রম হলে আমি খেতে পারিনা। আমার গা রি রি করে। আমার বমি চলে আসে।
হুম। কি কি অপছন্দ তোমার?
অনেক কিছু খাইনা। তবে মুরগিরটা আগে বলি। মা বলতেন আমি মুরগির চারটা অংশ খাই। কোন চার অংশ তা বলতে পারবনা। বাকি অংশ যেমন পা, চামড়া, গলা, হাতা, মাথা, কলিজা ইত্যাদি ভুলেও আমার প্লেটে পড়লে আমার বমি হয়। আমি আর খেতে পারিনা।
ও। আর কি কি খেতে পারনা?
সব তো এখনই বলে দিতে পারবনা। মা থাকলে ভালো হত। সব বলে দিত।
মায়ের কাছে তো ফিরে যাবই। তার আগ পর্যন্ত খেতে হবেনা?
হ্যাঁ হবে। এই সত্যি তুমি মায়ের কাছে ফিরতে পারবে? মানে ফিরে যাবে?
অবশ্যই সত্যি। আমি কি আমার এই জীবন শ্বাশুরির সাথে ঝগড়া না করে কাটিয়ে দিব? কখনো না! তোমার বিশ্বাস হয়না যে আমি যাব?
তা হয়। কিন্তু মা যে রাগী।
তোমার মা রাগী না ছাই। একটা আস্ত বোকা।
আসলেই বোকা। নইলে কেন তিনি বুঝতে পারলেন নে ভার্জিন মেয়ে কেমন করে এক্সপেক্ট করে? হা হা হা।
যাহ্‌ দুষ্টু। এতে তো ভালোই হয়েছে। কোথায় আছেনা যা হয় ভালোর জন্যই হয়।
হুম।

সকালবেলা ঘুম ভাঙ্গার পর দেখি ঐ বুড়ি এসে হাজির। কথায় কথায় জানতে পারলাম তার নাম “রাঙা বুড়ি”। সবাই নাকি তাকে এ নামে ডাকে। বুড়ির থাকার ঘড় দেখিয়ে দেয়ার পর তো দেখি মহা খুশি। আমিও খুশি হলাম তার খুশি দেখে। এমনিভাবে কয়েকদিন কেটে গেল। একদিন দুপুরের পর ঐ পুকুরপারে বসে আছি আমি, রাঙা বুড়ি আর বাচ্চুর মা। এমন সময় কোথা থেকে যেন বাচ্চু দৌড়ে হাঁপাতে হাঁপাতে এল। এসে বলল, বীণা রায়ের ঐ ছোট্ট মেয়েটা মারা গেছে। মেয়েটার নাম রাখা হয়েছিল “স্বপ্না রায়”।

খবরটা শুনে আমি যেন হাই ভোল্টেজ ইলেকট্রিক শক খেলাম। ব্যাপারটা ঠিক মানতে পারলাম না। খুব খারাপ লাগল। তাই সন্ধ্যার দিকে একবার মেয়েটার সৎকার কাজের আয়োজন দেখতে গেলাম। ছোট বাচ্চা মেয়ের কাফনে জড়ানো লাশ দেখে আমার মন যা খারাপ হল তা আর বলার মত না। আশেপাশের মানুষের কাছ থেকে জানতে পারলাম ওরা ছোট বাচ্চা থেকে বার বছর পর্যন্ত শিশু মারা গেলে কবর দেয়। এরপর থেকে পোড়ায়। তাই ছোট্ট স্বপ্নাকে কবর দেয়া হবে। কিন্তু অপেক্ষা করা হচ্ছে স্বপ্নার বাবা তারিণী কান্ত রায়ের জন্য। তিনি বাড়িতে নেই। আসলে কবর দেয়া হবে।

স্বপ্না কিভাবে মরল, জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম স্বপ্নার মা এখনও আতুরঘড়ে আছেন। স্বপ্নার গায়ে দুদিন আগে হাম উঠেছিল। এই হামের জন্য হোমিও ঔষধ আনা হয়েছিল এলাকার বিখ্যাত “হরিরাম” ডাক্তারের কাছ থেকে। তার দেয়া পুরিয়া ভুলক্রমে বেশি খাইয়ে দেয়ার পর স্বপ্না মারা যায়।

আমরা কিছুক্ষন দাড়িয়ে থাকতে থাকতেই স্বপ্নার বাবা আসল। স্বপ্নার জন্য কবরও খোড়া হয়ে গেছে। একটু পর লাশটা শুধু নামানো হবে। আমি একটু বীণা রায়ের কাছে গেলাম। তিনি কেমন নিথর হয়ে বসে আছেন। আমি যাওয়ার একটু পর কেউ একজনকে ডেকে বললেন, এই আমার মেয়েকে একটু এদিকে দে তো। একবার শেষ দেখা দেখে নেই। ছোট্ট স্বপ্নার লাশ তার দিকে এগিয়ে দেয়া হয়। স্বপ্নার গায়ে কাফন জড়ানো, নাকে, কানে তুলা গোজা। বীণা রায়কে দেখলাম স্বপ্নার নাকের কাছে কি যেন দেখছে। তার বুকে হাত রাখছে। তারপর দেখলাম তিনি নাক থেকে তুলা বের করে ফেললেন। হঠাৎ করে চিৎকার করে বললেন, তোমরা কে কোথায় আছ? আমার মা বেঁচে আছে। ওকে মাটি দিওনা। ওকে কবরে নামিও না। আমার মেয়ে বেঁচে আছে।

আমি প্রথমে বিশ্বাস করিনি। ভেবেছিলাম হয়ত মায়ের মন, তাই এমনটা বলছেন। পরে দেখি যে না সত্যি সত্যিই স্বপ্না কেঁদে উঠল। আমার জীবনে এর চাইতে আশ্চর্য ঘটনা আর ঘটেনি। এরপর আর বেশি সেখানে না দাড়িয়ে ফিরে আসার জন্য রওনা দিলাম। আসতে আসতে শুনতে পেলাম স্বপ্নার মা বীণা রায় বলছে, প্রভু আমার মেয়েকে তুমি জীবন ভিক্ষা দিয়েছ। সে তোমার তরে নিজেকে সপে দিবে। কথাটা শুনে আমার মনটা ভরে গেল। মেয়েটা যেন বড় হয়ে তাই করে। তার জন্য আমার শুভকামনা রইল।

রাতের বেলা বিছানায় কেন জানি জাহিদের সাথে একটু দুষ্টুমি করতে ইচ্ছে হল। তাই জাহিদকে মৃত স্বপ্নার বেঁচে যাওয়ার কথা বললাম। বিনয় বর্মণের কথা বললাম। শুনে জাহিদ ভয়ে কুকরে গেল। একটা কাথা মুরো দিয়ে বলল, আমাকে ধর। আমি আর শুনতে চাইনা। তুমি থাম প্লিজ। আমি মুচকি হাসি দিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরলাম। এমনিতে কিন্তু ওকে বেশি ধরে রাখা যায়না। একটু জড়িয়ে ধরলেই বলে, ওফ। গরম লাগছে। অথবা বলে, নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। গায়ের উপর পা দিলে বারবার নামিয়ে দেয়। আর আজ নিজেই বলছে জড়িয়ে ধর। হা হা হা। আমার খুব ভালো লাগছে ওকে জড়িয়ে ধরে লেপটে শুয়ে থাকতে। ভালোবাসার মানুষের সাথে ফেউ এর মত লেগে থাকার মজাই আলাদা। আজ যে সুযোগটা কাজে লাগাতেই হবে।

আমি সম্ভবত কনসিভ করেছি। সম্ভবত বললাম কারন এটাই প্রথম তাই নিশ্চিত না। আজ একবার বীণা রায়ের সাথে দেখা করব। স্বপ্না বাবুটাকেও একটু দেখে আসব। সময় করে রাঙা বুড়িকে সাথে নিয়ে বীণা রায়ের বাড়ি গেলাম। যেয়ে দেখি এলাহি কাণ্ড। ঐ বাড়িতে অনেক ভিড়। হিন্দু মেয়ে, মহিলারা স্বপ্নাকে দেখতে এসেছে। অনেকে শাঁখা, সিঁদুর, নোয়া ছুইয়ে নিচ্ছে। এসব তদারকি করছে স্বপ্নার দাদী। আমার কাছে ব্যাপারটা একটু মজার লাগল। মৃত মেয়ে বেঁচে যাওয়ার ঘটনায় সবাই তাকে দেবী ভাবছে। রাঙা বুড়ির কাছ থেকে শুনলাম স্বপ্নার পা ধোয়া পানি খেলে নাকি পুরনো পেটের ব্যাধি ভালো হয়ে যায়। একেকজন ওর হাত ধরে চুমু খায় আর সবাই উলু ধ্বনি দেয়। আমি কোথাও বীণা রায়কে না দেখে ফিরে আসছিলাম। পথে দেখা হল বীণা রায়ের সাথে। ভদ্রমহিলা আমাকে দেখে হেসে বললেন, নমস্কার দিদি।
আমিও বললাম, নমস্কার। কেমন আছেন?
ভালো। আপনি কেমন?
আমিও ভালো। আপনার বাড়ি গিয়েছিলাম। সেখানে তো এলাহি কাণ্ড।
আর বলবেন না দিদি। আমার শ্বাশুরিকে নিয়ে আর পারিনা। আগাগোড়া শুধু কুসংস্কার।
হুম। আচ্ছা দিদি। ঐ দিন স্বপ্নার আসলে কি হয়েছিল?
স্বপ্নার হাম উঠেছিল। হরিরাম ডাক্তারের পুরিয়া ওর মুখে দেয়ার পর দেখি আর নড়াচড়া করছে না। শ্বাস পড়ছে না। ওকে শেষ দেখা না দেখলে হয়ত জীবিতই কবর দিয়ে দিতাম।
আপনি ওর নাকের কাছে কি দেখছিলেন?
দিদি, ব্যাপারটা হয়ত আপনি বিশ্বাস করবেন না। ওকে কোলে নেয়ার পর কেন জানি মনে হল ও মারা যায়নি। ভাল করে দেখতে যেয়ে দেখি নাকের এক পাশের তুলা নড়ছে। এরপর বুকে হাত দিয়ে দেখি একটু গরম লাগছে। পরে নাক থেকে তুলা বের করার পর জোড়ে জোড়ে শ্বাস নেয়া শুরু করল।
ও মাই গাড! এত রীতিমত অবিশ্বাস্য।
হুম। জানেন দিদি ঐদিনের পর আমি আমার মেয়ের নাম বদলে রেখেছি। কেউ ঐ নামে ডাকুক না ডাকুক আমি ঐ নামে ডাকব।
তাই? এটা তো খুব ভাল কথা। তা ওর নতুন নাম কি রেখেছেন?
ওর নতুন নাম “স্মৃতি রায়”।
হুম।

এরপর বীণা রায়কে আমার নিজের ব্যাপারটা বললাম। ওনি আমাকে কিছু প্রশ্ন করলেন। কয়েকটা ছোট খাট পরীক্ষা করলেন। সবশেষে আমাকে নিশ্চিত করলেন। আমি সত্যি সত্যি কনসিভ করেছি। So, it’s time to say WOW!! খবরটা নিশ্চিত হওয়ার পর দেখি আনন্দে আমার মাথা খারাপ। সাথে অবশ্য একটু লজ্জাও লাগছে। এক দৌড়ে বাসায় চলে আসতে ইচ্ছে হচ্ছে। রাঙা বুড়ি বারবার জানতে চাইল, হঠাৎ এত খুশি হওয়ার কারন। আমি কিছু বললাম না। তারাতারি নিজের বাসায় চলে এলাম।

জাহিদকে কথাটা কিভাবে বলব বুঝতেই পারছিনা। সারাদিন কাথা দিয়ে মুখ ঢেকে রাখতে ইচ্ছে হল। আমার মা, শ্বাশুরি কেউই কাছে নেই। তারা কেউই আমার সাথে কথা বলেনা। কথা বললে হয়ত ব্যাপারটা জেনে খুব খুশি হত। আমাকে না জানি কতরকম উপদেশ দিত! কয়েকবার নিজের পেটে হাত বুলালাম। উফ, এ এক অসাধারন অনুভূতি। এটা শুধু অন্তর্যামী আর যে মা হয় সে বুঝে। আর কারো পক্ষে এ অনুভূতি বর্ণনা করা বা বুঝা সম্ভব না। রাতে খাওয়ার টেবিলে জাহিদকে বললাম, তোমার জন্য একটা বিশাল সারপ্রাইজ আছে।
ও বলল, সত্যি? তা সারপ্রাইজটা কি শুনি?
আমাদের বাসায় একজন মেহমান আসবে।
এতে সারপ্রাইজের কি আছে? নাকি আমার মা আসবে?
মা আসবে নাকি বাবা আসবে তা তো এখনই বলতে পারছিনা! শুধু জানি আসবে। অবশ্যই আসবে।
কি বল? সত্যি! আমার বিশ্বাসই হচ্ছেনা। আমার মনে হচ্ছে মা-ই আসবে। আমি জানতাম মা এতদিন আমার উপর রাগ করে থাকতে পারেনা। এই বলনা মা কবে আসবে?
বলব না।
কেন বলবে না? আচ্ছা এটা বল, তোমার সাথে মায়ের কখন কথা হল?
কিচ্ছু বলব না। তুমি এত মা মা করছ কেন? বাবাও তো আসতে পারে?
হ্যাঁ তা পারে। নাকি তোমার বাবা- মা আসবে?
যিনি আসবেন আমাদের বাসায় তিনি আমার তোমার দুজনেরই বাবা অথবা মা। তিনি আমাদের বাসায় আমাদের সাথেই থাকবেন।
তুমি কি আবোল তাবোল বলছ?
আমি মোটেও আবোল তাবোল বলছি না। বুদ্ধু একটা। কিছু বুঝেনা। সব খুলে বলতে হয়।
তুমি তো জানই আমি বুদ্ধু। বলনা এবার খুলে।
আচ্ছা হাদারাম বলছি। আমাদের ঘড়ে ছোট্ট একটা মানুষ আসছে। যে আপনাকে হাদা বাবা বলে ডাকবে। এ কথাটা বলেই আমি বালিশে মুখ গুজে দিলাম। আর জাহিদ দেখি ইয়াহু বলে কতক্ষন নাচানাচি করল। তারপর আমার মুখ থেকে বালিশ সরিয়ে দিল। আমাকে ওর বুকে ধরল। কপালে আলতো করে একটা চুমু দিয়ে বলল, এই খবরটা আমাকে তুমি এত ঘুড়িয়ে পেচিয়ে দিলে?
যাহ্‌ বুদ্ধু, আমার লজ্জা লাগেনা।
সারাক্ষন বুদ্ধু বুদ্ধু করোনা তো। দুদিন পর আমি বাবা হব। পরে বাবুটাও এসব শিখে যাবে।
বাবুটা এসব না শিখলেও আমি শিখিয়ে দিব। ওকে বলব, তোমাকে যেন বুদ্ধু বাবা, হাদা বাবা বলে ডাকে।
খবরদার একদম এসব করবেনা। তাহলে আমিও বলব তোমাকে পাগলি মা বলে ডাকতে।
হা হা হা। তোমার কথা শুনবে না। আমার কথাই শুনবে।
আমার বাবু হয়ে থাকলে আমার কথাই শুনবে।
এই তোমার বাবু মানে কি? তোমার কি কোন সন্দেহ আছে নাকি?
চান্সই নাই। হা হা হা। দেখো আমার ছোট্ট মা আমার কথাই শুনবে।
ওরে বাবা, ছোট্ট মা শিওর হলে কিভাবে?
জানিনা। আমার মন বলছে।
তোমার মন বলে থাকলে তো মনে হয় সেটাই হবে। আর মেয়ে হলে তোমার কথা শুনবেই। আমাকে পাগলি মা বললে কিন্তু আমি মেরে হার গোর ভেঙ্গে দিব।
এখন থেকেই শত্রুতামি!
হ্যাঁ এখন থেকেই। তোমার মেয়েকে বলবা আমাকে যেন বেশি জ্বালাতন না করে।
জ্বালাতন করলে কি হবে?
বাপ বেটি দুটোকে আচ্ছা মত ধোলাই দিব।
হা হা হা। আর আমরা তোমার শখের জিনিসপত্র ভাংচুর করব। খেলনা দিয়ে ঘড় ভরে ফেলব। সারাক্ষণ পো পো করে বাঁশি বাজাব। দুজনে মিলে আইসক্রিম খাব। বেড়াতে যাব। তোমাকে নিবনা।
আমাকে না নিলে আমি তোমাদের বাসায় ঢুকতেই দিবনা।
হা হা হা।
এই আমি কোন অ্যামনিওস্ট্যাসিস করব না। দেখি আমাদের ভাগ্যে কি আছে।
ব্যাপারটা রিস্কি হয়ে যায়না?
আরে ধুর। কি আর রিস্কি হবে?
আচ্ছা সেঁজুতি সুলতানা, ব্যাপারটা কি আসলেই সত্যি?
হ্যাঁ। হ্যাঁ। সত্যি। আজই কনফার্ম হল।

ঐদিন মাঝরাতে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। দেখি জাহিদ বিছানায় নেই। জানালার পাশে একটা চেয়ার নিয়ে বসে কি যেন ভাবছে। আমি উঠে যেয়ে ওর গায়ে হাত রাখতেই দেখি ও চমকে উঠল। আমি বললাম, কি ব্যাপার? কি ভাবছ তুমি?
ও বলল, নাহ। কিছুনা। আচ্ছা সেঁজুতি সুলতানা।
কি?
আমাদের বেবিটা কি খুব আনলাকি?
এ কথা বলছ কেন?
ওর তো দাদা, দাদী, নানা, নানু সবাই বেঁচে আছে। তবুও তো তাদের আদর থেকে বঞ্চিত হবে। ওর বাবারও তেমন বেশি টাকা নেই। ওকে কি একটা নিরাপদ ভবিষ্যৎ দিতে পারব?
কি সব ভাবছ তুমি? সব ঠিক হয়ে যাবে। দেখো সব ঠিক করে ফেলব।
সত্যি ঠিক হবে? নাকি সবাই ঘৃণাভরে ওকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিবে?
খুন করে ফেলব না একদম। কার এত সাহস? কে ওকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিবে? কেউ দিবেনা। দেখবে সবাই ওকে আদর করবে।
তাই যেন হয়।

 

পাঁচ

কনসিভ করার পর থেকে একটা ঝামেলায় আছি। কিছু খেতে পারিনা। শুধু বমি বমি ভাব হয়। মাথা ঘোরায়। টক খেতে ইচ্ছে করে। খাবার থেকে গন্ধ আসে। ইতিমধ্যে এ খবরটা রুবিনা ও আমার বাসার সবাই জেনে গেছে। আমার বাবুটা ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে। জাহিদ নিয়মিত বাবুটাকে আদর করে। কবিতা শোনায়। ছড়া শোনায়। জাহিদ কাছে আসলেই বাবুটার নড়াচড়া বেড়ে যায়। মাঝে মাঝে খুব জোড়ে লাথি দেয়া শুরু করে। যেন বোঝাতে চায়, তার আর তর সইছে না। এখুনি বাবার সাথে খেলতে হবে। বৃষ্টি আর বাদল আমাকে নিতে এসেছে। জাহিদও নিরাপদ মাতৃত্বের জন্য আমাকে পাঠাতে চাইছে। ওরা এখন সবাই খুব মজা করছে। বৃষ্টিও প্রতিদিন পেটে হাত দিয়ে বাবুর নড়াচড়া দেখে আর হাসে। বাদল এখানে এসে শুধু বাচ্চু আর রাঙা বুড়িকে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মাত্র দুদিনের কথা বলে এখানে এসে ওরা প্রায় দশদিন বেড়াল। তারপর একদিন মায়ের ধমক খেয়ে ওরা ফিরতে চাইল। আমাকে নেয়ার জন্য মা ঢাকা থেকে গাড়ি পাঠিয়েছেন। রওনা হওয়ার একটু আগে সবাই এমন কান্না শুরু করল যে আর বলার মত না। বাচ্চুর মা, রাঙা বুড়ি রীতিমত বিলাপ করে কান্না শুরু করল। আর আমার জাহিদের প্রায় কথা বন্ধ অবস্থা। আমি গাড়িতে উঠার আগে আমাকে ডেকে নিয়ে বলল, একদম ভয় পাবেনা কিন্তু।
আচ্ছা।
কোন প্রকার দুশ্চিন্তা করবেনা। অনিয়ম করবে না।
কোন অনিয়ম করব না। তাছাড়া আমাকে দেখার অনেক লোক আছে। তুমি একদম চিন্তা করোনা। নিজের যত্ন নিও। আমার সাথে নিয়মিত কথা বলবে। নইলে আমি চিন্তা করব।
আমি কথা বলব নিয়মিত। তোমার চিন্তা করা লাগবে না। আমার বেবিটাকে ছড়া শোনাবে প্রতিদিন। ভালো ভালো ছড়া।
আচ্ছা বাবা শোনাব।

এরপর জাহিদ হাঁটু গেড়ে নিচে বসে আমার পেটটাকে জড়িয়ে ধরে। একটা চুমু দিয়ে বেবিটাকে বলে, বাবা আই লাভ ইউ। আই উইল মিস ইউ। তুমি ভাল থাকবে। মাকে একদম জ্বালাতন করবে না। এটুকু বলে আর কিছু বলতে পারলনা জাহিদ। বুঝতে পারলাম হয়ত ওর কান্না চলে এসেছে। আমি একটু হাসি ঠাট্টা করে পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রণে নেয়ার চেষ্টা করলাম। গাড়িতে উঠে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। বৃষ্টিকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠলাম। কাঁদতে কাঁদতে জানালা দিয়ে দেখলাম সবাই কেমন করে গাড়িটার দিকে তাকিয়ে আছে। জাহিদ বুকে হাত ভাজ করে দাড়িয়ে আছে। আবার না জানি কবে জাহিদের কাছে ফিরে যাব!

আমার বাবা কিন্তু এখনও আমার সাথে কথা বলেনা। মা বলে, তবে আগের মত না। অনেকদিন পর নিজের বাড়িতে এলাম। এই কদিনে অনেক কিছু বদলে গেছে। প্রকৃতি শূন্যস্থান পছন্দ করেনা। কোননা কোন ভাবে তা ভরিয়ে দিতে চায়।

যা হোক আমার ডেলিভারির জন্য ডাঃ দিলরুবা খানমের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ভদ্র মহিলা আমাকে দেখে একগাল হেসে বললেন, এবার তাহলে আমার মায়ের সত্যি বাচ্চা হবে! এর মাঝে জেনে গেছি আমার আসলেই মেয়ে হবে। আমার অবস্থা মোটামুটি স্বাভাবিক। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার কারন হাত পায়ে পানি চলে এসেছিল। আর বাবুটাও একটু নড়াচড়া কম করছিল। পরে জানতে পারলাম ডেলিভারির সময় ঘনিয়ে এলে এমন হয়।

নির্ধারিত দিনে আমার ডেলিভারি হল। পুরোটা সময় বাসার লোকজনদের সাথে রুবিনাও আমার পাশে থাকল। কোনরকম জটিলতা ছাড়া স্বাভাবিকভাবে একটা সুস্থ মেয়ে জন্ম দিলাম। মেয়েটাকে কোলে নেয়ার পরতো আমি অবাক। এতো দেখি পুরো জাহিদের কার্বন কপি। ঠিক ঐ রকম নাক, মুখ, গাল, চোখ। আর মাশাল্লাহ কি ফর্সা! একদম বাবার মত। শরীরের যে অংশেই ধরি সেখানেই রক্ত জমাট বেধে যায়।

মেয়ের জন্মের পর জাহিদ বলল ওর ছবি তুলে পাঠাতে। আমি রাজি হলাম না। ওকে বললাম, ঢাকায় আসতে। জানি এটা এক প্রকার অবিচার করলাম ওর প্রতি। তবুও ও ঢাকায় না এলে কেমন করে মিট হবে সব? তাই যা হবার হবে। ওকে ঢাকায় আসতেই হবে। ঢাকায় আসতে বলার পর দেখি জাহিদ কেমন চুপ হয়ে গেল। এ ব্যাপারটা সচেতনে এড়িয়ে যেয়ে বাবুর আর আমার শরীরের কথা জানতে চাইল। আমিও ওসবের ঠিক ঠিক জবাব দিয়ে দিলাম। শুধু বাবু দেখতে কেমন বা কি তা কিছুই বললাম না।

বাবুকে নিয়ে আমাদের বাসায় পর একটা হুলস্থূল বেধে গেল। বৃষ্টি শুধু ওকে চুমু দিতে চায়। কোল থেকে নামায়ই না। আমি বাধা দিলেও মানেনা। বাদল ওর সব বন্ধুদেরকে ফোন করে জানাচ্ছে যে ও মামা হয়েছে। ওর গর্বে বুকটা ফুলে গিয়েছে। আমার বাবা এরমাঝে একবারও আমার খোজ নেয়নি। একদিন রাতে দেখলাম বাবুকে আমার পাশ থেকে মা কোলে করে তার রুমে নিয়ে যাচ্ছে। আমিও কৌতহল বশত একটু ফলো করলাম। দেখি মায়ের রুমে আমার বাবা, বৃষ্টি, বাদল সবাই আছে। মা রুমে ঢুকতেই বাবা বললেন, কই দেখিতো কেমন হয়েছে দেখতে?
মা বললেন, দিচ্ছি। সাবধানে কোলে নিবে।
বাবা কোলে নিয়ে বললেন, কি আশ্চর্য! এতো দেখি আস্ত পূর্ণিমার চাঁদ। এই ও দেখতে কার মত হয়েছে? ওর বাবা কি খুব সুন্দর?
মা বললেন, আমি তো জানিনা। মনে হয় সুন্দর।
বৃষ্টি চেচিয়ে বলল, কেন জানবে না। বহুবার বলেছি না জাহিদ ভাইয়া অনেক সুন্দর।
বাবা বললেন, এই থাম। এখন বলত নাতনিকে কি দেই?
মা বললেন, তুমি কি দাও সেটা তোমার ব্যাপার। আমারটা আমি দিব।
বাবা বললেন, আচ্ছা। আমি একটা ডায়মন্ড সেট দিলাম।
মা বললেন, ঠিক আছে। তাহলে আমি একটা সীতা হার দিলাম।
বাদল বলল, বাবা আমিও তো ওর মামা। আমি কি দিব ওকে?
বাবা বললেন, তুমি একটা খেলনা দাও।
বাদল বলল, একটা রিমোট কন্ট্রোল গাড়ি দিব? নাকি একটা উড়োজাহাজ দিব?
মাঝখান থেকে বৃষ্টি বলল, সবাই চুপ। আমাকে কেউ হেল্প করছ না কেন? আমি কি দিব?
মা বলল, তুমি নিজে খুজে বের কর।
বৃষ্টি বলল, আমি ওকে চুরি, ফিতা, ক্লিপ, লাল জামা, জুতা কিনে দিব।

আমি আর ওদের কথা বেশি শুনলাম না। আমার হাসি পেয়ে গেল। ওরা যা বলছে তার কিছুই তো আমার বাবু ব্যবহার করতে পারবেনা। আমি ফিরে এসে আগের যায়গায় ঘুমের ভান ধরে শুয়ে থাকলাম। একটু পর আমার মা এসে বাবুকে আমার পাশে শুইয়ে রেখে গেল। মা চলে যাওয়ার পর আমি চোখ খুললাম। দেখি মাথার পাশে ডায়মন্ড সেট, সীতা হার, খেলনা, ছোট জামা জুতা সহ অনেক কিছু পরে আছে। এসব দেখে আমার বাবুকে গাল ছুয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কি বাবু এসব নিবে? বাবুটা কি বুঝল জানিনা। সে তার দাঁতহীন মাড়ি বের করে হাসল। তার পর জিহ্বা বের করে অদ্ভুত ভ্যরররর শব্দ করল। আমি আবার মানে জানতে চাইলে ওয়া ওয়া ওয়া করে কেঁদে উঠল। আমি সাথে সাথে কাছে নিয়ে এলাম ওকে। একটু দুদু খাওয়ালাম। তারপর ওকে ঘুম পাড়িয়ে দিলাম। মেয়েটা সত্যি তার বাবার মত হয়েছে। গায়ে জড়িয়ে রাখলে ঘুমাতে পারেনা। একটু দূরে সরালে ঘুম আসে। আবার বেশি দূরে রাখলে কান্না করে।

সকাল বেলা হিরের সেট, গহনা, জামা কাপড়, খেলনা এসব দেখেও না দেখার ভান করলাম। মাকে বললাম, মা এসব কি? কে কি দিয়েছে তার বিস্তারিত বর্ণনা দিল মা। শুনে আমি বললাম, মা আমি তো এসব নিতে পারবনা।
মা বলল, কেন?
এমনি। তোমরা তো আর ওর দাদা বাড়ি যেয়ে এসব দিয়ে আসবে না। তাই নিবনা এসব।
ওর দাদাবাড়ী যেয়ে দিয়ে আসব মানে? তোমাকে না তোমার শ্বাশুঁড়ী বের করে দিয়েছেন?
বের করে দিয়েছেন তো কি হয়েছে! আজই আবার ঢুকব।
তোমার মাথা কি আগের মত খারাপই আছে? আমি তো ভেবেছিলাম এখন হয়ত ঠিক হয়েছে। মাত্র ছয়দিন বয়সের বাচ্চাকে নিয়ে অ্যাডভেঞ্চার করতে চাও?
মা, অ্যাডভেঞ্চার তো আর সাধে করতে চাইনা। আমার কপালেই এরকম লেখা আছে। বাবুকে নিয়ে আজ তার নিজের বাড়িতে যাব। আমাকে যেতেই হবে।
তুমি যেহেতু একবার বলেছ যাবে, তো যাও। আমি বাধা দিবনা। তাছাড়া তুমি তো বাধা মানবেও না। তবুও বলছি এই কচি বাচ্চাকে নিয়ে যাবে আর যদি তোমাকে ফিরিয়ে দেয় বা তোমাকে দেখে কোন দুর্ঘটনা ঘটে। তাই তোমার না যাওয়াই ব্যাটার।
কিছু হবেনা। তুমি দোয়া কর।
হুম।

মায়ের সাথে কথা বলে আমি বেরিয়ে পড়লাম। বৃষ্টি আর বাদল সারা রাত জেগে বাবুকে পাহারা দিয়েছে। এখন অঘোরে ঘুমাচ্ছে। ওরা দেখলে আমাকে কখনোই বের হতে দিতনা। রাস্তায় এসে কোন রকমে একটা ট্যাক্সি ভাড়া করে আমি জাহিদদের বাড়িতে গেলাম। ডোর বেল টিপতেই দরজা খুলে দিল আমার শ্বশুর। আমি সালাম দিলাম। আমাকে আর আমার বাবুকে দেখে তিনি ভুবন জোড়া হাসি দিলেন। আমাদের ভিতরে ঢুকিয়ে দরজা লাগাতে লাগাতে বললেন, আমি জানতাম মা তুমি আবার আসবে। এমন কিছু করবে। আমি কোন কথা না বলে শুধু মাথা নাড়াতে থাকলাম। ওনাকে আমার শ্বাশুড়ির কথা জিজ্ঞেস করলাম। ওনি বললেন, আমার শ্বাশুড়ি খুব অসুস্থ। এর মাঝে দুইবার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। এখন ফুল বেড রেস্টে আছে। তারপর আমি আমার শ্বাশুড়ির রুমের বাইরে গিয়ে দাড়ালাম। আর আমার শ্বশুরের কোলে বাবুকে দিয়ে আমার শ্বাশুড়িকে ডাক দিতে বললাম। একটু উকি দিয়ে আমার শ্বাশুড়ির চেহারা দেখে ভড়কে গেলাম। চোখ দুটো কোটরের ভিতরে ঢুকে গেছে। গায়ের রঙও কিছুটা বদলে গেছে। তিনি গলা পর্যন্ত কাথা টেনে শুয়ে আছেন। আমার শ্বশুর বাবুকে কোলে নিয়ে সাবধানে পা টিপে টিপে আমার শ্বাশুড়ির কাছে গেলেন। তার ঘুম ভাঙ্গিয়ে বাবুকে তার কোলে দিলেন। আমার শ্বাশুড়ি ধড়মড় করে উঠে বসলেন। হাতড়ে হাতড়ে চশমা চোখে দিলেন। তারপর বললেন, এটা কে?
আমার শ্বশুর বললেন, অনুমান করো তো দেখি।
নাক মুখ চেনা চেনা লাগছে। তবু পারছিনা।
একবার চেষ্টা করো।
ঢং না করে বলত।
ও তোমার সতিন। আমাদের জাহিদের মেয়ে।
জাহিদের মেয়ে! ওরা কি ফিরে এসেছে?

একথা বলে আমার শ্বাশুড়ি খুব খুশি হয়ে উঠলেন। তারপর হঠাৎ মুখ গোমড়া করে বাবুকে বালিশে শুইয়ে রাখলেন। বালিশে শোয়ানোর পর বাবু একটু কেঁদে উঠল। আমার শ্বাশুড়ি বললেন, এই ওর মা কোথায়? ডাক। কোলে নিতে বল।

আমার শ্বশুর আমাকে ডাকলেন। আমি রুমে ঢুকে বাবুকে কোলে না নিয়ে আমার শ্বাশুড়ির পা জড়িয়ে ধরলাম। বললাম, মা আমাকে ক্ষমা করে দেন।
আমার শ্বাশুড়ি বললেন, বাবুটা কাঁদছে। ওকে কোলে নাও।
আপনি ক্ষমা না করলে আমি জীবনেও ওকে কোলে নিবনা।
এ পর্যায়ে বাবুটা একটু জোড়ে কেঁদে উঠল। আমার শ্বাশুড়ি তাকে আবার কোলে তুলে নিয়ে ও ও ও করতে করতে বলল, তুমি কিন্তু আমাকে ব্ল্যাকমেইল করছ। ওকে জলদি কোলে নাও।
বলেছি তো ক্ষমা না করলে কোলে নিবনা।
তোমার অনেক সাহস। বুদ্ধিও আছে বটে।
তবুও তো আপনি ক্ষমা করেন না। আচ্ছা মা বলেন তো এ দুনিয়াটা কত দিনের? আপনার জ্ঞান, বুদ্ধি হতে লেগেছে পনের বছর। এরপর ষাট বছর পর আবার জ্ঞান বুদ্ধি চলে যাবে। তো আপনি বাঁচবেন কয় বছর? মাঝখানে যে সময়টা পাবেন তা যদি রাগ করেই কাটিয়ে দেন তাহলে আমার সাথে ঝগড়া করবে কে?
এই মেয়ে চুপ কর। মন খারাপ করা কথা বলবে না। বাবুকে কোলে নাও। তোমাকে মাফ করে দিলাম।
জাহিদকেও মাফ করতে হবে।
করব। ও কি এসেছে?
না, ও আসেনি। আর একটা প্রমিজ করতে হবে?
কি প্রমিজ?
আপনি আমাদের আর বের করে দিতে পারবেন না। আমরা আপনার কাছে থাকব।
আমার শ্বাশুড়ি এবার বাবুকে আমার কোলে ছেড়ে দিয়ে বলল, নাহ। আর বের করে দিবনা। এখন কিভাবে বের করে দিব।

আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বাবুকে দুদু খাওয়াতে লাগলাম। জাহিদ এসবের কিছুই জানেনা। আমার শ্বাশুড়ী পারলে পুরো বাড়ি মাথায় তোলেন। আনন্দে তার মাথা খারাপ হবার যোগার। সবাইকে নিজ মুখে খবরটা দিলেন। কাকে যেন পাঠিয়েছেন একটা খাসি কিনতে। আকিকা দিয়ে বাবুর নাম রাখবেন। জুনায়েদ একটু বাইরে গিয়েছিল। বাসায় এসে আমাকে আর বাবুকে দেখে তো চিৎকার চেচামেচি করে আনন্দ করতে লাগল। ও আমার প্রতি একটু রাগ করেছে। আমি ওকে একটুও জানাইনি বলে। বারবার বলছে, ভাবী তুমি এটা করতে পারলে?
কি করলাম?
আমাদের বাবু হল। তুমি আমাকে একটুও জানাওনি। তোমার কি জানানো উচিত ছিলনা? এটার জন্য তোমাকে অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে।
আচ্ছা দিও শাস্তি। এখন একটু শান্ত হয়ে বস।
এখন বসব না। বাবুকে কোলে নিব। দাওনা একটু কোলে।

আমি জুনায়েদের কোলে দিতেই ও বলল, ওমা এইটুকুন একজন মানুষ। যদি হাত গলে পরে যায়। ভাবী তুমিও ধর। আমার ভয় লাগছে।

মর্জিনার আনন্দও দেখার মত ছিল। ও শুধু বলছে, আমরার ছোড আম্মা আইয়া পড়ছে রে। পুরা ভাইজানের চেহারা। এদিকে আমার শ্বাশুড়ী দারোগার মত বাড়ি রাউন্ড দিতে থাকলেন। এক নিমিষেই যেন তিনি একদম সুস্থ হয়ে গেছেন। মর্জিনাকে বকাবকি করছেন। বাসায় এক রোয়া ময়লা পেলে সবাইকে শূলে চরাবেন বলেছেন।

একটু বেশি নড়াচড়া করার কারনে আমার একটু মেয়েলি প্রবলেম হল। প্রসব পরবর্তী সময়ে এসব হয়। তবে আমার শ্বাশুড়ী এসবের বেশ যত্ন নিলেন। তিনি আমার জন্য একটা রুম গোছালেন। সেই রুমে নিজেও থাকার সিদ্ধান্ত নিলেন। আমার পাশে আমার সেবা করতে করতে বললেন, এমন কাচা শরীর নিয়ে কেউ এত নড়াচড়া করে?
আমি বললাম, কি করব? না নড়লে, আমার শ্বাশুড়ীর অভিমান ভাঙ্গাতাম কি করে?
পাজি মেয়ে।
পাজি শ্বাশুড়ী। পাজি মা।
হা হা হা। তুমি একদম আমার মায়ের মত। কোনকিছুতেই হাল ছাড়না। একবার কিছু ভাবলে তা করেই ছাড়।
আমি তো আপনার মা-ই। আপনিই তো ডাকেন না।
আচ্ছা ডাকলাম মা। হয়েছে?
না হয়নি।
কেন?
আরো বেশি ডাকতে হবে।
আচ্ছা ডাকলাম, মা, মা, মা, মা, মা, মা, মা ……। এবার হয়েছে?
হয়েছে। এইতো আমার লক্ষ্মী মেয়ে।
লক্ষ্মী মেয়ে না ছাই। মা, তুমি বাবাকে রেখে এলে কেন? বাবাটা একা একা এখন কি করবে?
আপনার বাবা একটা ভীতুর ডিম। কোন সাহসই নাই।
না মা। এটা বলনা। আমার বাবা ভীতুর ডিম না। আমার বাবা একটা পারফেক্ট মানুষ। ছোটবেলা থেকেই এমন। ঝামেলা বুঝেনা।
কচু।
কচু না। শোন, জাহিদ যখন ছোট ছিল তখন আমি একটা স্কুলে পড়াতাম। ওকে চেয়ারে বসিয়ে রেখে আমি ক্লাস নিতাম। আমার ছেলেটা চুপ করে বসে থাকত। একটুও বিরক্ত করত না। কিন্ত একদিন হঠাৎ লক্ষ্য করলাম ওর মুখটা দিন দিন মলিন থেকে মলিনতর হয়ে যাচ্ছে। বুঝতে পারলাম ওর প্রতি আরও মনোযোগ দেয়া দরকার। পরের দিন আমি চাকরিটা ছেড়ে দিলাম। আর কোনোদিন চাকরি করিনি। শুধু ওর জন্য।
হুম। কিন্তু আপনার বাবা আমাকে অনেক বিরক্ত করেছে।
বললেই হল? মা, তুমি বড় বেশি মিথ্যা বল।
না। আগে বলতাম। এখন বলিনা। আপানার বাবা খাওয়া নিয়ে খুব ঝামেলা করে।
ঝামেলা করেনা। শুধু যেটা না খায় তা দেখতে পারেনা। আচ্ছা বাদ দাও। শোন তোমার বাবা, মাকে দাওয়াত দেয়া দরকার। কিভাবে দাওয়াত দিব? আমি নিজে যাব, নাকি ফোন করব?
ফোন করলেই হবে।
আচ্ছা। তুমি একটু বিশ্রাম নাও। কিছু লাগলে আমাকে বলবে। আমি এখন ফোন করব তোমাদের বাড়ি।

সাফল্য সাহসীর পক্ষে থাকে। এ কথাটা আরেকবার প্রমান হল। আমার শ্বাশুড়ী একটু আগে আমাদের বাড়িতে ফোন করেছিলেন। তাদের অনেক কথা হল। কান্নাকাটি হল। অবশেষে ঠিক হল আমাদের বাড়ির সবাই আগামীকাল এ বাড়িতে আসবে। এই আনন্দের খবরটা জাহিদকে দেয়া দরকার। ওকে কয়েকবার ফোন করার পর ফোনটা ধরল।
হ্যালো, সেঁজুতি সুলতানা। কেমন আছ?
বলব কেন কেমন আছি? আগে বল কোথায় ছিলে? ফোন ধরতে এত দেরি হল কেন?
একটু কাজ করছিলাম।
রাতের বেলাও কি কাজ?
করি টুকটাক কাজ। কি করব বল, সময় কাটতে চায়না।
তোমার সময় না কাটাই ভালো। একটা পাষাণ বাবা। নিজের মেয়ের মুখ পর্যন্ত দেখতে এলেনা।
আমাকে বিব্রত করোনা। এমনিতেই আমার মেয়েটার জন্য মন আনচান করে।
বাজে কথা বলোনা। মন আনচান করলে তো চলেই আসতে।
কিভাবে আসব বল? একটা প্রজেক্ট মাঝ পথে রেখে চলে আসি কিভাবে? একটা মানবতা বলেও তো কথা আছে।
নিজের মেয়ের কাছে থাকার চাইতেও বেশি বড় তোমার মানবতা?
সেঁজুতি সুলতানা, তুমি কি সেদিনের কথা ভুলে গেলে?
কোন দিনের কথা?
ঐ যে যেদিন আমার কয়েক ঘণ্টার ভিতর চাকরি হয়েছিল। এই এন.জি.ও –ই তো আমাকে বাচালো। নইলে আমি কি করতাম বল? তোমাকে নিয়ে কোথায় যেতাম? কে আমাদের আশ্রয় দিত?
হুম। তবুও বল তুমি কবে আসবে?
প্রজেক্ট শেষ করে আসব। আরেকটা চাকরিও তো পেতে হবে। একবার আসলে আর যাবনা।
বুঝেছি। তুমি প্রজেক্ট শেষ না করে আসবেই না। আচ্ছা শোন প্রজেক্ট শেষ করেই চাকরি ছেড়ে দিয়ে চলে আসবে। নতুন চাকরির জন্য অপেক্ষা করবেনা।
ঠিক আছে।
কি ঠিক আছে? তুমি না ভূত ভয় পাও। একা থাকতে পারনা। এখন থাকছ কিভাবে?
শেক্সপিয়ার এর একটা কথা ভুলে গেছ?
কোন কথা?
ঐ যে “যখন তুমি ধর্ষণ ঠেকাতে পারবেনা, তা উপভোগ কর”।
না ভুলিনি। বাই দি ওয়ে, এখন কোথায় আছি বলতে পারবে?
কেন তোমার বাবার বাসায়।
জ্বি না। বুদ্ধু, হাদারাম। এখন আছি আমার শ্বশুর বাড়িতে। তোমার মেয়ে তার দাদীর কোলে শুয়ে আছে।
আন্দাজে। গুলপট্টি মারার জায়গা পাওনা?
আরে ধুর। গুলপট্টি না। সত্যি। আমাকে বিশ্বাস কর।
কি বলছ! মা তোমাকে ঢুকতে দিল?
আরে দেয়নি আবার। এখন তো পারলে কোলে করে রাখে। জানো আমাদের বাসার সবাই এ বাড়িতে আসবে। কাল বাবুর আকিকা করে নাম রাখা হবে।
বাহ। তুমি তো দেখছি মহান যাদুকর। কেমন করে সব মিলিয়ে ফেললে। মাঝখান থেকে আমিই বাদ পড়লাম।
হাহ হাহ। দেখতে হবেনা।
হুম। তাইতো দেখলাম। এই তোমার সাথে অনেক কথা হল। এবার বলনা আমার মা কেমন আছে?
তোমার মা তো এখন দুইটা। কোন মায়ের কথা বলছ?
দুই মায়ের কথাই বল। বড় মা অসুস্থ ছিলেন। এখন পুরোপুরি সুস্থ। কোন ঔষধও লাগছেনা। নাতনিই তার বড় ঔষধ। আর ছোট মা’র কথা আমি বলব না। এসে দেখে যেতে হবে।
আবারো এক কথা? তোমার সাথে কথা বলেই মজা নেই।
এখন কি আর আমার কাছে মজা পাবে? বাচ্চা হয়ে গেছেনা। আমার কাছে আর কোন মজা নেই। হা হা হা।
যাও দুষ্টমি করবেনা। বৃষ্টি ফোন করেছিল। তুমি নাকি বাবুকে চুমু দিতে দাওনা। আদর করতে দাওনা। কোলে নিতে দাওনা।
চুমু দিতে দেইনি এটা সত্য। আর বাকিগুলো মিথ্যা। তোমার মেয়ের গালে চুমু দিলে ও অস্বস্তি ফিল করে। আর গাল লাল হয়ে রক্ত জমে থাকে।
ও। মেয়েটাকে আমার পক্ষ থেকে আদর দিও।
আর আমাকে আদর দিবে কে?
এখনই লাগবে নাকি?
হ্যাঁ লাগবে।
কিছুদিন অপেক্ষা কর পাগলি। আমি চলে আসব। তুমি এমন করোনা। তাহলে আমি কোন কাজে মন বসাতে পারবনা।
কিছু জানতে চাইনা, ছাই। আই মিস ইউ এ লট।
আই মিস ইউ টূ।

জাহিদটা কেমন জানি অন্য ধাতু দিয়ে গড়া। ধুর। ওর জন্য একদম ভালো লাগছে না। পরদিন আমার বাবা, মা, ভাইবোন সবাই আমার শ্বশুর বাড়িতে এল। আমার শ্বাশুড়ীর সে কি আনন্দ। সবাই মিলে খুব মজা করল। আকিকা দিয়ে বাবুর নাম রাখা হল “জেবিন”। জাহিদের নামের সাথে মিল রেখে এ নাম রাখা হয়েছে। আমার বাবা আজ অনেক দিন পর আমার সাথে কথা বলেছে। আমাকে বুকে জড়িয়ে কান্না করেছে। শেষে বলেছে, মা তুই কোন ভুল করিস নি। তুই সঠিক কাজ করেছিস। তারপর জাহিদের কথা জানতে চাইল। আমি ওর সব কথা খুলে বললাম। কেন ও আসতে পারছেনা তার বিস্তারিত বর্ণনা দিলাম। সব শুনে বাবা বলল যে তিনি কিছু করবেন কিনা। আমি না করলাম। কারন জানি জাহিদ কারো দয়া নিবেনা।

বেশ আনন্দেই কাটতে থাকল আমার দিনগুলো। বাবুটা আসতে আসতে বড় হতে থাকল। ঘড়টা খেলনায় ভরে গেল। মাঝে মাঝে আমাদের বাড়িতে যাওয়া নিয়ে একটু ঝামেলা হত। জুনায়েদ কিছুতেই ও বাড়ি যেতে দিবেনা। দিলেও দুদিন পরেও নিয়ে আসতে হাজির হবে। আর বৃষ্টি, বাদল ওরাও ঝগড়া জুড়ে দেয়। এমন সুখের দিনে একটা ছোট দুর্ঘটনা ঘটল। আমার শ্বাশুড়ীর ফোনে একদিন একটা অপরিচিত নাম্বার থেকে ফোন এল। আমার শ্বাশুড়ী ধরলেন।
হ্যালো।
অপর প্রান্ত থেকে একটা মোটা কণ্ঠ ভেসে এল, আসসালামু ওয়ালাইকুম। আপনি অতি ভাগ্যবতী মহিলা। আমি জিনের বাদশাহ বলছি।
জ্বীনের বাদশাহ ফোন নিল কবে? কি আজব!
নিতে হল। না হলে আপনার সাথে যোগাযোগে অসুবিধা হত।
আচ্ছা যা হোক বলেন। কি করতে পারি আপনার জন্য?
আমার জন্য কিছু করতে হবেনা। আমিই আপনার জন্য করব। আপনি সাত রাজার ধন সাত কলসি স্বর্ণ পেয়েছেন। আপনি ধার্মিক মহিলা বলে আমি এসব আপনাকে দেয়ার সিদ্দান্ত নিয়েছি।
বলেন কি? দেরি করছেন কেন? দিয়ে যান।
দেয়ার জন্যই তো ফোন করেছি। একটা কলসি একটু ভাঙ্গা। ওটা জোড়াতে বিশ ভরি স্বর্ণ দরকার। আপনাকে ঐ স্বর্ণগুলো দিতে হবে।
আমার স্বর্ণ দেয়ার দরকার কি? আপনি ছয় কলসি থেকে একটু একটু নিয়ে ভাঙ্গা কলসিটা জোড়া লাগান। তারপর আমাকে দেন।
আপনি বেশি কথা বলেন। যা বলেছি তা করেন। নাইলে আপনার ক্ষতি হবে।
কি ক্ষতি হবে?
আপনার গলায় রক্ত উঠে মারা যাবেন। আপনার ছেলেরা মরে যাবে।
হারামজাদা তুই কার সাথে কথা বলছিস জানিস?
আপনি মুখের ভাষা খারাপ করছেন কেন?
তোরে যে থাপড়াই নাই এইটাই বেশি।
আপনি বেয়াদবি করছেন। এখনও সময় আছে মাফ চান।
চুপ ইতর কোথাকার। জুতা মেরে কান গরম করে ফেলব।
আপনি মাফ চান। না হলে জ্বলে পুড়ে ছাড়খার হয়ে যাবেন।
তুই আর একটা কথা বলবি না। তোর মার কবরে আগুন জলতেছে দেখ যেয়ে। কুলাঙ্গার কোথাকার।

আমার শ্বাশুড়ী রাগে কাঁপতে থাকল। শেষে নাম্বারটা সরাসরি র্যাবের কাছে দিল। র্যাব উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে তথাকথিত জ্বীনের বাদশাহ কে গ্রফতার করে। পরে জানা যায় এটা একটা চক্র। এই পেশাটার নাম “জ্বীন করা”। কিছু অসাধু মানুষ বাসায় কাজ নিয়ে তথ্য পাচার করে। পরে ঐ সাজানো জ্বীনের বাদশাহরা ফোন করে নানান ভয় ভীতি ও লোভ দেখায়। অনেকে তাদের ফাঁদে পা দিয়ে সর্বস্ব হারায়। কোন কোন ক্ষেত্রে খুনের ঘটনাও ঘটে।

বুদ্ধিমান পাঠক নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন আমাদের বাসা থেকে তথ্য পাচার করেছে মর্জিনা। র্যাব ওকেও এরেস্ট করতে এল। আমার শ্বাশুড়ী কি মনে করে ওকে এরেস্ট না করতে অনুরোধ করল। কিন্তু মর্জিনা এগিয়ে এসে বলল, আমারে এরেস্ট করেন। হাতকড়া পরে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল, আম্মা আই আন্নের ঐ কতাডার মানি বুঝছি।
আমার শ্বাশুড়ী বললেন, কোন কথাটা?
ঐ যে “ঢেউ এর উপর ঢেউ, তার উপর পা তুলে বসে আছে লাট সাহেবের বউ”। আমি সেই লাটসাহেবের বউ কচুরিপানা। আম্মা আই মারাত্মক ভুল কচ্ছি। আর শাস্তি পাওনই লাগব। পারলে নিজ গুনে ক্ষমা করবেন।

আমার শ্বাশুড়ী কোন কথা বলল না। র্যাব কর্মকর্তারা চলে গেল। আমাদের বিশাল আনন্দে শুধু এইটুকুই ছেদ পড়ল। দেখতে দেখতে জেবিন বাবুর বয়স সাত মাস হয়ে গেল। এখন সে অল্প অল্প দাঁড়াতে পারে। জুনায়েদকে জু বলে ডাকে। জাহিদের সাথে মাঝে মাঝে ফোনে কথা বলে। কি ভাষায় কথা বলে তা আমি নিজেও জানিনা। জেবিনের প্রতিদিনের একটা রুটিন আছে। ও সকাল বেলা ওর দাদু ভাইয়ের সাথে কোলে ওঠে হাটতে যায়। শত নিষেধ করা সত্ত্বেও যা পছন্দ হয় তা কিনে নিয়ে আসে। তারপর ফিরে এসে একটু বিশ্রাম নেয়। আমার শ্বাশুড়ীর কোলে থাকে। বিকেল হলেই জু জু করতে থাকে। প্রতিদিন বিকেলে জুনায়েদ ওকে নিয়ে হাটতে যায়। মাঝে মাঝে বৃষ্টি, বাদল এবং রুবিনা আসে। আমার বাবা মাও আসে। জেবিন শুধু আমার বাবার চশমা ভাঙ্গে। আমার মায়ের মুখ খামছে দেয়। আমার সাথে ও দুষ্টমি করে। মাঝে মাঝে নাকে, কানে আঙ্গুল ঢুকিয়ে দেয়। আমার জগতে এখন শুধু জাহিদ ছাড়া সব আছে। ইদানিং ওর সাথে কথা বলা কমিয়ে দিয়েছি। ফাজিল একটা। থাকুক ওর প্রজেক্ট নিয়ে। কবে ওর প্রজেক্ট শেষ হবে আর কবে ও আসবে ঠিক নেই। তবে আমি ঠিক করে রেখেছি। এবার আসুক ও। আমাকে কষ্ট দেয়ার মজা বুঝাব। একদম কথাই বলব না ওর সাথে।

একমাস পর
সকল অপেক্ষার পালা শেষ হল। জাহিদ ঢাকায় ফিরে এল। শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। এসেই মেয়েকে কোলে নিল। আমি কোন কথা বললাম না। ওকে না দেখার ভান করে রুম থেকে চলে গেলাম। আমার শ্বাশুড়ীর কোলে মাথা রেখে শুয়ে রইলাম। আমার শ্বাশুড়ী চুলে বিলি কাটতে কাটতে বললেন, কি মা? মন খারাপ নাকি?
না। আপনার বাবা তো এসেছে। যান কথা বলেন।
একটু সময় লাগবে। আগে তুমি যাও মা। বাবার সাথে কথা বল।
আমার কোন দরকার নেই কথা বলার। আপনার বাবার সাথে আর জীবনেও কথা বলবনা।
তাই বুঝি। এত অভিমান?
হ্যাঁ।
মা একটা জিনিস জানো?
কি?
আল্লাহ কিন্তু জমির মাটি জমিতেই ভাঙ্গে। অন্য কোথাও নেয়না।
বুঝলাম না।
তোমারও একদিন আমার মত ছেলে হবে। তখন বুঝবে।
কি বুঝব?
ধর তোমার ছেলে একটা মেথরানীকে বিয়ে করল। মেথর মেয়েরা কিন্তু খুব সুন্দরী হয়। তোমার ছেলের সাথে মানাবে ভাল। রাজকন্যার মত চেহারা শুধু বগলে একটা ঝাড়ু থাকবে। আর গা থেকে ভুরভুর করে ময়লার গন্ধ আসবে। হা হা হা।
মা। একদম শত্রুতামি করবেন না। বদদোয়া দিবেন না। আপনি জানেন আমি কাল রাতে স্বপ্নে কি দেখেছি?
কি দেখেছ?
দেখেছি আমার একটা ছেলে হয়েছে। ছোট্ট ছেলেটাকে দিয়ে আপনি শুধু কাজ করান। পা টিপান। আপনার পানের বাটা ও মাথায় করে আনে। হেলতে দুলতে পড়ে যায় ও।
হা হা হা। কিন্তু আমিতো পান-ই খাইনা।
ভবিষ্যতে খেতেও তো পারেন। খান আর যাই করেন আমার ছেলে হলে আপনি এমন করবেন না।
একশবার করব। ওকে আমি চোখ টিপ দেয়া শিখাব। শিস বাজানো শিখাব।
না। কখনো না। আপনি এসব শিখাবেন না।

আমাদের কথার মাঝে দেখি জাহিদ জেবিন কে কোলে নিয়ে দরজার সামনে এসে দাড়িয়েছে। জেবিনের এক হাতে চকলেট অন্য হাতে কি যেন ধরা। খাবার হবে হয়ত। জাহিদ দরজার কাছে জেবিনকে ছেড়ে দিল। জেবিন ছোট পায়ে এগিয়ে এসে দাদুর কোলে ঐ প্যাকেটটা দিল। আমার শ্বাশুড়ী জাহিদকে না দেখার ভান করে জেবিনকে বলল, কে দিয়েছে? জেবিন হাত দিয়ে ইশারায় জাহিদকে দেখাল। আমার শ্বাশুড়ী ওর দিকে না তাকিয়ে প্যাকেটটা ছুড়ে ফেলে দিল। আর মুখে বলল, ও নিজে দিতে পারেনা।

জেবিন সবসময় আমার শ্বাশুড়ীকে খুব ফলো করে। সেও তার প্যাকেটটা দাদীর মত ছুড়ে ফেলে দিল। ওর ছুড়ে ফেলা দেখে কেউ কিছু বলল না। কিছুক্ষন পর ও নিজে বুঝতে পারল ওর চকলেট পরে গেছে। বুঝতে পেরে জু জু বলে কান্না শুরু করল। জাহিদ এগিয়ে এসে জেবিনের চকলেটটা ওর হাতে তুলে দিল। আমার শ্বাশুড়ীর প্যাকেটটাও মাথা নিচু করে এগিয়ে দিয়ে বলল, মা নাও। আমার শ্বাশুড়ী প্যাকেট না ধরে ওকে জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করল। জাহিদ চুপ করে দাড়িয়ে রইল। কিছুক্ষন পর আমার শ্বাশুড়ী জাহিদের কপালে, গালে চুমু দিয়ে বলল, বাবা আমার, সোনা বাবা। আমার লক্ষ্মী বাবা। আর কোনোদিন মাকে ছেড়ে দূরে যাবেনা। তাহলে মা মরেই যাব।
জাহিদও বলল, যাবনা মা। আর কোনোদিন যাবনা।
এত কিছুর ফাকে কেউ জেবিনকে লক্ষ্য করেনি। ও বিছানার উপর দাড়িয়ে ওর বাবাকে জড়িয়ে ধরেছিল। আমার শ্বাশুড়ী এটা দেখতে পেয়ে ওর পেটে একটা খোচা দিয়ে বলল, এই যে আমি তো বাবাকে আদরও করে দিলাম। তুমিও আদর করে দাও।

আমার মেয়েটা হেসে এগিয়ে গেল। তারপর জাহিদের কপালে, গালে, চুমু দিল। শেষে হঠাৎ কি মনে হল কানে একটা আঙুল ঢুকিয়ে নাকের উপর কামড়ে দিল। নতুন দাঁত উঠেছে। তাই সবসময় কিছু কামড়াতে চায়। কামড় খেয়েও জাহিদ ওর মেয়েকে কোলে নিয়ে আবার বেরিয়ে এল। আমার সাথে কথা বলার কোন চান্সই দিলাম না।

রাতে খাবার টেবিলে একটু কথা বলতে চাইল। আমি জবাব দিলাম না। একটু বুঝুক ও। ঘুমানোর সময় হলে আমি জেবিনকে নিয়ে অন্য রুমে চলে এলাম। বাড়ির সব লাইট অফ হওয়ার পর দেখি জাহিদ এসে হাজির। আমি ওকে দেখে ওর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলাম। ও কোন কথা না বলে আমাকে জোর করে পাজাকোলে তুলে নিল। হাসতে হাসতে বলল, একি। পাগলির দেখি ওজন বেড়ে গেছে।

আমি তবুও কিছু বললাম না। মেয়েটা কি বুঝল কে জানে। ও দেখি একটু হেসে উঠল। জাহিদ সেদিকে তাকিয়ে বলল, দেখেছ আমার মেয়েও কিন্তু বড় হয়ে গেছে। সব বুঝে।
আমি ঝাঝালো গলায় বললাম, তুমি দেখো বসে বসে। একদম কথা বলবে না আমার সাথে। কোল থেকে নামাও।
না নামাব না। আগে রুমে চল।
যাবনা রুমে।
তাহলে আমি নিয়ে যাই। বলে, জেবিনকে বলল, মা আসোতো। তুমি আমার গলায় ধর। জেবিন ওর বাবার কথা মত আমার পেটের উপর বসে গলায় ধরল। আর জাহিদ আমাকে পাজাকোলা করে আমাদের রুমে নিয়ে এল। দরজা বন্ধ করে আমার হাত ধরে বলল, আই এম সো সরি। আর এমন হবেনা। এরপর এমন একটা কথা বলল যে আমি আর রাগ করে থাকতে পারলাম না। ওকে বললাম, ঠিক তো?
ও বলল, ঠিক।
তোমার এত দেরি হল কেন আসতে?
কাজ শেষ করতে করতে একটু দেরি হল। জানো রাঙা বুড়িকে একটা ঘড় তুলে দিয়ে এসেছি।
সত্যি?
হ্যাঁ। আর বাচ্চুর মা কে একটা এন.জি.ও থেকে ঋণ তুলতে সাহায্য করেছি। ওনি এখন গাভী পালন করেন। আর বাচ্চু স্কুলে পড়ে।
তুমি আসার সময় নিশ্চয় অনেক কান্না করেছে।
হ্যাঁ। অনেক কান্না করেছে। তোমাকে নিয়ে আবার যেতে বলেছে।
যাব একবার। বাবু বড় হোক।
হুম। কাল আমার অনেক কাজ। তোমাদের বাড়ি যেতে হবে। শ্বশুরবাড়ি প্রথম যাব বলে কথা।
তাই নাকি?
হ্যাঁ। মা আজই বলল, কাল যেন অবশ্যই তোমাদের বাড়ি যাই। মাও নাকি যাবে সাথে।
হুম। জানো জাহিদ- আমি না অনেক লাকি একটা মেয়ে। কজনের ভাগ্যে এমন শ্বাশুড়ী জোটে? আমাকে যে কি আদর করে তা বলে বুঝানো যাবেনা।
আমিও অনেক লাকি। তোমার মত পাগলি আমাকে ভালবেসেছে। বিয়ে করেছে এটাও অনেক বিশাল ব্যাপার।
হা হা হা। আচ্ছা স্বপ্নার কি খবর?
ভালো। কথা বলতে পারে এখন। আমাকে বলল, আবার এসো কিন্ত।
ও। জাহিদ জানো তুমি একটা আজব মানুষ।
কেমন?
তোমার কারো কাছ থেকে কিছু চাইতে হয়না। তুমি এমনিই পেয়ে যাও। আবার কাউকে কিছু দিতেও হয়না। সবাই এমনিই নিয়ে যায়।
এ কথাটা মনে হয় সত্যি।
হুম। আচ্ছা জাহিদ একটা কথা সত্যি করে বলত।
কি?
তুমি কি করে পারলে আঁট মাস বাচ্চার মুখ না দেখে থাকতে?
পরিস্থিতির শিকার।
উহু। পরিস্থিতির শিকার না। আমার মনে হয় অন্য কোন ব্যাপার আছে যা তুমি এড়িয়ে গেছ।
ব্যাপার যদি কিছু থেকে থাকে তাহলে কাল সকালে বলব। এখন আর কোন কথা নয়। সোজা ঘুম। আগামীকাল অনেক কাজ আছে।
হুম।

উৎসর্গ
তারা দুজনেই নারী। তাদের দুজনকেই আমি অনুভব করি। তাদের আবেগকে স্পর্শ করি। খুব গোপনে তাদের দুজনের কাছ থেকে আমি দুরকমের জিনিস চাই। কোনদিন পাব কিনা জানিনা। পেলে ভাল, না পেলে আরও ভাল! উৎসর্গে আরও অনেক কিছু লিখেছিলাম। কি মনে কেটে দিলাম। তাই এরপর শুধু নাম ও শুভকামনা রইল।

প্রিয়, নূর-ই-জান্নাত ও নিগার সুলতানা তমা কে।

লেখকের অন্যান্য বইঃ

১. অবাক ভালোবাসা

২. হৃদয় মাঝে লুকিয়ে ছিলে

বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীঃ
১. রুহক

I love thee with a love I seemed to lose
With my lost saints- I love thee with the breath,
Smiles, tears, of all my life! – and, if god choose,
I shall but love thee better after death.
– Elizabeth Barrett Browning
(How Do I Love Thee)

লেখকের কথাঃ
লেখালেখির শৈশবকাল চলছে। হাটি হাটি পা পা করে এগিয়ে যাচ্ছি। অনেক চড়াই উৎরাই পার হয়ে বইমেলাতে নতুন বই আনছি! মাঝে মাঝে ভাবি কি লাভ এসব করে? পরমুহূর্তেই আবার সম্বিত ফিরে পেয়ে লজ্জায় পরে যাই। ছিঃ, কি ভাবছি এসব! বইমেলাতে অনেক ভীর ঠেলে একটা বই কিনে, কপালের ঘাম মুছে কেউ যখন এগিয়ে এসে বলে “অটোগ্রাফ” প্লিজ- আমি তো তার জন্যই লিখি। কিংবা হাসি হাসি মুখে বলে, ভালো হয়েছে ভাইয়া। বিভিন্ন যোগাযোগ মাধ্যমের দ্বারা যারা বহু কষ্ট করে যোগাযোগ করে বিভিন্ন ভুল ত্রুটি ধরিয়ে দেন- আমি তাদের জন্য লিখি।

অনেকেই জানতে চান এত বড় পরিসরটা কিভাবে দেখি। উত্তরটা পাঠকের সামনে দেই। প্রতিবার বই মেলাতে পাঠকের উচ্ছ্বাসটা উপভোগ করি, চাপটা অনুভব করি, আর সমালোচনাটা মুখ বুঝে সহ্য করি।

আমি জানি আমার অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। এও জানি একলাফে সব দূর করা যাবেনা। চেষ্টা করে যাচ্ছি। সবাই দোয়া করবেন। সামনে যেন আরও অনেক ভালো মানের বই উপহার দিতে পারি। আপনাদের জন্য শুভকামনা রইল।

আরও পড়ুন

মন্তব্য করুন

Back to top button
Translate »