আর্কাইভ

বিসিসি নির্বাচন : বরিশালের মেয়র প্রার্থীদের টার্গেট নতুন ভোটার

বিশেষ প্রতিনিধি ॥  আসন্ন বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের (বিসিসি) নির্বাচনে আ’লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট এবং বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের দুই মেয়র প্রার্থীর টার্গেট নতুন প্রজন্মের ভোটার। নতুন প্রজন্মের এ ভোটারদের কাছে টানতে উভয়জোট নানা পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নেমেছেন। প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের অভিমত নতুন প্রজন্মের ভোটাররা নির্বাচনী ফলাফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

রিটার্নিং অফিসারের অফিস সূত্রে জানা গেছে, এবার বিসিসি নির্বাচনে মোট ভোটার ২ লাখ ১০ হাজার ৫৩০ জন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লক্ষ ৭ হাজার ১৮৪জন এবং মহিলা ভোটার ১ লক্ষ ৩ হাজার ৩৪৬ জন। গত বারের তুলনায় এবার ভোটার বেড়েছে ১৮ হাজার ৩০৩ জন। এরমধ্যে নতুন প্রজন্মের ভোটার সংখ্যা ১৮ হাজার ৩০৩ জন। এ সিটি কর্পোরেশনে ওয়ার্ড সংখ্যা ৩০টি। এখানে ভোট কেন্দ্রের সংখ্যা ১’শ টি, স্থায়ী ভোট কক্ষ ৬১৪টি এবং অস্থায়ী ভোটকক্ষের সংখ্যা ৩৭টি।

নতুন প্রজন্মের ভোটারদের ভাবনা নিয়ে এক বিশেষ অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াত-শিবিরের নাশকতামূলক কর্মকান্ড ও তাদের মদদদাতাদের ভালো চোখে দেখছেন না নতুন প্রজন্ম। বোমা বিস্ফোরণে পুলিশের হাত উড়িয়ে দেয়া, আরেক পুলিশকে হত্যার উদ্দেশ্যে ইট দিয়ে মাথা থেতলে দেয়াসহ সারাদেশে পুলিশসহ অসংখ্য হত্যাকান্ডের ঘটনা ভালো চোখে দেখছে না নতুন প্রজন্মের ভোটাররা। ফলে বিএনপির প্রার্থীর জন্য জামায়াতের সমর্থন নতুন প্রজন্মের ভোটাররা গ্রহণ করতে পুরোপুরি নারাজ। অনুসন্ধানে আরো দেখা গেছে, একজন নতুন প্রজন্মের চাওয়া পাওয়ার ওপর অনেক ক্ষেত্রেই পরিবারের সদস্যরা অসহায় হয়ে পরেন। তাই নতুন প্রজন্মের ভোটারদের মনজয় করার জন্যই দুই জোটের প্রার্থীরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

এ ব্যাপারে সম্মিলিত নাগরিক কমিটির মনোনীত ও ১৪ দল সমর্থিত মেয়র প্রার্থী, সদ্যপদত্যাগকারী মেয়র আলহাজ শওকত হোসেন হিরন বলেন, বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নতুন প্রজন্মের ভোটাররা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির পক্ষে রায় দিয়েছেন। বিসিসি নির্বাচন অরাজনৈতিক হলেও নতুন প্রজন্মের ভোটাররা স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিকেই ভোট দেবেন বলে আমি বিশ্বাসী। এছাড়াও তরুণ প্রজন্ম আধুনিকতায় বিশ্বাসী। তথ্য প্রযুক্তিতে আস্থাবান। তাদের জন্য আমি মেয়র থাকাকালীন সময় সাধ্যমতো তথ্য প্রযুক্তির সেবা পৌঁছে দিয়েছি। আবারো নির্বাচিত হলে নতুন প্রজন্মের জন্য তথ্য প্রযুক্তির চলমান সেবা আরো বেগবান করবো।

১৮ দলীয় জোটের সমর্থিত ও জাতীয়তাবাদী নাগরিক পরিষদের মেয়র প্রার্থী আহসান হাবিব কামাল বলেন, নতুন ভোটারদের কথা মাথায় রেখেই নির্বাচনী প্রচারণার কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্বাচনে তাদের মূল টার্গেট হচ্ছে নতুন ভোটারদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। তবে জামায়াতের প্রতি নতুন প্রজন্মের ভোটারদের নেতিবাচক ধারণা ভোটের ক্ষেত্রে তেমন কোন প্রভাব ফেলবে না বলেও তিনি মনে করেন।

যাদের নিয়ে দুই প্রধান জোটের এতো কৌঁশল সেই ভোটাররাও জামায়াত-শিবিরে সা¯প্রতিক কর্মকান্ডকে ভালো চোখে দেখছেন না। এ ব্যাপারে স্থানীয় বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ প্রফেসর মোঃ হানিফ বলেন, সা¯প্রতিক সময়ে জামায়াত-শিবির নানা অজুহাতে দেশের মধ্যে যে ভয়াবহ তান্ডব চালিয়েছে, তা মানুষের মন থেকে সহজে মুছে যাবার নয়। ফলে জামায়াতের সমর্থন নিয়ে বিএনপির পক্ষে নতুন প্রজন্মের ভোটারদের কাছে টানা খুব সহজ হবে না। অপরদিকে বরিশাল বিএম কলেজের শিক্ষার্থী ও নতুন ভোটার পাপিয়া সুলতানা বলেন, এখানে দু’জোটের দু’প্রার্থীই মেয়র ছিলেন। তাই কার সময়ে কতোটুকু উন্নয়ন হয়েছে তা একজন প্রথম ভোটার হিসেবে বুঝে শুনে মূল্যায়ন করে যোগ্যপ্রার্থীকেই ভোট দেবো।

 

কামালের বিরুদ্ধে হিরনের অভিযোগ

বিসিসি নির্বাচনে বিএনপির মেয়র প্রার্থী আহসান হাবিব কামালের বিরুদ্ধে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ করেছেন সদ্যবিদায়ী মেয়র ও আওয়ামীলীগের মেয়র প্রার্থী শওকত হোসেন হিরন। রিটানিং কর্মকর্তা মোঃ মুজিবুর রহমানের কাছে শওকত হোসেন হিরনের পক্ষে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন তার নির্বাচনী এজেন্ট কেবিএস আহমেদ কবীর। রিটানিং কর্মকর্তা মুজিবুর রহমান বুধবার বিকেলে অভিযোগ প্রাপ্তির কথা স্বীকার করে বলেন, প্রার্থীদের অভিযোগ তদন্তে মাঠে মোবাইল টিম কাজ করছে। তাদের দেয়া প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। ১৪ দল সমর্থিত সম্মিলিত নাগরিক কমিটির মেয়র প্রার্থী আলহাজ শওকত হোসেন হিরন টেলিভিশন এবং বিএনপি সমর্থিত জাতীয়তাবাদী নাগরিক পরিষদের মেয়র প্রার্থী আহসান হাবিব কামাল আনারস প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্ধিতা করছেন।

হিরনের পক্ষে দেয়া লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, মেয়র প্রার্থী আহসান হাবিব কামালের প্রধান নির্বাচন সমন্বয়কারী ও বরিশাল মহানগর বিএনপির সভাপতি মজিবর রহমান সরোয়ার-এমপি প্রতিদ্বন্ধি প্রার্থী শওকত হোসেন হিরনকে নাস্তিক বলে অভিহিত করেছেন। এছাড়া তাকে ভোট না দেয়ার জন্যও আহ্বান করেন। যা নির্বাচন বিধি, ২০১০ এর বিধি ১০ (ক) এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এছাড়া আনারস প্রতীকের প্রার্থী কামাল চার কালার রঙ্গিন পোস্টার ছাঁপিয়ে বিলি করেছেন। এরফলে তিনি বিধি ২(৬)(ক)(ঙ) লঙ্ঘন করেছেন। তাই নির্বাচনী আচরণ বিধি লঙ্ঘনের দায়ে সিটি কর্পোরেশন (নির্বাচন আচরন) বিধিমালা, ২০১০ এর বিধি ১০(১) নিয়ম অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর প্রার্থীতা বাতিলসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ করা হয়।

মামুনের প্রচারনার গাড়ী ভাংচুরের অভিযোগ

আ’লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী মাহমুদুল হক খান মামুনের প্রচারনার কাজে ব্যবহৃত তিনটি অটোরিক্স ভাংচুর করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। মেয়র প্রার্থী খান মামুনের মিডিয়া বিষয়ক কর্মকর্তা মোঃ মিরাজ হোসেন জানান, আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে খান মামুনের দোয়াত-কলম প্রতীকের সমর্থনে প্রচারনার (মাইকিং) সময় নগরীর সাগরদী বাজার এলাকায় একটি, বাংলাবাজার ও নতুন বাজার এলাকায় আরো দুটি অটোরিক্সা ভাংচুর করে আ’লীগ সমর্থিত মেয়র প্রার্থী শওকত হোসেন হিরনের সমর্থক নেতা-কর্মীরা। মিরাজের এ অভিযোগ অস্বীকার করে, শওকত হোসেন হিরন বলেন, এ ঘটনার সাথে তার কর্মী-সমর্থকদের কোন যোগসূত্র নেই। অহেতুক তার ওপর দোষ চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে।

মাইক ব্যবসা জমজমাট

দীর্ঘ সাড়ে চার বছর পর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জমজমাট হয়ে ওঠেছে বরিশালের মাইক ব্যবসা। মেয়র থেকে শুরু করে ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর প্রার্থীরা পর্যন্ত প্রচারের মাধ্যম হিসেবে মাইকিংকে বেঁছে নিয়েছেন। ভোরের আলো ফোটার পর পরই ৬০ বর্গ কিলোমিটার নগরীতে শুরু হয় মাইকের গর্জন। কান ফাটা শব্দে নানামুখী শ্লোগান চলে রাত অবধি। মাইক ব্যবসায়ীরা জানান, প্রতিদিন একজন প্রার্থীর কাছে একেকটি মাইক ৫ থেকে ৬’শ টাকা করে ভাড়া দেয়া হচ্ছে। তার পরেও প্রার্থীদের চাহিদা অনুযায়ী মাইক সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না বলেও তারা উল্লেখ করেন।

বরিশালে হিরন-কামালের কুশল বিনিময়

 

বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের (বিসিসি) নির্বাচনের মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীরা আজ বৃহস্পতিবার দিনভর প্রবল বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ডে গণসংযোগ করেছেন। নারী-পুরুষ, কিশোর-কিশোরীরাও অংশ নিয়েছে এ গণসংযোগে।

অপরদিকে বরিশাল মহানগরীতে গতকাল বৃহস্পতিবার অতীতের ন্যায় আবারো সহঅবস্থানের রাজনীতির বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন আ’লীগ সমর্থিক সম্মিলিত নাগরিক কমিটির মেয়র প্রার্থী ও সাবেক মেয়র আলহাজ শওকত হোসেন হিরন। ওইদিন বিকেলে তার টেলিভিশন মার্কার সমর্থনে গণসংযোগের একপর্যায়ে মুখোমুখী সাক্ষাত হয় বিএনপি সমর্থিত জাতীয়তাবাদী নাগরিক পরিষদের মেয়র প্রার্থী আহসান হাবিব কামালের। এসময় তিনি কামালকে বুকে জড়িয়ে ধরে কুশল বিনিময় করেন। নির্বাচনের মাঠে প্রতিপক্ষের প্রার্থীর সাথে অতীতের ন্যায় হিরনের এ আকস্মিক মনোভাবে গণসংযোগে উপস্থিত উভয়দলের নেতা-কর্মী, সমর্থক ও স্থানীয় সাধারন ভোটারদের মধ্যে হিরন বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন।

জানা গেছে, সম্মিলিত নাগরিক কমিটির টেলিভিশন মার্কার মেয়র পদপ্রাথী শওকত হোসেন হিরন বৃহস্পতিবার দিনভর প্রবল বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে নগরীর কাশিপুরের ৩০, ২৯, ২৮ ও ২৭ নং ওয়ার্ডেবাসীর সাথে নির্বাচনী গণসংযোগ করেন। এসময় অন্যান্যদের মধ্যে সংসদ সদস্য ও হিরনের নির্বাচনী প্রধান সমন্বয়ক এ্যাডভোকেট তালুকদার মোঃ ইউনুস, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও অগ্রনী ব্যাংকের পরিচালক এ্যাডভোকেট বলরাম পোদ্দার, জেলা আ’লীগ নেতা মোঃ হোসেন চৌধুরী, বানারীপাড়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও বিশিষ্ট আ’লীগ নেতা আলহাজ গোলাম ফারুকসহ সম্মিলিত নাগরিক কমিটির নেতৃবৃন্দরা উপস্থিত ছিলেন।

একইদিন দিনভর আনারস প্রতীকের মেয়র পদপ্রার্থী আহসান হাবিব কামাল নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক গণসংযোগ করেন।

আরও পড়ুন

মন্তব্য করুন

Back to top button
Translate »