আর্কাইভ

ইট-পাথরের শহরকে সাজানো হয়েছে বৃক্ষ দিয়ে

ঘুরে আসুন প্রাচ্যের ভেনিস বরিশালে

হাসান মাহমুদ, বিশেষ প্রতিনিধি ॥  প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমিতে পরিণত করতে ইট-পাথরের বৃহত্তর বরিশাল শহরকে অকৃপণভাবেই সাজানো হয়েছে হাজার-হাজার ফলজ, বনজ, ফুল ও বিরল প্রজাতির বৃক্ষ দিয়ে। প্রকৃতির রম্য নিকেতনে কৃত্রিম ভাবে পুরো নগরী জুড়ে (জিভাইডার দিয়ে) বৃক্ষ রোপনের ফলে বরিশাল আজ বাংলাদেশের মধ্যে অন্যতম একটি সবুজ নগরীতে পরিণত হয়েছে। ফলশ্র“তিতে এশিয়া মহাদেশের মধ্যে একমাত্র বরিশাল সিটি কর্পোরেশনকে শিশুবান্ধব নগরী হিসেবে স্বীকৃতি ও সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। নগরীর প্রায় প্রতিটি সড়কগুলোকে প্রশস্ত করে তার মাঝে বিরল প্রজাতির বৃক্ষরোপন করে বরিশাল শহরকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমিতে পরিণত করার একমাত্র কারিগর কিংবা উদ্যোক্তা হচ্ছেন বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের সদ্য বিদায়ী মেয়র আলহাজ্ব শওকত হোসেন হিরন।

সুন্দর-পরিপাটি, সাজানো-গোছানো, পুরো শহরই যেন একটি বৃক্ষের নগরী। একটিবারের জন্য হলেও প্রকৃতি প্রেমীরা ঘুরে আসতে পারেন প্রাচ্যের ভেনিস বরিশালে। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম বরিশালের রূপ সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে এর নাম দিয়েছিলেন প্রাচ্যের ভেনিস। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে বেশি অবহেলিত শহর ছিলো বরিশাল।

এরইমধ্যে পৌরসভা থেকে বরিশাল সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত হওয়ার পরেও (বিগত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে) কোন উন্নয়নই হয়নি এ সিটি কর্পোরেশনে। ভাগ্য বদলেনি নগরবাসীর। ২০০৮ সনের ১১ সেপ্টেম্বর ৬০ বর্গ কিলোমিটারের ৩০ টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এ নগরীর নির্বাচিত দ্বিতীয় মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পরেন শওকত হোসেন হিরনের ওপর। এরপর থেকেই পাল্টাতে শুরু করে নগরবাসীর ভাগ্য ও নগরীর রূপ-চিত্র। সেই থেকে দীর্ঘ ৪ বছর ৮ মাস ৩ দিন নগরীকে সাজাতে-গোছাতে একনিষ্ঠ ভাবে কাজ করেছেন তৎকালীন মেয়র হিরন। তিনি পুরো নগরী জুড়ে হাজার-হাজার ফলজ, বনজ ও ফুলের বৃক্ষ রোপন করেন। ফলে বরিশাল আজ বাংলাদেশের মধ্যে অন্যতম সবুজ নগরীতে পরিণত হয়েছে। নগরীর প্রাণকেন্দ্র কীর্তনখোলা নদীর সৌন্দর্য উপভোগের জন্য অবৈধ দোকানপাট ও বস্তি অপসারণের মাধ্যমে তিনি দু’কিলোমিটারের দৃষ্টিনন্দনকরা মুক্তিযোদ্ধা পার্ক নির্মাণ, নগরবাসীর স্বাস্থ্য সচেতনতার জন্য নগর জুড়ে উন্মুক্ত বিনোদন কেন্দ্র, পাবলিক স্কয়ার, শহীদ কাঞ্চন উদ্যান, স্বাধীনতা পার্ক, বঙ্গবন্ধু উদ্যান, শহীদ গফফুর-শুক্কুর পার্ক, বিবির পুকুরের সৌন্দর্য বর্ধন, বিএম কলেজের ওয়াকওয়ে, পরেশ সাগর মাঠের ওয়াকওয়ে, বদ্ধভূমির সৌন্দর্য বর্ধন, জিলা স্কুল মোড়, কাশিপুর চৌমাথা, সুরভী চত্বর, গড়িয়ারপাড় লেকের সৌন্দর্য বর্ধন, হাতেম আলী কলেজ চৌমাথা লেকের সৌন্দর্য বর্ধন ও জেলখানার মোড়ের সৌন্দর্য  বর্ধন করেছেন। এছাড়াও তিনি (হিরন) নগরীতে জনসাধারনের চলাচলের জন্য রাস্তার উভয় পার্শ্বে ফুটপাত ও ফুটপাতকে দৃষ্টিনন্দন করার জন্য পুটওয়াল টাইলসদ্বারা আচ্ছাদন করেন। যার ফলে নগরীর সৌন্দর্য আজ যেকোন উন্নত শহরের সাথে তুলনাযোগ্য। নগরীর প্রায় প্রতিটি সড়কগুলোকে প্রশস্ত করে তার মাঝখানে জিভাইডার দিয়ে বিরল প্রজাতির বৃক্ষরোপন করিয়েছেন তৎকালীন মেয়র শওকত হোসেন হিরন। ফলশ্র“তিতে বর্তমানে বরিশাল নগরী একটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমিতে পরিণত হয়েছে।

এছাড়াও আবর্জনার স্তুপ, ময়লা, ঘিঞ্জি ও পুঁতি দুর্গন্ধময় নগরী থেকে বরিশাল সিটি কর্পোরেশনকে একটি আধুনিক স্থাপত্য শৈলী, দৃষ্টিনন্দন ও সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনার নগরীতে পরিণত করা হয়েছে। যা বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ও বাংলাদেশের বিশিষ্ট নগর স্থাপত্যের দ্বারা স্বীকৃত ও প্রশংশিত হয়েছে। বরিশাল নগরীতে এখন আর কোন ভাঙ্গা চোরা রাস্তা, যত্রতত্র ময়লা আবর্জনা, অসময়ে ময়লা ফেলা ও নাকে হাত দিয়ে নাগরিকদের আর হাটতে হয়না। ফলে এ নগরী এখন নগরবাসীর কাছে অত্যন্ত গর্বের নগরী হিসেবে পরিনত হয়েছে। এখানে সকল ধর্মের লোকজনদের সহঅবস্থানে বসবাস, যেকোন অমীমাংসিত সমস্যা সমাধানে হিরনের দ্বারছিলো নগরবাসীর জন্য উন্মুক্ত, গভীর রাত পর্যন্ত নিবিঘেœ পুরো নগরী ঘুরে বেড়িয়ে নিরাপত্তায় অতন্দ্র প্রহরীর মত দায়িত্ব পালন, শিক্ষা ব্যবস্থায় স্কুল-কলেজে ভর্তি ও নিয়োগ বানিজ্য বন্ধ, শিক্ষার উন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহন, স্বাস্থ্য সেবায় প্রতিটি হাসপাতালে কঠোর নজরদারি, ভোররাতে লুঙ্গি পরেই নগরবাসীকে সাথে নিয়ে ধাওয়া করে একাধিক চাঁদাবাজকে আটক করে পুরো নগরীকে চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসের জনপথ থেকে মুক্ত করার অন্যান্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তৎকালীন সিটি মেয়র শওকত হোসেন হিরন। যেকারনেই বরিশাল এখন উন্নয়নশীল দেশের কোন এক শহর হিসেবে রূপ নিয়েছে। এ শহরকে আরো ঢেলে সাজাতে শওকত হোসেন হিরনকে আবারো মেয়র হিসেবে প্রয়োজন বলে দাবি করেছেন সচেতন নগরবাসী।

প্রাচ্যের ভেনিস এ বরিশালে জন্ম নিয়েছেন মহাত্মা অশ্বিনী কুমার দত্ত, বাংলার বাঘ শেরেবাংলা একে ফজলুল হক, সাংবাদিকতার পথিকৃত নির্ভীক সাংবাদিক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, কবি সুফিয়া কামাল, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের নেতা অগ্নিপুরুষ বিপ্লবী দেবেন্দ্রনাথ ঘোষ, কমরেড নলিনী দাস, মনোরমা মাসিমা অমৃত লাল দে, মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল, কৃষক কুলের নয়নমনি আব্দুর রব সেরনিয়াবাতসহ অনেক ক্ষণজন্মা নারী-পুরুষ। একুশে ফেব্র“য়ারি ও মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে বরিশালের রয়েছে গর্বিত ইতিহাস। বিশিষ্ট কলামিষ্ট আব্দুল গাফফার চৌধুরী ও শিল্পী আলতাফ মাহমুদ জন্ম নিয়েছেন এ জেলায়। এছাড়াও স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বীরশ্রেষ্ঠ ইঞ্জিনিয়ার ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর, বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল, বীরোত্তম আব্দুস সত্তার ও মেজর জলিলকে নিয়ে এখানকার মানুষ এখনো গর্ববোধ করেন। রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাসের শৈশব-কৈশোর ও শিক্ষকতা জীবন কেটেছে বরিশাল শহরে। একইভাবে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অপর নেতা চারণ কবি মুকুন্দ দাসের শৈশব-কৈশোরও কেটেছে এই শহরে। সচেতন নগরবাসীর মতে, এসব অসংখ্য ক্ষণজন্মার পার্শ্বে নিজ কর্মগুনে আজ অকপটেই নাম লিখিয়ে নিয়েছেন আলহাজ্ব শওকত হোসেন হিরন।

আরও পড়ুন

Back to top button
Translate »