আর্কাইভ

ঢাকা শহরকে শিখতে হবে বরিশাল নগরীর কাছে

বিশেষ প্রতিনিধি ॥   রাস্তার ওপর কোথাও ডাস্টবিন নেই। নেই দুর্গন্ধও। কিছু গলিতে ডাস্টবিন রয়েছে। কোথাও দু’দিনের বাসি ময়লা নেই। ঢাকার শহরের মতো নাকে হাত দিয়ে হাঁটতে হয়না বরিশালে। পুরো শহরে বইছে নির্মল বাতাস। ৬০ বর্গকিলোমিটারের এ নগরীর প্রতিটি রাস্তা প্রশস্ত করে সৌন্দর্য বর্ধণের পাশপাশি বিকল্পভাবে (ডিভাইডার) দিয়ে রাস্তার মাঝখানে লাগানো হয়েছে বড় বড় সুবিশাল বৃক্ষসহ হাজার-হাজার ফলজ, বনজ, ঔষধী ও ফুলের গাছ। ইট-পাথরের এ নগরীর শোভাবর্ধনের পাশাপাশি নগরবাসীর পরিবেশ উন্নয়নে শতভাগ সফল হয়েছেন বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের সদ্যবিদায়ী মেয়র আলহাজ্ব শওকত হোসেন হিরন।

বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের ৩০টি ওয়ার্ডকে ঢেলে সাজাতে জাপানের জাইকা প্রকল্পের ১৩৩ কোটি টাকা ও সরকারের দেয়া ২০৮ কোটি টাকা, নিজস্ব তহবিল ও বিভিন্ন প্রাইভেট কোম্পানীর দেয়া আর্থিক সহায়তার অর্থসহ প্রায় ৪’শ কোটি টাকার অকল্পনীয় উন্নয়ন কাজ করা হয়েছে নগরীর সৌন্দর্য্য বর্ধনে। আর এসব কাজ করা হয়েছে সিটি কর্পোরেশনে আওয়ামীলীগের মনোনীত প্রথম নির্বাচিত মেয়র শওকত হোসেন হিরনের ৪ বছর ৭ মাস ৩ দিনের মেয়রের দায়িত্ব পালনকালে। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক নেতা, বর্তমান অগ্রনী ব্যাংকের পরিচালক ও বরিশালের বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে একনিষ্ঠ ভাবে কাজ করে সবার হৃদয়ে স্থান করে নেয়া এ্যাডভোকেট বলরাম পোদ্দার জানান, সর্বপ্রথম বরিশাল নগর ভবনে আওয়ামীলীগের কোনো নেতা দায়িত্ব পাওয়ার পরই দেশের একমাত্র অবহেলিত বরিশাল নতুন রূপ পেয়েছে। প্রাচ্যের ভেনিসখ্যাত বরিশাল নগরী একসময় জৌলুস হারিয়ে জরাজীর্ণ রূপ নিয়েছিলো। সেই দশা থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে বরিশালকে আধুনিক নগরীতে রূপ দিতে গত ৪ বছর ৭ মাস ৩ দিন মেয়রের দায়িত্ব পালনকালে নিরলস ভাবে কাজ করেছেন সদ্য বিদায়ী মেয়র ও মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি শওকত হোসেন হিরন। তিনি আরো জানান, বরাদ্দকৃত টাকায় পরিকল্পিত আধুনিক নগরায়ন ও দর্শনীয় স্থাপনা নির্মাণসহ নাগরিক সুবিধা বৃদ্ধিতে সদ্য বিদায়ী মেয়রের আমলে প্রায় ৪’শ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ হয়েছে। তাই পরিপূর্ণ আধুনিক নগরী গড়ে তোলার পথে উন্নয়নের বাকি কাজগুলো সম্পন্ন করার জন্য তিনি ভোটারদের কাছে আরো একবার হিরনকে মেয়র নির্বাচিত করার জন্য তিনি জোর দাবি করেছেন।

সিটি কর্পোরেশন সূত্রে জানা গেছে, শওকত হোসেন হিরন মেয়র থাকাকালীন জাপানের জাইকা প্রকল্পের ১৩৩ কোটি টাকা ও সরকারের দেয়া ২০৮ কোটি টাকায় অধিকাংশ উন্নয়ন কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এর বাইরে নিজস্ব তহবিল ও বিভিন্ন প্রাইভেট কোম্পানীর আর্থিক সহায়তায় নগরীর সৌন্দর্য্য বর্ধনে কাজ করা হয়েছে অকল্পনীয় ভাবে। ২০০১ সনে বরিশাল পৌরসভা থেকে সিটি কর্পোরেশনে রূপ নেয়া এই নগরীতে সাবেক দুই মেয়রের আমলের কোনোটিতেই ১০০ কোটি টাকার কাজ সম্পন্ন করার নজির নেই। উন্নয়ন প্রকল্পের মধ্যে সড়ক প্রশস্তকরণ, আধুনিক ফুটপাত নির্মাণ, সড়ক দ্বীপ, ওয়ানওয়ে সড়ক ও সড়কগুলোতে অত্যাধুনিক বাতি লাগিয়ে সৌন্দর্য্য মন্ডিত করা হয়। এছাড়া দু’টি ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট নির্মাণের কাজ এখনো চলমান। পানি সংকট নিরসনে ২২টি পানির পাম্প ও ৪৫০টি গভীর নলকূপ স্থাপনের পাশাপাশি ৪৬ কিলোমিটার এলাকায় নতুন পানির লাইন স্থাপন করা হয়েছে।

বরিশালের সাদা মনের মানুষ বলেখ্যাত এ্যাডভোকেট তালুকদার মোঃ ইউনুস-এমপি জানান, ৬০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ নগরীতে সিটি কর্পোরেশনের অধীনে সড়ক রয়েছে ৫৯৩ কিলোমিটার। ২০০৮ সন পর্যন্ত এর সিংহভাগই ছিলো যানবাহন চলাচলের অনুপযোগী। শওকত হোসেন হিরন মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর শুরুতেই সড়ক প্রশস্তকরণের জন্য অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযান পরিচালনা করেন। ভূমিদস্যুদের তীব্র বিরোধীতার মুখে তিনি প্রথম দফায় চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে সাফল্য পান। অবৈধ স্থাপনা ভেঙ্গে সড়ক প্রশস্তকরণের জন্য শুরুতেই ড্রেন নির্মাণ করা হয়। নগরীতে এখন বড় সড়কগুলোর বাইরে রাজা রায় বাহাদুর সড়ক ও সাগরদীসহ ছোট কয়েকটি সড়কে রোড ডিভাইডার নির্মাণ করে তার ওপর বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষ রোপণ করে তৈরি করা হয়েছে সবুজ বেষ্টনী। বঙ্গবন্ধু উদ্যান থেকে শুরু করে বরিশাল ক্লাব, আমতলা ও সার্কিট হাউজ পর্যন্ত সড়কের পাশে সবুজ বৃক্ষরাজিতে দেয়া হয়েছে নানান বর্ণিল আলো।

ঢাকা থেকে বরিশাল নগরীতে বেড়াতে আসা সাংবাদিক সেরাজুল ইসলাম সিরাজের প্রথম দেখা বরিশাল নগরীকে নিয়ে বলেন, সাজানো-গোছানো পরিবেশের বরিশাল নগরীকে দেখে আমি প্রথমে হতভাগ হয়ে যাই। বরিশালকে দেখে মনে হচ্ছিলো, এইমাত্র এ মহানগরীকে সাজানো হয়েছে। বৃষ্টির পর পরই মনের অজান্তে রাজধানী ঢাকার রাস্তার সাথে মেলাতে থাকি প্রথম দেখা বরিশাল নগরীকে নিয়ে। ঢাকায় তো খানিক বৃষ্টিতেই আবর্জনাময় পানিতে রাস্তা সয়লাব হয়ে যায়। হাঁটাই দায় হয়ে পড়ে। এখানে তার পুরোপুরিটাই উল্টো। বৃষ্টির পর ঝকঝক করছে সারাশহর। পুরো নগরীর প্রতিটি সু-বিশাল রাস্তার মধ্যে রোপিত বিভিন্ন প্রজাতের বৃক্ষ যেন চাহিদার চেয়েও অধিক অক্সিজেন দিয়ে যাচ্ছে নগরবাসীকে। তিনি আরো বলেন, সেদিন নৈশকোচ থেকে নেমে রিকশাযোগে চলছিলাম চাঁনমারির উদ্দেশ্যে। অবাক হয়ে তাকাচ্ছিলাম চারিদিকে। চলতে চলতেই কথা হচ্ছিলো রিকশাচালক রহমত আলীর সাথে। তিনি থাকেন নগরীর কাউনিয়া এলাকায়। কৌতূহল চেঁপে রাখতে না পেরে রহমত আলীর কাছে জিজ্ঞেস করলাম, রাস্তাগুলো এতো পরিস্কার কেন, কোন অনুষ্ঠান আছে কি? নাকি নির্বাচনী তোড়জোড়! জবাব না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করে বসলো রহমত আলী-“আমনে কি বরিশালে পেরতোম আইছেন। জানেন না মোগো শহর হিরনই পেরতোম আলোকিত করছে।” সামনে ভোট। কাকে ভোট দেবেন, উত্তরে রহমত আলী বলেন, “হেইয়া তো মোর দেলের মইধ্যেই আছে। হেই কতা ফ্লাস করা যাইবো না।” নগরীর বান্দরোড, সিএনবি রোড, পুলিশ লাইন, আন্দারকেল্লা রোড, কাজী বাড়ি রোড ঘুরে চাঁনমারি চৌরাস্তায় পৌঁছে অবাক হয়ে যান সাংবাদিক সেরাজুল ইসলাম সিরাজ। তিনি রাস্তার ওপর কোথাও কোন ডাস্টবিন খুঁজে পাননি। ভাবেন পরিচ্ছন্ন কর্মীদের ওপর ভীষন চাপ রয়েছে বৈকি। লঞ্চঘাট এলাকার তিনি একটি ময়লার ট্রাককে ইশারা দিয়ে দাঁড় করান। ড্রাইভার আব্দুল মালেক তাকে জানান, প্রেসারটা একটু বেশি। তবে তাদের পূর্বের বেতন তিন হাজার টাকা থেকে হিরন মেয়র থাকাকালীন সময়ে সাড়ে চার হাজার টাকা করা হয়েছে। লোকজন ময়লা রাখে কোথায় জানতে চাইলে মালেক বলেন, “মেইন রাস্তায় ডাস্টবিন নেই, কিছু গলিতে ডাস্টবিন আছে। তবে কোথাও দু’দিনের বাসি ময়লা নেই”। বলেই সাংবাদিক সিরাজকে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দেয় ড্রাইভার মালেক, “কোথা থেকে এসেছেন?” সিরাজ ঢাকা বলতেই তড়পে ওঠেন মালেক। বলে ওঠেন, “ওইটা কোনো শহর হইলো নাকি। ঢাকাকে বরিশালের কাছে শিক্ষা নিতে বলেন।”

সূত্রমতে, বরিশাল সিটি কর্পোরেশনে ময়লা টানার জন্য ট্রাক রয়েছে মাত্র ১৪টি। বক্স ভ্যান বেশ কয়েকটি। তাতেই বাজিমাত। দিনে দু’টি ট্রিপ দিতে হয় প্রতিটি ময়লার ট্রামের চালকদের। সাংবাদিক সিরাজ আরো বলেন, ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের ব্যাঙ্গালুর সিটি দেখার সৌভাগ্য হয়েছিলো আমার। ক্লিন সিটি হিসেবে মনের মধ্যে আজো দাগ কেটে আছে ওই শহরটি। তবে বরিশাল সিটিকে তার সাথে তুলনা করলে খুব বেশি বাড়িয়ে বলা হবে না। এসবের একমাত্র দাবিদার বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের সদ্যবিদায়ী মেয়র আলহাজ্ব শওকত হোসেন হিরন।

উল্লেখ্য, বরিশাল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের আরমাত্র কয়েকদিন বাকি। এখানে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্ধীতা করছেন ১৪ দল সমর্থিত সম্মিলিত নাগরিক কমিটির মেয়র পদপ্রার্থী সদ্য বিদায়ী মেয়র আলহাজ্ব শওকত হোসেন হিরন-টেলিভিশন, ১৮ দল সমর্থিত জাতীয়তাবাদী নাগরিক পরিষদের প্রার্থী আহসান হাবিব কামাল-আনারস ও দক্ষিণাঞ্চল সাংস্কৃতিক পরিষদের প্রার্থী মাহমুদুল হক খান মামুন-দোয়াত কলম। তিনজন মেয়র পদপ্রার্থীর মধ্যে সর্বপ্রথম বলিষ্ট ভূমিকা রেখে বরিশাল মহানগরীতে ব্যাপক উন্নয়ন করায় কোন রাজনৈতিক দল হিসেবে নয়; ব্যক্তি হিসেবে আলহাজ্ব শওকত হোসেন হিরনের টেলিভিশন মার্কায় সর্বত্র গণজোয়ারের সৃষ্টি হয়েছে।

আরও পড়ুন

মন্তব্য করুন

Back to top button
Translate »