আর্কাইভ

বরিশালের জিতু-কালু ও মিরাজের পরিবারের কান্না আজো থামেনি

সরোয়ার ও কামালের দ্বন্ধে তিন ছাত্রদল নেতা নিহত

বিশেষ প্রতিনিধি ॥  বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনকে সামনে রেখে দীর্ঘ একযুগ পর পূর্বের সকল বিরোধ ভুলে একই প্লাটফর্মে দাঁড়িয়েছেন জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও মেয়র পদপ্রার্থী আহসান হাবিব কামাল এবং মহানগর বিএনপির সভাপতি মজিবর রহমান সরোয়ার-এমপি। চিরপ্রতিদ্বন্ধী এ দু’নেতার বিরোধ মীমাংসা হলেও আজো কান্না থামেনি সরোয়ার ও কামালের আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্ধে নিহত ছাত্রদল নেতা রাফসান আহম্মেদ জিতু, দীর্ঘ এক বছর ধরে নিখোঁজ ছাত্রদল নেতা ফিরোজ খান কালু ও মিরাজের পরিবারের।

যে দু’নেতার দ্বন্ধের কারনে একজন খুন ও দু’ভাইকে অপহরনের পর হত্যা করে লাশ গুম করার অভিযোগ উঠেছে সেই দু’পরিবারের খোঁজ নেয়নি কেউ। উল্টো নিজ দলের কতিপয় সন্ত্রাসীরা নিহত জিতুর পরিবারকে বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতিসহ জিতুর বড় ভাই টিপুকে প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। অপরদিকে বুকের ধন কালু ও মিরাজকে হারিয়ে নির্বাক তাদের বিধবা মা ফিরোজা বেগম (৫০)। স্বামীর ফিরে আসার প্রতিক্ষায় প্রতিদিন পথপানে চেয়ে থাকেন কালুর অসহায় স্ত্রী আমেনা আক্তার বৃষ্টি। কালুর চার বছরের একমাত্র পুত্র জিসান বাবাকে ফিরে পাবার আসায় আল্লাহর দরবারে প্রতিনিয়ত প্রার্থনা করে যাচ্ছে। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম কালুর নিখোঁজের পর নিদারুন কষ্টে দিনাতিপাত করছেন তার বিধবা মা, স্ত্রী ও সন্তান। সূত্রমতে, সরকারি বরিশাল কলেজ শাখা ছাত্রদলের আহবায়ক রাফসান আহমেদ জিতু ছিলো জেলা বিএনপির সদ্য পদত্যাগ করা সভাপতি ও বর্তমান মেয়র পদপ্রার্থী আহসান হাবিব কামালের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। মজিবর রহমান সরোয়ার-এমপি’র ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলো নগরীর ২০নং ওয়ার্ড ছাত্রদলের সভাপতি ফিরোজ খান কালু ও তার সহদর মিরাজ হোসেন খান।

সূত্রমতে, বরিশাল নগরীতে দীর্ঘদিন থেকে জেলা বিএনপির সভাপতি আহসান হাবিব কামাল এবং মহানগর বিএনপির সভাপতি ও বরিশাল-৫ (সদর) আসনের বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য মজিবর রহমান সরোয়ারের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে চরম বিরোধ চলে আসছিলো। দলীয় শীর্ষ নেতাদের বিরোধের জেরধরে কয়েকদফা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। এরইমধ্যে আহসান হাবিব কামালের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছাত্রদল নেতা রাফসান আহম্মেদ জিতুকে গত বছরের ২৪ মার্চ সন্ধ্যায় প্রতিপক্ষ মজিবর রহমান সরোয়ার-এমপি’র ঘনিষ্ঠ সহযোগী বাবুগঞ্জ উপজেলার চাঁদপাশা গ্রামের সবুজ আকন পরিকল্পিত ভাবে ডেকে নগরীর কালিবাড়ি রোড এলাকার বরিশাল কলেজের সম্মুখে নিয়ে নির্মম ভাবে কুপিয়ে হত্যা করে। এ ঘটনায় নিহত জিতুর ভাই রফিকুল ইসলাম টিপু বাদি হয়ে বরিশাল কোতোয়ালী মডেল থানায় (২৫ মার্চ) একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন (মামলা নং-৫২/১২)। মামলায় এমপি সরোয়ারের নাম উল্লেখ না করলেও তার নির্দেশে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ আনা হয়েছিলো। টিপুর দাবি রাজনৈতিক দ্বন্ধের কারণেই তার ভাই জিতুকে হত্যা করা হয়েছে। তার ভাই জিতু ছিলো কামালপন্থী ছাত্রদল নেতা ও খুনীরা ছিলো এমপি সরোয়ার পন্থী। মামলায় ১০ জনের নাম উল্লেখ করা হলেও ১৭ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছিলো। মামলার আসামিরা হলো, সরোয়ারের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও ২০নং ওয়ার্ড ছাত্রদলের সভাপতি ফিরোজ খান কালু, তার ভাই ছাত্রদল নেতা মিরাজ হোসেন, মহানগর ছাত্রদলের যুগ্ম আহবায়ক আরিফুল ইসলাম মুন্না, ছাত্রদল নেতা মাহফুজ, রনি ওরফে তরকারী রনি, ডিসকো আলামিন, প্রিন্স, সবুজ আকন, নুন্না ও মুন্না।

জিতুর ভাই ছাত্রদল নেতা রফিকুল ইসলাম টিপু বলেন, মামলার আসামিরা জামিনে বেরিয়ে প্রকাশ্যে আমাকে ও আমার পরিবারকে বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতিসহ মামলা উত্তোলনের জন্য প্রাণনাশের হুমকি অব্যাহত রেখেছে। নিজ দলীয় আসামিদের হুমকির মুখে আমি ও পরিবারের সদস্যরা এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছি। নিহত জিতুর বোন নাজমা আক্তার অভিযোগ করে বলেন, কারনে-অকারনে থানার কতিপয় এসআই আমাদের বিভিন্ন ভাবে হয়রানি করে আসছে। আবেগআপ্লুত হয়ে তিনি আরো বলেন, কামাল-সরোয়ার একত্রিত হয়ে গেলেও অদ্যবর্ধি আমাদের খোঁজ কেউ রাখেননি। তিনি কামাল-সরোয়ারের উদ্দেশ্যে বলেন, আপনারা যখন মিলে গেছেন, তখন আমাদের ভাই জিতুকে আপনারা ফেরত দিন। বলেই কান্নায় ভেঙ্গে পরেন নাজমা আক্তার। নিহত রাফসান আহম্মেদ জিতু বরিশাল কলেজ রোড এলাকার বাসিন্দা ও একটি বেসরকারি কীটনাশক কোম্পানীর বিক্রয় প্রতিনিধি নুরুল হকের পুত্র।

জিতু হত্যার প্রত্যক্ষদর্শী ছাত্রদল নেতা ও জিতুর বন্ধু রুম্মান জানান, সন্ত্রাসীরা জিতুকে কোপানোর সময় শুধু বলেছিলো “কামাল কোরাম করো”। ওইদিন (২৪ মার্চ) রাত এগারোটার দিকে কামাল পন্থী বিএনপির নেতা-কর্মীরা জিতু হত্যার জন্য সাংসদ সরোয়ার ও তার ক্যাডারদের দায়ি করে নগরীতে বিক্ষোভ মিছিলও করেছিলো। জিতুর খুনের খবর পেয়ে ঢাকা থেকে বরিশালে ছুটে এসে জিতুর পরিবারকে শান্তনা দিয়েছিলেন আহসান হাবিব কামাল। এ হত্যাকান্ডের ঘটনায় খুনীদের গ্রেফতারপূর্বক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে ছাত্রদল নেতারা বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন, কালোব্যাজ ধারন, শোক সভাসহ পাঁচদিনের কর্মসূচী পালন করেছিলেন। ওইসময় ছাত্রদলের একাংশেরর নেতা-কর্মীদের আন্দোলনের মুখে পূর্ব ঘোষিত সাংসদ মজিবর রহমান সরোয়ার সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের মন্ত্রীরা কটুক্তি করার প্রতিবাদে সরোয়ারের আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছিলো।

অপরদিকে মামলা দায়েরের পর পরই বরিশাল থেকে আত্মগোপন করে সাংসদ সরোয়ারের ঘনিষ্ঠ সহযোগী নগরীর ২০নং ওয়ার্ড ছাত্রদলের সভাপতি ফিরোজ খান কালু ও তার সহদর মিরাজ খান। এ ঘটনার কয়েকদিন পরেই আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় ঢাকার মিরপুর-১ নাম্বার থেকে সাদাপোষাকে আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে অপহরন করা হয় মিরাজকে। এরকিছুদিন পর স্ত্রী-সন্তান নিয়ে চট্টগ্রামে আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় একইভাবে অপহরন করা হয় ফিরোজ খান কালুকে। যদিও অদ্যবর্ধি কোন আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরাই তাদের দু’ভাইকে তুলে নেয়ার বিষয়টি স্বীকার করেননি। সেই থেকে অদ্যবর্ধি নিখোঁজ রয়েছে কালু ও তার সহদর মিরাজ।

বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে অর্থাভাবে বিনাচিকিৎসায় থাকা কালু ও মিরাজের বিধবা মা ফিরোজা বেগমের অভিযোগ, দলীয় প্রতিপক্ষের সন্ত্রাসীরা তার সন্তানদের অপহরনের পর হত্যা করে লাশ গুম করেছে। আবেগ আপ্লুত হয়ে কান্নাজড়িত কন্ঠে বিধবা ফিরোজা বেগম বলেন, আল্লাহর বিচার নাই-যদি থাকতো তাইলে যারা এই হত্যাকান্ডগুলো করিয়েছে তাগো ওপর আল্লাহর গজব পড়তো। আসন্ন সিটি নির্বাচনে ভোট দেয়া নিয়ে তিনি বলেন, ভোট দিমু না-কারে ভোট দিমু, যারা মোর বুকের ধন দুই পোলারে কাইরা নেছে হেগো ভোট দিমুনা। যদিও ভোট দিতে যাই তাইলে বিএনপিরে নয়; আ’লীগের প্রার্থীরে ভোট দিমু। কালুর স্ত্রী আমেনা আক্তার বৃষ্টি আজো বিশ্বাস করেন, তার স্বামী ও দেবর বেঁচে আছেন। তাই প্রতিদিনই তাদের আগমনের আশায় তিনি পথপানে চেয়ে থাকেন। বৃষ্টি তার স্বামী ও দেবরের সন্ধ্যান পেতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। একই দাবিতে তারা ইতোমধ্যে একাধিকবার সংবাদ সম্মেলনসহ বিভিন্ন দপ্তরের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও কোন সুফল পাননি।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী ১৫ জুন বিসিসি’র নির্বাচন। দলের মনোনীত প্রার্থীকে বিজয়ী করতে দীর্ঘদিনের আধিপত্য বিস্তারের বিভাজনের রাজনীতির রূপরেখার বাইরে এখন একই প্লাটফর্মে আবদ্ধ হয়েছেন মজিবর রহমান সরোয়ার এবং আহসান হাবিব কামাল। দলের নেতা-কর্মীদের তারা জানিয়েছেন, দলের মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে বিভাজন নয়; একই বন্ধনে মিলিত হয়ে নির্বাচনী প্রচারনা চালানোর জন্য। অবশ্য নির্বাচনী প্রচারনায় সরোয়ার ও কামাল প্লাটফর্মে মিলিত হওয়ার বিষয়টি দৃশ্যমান ঘটলেও কর্মীরা এখনও পুরোপুরী নির্বাচনমুখী হয়নি। কষছেন পুরানো দিনেও সব হিসেব নিকেশ। অন্যদিকে, যেখানে নির্বাচনের আনন্দে দলের নিবেদিত নেতা-কর্মীদের উদ্ভাসিত হওয়ার কথা, সেখানে বিশেষ করে ছাত্রদল নেতাদের মাঝে আলোচনায় উঠে এসেছে ছাত্রদল নেতা রাফসান আহম্মেদ জিতুর হত্যাকান্ড ও এ হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি ছাত্রদল নেতা ফিরোজ খান কালু ও তার ভাই মিরাজের সন্ধ্যান না পাওয়ার বিষয়টি। তাই পুরনো দিনের সেই হিসেব মেলাতে গিয়ে অধিকাংশ ছাত্রদল নেতারাই নির্বাচনের মাঠ থেকে নিজেদের আড়াল করে রেখেছেন।

আরও পড়ুন

Back to top button
Translate »