আর্কাইভ

বরিশালে হিরণের বিরুদ্ধে নয় আ’লীগের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে জনগন

যে কারনে হিরণের পরাজয়

হাসান মাহমুদ, বিশেষ প্রতিনিধি, বরিশাল থেকে ॥  বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের (বিসিসি) নির্বাচনের মেয়র পদপ্রার্থী ও সদ্য বিদায়ী মেয়র আলহাজ্ব শওকত হোসেন হিরণের বিরুদ্ধে নয়; ধর্মভীরু সাধারন জনগন তাদের মূল্যবান ভোট দিয়েছে আওয়ামীলীগের বিরুদ্ধে। আর এর পেছেনে কাজ করেছে জনগণের মধ্যে সরকারের নেতিবাচক ইমেজ, পদ্মাসেতু দুর্নীতি, হেফাজতে ইসলাম ইস্যু, হলমার্ক, শেয়ারবাজার ও কর্মীদের অবমূল্যায়ন করা। এছাড়াও সাধারন ভোটারদের মধ্যে আ’লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর অপপ্রচারও অনেকটা সমস্যার সৃষ্টি করেছে। আজ গতকাল রবিবার বরিশাল নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে সাধারণ নগরবাসী ও আ’লীগের নেতা-কর্মীদের মুখেই এমন কথা শোনা গেছে।

 

 

 

এছাড়া ভোটের দিনে ভোট কেন্দ্র থেকে প্রতিদ্বন্ধী প্রার্থীর এজেন্টকে বের করে দেয়া, ভোট কেন্দ্রে  হিরণের সম্মুখেই প্রতিদ্বন্ধী প্রার্থী আহসান হাবিব কামাল ও বাকেরগঞ্জের বিএনপি দলীয় সাবেক এমপি আবুল হোসেনের ওপর হামলার বিষয়টিও মেনে নিতে পারেননি এখানকার সাধারন ভোটাররা। এমনিতেই বিএনপি অধ্যুষিত এলাকা বরিশাল। তার পরেও তিনি (হিরণ) মেয়র থাকাকালীন সময় নগরবাসীর প্রত্যাশার চেয়ে বেশি উন্নয়ন করতে সক্ষম হন। যে কারনে দল হিসেবে বিএনপিকে ভালবাসলেও ব্যক্তি ইমেজ হিসেবে হিরণকে অনেক সাধারন ভোটাররাই ভোট দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু উপরোক্ত বিষয়গুলোই হিরণের বিজয়ের বিপরীতে কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এরবাইরে হিরণের পরাজিত হওয়ার কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না বরিশালের রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

 

 

সচেতন নগরবাসীর মতে, শওকত হোসেন হিরণের উন্নয়নের কথা সবার মুখে মুখে। রাস্তায় যে ডিভাইডার বলতে কোনো বিষয় হতে পারে তা বরিশালবাসীকে চিনিয়েছেন হিরণ। এর আগে যারা ঢাকায় গেছেন, শুধু তারাই রোড ডিভাইডারের বিষয়টি বুঝতেন। অথচ হিরণ নগরীর প্রায় সবগুলো রাস্তা প্রশস্ত করে ডিভাইডার বসিয়েছেন। রাস্তা বড় করতে গিয়ে অনেক বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভাংচুর করতে হয়েছে। এক্ষেত্রে তিনি তার আপন ফুফুর বাড়ি ভেঙ্গে নগরীতে স্থাপনা ভাঙ্গার উদ্বোধন করেন। ছাড় পাননি তার ভাইও। এক্ষেত্রে হিরণের বক্তব্য ছিল, আগে নিজেদের লোকজনের বাড়ি ভাঙ্গতে হবে। তাহলে অন্যরা সমালোচনা করতে পারবেন না। দলীয় লোকজন থেকে শুরু করে খোঁদ বিএনপির নেতা-কর্মীরাও হিরণের প্রভূত উন্নয়নের বিষয়টি এক বাক্যে স্বীকার করেন। নির্বাচনের সময় বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী আহসান হাবিব কামাল বলেছিলেন, অপরিকল্পিত উন্নয়ন করেছে হিরণ। তিনিও বলতে পারেননি হিরণ কোনো কাজ করেনি। কারণ উন্নয়নের মডেল বলা হয় হিরণকে। এককালের সন্ত্রাসের জনপদ ছিল বরিশাল। যখন যেদল ক্ষমতায় আসতো তারা এলাকায় থাকতো। আর বিরোধীদলের লোকজন এলাকা ছেড়ে পালিয়ে থাকতে হতো। কিন্তু হিরণ রাজনৈতিক সহবস্থানের নতুন দিগন্তের সূচনা করেছেন।

 

 

তার পরেও বিশাল ব্যবধানে শওকত হোসেন হিরণের পরাজয়ের ব্যাপারে এক বিশেষ অনুসন্ধানে বেড়িয়ে এসেছে অজানা তথ্য। খোঁদ আ’লীগের নেতারাই সরকারের ইমেজ সংকটকে দায়ী করেছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে মহানগর আ’লীগের এক নেতা জানান, বরিশাল মূলত বিএনপির ঘাঁটি বলে পরিচিত। প্রার্থীর চেয়ে দলের বিষয়টি এখানে বেশি গুরুত্ব পায়। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। জনগণ হিরনের বিরুদ্ধে ভোট দেয়নি। ভোট দিয়েছে সরকারের নানা অনিয়মের বিরুদ্ধে। হিরণের কর্মী সুলতান আহম্মেদ জানান, হেফাজতকে মতিঝিল থেকে উঠিয়ে দিতে গিয়ে কয়েক হাজার লোক মারা হয়েছে, এমন মিথ্যা প্রচারণা অনেকেই বিশ্বাস করেন। সে বিষয়টিও খানিকটা প্রভাবিত করেছে এ নির্বাচনে। নির্বাচনে মহাজোট সমর্থিত পরাজিত প্রার্থী শওকত হোসেন হিরণের প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট এ্যাডভোকেট কেবিএম আহম্মেদ কবির বলেন, হিরণের পরাজয়ের পেছনে জাতীয় রাজনীতির প্রভাব রয়েছে। এখানে উন্নয়ন বিবেচ্য বিষয় নয়। তিনি বলেন, এখানে গত সিটি নির্বাচনের চেয়ে এবার আ’লীগের ভোট বেড়েছে। অন্যদিকে বিএনপির ভোট কমেছে। কর্মীদের অবমূল্যায়নের ব্যাপারে তিনি বলেন, কিছুটা অবহেলা ছিলো তা সত্য। তবে এটা ২৫ ভাগ বলা চলে। এটা ভোটের ক্ষেত্রে তেমন প্রভাব ফেলেনি।

 

 

 

ভোটের দিনে বিতর্কিত কর্মকান্ড

 

এদিকে ভোটের দিন (১৫ জুন) হিরণের বেশ কিছু বিতর্কিত কর্মকান্ড ফলাও করে বিভিন্ন বেসরকারি ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ায় প্রচারিত হয়েছে। ওইদিন সকাল সাড়ে ১১টায় একটি ভোট কেন্দ্র থেকে প্রতিদ্বন্ধী প্রার্থীর পোলিং এজেন্টকে নিজ হাতে বের করে দেয়া, তার (হিরণের) উপস্থিতিতে রূপাতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে প্রতিদ্বন্ধী প্রার্থী ও তার অন্যতম নির্বাচন পরিচালনাকারী সাবেক এক এমপিকে রক্তাক্ত জখম করা হয়। এ ঘটনা গুরুত্বের সাথে প্রচার করে মিডিয়াগুলো। প্রতিদ্বন্ধী মেয়র প্রার্থী ও সদ্য বিজয়ী মেয়র আহসান হাবিব কামাল মিডিয়া কর্মীদের কাছে অভিযোগ করেন, হিরণ নিজে তাকে ও সাবেক এমপি আবুল হোসেনকে ঘুষি মেরেছে। সাধারন ভোটাররা টিভি চ্যানেলে এসব বির্তকিত কর্মকান্ড দেখে হিরণের দিক থেকে অনেকেই মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছেন বলেও সচেতন মহল মনে করছেন।

 

 

 

দলীয় কর্মীদের অবমূল্যায়ন

 

গত সিটি নির্বাচনে যারা জানপ্রাণ দিয়ে খেটেছিলো সেই একনিষ্ঠ কর্মীদের কোনোই মূল্যায়ন করেননি হিরণ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে দলীয় ওইসব ত্যাগী নেতা-কর্মীরা জানান, নগর ভবনে পুরো সময় জুড়েই টেন্ডারাবাজি হয়েছে। এতে তার পিএ ও স্বজনেরা কাজ পেয়েছেন। কোনো সুযোগ পায়নি নির্বাচনে পরিশ্রম করা কর্মীরা। কোটিপতি হয়েছেন তার পিএ, নগরীতে তিনি বাড়ি, জমি ও গাড়ি কিনেছেন। কিন্তু কর্মীদের ভাগ্যের উন্নয়ন হয়নি। সিটি কর্পোরেশনে বিভিন্ন পদে চাকরির ক্ষেত্রেও অবমূল্যায়িত হয়েছেন কর্মীরা। যে কারণে তারা এবার আর মনপ্রাণ দিয়ে নির্বাচনী মাঠে নামেননি। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে হিরণ বলেন, কাজ করতে গেলে ভুলত্র“টি থাকতেই পারে। যারা আমাকে ভালবেসে আমার ভুলত্র“টি ধরিয়ে দিয়েছে তাদের সকল কাজই পর্যায়ক্রমে করে দেয়া হয়েছে। 

 

 

 

হাসানাত-হিরণ দ্বন্ধ

 

সতেচন বরিশাল নগরবাসীর মতে, এখানে দীর্ঘদিন থেকে সাবেক চীফ হুইপ আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ ও শওকত হোসেন হিরণের মধ্যে অঘোষিত দ্বন্ধ চলে আসছিলো। ফলে দু’জন দু’জনাকে কোণঠাসা করে রাখতে সব সময়েই ছিলেন তৎপর। সে কারণে হাসনাত আব্দুল্লাহ নির্বাচনে আন্তরিকভাবে হিরণের পক্ষে কাজ করেছে কিনা এনিয়েও নানাগুঞ্জন রয়েছে। এছাড়া নগরীর ২৫টি ওয়ার্ডের শ্রমিক সংগঠনের সাথে মালিক সমিতির নেতা আফতাবের চরম বিরোধের একপর্যায়ে হিরণ বাস মালিক সমিতির সভাপতি হিসেবে আফতাব হোসেনকে মনোনীত করেন। এতে বিপাকে পড়ে যায় শ্রমিক নেতারা। যে কারনে এ নির্বাচনে ওইসব সহস্রাধীক শ্রমিক নেতারাও হিরণের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

 

 

 

বিএম কলেজের অধ্যক্ষকে মারধর

 

ঐতিহ্যবাহী সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজের অবৈধ ছাত্র কর্ম পরিষদের গঠনের পর কলেজ ফান্ডের মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয় ওই নামসর্বস্ত্র সংগঠনের কতিপয় ছাত্রলীগ নেতারা। এ নিয়ে তদন্ত শুরু হওয়ার পর কলেজের অধ্যক্ষ ননী গোপাল দাসকে বদলি করে তারস্থলে শংকর দত্তকে নিয়োগের অর্ডার করে শিক্ষামন্ত্রণালয়। শংকর দত্ত কলেজে যোগদান করতে আসলে ওইসব ছাত্রলীগ নেতারা তাকে মারধর করে তাড়িয়ে দেয়। এ ঘটনায় নিরপরাধ ব্যক্তিদের ফাঁসিয়ে দেয়ার অভিযোগ ওঠে তৎকালীন মেয়র হিরণের বিরুদ্ধে। যেকারনে সুশীল সমাজের মধ্যেও হিরণ বিরোধিতা কাজ করে।

 

 

 

 

দলের বিদ্রোহী প্রার্থী

 

দীর্ঘ একযুগের বিরোধ মীমাংসা করে এখানে বিএনপি একক প্রার্থী দিলেও ব্যর্থ হয় আওয়ামীলীগ। নির্বাচনী মাঠ দাঁপড়িয়ে বেড়ায় দলের বিদ্রোহী প্রার্থী ও মহানগর যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক মাহমুদুল হক খান মামুন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাধারন ভোটাররা এক দলে দু’প্রার্থীকে সহজ ভাবে মেনে নিতে পারেননি। অপর একটি সূত্র জানিয়েছে, বিদ্রোহী প্রার্থী মামুন নিজের পক্ষে ভোট চাওয়ার বিপরীতে আওয়ামীলীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মনোনীত মেয়র প্রার্থী শওকত হোসেন হিরণের বিরুদ্ধে ভোটের মাঠে অপপ্রচার চালিয়েছেন বেশি। যে কারনেও অনেক সাধারন ভোটারদেরকেই বলতে শোনা গেছে, আ’লীগের দু’জন প্রার্থী হওয়ায় তাদের ভোট ভাগাভাগি হয়ে যাবে। হেরা কেউই হইতে পারবে না ফলে এদের ভোট দিলে ভোট নষ্ট হয়ে যাবে।

 

 

 

 

বিজয়ী হয়ে কাঁদলেন কামাল ও সরোয়ার

১৮ দলীয় জোট সমর্থিত জাতীয়তাবাদী নাগরিক পরিষদের মেয়র প্রার্থী আহসান হাবিব কামালকে-আনারস বেসরকারি ভাবে মেয়র পদে বিজয়ী ঘোষণা করেছের রিটার্নিং অফিসার মোঃ মুজিবুর রহমান।

 

শনিবার রাত সোয়া বারোটার দিকে রিটার্নিং অফিসার ঘোষণা করেন, আনারস প্রতীক নিয়ে আহসান হাবিব কামাল নগরীর ৩০ টি ওয়ার্ডের ১’শ টি ভোট কেন্দ্রে পেয়েছেন ৮৩ হাজার ৭৫১ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্ধী মহাজোট সমর্থিত সম্মিলিত নাগরিক কমিটির মেয়র প্রার্থী আলহাজ্ব শওকত হোসেন হিরণ টেলিভিশন প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৬৬ হাজার ৭৪১ ভোট। ফলাফল ঘোষণার পর আহসান হাবিব কামাল সমর্থিত বিএনপির নেতা-কর্মীরা যখন বিজয় উল্লাসে ফেটে পড়েন ঠিক তখনই সদ্য নির্বাচিত মেয়র আহসান হাবিব কামাল ও তার নির্বাচনী প্রধান সমন্ময়ক এ্যাডভোকেট মজিবর রহমান সরোয়ার-এমপি আবেগ আপ্লুত হয়ে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে বিজয়ের আনন্দে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেন। দু’প্রার্থীর মধ্যে ভোটের ব্যবধান হচ্ছে ১৭ হাজার ১০ ভোট। অপর প্রার্থী মাহমুদুল হক খান মামুন দোয়াত-কলম প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ১ হাজার ৮০৭ ভোট। বরিশাল সিটির ৩০টি ওয়ার্ডে মোট ভোটার ২ লক্ষ ১১ হাজার ২৫৭ জন। এরমধ্যে পুরুষ হচ্ছে ১ লক্ষ ৭ হাজার ৬২৫ ও নারী ১ লক্ষ ৩ হাজার ৬৩২ জন। ভোট প্রদান করেছেন ১ লক্ষ ৫৫ হাজার ১২৬ জন ভোটার। প্রদত্ত ভোটের হার শতকরা ৭৩ দশমিক ৫ ভাগ।

 

 

 

নব নির্বাচিত মেয়রের প্রতিক্রিয়া

 

বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের নবনির্বাচিত মেয়র আহসান হাবিব কামাল বলেন, এ বিজয় জনগণের বিজয়। জাতীয়তাবাদী, ইসলামে বিশ্বাসী এবং ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের বিজয়। তিনি বলেন, এ বিজয়ের জন্য বরিশালের সর্বস্তরের মানুষকে আমি অভিনন্দন জানাই। তিনি শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার জন্য দলমত নির্বিশেষ সকলের প্রতি আহবান করেন।

আরও পড়ুন

Back to top button