আর্কাইভ

গৌরনদীর রাজাকার কমান্ডারের অপরাধের তদন্ত শুরু

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে

মোঃ জামাল উদ্দিন ॥  এলাকাবাসীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে স্বাধীনতার ৪২ বছর পরে হলেও বরিশালের গৌরনদী উপজেলার কান্ডপাশা গ্রামের যুদ্ধাপরাধী ও কুখ্যাত রাজাকার কমান্ডার বলে খ্যাত জালাল হাওলাদারের (৬৮) অপরাধ কর্মের তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। বরিশাল হেড-কোয়াটারের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার আব্দুল মোতালেব সম্প্রতি নলচিড়া বাজারে এসে এলাকার লোকজনের সাক্ষ্য গ্রহন করেন। এ সময় স্থানীয় বহু লোকজন তার বিরূদ্ধে সাক্ষ্য দেন।

পুলিশ ও এলাকাবাসী সূত্রে জানাগেছে, কান্ডপাশা গ্রামের মোসলেম খান গত দেড় মাস আগে  রাজাকার কমান্ডার জালাল হাওলাদারের নানা কুকর্মের বিচারের দাবীতে স্বর্-াষ্ট্র  মন্ত্রনালয়ে অভিযোগ দায়ের কওে যুদ্ধ অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তার বিচারের দাবী জানান। মোসলেম খান লিখিত অভিযোগে জানান, জালাল হাওলাদার স্বাধীনতা যুদ্ধচলাকালীন সময় গৌরনদী এরাকার বহু মুক্তিযোদ্ধা নিরীহ মানুষ খুন করেছে। সে ছিল লুটেরা, অগ্নিসংযোগকারী ও নারী ধর্ষনকারী দলের মূল হোতা। গৌরনদীর ভুরঘাটা থেকে উজিরপুরের শিকারপুর পর্যন্ত রাজাকারদের যে কয়টি ক্যাম্প স্থাপিত হয়েছিল সব কটিই ছিল রাজাকার কমান্ডার জালাল হাওলাদারের নিয়ন্ত্রনে। দেশ স্বাধীন হওয়ার প্রাক্কালে রাজাকার কমান্ডার জালাল অবস্থা বেগতিক দেখে বরিশাল উত্তরের আঞ্চলিক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার নিজাম উদ্দিনের কাছে অস্ত্র জমা দিয়ে আত্মসমর্পন করে এবং প্রান ভিক্ষা চায়। ওই সময় নিজাম উদ্দিন তার শিক্ষক খাদেম হোসেন মাষ্টারের (তিনি নিজেও পিচ কমিটির সভাপতি ছিলেন) অনুরোধে জালালকে ক্ষমা করে দিয়ে তার দেহরক্ষি নিয়োগ করেন।

জানা গেছে, স্বাধীনতা পরবর্তি সময়ে নকসাল পন্থিরা নিজামকে খুন করার জন্য বহুবার পদক্ষেপ নিয়েও ব্যার্থ হয়। স্থানীয়রা জানান, নিজাম উদ্দিনের দেহরক্ষি হওয়ার ফলে রাজাকার জালাল আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে। নিজামের অস্ত্র ভান্ডার ছিল জালালের দখলে। এ সুযোগে সে এলাকয় আধিপত্য বিস্তারের জন্য গড়ে তোলে সন্ত্রাসী বাহিনী। মোসলেম খান আরো জানান, স্বাধীনতা পরবর্তি সময়ে জালাল আমার পিতা মৌজে আলী খান ও ছোট ভাই কবির খানকে বাড়ী থেকে ধরে নিয়ে খুন করে। একই ভাবে শরিকল ইউনিয়নের তৎকালিন চেয়ারম্যান ও মুক্তিযোদ্ধা সংগঠক সুরেন শিকদার, কান্ডপাশা গ্রামের বিশিষ্ট সমাজ সেবক মুক্তিযোদ্ধা হাবিব খান, গফুর খলিফা,হোসনাবাদ গ্রামের রমনী চৌকিদার সহ বহু লোককে খুন করেছে জালাল রাজাকার। এছাড়া তার দ্বারা নানাভাবে নিগৃত হয়েছে এলাকার বহু লোকজন। কিন্তু তার ভয়ে ওই সময় অনেকেই মামলা করতে সাহস পায়নি। আমরা মামলা করলেও সে আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেড়িয়ে যায়।

কান্ডপাশা গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা সংগঠক ও প্রবীন শিক্ষক আঃ রশিদ খান (৭৫) অভিযোগ করেন, একজন রাজাকার কমান্ডার হওয়া সত্যে ও জালাল স্বাধনতা পরবর্তি ৭৩ সালে নিজামের কাছ থেকে মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিয়ে সোনালী ব্যাংকের কেয়ারটেকার পদে চাকুরী পায়। সে বিভিন্ন সময়ে পেশী শক্তি ও জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে বহু সংখ্যালঘু পরিবারের সহায় সম্পত্তি দখল করেছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। জালাল বর্তমানে যে বাড়ীতে বসবাস করছে ওই বাড়ীটি অত্র এলাকার তৎকালীন সময়ের প্রখ্যাত সমাজ সেবক বিভূতি ভূষন সেনের ছিল। সে রাতের আধারে  সেনবাড়ীর সবাইকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে বাড়ীটি দখল করে  নিয়েছে বলে রশিদ খান জানান। ওই বাড়ীটি যুদ্ধকালিন সময় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রথম ক্যাম্প ছিল।  জালাল একজন ডিগ্রীবাজ, সে ডিগ্রি করে বহু মানুষের সম্পত্তি আত্মসাৎ করেছে বলে তিনি জানান। রশিদ মাষ্টার আরো জানান, সুচতুর জালাল সব সময় নিজেকে সরকারি দলের লোক পরিচয় দিয়ে নানা অপকর্মে লিপ্ত থাকে।

বিগত ৪ দলীয় জোট ( বিএনপি) ক্ষমতা গ্রহনের পর নলচিড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের লাইব্রেরীতে এবং নলচিড়া বাজারে অবস্থিত সোনালী ব্যাংকে টাঙ্গানো জাতির জনকের ছবি নামিয়ে পদদলিত করে অগ্নি সংযোগ করে। পরবর্তিতে আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর সে পূনরায় বোলপাল্টিয়ে এই দলে যোগ দেয়। তিনি ক্ষোভের সাথে জানান,আওয়ামীলীগ নেতাদের ম্যানেজ করে রাজাকার জালালের পুত্র মেহেদী হাসান সুজন নলচিড়া ইউনিয়ন ছাত্রীগের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছে। তাদের অত্যচারে এলাকাবাসী অতিষ্ট বলে তিনি জানান।

অভিযোগের ব্যাপারে জালাল হাওলাদারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি তার বিরুদ্ধে আনীত সবকটি অভিযোগই সম্পূর্ণ মিথ্যা বানোয়াট ও উদ্দেশ্য প্রনোদিত বলে উল্লেখ করেন। তিনি জানান, আমি রাজাকার কমান্ডার ছিলাম বটে, তবে যুদ্ধকালিন সময়ে পাক সেনাদের ৩০টি অস্ত্র ও বিপুল পরিমান গোলবিারুদ নিয়ে পালিযে এসে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার নিজামের হাতে জমা দিয়ে আত্মসমর্পন করি। পরবর্তিতে বাটাজোরসহ বিভিন্নস্থানে মুক্তিবাহিনীর সাথে একত্রিত হয়ে পাকসেনাদের বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধে অবতীর্ণ হই। বাটাজোর থেকে ৩ জন পাকসেনাকে সশস্ত্র অবস্থায় ধরে এনে নিজাম উদ্দিনের কাছে সোপর্দ করি। তিনি নিজেকে একজন মুক্তিযোদ্ধা দাবী করে জানান,স্বাধীনতা পরবর্তি ১৯৭৩সালে আমি কর্ণেল ওসমানীর প্রদত্ত মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট নিয়ে সোনালী ব্যাংকের নিরাপত্তা কর্মী পদে চাকুরী পাই। দীর্ঘ ৩২ বছর যাবত একনাগারে চাকুরী করার পর ২০০৫ সালে অবসর গ্রহন করি। আমার বিরুদ্ধে যারা অভিযোগ করেছে তাদের সাথে র্দীর্ঘদিন যাবত জমাজমি নিয়ে আমার বিরোধ চলছে, এ নিয়ে আদালতে বহু মামলা মোকাদ্দমাও চলছে। আমি নই, রশিদ মাষ্টারসহ স্থানীয় কয়েক ব্যাক্তি আমাকে নানাভাবে একের পর এক হয়রানী করছে বলে তিনি জানান।

আরও পড়ুন

মন্তব্য করুন

Back to top button
Translate »