আর্কাইভ

ড. ইউনূসকে লেখা খন্দকার মোজাম্মেল হকের চিঠি

খন্দকার মোজাম্মেল হক তখন ছিলেন ব্যাংকটির মহাব্যবস্থাপক। ২০০৩ সালে অবসরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনার নানা সংকট চিহ্নিত এবং সেগুলোর প্রতিকার চেয়ে তিনটি দাপ্তরিক চিঠি দিয়েছিলেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে। ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে ব্যাংকটির অস্তিত্ব বিপন্ন হবে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন তিনি। সেসব চিঠির একটি (২০০০ সালের ১ জানুয়ারিতে লেখা) সংযোজিত হয়েছে রিভিউ কমিটির প্রতিবেদনের সঙ্গে। চিঠিটি নিচে হুবহু প্রকাশ করা হলো।

জনাব
বিগত ৬ জুলাই, ১৯৯৭ সালে আপনাকে আমি একটি মেমোর মাধ্যমে গ্রামীণ ব্যাংকের বিভিন্ন সংকটের কথা অবহিত করেছিলাম (কপি সংযুক্ত) ! উক্ত মেমোতে নিম্নলিখিত মন্তব্য করেছিলাম। "Your recent decision to officially allow loan adjustments at the borrower level will have adverse on the financial sustainability of the Bank. The repayment rate will look good for about eighteen months and all of a sudden, the deteriorating repayment problem would resurface at a much higher level. If that happens the bank will not be able to meet its internal and external financial obligations i.e. staff salaries, pension benefits or external debt servicing amounting to about US Dollars 100 million, which is guaranteed by the Bangladesh government."

আমি আশা করেছিলাম যে মেমোতে উত্থাপিত বিষয়গুলো নিয়ে আপনি আপনার সিনিয়র সহকর্মীদের নিয়ে আলাপ-আলোচনা করে গ্রামীণ ব্যাংককে বিদ্যমান সংকট থেকে উত্তরণের পদক্ষেপ নেবেন। দুঃখের বিষয় যে, আপনি তা করেননি। কারণ ব্যাংকের এত সংকটের মধ্যেও আপনি মাসে গড়ে ১২ দিন অর্থাৎ বছরে প্রায় ১৩০ দিন দেশেই থাকেন না। নভেম্বর, ১৯৯৯ সালে আপনার পক্ষে মাত্র তিন দিন ব্যাংকে আসা সম্ভব হয়েছে। ক্ষমতা এবং দায়িত্ব হস্তান্তরের ক্ষেত্রে আপনার আপারগতা গ্রমীণ ব্যাংককে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছে। যেহেতু আপনার অনুপস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিভিন্ন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা থাকলেও কার্যত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নেই। তার কারণ আপনি ইতিমধ্যেই ব্যাংক ব্যবস্থাপনার ঈযধরহ ড়ভ পড়সসধহফ-এর ভারসাম্য নষ্ট করেছেন এবং নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছেন। উপরন্তু আপনি বছরে চার মাস যেসব উদ্দেশ্যে বিদেশ সফর করেছেন, তাতে আপনার ব্যক্তিগত লাভ ও প্রচার বাড়ছে, কিন্তু ব্যাংকের কোনো লাভ হচ্ছে না বরং ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। আপনার খ্যাতি ও প্রতিপত্তি এমন একপর্যায়ে এসেছে যে আপনি কোনো প্রকার জবাবদিহিতার অনেক উপরে অবস্থান করছেন। জুলাই, ১৯৯৭ সালের মেমোতে আমি যেসব সংকটের কথা উল্লেখ করেছিলাম, সেসব সংকট আরো ঘনীভূত হয়েছে, যার কারণে বর্তমানে গ্রামীণ ব্যাংকের অস্তিত্ব বিপন্ন হওয়ার সম্মুখীন।

নভেম্বর ১৯৯৯ সালে আদায়যোগ্য ঋণের পরিমাণ এক হাজার ৩৮২ কোটি টাকা। সাধারণ (২০% সব ঋণ) ১০৮২ কোটি এবং গৃহ ৩০০ কোটি। সাধারণ ঋণের মেয়াদ উত্তীর্ণ ঋণের পরিমাণ প্রায় ৩০০ কোটি টাকা।

পাঁচ বছর পূর্ণ হয়েছে অথচ গৃহ ঋণের অর্ধেক টাকা পরিশোধও হয়নি এমন ঋণীর সংখ্যা ২৮০০০ এবং টাকার পরিমাণ ২৬ কোটি। ১০ বছর পূর্ণ হয়েছে অথচ পূর্ণ পরিশোধ করেননি এমন ঋণীর সংখ্যা প্রায় সাত হাজার এবং টাকার পরিমাণ প্রায় দুই কোটি ৫০ লাখ।

গত ১১ মাসে আদায়যোগ্য ঋণ হ্রাস পেয়েছে প্রায় ১৭৫ কোটি টাকা। এর ফলে ২৭ কোটি টাকা আয় কম হবে। প্যাকেজ কর্মসূচির আওতায় বিশেষ করে সেপ্টেম্বর, ১৯৯৭-আগস্ট, ১৯৯৯ সময়ের মধ্যে প্রায় তিন লাখ ৫০ হাজার ঋণীর কাছ থেকে প্রায় ৫৪ কোটি টাকা আদায় করে প্রায় দুই লাখ ৭০ হাজার ঋণীর কাছে প্রায় ১৩৬ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে।

১৯৯৮ সালে ব্যাংকের আয় ২২৭ কোটি টাকা এবং ব্যয় ২১৭ কোটি। ১৯৯৯ সালে ব্যাংকের আয়-ব্যয় যথাক্রমে ২৪১ এবং ২৪২ কোটি টাকা।
১৯৯৯ সালে প্রভিশন কম দেখিয়ে (২০% এর স্থলে ৪০% এবং পেনশন খাতে ৬০% এর স্থলে ৩০%) লোকসান এড়ানো হয়েছে।

১৯৯৫ সালে গ্রামীণ ব্যাংকের আর্থিক এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার চরম অবনতির যে বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল, অদ্যাবধি সে অবস্থার কোনো উন্নতি বাস্তবে সম্ভব হয়নি, বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা বিস্তার ঘটে জটিল আকার নিয়েছে।

ঋণ সমন্বয় প্রসঙ্গে
আমরা সবাই অবগত আছি যে, ১৯৯৩-৯৪ সালে অর্থনৈতিক শৃঙ্খলার প্রতি লক্ষ না রেখে লাগামহীনভাবে আপনার সরাসরি উৎসাহ ও নির্দেশে ঋণ বিতরণ করা হয়েছে।
আমাদের প্রকৃত ঋণ আদায়ের হার বর্তমানে ৬৫ শতাংশের বেশি নয়। অর্থাৎ ১০০ টাকা বিনিয়োগ করে যেখানে আমাদের ১২০ টাকা পাওয়ার কথা সেখানে আমরা পাচ্ছি মাত্র ৬৫ টাকা। আমাদের ২০ শতাংশের সব ঋণের স্থিতি বর্তমানে এক হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণের পরিমাণ প্রায় ২৭০ কোটি টাকা এবং আগামী তিন মাসে আরো ৩০ থেকে ৪০ কোটি টাকা মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ দেড় লাখ সদস্য ৩৮ সপ্তাহের মধ্যে অর্ধেক পরিমাণ ঋণও পরিশোধ করতে পারেনি।
বর্তমানে ব্যাংকে অনাদায়ী সুদের পরিমাণ ১৭০ কোটি টাকা। (যা কি না আয় হিসেবে আমরা আগেই দেখিয়ে দিয়েছি)। এবং এই বছরে ৩১ ডিসেম্বরে বার্ষিক সুদ-চার্জ করার পর অনাদায়ী সুদের পরিমাণ ২১০ কোটি টাকা অতিক্রম করার আশঙ্কা আছে।
বর্তমানে ব্যাংকের দায়-দেনার পরিমাণ এক হাজার ১০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে বৈদেশিক দেনার পরিমাণ প্রায় ৫০০ কোটি টাকা, যা ২ শতাংশ হারে আগামী ১০ বছরে ডলারের মূল্যমানে পরিশোধ করতে হবে। আর প্রায় ৫০০ কোটি টাকা দেশীয় বিভিন্ন সংস্থাকে পরিশোধ করতে হবে আগামী এক থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে, যার সুদের হার গড়ে ৮ শতাংশ।
এ ছাড়া উল্লেখ্য যে, গ্রামীণ ব্যাংক জন্মলগ্ন থেকে অর্থাৎ ১৯৭৬ সাল থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত এই ১৫ বছরে যে পরিমাণ ঋণ বিতরণ করেছিল একমাত্র ১৯৯২ এবং ১৯৯৩ সালে দুই বছরেই প্রায় সেই পরিমাণ ঋণ বিতরণ করা হয়েছে; যার কারণ বিশ্লেষণ আবান্তর। আরো উল্লেখ্য, আপনি জুলাই ১৯৯৮ সালে এক সাক্ষাৎকারে অভিমত দেন, গ্রামীণ ব্যাংকের বয়স বেড়েছে এবং এটি একটি অদক্ষ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশে নতুন এবং সবল প্রতিষ্ঠানের সৃষ্টি হবে এবং তারা গ্রামীণ ব্যাংককে ছাড়িয়ে যাবে। এ ধরনের ভবিষ্যদ্বাণীতে আশার না ভীতির কথা বলা হয়েছে, তা অস্পষ্ট।
বিভিন্ন কারণে গ্রামীণ ব্যাংকের কর্মীরা এখন প্রচণ্ডভাবে হতাশা এবং আস্থাহীনতায় ভুগছেন। তাঁরা নিজেদের ভবিষ্যৎ এবং নিরাপত্তা নিয়ে ভীষণভাবে উদগ্রিব এবং শঙ্কিত।
ব্যাংকের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে কর্মীরা অবহিত নন। আমাদের বাৎসরিক বেতন, ভাতা ও বোনাসবাবদ ব্যয় বর্তমানে প্রায় ১১০ কোটি টাকা। গ্রামীণ ব্যাংকেরই বিগত পাঁচ বছরে আপনি যে সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছেন তা থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে অনেক কঠিন কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অর্থাৎ ব্যাংক এবং অঙ্গপ্রতিষ্ঠানগুলোর সামগ্রিকভাবে কাঠামোর পুনর্বিন্যাস করতে হবে এবং এ ধরনের পুনর্বিন্যাস করার জন্য ব্যাংকের সবপর্যায়ে আলোচনা ও মতবিনিময় করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারণ মাঠপর্যায়ের কর্মীরা এখনো পরিস্থিতির ভয়াবহতা সম্পর্কে ভালোভাবে অবহিত নন। তাঁরা শুধু জানেন যে, ব্যাংকের সংকটের প্রধান কারণ লাগামহীনভাবে ঋণ বিতরণ করা হয়েছে, যেকোনো মূল্যে ব্যাংকের আদায়ের হার ভালো দেখানোর জন্য এবং সহকর্মীরা সবাই জানেন যে, অনিয়মের মাধ্যমে ঋণ পরিশোধের হার বাড়ানো হলে তার পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহ হয় এবং গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষেত্রে ঠিক তাই ঘটেছে। অর্থনৈতিক শৃঙ্খলনার প্রতি অবজ্ঞা করে কেন ঋণ পরিশোধের হার বাড়াতে হবে তার কোনো সুষ্ঠু ব্যাখ্যা কোথাও থেকে পাওয়া যাচ্ছে না।

ব্যাংক-কর্মীদের বর্তমান অবস্থান
১৯৯৭ সালে আনসার ভিডিপি ব্যাংকে এবং ১৯৯৮ সালে কর্মসংস্থান ব্যাংকে যত কর্মকর্তা চাকরির জন্য আবেদন করেছেন (যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমসহ) তার ৯০ ভাগই গ্রামীণ ব্যাংকের কর্মী ছিল। এত জন কর্মী একসঙ্গে প্রতিষ্ঠান ছেড়ে চলে যেতে চাচ্ছেন সে কারণে কর্তৃপক্ষ উদ্বিগ্ন নয় এবং এর কারণগুলোও অনুসন্ধান করার প্রয়োজন বোধ করছেন না। এ ছাড়া অনেকের ধারণা, যদি বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ আসে তবে গ্রামীণ ব্যাংকের প্রায় ৭০ ভাগ কর্মী (যাদের চাকরির বয়স ১০ বৎসর পূর্ণ হয়েছে) প্রতিষ্ঠান ছেড়ে যাবে। স্মরণ করা প্রয়োজন ১৯৯০-৯১ সাল পর্যন্ত তুলনামূলকভাবে অনেকেই ভালো চাকরির প্রস্তাব পাওয়া সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠান ছেড়ে চলে যাননি বরং আসতে চাইতেন অনেকে। কিন্তু অল্প সময়ের ব্যবধানে আজ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বিপরীত, ভিন্ন চিত্র।

ব্যাংক ব্যবস্থাপনা ও পদোন্নতি প্রসঙ্গে
১৯৯৯ সালের মধ্যেই আমাদের মোটামুটিভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন যে, ২০০৫ সালে ব্যাংকের ম্যানেজমেন্ট কাঠামো কী হবে? অর্থাৎ কোন পদে কতজন লোকের প্রয়োজন হবে? ২০০৫ সালে ব্যাংকের কাঠামো ২০০৩ সালে কী দাঁড়াবে সেজন্য প্রস্তুতি এখন থেকেই নিতে হবে। এবং সবাই জেনে যাবে যে, উচ্চতর পদ ও দায়িত্ব পাওয়ার সুযোগ কতখানি আছে এবং সে ভিত্তিতেই মোটামুটি সবাই মানসিক প্রস্তুতি নেবেন। বর্তমান ব্যবস্থাপনায় পদোন্নতির ব্যাপারেই হোক আর বদলির ব্যাপারেই হোক কারো কোনো প্রকার মানসিক প্রস্তুতি নেওয়ার সময় ও সুযোগ নেই, যার কারণে অহেতুকভাবে হতাশার সৃষ্টি হয়।
আমাদের আরো একটি সিদ্ধান্ত যে, কমপক্ষে তিন বছর সফলভাবে শাখা ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব পালন না করতে পারলে অফিসার থেকে সিনিয়র অফিসারের পদোন্নতি দেওয়া হবে না। এটা বাস্তবসম্মত নয়। প্রমোটি অফিসাররা ভবিষ্যতে শাখা পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ার প্রকৃতপক্ষে কোনো সুযোগই পাবেন না। কারণ এখন প্রায় ১৭৫ প্রিন্সিপাল অফিসার শাখার দায়িত্বে এবং সরাসরিভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত এমএ পাস অফিসারদের বাদ দিয়ে পদোন্নতিপ্রাপ্ত অফিসারদের শাখা ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব পালন করার সুযোগ দেয়ারও কোনো সুযোগ নেই। এ ক্ষেত্রে আমাদের একটি সুনির্দিষ্ট যোগ্যতার মাপকাঠি নির্ধারণ করে প্রতিবছর ব্যাংকের কাঠামো এবং প্রয়োজনের দিকে লক্ষ রেখে সীমিতসংখ্যক যোগ্য প্রার্থীকে পদোন্নতি দিতে হবে। এ প্রস্তাবের সঙ্গেও ২০০৫ সালের ব্যাংকের কাঠামো কী দাঁড়াবে তা ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
বর্তমানে আমরা আমাদের চিন্তা এবং দর্শন থেকে বিভিন্ন কারণে দূরে সরে এসেছি। এটা বিশেষভাবে লক্ষ করা যায় গ্রামীণ ব্যাংকের প্রায় সব অঙ্গপ্রতিষ্ঠান গ্রামীণ ব্যাংকের কর্মীদের দ্বারাই পরিচালিত হয়েছে এবং একপর্যায়ে তাদের ব্যাংকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। এটা সিনিয়র ম্যানেজমেন্টের বেলায়ই প্রযোজ্য। অবসরপ্রাপ্ত আমলাদের দ্বারা গ্রামীণ ব্যাংক সৃষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্দেশ্য ও আদর্শের বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তা ছাড়া আপনি সব প্রতিষ্ঠানের এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যানের (নির্বাহী সভাপতি) দায়িত্ব পালন করার ফলে গ্রামীণ ব্যাংক তো দূরের কথা অন্য সব প্রতিষ্ঠানকেও যে ধরনের সময় ও দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন তা দেওয়া হচ্ছে না। যার ফলে ঈড়হভষরপঃ ড়ভ রহঃবৎবংঃ একটা বিশেষ আতঙ্ক ও অস্বস্তিকর ব্যাপারের উদ্ভব হয়েছে যা নিরসন করা অত্যন্ত প্রয়োজন। সাবেক আমলাদের বোর্ডের সভাপতি করা যেতে পারে কিন্তু প্রধান নির্বাহী করা ঠিক হবে না। বরং অঙ্গপ্রতিষ্ঠানগুলোতে গ্রামীণ সিনিয়র লেভেলের ম্যানেজমেন্ট থেকে তিন বছর অথবা একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য ডেপুটেশনে যেতে পারেন এবং এমন ভাবে পরিকল্পনা নিতে হবে যাতে প্রতিবছর এক-তৃতীয়াংশ ফেরত আসবেন এবং নতুন ব্যাচ তাদের জায়গায় যাবেন। এতে করেই সিনিয়র ম্যানেজমেন্টদের বিভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা ব্যাংকের স্টাফ ডেভেলপমেন্ট কর্মসূচির জন্য সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
সার্ভিস কলের অনিয়ম প্রসঙ্গে
বিগত ১০ বছরে গ্রামীণ ব্যাংকের বিভিন্ন পলিসির কারণে অনেক ছেলেমেয়ের ক্যারিয়ার নষ্ট হয়ে গেছে। অধিকাংশেরই কোনো মতামত ছাড়াই নির্বাহী ক্ষমতার বলে গ্রামীণ ব্যাংকের বিভিন্ন অঙ্গপ্রতিষ্ঠানে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য ডেপুটেশনে পাঠানো হয়েছে। বহু দিন অন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ করার পর আবার বলা হয়েছে, গ্রামীণ ব্যাংক থেকে বহু দিন অনুপস্থিত থাকার কারণে তাঁরা গ্রামীণ ব্যাংকে কাজ করার অনুপযুক্ত হয়ে পড়েছেন। তাঁদের আর ফিরিয়ে আনা যাবে না। এ নীতি অত্যন্ত অন্যায় ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল।
অনেক সহকর্মীকে আমরা ব্যাংকের স্বার্থে ও প্রয়োজনে দীর্ঘ ১২-১৪ বছর বদলি করিনি। এখন হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বিশেষ করে প্রধান কার্যালয় থেকে সবাইকে বদলি করা হবে। তাঁদের বেশিরভাগই মহিলা। যদি কোনো ব্যক্তিকে দীর্ঘ ১০-১২-১৪ বছর বদলি না করা হয়, তবে তাঁর এবং তাঁর পারিবারিকজীবন একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আবর্তিত হতে থাকে। ফলে হঠাৎ করেই ছয় মাসের নোটিশে তাদের বদলি করা হলে অধিকাংশই চাকরি ছেড়ে চলে যাবেন এবং তাঁর বিশেষ ধরনের দক্ষতার সেবা থেকে ব্যাংক বঞ্চিত হবে। এ ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে কোনো প্রকার দীর্ঘমেয়াদি কর্মী ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনার অভাবে। উল্লিখিত কারণের জন্য যাঁরা গ্রামীণ ব্যাংক ছাড়তে বাধ্য হবেন তাঁদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা গ্রামীণ ব্যাংকের নৈতিক দায়িত্ব বলে আমি মনে করি। আমার ধারণা গ্রামীণ ব্যাংক অঙ্গসংগঠনগুলোর জন্য নির্বিচারে বাইরে থেকে লোক নিয়োগ না করে তাঁদের সুযোগ দিলে অপেক্ষাকৃত সততা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবেন বলে আমার বিশ্বাস। কারণ আমরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমাদের সহকর্মীদের সেভাবেই গড়ে তুলেছি।
গ্রামীণ ব্যাংকের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন
এটা লক্ষণীয় যে, ক্রমশই বাংলাদেশের একটি বিশেষ অঞ্চল/জেলার লোকজন গ্রামীণ ব্যাংক ও তার অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের নীতিনির্ধারণ ও পরিচালনায় বিশেষ ভূমিকা রাখছে। তাঁদের অনেকের যোগ্যতা, নিরপেক্ষতা এবং আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
গ্রামীণ ব্যাংক মে, ১৯৯৭ সালে গ্রামীণ কল্যাণের সঙ্গে একটি চুক্তি সম্পাদিত করে, যা ৩১ ডিসেম্বর ১৯৯৬ সাল থেকে বলবৎ করা হয়। এই চুক্তির ক্ষেত্রে গ্রামীণ ব্যাংকের মালিকরা বিভিন্ন দাতা সংস্থা থেকে অনুদান হিসেবে প্রায় ৩৯০ কোটি টাকা পান, সমুদয় অর্থ গ্রামীণ ব্যাংকের একটি ঘূর্ণায়মান তহবিল (রিভলবিং ফান্ড) থেকে সদস্য/সদস্যদের ঋণ কর্মসূচিকে ক্রমাগত ব্যবহার করার লক্ষ্যেই মূলত দেওয়া হয়েছিল। এবং এক অর্থে এটাকে ব্যাংক ইক্যুইটি হিসেবে দেখানো হলে ব্যাংকের আর্থিক ভিত অনেক মজবুত দেখাবে। গ্রামীণ ব্যাংকের মালিকরা তাঁদের অনুদানে পাওয়া রিভলবিং ফান্ড প্রথম গ্রামীণ ব্যাংক সৃষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানকে উপহার/দান হিসেবে দেয়। যে প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পরিষদে গ্রামীণ ব্যাংকের সদস্য/সদস্যাদের কোনো প্রকার প্রতিনিধিত্ব নেই, এবং এই উপহার/দানের অর্থ আবার গ্রামীণ ব্যাংকের মালিকরা উক্ত প্রতিষ্ঠান থেকে ধার নেন। যদিও এ ধার পরিশোধের কোনো সময়সীমা বা সুদের হারের কোনো উল্লেখ নেই। এই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় অনেকেই এখন প্রশ্ন করবেন যে গ্রামীণ ব্যাংকের প্রায় ২২ লাখ শেয়ার হোল্ডার আসলেই কি ব্যাংকের মালিক? নাকি জনগণ যেভাবে দেশের মালিক তারাও সেভাবে ব্যাংকের মালিক? দাতা সংস্থা থেকে এভাবে কেন ধার নেওয়া হলো এবং তা চুক্তির পরিপন্থী, এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে গ্রামীণ ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী হিসেবে আপনি দাতা সংস্থাকে জানিয়েছেন যে, গ্রামীণ ব্যাংক এত বড় অঙ্কের টাকা দক্ষতার সঙ্গে ম্যানেজ করতে পারবে না। গ্রামীণ ব্যাংকের সৃষ্ট অঙ্গ প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ কল্যাণ এটা দক্ষতার সঙ্গে ম্যানেজ করতে পারবে। যদিও ব্যাখ্যা করা হয়নি যে গ্রামীণ কল্যাণের কী ধরনের বাড়তি দক্ষতা আছে_যেটা গ্রামীণ ব্যাংকের নেই।
১৯৯৮ সালে প্রথমবারের মতো সরকার গ্রামীণ ব্যাংকে অডিট করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশ দেয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের অডিট রিপোর্টে বলা হয় যে, গ্রামীণ ব্যাংক কেবল ভূমিহীন ও বিত্তহীনদের আহরিত তহবিল থেকে ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ করতে পারে। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই গ্রামীণ ব্যাংক কোনো প্রতিষ্ঠানকে ঋণ প্রদান করতে পারে না। কাজেই গ্রামীণ ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঋণ প্রদান গ্রামীণ ব্যাংক অধ্যাদেশ ১৯৮৩-এর ১৯ নং ধারার লঙ্ঘন বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অডিট রিপোর্ট গ্রামীণ ব্যাংকের বেশ কয়েকজন সিনিয়র ম্যানেজমেন্টের কাছ থেকে গোপন রাখা হয়েছে এবং খুব সম্ভবত গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকেও এ অডিট রিপোর্ট সম্পর্কে অবহিত করা হয়নি।
উপরে বর্ণিত বিষয়গুলোর প্রেক্ষাপটে আগামী দেড় বছর আপনাকে একান্তভাবে গ্রামীণ ব্যাংকের কার্যক্রমের প্রতি বিশেষভাবে দৃষ্টি ও সময় দিতে হবে। গ্রামীণ ব্যাংক সৃষ্ট অঙ্গসংগঠনগুলো কিভাবে পরিচালিত হলে সামগ্রিক অর্থে গ্রামীণ ব্যাংকের সদস্যদের তথা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য নিরসনে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে, তা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। এই পরিপ্রেক্ষিতে এটাও সুস্পষ্ট হয়ে যাওয়া প্রয়োজন যে, আপনি ব্যক্তি না পদাধিকারবলে চেয়ারম্যান হিসেবে ভূমিকা পালন করবেন_যার ওপর নির্ভর করছে সৃষ্ট সমস্যার সমাধান।
আপনার অবসর গ্রহণ প্রসঙ্গে
আপনার পক্ষে আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে গ্রামীণ ব্যাংক থেকে অবসর নেওয়া সম্ভব হবে না। কারণ_
ক. গ্রামীণ ব্যাংক এখন প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিকভাবে দারুণ সংকটের সম্মুখীন এবং এই সংকট থেক উত্তরণের কোনো ম্যাজিক ফর্মুলা নেই। এখন থেকে শক্ত হাতে হাল ধরলে তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে ৫০ থেকে ৬০ সমস্যা থেকে উত্তরণ পাওয়া যেতে পারে।
খ. আপনার পারিবারিক ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান প্যাকেজেস করপোরেশনে বিনিয়োগকৃত সুদ-আসলে প্রায় দুই কোটি টাকা। আপনার পরিবারের পক্ষে আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে পরিশোধ করা সম্ভব নাও হতে পারে। যদিও গ্রামীণ ব্যাংকের অধিকাংশ ছাপার কাজ অনেকের মধ্যে বাজার মূল্যের প্রায় ৪০ শতাংশ ঊর্ধ্ব ধরে কোনো প্রকার টেন্ডার ছাড়া আপনাদের পারিবারিক প্রতিষ্ঠান প্যাকেজেস করপোরেশনকে দিয়ে ছাপানো হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ছাপার গুণগত মান গ্রহণযোগ্য পর্যায়ের নিচে থাকা সত্ত্বেও গ্রামীণ ব্যাংককে তা গ্রহণ করতে হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো সময়েই প্যাকেজেস করপোরেশনের সঙ্গে আপনার সম্পর্কের আর্থিক লেনদেন নিরীক্ষণ করলে আপনার এবং গ্রামীণ ব্যাংকের জন্য তা অত্যন্ত অস্বস্তিকর ও লজ্জার ব্যাপার হবে।
গ. গ্রামীণ কল্যাণকে ৩৯০ কোটি টাকা উপহার দিয়ে আবার গ্রামীণ কল্যাণ থেকে সমপরিমাণ টাকা ঋণ হিসেবে দেখিয়ে গ্রামীণ ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ সরিয়ে ফেলা হয়েছে। যেকোনো নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক এই চুক্তির আইনগত ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন। কেননা এই লেনদেনের আইনগত কোনো ভিত্তি নেই বললেই চলে।
পরিশেষে বিশ্বব্যাপী মাইক্রোক্রেডিটের প্রেক্ষাপটে গ্রামীণ ব্যাংক পতাকাবাহী জাহাজ। এই গুরুত্ব অনুধাবন করেই আমাদের বিশেষভাবে সচেষ্ট হতে হবে। নইলে মাইক্রোক্রেডিটের কনসেপ্ট বিপন্ন ও পরিত্যক্ত হলে তার জ্বলন্ত উদাহরণ হবে গ্রামীণ ব্যাংক, তা কারোরই কাম্য নয়।

প্রাপক
ড. মুহাম্মদ ইউনূস
ব্যবস্থাপনা পরিচালক
গ্রামীণ ব্যাংক

প্রেরক
খন্দকার মোজাম্মেল হক
মহাব্যবস্থাপক
গ্রামীণ ব্যাংক
তারিখ : ১ জানুয়ারি, ২০০০ইং

আরও পড়ুন

Back to top button
Translate »