আর্কাইভ

বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে চান বিল গেটস

গ্রিন টেকনোলজি (সবুজ প্রযুক্তি) ব্যবহারের সুবিধা পেতে ঝুঁকিপূর্ণ অর্থনীতির দেশগুলোকে পর্যাপ্ত তহবিলের জোগান দেয়ার জন্য শিল্পোন্নত দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী গতকাল সোমবার জেনেভায় আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও)’র ১৬তম কংগ্রেসের একটি অধিবেশনে ভাষণকালে এ আহ্বান জানান। 

 

 প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে জেনেভায় ১৬ মে সোমবার ১৬তম বিশ্ব আবহাওয়া কংগ্রেসে ভাষণ দেন।
 

প্রধানমন্ত্রী বলেন, গ্রিন টেকনোলজি ব্যবহারের ব্যয় নির্বাহে এই তহবিল পর্যাপ্ত, স্থায়ী ও সহজলভ্য হওয়া অপরিহার্য। উন্নত দেশগুলোর প্রতি জলবায়ু মোকাবেলা তহবিলের কার্যক্রম দ্রুত শুরু করার আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ঝুঁকি ও জনসংখ্যার হারের ভিত্তিতে এই তহবিলের জোগান ওডিএর চেয়ে বেশি হওয়া জরুরি। এর আগে তিনি সম্মেলন কেন্দ্রে পৌঁছলে ডব্লিউএমও মহাসচিব মাইকেল জাররাউড তাকে ভিআইপি গেটে অভ্যর্থনা জানান।
সংস্থার বিদায়ী সভাপতি ড. আলেকজান্ডার বেদরিকির সভাপতিত্বে অধিবেশনে আরো বক্তব্য রাখেন সংস্থাটির প্রথম সহ-সভাপতি আলি মোহাম্মদ নূরীয়ান, দ্বিতীয় সহ-সভাপতি টাইরোন সুথারল্যান্ড ও তৃতীয় সহ-সভাপতি এ্যান্টনিও ডিভিনো মৌরা। এসময় বিভিন্ন সদস্য দেশ ও ভূখণ্ডের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানরা এবং মন্ত্রীবর্গ কংগ্রেসের উচ্চ পর্যায়ের এই অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের দৃশ্যমান ভয়াবহতার প্রেক্ষাপটে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন বন্ধে বাধ্যবাধকতাপূর্ণ চুক্তি প্রণয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি বলেন, বর্তমানে কিছু কিছু দেশ জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে। আগামীতে গোটা বিশ্বকে এই সমস্যার মুখে পড়তে হবে। এ অবস্থায় এই গ্রহ ও আমাদের রক্ষার জন্য গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাসে সম্মিলিত কর্মপন্থা গ্রহণের বিকল্প নেই। শেখ হাসিনা বলেন, সকল দেশের অংশগ্রহণে ন্যায্যতা ও বাস্তবতার ভিত্তিতে নির্গমন হ্রাস হতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বিশ্ব নেতৃবৃন্দের প্রতি আগামী প্রজন্মের জন্য নিরাপদ বিশ্বের অঙ্গীকারের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় তাদেরকে ক্ষুদ্রস্বার্থ পরিহার করতে হবে।

 
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে জেনেভায় ১৬ মে সোমবার মাইক্রোসফট্‌ কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান বিল গেইটস্‌ সাক্ষাত করেন।
 
রিও সম্মেলন এবং কোপেনহেগেন ও কানকুনের ব্যর্থতার পর কিয়োটো প্রোটোকল ও বালি প্ন্যান অব অ্যাকশন প্রণয়নে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠায় বিশ্ব নেতৃবৃন্দের সাফল্যের কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ডারবানে তাদের সুযোগ হাতছাড়া করা উচিত হবে না।
আবহাওয়ার পূর্বাভাষের ক্ষেত্রে সমতা বৃদ্ধি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তথ্য সম্পৃক্তকরণে ব্যবহারকারীদের সহায়তা প্রদানের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, গ্লোবাল ফ্রেমওয়ার্ক ফর ক্লাইমেট সার্ভিসেস (জিএফসিএস)’র কার্যক্রম বৈশ্বিক, আঞ্চলিক ও জাতীয় পর্যায়ে পরিচালনার প্রয়োজন রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশের ঝুঁকির পরিধি ও ব্যাপকতার উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনে বাংলাদেশের ভূমিকা খুবই নগণ্য হলেও বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে দেশটি সর্বাধিক ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও মরুকরণের ফলে বিগত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশ বন্যা, নদী ভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্পের পদধ্বনি, জলোচ্ছ্বাস ও নিম্ন উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধির মতো বিপর্যয়কর প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রত্যক্ষ করছে। তিনি বলেন, এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাংলাদেশের মানুষের খাদ্য, পানি ও স্বাস্থ্য নিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্য, পরিবেশের ভারসাম্য এবং জীবন যাত্রার ধরন ও উপার্জনের ক্ষেত্রে হুমকির সৃষ্টি করছে।
 
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে জেনেভায় ১৬ মে সোমবার ইউএনএইড এর নির্বাহী পরিচালক মাইকেল সিডিব সাক্ষাত করেন।
 

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশ বন্যা ব্যবস্থাপনা প্রকল্প, নদীর তীর সংরক্ষণ, ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ, ভূমি উদ্ধার ও সড়ক উঁচুকরণের মতো বিভিন্ন খাতে এক হাজার কোটিরও বেশি মার্কিন ডলার ব্যয় করেছে। উন্নয়ন খাতের জন্য বরাদ্দ তহবিলের অর্থ সরিয়ে এসব করা হয়েছে। এজন্য উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও এমডিজি অর্জনের গতি শ্লথ হয়েছে। তবুও বিগত দশকে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৬ শতাংশ এবং বাংলাদেশ ২০১৫ সালের মধ্যে এমডিজি অর্জনের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। শেখ হাসিনা বলেন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে এদেশের জনগণের নিষ্ঠা, দৃঢ়তা ও কঠোর পরিশ্রমের কারণেই এটা সম্‌ভব হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার উদ্যোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, তার দেশ এ লক্ষ্যে ১৩৪ দফা কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা না থাকলেও নৈতিক দায়িত্ববোধ থেকে আমরা এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছি। এছাড়া বাংলাদেশ তার প্রচলিত কৃষি ব্যবস্থার পরিবর্তন, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপখাইয়ে ফসল উৎপাদন ও কার্বন গ্রহণের বিশাল ক্ষেত্র গড়ে তুলতে ২০১৫ সালের মধ্যে মোট ভূমির ২০ শতাংশ বনায়নের আওতায় নিয়ে আসা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির উন্নয়নে কাজ করছে।
এ প্রসঙ্গে তিনি জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নদী খনন, বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে উপকূলীয় অঞ্চল সুরা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর পরিধি বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মতো বিভিন্ন কর্মসূচির উল্লেখ করেন।

 
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে জেনেভায় ১৬ মে সোমবার ইউএন ট্রেইড এন্ড ডেভেলপমেন্ট এর সেক্রেটারি জেনারেল সুপাচাই সাক্ষাত করেন।
 

শেখ হাসিনা বলেন, কারো সাহায্যের অপেক্ষায় না থেকে বাংলাদেশ ২০ কোটি মার্কিন ডলারের জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করেছে।
এছাড়া প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল হলেও উন্নয়ন অংশীদারদের সহায়তায় একটি ’মাল্টি-ডোনার ট্রাস্ট ফান্ড’ গঠন করা হয়েছে। বৈজ্ঞানিক সমীক্ষার উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা ১ মিটার বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশের এক-পঞ্চমাংশ তলিয়ে যাবে এবং ২ কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হবে। এর ফলে অনিবার্যভাবে নগরগুলোতে অভিবাসন অনেক বেড়ে যাবে এবং এতে জীবনযাত্রা, জীববৈচিত্র্য, খাদ্য, পানি ও স্যানিটেশন ও মূল অবকাঠামোর ওপর প্রভাব পড়বে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ধরনের অভিবাসনে প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্কে জটিলতার সৃষ্টি হতে পারে- যা মানব পাচার, অবৈধ অস্ত্র ও মাদকসহ আন্তঃসীমান্ত অপরাধ বৃদ্ধি করবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জলবায়ু অভিবাসীদের সামাজিক, সাংসকৃতিক ও অর্থনৈতিক পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে ইউএন এফসিসির আওতায় একটি নতুন বিধিবদ্ধ কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, তার সরকার দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ঝুঁকি হ্রাসে উপকূলীয় এলাকায় ১৪ হাজার ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ, সতর্কীকরণ ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ ও আবহাওয়া অফিসের কার্যক্রম আধুনিকায়নের পরিকল্পনা নিয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. আ ফ ম রুহুল হক, প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী, পরিবেশ ও বন প্রতিমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন এমপি, আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক বদিউজ্জামান ডাবলু ও প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ অধিবেশনে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।


সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্য (এমডিজি) অর্জনে বাংলাদেশের সঙ্গে একযোগে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন মাইক্রোসফট কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান ও বিল এন্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের কো-চেয়ার উইলিয়াম বিল গেটস।

সোমবার সন্ধ্যায় সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করে বিল এই আগ্রহের কথা জানান।

প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ পরে সাংবাদিকদের বলেন, বিল গেটস ডিজিটাল বাংলাদেশ নির্মাণের স্বপ্ন বাস্তবায়নে শেখ হাসিনার সুপরিকল্পিত, আধুনিক ও দূরদর্শী নেতৃত্বের প্রশংসা করেন এবং বাংলাদেশে টিকাদান কর্মসূচিতে সহযোগিতা বৃদ্ধির কথা বলেন।

দারিদ্র্য বিমোচনের অঙ্গীকার ও প্রচেষ্টার জন্য প্রধানমন্ত্রী মাইক্রোসফট প্রধানকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে তার সরকার সমাজের সব পর্যায়ে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকারাবদ্ধ।

বাংলাদেশে শিশু ও মাতৃমৃত্যু হার কমিয়ে আনতে সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচি সম্পর্কেও বিল গেটসকে অবহিত করেন প্রধানমন্ত্রী। শিশুমৃত্যু হার কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে জাতিসংঘের এমডিজি পুরস্কার পাওয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানান বিল গেটস।

অন্যদের মধ্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ ফ ম রুহুল হক, বন ও পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী, অ্যাম্বাসেডর অ্যাট লার্জ এম জিয়াউদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এম এ করিম এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

বিশ্ব আবহাওয়া কংগ্রেস ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে যোগ দিতে গত রোববার সুইজারল্যান্ডে পৌঁছান শেখ হাসিনা। ২৮ মে তার দেশে ফেরার কথা রয়েছে।

আরও পড়ুন

Back to top button