আর্কাইভ

৩৬০ হাজার ব্রিটিশ পাউন্ড – যে কথা ওহাব পাইক জানেন না

ফ্রি টিকেট, ফ্রি থাকা আর সবেধন নীলমনি একটা চাকুরী আমার। বসের নির্দেশ পালন করতে তাই লন্ডনে। লস এঞ্জেলস থেকে হিথ্রো তারপর বার্ক হার্স্ট হিলে (এসেক্সে) বন্ধুর বাসা। উদ্দেশ্য, ম্যাডাম খালেদা'র লন্ডন রিপোর্ট কাভার করব। সেই সাথে জেনেভাতে যাব প্রধানমন্ত্রী হাসিনাকে দেখতে। সুতরাং বুঝতেই পারছেন দুনিয়ার হ্যাপা। খালেদা ম্যাডাম আর হাসিনা আপাকে দেখতে যাওয়ার হ্যাপা একটাই, কষ্টও একটা। সেটা হলো দুই দলের চামচাদের সহ্য করে হাস্যমুখে বসে থাকা। মানুষের মল চেটে চেটে খাওয়াও এর থেকে সুখকর। এই ব্যাপারে আমার কোনো সন্দেহ নেই। নেত্রীদ্বয়ের যত বড় না বাল তার চেয়েও বৃহৎ চ্যাট হচ্ছে চামচা সমর্থকরা। চ্যাটে চ্যাটে আর বালে বালে ধূল পরিমান।

ঘটনা -১

ইস্ট লন্ডনের ক্যানন রোডে ম্যাডামের অনুগত হ্যাডম আলা চামচাদের ফিনান্সিয়াল কমিটির সভা। সময়, সন্ধ্যা ৭ টা। বি এন পি’র আইনজীবি সমিতির ধাড়ি চামচা মওদুদ, ওয়াসিফ সহ বড় বড় চামচারা দন্ডায়মান। একজন আমার পরিচয় জানতে চাইলেন। পরিচয় দিলাম। শুধু পরিচয় না, খুব মন চাইছিলো দন্ত বিগলিত হাসি দিয়ে খুব জোরে স্লোগান দিয়ে উঠি। “আমার ভাই তোমার ভাই তারেক ভাই, তারেক ভাই” অথবা “তোমার আমার ঠিকানা, হাওয়া ভবন ছাড়া কিছুই না” বা এইভাবে, “ম্যাডামের দুই পূত্র, বাংলার দুই গর্ব”(গলা যথাসম্ভব কাঁপিয়ে)। পরিচয় পেয়ে ভদ্রলোক আমার দিকে এক ধরনের সন্দেহের দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে রইলেন। আমেরিকা থেকে এত বড় রেফারেন্স নিয়ে এসেছি শুনে চামচা ভদ্রলোক নিমরাজি হলেন। (এরপর ভেতরের কাহিনী অন্য আরেকদিন বলব, আজকের প্রসঙ্গ আলাদা)।

প্রিয় পাঠক, আপনারা শুনলে অবাক হবেন না জানি, তারপরেও কিছুটা চেষ্টা করি। মাত্র ১৫ মিনিট প্রিয় পাঠক, মাত্র ১৫ মিনিট…

শুধু চার চামচা ধনকুবের খালেদার লন্ডন আগমন উপলক্ষে হাসতে হাসতে চাঁদা কবুল করলেন ৩০০ হাজার ব্রিটিশ পাউন্ড। অন্যান্য আরো ক্ষুদে চামচারা কবুল কবুল বলে ত্রাহি ডাক ছাড়লো আরো ৬০ হাজার পাউন্ডের মত। এছাড়া চনু মিয়া টাইপ রেস্টুরেন্ট মালিক থেকে শুরু করে নুনু মিয়ার মত আন্ডারওয়ার দোকানের মালিকদের আক্ষেপ তো থেকেই গেলো।

“ ইতা খিতা বা???? মালিক সাব, সিরাজ মিয়া বা আব্দুস সালিকরা এত ট্যাখা দিরায়, আমি কিতা ফানি দি বাসি আইসি নি?”

এসব দেখে আমি অফসাইড বসে বসে জমে যাই আতংকে, বেদনায়, ক্ষোভে আর বুক ফাটা আর্তনাদে। কে কত বেশী পাউন্ড দিতে পারবে এই প্রতিযোগিতা চলছে আজ। চামচাদের মূর্মূহু তালিতে ছোট ঘরখানি আমার কাছে একটা নরক মনে হয়। পানের আর জর্দার গন্ধগুলোকে মনে হয় পটাশিয়াম সায়ানাইডের মত। কেবল বিষিয়ে মারতে চায়।

ঘটনা-২

লন্ডনের গ্রসনোভার হোটেল। পার্ক লেইন। রবিবার, ১৫-ই মে ২০১১। সময় ১২ টা ৩০ পি এম। আমি আর আমার বন্ধু দাঁড়িয়ে আছি হোটেলের সামনে।

ধাড়ি, মিনি, মাঝারি, এক্সট্রা পিচ্চি, এক্সট্রা লার্জ চামচাদের মহা আসর। গোলাপী বেগম আসবেন। গোলাপী আসবেন মাঠ কাঁপিয়ে, হাত কাঁপিয়ে, শিফনের শাড়ি কাঁপিয়ে। চারিদিকে রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষা। মিরাজ নামে এক ছাত্রদল নেতা রেগে মেগে অস্থির। নিজেরেই দলের আরেক অংশের সাথে লেগে গেলো মারামারি, টানা হ্যাঁচড়া, খিস্তি-খেউর। দক্ষিনে এক অংশ চিৎকার করছে তারেকের নামে, উত্তরে আরেক অংশ চিৎকার করছে জিয়ার নামে, মধ্য থেকে আরেক অংশ চিৎকার করছে খালেদার নামে-কোকোর নামে। ভিয়েনা থেকে নিজের পকেটের টাকায়, রক্তের পরিশ্রমের ইউরোতে এসেছেন শফিক সাহেব। শুধু খালেদাকে এক নজর দেখবেন বলে। ইনভাইটেশন কার্ড পাননি বলে হোটেলের বাইরে তার কি কান্না!!! লিসবন থেকে এসেছে শামীম, মুক্তা, হীরা সহ আরো অনেকে। নিউক্যাসল, ডরসেট, অর্পিংটন, লেস্টার, ইপসউইচ থেকে এসেছেন অসংখ্য খালেদা ভক্ত। ইটালী, জার্মানী, স্পেন থেকে এসেছেন যথাক্রমে সোহেল, রাজ্জাক আর মনির-বাবুল’রা। শুধু চাওয়া এক্টাই নেতা তারেক রহমানকে একনজর দেখা আর ম্যাডামকে এক নজর দেখা। সবাই এসেছেন নিজের সারা সপ্তাহ পরিশ্রমের টাকা দিয়ে, পাউন্ড দিয়ে, ইউরো দিয়ে। এই ইংল্যান্ডের কঠিন জীবনের টাকা এগুলো, জার্মানির হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রমের টাকা এগুলো, ইটালীর পথে পথে খেলনা বিক্রির টাকা এগুলো, স্পেনের মুদি দোকানে ৪০ কেজি চাল উঠা-নামা করাবার অর্থ এগুলো।

হোটেলের পাশেই আওয়ামীলীগের কয়েকশ চামচা ঘরের যত কালো জামা কাপড় আছে তাই নিয়ে হাজির। উদ্দেশ্য ম্যাডামকে কালো কাপড় দেখাবেন। বৃদ্ধ সুলতান শরীফ তার ডায়াবেটিস আর ইন্সুলিনের কথা ভুলে গিয়ে ২০ বছরের এক তরুনের কাছে গিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে,

"খিতা মিয়া, গলাত জুর নাই নি? মাতো না খ্যানে খানি খাও নাইনি?"

এই বলেই তিনি নিজেই স্লোগান ধরলেন,

"নিজামীর রক্ষক, খালেদার ফাঁসি চাই। দূর্নীতির বরপূত্র তারেকের ফাঁসি চাই"

আমি আর আমার বন্ধু খাবি খেতে খেতে এসব দেখি… একজন তাকাই আরেকজনের দিকে…

ম্যাডাম আসলেন। তারেককে জড়িয়ে ধরলেন। ম্যাডাম কাঁদে… কাঁদে তারেক। তাদের কান্না দেখে কাঁদে চামচারা। কেউ কেউ কয়েকশ গজ দূর থেকেই। ম্যাডাম হাসে… চামচারাও হাসে। ম্যাডাম রাগে… চামচারাও রাগে। ম্যাডাম গম্ভীর… চামচারাও গম্ভীর…

এ এক মনে রাখার মূহূর্ত। এক বিরল দৃশ্য। লিখে হয়ত কোনোদিনও প্রকাশ সম্ভব নয়। এই চামচাদের মধ্যে পিএইচডি আছেন, ডাবল গ্রাজুয়েট আছেন, শিক্ষক আছেন, ইঞ্জিনিয়ার আছেন, বাড়ির বৌ-ঝি’রা আছেন, আছেন আংকেল, দুলাভাই, তালই, তালতো ভাই, বেয়াই, জামাই, ডাক্তার, কবিরাজ… সব…

গ্রসনেভোর হোটেলের আশেপাশের চলতে থাকা সাদা চামড়ার মানুষগুলো এসব দেখে মাথা নাড়ে। নাক কুঁচকে হাইড পার্কের দিকে উঠে যায় তারা। হোটেলের লবিতে দাঁড়ানো নিরাপত্তা কর্মীরা অবাক বিষ্ময়ে এই মানুষগুলোকে দেখে। রিসেপশনের ইংরেজ মেয়েটা পরম বিষ্ময়ে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে এসব মানুষগুলোর দিকে। টিভিতে এসব মানুষগুলো দেখেছিলো, বাংলাদেশ নামক ক্ষুদ্র রাষ্ট্রটি চলে তাদের প্রতি বছর পাঠানো ৪ বিলিয়ন সাহায্য, আমেরিকার তারো বেশী বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সাহায্য, আই এম এফ এর সাহায্য, জাপানের, চায়নার, কানাডার, অস্ট্রেলিয়ার সাহায্যে। তাদের আরো জানা ছিলো, বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির অর্ধেকের বেশী মানুষ দারিদ্রসীমারও নীচে বাস করে। অথচ তারা দেখলো গ্রসনোভার হোটেলের ২০ টি ভি আই পি রুম ভাড়া নেয়া হয়েছে, হল রুম ভাড়া নেয়া হয়েছে, দামী দামী সব খাবার এসেছে, দামী দামী সব মানুষেরা এসেছে, দামী দামী সব পোষাকের মানব-মানবী এসেছে।

তারা আরো দেখলো এরা পানের পিক ফালাচ্ছে গ্রসনোভার হোটেলের সামনে বুড়ো ম্যাপলের গোঁড়ায়, থু থু ফেলছে পার্ক লেন দিয়ে চলে যাওয়া ভিক্টোরিয়ার রাস্তায়, নাকের ময়লাখানি বের করে গুটলি পাঁকিয়ে আবার গন্ধ শুকছে লেচু চাচা নামের এক ৭০ বছরের বৃদ্ধ, কারো দৃষ্টির কোনো পাত্তা না দিয়েই প্যান্টের ভেতর দিয়ে হাত ঢুকিয়ে নুনু চুলকাচ্ছে জামাল মিয়া, মুখের থেকে কাঠি খুঁচিয়ে নাকের কাছে এনে গন্ধ শুঁকে নাক কুঁচকালো সুহেল মিয়া। তারা আরো দেখলো এসব মানুষগুলো কেউ এসেছে কড়া রঙ্গের জাগুয়ার, মার্সিডিজ,রেঞ্জ রোভার আর ভল্ভোতে করে। তারা দেখলো ও দেখতেই থাকলো।

তারা দেখে যা বুঝলো না তা তাদের কাছে অজানাই। তারা যা ও যতটুকু দেখেছে এক জীবনে দেখার সাধ তাদের হয়ত মিটে গেছে সেটুকুতেই। কিন্তু আমি অফসাইড আর আমার বন্ধু যা বুঝলাম তা হলো,

উপরের ওই তিনশো ৬০ হাজার পাউন্ড একদিন আমাকে আপনাকে বা আমার বাবা ও আপনার বাবাকেই দিতে হবে। আজ খালেদার লন্ডন সফরের জন্য সালিক, মালিক সাহেবরা হাসতে হাসতে টাকা দিয়েছেন ওই টাকার বাচ্চার কথা মাথায় রেখেই। একদিন ওই টাকার বাচ্চা ফুটবে, সেই বাচ্চারও আবার বাচ্চা ফুটবে। এই অর্থ কেবল ম্যাডামের যোনীদ্বারে রেখে দেয়া স্পার্ম মাত্র। একদিন এই স্পার্ম ম্যাডামের ডিম্বানুকে ছুঁয়ে দেবে। তখন পরাগ-রেনুর এই নিষিক্ততা যেই বাচ্চা গুলোর জন্ম দেবে, তার ঘানি টানব আমি, আপনি, আমার বাবা, আপনার বাবা, আপনার চাচা, আমার চাচা, আপনার মামা, আমার মামা।

আপনার সামনের রাস্তাটার টেন্ডার পাবে লন্ডনের সালিক, আপনার এলাকার বিদ্যুত খুঁটির মালিকানা পাবে মালিক। তারা এম্পি হবার ছাড়পত্র পাবে সেই ৩৬০ হাজার পাউন্ডের জোরে। আমি আর আপনি এবং আমাদের বাবারা কলুর বলদ হয়ে একদিন ইন্না-লিল্লা হয়ে যেখানে যাবার সেখানেই যাব… বাবাদের পর আমাদের পালা… আমাদের পর আমাদের সন্তান… তাদের পর…

এরই এক ফাঁকে ভিক্ষা করে বেড়াবে বীরঙ্গনা আমেনা, শ্রদ্ধেয় ওহাব পাইকেরা। যারা আপনার মা-বোনের ধর্ষনকারীদের খুন করেছে, যারা আপনার বাবা-ভাই-চাচা-মামাদের খুনের বদলা নিয়েছে, যারা আপনার আদরের ছোট ভাইবোনের খুনের বদলা নিয়েছিল, যারা এই দেশকে ফিরিয়ে দিয়েছিলো আমাদের কাছে, দেশপ্রেম নামের এক অচেনা শব্দের টানে। ১৫ মিনিট কেনো… ১৫ হাজার কোটি বছরেও ৩৬০ হাজার পাউন্ড দূরের কথা ৩৬০টি টাকা তাঁরা পাবেন না।


লেখক : অফসাইড – নাগরিকব্লগ ডট কম

আরও পড়ুন

Back to top button
Translate »