আর্কাইভ

আখেরাত তহবিলের নামে ধর্মপ্রান মুসলমানদের সাথে প্রতারনা

নামের একটি মৌলবাদী প্রতারক চক্র ভূয়া সংগঠন তৈরী করে মুসলমান ধর্মপ্রান মহিলাদের কাছ থেকে প্রতারনা করে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। এই চক্রটির খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন কুমারখালীসহ বিভিন্ন এলাকার মহিলারা। প্রবাসীদের স্ত্রী বা পরিবারের দিকে এ চক্রটির বিশেষ টার্গেট। চক্রটি মহিলাদের ফুসলিয়ে নামাজ ও এলেম শিক্ষার কথা বলে ‘আখেরাত তহবিল’এর সদস্যা বানিয়ে তাদের প্রাথমিক কাজ শুরু করে। তারপর আখেরাতের সঞ্চয়ের নামে তাদের কাছ থেকে মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নেয়। এই তহবিলে টাকা জমা রাখলে পরকালে ফেরৎ পাবে বলে ধর্মভীরু মহিলাদের কাছ থেকে টাকা নিচ্ছে চক্রটি।  এমনকি বিদেশে অসহায় ব্যেক্তিদের সাহায্য পাঠানোর নাম করে টাকা আত্মসাতেরও অভিযোগ রয়েছে চক্রটির বিরুদ্ধে।এভাবে তারা গত ৮ বছর ধরে ভূয়া সংগঠনের মাধ্যমে বিপুল পরিমান অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে। এ মৌলবাদী প্রতারক চক্রের কারণে বহু সংসার ভেঙ্গে যাওয়া ছাড়াও বহু বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী। কিন্তু অভিযুক্ত চক্রের পক্ষে প্রশাষনিক কর্মকর্তরা বলছেন তিনি অত্যন্ত পরহেজগার একজন ব্যেক্তি। উদ্দেশ্যপ্রনদিতভাবে তার শত্রু পক্ষ এ ধরনের অপপ্রচার চালাচ্ছেন। তবে এক প্রশ্নের জবাবে বিষয়টি স্বরজমিনে তিন দিনের মধ্যে খতিয়ে দেখবেন বললে জানিয়েছেন পিরোজপুর থানার ওসি জাহিদুল ইসলাম।

জেলা শহর থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার দূরে কুমারখালী গ্রামের নির্জন এলাকায় অবস্থিত এ মৌলবাদী প্রতারক চক্রের আস্তানা। এর মাত্র ২শ’ গজ অদূরে অবস্থিত পিরোজপুর পুলিশ লাইন। ‘আখেরাত তহবিল’এর প্রতিষ্ঠাতা হলেন পুলিশ লাইন জামে মসজিদের ইমাম জামায়াত নেতা মাওলানা ইলিয়াছ হোসেন। তার বাড়ি জিয়ানগর উপজেলার বাড়ইখালী গ্রমে। কুমারখালীতে আস্তানা করে মাওলানা ইলিয়াস তার স্ত্রী রহিমা বেগম শিরিন(৩০), একই এলাকার রফিকুল ইসলামের স্ত্রী নুরজাহান মেগম(৩৫) এবং সৌদী প্রবাসী ফারুক খানের স্ত্রী রুমা খানম (২৫) এলাকার মহিলাদের ফুসলিয়ে এনে নামাজ ও এলেম শিক্ষার নামে হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। মাওলানা ইলিয়াছ এর আগে মুন্সিগঞ্জের লৌহজং উপজেলার কলমা গ্রামের মসজিদে ইমামতি করা অবস্থায় এ ধরণের একটি সংগঠন করে বহু টাকা আত্মসাৎ করলে সেখান থেকে পালিয়ে পিরোজপুরে আসেন। এরপর ২০০৩ সালে তৎকালীন সংসদ সদস্য জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর সহযোগিতায় পুলিশ লাইন জামে মসজিদে ইমাম হিসেবে যোগদান করেন। এখানে এসে পূর্বের ন্যায় ‘আখেরাত তহবিল’ সংগঠন তৈরী করেন। এলাকার কেউ যদি কিছু জানতে চায় তখন তারা বলে “আমরা কোরআন শুদ্ধ করে পড়াই।” কিছু মহিলা নিয়ে রহিমা বেগম শিরিন ও নুরজাহা বেগম পিরোজপুর সদর, নাজিরপুর ও কাউখালীসহ বিভিন্ন এলাকা সফর করেন। শিরিন কাউখালী ও নাজিরপুর দুই উপজেলার দায়িত্বে রয়েছেন। গত বুধ ও বৃহস্পতিবার শহরতলী কুমারখালী ও রায়েরকাঠি গ্রামে গিয়ে যুদ্ধাপরাধী মতিউর রহমান নিজামীর পৃষ্ঠপোষকতায় মুদ্রিত এবং দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর লেখা অনেক বইও বিতরণ করেন বলে জানা গেছে।

কুমারখালী গ্রামের নুরুল ইসলাম খান অভিযোগ করেন, এ প্রতারক চক্রের খপ্পরে পড়ে তিনি ২০ হাজার টাকা খুইয়েছেন। তার স্ত্রী মিনারা বেগমকে ফুসলিয়ে গত তিন বছরে বিভিন্ন সময়ে এ টাকা হাতিয়ে নেয় শিরিন, নুরজাহান ও  রুমা। এই তহবিলে টাকা জমা রাখলে নাকি পরকালে ফেরৎ পাওয়া যাবে এ ফতোয়া দিয়ে তার স্ত্রী ছাড়াও শত শত মহিলাদের কাছ থেকে কয়েক লাখ টাকা নিয়েছে প্রতারক চক্রটি। তিনি আরও বলেন, খোয়া যাওয়া ২০ হাজার টাকা নিয়ে প্রায়ই তার স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া হয়। স্বামী নূরুল ইসলাম আরও জানান, তার স্ত্রী মিনারা বেগম বৃহস্পতিবার তাকে জানিয়ে দিয়েছেন ‘আমি আল্লাহর পথে নেমেছি, আর ঘরে ফিরবোনা’ একই এলাকার নাগরিক হাজী সেকেন্দার আলি খান বলেন, পুলিশ লাইন মসজিদের ইমাম মাওলানা ইলিয়াছ একজন মৌলবাদী-প্রতারক ও ধর্ম ব্যবসায়ী। তিনি ‘আখেরাত তহবিল’ নামের একটি ভূয়া সংগঠন তৈরী করে এলাকার অনেক মুসলমান মহিলাদের সর্বস্বান্ত করছেন। তিনি আরও বলেন, এ এলাকার অনেক লোক সৌদীআরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে চাকরি ও ব্যবসা করে স্ত্রীর কাছে টাকা পাঠান। এসুযোগ নিয়ে মাওলানা ইলিয়াছের স্ত্রী রহিমা বেগম শিরিন ও রফিকুল ইসলামের স্ত্রী  নুরজাহান বেগম নামাজ ও এলেম শিক্ষা দেয়ার জন্য সৌদী প্রবাসী স্ত্রীদের কাছ থেকে ‘আখেরাত তহবিল’এর নামে প্রতি মাসে চাঁদা তুলে।

দীর্ঘ দিন ধরে মাওলানা ইলিয়াছ ইসলাম ধর্ম শিক্ষা দেয়ার নামে সহজ সরল মহিলাদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে এবং ধর্মভীরু এসব মহিলারাও ফাঁদে পড়ে সব হারাচ্ছেন এবং এদের কারণে বহু সংসার ভেঙ্গেছে এবং বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। অত্র এলাকার বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা নুরুল হকের স্ত্রী সেলিনা বেগম খুকু (৪৫) বলেন, মাওলানা ইলিয়াছের স্ত্রী রহিমা বেগম শিরিন, রফিকুল ইসলামের স্ত্রী নুরজাহান বেগম ও সৌদী প্রবাসী ফারুক খানের স্ত্রী রুমা তাকে বয়ান শোনার জন্য মজলিশে বহুবার যেতে বলেছে, কিন্তু তাদের হাব-ভাব আমার কাছে ভাল মনে হয়নি তাই যাইনি। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে কুমারখালী, ঝাটকাঠী, রায়েরকাঠী, নাজিরপুরসহ আশপাশ এলাকার ১০০ থেকে ১৫০ জন মহিলা তাদের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন। কেউ কেউ স্বামীর ঘর সংসার ছেড়ে তাদের কাছে থাকছেন। ‘আখেরাত তহবিলের’ নামে সহজ সরল মহিলাদের কাজ থেকে হাতিয়ে নেয়া টাকা দিয়ে তারা আমাদের বাড়ির পিছনে নিজেদের চার জনের নামে ১৪ কাঠা জমি ক্রয়  করেছেন। কুমারখালীতে বসবাস মুক্তিযোদ্ধা শহীদুল ইসলাম জানান, আমাদের বাড়িতে এসে মহিলাদের মজলিশে যাওয়ার জন্য দাওয়াত দেয়, কিন্তু আমি কাউকে যেতে দেয়নি। তিনি আরও জানান, মাওলানা ইলিয়াস একজন জামায়াত নেতা। তিনি এলেম শিক্ষার নামে গোপনে জামায়াতের কর্মকান্ড চালাচ্ছেন আর ‘আখেরাত তহবিল’ গঠন করে এ অঞ্চলের মহিলাদের কাছ থেকে টাকা-পয়সা নিচ্ছেন বলে আমিও শুনেছি। অত্র এলাকায় বাড়ি রিনা বেগম(৩৫) নামের এক মহিলা জানান, আনসার ক্যাম্পের পিছনে অবস্থিত মাওলানা ইলিয়াছের বাড়িতে দুই দিন গিয়েছিলেন, কিন্তু টাকা-পয়সার কথা শুনে আর যেতে মন চাইনি।

স্বামী সৌদীআরবে থাকেন নাম প্রকাশে অনেচ্ছুক খান বাড়ির এমন দুই গৃহবধূ জানান, তাদেরকে ইলিয়াছ-শিরিনের বাড়িতে যাওয়ার জন্য অনেক অনুরোধ করা হয়েছে কিন্তু ‘আখেরাতের তহবিল’ এর কথা শুনে তারা পিছপা দেন। স্থানীয়দের কয়েকজন জানান,জামায়াত নেতা মাওলানা ইলিয়াছ বছর দু‘য়েক আগে পার্শ্বর্বর্তী রায়েরকাঠি গ্রামের জনৈক রমিজকে বিদেশে পাঠানোর কথা বলে দেড় লাখ টাকা আত্মসাৎ করেন। এরমধ্যে মাত্র ৯৫ হাজার টাকা ফেরৎ দেয় মাওলানা ইলিয়াছ। এব্যাপারে সে সময় সদর থানায় একটি অভিযোগও দেয়া হয়। অপরদিকে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে মাওলানা ইলিয়াছ বলেন, আমি তাবলিগ জামায়াত করি সত্য, কিন্তু মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করিনা। মসজিদের ইমামতি করে যা পাই তা দিয়ে সংসার চলানোই কষ্ট। তাই আরবী বিদ্যার টিউশনি করি। ‘আখেরাত তহবিল’ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি এ ব্যাপারে কোন উত্তর না দিয়ে বলেন, আমার শ্বশুর, শ্যালক ও ভায়রার টাকা দিয়ে ৭ কাঠা জমি কিনেছি। তার স্ত্রী রহিমা বেগম শিরিন ও রফিকুল ইসলামের স্ত্রী নুরজাহান বেগম বলেন, এ অঞ্চলের অনেক মহিলার স্বামী বিদেশে থাকেন, একারণে অনেক স্ত্রী পরকীয়া প্রেম এবং অনৈতিক কর্মকান্ডে লিপ্ত থাকেন, আবার অনেকের বিয়ে বিচ্ছেদের ঘটনাও ঘটেছে। আমার এসব মহিলাদের ধর্মীয় বয়ান এবং হারাম-হালালের কথা শুনিয়ে সঠিক পথে রাখি। ইসলামের কথা বলে খারাপ কাজ করা থেকে বিরত রেখে বিপদ থেকে তাদের রক্ষা করি। কিন্তু এখানে আমাদের অপরাধ কোথায়? শিরিন ও নুরজাহান ‘আখেরাত তহবিল’ নামের সংগঠনের মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তবে তারা অকপটে স্বীকার করেন যে, এলেম ও কোরআন শিক্ষা ছাড়াও কেউ চাইলে তারা বিখ্যাত ব্যক্তিদের লেখা বই বিনা মূল্যে বিতরনও করেন। প্রয়োজনে  কোন কোন সময় বিক্রিও করেন। এসব বইয়ের মধ্যে রয়েছে, জামায়াত নেতা মাওলানা মতিউর রহমান নিজমীর পৃষ্ঠপোষকতায় মুদ্রিত ‘রাহে আমল-২’, এ এন এম সিরাজুল ইসলামের লেখা ‘ভাল মৃত্যুর উপায়’, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর লেখা ‘জান্নাত লাভের সহজ আমল’ ও ‘তাফসীরে সাঈদী’।

এ বিষয়ে পিরোজপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহিদুর রহমান জানান, আমি এ বিষয়ে কিছু শুনি নেই। আমার জানামতে তিনি একজন ভদ্র লোক। মসজিদের ঈমাম। এ ধরনের কোন কর্মকান্ডে তিনি জড়িত নন। তবে পূর্বে এ ধরনের কোন কর্মকান্ড তিনি করেছেন কিনা এ বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে ঘটনাটি আমরা স্বরজমিনে খতিয়ে দেখব।

আরও পড়ুন

Back to top button