আর্কাইভ

ক্ষুদ্ধ খালেদা জিয়া – বেকায়দায় মওদুদ, দুঃখ প্রকাশেও রেহাই মিলছেনা

স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং জিয়াউর রহমান সম্পর্কে যে বক্তব্য দিয়েছেন তা নিয়ে বেকায়দায় পড়েছেন তিনি। এ ব্যাপারে দুঃখ প্রকাশ করেও রেহাই পাচ্ছেন না দলীয় নেতাকর্মীসহ খোদ চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া থেকে।

তার বক্তব্যের ব্যাপারে খালেদা জিয়ার মুখোমুখি হয়ে তার অবস্থান ব্যাখ্যা করতে চেয়েও ব্যর্থ হয়েছেন তিনি। দেখা করার ব্যাপারে খালেদা জিয়া তাকে স্পষ্ট না করে দিয়েছেন। তবে ওমরাহ হজ্ব করে দেশে ফিরে এলে তিনি মওদুদকে সাক্ষাত দিতে পারেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।  

জাতীয় শোক দিবসে গত ১৫ আগস্ট এটিএন নিউজে দেয়া সাক্ষাৎকারে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, জিয়াউর রহমান থেকে বঙ্গবন্ধুর স্থান অনেক ওপরে। এটিএন নিউজের বরাতে দুটি পত্রিকায় এ বক্তব্য প্রচার হওয়ার পর দলীয় পরিমন্ডলে প্রচন্ড চাপের মুখে পড়েন মওদুদ।

তার এ বক্তব্য নিয়ে গত ৩দিন বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। অনেকেই তার এই বক্তব্যকে বিভ্রান্তিকর ও দলের ভাবমর্যাদা ক্ষুণœ করেছে বলে মন্তব্য করেছেন। একই সঙ্গে তারা এই বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন কিছু তরুণ নেতাকর্মী। দলের সিনিয়র জুনিয়র সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়ার জন্য চেয়ারপারসন ও মহাসচিবের ওপরে চাপ প্রয়োগ করছেন।

যুবদল, ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকর্মীরা মওদুদকে অবাঞ্চিত ঘোষণা করে তাকে দিগম্মর করার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। বগুড়ায় মওদুদের নির্বাচনী এলাকায় তাকে অবাঞ্ছিত ও তার কুশপুত্তলিকা দাহ করেছে জেলা ছাত্রদল।

দলীয় কর্মসূচিতে তার উপস্থিতির ওপর অলিখিত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আগামীকাল ২০ আগস্ট মহানগর নাট্যমঞ্চে আলোচনা সভায় মওদুদ আহমদকে প্রধান অতিথি করার কথা থাকলেও বুধবার তা বাতিল করা হয়েছে। মওদুদের পরিবর্তে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে প্রধান অতিথি করা হয়েছে।

গতরাতে খালেদা জিয়া ওমরাহ করার জন্য সৌদি আরবের উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করলেও তাকে বিদায় জানাতে বিমানবন্দরে যাননি মওদুদ। দলের একটি অংশ তাকে বিমানবন্দরে যেতে বারন করেছেন। দলের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, মওদুদের ঘারে কয়টি মাথা যে, জিয়াউর রহমান সম্পর্কে এরকম মন্তব্য করে আবার বিমান বন্দরে যাবেন চেয়ারপারসনকে বিদায় জানাতে। সুত্রের মতে, তার ক্ষমা প্রার্থনা ও দলীয় নেতাকর্মীদের শান্ত হওয়া পর্যন্ত তাকে ধৈর্য্য ধারণ করতে হবে। বিমানবন্দরে গেলে তিনি তো নাজেহাল হবেনই। তাকে সাবধানে চলাফেরা করতে হচ্ছে। এ রকম পরিস্থিতিতে বিপাকে পড়েছেন মওদুদ।

তবে মওদুদ তার বক্তব্য সম্পর্কে গত ১৭ আগস্ট বুধবার একটি ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন, বঙ্গবন্ধু ও জিয়া সম্পর্কে তার বক্তব্য খ-িত আকারে প্রচারিত হয়েছে। তাতেও শেষ রক্ষা না হওয়ায় উদ্বুত পরিস্থিতিতে নিজের দেয়া বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিতে গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে মতিঝিলে নিজ চেম্বারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মওদুদ তার বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, এটিএন নিউজে আমি যে বক্তব্য দিয়েছিলাম সেটি ছিল বিশ্লেষণমূলক ও একাডেমিক আলোচনা। আমার এ বক্তব্য খ-িত আকারে পত্রিকায় প্রকাশ করা হয়। সঙ্গত কারণেই এ নিয়ে দলীয় পরিম-লে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়, আর তা হওয়াটাই স্বাভাবিক। এ বক্তব্যের জন্য আমি দুঃখ প্রকাশ করছি।

তার বক্তব্যে ব্যাপারে গত বুধবার বিএনপির দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, পতিতাদের দেহ বিক্রির চেয়েও রাজনীতিবিদদের আত্মা বিক্রি মারাত্মক ক্ষতিকর। এজন্য দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের দলীয় কাঠামো অনুযায়ী সচেতনভাবে বক্তব্য দানের জন্যও তিনি অনুরোধ করেন। যারা দলের শৃঙ্খলা লঙ্ঘন করবে তাদের দলীয় আইন অনুযায়ী বিচার হওয়া উচিত।

রিজভীর দেয়া এ প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে মওদুদ বলেন, রিজভী দলের একটি দায়িত্বে আছে, সে আমার ছোট ভাইয়ের মতো। তার জায়গায় থেকে সে যেটি করেছে, ঠিকই করেছে। এ ব্যাপারে আমার কোনো আক্ষেপ নেই।

মওদুদ আরও বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে শেখ মুজিবুর রহমান ও জিয়াউর রহমানের আবির্ভাব ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে, এদের কারও অবদান খাটো করে দেখার অবকাশ নেই।

জিয়াউর রহমানের অবদান তুলে ধরে তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকহানাদার বাহিনী নিরস্ত্র মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লে জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।

পক্ষান্তরে ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি একদলীয় শাসন কায়েম করে বঙ্গবন্ধু ইতিহাসে সমালোচনার পাত্র হয়ে আছেন। তারপরও তার অন্যান্য অবদানের জন্য বাঙালি জাতি তাকে মনে রাখবে। সুতরাং এ দুই নেতার অবদান নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির কোনো সুযোগ নেই, নিজ নিজ অবদানের জন্য ইতিহাস তাদের অমর করে রাখবে।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, স্পর্শকাতর ব্যাপারে কথা বলার আগে সিনিয়র জুনিয়র সব নেতাকেই হিসাব নিকেশ করে কথা বলা উচিত। দলীয় শৃংখলা বিরোধী কোনো কথা কারো জন্যই শোভনীয় নয়। তিনি এব্যাপারে চেয়ারপারসনের সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করতে হবে বলে জানান।

আরও পড়ুন

Back to top button