আর্কাইভ

খালেদা পারলেন না হাসিনাও পারছেন না

পীর হাবিবুর রহমানঃ কিছু কিছু মানুষের সঙ্গে দেখা হলে এখনো আবেগতাড়িত হই। নস্টালজিয়ায় ভুগি। '৭৫-উত্তর আওয়ামী রাজনীতির দুঃসময়ে ছাত্রলীগের সাহসী তারুণ্যের ভূমিকা মনে পড়লে মনটা ভরে যায়। আজকের আওয়ামী লীগের নব্যদের অনেকেই তাদের গৌরবের গল্পগাথা বললে হয়তো বিদ্রূপের হাসি হাসেন।

কিন্তু এ নিয়ে আমি বিচলিত নই। আমার বিবেক, আমার চিন্তা, আমার দেখা ও উপলব্ধি থেকে যতটা স্বাধীনতা নিয়ে লেখা যায় ততটাই লেখার চেষ্টা করি। ইতিহাসকে বারবার টেনে আনি বর্তমানের সংশোধন ও ভবিষ্যতের নির্মাণশৈলী নিখুঁত করার তাগিদে। আজ যারা আওয়ামী লীগে এসেই নেতা হচ্ছেন, এমপি হচ্ছেন, কিংবা মন্ত্রী হচ্ছেন, তাদের অনেকেই জানেন না '৭৫-উত্তর সময়টায় যারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে বুকে নিয়ে দলকে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছিলেন তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কী অসাধ্য সাধনই না করেছেন।

অন্ধকার পথ হেঁটে তারা শেখ মুজিবের রাজনীতিকে আলোর পথে এনেছিলেন। কিংবা বলা যায় রীতিমতো পাথরে ফুল ফুটিয়েছিলেন। আমি কেন হঠাৎ এমন করে লিখতে শুরু করলাম এ প্রশক্ষ্ম অনেকেই করতে পারেন। ২৮ সেপ্টেম্বর ছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্মদিন। তিনি তখন আমেরিকায়। আগের রাতে খন্দকার জাহাঙ্গীর কবির রানা তার বাসভবনে টেলিফোন করে নিমন্ত্রণ করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী ও মুজিবকন্যা শেখ হাসিনার জন্মদিনের অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্য। কাজের চাপে আটকে পড়ায় যাওয়া হয়নি। পরে শুনেছি '৭৫-উত্তর দুঃসময়ের রাজনীতিতে মেধা ও যোগ্যতা নিয়ে যারা দেশের বিভিনক্ষ্ম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগের সাহসী মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তাদের অনেকেই একত্রিত হয়েছিলেন। গভীর মমতায়, আন্তরিকতায় ও অনাড়ম্বর ঘরোয়া পরিবেশে ব্যক্তিগত উদ্যোগে পারিবারিকভাবে শেখ হাসিনার দীর্ঘায়ু কামনা করে আনন্দঘন পরিবেশে এমন গোপন আয়োজনই একজন নেত্রীর জন্য তার কর্মীর অকৃত্রিম ভালোবাসা প্রকাশের উদাহরণ। বিরল হলেও এটাই সত্যিকারের ভালোবাসা। ঢাকঢোল পিটিয়ে হাঁকডাক করে যারা জন্মদিনের উৎসব করেন তাদের ভালোবাসা প্রকাশের দৃশ্য নিয়ে আমার প্রশক্ষ্ম নেই। কিন্তু লোকদেখানো অনেক কিছুর বাড়াবাড়ি নিয়ে আন্তরিকতা কখনো কখনো প্রশক্ষ্মবিদ্ধ হয়। জগৎবিখ্যাত মানুষের জন্মদিন পালনের খবর তেমন পাওয়া যায় না। তাদের মৃত্যু দিবসটাই অমরত্ব পায় কর্মের কৃতিত্বে। আমি বহুবার বলেছি, আমাদের মহান নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আমি আদর্শের সন্তান। তার অমর কীর্তি তাকে যে উচ্চতার ইতিহাসে অমরত্ব দিয়েছে তার পাশাপাশি কাউকে দাঁড় করানো দূরে থাক, তার নামের সঙ্গে কারও নাম উচ্চারণের ক্ষমতাও ইতিহাস আমাদের দেয়নি। আজীবন গণতন্ত্রের জন্য জীবন-যৌবন উৎসর্গ করা জগৎবিখ্যাত পৃথিবীর নন্দিত জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সফল নায়ক শেখ মুজিব যখন মস্কোর প্রেসক্রিপশন আর ন্যাপ-কমিউনিস্টদের খপ্পরে পড়ে একদলীয় বাকশাল করেন তখন অনেক প্রশক্ষ্ম সমালোচনা আসে। কিন্তু এমন দেশপ্রেমিক, যার হৃদয় জুড়ে ছিল শুধু মানুষের জন্য ভালোবাসা, তেমন মহান নেতা আর কখনো এই জাতির জীবনে আসবেন না। তিনিও জন্মদিন পালন করতেন না।

'৭১ সালের উত্তাল ১৭ মার্চ ইয়াহিয়ার সঙ্গে বৈঠক থেকে ফিরলে সাংবাদিকরা তার জন্মদিন স্মরণ করিয়ে দিলে তিনি বলেছিলেন, যে দেশের মানুষ গুলি খেয়ে মরে, অনাহারে থাকে, সে দেশের নেতার আবার জন্মদিন কি! আর আমি তো জীবন দেশ ও মানুষের জন্য উৎসর্গ করেছি। আমি অনেকবার বলেছি, মুজিব অনুরাগী একজন পাক্কা আল্লাহভীরু মুমিন মুসলমানের সন্তান হিসেবে আমাকে পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের অনুশাসনে বেড়ে উঠতে হয়েছে। যদিও আমার শৈশব-কৈশোর ছিল রবীন্দ্রনাথের ছোট গল্পের নায়ক ফটিকের মতো অবাধ্য দুরন্ত। আমার বড় ভাই অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান পীর '৭৬ সালে সাত সদস্যের সুনামগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের আহ্বায়ক, '৭৮ ও '৮০ সালের জেলা সম্মেলনে সর্বসম্মতভাবে সভাপতি নির্বাচিত হন। তখন কেন্দ্রের হস্তক্ষেপমুক্ত কাউন্সিলরদের ভোটে জেলা ছাত্রলীগের নেতৃত্ব নির্বাচিত হতে দেখেছি। সেনাশাসক জিয়ার দমননীতি আর জাসদের গণবাহিনীর অস্ত্রনির্ভর কর্মীদের ত্রাসের মুখে তিনি সংগঠনকে শক্তিশালী রূপ দিয়ে জেলাজুড়ে দাঁড়ই করাননি, প্রথম কলেজ সংসদ নির্বাচনে ছাত্রলীগকে বিজয়ের আনন্দ এনে দেন। তার সঙ্গে প্রথমবার জেলা সাধারণ সম্পাদক হন হায়দার চৌধুরী লিটন ও পরে আনোয়ার হোসেন আনুল।

সেই সময় তার সাংগঠনিক তৎপরতা বৃহত্তর সিলেট জুড়ে বিস্তৃত ছিল। '৭৯ সালে কাদের সিদ্দিকীর বিদ্রোহের দুর্গ থেকে সুলতান মোহাম্মদ মনসুর ফিরে এলে তাকে কেন্দ্রের রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা করতে মতিউর রহমান পীররা ভূমিকা রাখেন। সুলতানের অবদানও খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। এমনকি আবদুস সামাদ আজাদসহ দলের বড় বড় নেতা যখন জেলে তখন সিলেট পৌরসভার নন্দিত সুদর্শন চেয়ারম্যান বাবরুল হোসেন বাবুলকে নিয়ে মতিউর রহমান পীররা বৃহত্তর সিলেটে জনসভা করতেন। কলেজ নির্বাচনে তাকে টানতেন। ওবায়দুল কাদের ও খবর সম্পাদক মিজানুর রহমান মিজান একবার কষ্ট করে সুনামগঞ্জ যান। সস্তা হোটেলে থাকা-খাওয়া করে ট্রাফিক পয়েন্টে ছাত্র গণজমায়েতে বক্তৃতা করেন। কলেজ সংসদ নির্বাচনে কেন্দ্রীয় ছাত্রনেতা রায় রমেশ চন্দ্র, খ. ম. জাহাঙ্গীর, শরীফ সাহাবুদ্দিন, সুলতান মোহাম্মদ মনসুর, শহিদুল ইসলাম, সৈয়দ মানক্ষ্মানরা বাড়ি বাড়ি ভোট চাইতে যেতেন। সেই সময় ছাত্রলীগের কর্মীদের মাঝে অনলবর্ষী বক্তা হিসেবে রবিউল আলম মোক্তাদির চৌধুরীও গিয়েছিলেন। তখন এসএসসি পরীক্ষার্থীদের নিয়মিত সংবর্ধনা, নবীনবরণ অনুষ্ঠান সব ছাত্র সংগঠন প্রতিযোগিতামূলকভাবে করত। তখন ছাত্রলীগ-আওয়ামী লীগ মিলে যেন একটি একানক্ষ্মবর্তী পরিবারের ভালোবাসার বন্ধন তৈরি হয়েছিল। দলের মধ্যে ভাঙন, সুবিধাবাদী থানা এবং প্রশাসনের দালাল, ঠিকাদার ও ন্যাপ-কমিউনিস্টদের আগমন দিন দিন সেই বন্ধন শিথিল করে দেয়। '৭৭ সালে জিয়াউর রহমানের সামনে পৌরসভা চেয়ারম্যানদের সম্মেলনে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার চেয়ে যে বাবরুল হোসেন বাবুল বক্তৃতা করেন তাকে পরে সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বসানোর কথা থাকলেও ব্যক্তিগত ইমেজ তুঙ্গে থাকা সত্ত্বেও দল থেকে বের করে দেওয়া হয়। ষাটের দশকে আইয়ুব খানকে জুতা মারা ও '৭৫-উত্তর দুঃসময়ের সংগঠক শাহ আজিজুর রহমান অনাদর-অবহেলায় ঘরে বসে দগ্ধ হচ্ছেন। যাক এক কথা বলতে অনেক কথা চলে এসেছে। আমার ভাই মতিউর রহমান পীরের হাত ধরে আমি স্কুলজীবনে ছাত্রলীগের মাধ্যমে শেখ মুজিবকে পাঠ করতে শিখেছিলাম। ছাত্রলীগ আমাকে অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে কথা বলতেই শেখায়নি, স্বাধীনতার রূপকারদের প্রতিও শ্রদ্ধাশীল করেছে। খন্দকার জাহাঙ্গীর কবির রানার সঙ্গে অনেক বছর দেখা নেই।

'৭৫-উত্তর দুঃসময়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিচারপতি বজলুর রহমান ছানা ও এই জাহাঙ্গীর কবির রানা ছাত্রলীগের পুনর্জন্ম দিয়েছিলেন। তখন গণবাহিনীর অস্ত্রনির্ভর জাসদ আর অতি বাম বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়ন, বিপ্লবী ছাত্র আন্দোলন সব মিলে আজকের নৌকায় চড়া এমপি ফজলে হোসেন বাদশার নেতৃত্বে ছাত্রলীগের প্রকাশ্য রাজনীতি নিষিদ্ধ করে রেখেছিল। আজকের আওয়ামী লীগের অনেকের কাছেই ছানা-রানার নাম গোনায় না থাকলেও সেই দিন সারা দেশে তাদের নামে ছাত্রলীগ উজ্জীবিত হয়েছে। পাঁচ দফার আন্দোলন, শিক্ষামন্ত্রী বাতেনকে আটক করার মধ্য দিয়ে ছাত্রলীগ ছানা-রানার নেতৃত্বে আত্মপ্রকাশই করেনি, রাকসু নির্বাচনে অবিস্মরণীয় বিজয় ছিনিয়ে আনে। শহর ও মেয়েদের ভোটের জন্য ভিপিতে বাদশার কাছে ছানা হেরে গেলেও সিনেটে জয়ী হন। রানা জিএস পদে জিতেন সঙ্গে ১২টি পদে ছাত্রলীগ জয়লাভ করে। বিশ্ববিদ্যালয় স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত অভিষেক অনুষ্ঠানে বাদশার চীনপন্থি ছাত্রমৈত্রী ও জাসদের কারণে রানারা বুকে শেখ মুজিবের ছবি লাগাতে পারেনি। তবে তারা মুজিব কোর্ট পরে শপথ নেন। সেদিন বক্তৃতায় রানা শেখ মুজিবের নাম যেমন নিয়েছেন প্রধান অতিথি বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের স্বাধীনতার ডাক স্মরণ করেছিলেন। রাকসুতে রানার বিজয়ে সারা দেশে ছাত্রলীগ আনন্দ মিছিল করে। সুনামগঞ্জেও আমরা করেছিলাম। তখন উত্তরবঙ্গে ছানা-রানা, ময়মনসিংহে প্রদীপ কর, চট্টগ্রামে জমির চৌধুরী, বরিশালে মরহুম শহীদ খান ও জাহাঙ্গীর কবির নানকের মতো ছাত্র নেতা অসাধারণ সাংগঠনিক দক্ষতায় ছাত্রলীগকে জাগিয়ে ছিলেন।

ছানা-রানা দুজনের মধ্য নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা ছিল। দুজনের নামে দুটো গ্রুপ ছিল। তখন ছাত্রলীগের বিশ্ববিদ্যালয় কর্মীরা দুই নেতার অনুসারী ছিলেন। আমাকে দুজনই ভীষণ সক্ষ্মেহ করতেন মতিহার ক্যাম্পাসে যাওয়ার আগে থেকেই। সুনামগঞ্জে মতিউর রহমান পীরদের ছায়ায় যে ছাত্রনেতা পরবর্তীতে অসাধারণ সাংগঠনিক দক্ষতায় জনপ্রিয়তা অর্জন করেন তার নাম সুবীর তালুকদার বাপটু। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি ওবায়দুল কাদের ও সাধারণ সম্পাদক বাহালুল মজনুন চুনক্ষ্মু দুজনই আমকে সক্ষ্মেহ করতেন। তাদের সময় আমি কলেজ কমিটির সাধারণ সম্পাদক হই ভোটের মাধ্যমে। মতিহার ক্যাম্পাসে যাওয়ার পর আমি একদল সশস্ত্র বেয়াদবনির্ভর অদ্ভুত দাপুটে ছাত্র সংগঠন দেখলাম। নাম তার ছাত্রমৈত্রী। নেতা ফজলে হোসেন বাদশা। পাশাপাশি আরও কিছু বেয়াদবনির্ভর উগ্র জাসদ ছাত্রলীগের কারণে হল ক্যান্টিনের বদলে রুমে এনেই সকালের নাস্তা সারতাম। দুটি সংগঠনই এখন মৃত প্রায়।

মহান শেখ মুজিবের নামে ও তার পরিবার সম্পর্কে নির্দয়-নিষ্ঠুরের মতো যে চীনপন্থি ও উগ্রপন্থিরা বিষোদগার ছড়াত আর তাদের কথা শুনে '৭১-এর পরাজিত শয়তানরা হাততালি দিয়ে নাচত, সেই দেউলিয়া জনসমর্থনহীন উগ্রপন্থি ও চীনপন্থিরা এখন মুজিবকন্যা শেখ হাসিনার নৌকায় চড়ে সংসদে। কেউবা মন্ত্রিসভায়। যারা শেখ মুজিবের নামে শপথ নিয়ে ছাত্রলীগের রাজনীতি নিয়ে প্রিয় মাতৃভূমিকে ভালোবেসে ছিল জাতীয়তাবাদী চেতনায়, '৭৫-উত্তর দুঃসময়ের সেই সাহসী নেতারা ষাটের দশকের মুজিব সন্তানদের পাশাপাশি আজ অবহেলিত-নিগৃহীত। আমাদের চোখের সামনে বিএনপি দাঁড়িয়েছে। বঙ্গবন্ধুর প্রতি অগাধ ভালোবাসার কারণে, আদর্শের প্রতি অবিচল থাকার কারণে দল ত্যাগ করেনি। অন্তহীন দহনে ক্ষয়ে যাচ্ছে তাদের জীবন। দল তাদের ডাকে না। কাজে লাগায় না। মুজিবকন্যা শেখ হাসিনার চারপাশে সেই মতিয়া চৌধুরী আর লেনিনরা জনসমর্থন হারিয়ে এসে মোসাহেবি করে করে আশ্রয় নিয়েছে ভাবতে অবাক লাগে। '৭৩ সালের ৩ জানুয়ারির ইত্তেফাক খুললে এখনো মতিয়া ও তার সহযোগীদের মুজিববিরোধী আসগ্গালনের চিত্র পাওয়া যায়। ভিয়েতনাম দিবসের ছাত্র ইউনিয়নের মিছিল ঘিরে সংঘটিত ঘটনা আর ডাকসু ভবনে বঙ্গবন্ধুর আজীবন সদস্য পদ ছিঁড়ে ফেলায় সারা দেশের ছাত্রলীগ-যুবলীগ গণপ্রতিরোধ গড়েছিল। সেদিন মনিসিংহ-মোজাফফর-ফরহাদরা বঙ্গবন্ধুর কাছে নত হয়ে মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমকে দিয়ে ক্ষমা চাইয়েছিলেন। কিন্তু আজ শেখ হাসিনার পাশে প্রবল ক্ষমতা নিয়ে থাকা একজনই ক্ষমা চাননি, 'বঙ্গবন্ধুর চামড়া দিয়ে ঢোল আর হাড্ডি দিয়ে ডুগডুগি বাজানো'র মতো ঔদ্ধত্য দেখানো মতিয়া চৌধুরী ও ফালতু এক ছাত্র ইউনিয়ন করা আজকের এক প্রতিমন্ত্রী। বঙ্গবন্ধুকন্যা মুজিব সন্তানদের ছোটখাটো ভুল, অভিমানী আচরণের ক্ষমা করছেন না। অথচ যারা আমাদের মহান নেতাকে সাম্রাজ্যবাদের এজেন্ট ও ৬ দফাকে সিআই'র দলিল বলেছিল, যারা এদেশে কখনো কুঁড়েঘর বা কাস্তে নিয়ে ভোট করার সাহস পায়নি, মানুষের হৃদয়ে যাদের ঠাঁই নেই তাদের নৌকায় তুলে মন্ত্রী করার আগে এমন কোনো নজির কেউ কি দেখাতে পারবেন যে, তারা তাদের অতীত ভুলের জন্য জাতির কাছে দূরে থাক, মুজিবকন্যা হাসিনার কাছে ক্ষমা চেয়েছেন?

'৭৫ সালের পর থেকে যারা শেখ মুজিবের চরিত্র হননের চেষ্টা করেছে, শেখ কামালের মতো সৃজনশীল ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সংগঠক মুক্তিযোদ্ধাকে ব্যাংক ডাকাত বানাতে চেয়েছে, সেসব চীনা ও হঠকারী উগ্রপন্থিকে নৌকায় তোলার আগে কি তারা তাদের পাপের রাজনীতির জন্য ক্ষমা চেয়েছিল? বিদেশের টাকায় বিদেশের রাজনীতি করা জনসমর্থন আদায়ে ব্যর্থ সুবিধাবাদী উচ্ছিষ্ট বামরা শেখ মুজিবের আওয়ামী লীগে ও শেখ হাসিনার সরকারে প্রভাবশালী হবেন আর বঙ্গবন্ধুর সন্তানরা অনাদর-অবহেলায় উপহাস ও বিদ্রূপের পাত্র হয়ে থাকবেন এটা কতটা যৌক্তিক এ প্রশক্ষ্ম থেকে যায়। এদেশের রাজনীতিতে মুক্তিযুদ্ধে কবর রচিত হয়েছে দক্ষিণপন্থি ধর্মভিত্তিক রাজনীতির। জিয়া-এরশাদের সেনাশাসনামলে চীনা বামপন্থিরা একচেটিয়া রাজত্ব করে গেছেন। এদেশের জনগণ এদের রাজনীতিকে কখনো গ্রহণ না করলেও তাদেরই দীর্ঘ সময় মন্ত্রিসভায় দেখা গেছে। অথচ যারা এই দেশ নির্মাণ করেছেন, গণতন্ত্রের সংগ্রাম করেছেন, জনগণের হৃদয়ে ঠাঁই পেয়েছেন, সেসব জাতীয়তাবাদী বীর কেউ কেউ একবার কেউ কেউ মন্ত্রিসভায়ই আসতে পারেননি। সেনাশাসন ও গণতন্ত্রের জামানায় ডানপন্থিদের কোনো নির্বাচনেই জনগণ ম্যান্ডেট দেয়নি। জামানত হারিয়েছে। দুনিয়া জুড়ে আজ ধর্মান্ধ রাজনীতিবিরোধী জিগির প্রতিরোধের মুখে। অন্যদিকে বাম বা কমিউনিস্ট ঠিকানা মুছে গেছে দেশে দেশে। রগ কাটা রাজনীতি ও যুদ্ধাপরাধের কলঙ্কে অভিশপ্ত জামায়াতকে বাদ দিতে পারলেন না বিরোধী দলের নেত্রী খালেদা জিয়া। সব ডানপন্থিকে নিয়ে সরকারবিরোধী আন্দোলনের শুভ সূচনাতেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আক্রমণ করতে গিয়ে চরম সাম্প্রদায়িক বক্তৃতা করেছেন। তিনি এদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্যকে আঘাত করেছেন। এটা বেদনার। ডান নয় বাম নয় সোজা পথে চলার নীতি পরিহার করে দক্ষিণপন্থিদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। সেনাশাসনামল থেকে গণতান্ত্রিক শাসনামল সব সময়ই উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা হয়েছে। ভবিষ্যতেও হবে। পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম মুসলিম দেশ হলেও এখানকার মানুষের চেতনার উৎসই হলো অসাম্প্রদায়িকতা ও গণতন্ত্র। এখানে ধর্মন্ধতারও ঠাঁই নেই, সমাজতান্ত্রিকদেরও আশ্রয় নেই। একসময়ে তারুণ্যকে কমিউনিস্টরা টেনেছে হয় লেনিন না হয় মাও সেতুংয়ের মন্ত্র দিয়ে। ভোটের বাক্স তাদের শূন্যই ঠেকেছে। সমাজতান্ত্রিক মস্কোর আজ্ঞাবহ ও আদর্শচ্যুত মতিয়া আর চিন্তায়-আত্মায় চীনের সেবাদাস দিলীপ বড়ুয়ার গাড়িতে যেমন মুজিবের দিয়ে যাওয়া পতাকা উড়ছে শেখ হাসিনার করুণা ধারায়, তেমনি '৭১-এর পরাজিত যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত নিজামী-মুজাহিদের গাড়িতেও শহীদের রক্তে পাওয়া পতাকার অবমাননা হয়েছিল খালেদা জিয়ার অনুকম্পায়। জিয়া-এরশাদ পড়েছিলেন চীনা বামদের খপ্পরে। খালেদা জিয়া চীনা বামদের রাখলেও এখন উগ্র ডানদের কবলে। অন্যদিকে শেখ হাসিনা সোভিয়েত বামদের খপ্পরে। খালেদা জিয়া পারেননি ডানপন্থিদের কবল থেকে মুক্ত হতে, শেখ হাসিনা পারছেন না বামদের প্রভাব বলয় থেকে মুক্ত হতে।

আজকের জমানায় মুজিবকন্যার মন্ত্রিসভায় এত বাম! ভাবাই যায় না! শেষ কথা বলতে চাই, কৈশোর ও তারুণ্যে ছাত্রলীগ আমার প্রেমের পাঠশালা হলেও, আমি মহান মুজিবের আদর্শের সন্তান হলেও, পেশার তারে জড়ানো জীবনে আজ আমার বড় পরিচয় আমি লেখক, পেশাদার সংবাদকর্মী। রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে আমি প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলের নেত্রী ও রাজনৈতিক শক্তির সৃজনশীল সমালোচক। কারও শত্রু নই। দুই নেত্রীর চারপাশে যাদের ক্ষণস্থায়ী ঠাঁই হয়, সুযোগ-সুবিধায় যারা থাকেন আরামে-আয়েশে, আড়ালে-আবডালে তাদের অনেকেই আমার দিকে সমালোচনার তীর ছুঁড়েন। জেনেও আমি কিছু মনে করি না। উপভোগ করি মাত্র। আমি জানি এটা তাদের সাময়িক মোহের প্রতিক্রিয়া মাত্র। অজস পাঠকের ভালোবাসায় সিক্ত আমাদের জীবন। মানুষের ভালোবাসা আমাকে টানে। ক্ষমতার মোহ নয়। ক্ষমতাবানদের মোসাহেবির জন্য আদর্শহীন বামরা থাক। আমি কিন্তু সব বামদের ঘৃণা করি না।

আদর্শের প্রশেক্ষ্ম অবিচল থেকে যেসব বাম কমিউনিস্ট ইহজগৎ ত্যাগ করেছেন ও করবেন তাদের প্রতি আমার বিনম্র শ্রদ্ধা-ভালোবাসা আমৃত্য থাকবে। দেশ ও মানুষের প্রতি আমার দায়বদ্ধতা। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রতি নয়। পৃথিবীর তাবৎ সাহসী মানুষ আমার প্রেরণার উৎস। আমার বাড়ির দেয়ালে মর্যাদায় শোভাপান শেখ মুজিব, গান্ধী, নেতাজী, ইন্দিরা, ম্যান্ডেলা, ফিদেল ক্যাস্ট্রো, চে গুয়েভারা ও রবীন্দ্রনাথ। আমার অনুজ অ্যাডভোকেট পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ যুবলীগ কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য। আমি শাসক আওয়ামী লীগ ও তার নেতৃত্বের কঠোর সমালোচক বলে সে আমার সঙ্গে সম্পর্ক ছিনক্ষ্ম করে রেখেছে। আমার পেশাদারি স্বাধীনচেতা সত্তার কারণে আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে তারা কোণঠাসা। আমি এ নিয়ে তাদের সঙ্গে আলাপেও যাই না। তবে মাঝেমধ্যে আমার মন খারাপ যে হয় না তা নয়, মাঝেমধ্যে হয়। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ আমাকে শক্তি যোগান। আশ্রয় দেন। তিনি বলেছেন 'সত্য যে কঠিন, কঠিনেরে ভালোবাসিলাম/সে করে না কখনো প্রবঞ্চনা।' কিন্তু যখন দেখি জামালপুরের বিখ্যাত জামায়াতির পুত্র যার তিন ভাই শিবির কর্মী ছিলেন অথচ এখন তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক, তখন আমারও মন বিদ্রোহ করে। কবি নজরুলের মতো তখন বলি 'দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়াছি/তাই মুখে যাহা আসে তাহাই কহি'।

 

আরও পড়ুন

Back to top button
Translate »