আমার কিছু কথা ছিলো -রোমেলু লুকাকু (বেলজিয়ান স্ট্রাইকার)

ভেঙে যাওয়ার সময়টা খেয়াল আছে আমার। আমাদের ভেঙে যাওয়া, ক্ষয়ে যাওয়া। মা ফ্রিজের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন, গোটা দৃশ্যটা আমার পরিস্কার মনে আছে। চোখের সামনে ভাসে।

তখন আমার ছয় বছর বয়স। স্কুল ব্রেকের সময় সাধারনত বাড়িতে খাবার জন্যে ফিরতাম। প্রতিদিন, একদম প্রতিদিন মেন্যুতে একই খাবার, পাউরুটি, দুধ। আসলে ঐ বয়সে খাবার নিয়ে কেউ চিন্তা করেনা। আসেনা মাথায়। মা যা দেয় বাচ্চারা খেয়ে ফেলে। তারপরও…তারপরও আমি জানতাম ওর চাইতে বেশি কিছু আমাদের সামর্থ্যের মধ্যেই ছিলোনা।

তারপর আরকি, সেদিনটা আসলো। প্রতিদিনের মতো দুপুরে বাড়ি ফিরে সোজা ঢুকে গেলাম কিচেনে। দেখি মা রেফ্রিজারেটরের সামনে দাঁড়িয়ে, হাতে এক বক্স দুধ। আমার খুবই পরিচিত দৃশ্য। এই দৃশ্যে অপরিচিত যে অংশটা ছিলো তা হচ্ছে মা দুধে কি যেন মেশাচ্ছিলেন। খুব ভালো করে মেশাচ্ছিলেন, বুঝতে পারছেন তো? ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি কি হচ্ছে ঘটনাটা। ভালোমতো মিশিয়ে টিশিয়ে মা খাবার আমার সামনে এনে রাখলেন, মুখে সেই পরিচিত হাসিটা, যেন কিচ্ছু হয়নি। সবকিছু একেবারে ঠিকঠাক। কিন্তু আমি বুঝতে পারছিলাম। বুঝে যাচ্ছিলাম আসলে।

আমার মা দুধে জল মেশাচ্ছিলেন। গোটা সপ্তাহ চলার জন্যে আমাদের হাতে টাকা ছিলোনা। আমরা ক্ষয়ে যাচ্ছিলাম, শুধু গরীব না, আমরা মাটিতে মিশে যাচ্ছিলাম।

আমার বাবা ছিলেন একজন পেশাদার ফুটবলার। ছিলেন ক্যারিয়ারের একদম শেষপ্রান্তে, খেলাও নেই টাকাও শেষ। এর প্রথম ধাক্কাটা গেলো আমাদের কেবল টিভির উপর দিয়ে। নো মোর ম্যাচ অফ দ্য ডে। নো সিগনাল।

এরপর বাড়ির ইলেকট্রিসিটি। এমনও সময় গেছে টানা দু তিন সপ্তাহ আমরা অন্ধকারে কাটিয়েছি। আমরা ডুবে যাচ্ছিলাম অন্ধকারে। নিকশ কালো অন্ধকার! রাতে বাড়িতে এসে দেখতাম গোটা বাড়ি প্যাঁচার মতো অন্ধকারে বসে আছে। স্নানের জন্যে গরম জল চাইলে আমার মা স্টোভে কেতলি চড়িয়ে দিতো। গরম জল হতো। শাওয়ারের নীচে দাঁড়িয়ে ছোট্ট একটা কাপ দিয়ে মাথায় ঢালতাম সেই গরম জল।

এমনও সময় গিয়েছে, মা বাড়ির পাশের বেকারি থেকে পাউরুটি আনতেন বাকীতে। বেকারীর লোকজন আমাকে আর আমার ভাইকে চিনতো ঠিক করেই। ওরা আমার মা কে বাকীতে দিতো পাউরুটি। সোমবার বাকীতে নিয়ে শুক্রবার শুধে দিতে হতো।

জানতাম আমরা খুব একটা বিশ্রী সময় পার করছি, নিয়মিত যুদ্ধ করে আমরা বেঁচে আছি। কিন্তু যখন মাকে দেখলাম দুধে জল মেশাতে, বুঝে গিয়েছিলাম সব শেষ। বুঝতে পারছেন তো? এই ছিলো আমাদের জীবন।

ঐদিন আমি মাকে কিচ্ছু বলিনি। মাকে কষ্ট দিতে চাইনি, বেচারিকে আর কত টানাপোড়েনে ফেলবো! চুপচাপ লাঞ্চ শেষ করে আবার স্কুলে চলে গিয়েছিলাম। বিশ্বাস করুন,সেদিন নিজের ভেতর খুব ভাঙাগড়া চললো। ঐ ছয় বছরের বাচ্চাটার ভেতর। মনে হচ্ছিলো হঠাত করেই কে যেন আমার ঘুমটা ভাঙিয়ে দিয়েছে, এতদিন ঘুমিয়ে ছিলাম। আমি কিভাবে যেন জেনে গেছি আমাকে কি করতে হবে। জানতাম কি করতে যাচ্ছি।

মাকে এভাবে বেঁচে থাকতে দেখা যায়না। সম্ভব না। আমি কোনভাবেই নিতে পারবোনা।

ফুটবল নিয়ে যারা কথা বলে তারা খেলোয়াড়দের মানসিক শক্তি নিয়ে কথা বলতে পছন্দ করে। কে চাপে ভেঙে পড়েনা, কে কতো শক্ত মনের ইত্যাদি ইত্যাদি। সেই হিসেবে যদি বলেন, আপনার দেখা ফুটবলারদের মধ্যে আমিই সবচে কঠিন মানসিক সামর্থ্যের মানুষ। আমার মনে পড়ে…অন্ধকার রুমের ভেতর আমার ভাই, মা আর আমি প্রার্থণা করছি…ভাবছি, বিশ্বাস করছি ,জানতাম এদিন বেশিদিন থাকবেনা। বদল আসবেই।

প্রতিজ্ঞাটা নিজের ভেতরেই রেখেছিলাম। প্রতিজ্ঞা্র কথা কাউকে বলতে হয়না তাই বলিনি। কিন্তু মাঝে মাঝে স্কুল থেকে এসে দেখতাম মা কাঁদছে। ভাল্লাগতো না। একদিন বলেই ফেললাম মা কে। “মা, সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। দেখে নিও। আমি আন্দেরলেখটে খেলবো। খুব শিঘ্রীই খেলবো। আমাদের সব ঠিক হয়ে যাবে। তোমাকে এত কষ্ট করতে হবেনা।”

আমার বয়স তখন ছয়।

বাবাকে জিজ্ঞাসা করলাম, “প্রফেশনাল ফুটবল কত বছর বয়স থেকে খেলা যায়?”

বাবা বললেন, “ষোল বছর।”

আমি বললাম,”আচ্ছা, তাহলে ষোলই সই।”

হবে। হতেই হবে। শুধু সময়টার অপেক্ষা।

একটা কথা বলি-প্রতিটা ম্যাচ, প্রতিটা খেলা আমার জন্যে ফাইনাল। যখন পার্কে খেলেছি, ফাইনাল ছিলো। কিন্ডারগার্ডেনে ব্রেক টাইমে যখন খেলেছি-ফাইনাল ছিলো। আমি সিরিয়াস, ভয়ঙ্কর সিরিয়াস। যখনই বলে শট করেছি, চেষ্টা করেছি বলের কভারটা ছিঁড়ে ফেলতে। ফুল পাওয়ার। কোন ছেলেখেলা না, নো ফিটনেস শট। আমার কোন ফিফা ছিলোনা। ছিলোনা কোন প্লেস্টেশন। মাঠে আমি খেলে বেড়াইনি, খুনের নেশা নিয়ে বল পায়ে দাবড়ে বেরিয়েছি।

যখন লম্বা হতে শুরু করলাম, কয়েকজন শিক্ষক, অন্য বাচ্চাদের বাবা মায়েরা খুব ভড়কে যেতো দেখলে। একবার একজন জিজ্ঞাসাই করে বসলো, “এই ছেলে, তোমার বয়স কতো? জন্মেছো কোথায়?”
এই প্রশ্নটা আমি ভুলবোনা কখনোই।

আমার তখন চেহারায় লেখা, “হোয়াট? আর ইউ সিরিয়াস?”

আমার বয়স যখন ১১, লিয়ার্সে ইয়ুথ টিমে খেলছি। একদিন বিপক্ষ দলের এক খেলোয়াড়ের বাবা আমাকে আক্ষরিক অর্থেই মাঠে নামার সময় আটকে দিয়েছিলো। ভাবটা এমন যে” আরে এই ছোকড়ার বয়স কতো? এর আইডি কোথায়? এসেছে কোত্থেকে?”
মনে মনে বললাম, “কোত্থেকে এসেছি? আচ্ছা? আমি এই অ্যান্টওয়ের্পেই জন্মেছি। এসেছি বেলজিয়াম থেকে।“

বাবা ওখানে ছিলেন না। দূরের খেলা গুলোতে আমি একাই যেতাম কারন আমাদের কোন গাড়ি নেই। একেবারে একা একটা ছেলে। আমাকেই দাঁড়াতে হয়েছে আমার জন্যে। আমার অবলম্বন হতে হয়েছে। ব্যাগ থেকে আইডি বের করে সোজা ঐ লোকের হাতে ধরিয়ে দিলাম। সবাই এক এক করে আমার আইডি দেখলো। পরিস্কার মনে আছে ওদের এই তীব্র অবিশ্বাসে আমার শরীরের রক্ত টগবগ করে ফুটছিলো। ঝড়ের বেগে মাথায় ভাবনা চলছে…আপনাদের ছেলেগুলোকে আমি ছিঁড়ে ফেলবো। একদম ছিঁড়ে ফালাফালা করে ফেলবো, এমন ভাবে ছিঁড়বো যাতে ধ্বংস হয়ে যায়। আপনাদের ছেলেরা আজ কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি যাবে…

আমি বেলজিয়ান ফুটবলের ইতিহাসের সেরা হতে চেয়েছি। ওটাই আমার লক্ষ্য। শুধু ভালো না, গ্রেইটও না, একদম সেরা। প্রচন্ড রাগ নিয়ে খেলতাম, এর কারন অনেক…অনেক কারন…কারন আমার অ্যাপার্টমেন্টে ইঁদুর দৌড়ে বেড়ায়…কারন আমাদের মেঝেতে ঘুমোতে হয়…কারন আমি চ্যাম্পিয়নস লীগ দেখতে পারিনা…কারন অন্যেরা আমার দিকে এমনভাবে তাকায় যেন চিড়িয়াখানার কোন আজব জন্তু দেখছে…কারন আমার মাকে আমার দুধের গ্লাসে জল মেশানোর কষ্ট নিয়ে বেঁচে থাকতে হয়…বাকীতে পাউরুটি আনতে হয়…

আমি একটা মিশনে নেমেছি।

যখন আমার বয়স ১২, ততদিনে ৩৪ ম্যাচে ৭৬টা গোল করে ফেলেছি।

প্রতিটা গোল আমি করেছি বাবার জুতো পায়ে দিয়ে। আমার পা বাবার মাপের সমান হবার পর থেকেই আমরা একই জুতো শেয়ার করি।

তো এর মাঝেই আমি একদিন দাদুকে ফোন করেছি। আমার মায়ের বাবা। ভদ্রলোক আমার জীবনের খুব গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষ। কঙ্গোতে এই একটা মানুষের সাথেই আমার যোগাযোগ। কঙ্গোর সাথে এই একটাই আমার সম্পর্ক। আমার বাবা-মা কঙ্গো থেকেই এসেছিলেন। ফোনে দাদুকে বলছিলাম,” আমি খুব ভালো খেলছি দাদু। ৭৬ টা গোল করেছি। লীগ জিতেছি এবার। বড় দলগুলোর চোখ পড়েছে আমার উপর।“

সাধারণত দাদু আমার ফুটবল খেলা নিয়েই সবসময় জানতে চাইতো। খুব উৎসাহী ছিলেন মানুষটা।

দাদু বললেন,” সাবাস রোম, সাবাস। আমার জন্যে একটা কাজ করতে পারবি তুই?”

বাহ! পারবো না কেন? বলেই দেখো।

দাদু বললেন, “আমার মেয়েটাকে দেখে রাখতে পারবি, প্লিজ?”

পুরোপুরি কনফিউজড হয়ে গেলাম। আরে দাদু এসব কি বলছে? সমস্যা কি?

বললাম, “মার কথা বলছো? আচ্ছা, ঠিক আছে। আমরা তো ভালোই আছি। উই আর ওকে।“

দাদু বললেন, “না ,প্রতিজ্ঞা করে বল। প্রতিজ্ঞা করতে পারবি? আমার মেয়েটাকে শুধু দেখে রাখিস। আমার হয়ে দেখে রাখিস কেমন?”

এর ঠিক পাঁচদিন পর আমার দাদুটা মরে গেলো। তখন বুঝলাম আসলে দাদু কি বলতে চেয়েছিলেন।

খুব কষ্ট পেয়েছিলাম আমি। আর চারটা বছর বাঁচলে কি হতো? আর মাত্র চারটা বছর বাঁচলেই আমার দাদুটা দেখে যেতে পারতো আমি আন্দেরলেখটে খেলছি। দেখে যেতে পারতো আমি আমার প্রতিজ্ঞাটা রাখতে পেরেছি। দেখে যেতে পারতো তার মেয়েটা এখন ভালো আছে। সবকিছু ঠিকঠাক।

মাকে বলেছিলাম ১৬ বছরেই হয়ে যাবে।

যদিও আমার দেরি হয়েছিলো। দেরি হয়েছিলো ঠিক ১১ দিন।

২০০৯ এর ২৪ শে মে।

প্লে অফ ফাইনাল। আন্দেরলেখট বনাম স্ট্যান্ডার্ড লিগ।

খুব এলোমেলো একটা দিন। মাতাল একটা দিন। সিজনের শুরুতে আন্দেরলেখটের আন্ডার নাইনটিন দলে আমি ছিলাম। ছিলাম বেঞ্চে। বেঞ্চ গরম করা ছাড়া কোন কাজ নেই। কোচ আমাকে মনে হয় সেজন্যেই রেখেছিলেন। খেলোয়াড়েরা এসে যাতে গরম বেঞ্চে বসতে পারে তাই বেঞ্চে বসে থাকবে রোম। আমার মনে হলো, “আরে আশ্চর্য তো! এভাবে বেঞ্চ লেপ্টে বসে থাকলে ষোলোর আগে আমি প্রফেশনাল কন্ট্যাক্ট সাইন করবো কিভাবে? হবে নাতো এভাবে”।

কোচের সাথে বাজি ধরে ফেললাম।

কোচকে বললাম, “কোচ, শুনুন, আমাকে যদি খেলতে দেন ডিসেম্বরের মধ্যে আমি ২৫ টা গোল করবো। গ্যারান্টি।“

ব্যাটাচ্ছেলে হাসা শুরু করলো। হ্যাঁ, সত্যি খুব জোরে হাসা শুরু করলো।

বললাম, “আচ্ছা ঠিক আছে যান। বাজী।”

কোচ বললেন, “ ওকে, কিন্তু যদি ডিসেম্বরের মধ্যে ২৫ টা গোল না করতে পারিস, আবার সোজা বেঞ্চে।”

“ঠিক আছে। কিন্তু যদি আমি জিতে যাই, আমাদের আনা নেয়ার যে মিনিভ্যান আছে সেটা আপনাকে রেগুলার পরিস্কার করতে হবে।“

“আচ্ছা ব্যাটা যা। ডীল।”

“আরেকটা কথা। আপনি তাহলে প্রতিদিন আমাদের প্যানকেক বানিয়ে খাওয়াবেন।”

আমাদের কোচের জীবনে ওই ছিলো সবচে খারাপ বাজী। এরচেয়ে খারাপ বাজি সে তার ইহজন্মে ধরেছে বলে মনে হয়না।

নভেম্বরের মধ্যেই ২৫ টা গোল হয়ে গেলো। ক্রিসমাসের আগেই আমাদের সবার হাতে প্যানকেক। আমরা সবাই ফ্রিতে প্যানকেক খাই ব্রো।

এটা একটা শিক্ষাও বলতে পারেন। যে ছেলেটা খেতে পায়না, খুব খিদে নিয়ে ঘুড়ে বেড়াচ্ছে তার সাথে মশকরা করা ঠিক না।ঘটি বাটি উড়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে।

Soccer Football – 2018 World Cup Qualifications – Europe – Greece vs Belgium – Athens, Greece – September 3, 2017 Belgium’s Romelu Lukaku celebrates after the match REUTERS/Alkis Konstantinidis

আন্দেরলেখটের সাথে আমি প্রোফেশনাল কন্ট্যাক্ট সাইন করলাম আমার জন্মদিনে, ১৩ ই মে। সাইন করে টরে ফিফা আর টেলিভিশনের ক্যাবল প্যাকেজ কিনে সোজা বাড়ি। ততদিনে ফুটবল সীজন শেষ। বাড়িতে বসে খুব চিল করছি। সে বছর বেলজিয়ান লীগের অবস্থা খুব উড়াধুড়া ধরনের। আন্দেরলেখট আর স্ট্যান্ডার্ড লিগ সিজন শেষ করেছে সমান পয়েন্ট নিয়ে। দুই লীগের প্লে অফ হবে কে চ্যাম্পিয়ন তা ঠিক করার জন্যে।

প্রথম লেগে আমি স্রেফ ফ্যান। টিভিতে খেলা দেখলাম।

সেকেন্ড লেগের আগের দিন কোচের ফোন।

“হ্যালো?”
“হ্যালো,রোম। কি করিস?”
“পার্কে ফুটবল খেলতে বের হচ্ছিলাম।“
“না, না, না, না। এক্ষুনি ব্যাগ গোছা। এক্ষুনি।
“কি? আমি আবার কি করলাম?”
“না, না, না। তোকে এক্ষুনি স্টেডিয়ামে আসতে হবে। ফার্স্ট টীম তোকে চাচ্ছে।“
“ইয়ো…হোয়াট?! আমি?!”
“হ্যাঁ, তুই। এক্ষুনি চলে আয়।“

ফোন রেখে আক্ষরিক অর্থেই দৌড়ে বাবার রুমে ঢুকে গেলাম। ইয়ো! উঠে পরো বাপজান। আমাদের যেতে হবে।“

বাবার বিরক্তি নিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন,” হাহ? কি? কোথায় যেতে হবে?”
“আন্দেরলেখট, ম্যান!”

ঐসময়টা আমি কখনোই ভুলবোনা। স্টেডিয়ামে ঢুকে আমি মোটামুটি দৌড়েই ড্রেসিংরুমে ঢুকে গেলাম। কিটম্যান জিজ্ঞাসা করলো, “তো, কিডো, কোন নাম্বারটা চাস?”

বললাম, “১০ নাম্বার দিন।“

হা হা হা হা হা! আমি আসলে জানিনা। ওই বয়সে আসলে কি ভয় পাওয়া উচিৎ তা জানতাম না।

আমাকে কিটম্যান বললেন, “অ্যাকাডেমী প্লেয়ারদের ৩০ এর উপর নাম্বার নিতে হয়।“
“ওকে। তিন যোগ ছয়, নয় হয়। কুল…ম্যান। আমাকে ৩৬ নাম্বার দিন।“

ঐ রাতে ডিনারে সিনিয়র প্লেয়ারেরা আমাকে দিয়ে গান গাওয়ালো। ঠিক মনে নেই কোন গানটা গেয়েছিলাম। আমিতো তখন ঘোরের মধ্যে।

পরেরদিন আমার এক বন্ধু বাড়িতে এসে আমার খোঁজ করেছিলো। পার্কে খেলতে যাবো কিনা জানতে এসেছে। মা বলে দিলো, “ও তো খেলতে চলে গেছে।”
বন্ধু জিজ্ঞাসা করলো, “খেলতে? কোথায়?”
“আর কোথায়? ফাইনাল খেলতে গেছে।”

বাসে করে আমরা স্টেডিয়ামে গেলাম। প্রতিটা খেলোয়াড়ের গায়ে ক্যুল স্যুট। ধীরস্থির হেঁটে ঢুকছে সবাই। আমার গায়ে এক উৎকট ট্র্যাকশ্যুট চাপানো। টিভি ক্যামেরা সব যেন আমারই মুখের উপরে ধরা। বাস থেকে লকার রুম ৩০০ মিটার। কত হবে আর, মিনিট তিনেকের হাঁটা পথ। লকার রুমে পা রাখা মাত্র আমার মোবাইল মনে হলো পাগল হয়ে গেলো। তিন মিনিটে আমার মোবাইলে ২৫ টা মেসেজ এসেছে। টিভিতে দেখে আমার বন্ধুরা পুরো পাগলা হয়ে গেছে।।
“ব্রো?! তুই এই খেলায় কেন?”
“রোম, কি হচ্ছে এইসব” তোকে টিভিতে দেখাচ্ছে কেন?”

শুধু একজনের মেসেজ ব্যাক করেছিলাম। আমার প্রাণের বন্ধু। লিখেছিলাম, “দোস্ত আমি খেলবো কিনা জানিনা। কি হচ্ছে তাও জানিনা। টিভিতে দেখতে থাক শুধু।“

৬৩ মিনিটের সময় ম্যানেজার আমার কাঁধে চাপড় দিলেন।
আন্দেরলেখটের হয়ে মাঠে নেমে গেলাম। আমার বয়স তখন ১৬ বছর ১১ দিন।

সেদিনের সেই ফাইনালে আমরা হেরেছিলাম। তাতে কি! আমি ছিলাম সুখের সাত সমুদ্রে। মায়ের কাছে দেয়া, আমার দাদুর কাছে দেয়া কথা আমি রাখতে পেরেছি। মাঠে নামার মুহুর্তটাতেই আমি জেনেছি সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। একেবারে সব।

পরের সীজনে, আমি তখনো হাই স্কুলে পড়ছি আবার একই সাথে ইওরোপা লীগে খেলছি। স্কুলে আমি সাধারণত একটা বড় ব্যাগ নিতাম যাতে স্কুল শেষে বিকেলে ফ্লাইট ধরতে পারি। বিশাল ব্যবধানে আমরা লীগ জিতলাম। আফ্রিকান প্লেয়ার অফ দ্য ইয়ারে আমি দ্বিতীয়। কি বলবো…অস্থির…পুরো অস্থির।

এসব কিছুরই আশা আমার ছিলো। জানতাম এরকমই হবে। কিন্তু এত দ্রুত হবে তা জানতাম না। হঠাত করেই মিডিয়া আমার উপর আশা করা বাড়িয়ে দিলো। যেন সমস্ত আশা ভরসা মূল আমি। বিশেষ করে জাতীয় দলে। ঠিক কি কারনে জানিনা, বেলজিয়ামের হয়ে আমি ঠিক ভালো খেলতে পারছিলাম না। হচ্ছিলো না ঠিকঠাক সব।

বাট, ইয়ো-কাম অন। আমার বয়স তখন কত? ১৭! ১৮! না হয় ১৯!

যখন সব ঠিকঠাক হলো তখন খবরের কাগজে বিভিন্ন আর্টিকেলে দেখলাম লিখছে, রোমেলু লুকাকু, দ্য বেলজিয়ান স্ট্রাইকার।

যখন সব ঠিক থাকেনা তখন লিখছে, রোমেলু লুকাকু ,কঙ্গোলিজ বংশোদ্ভত বেলজিয়ান স্ট্রাইকার।

যেভাবে আমি খেলি, সেটা আপনার পছন্দ নাই হতে পারে। অস্বাভাবিক কিছু না। কিন্তু আমি এখানে জন্মেছি। বড় হয়েছি অ্যান্টওয়ের্প, লীগ, ব্রাসেলসে। স্বপ্ন দেখেছি আন্দেরলেখটের হয়ে খেলার। ভিনসেন্ট কোম্পানি হবার স্বপ্ন দেখেছি। আমার মুখের কথা শুরু হয় ফ্রেঞ্চ দিয়ে শেষটা হয় ডাচ। এর মাঝে আমার এলাকা বুঝে কথার মধ্যে স্প্যানিশ বা পর্তুগীজ বা নিদেনপক্ষে লিঙ্গালাও ঢুকে যায়।

কারন আমি বেলজিয়ান।

আমরা সবাই বেলজিয়ান। এজন্যেই এই দেশটা দুর্দান্ত, তাইনা?

আমার দেশেরই কিছু লোক চায় আমি যাতে ব্যার্থ হই, কেন চায় তা আমি ঠিক জানিনা। আসলেই জানিনা। যখন আমি চেলসি তে গেলাম, আমি খেলিনি। সবার হাসি শুনেছি তখন। যখন আবার ধারে ওয়েষ্ট ব্রমে গেলাম খেলতে তখনও আমি ওদের হাসিটা শুনেছি।

সমস্যা নেই। এসব লোকের পরোয়া করিনা। আমার সিরিয়ালে যখন দুধের বদলে জল মেশানো হয়েছে তখন এরা কেউ ছিলোনা। আমার যখন কিছুই ছিলোনা তখন যেহেতু এরা আমার পাশে ছিলোনা তাই এদের পক্ষে আমাকে বোঝা সম্ভব না।

মজার কথা কি জানেন? সেই বাচ্চা অবস্থাতে আমি টানা দশটা বছর চ্যাম্পিয়নস লীগ ফুটবল মিস করেছি। আমাদের টিভি দেখার সামর্থ্যই ছিলোনা। সব বাচ্চারা স্কুলে গিয়ে ফাইনাল নিয়ে কথা বলতো, আমিতো কিছুই জানিনা। জানবো কিভাবে, দেখিনি তো! আমার ২০০২ এর কথা মনে আছে ।সেবার মাদ্রিদ লিভারকুসেনের সাথে খেলেছিলো। সবাই খেলা শেষে এসে বলছিলো, “ ভলিটা! ওহ মাই গড, কি ভলি!”

সবার সাথে সাথে আমিও চোখ কপালে তুলেছি। আসলেই! কি অসাধারন ভলি! এমন ভাব যেনো আমি ভলিটা নিজে চোখে দেখেছি। খুব সুন্দর অভিনয়। দরিদ্রদের মাথা উঁচু করে টিকে থাকতে হলে খুব ভালো অভিনয় জানতে হয়।

এর দু সপ্তাহ পর কম্পিউটার ক্লাসে আমার এক ক্লাসমেইট নেট থেকে ভিডিওটা ডাউনলোড করেছিলো। তখন দেখলাম জিদানের সেই অবিশ্বাস্য ভলি!

ঐ গ্রীষ্মে আমি সেই ক্লাসমেইটের বাড়িতে গিয়েই বিশ্বকাপ ফাইনালে রোনালদো- দ্য ফেনোমেনন এর কীর্তি দেখলাম। তাও নেট থেকে নামানো ফাইল। কতো শুনেছি এই গোলগুলোর গল্প। ঘন্টার পর ঘন্টা সবাই গোলগুলো নিয়ে গল্প করেছে। সেইসব গোল! আমিও সবার কথায় মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিয়ে গেছি।

ওইসময়টায় আমার জুতোয় ছিদ্র ছিলো। বেশ বড় বড়।

ঠিক ১২ বছর পর আমি খেললাম বিশ্বকাপে।

এবারেও খেলবো আরেকটা বিশ্বকাপ। তবে বিষয় কি জানেন, এবারে আমার মাথায় মজা করার ভুত চেপেছে। এত চাপ, নাটকের ভীড়ে আসলে জীবনটা খুবই ছোট। আমাদের দল বা আমাকে নিয়ে যে যা ইচ্ছা বলুক, কিসসু যায় আসেনা। এবার মজাই করবো।

ভাই, শোনেন-যখন ছোট ছিলাম, থিয়েরে অঁরির ম্যাচ টিভিতে দেখার পর্যন্ত সামর্থ্য ছিলোনা ! আর এখন! প্রতিটা দিন ওর সাথে আমাদের জাতীয় দলে থাকছি। শিখছি ওর কাছ থেকে। জীবন্ত এক কিংবদন্তীর পাশে রক্তমাংসের এই আমি দাঁড়িয়ে শুনি কিভাবে দুই খেলোয়াড়ের মাঝের ছোট্ট ফাঁকা জায়গাটায় চিতার ক্ষিপ্রতা নিয়ে দৌড়াতে হয়। যেমনটা অঁরি নিজে করতো। এই দুনিয়ায় অঁরিই সম্ভবত একমাত্র মানুষ যে আমার চাইতে বেশি খেলা দেখেছে টিভিতে। আমরা সবকিছুতেই তর্ক করি। এমনকি পাশে বসে জার্মানীর দ্বিতীয় বিভাগের ফুটবল নিয়েও কথা বলি। পাগলামো বলতে পারেন অবশ্য।

এই যেমন বলি, “থিয়েরি, ফরচুনা ড্যুসেলডর্ফের সেট আপটা দেখেছেন?”

“ডোন্ট বি সিলি রোম। অবশ্যই দেখেছি।”

এইযে দৃশ্যটা, কথাগুলো, এগুলোই আমার জন্যে “কুলেষ্ট থিং”।

প্রায়ই মনে হয়, আহারে, আমার দাদুটা যদি দেখে যেতে পারতো!

আমি প্রিমিয়ার লীগ নিয়ে বলতাম না।

ম্যানচেষ্টার ইউনাইটেড নিয়ে কথা বলতাম না।

চ্যাম্পিয়নস লীগ নিয়ে না।

বিশ্বকাপ নিয়েও না।

কিছু নিয়েই আলাদা করে দাদুকে কিছু বলার নেই আমার। শুধু যদি আমাদের জীবনটা দেখে যেতে পারতো! আরেকটা বার যদি দাদুর সাথে ফোনে কথা বলতে পারতাম, যদি জানাতে পারতাম…

দেখেছো দাদু? বলেছিলাম না? তোমার মেয়েটা ঠিক আছে এখন। আমাদের অ্যাপার্টমেন্টে এখন কোন ইঁদুর নেই। আমাদের আর মেঝেতে ঘুমোতে হয়না। আমাদের এখন কোন কষ্ট নেই। আমরা ভালো আছি। ভালো আছি…

ওদের আর আমার আইডি চেক করতে হয়না। ওরা এখন আমার নামটা জানে। রোমেলু লুকাকু…

মূলঃ দ্য প্লেয়ার্স ট্রিবিউন।
অনুবাদঃ মানিক চন্দ্র দাস।

আমারও আর্মি গার্ড আছে! -জেরদান শাকিরি

আমাদের বাড়িটা ঠিক গরম হতোনা, জানেন! একটা বড় ফায়ারপ্লেস ছিলো ঠিকই। কিন্তু ঐযে পুরানো বাড়ি হলে যা হয় আরকি। বাসেল এর একটা ফার্মের ভেতর পুরোনো বাড়িতে আমরা থাকতাম। এরকম জায়গায় পুরানো বাড়ি হলে যা হয়, একেবারে সেরকম। বরফের মতো ঠান্ডা বাড়ি। ও নিয়ে আমি তেমন একটা মাথা ঘামাইনি। ঘামিয়ে লাভটা কি? মোটামুটি উন্মাদের মত চারপাশ দৌড়ে আমি গা গরম রাখতাম। ঠান্ডা নিয়ে অভিযোগের অন্ত ছিলোনা বেচারা আমার বড় ভাইটার। হবে নাইবা কেন, বেচারার ঘরটা ছিলো ফায়ারপ্লেস থেকে অনেকখানি দূরে। তাও আবার দোতলায়। শীতের দিনে গায়ের উপর গোটা পাঁচেক কম্বল চাপিয়ে ঘুমুতে হতো ওর।

যুদ্ধের ঠিক আগ দিয়ে আমার পরিবার কসভো ছেড়ে পাড়ি জমায় সুইজারল্যান্ডে। আমার বয়স তখন চার। সাথে আমার আরো দুই ভাই। আর বাবা-মা। বেচারারা তিন ছেলে নিয়ে এসে সুইজারল্যান্ডে থিঁতু হতে চাচ্ছিলেন। কাজটা কিন্তু সহজ না, খুব কঠিন। বয়স্ক গাছের শিকড় উপড়ে আরেক জায়গায় নিয়ে লাগানোর পর বাঁচানো যেমন কঠিন, বিষয়টা সেরকম। তার উপর আমার বাবা সুইস জার্মান ভাষাটা পারতেন না। তাই তাঁকে প্রথমেই কাজ করতে হয়েছে রেস্তোরাঁর কিচেন সিঙ্কে। থালা বাসন ধুয়ে দিতেন। পরে বাবা অবশ্য রাস্তার কনস্ট্রাকশন এর কাজ পেয়েছিলেন। মা কাজ করতেন ক্লিনারের। শহরের অফিস বিল্ডিং এ ছিলো তাঁর কাজ। (মায়ের সাথে আমরা তিন ভাই থাকতাম। আমি ছিলাম ভ্যাকুয়াম হেল্পার আর আমার দুই ভাই পরিস্কার করতো জানালা।)

সুইজারল্যান্ড খুব খরুচে দেশ। আমার বাবা মায়ের জন্যে বিষয়টা ছিলো আরো বেশি কঠিন। তাঁরা কসভোতে থেকে যাওয়া আমাদের পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের জন্যে টাকা পাঠাতেন। প্রথম প্রথম আমরা বিমানে চেপে কসভোতে আত্মীয়স্বজনদের দেখতে যেতাম। ওই বয়সের কথা আমার মনে থাকার তো কথা না, মায়ের গল্পে জেনেছি যে আমরা বিমানে চেপে যেতাম। মা বলতেন, “প্লেনে তুই একটা আস্ত শয়তান! সীট বেয়ে উঠে সবসময় পেছনের সীটের লোকজনকে ধরতে চাইতি! চুপ থাকা কাকে বলে ওইসময় যদি তোকে শেখানো যেতো!”

যুদ্ধ শুরু হবার পর সবকিছু খুব কঠিন হয়ে গেলো। কসভোতে যাওয়াতো অসম্ভব। যুদ্ধ চলছে। যারা ওখানে আটকা পড়েছিলো তাদের জন্যে সময়টা খুব কঠিন হয়ে গেলো। আমার কাকার বাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে, আরো অবর্ণনীয় সব কষ্ট। বাবা যতটা বেশি সম্ভব টাকা পাঠানোর চেষ্টা করতেন তখন। প্রয়োজনের চাইতে বেশি একটা পয়সাও খরচ করার কোন উপায় আমাদের ছিলোনা। শুধু এক জন্মদিনে একটা অতিরিক্ত জিনিস গিফট পেয়েছিলাম।

মজার গল্প আসলে—রোনালদো হচ্ছে আমার আইডল। আসল রোনালদো। ওর খেলাটা আমার কাছে যাদু মনে হতো। একেবারে নির্ভেজাল যাদু। ৯৮ এর ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে রোনালদো ইনজুরড ছিলো, হেরেও বসলো একেবারে লেজে গোবরে করে। এই রোনালদো লোকটার জন্যে আমার খুব মায়া লাগছিলো। কষ্ট হচ্ছিলো মানুষটার জন্যে। ঐ বয়সে কি আর কষ্টটা নেয়া যায়! কেঁদেছি খালি রোনালদোর জন্যে। খুব বেশী কেঁদেছি। বিশ্বকাপের মাস তিনেক পরেই আমার সপ্তম জন্মদিন ছিলো। মায়ের কানের কাছে ঘ্যান ঘ্যান শুরু করলাম, “জন্মদিনে আমাকে রোনালদোর হলুদ জার্সি কিনে দিতে হবে। আর কিচ্ছু লাগবেনা। ও মা, আমার রোনালদোর জার্সি লাগবে…”

জন্মদিনের দিন মায়ের হাতে একটাই বাক্স দেখা গেলো। আমার জন্যে। খুলে দেখলাম সেই জার্সি। রোনালদোর হলুদ জার্সি। বাজারে নকল পাওয়া যায়না? ওরকম একটা। নকলই তো হবে, আসলটা কেনার টাকাটাই বা কোথায় আমাদের। বাক্স খুলে আর তর সইছিলো না। জার্সিতে ব্রাজিলের ব্যাজ আছে কিনা সেটাও আমার দেখার কথা মাথায় নেই। হলুদ একটা গেঞ্জি ,পিছনে সবুজ রঙে ৯ লেখা। আমার জীবনের সবচে সুখের মুহুর্ত! প্রতিদিন আমি এই জার্সিটা পড়েছি, টানা প্রায় দশদিন চলেছে জার্সির উপর স্টীম রোলার। সেই জার্সির সাথে আবার হলুদ শর্টস। সেগুলো চেপেই ঘুরতাম।

স্কুলে একমাত্র অভিবাসী শিশু আমিই, আর কেউ নেই। সুইস বাচ্চাগুলো বুঝতোনা আসলে আমি কেন ফুটবল নিয়ে এত ব্যস্ত থাকি, কেন আমার সবটা জুড়ে শুধু ফুটবল। সুইজারল্যান্ডে ফুটবল শুধুই একটা খেলা, ডালভাত টাইপ। দুনিয়ার অনেক জায়গায় ফুটবলের আরেক নাম জীবন, সুইজারল্যান্ডে বিষয়টা তেমন না। আমার সবটাতেই ফুটবল, উদাহরন দিয়ে বললে বুঝবেন।

চার বছর পর ৯৮ এর বিশ্বকাপে রোনালদো মাথায় এক অদ্ভুত চুলের ছাঁট নিয়ে আসলেন খেলতে। ত্রিভূজাকৃতি। দেখেই তো মাথায় ভূত চাপলো। সোজা হেয়ারড্রেসারের কাছে গিয়ে বললাম, “আমাকে রোনালদো ছাঁট দিয়ে দিন”। আমার মাথার চুল ব্লন্ড এবং তার উপরে কোকড়া চুল। ব্লন্ড কোকড়া চুলে ঐ ছাঁট! পাগলা কাজকারবার আর কাকে বলে!

ওরকম চুল নিয়ে গেলাম স্কুলে। সবাই হতভম্ব। কেউ কিছু বলেনি, কিন্তু মনের কথাটাতো বোঝা যায়! সবাই ভাবছিলো আসলে, হালার হইছে কি? করছে টা কি মাথায়?

আমি ওসব পাত্তাটাত্তা দেইনি। আমি ওরকমই। আমার স্কুলটা ছিলো শহরের ভালো এলাকায় আর আমার বাসা ছিলো সবচে খারাপ এলাকার পাশে। বাসা থেকে পাঁচ মিনিটের হাঁটা পথ। কিন্তু মজাটা কি জানেন, এলাকা খারাপ হলেও ভালো ফুটবল খেলাটা ওখানেই হতো। ওখানে যেতে মা পই পই করে বারন করতো , শোনে কে ? প্রতিদিন স্কুল শেষে হেঁটে রওয়ানা দিতাম ওখানে। শুধু খেলার জন্যে। সুইজারল্যান্ড সম্পর্কে লোকজনের খুব ভাল ধারণা, গোটা দেশোটা আসলেই ভালো। কিন্তু এই পার্কটা…এই পার্কটা পুরো পাগলা।

প্রতিটা দল ইউনাইটেড নেশনস এর মতো, টার্কিশ আছে, আফ্রিকান আছে, সার্বিয়ান, আলবেনিয়ান…একদম সব। আর শুধুতো ফুটবল না-সবাই আবার ওই পার্কে ঘুরতে যাচ্ছে, একপাশে জার্মান হিপহপ বাজছে, ছেলেপিলে ফ্রিস্টাইল র‍্যাপিং করছে, আবার হঠাত দেখা গেলো খেলার মাঝে একেবারে মাঝখান দিয়ে মেয়েরা হেঁটে চলে যাচ্ছে। অদ্ভুত জায়গা।

পার্ক যেমনই হোক, ফুটবলটা হতো আসল। রিয়েল ফুটবল যাকে বলে। প্রায়ই মাঠে ঘুষোঘুষি দেখা যেত, এ ওকে ধরে ঘুষোচ্ছে, ও ওকে ধরে পেঁদিয়ে পোদের বিষ ঝেড়ে দিচ্ছে। আমি অবশ্য ওরকম মার খাইনি। মুখটা সবসময় বন্ধ রাখতাম তো, তাই মনে হয় মার খেতে হয়নি। কিন্তু ঐ পার্কে খেলাটা আমাকে আসলেই সাহায্য করেছে। ছোটবেলাতেই জেনে গিয়েছিলাম কিভাবে বড়দের সাথে খেলতে হয়। তাও যেনতেন বড় মানুষ না, এরা খুব সিরিয়াস ধরনের খেলোয়াড়। মজা করতে খেলেনা।

আমার বয়স যখন ১৪ বছর, এফসি বাসেল যুব দলে খেলছি। প্রাগে নাইক কাপে খেলার সুযোগ পেলাম। সমস্যা হয়ে গেলো যে ঐ কাপে খেলতে গেলে কয়েকদিন স্কুল মিস দিতে হয়। টিচারকে বললাম, সোজা মানা করে দিলেন। সুইজারল্যান্ডে টিচারেরা স্কুলিং খুব সিরিয়াসলি নেন, তাই না করাটাই স্বাভাবিক। ভাবলাম, খাইছে! তাহলে অসুস্থ্যের অভিনয় ছাড়া গতি নেই।

বাড়িতে এসে মাকে দিয়ে ফ্লু বা এরকম একটা কিছুর নোট লিখিয়ে স্কুলে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। চলে গেলাম প্রাগ। ঐ টুর্নামেন্টে আমি খুব, খুবই ভালো খেলেছিলাম। এখানেই প্রথমবারের মতো অন্য দেশের ছেলেপিলেদের দেখলাম অবাক হয়ে আমার খেলা দেখছে। নিজেদের মধ্যে ফিসফাস, এইত্তো, এই ব্যাটাই বাসেল থেকে এসেছে। থাকেনা? বোঝা যায়তো আসলে, চেহারার দিকে তাকালেই। খুব গর্ব হলো বিষয়টায়। দারুন এক অনুভূতি।

প্রাগ থেকে ফেরত গিয়ে সোমবার গেলাম স্কুলে। তখনও ভাব ধরে আছি, আমি এখনো অসুস্থ্য। বোঝেনতো আসলে। অভিনয়টা করাই লাগে।

আমাকে দেখেই টিচার বললেন, “জেরদান, এদিকে এসো। তাড়াতাড়ি…”

হাত টাত নেড়ে ডাকছেন ভদ্রলোক। লক্ষন সুবিধের লাগলো না।

স্যারের ডেস্কের কাছে গেলাম। একটা খবরের কাগজ টেবিলে ঠাস করে ফেলে বললেন, “অসুস্থ্য, তাইনা?”

দেখি কাগজের একদম প্রথম পাতায় আমার ছবি। একদম ক্যালানো একটা ছবি, হাতে প্লেয়ার অফ দ্য টুর্নামেন্ট ট্রফি।

স্যারের দিকে তাকানোর সাহসই হলোনা। দুই হাত তুলে দিয়ে শ্রাগ করলাম, মনে মনে বললাম, মারছে। শ্যাষ একদম !

টুর্নামেন্টের পর দেখলাম বেশ ভালোই মনোযোগ পাচ্ছি। তখনও আমাদের পরিবারের জন্য সমস্যা একটাই, টাকা। কারন আমার বাকী দুই ভাইও তখন বাসেল এ খেলছে। যখনই আমাদের কোন টুর্নামেন্টে যাবার জন্যে টাকা দিতে হয় বা অন্য কিছু, আমাদের খরচ তিনগুন। আমার বয়স যখন ১৬ তখন স্পেন এর এক জায়গায় একটা ক্যাম্প আয়োজন করা হলো, স্কিল বাড়ানোর জন্যে আরকি, টাকা লাগবে। কতো? ৭০০ সুইস ফ্রাঁ বা এরকম কিছু একটা। এক রাতে আমার বাবা আমাকে এসে বললেন, “সম্ভব না রে বাপ। এত টাকা আমার হাতে নাই।“

তো কি করা যায়? আমরা তিনভাই মিলে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমি আমাদের আশপাশের এলাকার লোকজনের লনের ঘাস কাটলাম সপ্তাহ তিনেকের মতো। আমার এক ভাই—ঠিক জানিনা ওর কাজটা কি ছিলো। তবে প্রতিদিন একেবারে সেইফটি গ্লাসটাস নিয়ে বেরিয়ে যেতে দেখতাম। নিশ্চয়ই কোন ফ্যাক্টরীতে কাজ করতো। তো যেভাবেই হোক একেবারে শেষ মুহুর্তে তিন ভাই এর টাকা মিলে যোগাড় হলো ৭০০ ফ্রাঁ। গেলাম স্পেনে। ক্যাম্পে যেতে পারবোনা এরকম কোন ভয় আমার হয়নি, ভয় টা কি নিয়ে ছিলো জানেন? আমার টীমমেইটরা বুঝে ফেলছে যে টাকা টা দেয়ার সামর্থ্য আমাদের নেই, এই ভয়টা আমার ছিলো। গরীবের ভাই কিছু থাকুক আর নাই থাকুক আত্মসন্মানবোধটা আছে।

বাচ্চা ছেলেপিলে কোন মাত্রার শয়তান হয় বোঝেন তো। বিশেষ করে এই ১৬ /১৭ বছর বয়সের ছেলেপিলে। আমার অক্ষমতা নিয়ে নির্দয় সব রসিকতা করে একেবারে ভেঙে ফেলবে সবকিছু। খুব অমানবিক হয় এসময় মানুষজন। ট্রেনিং শেষে সবাই কিওস্ক থেকে খেতে যেতো। আমাদের তো কখনোই টাকা ছিলোনা, আমরা একটা না একটা উসিলা বানিয়ে বাড়িতে ফেরত আসতাম। পেটে তখন তীব্র ক্ষিদে। এই ক্ষিদেটা সম্ভবত আমাকে অন্যভাবে সাহাজ্য করেছে সেরাদের বিপক্ষে খেলার তীব্র ক্ষিদেটা বাড়িয়েছে হয়তো এই ক্ষিদেটা। সবসময়।

এর একবছর পর আমি ডাক পেলাম বাসেল ফার্স্ট টীমে খেলার। আমার বয়স ১৭। আমাকে ম্যাচের শেষের ২০ মিনিটের জণ্যে নামানো হলো, আমার মনে হলো ভালোই খেলেছি। তো পরেরদিন আবার গেলাম ট্রেইনিং এ, আমাদের ইয়ুথ টীম কোচ ডেকে বললেন,” কি করলি গতকাল? ভাবিস কি তুই নিজেরে?”

আমি বললাম, “মানে কি? কি বলছেন কোচ?”

“আমি মাত্র ম্যানেজারের সাথে কথা বলেছি। উনি বললেন তুই নাকি খালি ড্রিবলিং করে বেরিয়েছিস। তুই আবার সেকেন্ড টীমে। যা ভাগ এখান থেকে”।

বিশাল একটা ধাক্কা খেলাম। মনে হচ্ছিলো বাসেল এ আমার আর কোন ভবিষ্যত নেই। সব শেষ।

দুই সপ্তাহ পর ঐ ম্যানেজারকেই বরখাস্ত করা হলো। নতুন ম্যানেজার এলেন। তিনি আমাকে ফার্স্ট টীমে ডেকে নিলেন। তারপর আর আমাকে পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। তব একটা মজার ব্যাপার ছিলো তখন। ম্যানেজার আমাকে খেলাতেন লেফট ব্যাক পজিশনে…আর আমি বল বানাতে আর আক্রমন করতে পছন্দ করি…জানেনই তো…ডিফেন্ডারেরা খালি চিৎকার করত মাঠে, “নীচে আয়, নীচে নাম হারামজাদা!”

হা হা হা হা হা! কি আর বলবো, বলুন? তবে কাজ হয়েছিলো বেশ কারন খবরের কাগজগুলোতে দেখতাম নিয়মিত লেখা হচ্ছে, শাকিরির বিশ্বকাপ দলে ডাক পাওয়া উচিৎত…এইসব আরকি।

কোত্থেকে কি হচ্ছিলো আমি জানিনা, ভাবতেও পারছিলাম না। শেষমেষ যখন দলে ডাক পেলাম, খুব আবেগের একটা ব্যাপার ছিলো আমার জন্যে। খবরটা পেয়ে সোজা বাবা-মায়ের সাথে দেখা করার জন্যে ছুটে গিয়েছিলাম। আমার বাবা মা তো খুব খুশি।

সবকিছু কেমন দ্রুত হয়ে গেলো। ১৬ বছর বয়সে স্পেনের ক্যাম্পে যাওয়ার জন্যে আমি লোকের বাগানের ঘাস কাটছি আর সেই আমি ১৮ বছর বয়সেই বিমানে চড়ে বসছি সাউথ আফ্রিকায় বিশ্বকাপ খেলার জন্যে। অদ্ভুত না?

স্পেনের বিপক্ষে যেদিন খেললাম সেদিনকার কথা খুব মনে আছে। খেলতে নেমে দেখি আমার সামনে ইনিয়েস্তা দৌড়াচ্ছে! খেলা বাদ দিয়ে মাথায় এলো, আরে! এই লোকটাকে তো আমি টিভিতে খেলতে দেখি! কি অদ্ভুত! এসব কিছুর পরেও একটা বিষয় আমার আজীবন মনে থাকবে। আমরা যখন প্রথম আমাদের হোটেলে পৌঁছলাম, দেখি আমাদের প্রত্যেকের রুমের সামনে বিশাল এক বন্দুক নিয়ে আর্মির লোক দাঁড়ানো। প্রত্যেকটা দরজায়!আমাদের নিজেদের পার্সোনাল আর্মি! আমার জন্যে এই ঘটনাটা হচ্ছে খুব ক্যুল একটা ঘটনা। মাত্র বছর খানেক আগেও আমি খারুজ একটা এলাকার পার্ক থেকেররাতের বেলায় একা একা ফিরেছি…আর এখন আমার নিজস্ব আর্মি গার্ড!

বাবা মায়ের জন্যে আমার বিশ্বকাপ খেলার মুহুর্তটা খুব গর্বের। বেচারারা একেবারে খালি হাতে সুইজারল্যান্ড এসেছিলেন, সারা জীবন তার বাচ্চাদের জন্যে সুন্দর একটা জীবন দেয়ার জন্যে ভয়াবহ পরিশ্রম করেছেন। মাঝে মাঝে মনে হয় সুইজারল্যান্ড বিষয়ে আমার অনুভূতিটা মিডিয়া ভালো করে বোঝেনি। বা ভুল বুঝেছে। আমার মনে হয় আমার বাড়ি দুইটা। খুবই সিম্পল একটা ব্যাপার। সুইজারল্যান্ড আমার পরিবারকে সব দিয়েছে, আমিও চেষ্টা করি সুইজারল্যান্ড দলটাকে আমার সবটুকু দিতে। আবার যখন কসভোতে যাই,জায়গাটাকে খুব আপন মনে হয়। কোন যুক্তি নেই জানি। স্রেফ আবেগ বলতে পারেন। আবেগের তো কোন যুক্তির প্রয়োজন হয়না।

২০১২ সালে যখন অ্যালবেনিয়ার বিপক্ষে খেললাম, আমার বুটে সুইজারল্যান্ড, অ্যালবেনিয়া আর কসভোর পতাকা লাগানো। সুইজারল্যান্ডের কয়েকটা কাগজ বিষয়টাকে খুব খারাপ ভাবে উপস্থাপন করলো। খারাপ ধরনের সব লেখা ছাপলো। ভয়াবহ সমালোচনার মুখে পড়ে গেলাম। আরে ভাই, এইতো আমার পরিচয়, এ নিয়েও যে কেউ অদ্ভুত সব কথাবার্তা ভাবতে পারে সেটাইতো আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়।

সুইজারল্যান্ডের সবচে ভালো দিক কি জানেন? দারিদ্রতা থেকে মুক্তি বা যুদ্ধ থেকে বেঁচে যারা একটা সুস্থ জীবন চায়, বেঁচে থাকতে চায় সুইজারল্যান্ড তাদেরকে স্বাগত জানায়।

সুইজারল্যান্ডে লেইক, পর্বত ইত্যাদি আছে। পৃথিবীর স্বর্গ বলতে পারেন। এসবের পাশেই আবার আছে আমার খেলার মতো একটা পার্ক যেখানে টার্ক, সার্বিয়ান, অ্যালবেনিয়ান, আফ্রিকানরা খেলে, জার্মান র‍্যাপার গান গায়, মেয়েরা মাঠের মাঝ দিয়ে হেঁটে বেড়ায়। সুইজারল্যান্ড আসলে সবার জন্যে। সবার।

এবারেও যখন বিশ্বকাপে খেলতে নামবো, আমার বুটে থাকবে সুইজারল্যান্ড আর কসভোর পতাকা। কন রাজনীতি বা এরকম কোন কারনে না। থাকবে কারন এই দুই পতাকা আমার জীবনের কথা বলে।

মূলঃ দ্য প্লেয়ারস ট্রিবিউন
অনুবাদঃ মানিক চন্দ্র দাস।

রোদ, ঝড়, বৃষ্টিতে… -অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়া

একটা চিঠির গল্প বলি। চিঠিটা পেয়েছিলাম আমার ক্লাব রিয়েল মাদ্রিদ এর কাছ থেকে। পড়িনি। পড়ার আগেই ছিঁড়ে ফেলেছিলাম।

চিঠিটা কবে পেয়েছিলাম, জানেন? ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালের দিন। ঠিক সকাল ১১ টায়। ট্রেইনারের টেবিলে বসে আছি। পায়ে ইঞ্জেকশন নিতে হবে। কোয়ার্টারফাইনাল ম্যাচে আমার উরুর পেশী ছিঁড়ে গিয়েছিলো। পেইন কিলার নিলে অবশ্য কোন সমস্যা হচ্ছিলো না। সমস্যা হবে কিভাবে, সমস্যা তো হয় ব্যাথা করলে। পেইনকিলার নিলে ব্যাথাটা দমে যাচ্ছিলো।

আমার ট্রেইনারকে বলেছিলাম, “ যদি মরে যাই, মরে যেতে দেবেন। তাতে আমার কিসসু যায় আসেনা। শুধু খেলতে চাই। আমি শুধু খেলতে চাই।“ ঠিক এগুলোই বলেছিলাম।
টেবিলে বসে পায়ে বরফ ঘষছি। এইসময় রুমে এলেন আমাদের দলের চিকিৎসক ড্যানিয়েল মার্টিনেজ। হাতে একটা খাম। উনি বললেন, “অ্যাঞ্জেল, এটা রিয়েল মাদ্রিদ থেকে এসেছে”।

মানে কি?
“ওরা বলছে, খেলার মতো কন্ডিশন এখন তোমার নেই। তোমাকে যাতে আমরা না খেলাই, জোর করছে ।“

বুঝতে পারছিলাম কি হচ্ছে আশপাশে। বাজারে জোর গুজব রিয়াল মাদ্রিদ বিশ্বকাপের পর জেমস রদ্রিগুয়েজ কে সাইন করাতে চাচ্ছে। আমি জানি ওকে আনতে হলে আমাকে বিক্রি করবে রিয়াল। আমার জায়গাটাতো খালি করতে হবে খেলার জন্যে। বিক্রির পণ্যটাকে ওরা নষ্ট করতে চাচ্ছেনা। সহজ হিসেব। ফুটবল যে একটা ব্যাবসা, সেই ব্যাবসায়িক দিকটি আমজনতা কখনো দেখতে পায়না। কিংবা দেখতে দেয়া হয়না।

ড্যানিয়েলকে বললাম চিঠিটা দিতে। হাতে পেয়েই কুচি কুচি করে ছিঁড়ে ফেললাম। পড়ারও প্রয়োজন বোধ করিনি। ওকেই আবার ছেঁড়া টুকরো গুলো দিয়ে বললাম, “ফেলে দাও। আজ সব সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা শুধু আমার।“

ম্যাচের আগের রাতে আমার এক ফোঁটা ঘুম হয়নি। এর একটা কারন হিসেবে বলা যায়, আমাদের হোটেলের বাইরে ব্রাজিলিয়ান ফ্যানরা সারাটা রাত আতশবাজি ফুটিয়েছে। শব্দ ছিলো মারাত্মক। ঠিক জানিনা, শব্দ যদি নাও থাকতো ,ঘুমুতে পারতাম কিনা। বিশ্বকাপ ফাইনালের আগের রাত,সারাটা জীবন যার স্বপ্ন দেখেছি সেই স্বপ্নটা যখন এত কাছে… এই অনুভূতিটা কোনভাবেই আমি বুঝিয়ে বলতে পারবোনা।

ফাইনালে আমি সত্যি সত্যি খেলতে চেয়েছিলাম। তাতে যদি আমার ক্যারিয়ার শেষও হয়ে যেতো, আপত্তি ছিলোনা। সেই সাথে আমি আমার দলের জন্যে কোন জটিল পরিস্থিতিও তৈরী করতে চাইনি। একদম ভোরে বিছানা ছেড়ে গেলাম ম্যানেজারের সাথে দেখা করতে। সাবেলা। আমাদের খুব ভালো সম্পর্ক। খুব কাছের মানুষ আমরা বলতে পারেন। তাঁকে যদি আমি বলতাম শুরু থেকেই খেলতে চাই, লোকটার উপর খুব চাপ হয়ে যেতো। আমাকে খেলানোর জন্যে তাঁর মনে একটা চিন্তা কাজ করতো। সেরকম কিছু করিনি। ওকে গিয়ে আমি আমার বুকে হাত রেখে বলেছি, তোমার যাকে খেলালে ভালো মনে হয়,তাকেই খেলাবে।

বললাম,” যদি আমাকে বসাতে হয়, তাও সই। যদি অন্য কাউকে বসাতে হয় তাহলে সেই অন্য কেউই। আমি শুধু বিশ্বকাপটা জিততে চাই। আমাকে যদি নামাও, মরে যাবার আগ পর্যন্ত খেলবো।“

কেন যেন কেঁদে ফেললাম। কোনভাবেই জলটা আটকাতে পারলাম না। সেই সময়টা হয়তো জানে কেন কেঁদেছি।

ম্যাচের আগে যখন টীম টক হয়, তখন সাবেলা ঘোষনা দিলেন আমার জায়গায় এনজো পেরেজ শুরু করবে। কারন এনজো একেবারে ফিট। কোন সমস্যা নেই। শুনে আমার খারাপ লাগেনি। শান্তিই লাগলো। কোচ তার সেরাদের দিয়ে খেলাবেন। ম্যাচ শুরুর আগে পায়ে আবার ইনজেকশন নিয়ে নিলাম। খেলার দ্বিতীয়ার্ধেও নিয়েছি যাতে কোচ ডাকলেই নামতে পারি মাঠে।

সেই ডাকটা আমার আর আসেনি। হেরে গেলাম। কোনকিছুই আমার কোনরকম নিয়ন্ত্রনে ছিলোনা। আমার জীবনের খুব কঠিন রাতগুলোর একটা। ম্যাচ শেষে মিডিয়া আমার না খেলা নিয়ে যা টা বলতে লাগলো। আমি সত্য কথা বলছি, একটা বিন্দু মিথ্যা কথা বলছি না। বিশ্বাস করুন।

সাবেলার সামনে গিয়ে যে কেঁদে ফেললাম, ও কি আমাকে নার্ভাস ভেবেছিলো? এই ভাবনাটা আমাকে তাড়া করে ফেরে।

বিশ্বাস করুন, ঐ সময়ের ঘটনাটার সাথে নার্ভের কোন সম্পর্ক নেই। আবেগে আমি আটকে ছিলাম। মুহুর্তটা কত দামী, কত সাধনার! প্রায় অসম্ভব একটা স্বপ্নের কত কাছে তখন আমরা।

আমি ছেলেবেলায় যে বাড়িতে থেকেছি ঐ বাড়ির দেয়ালের রঙ কোন একসময় সাদা ছিলো। কবে যে সাদা ছিলো আমার মনে নেই। প্রথম যে রঙটা খেয়াল আছে, বিবর্ন ধূসর। কয়লার গুঁড়োতে আস্তে আস্তে আমাদের দেয়ালগুলো কালো হয়ে গেলো।

আমার বাবা কয়লা নিয়ে কাজ করতেন। মাইনে যে কাজ করে ওরকম না। বাবা আসলে চারকোল বানাতেন। কাজ করতেন আমাদের বাড়ির পেছন দিকটায়। চারকোল কিভাবে বানানো হয় দেখেছেন কখনো? বার্বিকিউ করার জন্যে দোকান থেকে যে চারকোল কেনেন, ওগুলোর কথা বলছি। দোকানে যত সুন্দরই দেখাক, বানানোর প্রক্রিয়াটা কিন্তু খুবই নোংরা। বাবা এই নোংরা কাজটাই করতেন বাড়ির পেছনের চাতালে । চারকোল বানানোর পর ছোট ছোট চারকোল ব্যাগে ভরে বাজারে বিক্রি করতেন। আসলে শুধু বাবা ই নন, তাঁর সাথে ছোট ছোট দুজন হেল্পার ছিলো। আমি আর আমার বোন।

খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে বাবার কাজে সাহাজ্য করতাম। কাজটা কি? চারকোল ব্যাগের ভেতর ঢুকিয়ে গোছানো। মজাই লাগতো আসলে কাজটা। ঠিক কাজ মনে হতোনা। আমাদের বয়স তখন কত হবে,নয় দশ। কাজটাজ করে যেতাম স্কুলে। কয়লার ট্রাক এলে চারকোলের ব্যাগগুলো কাঁধে করে লিভিং রুমের ভেতর দিয়ে সামনের দরজা দিয়ে বের হতাম। তারপর বাবা ব্যাগ ট্রাকে উঠাতেন। এই চারকোলের ব্যাগ টানাটানিতেই আমাদের বাড়িটার দেয়ালের রঙ হয়ে গিয়েছিলো কালো।

কাজ যত নোংরাই হোক, এ দিয়েই আমাদের টেবিলে খাবার জুটতো। এই কজ করেই বাবা বাড়িটাকে ব্যাংকের হাত থেকে বাঁচিয়ে ছিলেন।

আমাদের অবস্থা এরকম ছিলোনা। বাবা খুব ভালো মানুষ। একজনের ভালো করতে গিয়ে বেচারা ওইরকম একটা গাড্ডায় পড়ে গিয়েছিলেন। এক বন্ধু তার বাড়ির গ্যারান্টর হতে বাবাকে অনুরোধ করেছিলেন। বাবা মানুষকে খুব বিশ্বাস করতেন। ব্যাংকের দেনা জমা হয়ে গেলো অনেক এবং সেই বন্ধু একদিন স্রেফ হাওয়া হয়ে গেলো। ব্যাংক তো সোজা পেয়ে বসলো বাবাকে। বেচারা দুদুটো বাড়ির দেনা শোধ করতে শুরু করলেন। আর কিছু করারও ছিলোনা। নিজের পরিবার তো আছেই, তার উপর দু দুটো বাড়ির দেনা! অনেক অনেক চাপ ছিলো মানুষটার উপর।

বাবা একেবারে শুরুতে চারকোলের ব্যাবসা করতেন না। আমাদের বাড়ির সামনের রুমটাকে একটা ছোট্ট দোকানমতো বানিয়েছিলেন। ব্লিচ, ক্লোরিন,সাবান ইত্যাদি পরিস্কার করার জিনিষপত্র ড্রামে করে কিনে ছোট ছোট বোতলে ভরে বিক্রি করতেন। ভালোই ছিলো বিক্রিবাট্টা। আমাদের শহরে লোকজন পরিস্কার করার সিআইএফ কিনতে একেবারে ব্র্যান্ড ব্যাবহার করছে, সেরকমটা ভাবা কঠিন। খুব বেশি খরচসাপেক্ষ হয় গোটা ব্যাপারটা। আমাদের দোকানে এলেই হতো। খুব সস্তায় এক বোতল ডি মারিয়া , ব্যাস কাজ সারা।

সবকিছুই ঠিকঠাক চলছিলো। একদিন তাদের ছোট ছেলে ব্যাবসায় বাগড়া বাধিয়ে দিলো। আসলে মরতেই বসেছিলো ছেলেটা।

হ্যাঁ ঠিকই পড়ছেন। আমিই সেই শয়তান।

ঠিক শয়তান বলাটাও ঠিক হচ্ছেনা। আমার আসলে খুব এনার্জি ছিলো। একেবারে হাইপার অ্যাকটিভ বাচ্চা যাকে বলে। সেই একদিন মা দোকানে সাবান বিক্রি করছিলেন আর আমি ওয়াকারে করে বাড়িতে ঘুরে বেড়াচ্ছি। বাড়ির সামনের দরজাটা খোলাই ছিলো। খোলা না থাকার কোন কারন নেই, কাষ্টমারেরা ও পথেই আসতো দোকানে। বিক্রি নিয়ে মা ব্যস্ত ছিলেন আর আমি এই ফাঁকে সোজা বাইরে…ঘুরে দেখতে চাচ্ছিলাম বাইরেটা!

হাঁটতে হাঁটতে সোজা রাস্তার মাঝখানে। মা রীতিমতো স্প্রিন্ট দৌড়ে গাড়ি চাপার হাত থেকে আমাকে বাঁচিয়েছিলেন। মা খুব নাটক করে বলে ঘটনাটা। ডি মারিয়া ক্লিনিং শপের ওদিনই শেষ দিন। মা বাবাকে বললেন, এভাবে হবেনা। বাচ্চাকাচ্চা সব মরে শুটকি হয়ে যাবে। আমাদের অন্যকিছু করতে হবে।

এরপরেই সেই কয়লা ওয়ালার সাথে বাবার দেখা। ভদ্রলোক সান্তিয়াগো দেল এস্ত্রো থেকে ট্রাকে করে কয়লা আনতেন। মজাটা হচ্ছে গোটা এক ট্রাক কয়লা কেনার সামর্থ্য বাবার ছিলোনা। বহু অনুরোধ করার পর ভদ্রলোক আমাদের প্রথম কয়েকটা শিপমেন্ট বাকীতে দিতে রাজী হন। প্রতিবারই এসে আগের ট্রাকের টাকা নিয়ে পরের ট্রাক কয়লা দিতো মানুষটা। দুটো বাড়ি, পরিবারের মানুষগুলো…ভরণপোষন…সব মিলিয়ে খুব ঝামেলা… । বাবার কাছে ক্যান্ডি বা এরকম কিছু চাইলে বাবা বলতেন, “দু দু্টো বাড়ি আর এক ট্রাক কয়লার দাম দিতে হবে বাবা। পরে দেবোনে”।

এই কথাগুলো বলা বাবার একেবারে অভ্যাস হয়ে গিয়েছিলো।

এক দিনের কথা মাথায় একেবারে গেঁথে আছে। আমার জীবন বদলে যাবার দিনটা। বাবার সাথে ব্যাগের ভেতর চারকোল ঢুকাচ্ছিলাম। প্রচন্ড ঠান্ডা, বৃষ্টি হচ্ছে। মাথার উপর টিনের চাল। কঠিন বৃষ্টি। ঘন্টা কয়েক পরেই আমি স্কুলে যাবো। ওখানে বেশ গরম, বাঁচোয়া। বাবাকে এই ঠান্ডায়, মাথার উপর বৃষ্টি নিয়ে কাজ করতে হবে সারাটা দিন। যদি চারকোল বিক্রি না হয়, আমাদের না খেয়ে থাকতে হবে।

মাথার ভেতর ভাবনা এলো। নিজেকেই বলা শুরু করলাম, এই অবস্থাটা বদলানো দরকার। খুব দরকার।

এজন্যে আমি ফুটবলের কাছে কৃতজ্ঞ।

মাঝে মাঝে অবশ্য জীবনের দামে দেনা চুকোতে হয়। ফুটবল শুরু করেছিলাম খুব অল্প বয়সে। দুষ্টুমি করে মায়ের মাথা খেয়ে ফেলতাম আমি। তাই মা আমাকে একদিন নিয়ে গেলেন ডাক্তারে কাছে। ডাক্তারকে বললেন, “ডাক্তার, আমার ছেলেটা খালি দৌড়য়। একটা মুহুর্তের জন্যে চুপ করে কোথাও বসতে পারেনা। কি করি বলুনতো!”

ডাক্তার খুব ভালো লোক। আর্জেন্টিনার মানুষ। আর্জেন্টাইন হলে যা হয়, উনি বললেন, “সারাদিন ছুটোছুটি করে কি করো? ফুটবল খেলো?”

এভাবেই শুরু হলো আমার ফুটবল খেলা।

ফুটবল নিয়ে আমি ঘোরগ্রস্থ মানুষ বলতে পারেন। সেই শুরু থেকেই। আমি শুধু ফুটবলই খেলেছি। প্রতি দু মাস অন্তর অন্তর আক্ষরিক অর্থেই আমার বুটের তলা ভেঙে যেতো, খেলতাম এতো বেশি। মা শেষে আঠা দিয়ে ঠিক করতেন বুটের তলা। দুমাস পরপর নতুন একজোড়া বুট কেনার টাকা আমাদের ছিলোনা। সাত বছর বয়স যখন ,পাড়ার দলের হয়ে ৬৩ টা গোল করে ফেলেছি। ভালোই খেলতাম মনে হচ্ছে এখন। তো একদিন আমার বেডরুমে মা এসে বললেন, “ রেডিও চ্যানেল তোর সাথে কথা বলতে চায়।“

স্টেশনে গেলাম ইন্টারভিউ দেয়ার জন্যে। খুব লাজুক ছিলাম ঐ বয়সটায়, মুখ দিয়ে দুএকটার বেশি শব্দই বেরোয়নি।

ওই বছরেই বাবার কাছে ফোন এলো। রোজারিও সেন্ট্রালের ইয়ুথ টীমের কোচ আমাকে দলে নিতে চান। খুব কজার একটা পরিস্থিতি ,জানেন! আমার বাবা হচ্ছেন নিওয়েল ওল্ড বয়েজ এর বিরাট সমর্থক। আর আমার মা রোজারিও সেন্ট্রালের পাঁড় ভক্ত। রোজারিওতে না থাকলে আসলে এই দুটো দলের সমর্থকদের মধ্যকার খুব আবেগের রাইভালরিটা ঠিক বুঝবেন না। একেবারে দুই মেরু বলতে পারেন। জীবন মরন টাইপ আরকি। দুইদলের মধ্যকার খেলা হলে আমার বাবা মা একেবারে তাদের সবটুকু দিয়ে চিৎকার চেঁচামেচি করেন। অবশ্যই নিজের দলের গোলের সময় আরকি।

যে জেতে তার কথার চোটে আরেকজন মনে করেন গোটা সপ্তাহ একেবারে কেঁচো হয়ে থাকতে হয়। খুবই কঠিন অবস্থা।

তো বুঝতেই পারছেন সেন্ট্রাল থেকে কল আসায় মায়ের অবস্থাটা। একেবারে উত্তেজনার শেষ সীমায়।

বাবা বললেন,” বুঝতে পারছিনা আসলে। অনেক দূর তো এখান থেকে। নয় কিলো! আমাদের তো গাড়ি নেই। ওকে আনা নেয়া করবো কিভাবে?”

মা বললেন,” আরে এইটা কোন ব্যাপার? চিন্তা করোনা, আমি নিয়ে যাবো।“

জন্ম হলো আমাদের গ্রাসিয়েলার।

গ্রাসিয়েলা আমাদের পুরোনো জংধরা সাইকেলের নাম। হলুদ রঙের। ঐ সাইকেলে চড়িয়েই আমার মা আমাকে প্রতিদিন ট্রেনিং এ নিয়ে যেতেন। সাইকেলের সামনে একটা ছোট্ট ঝুড়ি আর পেছনে আরেকজন বসার জন্যে একটু জায়গা। এই নিয়ে আমাদের গ্রাসিয়েলা। একটা ছোট্ট সমস্যা তখনো ছিলো, আমাদের সাথে তো আমার বোনটাও যাবে। কিন্তু বসবে কি করে? বাবা তখন বুদ্ধি করে সাইকেলের পাশে কাঠের একটা পিঁড়ি জুড়ে দিলেন। ওখানে বসতো বোন।

একজন মা ছোট্ট একটা ছেলেকে সাইকেলের পিছনে আর ছোট্ট একটা মেয়েকে পাশে নিয়ে সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছেন। সাইকেলের সামনের ঝুড়িতে কিটব্যাগ, বুট আর কিছু স্ন্যাকস। আসা যাওয়া…ভয়াবহ সব এলাকা…ঝড়ের মধ্যে, বৃষ্টিতে কিংবা তীব্র ঠান্ডায়…আলো কিংবা অন্ধকারে। পরিবেশ কি তাতে মায়ের কিচ্ছু যায় আসেনা। মা সাইকেল চালাচ্ছে…কল্পনা করুনতো একবার দৃশ্যটা!

গ্রাসিয়েলা আমাদের নিয়ে যেতো সবখানে। যেখানে যেতে চেয়েছি, সবখানে। আমাদের ছোট্ট গ্রেসিয়েলা!

সেন্ট্রালে আমার সময়টা ছিলো খুব কঠিন। মা না থাকলে ফুটবল খেলাটা ছেড়েই দিতাম। দুবা এরকম পরিস্থিতি তৈরী হয়েছিলো। আমার বয়স তখন ১৫। শরীরটা ঠিকঠাক বাড়েনি। শুটকাপটকা ধরনের শরীর আমার। আমাদের কোচ ছিলেন একটু অ্যাগ্রেসিভ ধরনের। শরীর দিয়ে খুব এগ্রেসিভ হয়ে খেলে এরকম খেলোয়াড়দের বেশি পছন্দ করতেন। আমিতো ওরকম না, ছিলামও না, এখনও নই। তো একদিন কি হলো, ডি বক্সের ভেতরে একটা হেড করতে ঠিকঠাক লাফিয়ে উঠতে পারিনি।

ট্রেনিং শেষে কোচ সবাইকে ডাকলেন। আমাকে সবার মাঝে রেখে বললেন, “ খেলাতো পারিস না কোন **টাও। জীবনে কোন ***টাও ছিঁড়তে পারবানা। শালা***”

এরকম একটা পরিস্থিতি…ওই বয়সী একটা ছেলে…একেবারে বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছিলাম। কোচের কথা শেষ হবার আগেই একেবারে ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো কান্নাটা। সবার সামনে একেবারে। দৌড়ে পালিয়েছিলাম ওখান থেকে ।

বাড়ি ফিরে সোজা নিজের রুমে ঢুকে গেলাম। একা একটু কাঁদা দরকার। থাকেনা কিছু সময়, একা থাকা লাগে? একা নিজের সাথে বুঝতে হয়? ওরকম একটা সময় তখন। মা বুঝে ফেলেছিলেন, কোথাও কোন ঝামেলা হয়ে গেছে। ট্রেনিং থেকে ফিরে রাস্তায় খেলি অনেকক্ষন, ঐদিন কোন কথা নেই। কোন খেলা নেই। খুব ভাঙচুর হচ্ছিলো ভেতরে। মা চলে এলেন আমার রুমে। বলতেও খুব ভয় পাচ্ছিলাম। রাগ উঠলে এই এতটা রাস্তা সাইকেল চালিয়ে গিয়ে কোচকে একেবারে খোলা মাঠে মা ঠ্যাঙিয়ে আসবেন, আমি জানি। মা এমনিতে খুব চুপচাপ, শান্ত মানুষ। ওনার ছানাপোনাদের কিছু করছেন তো, দৌড়…ঝেড়ে দৌড় লাগান…আশপাশের এলাকায় থাকাটা একেবারে জীবনের ঝুঁকি বলতে পারেনণইমাকে বললাম মারপিট করেছি।

মা কিন্তু জানতেন ডাঁহা মিথ্যে কথা। অন্য সব মা যা করতেন এই সময়ে, মা ও তাই করলেন। আমার এক টীমমেইটের মা কে ডেকে পুরো ঘটনা শুনে নিলেন।

সব শুনে মা যখন আবার আমার রুমে ফিরলেন, অঝোরে কাঁদছি। বললাম, ফুটবল খেলবো না। আর খেলবো না। পরের দিন আমি আমার রুম থেকেই বের হইনি। স্কুলে যাইনি। সারাটা দিন বিছানায়। খুব বেশি লেগেছিলো ভেতরটায়।মা এসে বিছানায় বসে মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,”তুই খেলবি এঞ্জেল। আজকেই যাবি তুই। ঐ ব্যাটাকে দেখিয়ে দিতে হবে তুই ফেলনা নোস”।

ওইদিনই আমি মাঠে ট্রেনিং এ ফিরেছি। মাঠে যা হলো তাতে আমি অবাক হয়েছি। মানুষের উপর বিশ্বাস এসেছে। যে মানুষের জণ্যে আমাদের দুবেলা খাবার নিয়ে চিন্তাইয় পড়তে হয়েছে, যে মানুষ আমাকে খোলা আকাশের নিচে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছে, সেই মানুষের উপরেই বিশ্বাস ফিরেছে। আমার দলের সতীর্থরা আমাকে নিয়ে একটুও রসিকতা করেনি। বরং সাহাজ্য করেছে প্রাণপনে। বাতাসে যখন বল ভেসে এসেছে ডিফেন্সের খেলোয়াড়েরা আমাকে হেড করার সুযোগ করে দিয়েছে। আমার একটু ভালো লাগানোর জণ্য সতীর্থরা মাঠে সবটুকু উজাড় করে দিলো সেদিন। সবাই এত এত খেয়াল রাখলো আমার! এতটা ভালোলাগা আমার কখনো আসেনি।

তখনও খুব শুটকাপটকা ধরনের শরীর। বয়স হয়ে গেছে ১৬। সেন্ট্রালের সিনিয়র দলে নাম আসেনি। বাবা এ নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় ছিলেন। একদিন রাতে সবাই খেতে বসেছি। বাবা বললেন,” তোর কাছে তিনটা অপশন আছে অ্যাঞ্জেল। আমার সাথে কাজে যেতে পারিস। স্কুলের পড়াটা শেষ করতে পারিস। অথবা ফুটবলে আরেকটা বছর দিয়ে দেখতে পারিস। যদি কাজ না হয় আমার সাথে এসে কাজ শুরু করতে হবে।“

কিছুই বলিনি। কি বলবো আসলে? খুব জটিল পরিস্থিতি তো। আমাদের বাঁচার জন্যে টাকাটাও দরকার।

শেষমেষ মা বললেন। “আরেক বছর খেলুক অ্যাঞ্জেল।“

ডিসেম্বর। ডিসেম্বরের একেবারে শেষের দিকে সেন্ট্রালের পক্ষ হয়ে প্রিমেরা দিভিশিওনে আমার অভিষেক হয়।

আমার খেলোয়াড়ি জীবনের সেই শুরু, ওইদিনই। কিন্তু ভেতরে সত্যটা হচ্ছে আমাদের যুদ্ধ শুরু হয়েছে আরো অনেক আগে। অনেক আগে। আমার বুটের তলা যখন মা আঠা দিয়ে জোড় দিতেন আমাদের যুদ্ধটা শুরু হয়েছে তখন থেকে। গ্রাসিয়েলাতে চাপিয়ে রোদ ঝড় বৃষ্টিতে মা আমাকে যখন ট্রেনিং এ নিয়ে যেতেন, আমাদের যুদ্ধটা শুরু হয়েছে তখন থেকে। এমনকি যখন আর্জেন্টিনায় পেশাদার ফুটবলার হিসেবে যাত্রা শুরু করি, যুদ্ধটা তখনো চলছে। সাউথ আমেরিকার বাইরের কারো পক্ষে বিষয়টা বোঝা খুবই কঠিন। এখানে থেকে না দেখলে, ঐ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে না গেলে কারো পক্ষে বিশ্বাস করা আসলেই কঠিন।

কলম্বিয়াতে একবার ন্যাশিওনাল এর বিপক্ষে খেলতে যেতে হয়েছিলো আমাদের। ঐদিনের কথা আমার খুব বেশি করে মনে আছে। প্রিমিয়ার লীগ বা লা লীগায় যেরকম এয়ার ট্রাভেল ওখানে এয়ার ট্রাভেলটা ওরকম না। বুয়েনস আয়ারসে খেললে যেরকম সেরকমও না। কারন ঐ সময় রোজারিওতে কোন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট ছিলোনা। ছোট্ট একটা এয়ারপোর্ট। যেদিন ওখানে যে বিমান থাকবে সেটাতেই চড়তে হবে। কোন প্রশ্ন করা যাবেনা। করে হবেইবা কি?

এয়ারপোর্টে গিয়ে দেখি ইয়া বড় এক কার্গো প্লেন বসে আছে রানওয়েতে। পেছনে বিরাট র‍্যাম্প ওয়ালা কিছু কার্গো প্লেইন আছেনা? গাড়ি টাড়ি নেয় যে প্লেইনে ওগুলো। দেখা গেলো ওটাই আমাদের, ওতেই চড়তে হবে। নামটাও আমার পরিস্কার মনে আছে। হারকিউলিস।

র‍্যাম্প নেমে এলো। ওয়ার্কাররা প্লেইনের ভেতরে ম্যাট্রেস ঢোকানো শুরু করলেন।

হতভম্ব হয়ে আমরা একজন আরেকজনের দিকে তাকাচ্ছিলাম। হচ্ছেটা কি?

গেলাম প্লেইনের সামনে বসার জন্যে। ওয়ার্কারেরা হাতে হেডফোন ধরিয়ে দিয়ে বললো, “পেছনে চলে যান। ওখানেই আপনাদের বসার জায়গা।“

প্লেইনের তীব্র শব্দ আটকানোর জণ্যে আমাদেরকে মিলিটারি হেডফোন দেয়া হয়েছিলো। প্ল্যাটফর্মে উঠে দেখি কয়েকটা সীট আছে। আর বাকীদের জন্যে প্লেইনের মেঝেতে কার্পেট পাতা। কার্পেটে শুয়ে যাও, আপত্তি নেই কারো। প্লেইন চলা শুরু করলো, আমরা যারা শুয়েছিলাম, পিছলে নেমে যেতে শুরু করলাম। তীব্র শব্দে কেউ কারো কথা শুনতে পাচ্ছিনা। পিছলে যাবার সময় সবাই চিৎকার করে খালি বলছিলো, “পেছনে লাল বাটন থেকে সাবধান। খুব সাবধান। চাপ পড়লে সবকয়টা আজকেই শেষ।“সবাই যে একই কথা বলেছি টা আমরা অবশ্য জেনেছি প্লেইন থেকে নামার পর, ও সময় আমরা কেউই তো শুনতেই পাইনি।

অবিশ্বাস্য একটা ব্যাপার। ঐ জীবনে দিন কাটিয়ে না এলে তাহলে বিশ্বাস করবেন না।

যে জীবন ফড়িঙের, দোয়েলের–মানুষের সাথে তার হয়নাকো দেখা…এরকম ব্যাপারটা। আমার দলের অন্যান্যদের জিজ্ঞাসা করে দেখতে পারেন। সত্যিই হয়েছিলো। আমাদের নিজেদের প্রাইভেট প্লেইন, হারকিউলিস!

তারপরেও একধরনের সুখ নিয়ে আমি ঐ স্মৃতির দিকে তাকাই। রোমন্থন করি। আর্জেন্টিনায় ফুটবল দিয়ে যদি কিছু করতে হয়, যা করা দরকার তাই করতে হবে। দিতে হবে সর্বোচ্চটাই। যেই প্লেইনই এয়ারপোর্টে থাকুক, তাতেই চড়তে হবে। কোন প্রশ্ন করা যাবেনা।
সুযোগ থাকলে সেই প্লেইনে চড়তে হবে ওয়ান ওয়ে টিকেট কেটে। আমার জন্যে এরকম সুযোগটা ছিলো পর্তুগালের বেনফিকায়। আমার ক্যারিয়ারের দিকে তাকিয়ে অনেকে চোখ কপালে তুলে ফেলতে পারেন। ভাবতে পারেন, “ওয়াও, ছেলেটা বেনফিকায় খেলেছে, তারপর রিয়াল মাদ্রিদ, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, এবং পি এসজি।“ বিষয়টা হয়তো দেখতে খুব সাধারন লাগছে। এর মাঝে যে কি গেছে তা কারো জন্যে কল্পনা করাও কঠিন। ১৯ বছর বয়সে বেনফিকায় গিয়ে আমি দুই সীজনও খেলতে পারিনি। আমার বাবা চাকরি ছেড়ে চলে এলেন পর্তুগালে। নিজের স্ত্রীর সাথে তখন গোটা এক মহাসাগর দুরত্ব তাঁর। মাঝে মাঝে রাতে বাবাকে ফোনে কথা বলতে শুনতাম। বাবা কাঁদতেন, বাচ্চাদের মতো কাঁদতেন। মাকে খুব মিস করতেন বাবা।.

কখনো কখনো মনে হতো জীবনে একটা বড় ভুল করে ফেলেছি। হচ্ছেনা কিছুতেই। শুরু থেকে খেলতে পারছিনা। মনে হতো সব ছেড়েছুড়ে সোজা বাড়ি চলে যাই।

এরপর এলো ২০০৮ এর অলিম্পিক। আমার জীবন বদলে দিয়েছে সেই অলিম্পিক। আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে আমার ডাক পড়লো। বেনফিকায় আমি তখনো পুরো নব্বই মিনিট খেলার সুযোগ পাইনি। ঐ সময়টার কথা আমি কখনো ভুলবোনা। এই টুর্নামেন্টে আমি সুযোগ পেয়েছিলাম লিওনেল মেসির সাথে খেলার। অন্য পৃথিবীর, এক অতিমানব খেলোয়াড়। ওর সাথে ফুটবলটা খেলে আমি সবচে বেশি মজা পেয়েছি। আমাকে কিছুই করতে হতোনা, শুধু ফাঁকা একটা জায়গা বের করে একটা ছোট্ট দৌড় দিতে হতো। বল আসবেই ওই জায়গায়। ম্যাজিক। একদম ম্যাজিকের মতো।

আপনার আমার চোখ যেভাবে কাজ করে, লিওর চোখ ওভাবে কাজ করেনা। আমাদের চোখ দুপাশ থেকে দেখে। লিও তো সেরকম করে দেখেই, পাখির মতো ওপর থেকে দেখার এক আশ্চর্য ক্ষমতা আছে লিওর। আমি জানিনা এটা কিভাবে সম্ভব।

আমরা ফাইনালে গেলাম। আমাদের বিপক্ষে নাইজেরিয়া। আমার জীবনের সবচে স্মরণিয় সম্ভবত ঐ দিনটা। আমার গোলে আর্জেন্টিনা অলিম্পিকে গোল্ড পেয়ে গেলো…অনুভূতিটা আসলে বোঝাতে পারবোনা।

আমার বয়স তখন মাত্র ২০ বছর। বেনফিকায় পুরোটা সময় খেলার সুযোগ পাচ্ছিনা। পরিবার আলাদা দুই দেশে থাকেন। ঐ টুর্নামেন্টে খেলার জন্যে ডাক পাবার আগে খুব অসহায় একজন মানুষ ছিলাম আমি। প্রচন্ড অসহায়। আর ঠিক দু বছরের মাথায় আর্জেন্টিনার হয়ে সোনা জিতলাম, বেনফিকাতে খেলছি এরপর ট্রান্সফার হয়ে গেলাম মাদ্রিদে।

খুব গর্বের একটা সময়। শুধু আমার জন্যে না। আমার পরিবার, বন্ধুবান্ধব, সতীর্থ যাঁরা আমাকে দিনের পর দিন সাহস দিয়ে গেছেন, সমর্থন দিয়ে গেছেন সবার জন্যে গর্বের। শুনতে পাই আমার বাবা আমার চেয়ে ভালো ফুটবলার ছিলেন। তাঁর সময়ে খেলতেন আমার চাইতে অনেক ভালো। হাঁটু ভেঙে তাঁর স্বপ্নটা ভাঙে। শুনেছি আমার দাদা আমার বাবার চাইতে ভালো খেলতেন। এক ট্রেন দুর্ঘটনায় দুই পা হারিয়ে তাঁর স্বপ্নটাও হারিয়ে যায়।

আমার স্বপ্নও অনেকবার মৃত্যুর খুব কাছাকাছি চলে গিয়েছিলো। অনেকবার।

বাবা নিরলস কাজ করে গেছেন…টানা দিনের পর দিন…টিনের চালার নীচে…প্রচন্ড গরম, তীব্র শীতের ভেতর…মা সাইকেলের প্যাডেল চালিয়ে গেছেন রোদ,ঝড়,বৃষ্টিতে…ফুটবল নিয়ে আমি দৌড়ে বেড়িয়েছি উন্মাদের মতো…

ভাগ্যে বিশ্বাস করেন কিনা জানিনা। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে আমি প্রথম যে দলের বিপক্ষে গোলটা করেছি, দলটার নাম জানেন?
হারকিউলিস সিএফ।

অনেকটা তো বললাম, এবারে নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন ফাইনালের আগে আমি কেন সাবেলার সামনে গিয়ে কেঁদেছি। আমি নার্ভাস ছিলাম না। আমার ক্যারিয়ার নিয়ে শঙ্কিত ছিলাম না। এমনকি ম্যাচের শুরু থেকে খেলতে পারবো কিনা সেটাও আমার মাথায় ছিলোনা।

এই বুকে হাত রেখে বলছি, আমি শুধু স্বপ্নটাকে ছুঁয়ে দিতে চেয়েছি। চেয়েছিলাম আমার দেশে আমাদের নামটা যেন কিংবদন্তীর মতো করে সবাই মনে রাখে। একদম কাছে চলে গিয়েছিলাম আমরা…একদম।

একারনে আমাদের দলের প্রতি মিডিয়ার আচরনে মনটা ভেঙে গিয়েছিলো। নেগেটিভিটি, সমালোচনা কখনো কখনো সীমা ছাড়িয়ে যায়। খুব অসুস্থ ব্যাপারটা। আমরাতো সবাই মানুষ। এমন অনেক কিছুইতো হয় আমাদের যে বিষয়গুলো অন্যেরা কোনদিন জানতেও পায়না।

ফাইনাল কোয়ালিফাইং খেলা গুলোর আগে আমি সাইকোলজিষ্ট দেখানো শুরু করেছিলাম। মাথার ভেতর সব খুব অসহ্য লাগতো। সাধারনত আমি পরিবারের উপর খুব নির্ভর করি এরকম সময়গুলোতে। ওবার তা হয়নি। জাতীয় দলের উপর প্রেশারটা বেশি, অসম্ভব বেশি ছিলো। সাইকোলজিষ্টের সাথে দেখা করাটা আমার খুব কাজে দিয়েছিলো। ফাইনালের দুই ম্যাচে খুব রিলাক্সড ছিলাম, নির্ভার ছিলাম।

নিজেকে বার বার মনে করিয়ে দিয়েছি, আমি পৃথিবীর সেরা একটা দলের অংশ। খেলছি নিজের দেশের জন্যে। ছেলেবেলায় যে স্বপ্ন দেখেছি, সেই স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে আছি। মাঝে মাঝে পেশাদারিত্ব এই খুব সাধারন বিষয়গুলো মাথা থেকে সরিয়ে দেয়। সরিয়ে না দিলেও ঢেকে রাখে।

এরপর খেলাটা আমার কাছে নিছক খেলাই হয়ে গেলো।

আজকাল সবাই ইনস্টাগ্রাম বা ইউটিউবে দেখে নেয় সবকিছু।
খেলার ফলাফল খুব সহজে জেনে যাওয়া যায় কিন্তু ওর পেছনে কত কত যে ঘাম, আনন্দ-বেদনার কাব্য লুকিয়ে আছে তা কেউ দেখতে পায়না। মেয়েকে সাথে নিয়ে চ্যাম্পিয়নস লীগ ট্রফি সহ ছবি তুলেছি, ছবি দেখে সবার ধারণা বাহ, সবতো ঠিকই চলছে। কোথাও কোন গড়বড় নেই। কিন্তু কেউ জানেনা ঐ ছবিটা তোলার ঠিক এক বছর আগে আমার এই মেয়েটাই প্রিম্যাচিওর অবস্থায় জন্মেছিলো, দুমাস টানা হাসপাতালে ছিলো মেয়েটা। সারা শরীরে লাগানো ছিলো টিউব,তার…

ছবিটায় ট্রফিটার সাথে আমাকে কাঁদতে দেখা গেছে। সবাই ভাবছে জেতার আনন্দে কাঁদছি। ফুটবলের জন্যে কাঁদছি। সত্যিটা কি জানেন? কেঁদেছি আমার মেয়েটার জন্যে। এইযে ও বেঁচে আছে, আমার সাথে বেঁচে ধরে আছে ট্রফি, এই আনন্দে আমি কেঁদেছি।

সবাই বিশ্বকাপ ফাইনাল দেখেছে, ফলটা দেখেছে।

০-১

কত সম্ভব অসম্ভব যুদ্ধ জয় করে আমরা কজন সে জায়গায় পৌঁছেছিলাম, কেউ কি তা জানে?

লিভিং রুমের দেয়াল কি করে সাদা থেকে কালো হয়ে যায়, তা কি জানে কেউ?

টিনের চালার নীচে আমার বাবার দিনের পর দিন পরিশ্রমটা কেউ দেখেনি।

রোদ,ঝড়, বৃষ্টিতে গ্রেসিয়েলায় প্যাডেল চাপা আমার মাকে কি ওরা কখনো দেখেছে?

ওরা হারকিউলিস সম্পর্কে কি জানবে কখনো?

মূলঃ প্লেয়ারস ট্রিবিউন
অনুবাদঃ মানিক চন্দ্র দাস।

যোগাযোগ ব্যবস্থায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে সরকার

বদলে যাচ্ছে দেশের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। ঈদযাত্রার চতুর্থ দিনে সকাল থেকেই সড়ক, নৌ ও রেলপথে ঘরমুখী যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। তবে প্রশাসনের দৃঢ় ভূমিকা থাকায় সব ধরনের ঝামেলা কাটিয়ে ঈদযাত্রার পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পেরেছে সরকার।

এ প্রসঙ্গে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, ঈদযাত্রায় জনগণের নিরাপত্তা এবং নির্বিঘ্নে চলাফেরা নিশ্চিত করতে অন্যান্য বছরের মত এবারও সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সজাগ ছিল। এ বছর রমজানের আগেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শুরু করেছিল মন্ত্রণালয়। সম্পৃক্ত করা হয়েছে সকল স্টেক-হোল্ডারদের। এবার সমন্বয় সভাগুলো করা হয়েছে মাঠপর্যায়ে। কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের গজারিয়া, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ভুলতা, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের কালিয়াকৈর এবং ফেনীতে চারটি সমন্বয় সভার মাধ্যমে সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা হয়।

মূলত, সমন্বয় সভায় জনপ্রতিনিধি, জেলা প্রশাসন, জেলা পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ, উপজেলা প্রশাসন, থানা পুলিশ, পরিবহন মালিক-শ্রমিক নেতৃবৃন্দ, ব্যবসায়ী প্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগীতায় সকল ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে আনন্দের সাথে এবারের ঈদ কাটিয়ে রাজধানীতে ফিরেছেন সাধারণ মানুষ।

এ বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক কর্মকর্তা বলেন, ঈদের আগের চারদিন এবং পরের চারদিন চব্বিশ ঘন্টা সারাদেশের সিএনজি স্টেশনসমূহ খোলা ছিল। ঈদের আগে তিনদিন মহাসড়কে ভারি যানবাহন চলাচল বন্ধ ছিল। তবে নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য, পঁচনশীল দ্রব্য, গার্মেন্টস সামগ্রী, ঔষধ, কাঁচা চামড়া এবং জ্বালানী বহনকারী যানবাহন এ নিষেধাজ্ঞার আওতামুক্ত ছিল। যার কারণে মহা সড়কগুলোতে বাড়তি যানবাহনের কোনো চাপ ছিলো না।

মহাসড়কে যানবাহনের গতি অব্যাহত রাখতে ঈদের পূর্বের সাতদিন এবং পরে সাতদিন সুনির্দিষ্ট পূর্ব তথ্য ব্যতিত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সড়কের উপর মোটরযান থামায় নি। কোনোভাবেই ঈদযাত্রায় ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় চলতে দেয়া হয় নি। ঢাকা মহানগরীতে যত্রতত্র পার্কিং বন্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। সড়ক-মহাসড়কের যেখানে সেখানে গাড়ি থামিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানো করতে দেয়া হয় নি। এসব কারণেই যাত্রী ভোগান্তি শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।

একইভাবে নৌ পথেও ছিলো বাড়তি নিরাপত্তা। সড়ক পথের মতো নৌ পথেও ফিটনেসবিহীন লঞ্চ, স্টিমার নদীতে নামানো হয়নি। এছাড়া কোনো লঞ্চ বা স্টিমারে প্রয়োজনের অতিরিক্ত যাত্রী তোলা হয় নি।

এ প্রসঙ্গে কথা হয়, নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা সঙ্গে। তিনি বলেন, যাত্রী সুবিধা নিশ্চিতে গত বছরগুলোর মতো এবছরও যথেষ্ঠ সজাগ ছিলো সরকার। যার কারণে গত কয়েক বছর বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। সাধারণ মানুষ যাতে নির্বিঘ্নে ঈদ উদযাপন করতে পারে, সে কথা মাথায় রেখে আমাদের এ প্রয়াস আগামীতেও অব্যাহত থাকবে। ইনশাআল্লাহ।

এর আগে একনেক সভায় দেশের ৫টি বিভাগে ১০১টি জেলা সড়ক প্রশস্তকরণ এবং মজবুতিকরণ প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছিল এছাড়াও ৩টি বিভাগের জেলা সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদিত হয়। প্রকল্পের আওতায় মহাসড়কে ২৩টি সেতু, ২৪২টি কালভার্ট, ৩টি রেলওয়ে ওভারপাস, ১৪টি সড়ক বাইপাস, ২টি আন্ডারপাস, ৩৪টি স্টীল ফুটওভার ব্রীজ, ৬১টি বাস-বে এবং পর্যাপ্ত সংখ্যক যাত্রী ছাউনী নির্মাণ করা হয়েছে।

বরিশালে মেয়র পদে আ.লীগের প্রার্থী সাদিক আবদুল্লাহ

অবশেষে সকল জল্পনা-কল্পনা ও গুজব-গুঞ্জনের অবসান ঘটিয়ে প্রাচ্যের ভেনিস খ্যাত বরিশাল সিটি কর্পোরেশন (বিসিসি) নির্বাচনে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক নৌকা পেলেন ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট কালরাতে বাবা ও মায়ের সঙ্গে অলৌকিক ভাবে বেঁচে যাওয়া স্বজনের রক্তে ভেজা সেই সময়ের দেড় বছরের শিশু আজকের বরিশালের রাজনীতির ‘আইকন’ যুবরত্ন সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ। সকল সমীকরণ শেষে শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামীলীগ সভাপতি দেশরত্ন শেখ হাসিনা সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহর ওপরই আস্থা রাখলেন। শুক্রবার রাত ১০টার দিকে আওয়ামীলীগ সভাপতির ঢাকার ধানমন্ডি ৩/এ কার্যালয় থেকে দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা স্বাক্ষরিত মনোনয়নের নৌকার টিকিট গ্রহণ করা হয়।

এদিকে সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ সিটি নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ায় গোটা বরিশালে আওয়ামীলীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী ও সমর্থকরা আনন্দে উদ্বেলিত। মনোনয়নের খবর পেয়ে বরিশাল শহর ও বানারীপাড়াসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় নেতা-কর্মীরা তাৎক্ষনিক আনন্দ মিছিল বের করে।

প্রসঙ্গত সাদিক আব্দুল্লাহ স্বল্প সময়ের মধ্যে নিজের মেধা, প্রজ্ঞা ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতা দিয়ে পাদ প্রদীপের আলোয় এসে উদীয়মান মপল সূর্য নেতায় পরিণত হন। তার আলোয় আলোকিত বরিশালের আওয়ামী রাজনীতির অঙ্গন। বাবা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগ্নে মন্ত্রী পদ মর্যাদার পার্বত্য শান্তি চূক্তি বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ কমিটি ও স্থাণীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রনালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি এবং বরিশাল জেলা আ’লীগের সভাপতি সিংহ পুরুষ খ্যাত জাতীয় নেতা আলহাজ্ব আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ এমপি’র পদাঙ্ক অনুসরণ করে মুজিব অন্তঃ প্রাণ সাদিক আব্দুল্লাহ নিজেকে শুধু যোগ্য উত্তরসুরী হিসেবেই নয় দলীয় নেতা-কর্মীদের আশা ও ভরসার প্রতীক হিসেবেও নিজেকে গড়ে তুলতে পেরেছেন। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীও তার ওপর আস্থা রাখলেন।

সাদিক আব্দুল্লাহকে ঘিরেই বরিশালের মেয়র পদটি পুনরুদ্ধার করার স্বপ্ন-সাধ বুকে লালণ করছে দলীয় নেতা-কর্মী ও সমর্থকরা। বিএনপির কাছে বেদখল হয়ে যাওয়া সিটি মেয়রের পদটি পুনরুদ্ধার করার একমাত্র সক্ষমতা তারই রয়েছে বলে রাজনৈতিক অভিজ্ঞ মহলের ধারণা। তিনি বিজয়ী হলে বরিশাল নগরীকে তিলোত্তমা এক অপরূপা শহরে রূপান্তর করতে পারবেন বলেও সবার বিশ্বাস।

বিশেষভাবে উল্লেখ্য, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট কালরাতে রক্তঝরা অচিন্তনীয় বিয়োগান্তক অধ্যায়ের শোকগাথাঁয় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের সঙ্গে দাদা তৎকালীণ কৃষিমন্ত্রী ও কৃষক কুলের নয়নের মনি আব্দুর রব সেরনিয়াবাত ও চার বছরের ভাই সুকান্ত আব্দুলাহ বাবুসহ পরিবারের অনেক স্বজনকে হারান সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ। সেদিন রাতে মৃত্যুর দুয়ার থেকে মহান আল্লাহ রাব্বুল আল আমিনের অপার কৃপায় অলৌকিকভাবে বাবা আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ, বুলেটবিদ্ধ মা শাহানারা আব্দুল্লাহ ও তার কোলে থাকা দেড় বছরের শিশু পুত্র সাদিক আব্দুল্লাহ প্রাণে বেঁচে যান। শরীরে বেশ কয়েকটি বুলেট বহন করে অসহ্য যন্ত্রনা নিয়ে মা শাহানারা আব্দুল্লাহ ও বাবা আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহর মতো সাদিক আব্দুল্লাহও আ’লীগের সুখ-দুঃখের অংশীদার। ৭৫’র পর সেনাশাসক জিয়াউর রহমান, স্বৈরশাসক এরশাদ ও বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার আমলে (৯১-৯৬ ও ২০০১-২০০৬) মিথ্যা মামলাসহ নানা ভাবে আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ ও তার পরিবারকে হয়রানির শিকার হতে হয়। ১/১১’র সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলেও ষড়যন্ত্রের শিকার হন তারা। তবে সকল চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের মাঝেও এ পরিবারটি বরিশালে আওয়ামীলীগ নেতা-কর্মীদের একমাত্র ভরসাস্থল ও শেষ ঠিকানা।

ঈদের চতুর্থ দিনেও শাহী ৯৯ পার্কে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়

ঈদুল ফিতরের তৃতীয় ও চতুর্থ দিনেও প্রকৃতির খোঁজে শহরের কোলাহল ছেড়ে দর্শণার্থীদের উপচেপড়া ভিড়ে মুখর ছিলো প্রত্যন্ত অঞ্চলে নির্মিত বরিশালের গৌরনদী উপজেলার বাটাজোর ইউনিয়নের দেওপাড়া গ্রামে শাহী ৯৯ পার্ক। পৌর শহরের বাইরে একমাত্র এ বিনোদন কেন্দ্রে ঈদের দিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্য়ন্ত অদ্যবর্ধি প্রতিদিন সকল বয়সের ভ্রমনপিপাসু কমপক্ষে ৩৫-৪০ হাজার লোকের সমাগম ঘটেছে। ঈদুল ফিতরের ছুটিতে নারীর টানে বাড়িতে ফেরা জেলা ও পৌর শহরের মানুষদের কাছে শাহী ৯৯ পার্কটি বিনোদনের নতুন খোরাক জুগিয়েছে।

প্রতিদিন এখানে পৌর শহরসহ বিভিন্ন উপজেলার ভ্রমনপিপাসুরা স্ব-পরিবারে ছুটে আসেন প্রকৃতির ছোয়া পেতে। বাদ পড়েননি প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও। এ বিনোদন কেন্দ্রে আনন্দ উল্লাস করে ভেসে বেড়াচ্ছেন শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে সকল বয়সের দর্শনার্থীরা। এখানে ঈদের ছুটি উপভোগ করতে উচ্ছ্বাসের কোন কমতি ছিলোনা।

জানা গেছে, ২০১২ সালে প্রতিশ্রুতিশীল বৃক্ষপ্রেমি দেশের একমাত্র শাহী ৯৯ জর্দ্দা কোম্পানীর স্বত্তাধীকারি এবং বাংলাদেশ আওয়ামী তাঁতী লীগের ঢাকা মহানগরের (উত্তর) দক্ষিণখান থানার সাবেক সভাপতি শামীম আহমেদ তার নিজস্ব উদ্যোগে তার মায়ের মায়ের জম্মস্থান গৌরনদী উপজেলার বাটাজোর ইউনিয়নের দেওপাড়া গ্রামে শাহী ৯৯ পার্ক নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। সেই থেকে আজ পর্যন্ত তিনি তার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। দেশ-বিদেশ ঘুরে তিনি অসংখ্য স্ট্যাচু সংগ্রহ করে পার্কে স্থাপন করেছেন। এ পার্কে তিনি সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালা ও লতার। ফলশ্রুতিতে পার্কের মধ্যে ১৪’শ প্রজাতির গাছপালা ও লতা রোপন করা হয়েছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমির ন্যায় সাজানো অপূর্ব সব নৈশর্গিক দৃশ্যে ঘেরা বিনোদনমূলক শাহী ৯৯ পার্কে ঈদ ছাড়াও সবার জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ১০ টাকা কুপনের মাধ্যমে উন্মুক্ত এ পার্কে প্রতিদিন দর্শনার্থীদের উপচেপড়া ভিড় থাকে।

দর্শনার্থী তরিকুল ইসলাম, তৌফিক বেপারী জানান, শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে সকল বয়সের মানুষের চিত্ত বিনোদনের জন্য গৌরনদীসহ পাশ্ববর্তী বিভিন্ন উপজেলায় সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে আজও কোন পার্ক কিংবা বিনোদন স্পট গড়ে ওঠেনি। অজপাড়া গাঁয়ে হলেও এতদাঞ্চলের সকল বয়সের মানুষের জন্য শাহী ৯৯ পার্ক বিনোদনের নতুন মাত্রা যোগ হওয়ায় আমরা ঈদ আনন্দ উপভোগ করতে পারছি।

দর্শনার্থীরা জানায়, থাই স্প্রীং বট, এ্যালমন, পেশন গাছসহ দেশ-বিদেশের ১৪’শ প্রজাতের গাছপালা ও লতা। সু-বিশাল পুকুরের চারিপার্শ্বে বিভিন্ন প্রজাতের ফুলগাছ ছাড়াও কৃত্রিম পশু-পাখি যেমন-কুমির, জিরাফ, বক, গরু, উট পাখি, কচ্ছপ, খরগোশ, পেঙ্গুইন, ভৌতিক মানুষের কঙ্কাল, সুপারম্যান, ফাইটারম্যান, ফুলসহ বিনোদনের অসংখ্য স্ট্যাচু দিয়ে প্রায় পাঁচ একর জমিকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমির ন্যায় সাজানো হয়েছে অপরূপ সাজে।

সর্বদা খুশি থাকুন নিজের জীবন নিয়ে

পরিতৃপ্ত জীবনের জন্য কি চাই মানুষের? খুব ভালো চাকরি? বাড়ি-গাড়ি সম্পত্তি? অথবা একেবারে মনের মতো জীবনসঙ্গী? কিচ্ছু নয়। শুধুই প্রয়োজন সুখি হবার ইচ্ছেটুকু। আমাদের জীবনে সুখের সবচাইতে বড় বাধা তৈরি করি আমরা নিজেরাই। কারণ আমরা অলীক কিছু স্বপ্নের পেছনে দৌড়ে দৌড়ে নিজের জীবনের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ সময়টাকে পার করে দেই। এখন সময় এসেছে এই পুরনো ধারণা পাল্টে ফেলার। জীবনে সুখি হবার জন্য পুরো পৃথিবীটাকে নয়, শুধু নিজের দৃষ্টিভঙ্গিটাকে একটু পাল্টে ফেলুন। সুখ নিজে থেকেই আপনার কাছে ধরা দেবে।

এমন কিছু জিনিসের তালিকা করুন যেগুলো আপনাকে আনন্দ দেয়

খুব সাধারণ কিছু জিনিসের তালিকা করুন। তালিকা বেশী বড় করবেন না। কি লিখবেন তা একান্ত আপনার ওপরেই নির্ভর করছে। আপনি হয়ত বন্ধুদের সাথে বেড়াতে পছন্দ করেন, অথবা ভালোবাসেন মাঝরাতে ছাদে গিয়ে পরিষ্কার আকাশের তারা গুনতে। খুব সাধারণ ব্যাপার, কিন্তু সেটা করলে এক নিমিষেই আপনার মন ভালো হয়ে যায়- এমন কোনও একটি ব্যাপার তো নিশ্চয়ই আছে। এগুলো দিয়েই একটা তালিকা তৈরি করুন। এরপর কি করবেন? তালিকাটি অনুসরণ করুন। সপ্তাহে অন্তত দুই-তিনবার এই তালিকার কোনও একটি কাজ করুন। এ ব্যাপারটা অভ্যাস হয়ে গেলে দেখবেন আপনার দিনগুলো এমনিতেই ভালো হয়ে যাচ্ছে।

সক্রিয় থাকুন

কি ধরণের ব্যায়াম করতে পছন্দ করেন আপনি? অনেকে নাচতে খুব ভালোবাসেন, কেউ নিয়মিত জিমে যান, কেউ আবার যোগব্যায়াম করতে ভালোবাসেন। সাঁতার কাটা, সাইকেল চালানো, মার্শাল আর্ট- এসব ব্যাপারেও অনেকেই উৎসাহী থাকেন। আপনার যেটা করতে ভালো লাগে, সেটাই করুন। যে ভাবেই হোক শরীরকে চালু রাখুন। শরীর সক্রিয় থাকলে মনটাও ভালো থাকবে। খুব দ্রুত মনকে হালকা করার জন্য ব্যায়ামের জুড়ি নেই।

পরিমিত খাদ্যগ্রহণ

বেশী খেলেই যে শরীর বেশী ভালো থাকবে তা কিন্তু নয়! হালকা খাবার খান। আপনার যতটুকু দরকার তার চাইতে বেশী খাবেন না। এতে আপনার হজমের শক্তি বৃদ্ধি পাবে, শরীরে খাদ্য শোষিত হবে ভালোভাবে আর তাছাড়া শক্তি এবং সক্রিয়তাও বৃদ্ধি পাবে।

ঠাণ্ডা পানিতে গোসল করুন

সারা বছর ঠাণ্ডা পানিতে গোসল করতে গেলে অনেকের স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে যেতে পারে। কিন্তু যাদের এমন সমস্যা নেই তারা সকালে ঘুম থেকে উঠেই ঠাণ্ডা পানিতে গোসল করার অভ্যাস করতে পারেন। নিমিষেই ঘুম চলে গিয়ে কর্মোদ্যম ফিরে আসবে। শরীরের রক্ত চলাচল বাড়ায়, বিষণ্ণতা কমায়, ত্বক এবং চুল ভালো রাখে, সার্বিক স্বাস্থ্য ভালো রাখে এই ঠাণ্ডা পানির গোসল।

কথা কম বলার অভ্যাস করুন

অন্যদের সাথে যখনই কোনও ব্যাপারে আলোচনা করবেন অথবা আড্ডা দেবেন, তখন মনোযোগ দিয়ে কথা শুনুন এবং কথা বলার সময়েও একটু বেশী সময় ভাবুন। আমাদের জীবনের বেশিরভাগ সমস্যাই হবার কারণ হলো আমরা বেশী কথা বলি এবং চিন্তা না করে কথা বলি। অন্যদের কথা শোনার সময় তাদের কথার সুরের দিকে লক্ষ্য রাখুন। কথা বললেই যে তার প্রত্যুত্তর দিতে হবে এমনটা নয়। দরকার না হলে উত্তর দেবেন না। আর এটা মনে রাখুন, যে নেতিবাচক কথা বলা বা ঝগড়া করার চাইতে চুপ করে থাকাটাই শ্রেয়। লক্ষ্য করে দেখুন, কথা কম বলার ফলে আপনার কতটা উপকার হচ্ছে। অযথা কথা বলা কমিয়ে দিলে অন্যের কথার প্রতি আপনার মনোযোগ বাড়বে, কমে যাবে অযাচিত ঝগড়া এবং মনোমালিন্য। খুব সহজেই অনেক নেতিবাচক ব্যাপার থেকে মুক্ত হবে আপনার জীবন।

দিনে অন্তত ১০ মিনিট রৌদ্রে থাকুন

চোখে এবং ত্বকে সূর্যালোক এসে পড়লে মনটা ভালো হয়ে যাবে আপনা থেকেই। শুধু তাই নয়, বিষণ্ণতা দূর করতেও এটি কার্যকর। আর রৌদ্রে গেলে শরীরে ভিটামিন ডি তৈরি হয়ে এটা আমরা সবাই জানি। স্বাস্থ্য ভালো রাখতে এর বিকল্প নেই।

টিভি বন্ধ করে দিন

টিভি দেখে যে সময়টা ব্যয় করছেন, সে সময়টা অনেক বেশী দরকারি কাজে ব্যয় করতে পারবেন আপনি। ভালো কোনও বই পড়ুন। প্রিয়জন, বন্ধু বা পরিবারের কারও সাথে কথা বলুন। অন্যরকম কিছু করুন। আপনার মনের ওপরেই তার প্রভাব পড়বে।

সৃজনশীল হয়ে উঠুন

সবাই শিল্পী হতে পারেন না বটে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে আপনি সৃজনশীল কিছু করতে পারবেন না। রান্না করতে পারেন, ইচ্ছে মতো নাচ-গান করতে পারেন, ডায়েরি লিখতে পারেন, নতুন একটা কৌতুক শিখতে পারেন। কত রকমের কাজ রয়েছে পৃথিবীতে। নিজে থেকে কিছু তৈরি করুন। সময় পেলে ঘরতাকে একটু অন্যভাবে সাজান, বাগান তৈরি করুন। আনন্দে মন ভরে উঠবে।

প্রকৃতি উপভোগ করুন

আমরা প্রকৃতিরই অংশ। আমাদের জীবন থেকে প্রকৃতি যত হারিয়ে যাচ্ছে, ততই আমাদের মাঝে একটু একটু করে কষ্ট জমা হচ্ছে। আমাদের শরীর তো বটেই মনেরও ক্ষতি হচ্ছে প্রকৃতির সান্নিধ্য কমে যাওয়ায়। শুধু তাই নয়, নিজের জীবনটাকেও প্রকৃতির মতো স্বাভাবিক করে আনতে চেষ্টা করুন। খুব জোর দিয়ে কোনোকিছু করতে চাইবেন না। এটা মাথায় রাখুন , যে প্রাকৃতিক নিয়মেই সবকিছু হবে। নিজেকে কল্পনা করুন একটি বন্ফুলের মতো, সব প্রতিকূলতা সহ্য করেই যে টিকে থাকে।

নির্বাচনের আগেই সাদিক-শামীমের তুমুল লড়াই

ঈদ গেলেই পুরোদমে শুরু হবে বরিশাল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের তোড়জোড়। সিটি নির্বাচনের দিনক্ষণ ঠিক হওয়ার পর থেকেই শুরু হয়েছে নির্বাচনী ডামাডোল। আর তাতে এগিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।

ক্ষমতাসীন দলটির মনোনয়ন কে পাচ্ছেন এটি এখনো চূড়ান্ত না হলেও নেতাকর্মীদের জল্পনা-কল্পনায় রয়েছেন দলের বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি কর্নেল (অব.) জাহিদ ফারুক শামীম এবং মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ।

মেয়র পদে নিজের পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে মনোনয়ন নিশ্চিত করতে এই দুজনের কর্মী-সমর্থকরা ইতিমধ্যে লড়াইয়ে নেমে পড়েছেন। শক্ত দুই প্রার্থী মনোনয়ন প্রতিযোগিতায় থাকায় এখন সবাই তাকিয়ে আছেন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের দিকে। কে হবেন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী। তবে তাদের সব জল্পনা-কল্পনা শামীম-সাদিক নিয়ে। দুজনের মধ্যে আবার এগিয়ে সাদিক আবদুল্লাহ।

নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী আগামী ৩০ জুলাই অনুষ্ঠিত হবে বরিশাল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন।

মহানগর আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন দিতে হলে সাদিক-শামীমের মধ্য থেকেই দিতে হবে। কেননা এই দুজন ছাড়া আর কোনো শক্ত প্রার্থী নেই আওয়ামী লীগের।

আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে বোঝা যাচ্ছে, সাবেক মন্ত্রী আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহর ছেলে ও বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহর দিকেই এবার সমর্থনের জোয়ারটা বেশি বলে মনে করছেন তারা। কেননা একদিকে এমপি-পুত্র, অন্যদিকে সাবেক মেয়র শওকত হোসেন হিরণের পর মহানগর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে রয়েছেন সাদিক। ছাত্রলীগ ও যুবলীগের একটি বড় অংশ সাদিক আব্দুল্লাহর সঙ্গে রয়েছে।

তবে একটি অংশ প্রকাশ্যে সাদিকের বিরোধিতা করছে। তারা বলছে, মেয়র পদে সাদিককে নয়, তারা চায় জাহিদ ফারুক শামীমকে। অবশ্য এই অংশটি এক আমলে সাবেক মেয়র শওকত হোসেন হিরণের অনুসারী ছিলেন। হিরণের মৃত্যুর পর তারা সাদিকের দাপটে কোণঠাসা হয়ে পড়ায় এবারের নির্বাচনে শামীমকে নিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। শামীমের পক্ষে ভোটারদের কাছে গিয়ে নীরবে প্রচারও চালাচ্ছেন হিরণপন্থীরা।

কিন্তু সাদিক আব্দুল্লাহকে বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের কার্যক্রম থেকে শুরু করে দলীয় প্রোগ্রামগুলোতে ব্যাপক নেতাকর্মী নিয়ে উপস্থিত থাকতে দেখা যায় সব সময়। অন্যদিকে শামীমকে জাতীয় কোনো দিবস ছাড়া এই যাবৎকাল কোনো কর্মসূচিতে দেখা যায়নি। তাই অধিকাংশ নেতাকর্মীর দাবি- সাদিক আব্দুল্লাহকে দেয়া হোক আওয়ামী লীগের মনোনয়ন।

এদিকে বরিশাল জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের বেশ কজন সিনিয়র নেতা রুষ্ট সাদিক আব্দুল্লাহর ওপর। কারণ জানতে চাইলে তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সাদিক আব্দুল্লাহ রাজনীতির মাঠে অনেকটা এগিয়েছেন এটা ঠিক। নির্বাচনী প্রচারণাও চালাচ্ছেন জোরেশোরে। কিন্তু তার কিছু লোকজনের কারণে সাধারণ মানুষ বিরক্ত। তারা মনে করছে, সাদিক আব্দুল্লাহকে ভোট দিলে আরও বেশি ঝামেলায় পড়তে হবে তাদের।

মানুষের এই ধারণা সাদিক আব্দুল্লাহ পাল্টে দিতে পারলে তার মনোনয়ন নিয়ে তাদের কোনো কথা থাকবে না বলে জানান ওই নেতারা।

মেয়র পদে বিএনপির শক্ত প্রার্থী থাকার কথাও ওই নেতারা তুলে ধরেন। তারা বলেন, বিএনপি থেকে দলের যুগ্ম মহাসচিব মজিবর রহমান সরোয়ার নির্বাচনে আগ্রহী হলে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়তে হবে আওয়ামী লীগকে। সাদিক আব্দুল্লাহ যদি নিজের সমর্থকদের ভুল-ত্রুটি সংশোধন করে জনগণের আরো আস্থা অর্জন করতে পারেন তাহলে তিনি শক্ত প্রার্থী হয়ে দাঁড়াবেন বিএনপির সামনে।

অন্যদিকে শামীমের পক্ষের লোকজন মনে করেন, তাকে মনোনয়ন দিলে বরং লাবভান হবে আওয়ামী লীগ। বরিশাল সরকারি ব্রজমোহন কলেজ ছাত্র সংসদের সাহিত্য সম্পাদক ছাত্রলীগ নেতা নূর আল আহাদ সাঈদীর দাবি, নগরবাসী জাহিদ ফারুক শামীমকে পূর্ণ সমর্থন করছে।

রাজনীতির মাঠে শামীম নতুন লোক নন উল্লেখ করে নূর আল আহাদ বলেন, ‘আমরা মনে করি জাহিদ ফারুক শামীমকে মনোনয়ন দেয়া হলে তিনি বিএনপির বিপক্ষে নির্বাচিত হবেন। অন্য কোনো প্রার্থী বিএনপির সঙ্গে লড়াই করে পারবে না।’ তাই কেন্দ্র থেকে জাহিদ ফারুক শামীমকেই মনোনয়ন দেয়া হবে বলে বিশ্বাস এই ছাত্রনেতার।

নূর আল আহাদের বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন বরিশাল জেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি আতিকুল্লাহ মুনিম। তার মতে, বরিশাল নগরীর উন্নয়নের জন্য সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহর বিকল্প নেই।

এর কারণ হিসেবে আতিকুল্লাহ মুনিম বলেন, ‘তিনি (সাদিক) তৃণমূল থেকে শুরু করে সব স্তরের মানুষের দুঃখ-দুর্দশা সমাধানের চেষ্টা করছেন। ছুটে যাচ্ছেন ছিন্নমূল মানুষের কাছে। সাদিক আব্দুল্লাহ নির্বাচনে দাঁড়ালে নিঃসন্দেহে জয়ী হবেন তিনি।’

আরেক ছাত্রলীগ নেতা সাজ্জাদ সেরনিয়াবাত বলেন, ‘নগরীর উন্নয়নের জন্য নগরবাসী সাদিক আব্দুল্লাহকেই ভোট দেবে। ইতিমধ্যে সাদিক আব্দুল্লাহকে সমর্থন করেছে প্রতিটি এলাকার মানুষ।’

নিজের যোগ্যতায় রাজনীতির এতটা কঠিন অবস্থানে এসে পৌঁছেছেন সাদিক আব্দুল্লাহ- এমনটাই মনে করেন মহানগর আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক নিরব হোসেন টুটুল। তার মতে, বরিশালের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং জনসমর্থন প্রশ্নে সাদিক আব্দুল্লাহর অবস্থান নেত্রীর অজানা নয়।

বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম আব্বাস চৌধুরী দুলাল জানান, সাদিক আব্দুল্লাহকে মেয়র প্রার্থী করার জন্য তারা কেন্দ্রে দাবি তুলেছেন। সাদিক আব্দুল্লাহকে মেয়র পদে মনোনয়ন দিলে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

বরিশাল ট্রিবিউন অনলাইন এর সৌজন্যে

এবারের ফিতরা সর্বনিম্ন ৭০ টাকা

আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে এ বছর জনপ্রতি সর্বনিম্ন ৭০ টাকা ফিতরা নির্ধারণ করা হয়েছে। সেইসঙ্গে সর্বোচ্চ ফিতরা নির্ধারণ করা হয়েছে দুই হাজার ৩১০ টাকা।

রাজধানীর বায়তুল মোকাররম মসজিদের সভাকক্ষে ইসলামী ফাউন্ডেশনের জাতীয় ফিতরা নির্ধারণ কমিটির সভায় এই ফিতরা নির্ধারণ করা হয়।

ইসলাম ধর্মের নিয়ম হলো, ঈদুল ফিতরের নামাজের আগেই ফিতরা দিতে হয়। প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলমানের জন্য ফিতরা দেওয়া ওয়াজিব।

গত বছর ফিতরার হার সর্বনিম্ন ৬৫ টাকা ও সর্বোচ্চ এক হাজার ৯৮০ টাকা ছিল।

সারা দেশে গম বা আটার বাজারমূল্য হিসাব করে এই সর্বনিম্ন ফিতরা নির্ধারণ করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী, এক কেজি ৬৫০ গ্রাম গম বা আটা অথবা খেজুর, পনির, যব বা কিশমিশের মধ্যে যেকোনো একটি পণ্যের তিন কেজি ৩০০ গ্রামের বাজারমূল্য ফিতরা হিসেবে গরিবদের মধ্যে বিতরণ করা যায়।

পদ্মা থেকে পায়রা পর্যন্ত উন্নয়নের নেপথ্যের কারিগর আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ্

পদ্মা সেতু থেকে পায়রা বন্দর- প্রায় আড়াইশ কিলোমিটার জুড়ে শুধুই উন্নয়নের জোয়ার লেগেছে। দীর্ঘ এ সড়ক নির্মিত হচ্ছে ৪ লেনে। সাথে সংযোজিত হচ্ছে দক্ষিণের মানুষের স্বপ্নের রেল সংযোগ। আসছে ভোলার গ্যাস। যার মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলে গড়ে উঠবে শিল্পাঞ্চল। গত ৯ বছরের দীর্ঘ প্রচেষ্টায় এমন ঈর্ষণীয় উন্নয়ন ঘটেছে বরিশালে। নগরীর বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের দাবি, এই উন্নয়নের নেপথ্যের কারিগর হচ্ছেন দক্ষিণাঞ্চলের রাজনৈতিক অভিভাবক পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির আহবায়ক (মন্ত্রী), স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি আলহাজ্ব আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ এমপি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পদ্মা সেতুর ২টি স্প্যান ইতোমধ্যে স্থাপন হয়েছে। দ্রুত চলছে এর নির্মাণ কাজ। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বছর শেষে পুরোপুরি দৃশ্যমান হতে পারে পদ্মা সেতু। পদ্মা সেতুর পাশাপাশি এবার পায়রা বন্দর পর্যন্ত রেল লাইন সংযোগ দেয়ার জন্যও উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ সড়ক হচ্ছে ৪ লেনের। যার ফলে জাতীয় মহাসড়ক হিসেবে পরিণত হতে যাওয়া এ সড়ক থেকে যোগাযোগ মাধ্যম সৃষ্টি হতে যাচ্ছে পটুয়াখালীর পায়রা বন্দরে। বরিশাল চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি সাইদুর রহমান রিন্টু বলেন, “এবারের বাজেটে সরকারকে ভোলার গ্যাস বরিশালে আনা, রেল লাইন স্থাপনের মত গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন কাজে ব্যাপক বরাদ্দ দিতে হবে। কেননা এ অঞ্চলের ব্যাপক উন্নয়ন বাস্তবায়ন হলে আগামী নির্বাচনে দক্ষিণের সব ক’টি আসন পাবে আ’লীগ। আমাদের রাজনৈতিক অভিভাবক আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ এমন পরিকল্পনা নিয়েই গোটা বরিশাল বিভাগে কাজ করছেন। এ অঞ্চলের এতোসব উন্নয়নে তার অবদান ব্যাপক।”

জানতে চাইলে সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন বরিশাল জেলা কমিটির সদস্য সচিব কাজী এনায়েত হোসেন শিবলু বলেন, এই সরকার দক্ষিণাঞ্চলের যে উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে তা ঈর্ষণীয়। প্রধানমন্ত্রী ভোলার গ্যাসও বরিশালে আনার উদ্যোগ নিয়ে বরিশালবাসীর মনের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। এ অঞ্চলের সাথে রেলের সম্পর্ক ছিলো না। রেল উন্নয়নের অন্যতম চাবিকাঠি। প্রধানমন্ত্রী এই উদ্যোগও নিয়ে বরিশালবাসীর কাছে আরও বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন। রাজনৈতিক নেতৃত্বের কারণে এটি হচ্ছে। বাজেটেও এসব উন্নয়ন সেক্টরে বরাদ্দ থাকতে হবে। তিনি বলেন, দক্ষিণাঞ্চলের এতসব উন্নয়নে হাসানাত ভাইয়ের অবদান অনেক বেশি। হাসনাত ভাই এখন মাঠের রাজনীতিতে নেমে এসেছেন। তিনি এ অঞ্চলের উন্নয়নের দাবি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরছেন।

মহানগর আ’লীগের সভাপতি অ্যাড. গোলাম আব্বাস চৌধুরী দুলাল বলেন, এ অঞ্চলের যত উন্নয়ন দৃশ্যমান তা করেছেন প্রধানমন্ত্রী। এ অঞ্চল হবে শিল্পাঞ্চল। সিঙ্গাপুরে পরিণত হবে দক্ষিণাঞ্চল তথা বরিশাল। এতো উন্নয়নের পিছনে সাংসদ আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ’র উদ্যোগ রয়েছে ব্যাপক।

এ ব্যাপারে সাংস্কৃতিক সংগঠন সমন্বয় পরিষদের সভাপতি কাজল ঘোষ বলেন, বরিশালবাসী অনেক বেশি আধুনিক এবং পরিশ্রমী। তারা চান এ অঞ্চলের উন্নয়নের গতি আরো বেগবান হোক। পদ্মা থেকে পায়রা পর্যন্ত এতসব উন্নয়ন এ সরকারেরই অবদান। বাজেটে ব্যাপক বরাদ্দের মাধ্যমে এর দ্রুত বাস্তবায়ন ঘটাতে এ অঞ্চলের রাজনৈতিক অভিভাবক আবুল হাসানাত আবদুল্লাহসহ সকল রাজনৈতিক নেতাকে আরও বেশি ভূমিকা রাখতে হবে।

যুক্তরাজ্য থেকে এলএলবি সন্মান ডিগ্রী অর্জন করেছে গৌরনদীর রুমন

বরিশালের গৌরনদী উপজেলার কৃতি সন্তান মোহাম্মদ মুজাহিদুল ইসলাম রুমন যুক্তরাজ্যর হার্টফোর্ডশাআর ইউনিভার্সিটি থেকে ‘ল,গভর্মেন্ট এন্ড পলিটিক্স’ এর উপর এলএলবি সন্মান ডিগ্রী অর্জন করেছেন। এছাড়া তিনি হার্টফোর্ডশাআর ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশী সোসাইটির চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হয়েছেন এবং ভাইস চান্সেলরস ‘মোস্ট কমেন্ডিং স্টুডেন্ট অফ দা ইয়ার’ ২০১৬ এর সন্মান জনক সনদ অর্জন করেছেন।

রুমন যুক্তরাজ্যর এসেক্স কাউন্টিতে বসবাস করেন সেখানে তিনি বিভাগীয় পুলিশ এর নিরপেক্ষ উপদেষ্টা পরিষদের একজন সদস্য. তিনি পার্শবর্তী কাউন্টি ‘হার্টফোর্ডশাআর’ পুলিশ প্রধান এবং ‘পুলিশ ও ক্রাইম কমিশন’ এর ২০১৮বর্ষ সেরা সনদ অর্জন করেছেন, সেখানে তিনি পুলিশ এর সদর দপ্তর-এ কার্যক্রম ও তল্লাশির নিরপেক্ষ তদন্ত প্যানেল এর একজন সদস্য। বর্তমানে তিনি কেমব্রিজ এ ‘গ্রাজুয়েট প্রেসমেন্ট টিচার’ হিসেবে কর্মরত আছেন।

তিনি তৎকালীন ‘পালরদী মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও অমূল্য রতন ছাত্রাবাসের’ ছাত্র ছিলেন, এরপরে তিনি ‘ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজ’ থেকে এসএসসি ও এইচ এসসিপাশ করে যুক্তরাজ্যে বসবাস শুরু করেন।

তাঁর সাথে যোগাযোগ করলে তিনি গৌরনদী.কম এর প্রতিনিধিকে জানান, যুক্তরাজ্যের ‘সিটি ল স্কুল, ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডন’ থেকে ব্যারিস্টার ট্রেনিং শেষ করে যুক্তরাজ্যের পাশাপাশি তিনি ২০১৯ থেকে বাংলাদেশের আইন পেশায় নিযুক্ত হবার ব্যাপারে ও তিনি ব্যাপক আশাবাদী।

নানাবিদ প্রতিকূলতা ও প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে তিনি, তার এই সাফল্যর মধ্যে দিয়ে বর্তমান তরুণ ও যুব সমাজের জন্য এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তিনি মাদক ও আত্মহানির বিরুদ্ধে সকলকে সচেতন হওয়ার এবং মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি খেয়াল রাখার জন্য আহ্ববান জানান।

উল্লেখ্য, গৌরনদী উপজেলা বার্থী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও আনোয়ারা প্রি-ক্যাডেট স্কুলের প্রতিষ্টাতা আলহাজ মোহাম্মদ আবুল হোসাইন মিয়া ও অধ্যক্ষ মাকসুদা হোসাইন এর জ্যেষ্ঠ পুত্র মোহাম্মদ মুজাহিদুল ইসলাম রুমন।

মেয়র পদ প্রত্যাশী নাসরিন

অক্সফোর্ড খ্যাত বরিশাল বিএম কলেজের বনমালী গাঙ্গুলী ছাত্রীনিবাসের ছাত্রদলের সভাপতি হিসেবে তার প্রকাশ্যে রাজনীতির মাঠে পথচলা শুরু হয় ১৯৯৪ সালে। সেই থেকে রাজপথ আর ছাড়েননি তিনি। নানা ঘাত-প্রতিঘাত শেষে আজ তিনি কেন্দ্রীয় নেত্রী। দলের চরম দুর্দিনে মামলা-হামলায় একাকার হয়ে এরই মধ্যে তিনি অতি প্রিয় হয়ে উঠেছেন তৃণমূল নেতাকর্মীদের কাছে। মাঠপর্যায়ের কর্মীরা এখন তাকে জনপ্রতিনিধি হিসেবে দেখতে চান। তৃণমূল থেকে উঠে আসা সেই নেত্রী হলেন মহানগর বিএনপির সহ ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সহ সাংগঠনিক সম্পাদক আফরোজা খানম নাসরিন।

আসন্ন সিটি নির্বাচনে নগরবাসীর সেবায় নিজেকে আত্মনিয়োগ করতে মেয়র প্রার্থী হতে ইচ্ছুক তরুণ এই নেত্রী নাসরিন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দলের জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম করতে গিয়ে এ পর্যন্ত ২৯টি মামলার আসামি হতে হয়েছে আফরোজা খানম নাসরিনকে। অবরোধ-হরতালের এ ধরনের মামলায় তাকে ৭ বার জেলে যেতে হয়েছিল। ১৯৯৬ সালে বরিশালে সরকার বিরোধী আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে গুলিতে আহত হন তিনি। ২০০২ সালে বিএম কলেজের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে ছাত্রত্বও বাতিল হয় তার। ২০০৩ সালে বরিশাল ল’কলেজের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে তিনি ভিপি পদে প্রার্থী হলে ষড়যন্ত্র করে নির্বাচন বন্ধ করে দেয়া হয়। ২০১০ সালের ২৭ জুলাই ডাকা হরতালে রাজপথে থেকে পুলিশের নির্যাতন ও গ্রেপ্তারের শিকার হন এই নেত্রী। একই বছরের ১৩ নভেম্বর খালেদা জিয়াকে বাসভবন থেকে উচ্ছেদের প্রতিবাদে রাজপথে আন্দোলন করতে গিয়ে ঢাকার জাহাঙ্গীর গেটে পুলিশের হামলার শিকার ও পল্টন অফিসের সামনে থেকে গ্রেপ্তার হন নাসরিন। এভাবে আন্দোলন সংগ্রাম করতে গিয়ে পুলিশের দায়ের করা জননিরাপত্তা আইনে মামলাসহ বরিশালে সর্বোচ্চ ২৮টি মামলা এবং ঢাকায় ১টি মামলায় আসামি হতে হয়েছে তাকে। জেলে যেতে হয়েছে ৭ বার।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে নগরীর একাধিক ওয়ার্ড বিএনপি নেতা বলেন, আফরোজা খানম নাসরিন তরুণ হলেও রাজপথের পরীক্ষিত সৈনিক। নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডের কর্মীদের সাথে তার রয়েছে নিবিড় যোগাযোগ। তার মত যোগ্য নেতৃত্বকেই সিটি মেয়র হিসেবে মনোনয়ন দেয়া উচিত। এ ব্যাপারে মহানগর বিএনপির সহ ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সহ সাংগঠনিক সম্পাদক আফরোজা খানম নাসরিন বলেন, দলের প্রতি যে শ্রম এবং ত্যাগ তিনি স্বীকার করেছেন সেসব বিষয় চিন্তা করে দল তাকে আসন্ন বরিশাল সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে মনোনয়ন দিবে বলে আশা করেন। তৃণমূল নেতাকর্মীদের নিয়ে আন্দোলনে মাঠে ছিলেন দীর্ঘ সময়। তারাও তাকে মেয়র হিসেবে দেখতে চান। তিনি বরিশাল নগরীকে একটি সুন্দর এবং ‘গ্রিন সিটি’ হিসেবে গড়ে তুলতে চান, তরুণদের জন্য আত্মকর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে চান। বরিশালের সর্বস্তরের নাগরিকদের নিয়ে সবার জন্য একটি বাসযোগ্য আধুনিক পরিচ্ছন্ন নগরী গড়ে তুলতে চান দলের জন্য ত্যাগী এই নেত্রী।

প্রথম প্রকাশঃ দৈনিক আজকের বার্তা, বরিশাল