বরিশালের সাংবাদিক লিটন বাশারের মৃত্যুতে বিএমআই সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্ট এর শোক

বরিশালে গণমাধ্যম অঙ্গনে খ্যাতিমান সাংবাদিক লিটন বাশার এর অকাল মৃত্যুতে গভীর শোক ও তার পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন বাংলাদেশ মিডিয়া ইনস্টিটিউট সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্ট-এর কেন্দ্রীয় সভাপতি মুহাম্মাদ আবু হানিফ খান ও কেন্দ্রীয় মহাসচিব নূরুজ্জামান প্রধান। নেতৃদ্বয় শোকবার্তায় দৈনিক ইত্তেফাকে কর্মরত এই সাংবাদিকের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে ইত্তেফাক কর্তৃপক্ষ ও সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। নেতৃদ্বয় শোকবার্তায় আরও বলেন, লিটন বাশারের অকাল মৃত্যু বরিশালে সাংবাদিক অঙ্গনে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে।

বরিশাল বিভাগের সকল ওসিদের নাম্বার

আমরা পথ চলতে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অসুবিধার সম্মূখীন হই। কারনে অকারনে এসব বিপদে সব সময় নিজের সামর্থে সমাধান করা সম্ভব হয় না। আর দেশের প্রচলিত আইনে সব সমাধান আপনার দ্বারা সমাধান করার বিধানও নেই। রাষ্ট্রের নিয়ম অনুযায়ী আইনগতভাবে জনগনকে বিপদে সাহায্য করার জন্য রয়েছে থানা পুলিশ। আর থানা পুলিশকে দ্রুত সংবাদ দিতে হলে প্রথম যেটা প্রয়োজন সেটা হলো থানা পুলিশের মোবাইল নম্বর। আর সেই প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করে বরিশাল বিভাগের সকল থানার অফিসার ইনচার্জ বা ওসি সাহেবদের সরকারী মোবাইল নম্বর আপনাদের সুবিদার্থে এখানে দেওয়া হলো। আশা করি আপনাদের অনাকাঙ্খিত বিপদে নম্বরসমূহ কাজে আসবে।

তবে একটা অনুরোধ, একান্ত জরুরী প্রয়োজন ব্যতিত এই নম্বরসমূহে ফোন না করে সরাসরি দেখা করে কথা বলবেন। কারন এই নম্বরটি থানায় ওসি একাই সার্বক্ষনিকভাবে ব্যবহার করেন এবং ২৪ ঘন্টা মোবাইলটি খোলা থাকে, অহেতুক বিরক্ত করা উচিৎ হবে কিনা সে বিবেচনা আপনাকে আগে করতে হবে। মানবাধিকার সনদ অনুযায়ী সকল নাগরিকের বিশ্রামের নির্দিষ্ট সময় থাকে কিম্বা নির্দিষ্ট সময় কাজ করার জন্য নির্ধারিত থাকে। কিন্তু একমাত্র বাংলাদেশে ওসি সাহেবদের মানবাধিকারের এই নিয়মটি বলবৎ করা এখন পর্যন্ত সম্ভব হয়নি। তাই আমাদেরই উচিৎ বিষয়টির গুরুত্ব বুঝে ফোন করা।

যে সকল কারনে এই সকল নম্বরে ফোন করার প্রয়োজন হতে পারে-

১। কোন দূর্ঘটনার সংবাদ জানাতে ২। কোন অপমৃত্যু সংবাদ জানাতে ৩। অগ্নিকান্ডের সংবাদ জানাতে

৪। বড় ধরনের অপরাধ সংঘটনের প্রস্তুতির সংবাদ জানাতে ৫। কোন পলাতক/ফেরারী অপরাধীদের অবস্থান জানাতে

৬। মাদকদ্রব্য সম্পর্কে তথ্য প্রদানের জন্য ৭। অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র সম্পর্কে তথ্য প্রদানের জন্য ৮। দাঙ্গা সংঘটনের সংবাদ জানাতে

এখানে সব নাম্বার দেয়া আছেঃ

১। ওসি কোতয়ালী বরিশাল- ০১৭১৩৩৭৪২৬৭

* ওসি বিমানবন্দরঃ ০১৭১৩৩৭৪৬০৯

*ওসি কাউনিয়াঃ ০১৭১৩৩৭৪৬০৩

*ওসি বন্দর থানাঃ ০১৭১৩৩৭৪৫৯৭

২। ওসি হিজলা- ০১৭১৩৩৭৪২৬৮
৩। ওসি মেহেদীগঞ্জ- ০১৭১৩৩৭৪২৬৯
৪। ওসি মুলাদী- ০১৭১৩৩৭৪২৭০
৫। ওসি বাবুগঞ্জ- ০১৭১৩৩৭৪২৭১
৬। ওসি বাকেরগঞ্জ- ০১৭১৩৩৭৪২৭২
৭। ওসি বানারীপাড়া- ০১৭১৩৩৭৪২৭৩
৮। ওসি আগৌলঝাড়া- ০১৭১৩৩৭৪২৭৪
৯। ওসি গৌরনদী- ০১৭১৩৩৭৪২৭৫
১০। ওসি উজিরপুর- ০১৭১৩৩৭৪২৭৬
১১। ওসি ঝালকাঠি- ০১৭১৩৩৭৪২৮৬
১২। ওসি নলছিঠি- ০১৭১৩৩৭৪২৮৭
১৩। ওসি রাজাপুর- ০১৭১৩৩৭৪২৮৮
১৪। ওসি কাঠালিয়া- ০১৭১৩৩৭৪২৮৯
১৫। ওসি ভোলা- ০১৭১৩৩৭৪৩০০
১৬। ওসি দৌলতখান- ০১৭১৩৩৭৪৩০১
১৭। ওসি তজুমুদ্দিন- ০১৭১৩৩৭৪৩০২
১৮। ওসি বোরহানউদ্দিন- ০১৭১৩৩৭৪৩০৩
১৯। ওসি লালমোহন- ০১৭১৩৩৭৪৩০৪
২০। ওসি চরফ্যাশন- ০১৭১৩৩৭৪৩০৫
২১। ওসি মনপুরা- ০১৭১৩৩৭৪৩০৬
২২। ওসি পটুয়াখালী- ০১৭১৩৩৭৪৩১৮
২৩। ওসি বাউফল- ০১৭১৩৩৭৪৩১৯
২৪। ওসি গলাচিপা- ০১৭১৩৩৭৪৩২০
২৫। ওসি দশমিনা- ০১৭১৩৩৭৪৩২১
২৬। ওসি দুমকী- ০১৭১৩৩৭৪৩২২
২৭। ওসি কলাপাড়া- ০১৭১৩৩৭৪৩২৩
২৮। ওসি মির্জাগঞ্জ- ০১৭১৩৩৭৪৩২৪
২৯। ওসি রাঙ্গাবালি- ০১৭১৩৩৭৪৩২৫
৩০। ওসি পিরোজপুর- ০১৭১৩৩৭৪৩৩৬
৩১। ওসি ভান্ডারিয়া- ০১৭১৩৩৭৪৩৩৭
৩২। ওসি নেসারাবাদ- ০১৭১৩৩৭৪৩৩৮
৩৩। ওসি কাউখালী- ০১৭১৩৩৭৪৩৩৯
৩৪। ওসি নাজিরপুর- ০১৭১৩৩৭৪৩৪০
৩৫। ওসি জিয়া নগর- ০১৭১৩৩৭৪৩৪১
৩৬। ওসি মঠবাড়ীয়া- ০১৭১৩৩৭৪৩৪২
৩৭। ওসি বরগুনা- ০১৭১৩৩৭৪৩৫৩
৩৮। ওসি আমতলী- ০১৭১৩৩৭৪৩৫৪
৩৯। ওসি পাথরঘাটা- ০১৭১৩৩৭৪৩৫৫
৪০। ওসি বেতাগী- ০১৭১৩৩৭৪৩৫৬
৪১। ওসি বামনা- ০১৭১৩৩৭৪৩৫৭
৪২। ওসি তালতলি- ০১৭১৩৩৭৪৩৫৮

এছাড়া বর্তমানে কমবেশি সবারই এন্ড্রুয়েড বা আইফোন ব্যবহার করি। স্মার্টফোনের মাধ্যমেও আপনি যোগাযোগ করতে পারেন এই অ্যাপ ডাউনলোড করে-

https://play.google.com/store/apps/details?id=com.ntitas.bdPoliceHelpLine

https://play.google.com/store/apps/details?id=nasir.bdpolice&hl=en

জেনে নিন কিছু বহুল প্রচলিত জাল হাদিস

আবু উযাইর : হাদিসও জাল হয় তা যখন প্রথম শুনেছিলাম খুব অবাক হয়েছিলাম ও একই সাথে কষ্ট পেয়েছিলাম। আল্লাহ্‌, তাঁর রাসুল, ইসলাম এমন সেনসিটিভ বিষয় নিয়ে কেউ অবলীলায় এমন মিথ্যা রচনা করতে পারে, সত্যিই তা আমাদের ধারণার বাইরে। এক সময় অবাক হয়ে দেখলাম ছোটবেলা থেকে ‘আল হাদিস’ নামে যা কিছু শুনেছি, তার একটা বড় অংশই আসলে ‘জাল হাদিস’।

একটি জাল হাদিস মেনে চলা মানে মিথ্যা প্রচার করা বা মিথ্যা অনুসরণ করে নিজেকে সত্য থেকে দূরে সরিয়ে ফেলা। এর পরিণাম ভালো না হয়ে খারাপ হবার সম্ভাবনাই বেশী। সুতরাং যে কোন হাদিস জানার আগে তার সূত্র এবং এটি সহিহ বা বিশুদ্ধ কিনা তা জেনে নেয়া খুব জরুরী। এর জন্য খুব কষ্ট করার দরকার নেই। কম্পিউটার থাকলে এক সার্চেই এর আদ্যোপান্ত বেরিয়ে আসবে। আর তা না থাকলে একজন ভালো আলিমের কাছ থেকে জেনে নিতে হবে। আসুন দেখে নেয়া যাক কিছু প্রচলিত জাল হাদিস এবং মিলিয়ে দেখে নিন আপনার জানা হাদিসগুলো এর ভেতর পড়ে কিনা।

প্রতিটি বিশুদ্ধ হাদিসের শুরুতে যেমন ‘রাসুলুল্লাহ সাঃ বলেছেন’ কথাটি উল্লেখ করা থাকে, তেমনি জাল হাদিসগুলোর শুরুতেও তেমনটি থাকে। তবে এগুলো প্রকৃতপক্ষে রাসুলুল্লাহ সাঃ এর কথা না হওয়ায় জাল হাদিসের সংকলিত গ্রন্থগুলোতে সাধারণত ‘ক্বালা রাসুলাল্লাহি সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম’ বা ‘রাসুলুল্লাহ সাঃ বলেছেন’ উল্লেখ করা হয় না এবং এখানেও তা উল্লেখ করা হলো না। কেবল উদ্ধৃত অংশটিরই উল্লেখ করা হলো।

১। “জ্ঞানার্জনের জন্য সুদূর চীনে হলেও যাও”। (ইবন আদী ২/২০৭। ইবন জাওজী ও ইবন হিব্বান এটিকে জাল প্রমাণ করেছেন)
বহুল ব্যবহৃত ও বহুল প্রচারিত একটি জাল হাদিস। একটু খতিয়ে দেখলে সাধরণ চোখেই এই হাদিসটির জালিয়াতি চোখে পড়ে। রাসুলুল্লাহ সাঃ যদি সত্যিই এ কথা বলতেন তাহলে অত্যন্ত কষ্টকর হলেও চীনে অগণিত সাহাবাদের যাতায়াত থাকতো। তাছাড়া সে সময় চীন জ্ঞান-বিজ্ঞানের জন্য এমন কোন যায়গা ছিলোনা যে জ্ঞানার্জনের জন্য কাছাকাছি অনেক যায়গা ছেড়ে সেখানে যেতে রাসুলুল্লাহ সাঃ বলবেন।

২। “বিদ্বানের কলমের কালি শহীদের রক্তের চেয়েও পবিত্র”। (বাগদাদের ইতিহাস লিপিবদ্ধকালে খাতিব হাদিসটি লিপিবদ্ধ করেছেন, তবে তিনি নিজেই একে জাল বলেছেন)
শহীদদের মর্যাদা আর সকলের চেয়ে বেশী তা আল্লাহ্‌ নিজে কুরআনে বলেছেন। বহুল প্রচলিত এই জাল হাদিসটি দিয়ে মানুষকে শাহাদাতের বন্ধুর পথ থেকে অতি সূক্ষ্মভাবে দূরে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। একথা সত্য বলে মানার পর এমন কি কোন লোক থাকবে, যে বিদ্বান না হয়ে শহীদ হতে চাইবে?

৩। “মসজিদে অপ্রয়োজনীয় কথা বললে তা সৎকাজগুলিকে ধ্বংস করে, যেভাবে প্রাণী ঘাস সাবাড় করে”। (তাবাকাত আশ শাফি’ইয়া, চতুর্থ খন্ড, ১৪৫ পৃঃ)
মসজিদ হলো ইসলামের প্রাণকেন্দ্রের মতো। অন্যায় ও অশ্লীল কথা ছাড়া সকল ভালো কথা, কাজ, পরিকল্পনার যায়গা হিসাবে রাসুলুল্লাহ সাঃ এর সময় থেকেই ছিলো মসজিদ।

৪। “আরবদের তিন কারণে ভালোবেসো। প্রথমতঃ আমি একজন আরব, দ্বিতীয়তঃ কুরআন নাজিল হয়েছে আরবী ভাষায়, তৃতীয়তঃ জান্নাতের ভাষা হবে আরবী”। (মুসতাদরাক আল হাকিমঃ চথুর্থ খন্ড, পৃষ্ঠাঃ ৮৭। রিজাল শাস্ত্রের অন্যতম সেরা স্কলার আবু হাতিম একে জাল প্রমাণ করেছেন)।
এই হাদিসটিও ইসলামের ভেতর জাতীয়তাবাদের বিষবাষ্প ঢুকাবার জন্য ব্যবহার করা হয়। আরব-অনারব কোন পার্থক্য ইসলামে নেই বরং এমন করার অপচেষ্টা কবিরা গুনাহ।

৫। “মুসলিমদের ভেতর এমন একজন ব্যক্তিও নেই, যার গুনাহগুলো জুম্মার দিনে ক্ষমা করে দেয়া হয় না”। (তাবরানি বর্ণিত। এটি জাল প্রমাণ করেছেন ইবন নাজর আল আসকালানী ও আজ জাহাবী)
সামান্য আমলের অবিশ্বাস্য ফজিলতের বর্ণনা করে মানুষকে পথভ্রষ্ট বানাবার অপচেষ্টার অংশ হিসাবে এমন অনেক জাল হাদিস তৈরী করা হয়েছে। “আখেরী যুগে একটি সুন্নত পালন করলে সাতশ শহীদের সম্না সওয়াব পাওয়া যাবে” এটিও হলো বহুল প্রচারিত এমন আরেকটি জাল হাদিস।

৬। “আমি হলাম জ্ঞানের শহর আর আলী তার দরজা”। (লিপিবদ্ধ করেছেন আল হাকিম ৩/১২৬। ইমাম বুখারী এটিকে জাল প্রমাণ করেছেন)
আলী রাঃ এর প্রতি বাড়াবাড়ি দেখাতে গিয়ে শিয়াদের দ্বারা অগণিত জাল হাদিস ব্যবহৃত হয়, যার ভেতর এটি হলো বহুল ব্যবহৃত একটি জাল হাদিস। যদিও আলী রাঃ এর মর্যাদা সম্পর্কে বিশুদ্ধ হাদিস আছে।

৭। “আমার সাহাবাগণ হলো আকাশের তারার মতো। তাদের একজনকে অনুসরণ করলেই তোমরা সৎপথের উপর থাকবে”। (ইবন হাজাম ৬/৮২ আল ইহকাম গ্রন্থে এটিকে জাল প্রমাণ করেছেন)
শিয়াদের ভেতর অধিকাংশই আবু বকর, উমার, উসমান রাঃ সহ অধিকাংশ সাহাবাদের প্রকাশ্যে বা গোপনে কাফির বলে ঘোষণা দেয় ও এর স্বপক্ষে জাল হাদিস প্রচার করে। সাহাবাদের মর্যাদাহানী করে তৈরী করা শিয়াদের জাল হাদিসের বিপরীতে অতি উৎসাহী কিছু সুন্নী ব্যক্তি সাহাবাদের অযাচিত মর্যাদা দেখিয়ে পাল্টা জাল হাদিস তৈরী করে, যার ভেতর এটি একটি।

৮। “আমার উম্মাতের মধ্যে মতপার্থক্য হলো আল্লাহর একটি করুণা”। (ইবন হাজাম ৫/৬৪ আল ইহকাম গ্রন্থে এটিকে জাল প্রমাণ করেছেন)
মাজহাব বা আলিমদের অন্যান্য অনেক মতপার্থক্যকে হালকা করে দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য এমন কিছু জাল হাদিস তৈরী করা হয়েছে।

৯। “নারীর উপদেশ গ্রহণ করলে তা অনুতাপের কারণ হবে”। আরেকটি হাদিসে এসেছে, “নারীর কাছ থেকে আগে উপদেশ শুনো, তারপর তার বিপরীত করো” (ইবন আসাকির ২/২০০; আবু হাতিম ২/১৮৪ এটিকে জাল প্রমাণ করেছেন)
নারীদের ব্যাপারে রাসুল সাঃ এর এমন মনোভাব মানুষের কাছে প্রচার করার ঘৃণ্য কৌশল হিসাবে এমন কিছু জাল হাদিস বানানো হয়েছে।

১০। “আমার উম্মাতের আলিম হলো বনি ইসরাইলের নবীদের মতো”। (প্রায় সকল রিজাল শাস্ত্রবিদ মুহাদ্দিস এটিকে জাল প্রমাণ করেছেন)
অলি নামধারী বা পথভ্রষ্ট আলিমদের নিয়ে বাড়াবাড়ি বা ধর্মব্যবসার উদ্দেশ্যে তৈরী করা অগণিত জাল হাদিসের ভেতর এটি একটি।

১১। “যে ব্যক্তি ইতিকাফ করবে সে দুটি হজ্জ্ব ও দুটি উমরাহর সওয়াব লাভ করবে”। (বায়হাকী হাদিসটি লিপিবদ্ধ করেছেন এবং ইমাম জাহাবী একে জাল প্রমাণ করেছেন)
বানোয়াট ফজিলতের দিকে মানুষকে ডেকে গোমরাহ করার অপচেষ্টা।

১২। “যে ব্যক্তির একটি পুত্র হয় এবং সে বরকতের আশায় তার সন্তানের নাম মুহাম্মাদ রাখে, সে ও তার সন্তান উভয়েই জান্নাতে প্রবেশ করবে”। (ইমাম জাওজী একে জাল প্রমাণ করেছেন)
আমাদের দেশে অসংখ্য পুরুষের নামের আগে মুহাম্মাদ রাখা হয় এই বানোয়াট হাদিসের ভিত্তিতে। এমন কোন কথা রাসুলুল্লাহ সাঃ বলে যাননি। এর স্বপক্ষে উৎকৃষ্ট প্রমাণ হতে পারে এই যে, সাহাবা-তাবেয়ী-তাবে তাবেয়ী যাঁরা রাসুলের হাদিস পালনে আর সকলের চেয়ে অগ্রগামী ছিলেন তাঁদের পুত্রদের নাম মুহাম্মাদ ছিলো খুব কম সংখ্যকের। খলিফা থাকা অবস্থায় উমার রাঃ একবার মুহাম্মাদ নামের সকল লোককে ডাকিয়ে একত্র করেন এবং তাদের মুহাম্মাদ নাম বাতিল করে অন্য নাম রাখার আদেশ দেন। তিনি বলেন, “তোমাদের নাম হবে মুহাম্মাদ কিন্তু কাজ হবে মুহাম্মাদের বিপরীত তা আমি হতে দেব না”।

১৩। “দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ”। (সকল রিজাল শাস্ত্রবিদ মুহাদ্দিস এটিকে জাল প্রমাণ করেছেন)।
আপাতদৃষ্টিতে সুন্দর এই কথাটি রাসুলের নামে চালিয়ে দেয়া হয়। মূলতঃ ইসলামের ভেতর জাতীয়তাবাদের বিষবাষ্প প্রবেশ করানোই এর উদ্দেশ্য।

১৪। “জ্ঞানসহ অল্প আমল জ্ঞানহীন অনেক আমল থেকে উত্তম”। (দাইলামী লিপিবদ্ধ করেছেন ও ইমাম সুয়ুতী জাল প্রমাণ করেছেন)

১৫। “যে ব্যক্তি মক্কায় হজ্জ্ব করলো কিন্তু (মদীনায়) আমার রওজা জিয়ারত করলো না, সে নিশ্চিতভাবে আমাকে অসম্মান করলো”। (তাবরানী লিপিবদ্ধ করেছেন ও ইবন মাঈন জাল প্রমাণ করেছেন)
মজার ব্যাপার হলো এ কথাটি সত্য হলে অগণিত সাহাবা এই অপরাধে অপরাধী হবে, কেননা রাসুল সাঃ এর মৃত্যুর পর তাঁরা হজ্জ্বের অংশ হিসাবে কখনোই রাসুল সাঃ এর রওজা জিয়ারত করেননি। এটি মূলতঃ কবর পূজারীদের পক্ষে তৈরী করা অন্যতম একটি ইমোশনাল জাল হাদিস। অথচ রাসুলুল্লাহ সাঃ বলেছেন, “পূণ্য লাভের আশায় তিনটি স্থান ছাড়া অন্য কোন যায়গায় ওই নিয়তে যাওয়া যাবে না। তিনটি স্থান হলো-মসজিদুল হারাম, মসজিদে নববী (রাসুলের রওজা নয়, রাসুলের মসজিদ), মসজিদুল আকসা”। (মুসলিম)

১৬। “কিয়ামাতের দিন সকলকে মায়ের নাম ধরে ডাকা হবে”। (ইবন আদী লিপিবদ্ধ করেছেন ও ইবন জাওজী জাল প্রমাণ করেছেন)
বাংলাদেশে প্রচলিত একটি জাল হাদিস।

১৭। “সবকিছুর একটি হৃদয় আছে, আর কুরআনের হৃদয় হলো সুরা ইয়াসিন। যে এ সুরাটি একবার পড়বে, সে পুরো কুরআন দশবার পড়ার সওয়াব পাবে”। (দারিমি লিপিবদ্ধ করেছেন ও ইবন আবি হাতিম জাল প্রমাণ করেছেন)
কুরআনের অর্থ ও শিক্ষা থেকে মানুষকে দূরে সরাবার জন্য অনেক জাল হাদিস তৈরী হয়েছে। এর ভিতর আছে অর্থ না বুঝে কুরআন পড়ার প্রতি উৎসাহিতকরণ, না বুঝে পড়ে নেকীর পাল্লা ভারী করার দিকে মানুষকে ডাকা, দু-তিনটি সুরার ভিতর মানুষের আমলকে সীমাবদ্ধ করে ফেলা ইত্যাদি। শেষোক্ত ভাগে আছে অনেক জাল ফজিলতের হাদিস, যার ভিতর এটি একটি।

১৮। “অজুর উপর আবার অজু যেন আলোর উপর আরেকটি আলো”। (ইমাম গাজ্জালি লিপিবদ্ধ করেছেন ও মানযারি জাল প্রমাণ করেছেন)
অনর্থক কাজে আকৃষ্ট করে ব্যস্ত করার অপচেষ্টার অংশ হিসাবে এই হাদিস বানানো হয়েছে।

১৯। “আরবদের হেয় করা মানে হলো ইসলামকে হেয় করা”। (আবু নাইম লিপিবদ্ধ করেছেন ও ইবন আবু হাতিম জাল বলেছেন)
জাতীয়তাবাদের বিষ ইসলামে ঢুকিয়ে দেবার জন্য তৈরী করা অনেক হাদিসের ভেতর এটি একটি।

২০। “জুম্মার দিন ইমাম মিম্বরে দাঁড়াবার পর আর কোন (সুন্নত/নফল) সালাত ও কথাবার্তা নেই”। (তাবারানি বর্ণনা করেছেন ও ইমাম জাহাবী জাল প্রমাণ করেছেন)।
সহীহ হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাঃ স্বয়ং মিম্বরে দাঁড়িয়ে খুতবা দেয়ার সময় একজন সাহাবীকে ‘দখালালুল মাসাজিদ’ নামের দু’রাকাত সালাত আদায়ের আদেশ দিয়েছেন।

২১। “রাসুলুল্লাহ সাঃ একবার সাহাবাদের সাথে নিয়ে এক যুদ্ধ থেকে ফিরছিলেন। এক সময় তিনি তাদের দিকে ফিরে বললেন, আমরা ছোট জিহাদ থেকে বড় জিহাদ বা জিহাদ আন নফসে ফিরে এসেছি”। (বায়হাকী বর্ণনা করেছেন ও ইবন হাজার এটা জাল প্রমাণ করেছেন। তিনি বলেছেন এ কথা রাসুলের নয় বরং তা ইবরাহীম ইবন আবি আবলাহ নামক এক লোকের। বিখ্যাত স্কলার ইবন তাইমিয়াহ একে বিধ্বংসী জাল হাদিস হিসাবে বলেছেন)
জিহাদ থেকে মানুষকে দূরে সরাবার জন্য এ হাদিস তৈরী করা হয়েছে। নফসের সাথে জিহাদ বলতে যা এখানে বড় করে দেখানো হয়েছে, তা মূলতঃ সকল মুসলিমের জন্য সার্বক্ষণিক প্রযোজ্য। কুরআনে আগণিত আয়াতে জিহাদের কথা আল্লাহ্‌ বলেছেন, অথচ তা একবারের জন্যও ‘নফসের জিহাদের’ কথা নয়।

২২। “মুমিনের কলব হলো আল্লাহর আরশ”। (আজ জারকাশি ও ইমাম ইবন তাইমিয়াহ একে জাল বলেছেন)
ভিন্ন বর্ণনায় একই রকম একটি জাল হাদিস আছে, যা হলো- “সকল আসমান আর সকল জন্মি আমাকে ধারণ করতে অক্ষম, কিন্তু মুমিনের অন্তর আমাকে ধারণ করতে পারে”। ইমাম ইবন তাইমিয়া একে জাল বলেছেন।
পীর-কবর-মাজার পূজারীদের খুব পছন্দের জাল হাদিস এটি, যা মানুষকে শির্কের মতো ভয়াবহ অপরাধের দিকে ধাবিত করে।

২৩। “যে নিজেকে জানে, সে তার প্রতিপালককে জানে”। (ইমাম সুয়ুতি একে জাল বলেছেন)
বিভ্রান্তিকর কথা দিয়ে মানুষকে বোকা বানাবার চেষ্টা। নিজেকে জানা হলো এমন এক ধোকাবাজি, যা যাদুকরীভাবে মানুষের চিন্তাকে গ্রাস করে নিজেকে বড় ভাবতে বাধ্য করে, যা এমনকি শির্কের দিকে নিয়ে যেতে পারে। দেখুন আল্লাহর কথা ও ভাবুন কোনটা সত্য। আল্লাহ্‌ কুরআনে বলেছেন, “বস্তুতঃ মানুষ নিজের সম্পর্কে সম্মক অবগত, যদিও সে নানা টাল-বাহানার অবতারণা করে”।

২৪। “প্রয়োজনের জন্য কোন আইন নেই” (ওজরের কোন মাসলাহ নাই)। ইমাম জাহাবী একে জাল বলেছেন।
মানুষের মধ্যে ব্যাপক প্রচলিত একটি জাল হাদিস। প্রয়োজন বা ওজর মানুষ থেকে মানুষে বিভিন্ন হয়। কেউ সামান্য ব্যথা হলেও মুষড়ে পড়ে, কেউ অসহ্য ব্যথাও হাসিমুখে চেপে যেতে পারে। বিপদাপন্ন বা বিশেষ অবস্থায় অনেক কিছুতে আল্লাহ্‌ ছাড় দিয়েছেন বান্দাদের, তবে তা এই কথার মতো হাল্কা নয়।

২৫। “পাগড়ি পরে এক রাকাত সালাত পাগড়ি না পরে পনের রাকাত সালাতের সমান। পাগড়ি পরে একটি জুম্মা পাগড়ি না পরে দশটি জুম্মার নামাজের সমান”। (ইবন নাজ্জার এটি বর্ণনা করেছেন ও ইবন হাজার আসকালানি এটি জাল প্রমাণ করেছেন)।
এদেশে ব্যাপক প্রচলিত একটি জাল হাদিস। সামান্য কাজের অবিশ্বাস্য ফজিলত বলে মানুষকে ভুল আমলে জড়িয়ে ফেলে তৃপ্তি পাইয়ে আসল আমল থেকে দূরে রাখার অপপরিকল্পনার অংশ হতে পারে এটি।

আল্লাহ্‌ আমাদের জাল হাদিস অনুসরণ করে কষ্ট করে করা নিজের সৎকাজ ধ্বংস হওয়া থেকে হিফাজত করুন। যটুকু আমরা জানবো বা করবো তা যেন সঠিক হয় সে ভাগ্য আল্লাহ্‌ আমাদের দান করুন। আমিন।

কবি ভক্ত রাজনীতির কবি বঙ্গবন্ধু

রাষ্ট্রপ্রধানদের কাউকে দেখতে যাওয়া সচরাচর আনুষ্ঠানিকতা-পূর্ণ হয়। তিনি শয্যা পাশে দাড়িয়ে কুশলাদী জিজ্ঞেস করবেন, পীড়িতর আত্মীয় স্বজনদের সাথে দু-একটি কথা বলবেন, সাহায্য সহযোগিতার ঘোষণা দেবেন, ক্যামেরা ছবি তুলবে, এরপর চলে যাবেন।

কিন্তু এ ছবি ভিন্ন কথা বলে।
বঙ্গবন্ধু পারতেন রাষ্ট্রপ্রধানের আড়ম্বর পার করে, একজন কবিতার ভক্ত হিসেবে, কবির শয্যাপাশে সামনে নতজানু হয়ে বসতে। শুধু কর্তব্য বা দয়া নয়, অকৃত্রিম ভালবাসা দিয়ে সিক্ত করতে।

রাজনীতির কবি বঙ্গবন্ধুর- কবি এবং কবিতার প্রতি ভালবাসার অনেক গল্প আছে।
সেসময় কবি আল মাহমুদের অর্থকষ্ট চলছিল। বঙ্গবন্ধু তাকে একটি সরকারি দপ্তরে প্রকাশনা বিভাগের সহ-পরিচালক পদে নিয়োগ দেবার জন্য কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন। যোগদান করতে গেলে বড়কর্তা কবির কাছে সার্টিফিকেট চায়। ম্যাট্রিক পাশ কবি আল মাহমুদ সার্টিফিকেট না দিতে পারায় বড় কর্তা তাকে যোগদান করতে করতে দেননি। এরপর বঙ্গবন্ধু বিষয়টি জানতে পেরে বড়কর্তাকে ডেকে প্রশ্ন করেন – এই কবির আবার সার্টিফিকেট কি রে? পারবে বড় সার্টিফিকেট ধারী ওর মতো দু লাইন লিখতে? তারপর কবিকে তৎক্ষণাৎ যোগদান করাতে বলেন। সারা জীবন সেই চাকরি করে আল মাহমুদ অবসর নিয়েছেন।

মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে থাকা সত্ত্বেও অভাব-অনটনে রিক্ত কবি ফারুখ আহমদকে অর্থ সাহায্য করতেন। যুদ্ধোত্তর দেশে শিল্পী কমল দাশগুপ্তকে রেডিওতে, পল্লী কবি জসীম উদ্দিনকে ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেন। অসুস্থ কবি হুমায়ূন কবির, আবুল হাসান, মহাদেব সাহা এঁদেরকে সুচিকিৎসার জন্য বার্লিন-মস্কো-লন্ডন পাঠান।

১৯৫৭ সালে মাত্র ১৪ মাসের মন্ত্রিত্বের মধ্যেই পাশ করেন ‘বাংলা একাডেমী অ্যাক্ট ১৯৫৭’। চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা – বিল তারই উপস্থাপন করা। প্রত্যক্ষদর্শীরা আজও বলেন, তার নিজের আগ্রহে ১৯৭৪ সালে বাংলা একাডেমীতে, দেশি বিদেশি সাহিত্যিকদের নিয়ে, যে সাহিত্য সম্মেলন হয়েছিল, এর পরে তেমন আর দেখা যায়নি।

আর এজন্যই হয়ত তার অবর্তমানে তাকে নিয়ে লেখা হয় হাজার-লক্ষ কবিতা, গল্প। তার হত্যার প্রতিবাদে লেখক নির্বাসন নেন। প্রবাসে বসে কবি দাউদ হায়দার লেখেন :’তুমি আছো বলে অমোঘ পুরস্কার নিয়ে/ বেঁচে আছে কবি ও কবিতার দাউদ হায়দার।’ বঙ্গবন্ধুকে মুছে ফেলার জন্য রাষ্ট্রের সব ধরনের ষড়যন্ত্রের মাঝেও, কবিরা তাকে নিয়ে লিখে যান কবিতা-গান। সেই সামরিক শাসনের আমলে, আওয়ামীলীগ ভবিষ্যতে ক্ষমতায় আসার কোন সম্ভাবনা না দেখেও, তাকে নিয়ে গৌরবগাঁথা লেখা বন্ধ থাকেনি।

পাত্রী খোঁজার ১৮+ টিপস (রম্য লেখা)

১. বিয়ে করা আর মরার পারফেক্ট টাইম কেউ কোনদিনও পাবে না। আপনি যেদিন বিয়ে করতে রেডি, চাইলেই তৎক্ষণাৎ পাত্রী পাবেন না। গ্যারান্টি। বিদেশ থেকে পাত্রী খুঁজতে চাইলে, মোটামুটি দুই থেকে আড়াই বছর সময় লাগে।

২. কবুল বলার আগ পর্যন্ত কোন গ্যারান্টি নাই। বিমানে উঠার আগে জানবেন, সব ঠিকঠাক। বিমান থেকে নামার পরে শুনবেন, উনি প্রিয়জনের সাথে পালিয়ে গেছেন।

৩. কবুল বলার পরেও কোন গ্যারান্টি নাই। ওমুকের বিয়ের অতদিন পরে হেনো হয়েছে, তেনো হয়েছে। এসব শুনে মন খারাপ বা ভয় পাবার কিচ্ছু নাই। মাঝে মধ্যে রোড এক্সিডেন্ট হয়ে বলে কি – মাইনসে বাসে উঠবে না?

৪. পারফেক্ট পাত্রী বলতে কেউ নাই। আপনি নিজে যেমন পারফেক্ট না, দুনিয়ার অন্যরাও তেমন পারফেক্ট না।

৫. কারো ফিজিক্যাল এপিয়ারেন্স (উচ্চতা, গায়ের রং, বাপের টাকা, দেশের বাড়ি) নিয়ে চিন্তার পাশাপাশি তার ইমোশন, ইন্টারাকশন, কোঅপারেশন আপনার সাথে মিলায় দেখবেন। গায়ের চামড়ার চাইতে ভিতরের মানুষটাকে বুঝা এক হাজারগুন বেশি ইম্পরট্যান্ট।

৬. বায়ো ডাটার সাথে যে পিকচার দেয়, সেটা কত দিন আগের তোলা খেয়াল করতে হবে। হয়তো দেখা যাবে, তিন বছর আগের পিকচার দিছে। তখন ছেলের মাথায় চুল ছিলো এখন আবুল হায়াতের ছোট ভাই হয়ে গেছে। ঝকঝকে প্রোফাইল পিকচার না দেখে ৪-৫ জনের গ্রুপ পিকচার দেখেন, যেটা অন্য কেউ আপলোড করছে।

৭. কোন কাপলের প্রোফাইল পিকচার যত হট হবে, সুখী হবার চান্স তত কম হবে। সেজন্যই, সেলিব্রেটি ম্যারিজ তেমন টিকে না।

৮. ৩০ বছর বয়সের কাছাকাছি সময়ে বিয়ে করে ফেলা উচিত। নইলে বিয়ের আসল মজা পাবেন না। আর বাচ্চা-কাচ্চা মানুষ করার আগেই ওপারের ডাক চলে আসবে।

৯. আপনাকে বুঝতে হবে। আপনি কি লাইফ পার্টনার চাচ্ছেন, নাকি আপনার বস চাচ্ছেন, নাকি রান্না-বান্না বাচ্চা-কাচ্চা দেখাশুনা করবে এমন কাউকে চাচ্ছেন।

১০. পিকচার সহ বিয়ের বায়োডাটা একটা ইমেইল ড্রাফট করে রাখবেন যাতে সাথে সাথে ফরওয়ার্ড করা যায়। যাদেরকে বায়োডাটা দিছেন তাদেরকে মাঝে মধ্যে খোঁচা দিয়ে আপডেট নিবেন। সবাই একটা বায়ো ডাটা দেয়ার পরে চুপ হয়ে যাবে। তখন, সৌখিন ঘটক, আন্টি বা প্রফেশনাল ঘটক ধরতে যাবেন।

১১. ফেইসবুকে যাদের দেখবেন, তাদের ম্যাক্সিমামেরই আংটা লাগানো। তবে খুব বেশি ইচ্ছা হইলে, মিউচুয়াল ফ্রেন্ডদের কাছ থেকে ইনফরমেশন জোগাড় করে তারপরে নক দিবেন।

১২. না বলা অনেক কঠিন। তারপরেও আপনি অগ্রসর হতে না চাইলে। সরাসরি না করে দেন। পরে যোগাযোগ করবো বলে চুপ করে থাকা অনেক খারাপ। আরেকটা খারাপ হচ্ছে, আল্লাহ-খোদার দোহাই দেয়া। বায়োডাটা দেখে ভালো করে ভেবে নিন, কথা বলতে চান কিনা। এই স্টেজে না করা ইজি। তবে কথা বলার পরেও ভালো না লাগলে সেটা সরাসরি বলে দেন। কেনো ভালো লাগেনি, সেটা বলে দিলে ভালো হয়। .

১৩. ফোনে কথা বলার সময়, দেখবেন ইন্টারাকশন লাইভলি হচ্ছে কিনা। গল্প এক ঘন্টা চালিয়ে নেয়া যাচ্ছে কিনা। সেটা করতে না পারলে, সংসার ইন্টার‍্যাক্টিভ হবার চান্স কম। তবে প্রথম দুই-একবার কথা বলার সময় ভদ্রতা বা লজ্জাবশত একটু স্লো হতে পারে।

১৪. স্কাইপে মাস্ট কথা বলে নিবেন। তবে আমার মতে, অন্তত একবার সামনা সামনি না দেখে কথা চূড়ান্ত করা ঠিক না। অল্টারনেটিভ হিসেবে আপনার বাসার লোকজন আগে থেকে দেখে রাখতে পারে। তারপরেও, আপনার বিয়ে, আপনি সরাসরি দেখা উচিত।

১৫. আগে থেকে ফ্যামিলি লেভেলে দেখাশুনা কথা-বার্তা অলমোস্ট ফাইনাল করে না রাখলে, ২০-২৫ দিনের জন্য দেশে গিয়ে কিছুই করতে পারবেন না। আর মনে রাখবেন চাইলে বছরে দুইবার দেশে যেতে পারবেন না। সো, একবার মিস হইলে একবছর পিছায় যাবেন। এত কিছু ঝামেলা মনে হইলে, সময় থাকতে প্রেম করেন।

১৬. প্রবাসী অনেক ভালো ভালো পাত্রী আছে। সবাই বিদেশী বয়ফ্রেন্ড নিয়ে নাচানাচি করে না। তবে ABCD বিয়ে করতে চাইলে, একটু খেয়াল রাখবেন -ওরা অনেকেই বাংলায় ফ্লুয়েন্ট না, দেশে ঘনঘন যেতে চায় না, ক্রিকেট খেলা তেমন ফিল করে না, ঝগড়াঝাঁটি ইংলিশে করতে চায়। আসলে কে কই আছে সেটা ব্যাপার না। ব্যাপার হচ্ছে, কে কতটুকু ওপেন মাইন্ডেড কোওপারেটিভ আর কতটুকু এডজাস্ট করে নিতে চায়।

১৭. সেক্স ফ্যামিলি লাইফের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস না। এমনকি সংসারে গুরুত্বপূর্ণ টপ ফাইভ জিনিসের মধ্যে সেক্স পড়ে কিনা সন্দেহ। কারণ একজন মানুষের সাথে সারাদিন অনেক অনেক কিছু নিয়ে আলোচনা, পরিকল্পনা, ঘুরাফেরা, আড্ডা, খাওয়া দাওয়া করেই ম্যাক্সিমাম টাইম স্পেন্ড করবেন।

১৮. একেবারে ফাইনাল ডিসিশন নেয়ার আগে খুব ভালো ভাবে ভেবে দেখবেন। উনি কি সেই জন যার সাথে আপনি সারা জীবন কাটাতে চান। উনি কি সেই জন যার চোখের পানি আপনার সার্টের কলার দিয়ে মুছে দিতে পারবেন। উনি কি সেই জন যার কষ্ট মাখা দিনের দীর্ঘ নিশ্বাসে আপনার বুক ছিঁড়ে যাবে, তবুও আঁকড়ে ধরে রাখবেন। উনি কি সেইজন যার সাথে বৃষ্টিতে ভিজে এসে পাশে বসে এক কাপ কপি ভাগ করে খেতে চাইবেন।

১৯. বিয়ের সময় আজাইরা খরচ করে পরের দিন জামাই-বউ বাটি হাতে রাস্তায় নামার অবস্থা করা থেকে বিরত থাকুন।

 

লেখাটি Jhankar Mahbub এর নোট থেকে নেয়া হয়েছে

ছবি স্বত্ব : ইশরাত আমিন

 

ওদেরকে ভয় করো না, আমাকে ভয় করো — আল-বাক্বারাহ ১৪৯-১৫০

Bismillahir Rahmanir Rahimহিজরতের পর প্রথম দিকে মুসলিমরা আল-আক্বসাকে কিবলা হিসেবে অনুসরণ করত। রাসূলের ﷺ বড় ইচ্ছা ছিল যে, আল্লাহ ﷻ যেন কা’বাকে কিবলা করে দেন। তার ﷺ মনের বাসনা আল্লাহ ﷻ পূরণ করলেন, কা’বাকে কিবলা করে দিলেন, কু’রআনের আয়াত নাজিল হলো। কিন্তু রাসূল ﷺ যখন কিবলা পরিবর্তনের আয়াত মানুষকে তিলাওয়াত করে শোনালেন, তখন নানা ধরনের সমস্যা শুরু হলো। কিছু মানুষ মনে করা শুরু করলো, “একি! এতো দেখি রাসূল যা চায় সেটাই কয়েকদিন পর কুরআনের আয়াত হয়ে নাজিল হয়? আসলেই কু’রআনের আয়াতগুলো আল্লাহর ﷻ কাছ থেকে আসে তো? নাকি সব রাসূলের ﷺ বানানো কথা?”[১]

আবার অনেক মুসলিম, যারা আগে ইহুদি, খ্রিস্টান ছিলেন, তারা এত দিন ধরে আল-আক্বসাকে কিবলা মেনে এসেছিলেন। তাদের আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী ইহুদি, খ্রিস্টানরা সবাই তখনো আল-আক্বসাকে কিবলা অনুসরণ করছে। তখন সে যদি সবাইকে অপমান করে কা’বাকে কিবলা অনুসরণ করা শুরু করে, তাহলে ব্যাপারটা কেমন দেখাবে? “লোকে কী বলবে” এই ভয়ে অনেকে একাকী প্রার্থনা করার সময়, বা তাদের ইহুদি, খ্রিস্টান আত্মীয়দের সাথে চলাফেরা করার সময় কা’বার দিকে ঘুরে দাঁড়াতো না।[১]

আল্লাহ ﷻ কিবলা পরিবর্তনের নির্দেশ দিয়ে পর পর তিনটি আয়াত নাজিল করলেন। এরকম অভূতপূর্ব ঘটনা কু’রআনে বিরল, যেখানে একই নির্দেশ পর পর তিনবার পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে। এ থেকেই বোঝা যায়, কিবলা পরিবর্তনের ব্যাপারটি কতটা বিতর্কিত ছিল, এবং তখনকার মুসলিমদের অনেকেরই এটা মেনে নিতে যথেষ্ট কষ্ট হয়েছিল।[৬]

2_149

তুমি যেখান থেকেই শুরু করে থাকো না কেন, মাসজিদুল-হারামের দিকে ঘুরে দাঁড়াও। এটা তোমার প্রভুর কাছ থেকে আসা সত্য বাণী। তোমরা কী করছ, সে ব্যাপারে আল্লাহ বিন্দুমাত্র বেখেয়াল নন। [আল-বাক্বারাহ ১৪৯]

যারা সন্দেহ করেছিল যে, রাসূল ﷺ হয়তো বানিয়ে আয়াত বলছেন, তাদেরকে আল্লাহ ﷻ সাবধান করে দিলেন, “এটা তোমার প্রভুর কাছ থেকে আসা সত্য বাণী।” আর যারা ‘লোকে কী বলবে’ এই ভয়ে, প্রার্থনা করার সময় আল-আক্বসার দিকে মুখ করে থাকতো, তাদের জন্য আল্লাহর ﷻ সাবধান বাণী: “তোমরা কী করছ, সে ব্যাপারে আল্লাহ বিন্দুমাত্র বেখেয়াল নন।

এরপর আল্লাহ ﷻ আবারো বললেন—

2_150

তুমি যেখান থেকেই শুরু করো না কেন, মাসজিদুল-হারামের দিকে ঘুরে দাঁড়াও। আর তোমরা যেখানেই থাকো না কেন, সেটার দিকে ঘুরে দাঁড়াও, যেন অন্যেরা তোমাদেরকে নিয়ে কোনো তর্ক দাঁড় করাতে না পারে, শুধু তারা ছাড়া, যারা সীমালংঘন করে। —আর ওদেরকে ভয় করো না, আমাকে ভয় করো, যেন তোমাদের উপর আমি আমার অনুগ্রহ পরিপূর্ণ করতে পারি, আর যেন তোমরা সঠিক পথ অনুসরণ করতে পারো। [আল-বাক্বারাহ ১৫০]

ওদেরকে ভয় করো না, আমাকে ভয় করো

এই আয়াতে আল্লাহ ﷻ ভয়ের জন্য خشي (খাশিয়া) ব্যবহার করেছেন। কু’রআনে বিভিন্ন ধরনের ভয়ের জন্য বারোটি আলাদা আলাদা শব্দ রয়েছে: خاف, خشي, خشع, اتقى, حذر, راع, اوجس, وجف, وجل, رهب, رعب, اشفق —যার মধ্যে এই আয়াতে বিশেষভাবে খাশিয়া ব্যবহার করা হয়েছে, যা একটি বিশেষ ধরনের ভয়: যখন আমরা কারো থেকে বা কোনো কিছু থেকে অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু ঘটার ভয়ে থাকি, মনের শান্তি হারিয়ে ফেলি, তখন তাকে খাশিয়া বলা হয়।[১৪]

যেমন, ধরুন, আপনি এক আত্মীয়ের কাছ থেকে বিয়ের দাওয়াত পেলেন। আপনি জানেন আপনার এই আত্মীয়টি সুবিধার না। তারা বিয়েতে নাচ-গান করবেই। আশেপাশের দুই মাইল এলাকার মানুষের কান ফাটিয়ে, হাই ব্লাড প্রেশার, স্ট্রোক, হার্ট-অ্যাটাকের রোগীদের প্রচণ্ড কষ্ট দিয়ে রাত দু’টা পর্যন্ত জাগিয়ে রেখে, শত শত শিশু-বাচ্চাদেরকে ঘুমাতে না দিয়ে ধুম-ধাড়াক্কা করবে। বিয়েতে পুরুষ-মহিলা সব মাখামাখি করে থাকবে। এই ধরনের একটা বিয়েতে যাওয়া মানে প্রথমত, নিজে অনেকগুলো হারাম কাজ করা। দ্বিতীয়ত, অনেকগুলো মানুষের হারাম কাজের মধ্যে অংশগ্রহণ করা। তৃতীয়ত, পরোক্ষভাবে হারাম কাজকে প্রশ্রয় দেওয়া। কিন্তু তারপরেও আপনি সেই বিয়েতে গেলেন পাছে আত্মীয়রা আপনাকে নিয়ে কী বলাবলি করে। আপনি আত্মীয়দেরকে নিয়ে যে ভয়টা পেলেন, সেটা হচ্ছে খাশিয়া।

আজকের যুগে এই ভয়ঙ্কর শক্তিশালী খাশিয়া হচ্ছে: “লোকে কী বলবে?”

আমরা যখন কালেমা পড়ে ঘোষণা দেই, “লা ইলাহা ইল্লা আল্লাহ” —তখন আমরা শপথ করি: “আমার জীবনে আল্লাহর ﷻ থেকে বড় আর কেউ নেই। আজ থেকে আমার প্রতিটা সিদ্ধান্ত এবং কাজে আল্লাহ ﷻ থাকবেন সবার আগে, তারপরে অন্য কিছু। আমি অন্য কোনো কিছুকে আল্লাহর ﷻ থেকে বেশি গুরুত্ব দিবো না।” কিন্তু তারপর যা ঘটে তা হচ্ছে অনেকটা এরকম—

  • মেহমান এসেছে, তুমুল আড্ডা চলছে দেশের অবস্থা নিয়ে, ওদিকে মাগরিবের সময় পার হয়ে যাচ্ছে, “আহ্‌ হা, মাগরিবের সময় দেখি শেষ হয়ে গেল। কিন্তু এখন উঠে গেলে ওরা আবার কী মনে করে। তারচেয়ে রাতে একবারে ঈশার সাথে পড়ে নিবো। আল্লাহ ﷻ মাফ করুন।”
  • বিয়ের দাওয়াতে যাওয়ার আগে রঙবেরঙের সাজে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে, “মাথায় ঘোমটা দিলে কেমন খ্যাত-খ্যাত মনে হচ্ছে। থাক, ঘোমটা ছাড়াই যাই, আত্মীয়-স্বজনরা আবার কী সব বলাবলি করে। বান্ধবীরা দেখলে হাসা-হাসি করবে। ফুল-হাতা ব্লাউজটাও একদম মানাচ্ছে না। দেখি হাফ-হাতা পরি, স্মার্ট লাগবে। মাত্র এক রাতের ব্যাপার, কিছু হবে না, আল্লাহ ﷻ মাফ করবেন।”
  • বন্ধুর নতুন গাড়ির পাশে নিজের পুরনো গাড়িটার দিকে তাকিয়ে, “নাহ্‌, এই ভাঙ্গা গাড়িটা ফেলে দিয়ে ব্যাংক থেকে গাড়ির লোন নিয়ে এবার একটা নতুন গাড়ি কিনতেই হবে। এই গাড়ি নিয়ে বের হলে মানুষকে মুখ দেখাতে পারি না। প্রতিবেশীরা কেমন করে তাকায়, নিজেকে গরিব-গরিব মনে হয়। একটু সুদ দিলে কিছু হবে না। আল্লাহ ﷻ নিশ্চয়ই আমার কষ্টের কথা বুঝবেন।”
  • মাসের ভাড়া দিয়ে বাড়িওয়ালার বাসা থেকে মুখ কালো করে ফেরত আসার পথে, “আর না, অনেক অপমান সহ্য করেছি, বন্ধু বান্ধবকে মুখ দেখাতে পারি না। মানুষকে বলতে হয় – ‘আমি ভাড়াটিয়া।’ এইবার সুদের লোনটা নিয়ে একটা বাড়ি কিনবোই। পরে একসময় হজ্জ্ব করে আল্লাহর ﷻ কাছে মাফ চেয়ে নিবো।”
  • রাস্তায় সার্জেন্টকে পাঁচশ টাকার একটা নোট ধরিয়ে দিতে দিতে, “ছি, ছি, ঘুষ দেওয়াটা ঠিক হচ্ছে না। কিন্তু না দিলে তো আবার গাড়ি নিয়ে যাবে। কী লজ্জার ব্যাপার হবে যদি প্রতিবেশীরা জেনে ফেলে গাড়িটা দুই নম্বরি করে কেনা। থাক না, মাত্র পাঁচশ টাকা, আল্লাহ মাফ করবেন।”

এধরনের মানুষরা ‘লোকে কী বলবে’-কে এতই ভয় পায় যে, তারা কখনও চিন্তা করে দেখে না যে, তারা আসলে কী বলে, যখন তারা মুখে বলে—

লা ইলাহা ইল্লা আল্লাহ – আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনোই উপাসনার যোগ্য প্রভু নেই।

বরং তাদের চিন্তা-ভাবনা, কথা, কাজের মধ্যে দিয়ে প্রতিদিন তারা ঘোষণা দিচ্ছে—

লা ইলাহা ইল্লা ‘লোকে কী বলবে’

কালেমা পড়ে কাকে তারা সবচেয়ে বড় প্রভু হিসেবে মেনে নিয়েছে —সেটা এখনও তারা পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারেনি। এধরণের মানুষের কাছে আল্লাহ ﷻ সবচেয়ে বড় প্রভু নন, ‘লোকে কী বলবে’ আল্লাহর ﷻ থেকেও বড় প্রভু। যখনি তাদের জীবনে কোনো পরিস্থিতি আসে, যেখানে তাদেরকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়— “আমি এটা করলে তো আল্লাহ ﷻ রাগ করবেন, কিন্তু না করলে লোকে কী বলবে?” —তখন তারা আল্লাহর থেকে ‘লোকে কী বলবে’-কে বেশি ভয় পায় এবং আল্লাহকে ﷻ উপেক্ষা করে ‘লোকে কী বলবে’ ঠেকানোর জন্য যা করা দরকার সেটাই করে।

এরপরেও কিছু লোক আছে যারা অন্যদেরকে আল্লাহর সমান মনে করে। তাদেরকে তারা এমন ভাবে ভালবাসে, যেভাবে আল্লাহকে ভালবাসার কথা। কিন্তু যারা বিশ্বাসী, তাদের আল্লাহর প্রতি ভালবাসা অত্যন্ত মজবুত। হায়রে! যদি অন্যায়কারীরা দেখতে পেত যে, [যেটা তারা পাবে, যখন তারা  জাহান্নামের শাস্তির দিকে তাকিয়ে থাকবে] সকল ক্ষমতা আল্লাহর এবং আল্লাহ বড়ই কঠিন শাস্তি দেন। [আল-বাক্বারাহ ২:১৬৫]

মজার ব্যাপার হচ্ছে: এধরনের মানুষরা ঠিকই স্বীকার করে যে, আল্লাহ হচ্ছেন তাদের সৃষ্টিকর্তা। সে ব্যাপারে তাদের মনে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তারা আল্লাহকে ইলাহ (একমাত্র উপাসনার যোগ্য প্রভু) হিসেবে মেনে নিতে পারেনি, যাঁর সব নির্দেশ কোনো প্রশ্ন না করে, কোনো সন্দেহ না করে মেনে নিতে হবে।

ইবলিস কিন্তু জানতো আল্লাহ ﷻ একমাত্র সৃষ্টিকর্তা। সে আল্লাহর ﷻ সাথে কথা পর্যন্ত বলতে পারতো। আল্লাহর ﷻ ক্ষমতা, সন্মান, অবস্থান নিয়ে তার কোনোই সন্দেহ ছিল না। কিন্তু তারপরেও সে কাফির হয়ে গিয়েছিল। ইবলিসের কুফরি আল্লাহর ﷻ অস্তিত্বকে অস্বীকার করা ছিল না, তার কুফরি ছিল আল্লাহর ﷻ অবাধ্যতা। এই ব্যাপারটা খুব মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করুন: ইবলিসের কুফরি ছিল না যে, সে নাস্তিক ছিল বা সে আল্লাহকে ﷻ বিশ্বাস করতো না, বা আল্লাহর ﷻ বিরুদ্ধে ব্লগে, পত্রিকায় লেখালেখি করতো। তার কুফরি ছিল আল্লাহর ﷻ অবাধ্যতা।

একজন ব্যক্তি আল্লাহর ﷻ অবাধ্যতা তখনি করে, যখন সে জেনেশুনে আল্লাহর নির্দেশকে মানতে অস্বীকার করে। আর এই অস্বীকারকার করাটা হচ্ছে কু’রআনের ভাষায় কুফরী। আমরা যখন জেনে শুনে– “কু’রআনে কঠিন নির্দেশ আছে, আল্লাহ আমাকে সবসময় দেখছেন” –এটা জানার এবং বোঝার পরেও আল্লাহর নির্দেশ দিনের পর দিন অমান্য করতে থাকি, তাঁর অবাধ্য হতে থাকি, তখন আমরা কু’রআনের ভাষায় কুফরী করি।

একজন মানুষ যেই মামার কথা শুনে সুদের লোন নেয় বাড়ি কেনার জন্য, যেই চাচার কথায় ঘুষ দেয় কাজ হাসিল করার জন্য, যেই শাশুড়ির ভয়ে বিয়েতে যায় অর্ধ নগ্ন হয়ে, যেই বন্ধুকে দেখানোর জন্য সুদের লোন নিয়ে গাড়ি কেনে, যেই মডেলের ফ্যাশন সেন্সে মুগ্ধ হয়ে চাপা, খোলা জামাকাপড় পরে; কিয়ামতের দিন সেই মামা, চাচা, শাশুড়ি, মডেল, বন্ধুরাই তাকে বলবে, “তুমি কে? আমি তো তোমাকে কিছু করতে বলিনি? তুমি দুনিয়াতে কী করেছো না করেছো, তাতে আমার কোনোই হাত নেই। সব দোষ তোমার। যাও এখান থেকে!”—

যখন ওরা, যাদেরকে মানুষ অনুসরণ করতো, তাদের অনুসারীদেরকে ত্যাগ ও অস্বীকার করবে; যখন তারা সবাই মিলে একসাথে জাহান্নামের কঠিন শাস্তির দিকে তাকিয়ে থাকবে; যখন তাদের মধ্যে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে; তখন যারা ওদেরকে অনুসরণ করতো তারা বলবে, “হায়! যদি আমরা আর একটা বার সুযোগ পেতাম, তাহলে আজকে ওরা যেভাবে আমাদেরকে ত্যাগ ও অস্বীকার করছে, ঠিক সেভাবে আমরাও ওদেরকে দুনিয়াতে ত্যাগ ও অস্বীকার করতাম।” এভাবে আল্লাহ তাদেরকে দেখাবেন: তারা (দুনিয়ায়) কী করতো, যাতে করে তারা আফসোস করতে থাকে। তারা জাহান্নামের আগুন থেকে কখনই বের হতে পারবে না। [বাকারাহ ২:১৬৬-১৬৭]

একারণেই আল্লাহ ﷻ আমাদেরকে সাবধান করে দিচ্ছেন—

ওদেরকে ভয় করো না, আমাকে ভয় করো

যেন তোমাদের উপর আমি আমার অনুগ্রহ পরিপূর্ণ করতে পারি, যেন তোমরা সঠিক পথ অনুসরণ করতে পারো

আয়াতের এই অংশটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম যুগের মুসলিমরা উপলব্ধি করেছিল আয়াতের এই অংশটির তাৎপর্য কী। কয়েক বছর আগেও তারা ছিল বিচ্ছিন্ন কিছু দল, যারা নিজেদের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি, মারামারি করে বেড়াতো। দুনিয়ার মোহে তারা ছিল অন্ধ। তাদের কোনো বড় লক্ষ্য ছিল না, কোনো জাতীয় মূল্যবোধ, দিকনির্দেশনা ছিল না। ইসলাম আসার আগে আরব গোত্রগুলো ছিল মাস্তান ধরনের এক-একটা দল। অন্যায়, অবিচার, অশ্লীলতা, নোংরামিতে তারা একেবারেই ডুবে ছিল।[৬]

কিন্তু ইসলাম এসে সবকিছুকে পাল্টে দিলো। ইসলাম এসে এই সব মাস্তান ধরনের দলগুলোকে ঐক্য, সহমর্মিতা, আদর্শ শেখালো। তাদেরকে অজ্ঞ-বর্বর জীবন থেকে বের করে এনে, তাদের জীবনে বড় বড় লক্ষ্য এনে দিলো। আল্লাহর ﷻ সর্বশেষ বাণীকে সারা পৃথিবীর মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মতো ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিশনের দায়িত্ব দিলো। রাসূলের ﷺ সময়ের মুসলিম প্রজন্ম ঠিকই উপলব্ধি করতে পেরেছিল যে, আল্লাহ ﷻ এই আয়াতে তাদেরকে কোন্‌ মহান অনুগ্রহের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন।[৬] কী জঘন্য অবস্থা থেকে তাদেরকে বের করে এনে, কী সুন্দর একটা জীবন দিয়েছেন, সেটা যেন তারা উপলব্ধি করে কৃতজ্ঞ হয়।

সূত্র:

  • [১] নওমান আলি খানের সূরা আল-বাকারাহ এর উপর লেকচার এবং বাইয়িনাহ এর কু’রআনের তাফসীর।
  • [২] ম্যাসেজ অফ দা কু’রআন — মুহাম্মাদ আসাদ।
  • [৩] তাফহিমুল কু’রআন — মাওলানা মাওদুদি।
  • [৪] মা’রিফুল কু’রআন — মুফতি শাফি উসমানী।
  • [৫] মুহাম্মাদ মোহার আলি — A Word for Word Meaning of The Quran
  • [৬] সৈয়দ কুতব — In the Shade of the Quran
  • [৭] তাদাব্বুরে কু’রআন – আমিন আহসান ইসলাহি।
  • [৮] তাফসিরে তাওযীহুল কু’রআন — মুফতি তাক্বি উসমানী।
  • [৯] বায়ান আল কু’রআন — ড: ইসরার আহমেদ।
  • [১০] তাফসীর উল কু’রআন — মাওলানা আব্দুল মাজিদ দারিয়াবাদি
  • [১১] কু’রআন তাফসীর — আব্দুর রাহিম আস-সারানবি
  • [১২] আত-তাবারি-এর তাফসীরের অনুবাদ।
  • [১৩] তাফসির ইবন আব্বাস।
  • [১৪] তাফসির আল কুরতুবি।
  • [১৫] তাফসির আল জালালাইন।

ব্ল্যাকমেইলের শিকার হলে কি করবেন‬: মাসরুফ হোসেন

আজ সংক্ষেপে বর্তমান সময়ের ভয়াবহ একটি ব্যাধির কথা বলব। হাতে সময় থাকলে এটি জেনে রাখুন, হয়ত ভয়াবহ বিপর্যয় ঠেকাতে পারবেন।

ব্ল্যাকমেইল( Blackmail) কি তা আমরা সবাই জানি। সাদা বাংলায় বলতে গেলে, আপনার ব্যক্তিগত এমন কোন তথ্য বা চিত্র যদি কারো কাছে থাকে যেটি প্রকাশ পেলে আপনার সামাজিক মান মর্যাদার হানি হবে- এবং সেটি প্রকাশের ভয় দেখিয়ে কেউ যদি আপনাকে ইচ্ছার বিরূদ্ধে কোন কাজ করাতে চায়-তাকেই বলে ব্ল্যাকমেইল।

আইনী বিষয়গুলো বলার আগে পুলিশি অভিজ্ঞতা থেকে কয়েকটা বিষয় শুরুতেই জানিয়ে দিই।

১) আমাদের সমাজে এমন কাউকে পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ যার বাইরের রূপের ভেতরেও আরেকটা রূপ নেই। এই রূপ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই খুব একটা গৌরবের নয়। আমরা মানুষ, আমাদের প্রত্যেকেরই ব্যক্তিগত জীবন আছে- এই ব্যক্তিগত জীবনে কখনো কখনো আমরা এমন অনেক কিছু করে ফেলি যেগুলো প্রচলিত সামাজিক রীতিবিরূদ্ধ এবং কোন কোন ক্ষেত্রে অন্যায়ের সামিল।

২) বয়েস বা মতিভ্রমের কারণে নিজেদের করা এই কাজগুলো নিয়ে আমরা অনুতপ্ত হই এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই ভুলগুলো এড়িয়ে জীবনের যাত্রায় নতুন করে সামিল হই।

৩) সমস্যাটা তখনই হয়, যখন অতীতের করা এই ভুলগুলোর সুযোগ নিয়ে কোন নরাধম আমাদের বর্তমান এবং ভবিষ্যৎকে তছনছ করে দিতে চায়। এটা কখনো কখনো ঘটে অর্থের লোভে, অথবা ঘটে নিতান্তই হিংসা চরিতার্থ করতে।

৪) আমাদের সমাজও হিপোক্রেসিতে পরিপূর্ণঃ অতীতের ভুলের সুযোগ নিয়ে ওই হতভাগ্যকে মাটির তলে পিষে ফেলতে আমরা সবাই মুখিয়ে থাকি।একটা বারের জন্যেও ভাবি না, এরকম ভুল আমি নিজে না করলেও আমারই পরিবারের কেউ করে ফেলতে পারে।

৫) এধরণের ব্ল্যাকমেইলের শিকার হয়ে আত্মহত্যা আমাদের দেশে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। অতীতের তথাকথিত ভুলের প্রায়ঃশ্চিত্ত কি নির্মম ভাবেই না করে ওই হতভাগ্য!

এবার কাজের কথায় আসি। আপনি যদি এ ধরণের ব্ল্যাকমেইলের শিকার হন, নিম্শুনলিখিত পদক্ষেপগুলো অনুসরণ করুনঃ

ক) শুরুতেই যে কথাটি মনে রাখবেন সেটি হচ্ছে- আপনি অপরাধী নন, ভিকটিম। ইটস নট ইয়োর ফল্ট। মাথা উঁচু রাখুন। আপনার অতীতকে আপনি পেছনে ফেলে এসেছেন, সেটাকে খুঁচিয়ে বের করে কোন কাপুরুষ বর্বর যদি ফায়দা লুটতে চায় সেটা আপনার দোষ না।

খ) দেশের প্রচলিত আইন সম্পূর্ণরূপে আপনার পক্ষে। ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৩৮৩ ধারা অনুযায়ী সাদা বাংলায় বললে, যে কোন ধরণের ব্ল্যাকমেইলকে এক্সটরশন বা চাঁদাবাজির আওতায় ফেলা যাবে, ৩৮৪ ধারা অনুযায়ী এর শাস্তি সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড, সেটি জরিমানা সহ বা ব্যতীরেকে।

আর ইন্টারনেট/ফেসবুকের মাধ্যমে কেউ যদি আপনার ক্ষতি করতে চায় সেক্ষেত্রে নীচের আইনটি দেখুনঃ

ICT (Amendment) Act-2013

According to the Section 57 of the ordinance, if any person deliberately publishes any material in electronic form that causes to deteriorate law and order, prejudice the image of the State or person or causes to hurt religious belief the offender will be punished for maximum 14 years and minimum 7 years imprisonment. It also suggested that the crime is non-bailable.

জ্বি, ঠিক দেখেছেন। ফেসবুকে কেউ আপনার আপত্তিকর ছবি প্রকাশ করলে সাহস করে মামলা করে দিন, প্রমাণ হলে বাছাধন ন্যুনতম ৭ বছর “রাষ্ট্রীয় অতিথিশালায়” ফ্রিতে থাকা খাওয়ার “সুবিধা” পাবে। এটা জামিনের অযোগ্য অপরাধ।

গ) যখন বুঝতে পারবেন আপনি ব্ল্যাকমেইলের শিকার হচ্ছেন, ভয় না পেয়ে কাছের মানুষজনের সহায়তা নিন। প্রয়োজনে পরিবারকে জানান। আমাদের দেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরিবারকে জানাতে দ্বিধা করেন। জেনে রাখুন, আপনার চরম দুঃসময়ে আপনার পরিবারই আপনার সবচাইতে বড় ভরসা। তাঁরা হয়তো আপনার অতীতের ভুলের কারণে কষ্ট পাবেন, কিন্তু প্রাথমিক ধাক্কাটা কেটে গেলে আপনার সাহায্যে তাঁরা এগিয়ে আসবেন এটা মোটামুটি ১০০ ভাগ নিশ্চিত।

ঘ) শুরুতে যা বলেছি সেটা আবারো বলি, মনের জোর হারাবেন না বা নিজেকে দোষ দেবেন না। ব্ল্যাকমেইলিং একটি জঘন্য অপরাধ, তথাকথিত সমাজ আপনাকে যতই ছোট করতে চাক না কেন আইন অনুযায়ী আপনি সহায়তা পাবেন। সমাজের মুখোশধারী মুরুব্বিদের চোখ-কপালে তোলাকে অগ্রাহ্য করে অন্যায়ের প্রতিবাদ করুন, আইনের সহায়তা নিন।

মনে রাখবেন, Every saint has a past and every sinner has a future.

সবাইকে ধন্যবাদ।

মাসরুফ হোসেন
সহকারী পুলিশ সুপার
(বর্তমানে জাপানে অধ্যয়নরত)

শুভ বাংলা নববর্ষ ১৪২২

বাংলাভাষী মানুষের সর্ববৃহৎ গণমুখী উৎসব। এসো হে বৈশাখ এসো এসো ধ্বনি উচ্চারণের মধ্যে দিয়ে বাংলার মানুষ বরণ করে নেয় নববর্ষকে। কালের যাত্রা নিরন্তর, নিরবধি। মহাকালের রথ সেই পথযাত্রায় পেরিয়ে গেল ১৪২১ বাংলা বর্ষের সীমারেখা। আজ মঙ্গলবার। পয়লা বৈশাখ, বঙ্গাব্দ ১৪২২। নতুন বছরের পরিক্রমা শুরু হলো বাঙালির নিজস্ব বর্ষপঞ্জিতে। বাংলা ভাষাভাষীর জীবনে এল এক অমলিন আনন্দের দিন। আজ বৈশাখী উৎসব। জীর্ণ পুরাতন সবকিছু পিছে ফেলে নতুনের কেতন উড়িয়ে এল বৈশাখ। শুরু হলো আরও একটি নতুন বছর।

নববর্ষ মানেই নতুন আশা, নতুন স্বপ্ন, নতুন সংকল্প। আমরা সবাইকে বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাচ্ছি।

পৃথিবীতে প্রচলিত অধিকাংশ বর্ষপঞ্জির উৎপত্তি কোনো না কোনো ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত। সেদিক থেকে বাংলা নববর্ষ এক অনন্য বৈশিষ্ট্যময় উৎসব; কৃষিকাজ ও খাজনা সংগ্রহের নিমিত্তে এর প্রচলন এবং দিনে দিনে তা হয়ে ওঠে সর্বজনীন সাংস্কৃতিক উৎসবে। ধর্ম-সম্প্রদায় নির্বিশেষে বাংলা ভূখণ্ডের সব মানুষের প্রাণের উৎসব পয়লা বৈশাখ। এমন অসাম্প্রদায়িক উৎসব সারা পৃথিবীতেই বিরল। বাঙালির আদি পরিচয় বহনকারী এই অসাম্প্রদায়িক উৎসব আমাদের জাতীয় ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগের প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র পাকিস্তানের শাসকশ্রেণী যখন তাদের অন্যায়-অন্যায্য শাসনকে ন্যায্যতা দিতে ধর্মকে ব্যবহার করতে চেয়েছে, তখন শোষণমুক্তির সংগ্রামে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের ঐক্যবদ্ধ করেছে তার সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়।

ষাটের দশকে ঢাকায় বৈশাখের উৎসব বাঙালির আত্মপরিচয়ের আন্দোলন-সংগ্রামকে বেগবান করেছিল। সেই একই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য প্রেরণা জুগিয়েছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের। পথ-ঘাট, মাঠ-মঞ্চ-সবকিছু ভরে ওঠে নতুন প্রাণের উচ্ছ্বাসে।

বাংলা নববর্ষকে ঘিরে দেশীয় পোশাক-পরিচ্ছদ ও খাদ্যরুচির মর্যাদা বেড়েছে; আমাদের জীবনধারায় নতুন বেগ ও আবেগ সঞ্চার করেছে বাঙালিয়ানা। এই উৎসবে ঘটে মানুষে মানুষে মিলন ও সৌহার্দ্যরে নবায়ন। দিনভর শুভেচ্ছা বিনিময় চলে; চিরায়ত বাঙালি নকশায় রঞ্জিত মাটির হাঁড়ি, বাঁশের পাত্র ভরে বিনিময় করা হয় নানা ধরনের মিষ্টান্ন, পিঠাপুলিসহ হরেক রকমের ঐতিহ্যবাহী খাবার। মানুষে মানুষে এমন মিলন, এমন সৌহার্দ্যময় পরিবেশ কেবল পয়লা বৈশাখের মতো অসাম্প্রদায়িক উৎসবেই দেখা যায়। আমরাও চাই এই সৌহার্দ্যময় পরিবেশ চির প্রবহমান থাকুক বাংলার ঘরে ঘরে।

সবাইকে নববর্ষের শুভেচ্ছা।

গৌরনদী ডটকম পরিবারের পক্ষ থেকে ফাহিম মুরশেদ

মানবিক আবেদনঃ আমাদের মতি ভাইয়ের সাহায্যে এগিয়ে আসুন

এইচ এম সুমন, গৌরনদী ডটকম : গৌরনদীতে গত ৩০ বছর ধরে যারা আসা যাওয়া করেছেন তাদের হয়ত চিনতে কষ্ট হবে না। হ্যা আমি সেই পূরনো দিনের কথা বলছি। গৌরনদী বাসস্ট্যান্ডে তিনটি কসমেটিক্সের দোকানের একটির মালিক হলেন আপনাদের চির পরিচিত মুখ মতি ভাইয়ের কথা বলছি। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে প্রথমে মানসিক ও পরে আর্থিক দুরাবস্থার মাঝে পরে অসুস্থ হয়ে নিজের দুটো পা হারাতে বসছেন। সেই সাথে তার জীবন এখন হুমকির মুখে। জীবন এখন দুর্বিসহ। শারিরিক যন্ত্রনা সইতে না পেরে মাঝে মাঝে আত্মহত্যাও করতে চেয়েছেন। কেউ তার কুশল জিজ্ঞাসা করলেই হাউ মাউ করে কেঁদে ওঠেন। জীবনের এই মুহুর্তে তার পাশে দাড়ানোর মত কেহ নেই। তার পরিবার আজ থেকেও যেন নেই। সেটা আর একটা গল্প পরে না হয় কোন একদিন আপনাদের বলব।

মতি ভাইয়ের সাথে কথা বলে জানা গেছে, পায়ে ঠিক মতো রক্ত সাপ্লাই না হওয়ায় গ্যাংগ্রিন বা পায়ে পঁচন ধরেছে। এর সাথে হার্টে সমস্যা সহ ডায়বেটিকস ধরা পরেছে। সঠিকভাবে পরিচর্চা ও সেবা না পেয়ে শরীরে এত যন্ত্রনা নিয়ে কার বেঁচে থাকতে ইচ্ছে হয় বলুন? আজ প্রায় ৬ মাসের বেশি সময় ধরে সে অসুস্থ। তার পরিবারের ভাই-বোন মিলে যতটা পেরেছে চিকিৎসা করিয়েছে যা তাদের কাছে অনেক মনে হলেও মতি ভাইয়ের জন্য বাস্তবিকভাবে কিছুই করা হয়নি। দায়সারা ভাবে তার চিকিৎসা করানো হচ্ছে বলে মতি ভাই অভিযোগ করেন। একসময় এই পরিবারের হাল ধরেছিলেন আর তার এই দুঃসময়ে মতি ভাই না পারছেন চিকিৎসা করাতে না পারছেন ঔষধ কিনে সুস্থ হতে। ডাক্তার বলেছেন, ঠিকভাবে চিকিৎসা সহ যত্ন নিলে তিনি ভাল হয়ে উঠবেন।

এই আপনারা চাইলে অনেক মতি ভাই সুস্থ হতে পারে। আসুন মতি ভাইর হাস্বোজ্জল মুখটি দেখি। আসুন যার যতটুক সামর্থ্য আছে এগিয়ে আসি। আমরা চাই তিনি আমাদের মাঝে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসুক। এই কামনা করে আমাদের সেই প্রিয় মতি ভাইর জন্য আপনাদের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে তাকে এই সুন্দর পৃথিবীতে বাঁচতে সাহায্য করি। আসুন তাকে সহযোগিতা করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করছি।

যোগাযোগ :

এইচ এম সুমন,
গৌরনদী ডটকম
মোবাইল : ০১৭২১ ২৪ ৪০ ২৪
বিকাশ : ০১৭২১ ২৪ ৪০ ২৪ (পারসোনাল)

এছাড়া যারা অন্যভাবে সহযোগিতা করতে চান তারা আমার সাথে যোগাযোগ করার জন্য আকুল আবেদন করছি।

গৌরনদী বাসষ্ট্যান্ড থেকে বন্দরের রাস্তাটির প্রতি দৃষ্টি দিবেন কি?

মাননীয় এমপি মহোদয় এবং মাননীয় মেয়র মহোদয়,
আমরা সবাই জানি, টরকীর পরে গৌরনদী বন্দর হলো বানিজ্যিক প্রাণ কেন্দ্র। সেই বানিজ্যিক প্রাণ কেন্দ্রে যেতে হলে রাস্তাটির করুণ অবস্থা গত দুই বছর ধরে দেখে আসছে গৌরনদী পৌরসভার জনগন। গৌরনদী বাসষ্ট্যান্ড থেকে গৌরনদী বন্দর পর্যন্ত যেতে হলে কি পরিমাণ ঝুকি ও যাত্রী এবং চালকদের কষ্ট হয় আপনারা কি কখনো উপলব্দি করেছেন? আপনাদের কেউ কি কখনো অভিযোগ করেছে?

আমরা গৌরনদী পৌরবাসী আপনাদেরকে অনুরোধ করবো, প্লিজ আসুন, আপনাদের বিলাসবহুল গাড়ি রেখে রিকশায় বা কোন ব্যাটারি চালিত যানবাহনে চড়ে একবার রাস্তাটি ভ্রমন করুন। এরপর যদি আপনাদের মনে হয়, জনগন মিথ্যে বলছে, রাস্তাটি সম্পূর্ণরুপে ঠিক আছে এবং উহা চলাচলের জন্য যোগ্য তাহলে আমরা পৌরবাসী তথা ঐ রাস্তা দিয়ে যারাই চলাচল করবে তারা এই রাস্তা নিয়ে কখনোই অভিযোগ করবো না অভিশাপও দিবে না। দরকার হলে জনগনের থেকে চাঁদা তুলে ঐ রাস্তায় সাইনবোর্ড, ব্যানায় টাঙ্গিয়ে দিবো এই রাস্তাটি সম্পুর্ণ ভাল এবং এর জন্য আমরা জনগন দায়ী।

আমরা লোকমুখে শুনে আসছি, কেউ বলে রাস্তাটি পৌরসভার অধীনে, কেউ বলে রাস্তাটি এলজিআরডির অধীনে। তাই পৌরসভার ভিতরে রাস্তা হলেও পৌর মেয়র যেমন কোন ভ্রুক্ষেপ করছেন না তেমনি এলজিআরডি বা এই রাস্তাটি যাদের অধিনে তারাও উন্নয়নের জন্য কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে না।

কিন্তু প্রকৃত সত্যটা জেনে রাখুন, যারাই ঐ রাস্তা দিয়ে চলাচল করে, তারা যতবার যাতায়াত করে ঠিক ততবার আপনাদেরকে অভিশাপ দেয়। এবং অভিশাপের ভাষাগুলো শুনলে আপনাদের খুব মনখারাপ হবে। জনগন কখনোই বোঝে না কোনটা এলজিআরডি আর কোনটা পৌরসভার।

জনগন উন্নয়ন দেখতে চায়। আপনাদের কাছে জনগন উন্নয়ন দেখার জন্য উম্মুখ হয়ে আছে।

গৌরনদীবাসী আপনাদের দীর্ঘায়ু কামনা করছে।


লিখেছেন : ফাহিম মুরশেদ, গৌরনদী ডটকম

সেদিন কেউ কারও সাহায্য পাবে না — আল-বাক্বারাহ ১২৩

এই আয়াতে আল্লাহ ﷻ আমাদেরকে ‘ক্রিমিনাল সাইকোলজি’ শিখিয়েছেন। একজন অপরাধী চারভাবে তার অপরাধের শাস্তি থেকে বাঁচার চেষ্টা করে, যেগুলো কিয়ামাতের দিন কোনোই কাজে আসবে না—

2_123

সাবধান সেই দিনের ব্যাপারে: ১) যেদিন কেউ অন্য কারও জন্য একটুও এগিয়ে আসবে না, ২) কোনো বিনিময় নেওয়া হবে না, ৩) কারও সুপারিশ গ্রহণ করা হবে না — ৪) সেদিন কেউ কারও সাহায্য পাবে না। [আল-বাক্বারাহ ১২৩]

প্রথমে সে চেষ্টা করে তার দোষকে অন্য কারও ঘাড়ে চাপানোর। সে প্রমাণ করে দেখানোর চেষ্টা করে যে, আসলে অপরাধটা সে করেনি, অন্য কেউ করেছে। যেমন, “আমি তো ইচ্ছা করে ঘুষ খাইনি! ওরা আমাকে সেধে একটা ফ্লাট দিয়েছিল দেখেই তো আমি ওদেরকে প্রজেক্টের কন্ট্রাক্টটা দিয়েছিলাম। ওরা আমাকে ফ্লাট দিলো কেন? এটা ওদের দোষ!”

যদি এতে কাজ না হয়, তখন সে যুক্তি দেখানোর চেষ্টা করে যে, আসলে সে অপরাধ করতে বাধ্য হয়েছিল অন্য কারও জন্য: “আমি তো ইচ্ছা করে হাতাকাটা ব্লাউজ, আর ফিনফিনে পাতলা শাড়ি পরে বিয়েতে যাইনি। আমি যদি হিজাব করে বিয়েতে যেতাম, তাহলে আমার স্বামীকে সবাই ‘মোল্লা-তালেবান-ব্যাকডেটেড’ বলত। ওর জন্যই তো আমি স্মার্টভাবে সেজে বিয়েতে যেতে বাধ্য হয়েছি। এতে আমার তো কোনো দোষ নেই? দোষ হচ্ছে সমাজের!”

এধরনের চেষ্টা করে কোনো লাভ নেই, কারণ: “সেদিন কেউ অন্য কারও জন্য একটুও এগিয়ে আসবে না।”

এগুলো যখন কোনো কাজে আসে না, তখন অপরাধীরা চেষ্টা করে টাকা খাওয়ানোর, সম্পত্তির লোভ দেখানোর: “জজ সাহেব, আমার কেসটা ছেড়ে দ্যান, আমি আপনাকে খুশি করে দিবো। উত্তরায় আমার অনেক প্লট আছে। আপনার রঙিন পানির সাপ্লাই নিয়ে আর কোনো চিন্তা করতে হবে না।” কিয়ামাতের দিন কেউ যদি গিয়ে বলে, “আমি তো তিন-তিনবার হাজ্জ করেছি! এই দেখেন আমার পাসপোর্ট: তিনবার ভিসা দেওয়া আছে। সুদের লোন নিয়ে কেনা আমার একমাত্র বাড়িটা তিনটা হজ্জ দিয়ে মাফ করা যায় না?”

আল্লাহ ﷻ বলে দিয়েছেন যে, তাঁর সাথে এসব কিছুই চলবে না: “কোনো বিনিময় নেওয়া হবে না।” আমাদের হারাম সম্পত্তি হালাল করে যেতে হবে, যাদের হক মেরে দেওয়া হয়েছে, তাদের হক আদায় করে যেতে হবে। সেটা না পারলে হারাম সম্পত্তি দান করে দিতে হবে। কিন্তু হারাম টাকায় করা সম্পত্তি সারাজীবন ভোগ করে, মানুষের হক মেরে গিয়ে, তারপর সেটা সালাত, সিয়াম, হাজ্জ দিয়ে বিনিময় করা যাবে না। কিয়ামাত এধরনের ব্যবসা করার জায়গা নয়।

অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপানোর চেষ্টা করে যখন লাভ হয় না, তখন অপরাধীরা চেষ্টা করে ওপরের লেভেলের কোনো মামা-চাচা-খালু ধরার, কোনো বিখ্যাত ব্যক্তি দিয়ে সুপারিশ করার, বা কোনো ক্ষমতাশালী কারও সাথে যদি তার ওঠা-বসা থাকে তাহলে সেটার ভয় দেখানোর। যেমন, “আমার মামা ছিলেন হজ্জ সেন্টারের চেয়ারম্যান। তিনি বিশ বার হজ্জ কাফেলা নিয়ে গেছেন। তাকে একটু ডাকুন, তিনি আমার হয়ে সুপারিশ করবেন।”

সেটা করে লাভ না হলে, শেষ ভরসা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করে যে, তার সাথে কোনো সন্মানিত বা বিখ্যাত মানুষের সম্পর্ক আছে, এবং সে জন্য তাকে একটু বিশেষ ‘খাতির’ করতে হবে: “আমার বাবা সিলেটের অমুক পিরের ভগ্নিপতির মামার শ্যালক ছিলেন। আমি নিজে সৈয়দ বংশের সন্তান! আমরা সবাই আধ্যাত্মিক পরিবারে জন্মেছি। আমাকে তো খন্দকার বংশের মতো দেখলে হবে না!”

আল্লাহ ﷻ সোজা বলে দিয়েছেন, “সেদিন কারও সুপারিশ গ্রহণ করা হবে না।”  شفاعة (শাফাআত) অর্থাৎ সুপারিশ-এর দুটি পদ্ধতিই এখানে বাতিল করে দেওয়া হয়েছে—১) কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি নিজে থেকে অন্য কোনো অপরাধীর জন্য সুপারিশ করতে পারবে না, ২) কোনো অপরাধীকে অনুমতি দেওয়া হবে না, অন্য কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির সাথে তার বিশেষ সম্পর্ক উপস্থাপন করার।

সকল চেষ্টা যখন বিফল হয়, তখন অপরাধীরা শেষ ভরসা হিসেবে গায়ের জোর দেখানোর চেষ্টা করে। তার দলের সাঙ্গপাঙ্গদের নিয়ে মারামারি, খুনাখুনি করে পার পাওয়ার চেষ্টা করে। তাদেরকে আল্লাহ ﷻ শেষ কথা জানিয়ে দিয়েছেন, “সেদিন কেউ কারও সাহায্য পাবে না।” আল্লাহর ﷻ সামনে তার দলের সাঙ্গপাঙ্গরা, ভাড়াটে খুনিরা কেউ কিছুই করতে পারবে না। উলটো ওরা সবাই ভয়ে, আতঙ্কে থর থর করে কাঁপতে থাকবে—নিজেদেরকে কীভাবে বাঁচানো যায়, সেই চিন্তায় উদ্ভ্রান্ত হয়ে যাবে।

“সেই দিনের ব্যাপারে সাবধান: যেদিন কেউ কারও জন্য এগিয়ে আসবে না”—আপনি যেই আত্মীয়ের সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখার জন্য তার বিয়ের অনুষ্ঠানে অর্ধ নগ্ন হয়ে গেলেন, যেই বন্ধুর সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখার জন্য তার বাচ্চার বার্থডে পার্টিতে গিয়ে ছেলে-মেয়ে মাখামাখি করে নাচ-গান করলেন, যেই প্রতিবেশীর সামনে স্ট্যাটাস ঠিক রাখার জন্য সুদের লোন নিয়ে নতুন মডেলের গাড়ি কিনলেন—সেই আত্মীয়-বন্ধু-প্রতিবেশীরা কেউ কিয়ামাতের দিন আপনাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসবে না।

সেদিন আমরা যখন নিজেদের দোষে জান্নাত হারিয়ে ফেলব, তারপর ভয়ংকর কিছু সত্তা এসে নিষ্ঠুরভাবে আমাদেরকে টেনে হিঁচড়ে জাহান্নামের আগুনের দিকে নিয়ে যেতে থাকবে, তখন আমরা যতই হাহাকার করি, “আমার ছেলেটা আমাকে শেষ করে দিয়েছে। ওকে ধরেন! ওর পড়ালেখার জন্য দিনরাত দৌড়াদৌড়ি করতে গিয়ে আমি নামাজ পড়তে পারিনি। ওকে নিয়ে যান, আমাকে ছেড়ে দেন!”
“আমার মেয়েটার জন্য আজকে আমি শেষ! ও কার না কার সাথে প্রেম করে, এই ভয়ে আমি কোচিং সেন্টারে গিয়ে বসে থাকতাম। আমার বদলে ওকে ধরেন, আমাকে মাফ করে দেন!”
“আমার স্বামীর জন্য আমি হিজাব করিনি। আমার স্বামীকে জাহান্নামে নেন, আমাকে বাঁচান! আমি তো বুঝতে পারিনি এরকম হবে!”
“আমার বউয়ের শপিং-এর খরচের জন্য দিনরাত চাকরি-ব্যবসা করতে গিয়ে আমি ইসলাম শিখতে পারিনি। আমার দোষ নেই! আমার বউকে জাহান্নামে নেন। প্লিজ, আমাকে ছেড়ে দেন!”

—কোনো লাভ হবে না। জাহান্নামের আগুনের শিখা ক্ষুধার্ত হিংস্র বাঘের মতো আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকবে।

يُبَصَّرُونَهُمْ ۚ يَوَدُّ الْمُجْرِمُ لَوْ يَفْتَدِي مِنْ عَذَابِ يَوْمِئِذٍ بِبَنِيهِ ﴿١١﴾ وَصَاحِبَتِهِ وَأَخِيهِ ﴿١٢﴾ وَفَصِيلَتِهِ الَّتِي تُؤْوِيهِ ﴿١٣﴾ وَمَن فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا ثُمَّ يُنجِيهِ ﴿١٤﴾ كَلَّا ۖ إِنَّهَا لَظَىٰ
সেদিন তাদের একে অন্যকে দেখতে বাধ্য করা হবে। অন্যায়কারীরা চাইবে যেন সে নিজেকে সেই দিনের শাস্তি থেকে বাঁচাতে পারে: তার নিজের সন্তান, সহধর্মিণী, ভাই, নিকটাত্মীয়দের বিনিময়ে হলেও, যারা কিনা তাকে আশ্রয় দিয়েছিল। এমনকি পৃথিবীর সবার বিনিময়ে হলেও সে নিজেকে বাঁচাতে চাইবে। কখনই নয়! সেটা এক হিংস্র আগুণের শিখা! [আল-মা’আরিজ ৭০:১১-১৫]


বাকারাহ-এর এই আয়াতটি হচ্ছে আমাদের জন্য একটি সাবধান বাণী: আমাদেরকে Sense of Priority ঠিক করতে হবে। সব সময় মাথায় রাখতে হবে: আমি সমাজ, সংস্কৃতি, আত্মীয়তা, বন্ধুত্ব, সন্তানদের জন্য নিজেকে ব্যস্ত রাখতে গিয়ে যেন আমার প্রভুকে ভুলে না যাই। আমার প্রভু সবার আগে। আমার সন্তান স্কুলে আধা ঘণ্টা বেশি সময় বসে থাকতে পারে, কিন্তু তাই বলে তাকে তাড়াতাড়ি আনতে গিয়ে আমি আমার প্রভুর সাথে যুহরের ওয়াক্তের মিটিংটা মিস করতে পারি না। আমার বন্ধু তার গায়ে-হলুদে না যাবার জন্য মন খারাপ করতে পারে, কিন্তু তাই বলে আমার প্রভু আমার দিকে তাকিয়ে থাকবেন, আর আমি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নির্লজ্জের মতো সাজব কিছু পরপুরুষকে সুড়সুড়ি দেওয়ার জন্য—এটা হতে পারে না। আমার প্রতিবেশী আমার ভাঙা গাড়ি দেখে আমাকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করতে পারে, কিন্তু আমার প্রভু আমাকে দেখছেন, আর আমি ব্যাংকে বসে হারাম লোনের কাগজে সই করছি—এটা হতে পারে না। ‘লোকে কী বলবে’—সেটা আমি ভয় পাই না, বরং ‘আমার প্রভু রাগ করবেন’—সেটা আমি সবচেয়ে বেশি ভয় পাই।

সূত্র:

  • [১] নওমান আলি খানের সূরা আল-বাকারাহ এর উপর লেকচার এবং বাইয়িনাহ এর কু’রআনের তাফসীর।
  • [২] ম্যাসেজ অফ দা কু’রআন — মুহাম্মাদ আসাদ।
  • [৩] তাফহিমুল কু’রআন — মাওলানা মাওদুদি।
  • [৪] মা’রিফুল কু’রআন — মুফতি শাফি উসমানী।
  • [৫] মুহাম্মাদ মোহার আলি — A Word for Word Meaning of The Quran
  • [৬] সৈয়দ কুতব — In the Shade of the Quran
  • [৭] তাদাব্বুরে কু’রআন – আমিন আহসান ইসলাহি।
  • [৮] তাফসিরে তাওযীহুল কু’রআন — মুফতি তাক্বি উসমানী।
  • [৯] বায়ান আল কু’রআন — ড: ইসরার আহমেদ।
  • [১০] তাফসীর উল কু’রআন — মাওলানা আব্দুল মাজিদ দারিয়াবাদি
  • [১১] কু’রআন তাফসীর — আব্দুর রাহিম আস-সারানবি
  • [১২] আত-তাবারি-এর তাফসীরের অনুবাদ।
  • [১৩] তাফসির ইবন আব্বাস।
  • [১৪] তাফসির আল কুরতুবি।
  • [১৫] তাফসির আল জালালাইন।

সূরা ফাতিহা – আমরা যা শিখিনি

রাসুল মুহাম্মাদ ﷺ যখন ১৪০০ বছর আগে অমুসলিম আরবদেরকে কু’রআন তিলাওয়াত করে শোনাতেন, তখন তা শুনে আরবদের দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া হতো—

কি অসাধারণ কথা! এভাবে তো আমরা কখনও আরবি ব্যবহার করার কথা ভেবে দেখিনি! এত অসাধারণ বাক্য গঠন, শব্দ নির্বাচন তো আমাদের সবচেয়ে বিখ্যাত কবি সাহিত্যিকরাও করতে পারে না! এমন কঠিন বাণী, এমন হৃদয় স্পর্শী করে কেউ তো কোনো দিন বলতে পারেনি! এই জিনিস তো মানুষের পক্ষে তৈরি করা সম্ভব নয়! এটা নিশ্চয়ই আল্লাহর ﷻ বাণী! আমি সাক্ষি দিচ্ছি – লা ইলাহা ইল্লালাহ…

অথবা,

সর্বনাশ, এটা নিশ্চয়ই যাদু! এই জিনিস মানুষের পক্ষে বানানো সম্ভব না। এটা তো মনে হচ্ছে সত্যি সত্যি কোনো দৈব বাণী। কিন্তু এই জিনিস আমি মেনে নিলে তো আমি আর মদ খেতে পারবো না , জুয়া খেলতে পারবো না , আমার দাসগুলো র সাথে যা খুশি তাই করতে পারবো না।এসব শুরু করলে আমার পরিবার এবং গোত্রের লোকরা আমাকে বের করে দিবে। আমার মান – সন্মান , সম্পত্তি সব পানিতে চলে যাবে। এই জিনিস যেভাবেই হোক আটকাতে হবে। দাঁড়াও , আজকেই আমি আমার দলবল নিয়ে এই লোকটাকে…

কু’রআনের বাংলা বা ইংরেজি অনুবাদ পড়ে কখনও আপনার এরকম কোনো চরম প্রতিক্রিয়া হয়েছে? হয়নি, কারণ কোনও অনুবাদ আল্লাহর ﷻ ভাষণের মর্যাদা, গাম্ভীর্যতা, অলৌকিকতা তুলে ধরতে পারে না। কু’রআন যদি আল্লাহ ﷻ বাংলাতে পাঠাতেন, তাহলে আমরা একটা করে বাক্য শুনতাম, আর ধাক্কা খেতাম। রবীন্দ্রনাথ, মধুসূদন কেউ এর ধারে কিছু তৈরি করতে পারতো না। কিন্তু একজন আরব বাংলায় সেই বাণী শুনত, আর হাই তুলতো। ঠিক যে রকম কিনা আমরা করি, যখন আমরা আরবি কু’রআন শুনি।

কু’রআনের বাণীর যে অলৌকিকতা, ভাষাগত মাধুর্য রয়েছে – তা সুরা ফাতিহা দিয়ে শুরু করি। ফাতিহার প্রতিটি আয়াত এবং শব্দের যে কত ব্যাপক অর্থ রয়েছে, আল্লাহর ﷻ প্রতিটি শব্দ নির্বাচন যে কত সুক্ষ, আয়াতগুলো যে কত সুন্দর ভাবে ভারসাম্য রক্ষা করে তৈরি করা—তা তুলে ধরার চেষ্টা করবো। এগুলো জানার পড়ে আপনি যখন নামাজে সুরা ফাতিহা পড়বেন, তখন সেই পড়া, আর এখন যেভাবে পড়েন, সেটার মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য হবে —ইন শাআ আল্লাহ।

 

[সুরা ফাতিহার আয়াতের বাংলা অনুবাদ মুহসিন খানের অনুবাদ থেকে নেওয়া]

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ
শুরু করছি আল্লাহর ﷻ নামে যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু

যদিও আয়াতটির প্রচলিত অনুবাদে বলা হয় “শুরু করছি আল্লাহর নামে…”, কিন্তু বিসমিল্লাহতে “শুরু করছি” সরাসরি বলা নেই। এর সরাসরি অর্থ: “আল্লাহর নামে।” তবে আরবি ব্যাকরণ অনুসারে ‘বিসম’ এর আগে কিছু একটা আসবে। এক শ্রেণীর ব্যাকরণবিদদের মতে এর আগে একটি ক্রিয়াপদ আসবে, যেমন, ‘আমি তিলাওয়াত করছি’, ‘আমি শুরু করছি’ ইত্যাদি প্রেক্ষাপট অনুসারে ‘আমি অমুক করছি’ দিয়ে। আরেক শ্রেণীর ব্যাকরণবিদ অনুসারে এর আগে একটি বিশেষ্য আসবে, যেমন ‘আমার খাওয়া’, ‘আমার পড়া’ ইত্যাদি আল্লাহর নামে। এখানে আল্লাহ ﷻ আমাদেরকে সরাসরি ‘শুরু করছি’ না বলে বিসমিল্লাহ-এর প্রয়োগকে আরও ব্যাপক করে দিয়েছেন।[১]

আমরা ‘আল্লাহর নামে’ শুধু শুরুই করি না, বরং পুরো কাজটা করি আল্লাহর ﷻ নামে এবং শেষ করিও আল্লাহর ﷻ নামে। আপনি বিসমিল্লাহ বলে খাওয়া শুরু করলেন, কিন্তু খাবারটা যদি কেনা হয়ে থাকে হারাম রোজকার থেকে, তখন সেটা আল্লাহ ﷻ নামে খাওয়া হল না। আপনি বিসমিল্লাহ বলে একটা ফাইল নিলেন সই করার জন্য এবং সই করার আগে অন্যদিকে তাকিয়ে খুক্‌ খুক্‌ করে কেশে হাত বাড়িয়ে দিলেন ঘুষ নেবার জন্য, তাহলে সেটা আর আল্লাহর নামে সই করা হল না। একইভাবে আপনি বিসমিল্লাহ বলে পরীক্ষা দিতে বসলেন, তারপর একটু পরেই পাশের জনেরটা দেখে নকল করা শুরু করলেন —আপনার বিসমিল্লাহ তখন বাতিল হয়ে গেল। আল্লাহ যেটুকু বরকত দিতেন আপনার কাজে, সেটা চলে গেল।

যেহেতু বিসমিল্লাহ অর্থ শুধুই শুরু করা নয়, তাই আমরা শুধু কোনো কিছু শুরু করার জন্যই বিসমিল্লাহ বলব না, আরও অনেক উদ্দেশেই বিসমিল্লাহ বলা যাবে। মূলত: আল্লাহর ﷻ নাম নিয়ে যেকোনো কিছু করাই বিসমিল্লাহ। এছাড়াও আরবিতে ‘বি’-এর অনেকগুলো অর্থ হয়, যেমন ‘সাথে’, ‘দিয়ে’, ‘জন্য’, ‘উদ্দেশে’, ‘সাহায্যে’ ইত্যাদি। বাংলা বা ইংরেজিতে এমন একটি শব্দ নেই, যা একসাথে এতগুলো অর্থ বহন করে। সুরা ফাতিহার প্রথম আয়াতের, প্রথম শব্দের, প্রথম অংশটিই আমাদেরকে দেখিয়ে দেয় যে, কু’রআনের অনুবাদ করলে মূল আরবির ভাবের কতখানি ভাব হারিয়ে যায়। আমরা যদি ‘বি’ এর অর্থগুলোকে একসাথে করে বিসমিল্লাহকে অনুবাদ করতে যাই, তাহলে শুধুই বিসমিল্লাহের অর্থ দাঁড়াবে—

আল্লাহর নামের উদ্দেশে, আল্লাহর নামের জন্য, আল্লাহর নামের সাথে, আল্লাহর নামের সাহায্যে, …

বিসমিল্লাহ বলার সময় অবস্থা অনুসারে এই অর্থগুলোর একটি বা একাধিক নিজেকে মনে করিয়ে দিবেন।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সুরা ফাতিহার এই প্রথম আয়াতে ‘আল্লাহর নামে’ কী? আল্লাহ ﷻ কিন্তু এই আয়াতে বলেননি যে, ‘আল্লাহর নামে তিলাওয়াত শুরু করছি’, বা ‘আল্লাহর নামে এই কু’রআন’, বা ‘আল্লাহর নামে তোমরা কু’রআন পড়।’ তিনি ‘কী করছি’ তা না বলে বিসমিল্লাহ-এর প্রয়োগকে অবাধ করে দিয়েছেন। এর মানে দাঁড়ায় – যে কোনো হালাল কিছুতেই “বিসমিল্লাহির রাহমা-নির রাহি-ম” ব্যবহার করা যাবে।[১]

বিসমিল্লাহ কোনো নতুন কিছু নয়। নবী নুহ ﷺ কে আল্লাহ ﷻ তার জাহাজে উঠার সময় বলেছিলেন, ارْكَبُوا فِيهَا بِسْمِ اللَّهِ “আরোহণ কর আল্লাহর নামে…”(১১:৪১) নবী সুলায়মান ﷺ যখন রানী শিবাকে বাণী পাঠিয়েছিলেন, তখন তা শুরু হয়েছিল “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” দিয়ে (২৭:৩০)। এই দুটি আয়াত থেকে আল্লাহ ﷻ আমাদেরকে শেখাচ্ছেন: আমরা যখন কোনো যাত্রা শুরু করবো, বা কোনো দলিল বা চিঠি লিখব, তখন আমরা যেন “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” বলে শুরু করি।[১]

এরপরে আসে আররাহমা-ন এবং আররাহি-ম। এই শব্দ দুটির অর্থ অদ্ভুত সুন্দর, যা আমি আপনাদেরকে তৃতীয় আয়াত ব্যাখ্যা করার সময় বলবো। এখন শুধুই বলি আররাহমা-ন অর্থ ‘পরম দয়ালু’ এবং আররাহি-ম অর্থ ‘নিরন্তর দয়ালু।’

সুতরাং এই প্রথম আয়াতটির বিস্তারিত অনুবাদ হবে—

পরম দয়ালু, নিরন্তর দয়ালু আল্লাহর নামে

الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহ ﷻ তা’আলার যিনি সকল সৃষ্টি জগতের পালনকর্তা

প্রথমত, অনুবাদ পড়ে মনে হয় যেন আমরা আল্লাহর ﷻ প্রশংসা করছি। যেমন আপনি কাউকে বলেন – “আপনি অনেক ভালো”, সেরকম আমরাও আল্লাহকে ﷻ বলছি যে সমস্ত প্রশংসা তাঁর। কিন্তু ব্যাপারটা তা নয়। “আলহামদু লিল্লাহ” কোনো ক্রিয়া বাচক বাক্য নয়, এটি একটি বিশেষ্যবাচক বাক্য। সহজ বাংলায় বললে, এখানে কোনো কিছু করা হচ্ছে না বরং কোনো সত্যের পুনরাবৃত্তি করা হচ্ছে। যেমন আমরা যখন বলি, “আকাশ নীল” − তখন আমরা কোনো একটি সত্যের পুনরাবৃত্তি করছি। আমরা কিন্তু প্রশংসা করে বলছি না − “আহা! আকাশ, তুমি কত নীল।” আকাশ সবসময়ই নীল, সেটা আমরা বলি, আর না বলি। আমরা সবাই যদি “আকাশ নীল” বলা বন্ধ করেও দেই, আকাশ নীলই থাকবে। ঠিক একই ভাবে আলহামদু লিল্লাহ অর্থ “আল্লাহর ﷻ সমস্ত প্রশংসা”, সেটা আমরা বলি আর না বলি, সমস্ত প্রশংসা ইতিমধ্যেই আল্লাহর। যদি কেউ আল্লাহর ﷻ প্রশংসা নাও করে, তারপরেও তিনি স্ব-প্রশংসিত। পৃথিবীতে কোনো মানুষ বা জ্বিন না থাকলেও এবং তারা কেউ আল্লাহর ﷻ প্রশংসা না করলেও, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর ﷻ ছিল, আছে এবং থাকবে। বরং এটা আমাদের জন্যই একটা বিরাট সন্মান যে, আমরা আল্লাহর ﷻ প্রশংসা করার সুযোগ পাচ্ছি।

সুরা ফাতিহার এই আয়াতটির বাক্য গঠন দিয়েই আল্লাহ ﷻ আমাদেরকে তাঁর অবস্থান কত উপরে এবং আমাদের অবস্থান কত নিচে—তা বুঝিয়ে দিয়েছেন। তিনি আমাদেরকে বুঝিয়ে দিচ্ছেন যে, তিনি ইতিমধ্যেই প্রশংসিত; আমাদের ধন্যবাদ এবং প্রশংসা তাঁর দরকার নেই। তাহলে কেন আমাদের আল্লাহর ﷻ প্রশংসা করা দরকার? তাঁর ﷻ প্রশংসা করলে আমাদের কী লাভ হয়?

গত বছর টাইম ম্যাগাজিনের নভেম্বর সংখ্যায় একটি আর্টিকেল বের হয়েছে কৃতজ্ঞতার উপকারিতার উপরে। সেখানে বলা হয়েছে, ২০০৩ সালে ২,৬১৬ জন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের উপরে গবেষণা করে দেখা গেছে: যারা অপেক্ষাকৃত বেশি কৃতজ্ঞ, তাদের মধ্যে মানসিক অবসাদ, দুশ্চিন্তা, অমূলক ভয়-ভীতি, অতিরিক্ত খাবার অভ্যাস এবং মদ, সিগারেট ও ড্রাগের প্রতি আসক্তির ঝুঁকি অনেক কম। আরেকটিগবেষণায় দেখা গেছে: মানুষকে নিয়মিত আরও বেশি কৃতজ্ঞ হতে অনুপ্রাণিত করলে, মানুষের নিজের সম্পর্কে যে হীনমন্যতা আছে, নিজেকে ঘৃণা করা, নিজেকে সবসময় অসুন্দর, দুর্বল, উপেক্ষিত মনে করা, ইত্যাদি নানা ধরণের সমস্যা ৭৬% পর্যন্ত দূর করা যায়।

২০০৯ সালে ৪০১ জন মানুষের উপর গবেষণা করা হয়, যাদের মধ্যে ৪০%-এর ক্লিনিকাল স্লিপ ডিসঅর্ডার, অর্থাৎ জটিল ঘুমের সমস্যা আছে। তাদের মধ্যে যারা সবচেয়ে বেশি কৃতজ্ঞ, তারা একনাগাড়ে বেশি ঘুমাতে পারেন, তাদের ঘুম নিয়মিত হয়, রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়েন এবং দিনের বেলা ক্লান্ত-অবসাদ কম থাকেন।

নিউইয়র্কের Hofstra University সাইকোলজির অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর ডঃ জেফ্রি ফ্রহ ১০৩৫ জন ১৪-১৯ বছর বয়সি শিক্ষার্থীর উপর গবেষণা করে দেখেছেন: যারা বেশি কৃতজ্ঞতা দেখায়, তাদের পরীক্ষায় ফলাফল অপেক্ষাকৃত বেশি ভালো, সামাজিক ভাবে বেশি মেলামেশা করে এবং হিংসা ও মানসিক অবসাদে কম ভোগে।

Wall Street Journal একটি আর্টিকেলে বলা হয়েছেঃ

Adults who frequently feel grateful have more energy, more optimism, more social connections and more happiness than those who do not, according to studies conducted over the past decade. They’re also less likely to be depressed, envious, greedy or alcoholics. They earn more money, sleep more soundly, exercise more regularly and have greater resistance to viral infections.

এক যুগের গবেষণা থেকে দেখা গেছে: প্রাপ্ত বয়স্করা যারা নিয়মিত কৃতজ্ঞতা অনুভব করেন, তাদের কাজের আগ্রহ, শক্তি বেশি থাকে, তাদের সামাজিক সম্পর্ক বেশি হয়, এবং যারা কৃতজ্ঞ নয়, ওদের থেকে তারা বেশি সুখী অনুভব করেন। তারা অপেক্ষাকৃত কম হতাশা, হিংসা, লোভ বা এলকোহল আসক্ত হন। তারা অপেক্ষাকৃত বেশি আয় করেন, ভালভাবে ঘুমান, নিয়মিত ব্যায়াম করেন, এবং ভাইরাল অসুখের প্রতি তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি থাকে।

এবার বুঝতে পারছেন কেন আল্লাহ ﷻ আমাদেরকে প্রতিদিন ৫ ওয়াক্তে, কমপক্ষে ১৭ বার বলতে বলেছেনঃ

আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আ’লামিন
সমস্ত প্রশংসা এবং ধন্যবাদ আল্লাহর, যিনি সৃষ্টিজগতের প্রভু। [ফাতিহা ১:২]

এখন, আরবিতে প্রশংসার জন্য অনেক শব্দ আছে, যেমন মাদহ্‌, ছানাআ, শুকর। কিন্তু আল্লাহ ﷻ সেগুলো থাকতে কেন তাঁর জন্য হামদ শব্দটি বেছে নিলেন?

হামদ শব্দটি একটি বিশেষ ধরণের প্রশংসা। আরবিতে সাধারন প্রশংসাকে মাদহ مدح বলা হয়। এছাড়াও সানাআ ثناء অর্থ গুণগান। শুকর شكر অর্থ ধন্যবাদ দেওয়া। কিন্তু হামদ অর্থ একই সাথে ধন্যবাদ দিয়ে প্রশংসা করা, যখন আপনি কারো গুণে মুগ্ধ। আপনি কারো কোনো বিশেষ গুণকে স্বীকার করে, তার মুল্যায়ন করার জন্য হামদ করেন। হামদ করা হয় ভালবাসা থেকে, শ্রদ্ধা থেকে, নম্রতা থেকে। এছাড়াও হামদ করা হয় যখন কারো কোনো গুণ বা কাজের দ্বারা আপনি উপকৃত হয়েছেন। আল্লাহর ﷻ অসংখ্য গুণের জন্য এবং তিনি আমাদেরকে যে এত অসীম নিয়ামত দিয়েছেন, যা আমরা প্রতিনিয়ত ভোগ করি—তার জন্য তাঁকে ধন্যবাদ দিয়ে তাঁর প্রশংসা করার জন্য হামদ সবচেয়ে উপযুক্ত শব্দ।

যদি আয়াতটি হতো আল-মাদহু লিল্লাহ: “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর” —তাহলে কী সমস্যা ছিল? মাদহ অর্থ যদিও প্রশংসা, কিন্তু মাদহ একই সাথে বস্তু এবং ব্যক্তির জন্য করা যায়। মাদহ এমন কারও জন্য করা যায়, যে সেই গুণ নিজে অর্জন করেনি। যেমন আপনি বলতে পারেন, “গোলাপ ফুল খুব সুন্দর।” কিন্তু গোলাপ ফুল সুন্দর হওয়ার পেছনে গোলাপের কোনো কৃতিত্ব নেই। কিন্তু হামদ শুধুমাত্র বুদ্ধিমান, ব্যক্তিত্ববান সত্ত্বার জন্য প্রযোজ্য।

যদি আয়াতটি হতো আছ-ছানাউ লিল্লাহ – “সমস্ত গুণগান/মহিমা আল্লাহর”—তাহলে কী সমস্যা ছিল? ছানাআ হচ্ছে শুধুই কারো কোনো গুণের প্রশংসা করা, যা খুবই সীমাবদ্ধ। এর মধ্যে কোনো কৃতজ্ঞতা নেই। আমরা শুধুই আল্লাহর ﷻ গুণের প্রশংসা করি না। আমরা তাঁর প্রতি একই সাথে কৃতজ্ঞ।

তাহলে আয়াতটি আশ-শুকরু লিল্লাহ – “সমস্ত ধন্যবাদ আল্লাহর”—হলো না কেন? আমরা কাউকে ধন্যবাদ দেই শুধুই যখন কেউ আমাদের কোনো উপকার করে। আল্লাহর ﷻ বেলায় সেটা প্রযোজ্য নয়। আমরা আল্লাহর ﷻ হামদ সবসময় করি। হঠাৎ করে কোটিপতি হয়ে গেলেও করি, আবার ক্যানসার ধরা পড়লেও করি। এছাড়াও শুক্‌র করা হয় যখন আপনি কারো কাছ থেকে সরাসরি উপকার পান। কিন্তু হামদ করা হয় যখন উপকারটি শুধু আপানাকে না বরং আরও অনেককে প্রভাবিত করে। যেমন, কেউ আপনাকে এক গ্লাস পানি এনে দিলো: আপনি থাকে ‘শুকরান’ বলে ধন্যবাদ দিলেন। কিন্তু আল্লাহ‌ শুধু আপনাকে একগ্লাস পানিই দেননি, বিশাল সমুদ্র দিয়েছেন ৬০০ কোটি মানুষের জন্য পানি ধারণ করার জন্য। সূর্য দিয়েছেন যাতে সূর্যের তাপে সেই পানি বাস্প হয়ে বিশুদ্ধ রূপে মেঘে জমা হয়। তারপর শীতল বায়ু দিয়েছেন যাতে সেই মেঘ ঘন হয়ে একসময় বৃষ্টি হয়। তারপর মাটির ভেতরে পানি জমার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন, যাতে সেই পানি বিশুদ্ধ অবস্থাতেই শত বছর জমা থাকে। তারপর সেই বিশুদ্ধ পানি বের হয়ে আসার জন্য ঝর্ণা, নদী, পুকুর দিয়েছেন, যাতে আপনি সহজেই সেই বিশুদ্ধ পানি পান করতে পারেন। এসবের জন্য আল্লাহকে ﷻ শুধু ‘ধন্যবাদ আল্লাহ্‌’ বললে সেটা আল্লাহর অবদানকে অনেক ছোট করে দেখা হবে। সুতরাং শুকর বা ধন্যবাদ ছোট একটা ব্যাপার, এটা আল্লাহর ﷻ জন্য উপযুক্ত নয়।

رَبِّ الْعَالَمِين
রাব্বিল আ’-লামি-ন

রাব্ব শব্দটির যথার্থ অনুবাদ করার মত বাংলা বা ইংরেজি শব্দ নেই, কারণ রাব্ব অর্থ একই সাথে মালিক, সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারি, সযত্নে পালনকর্তা, অনুগ্রহ দাতা, রক্ষক। অনেকে এটার অর্থ শুধুই পালনকর্তা করেন, অনেকে সৃষ্টিকর্তা করেন, আবার অনেকে প্রভু করেন। সম্ভবত প্রভু বেশি উপযুক্ত, কারণ আমরা যে একজন প্রভুর দাস, তা একটু পরেই আসবে।

রাব্ব-এর একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল: রাব্ব আমাদেরকে পথ প্রদর্শন করেন, যেটা মালিক (রাজা), খালিক (সৃষ্টিকর্তা) করে না। একজন মালিক তার দাসকে বলবে, “আমার খাজনা কই?” সেই খাজনা দাস কিভাবে জোগাড় করবে, সেটা নিয়ে তার মাথা ব্যাথা নেই। আর একজন খালিক দাসকে সৃষ্টি করেই খালাস। দাসের বেঁচে থাকার জন্য যা দরকার, তার পরিপূর্ণ বেড়ে ওঠার জন্য যে পথনির্দেশ দরকার, তা দিতে খালিক বাধ্য নয়। একারণে আল্লাহ ﷻ যখন তাঁকে প্রভু হিসেবে ঘোষণা করছেন, তখন তিনি ‘রাব্ব’ শব্দটিকে ব্যবহার করেছেন। এই সুরার একটু পরেই আমরা আমাদের রাব্ব-এর কাছে পথনির্দেশ চাবো। একজন দাসের তার প্রভুর কাছ থেকে প্রথম যেই জিনিসটা চাওয়ার আছে তা হল: তাকে কী করতে হবে? প্রভু যদি দাসকে না বলে কী করতে হবে, তাহলে দাস বুঝবে কীভাবে তাকে কী করতে হবে এবং কী করা যাবে না?

তবে প্রভু-দাস এই শব্দগুলো সম্পর্কে আমাদের মনে কোনো ভালো ধারণা নেই। প্রভু শব্দটা শুনলেই আমাদের মনের কোনোয় এক খান্দানি মোচ ওলা, অত্যাচারী জমিদারের ছবি ভেসে উঠে। আর দাস বলতে আমরা সাধারণত দুর্বল, না খাওয়া, অভাবী, অত্যাচারিত মানুষের কথা ভাবি। আমাদের মনে যেন এধরনের কোনো ধারণা না আসে, সেজন্য পরের আয়াতটি আমাদেরকে পরিষ্কার করে দিচ্ছে আল্লাহ ﷻ কেমন দয়ালু প্রভু।

আল-আ’লামি-ন শব্দটির দু’ধরনের অর্থ হয়: ১)সকল সৃষ্টি জগত, ২)সকল জাতি। আল-আ’লামি-ন শব্দটি আলআ’-লাম العالم এর বহুবচন, যার অর্থ: জগত। এখন আলআ’-লাম العالم এর দুটি বহুবচন আছে: আল আ’লামি-ন العالمين —যার অর্থ সকল চেতন/বুদ্ধিমান জাতি (মানুষ, ফেরেশতা, জ্বিন, এলিয়েন, …), আর আল আ’ওয়া-লিম العوالم —যা আল্লাহ ﷻ ছাড়া সকল সৃষ্টি জগত, চেতন বা অচেতন (জড়), দুটোই নির্দেশ করে। এখন প্রশ্ন আসে, কেন আল্লাহ ﷻ আল আ’ওয়া-লিম ব্যবহার না করে, আল-আ’-লামি-ন ব্যবহার করলেন? তিনি কি সকল চেতন এবং অচেতন সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা নন?

সুরা ফাতিহা হচ্ছে চেতন সৃষ্টির জন্য একটি পথ নির্দেশ। এই সূরার মাধ্যমে বুদ্ধিমান সৃষ্টিরা আল্লাহর ﷻ কাছে পথ নির্দেশ চায় এবং আল্লাহর কাছে নিজেদেরকে সমর্পণ করে। আপনার গাড়িটির সুরা ফাতিহার কোনো দরকার নেই, কারণ তার আল্লাহর কাছ থেকে পথনির্দেশ পাবার দরকার নেই। বরং আপনার এবং আপনার ড্রাইভারের আল্লাহর কাছ থেকে পথনির্দেশ পাওয়াটা বড়ই দরকার, যাতে করে আপনারা বুঝে শুনে রাস্তায় একজন বিবেকবান মানুষের মত গাড়ি চালান।

এছাড়াও আভিধানিকভাবে আ’লামি-ন শব্দটি এসেছে ع ل م মুল থেকে, যার অর্থ: ‘জ্ঞান’, যা দ্বারা কোনো কিছু জানা যায়, অর্থাৎ সৃষ্টিজগত। কারণ আমরা সবকিছু জানতে পারি সৃষ্টিজগত থেকে। আমাদের সকল জ্ঞানের মাধ্যম হচ্ছে সৃষ্টিজগত, যার মাধ্যমে আল্লাহ ﷻ আমাদেরকে জ্ঞান দেন। আর এই সৃষ্টিজগতই আমাদেরকে সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত করে। একটা মোবাইল ফোন দেখলে আপনি যেমন নিশ্চিতভাবে বুঝতে পারেন: এটা প্রযুক্তিতে অগ্রসর কোনো বুদ্ধিমান প্রাণী বানিয়েছে, তেমনি আকাশের সূর্য, রাতের আকাশে লক্ষ কোটি তারা, বিশাল সমুদ্র, কোটি প্রজাতির কীটপতঙ্গ, কোটি প্রজাতির গাছ, লক্ষ প্রজাতির মাছ, লক্ষ প্রজাতির পাখি—এই সবকিছু দেখলে আপনি বুঝতে পারেন: এক অকল্পনীয় জ্ঞানী, প্রচন্ত ক্ষমতাবান এবং অত্যন্ত সৃজনশীল একজন সত্ত্বা রয়েছেন, যিনি এত কিছু বানাতে পারেন এবং এত বৈচিত্র্য সৃষ্টি করতে পারেন।

সুতরাং “আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আ’লামি-ন” এর বাংলা অনুবাদ হওয়া উচিত:

সকল প্রশংসা, মহিমা এবং ধন্যবাদ আল্লাহর; তিনি সকল চেতন অস্তিত্বের সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারি, যত্নশীল প্রভু।

এরপরের অসাধারণ আয়াতটি আমাদেরকে শেখাবে আল্লাহ ﷻ কেমন প্রভু—

الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ
যিনি নিতান্ত মেহেরবান ও দয়ালু

এই আয়াতে আল্লাহ ﷻ আমাদেরকে তিনি কেমন প্রভু, তার এক বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। মাত্র দুটি শব্দের মধ্যে কী ব্যাপক পরিমাণের তথ্য আছে দেখুন।

প্রথমত, রাহমা-ন এবং রাহি-ম: এই দুটো শব্দই এসেছে রাহমা থেকে, যার অর্থ: দয়া। আরবিতে রাহমা শব্দটির আরেকটি অর্থ ‘মায়ের গর্ভ।’ মায়ের গর্ভে শিশু নিরাপদে, নিশ্চিতে থাকে। মায়ের গর্ভ শিশুর জীবনের সব মৌলিক চাহিদার ব্যবস্থা করে দেয়, শিশুকে আঘাত থেকে রক্ষা করে, শিশুর বেড়ে উঠার জন্য সব ব্যবস্থা করে দেয়। শিশুর জন্য সকল দয়ার উৎস হচ্ছে তার মায়ের গর্ভ।

এখন রাহমান এবং রাহিম দুটো শব্দই এসেছে রাহমাহ থেকে, কিন্তু যেহেতু শব্দ দুটোর গঠন দুই ধরনের, তাই তাদের অর্থ দুই ধরণের দয়ার—

আররাহমা-ন

রাহমা-ন এর শেষে যে একটা টান আছে: ‘আন’, তা প্রচণ্ডতা নির্দেশ করে। রাহমান হচ্ছে পরম দয়ালু, অকল্পনীয় দয়ালু। আল্লাহ ﷻ তার একটি গুণ ‘আর-রাহমা-ন’ দিয়ে আমাদেরকে বলেছেন যে, তিনি পরম দয়ালু, তাঁর দয়ার কথা আমরা কখনও কল্পনা করতে পারব না। একজন মা যেমন তার শিশুর জন্য সবরকম মৌলিক চাহিদা পূরণ করে, সবরকম বিপদ আপদ থেকে রক্ষা করে, আল্লাহ ﷻ তার থেকেও বেশি দয়ার সাথে তাঁর সকল সৃষ্টিকে পালন করেন, রক্ষা করেন, তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করেন। আল্লাহ ﷻ তাঁর অসীম দয়া দিয়ে প্রকৃতিতে হাজারো ব্যবস্থা করে রেখেছেন পৃথিবীর সবধরনের প্রাণীর মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য। মানুষ হাজার বছর ধরে নানা ভাবে প্রকৃতির এই ব্যবস্থাগুলো ধ্বংস করেছে, চরম দূষণ করেছে, অবাধে গাছ, পশুপাখি নিধন করেছে। কিন্তু তারপরেও কোটি কোটি প্রাণী প্রতিদিন খাবারের সন্ধানে বের হয় এবং ঠিকই খাবার খেয়ে ঘরে ফিরে। শুধুইউরোপেই প্রতি বছর ৩০০ মিলিয়ন গবাদি পশু এবং ৮ বিলিয়ন মুরগি খাবার জন্য হত্যা করা হয়। তারপরেও আমাদের গবাদি পশু, হাস-মুরগির কোনো অভাব হয় না, কারণ আল্লাহ ﷻ পরম দয়ালু।

দ্বিতীয়ত, রাহমা-ন শব্দটির গঠন এমন যে, এটি কোনো কিছু এই মুহূর্তে হচ্ছে—তা নির্দেশ করে। যেমন আপনি যদি বলেন: “মুহম্মদ একজন উদার মানুষ”, তার মানে এই না যে মুহম্মদ এই মুহূর্তে কোনো উদার কাজ করছে, বা কাউকে কিছু দান করছে। কিন্তু রাহমা-ন শব্দটির গঠন এমন যে, তা নির্দেশ করে এই মুহূর্তে আল্লাহ ﷻ অকল্পনীয় দয়ালু। তিনি আপনাকে, আমাকে, আমাদের পরিবারকে, সমাজকে, আমাদের দেশকে, আমাদের ছোট গ্রহটাকে, আমাদের ছায়াপথের ১০০ কোটি তারা এবং কোটি কোটি গ্রহকে, পুরো মহাবিশ্বের ১০০ কোটি ছায়াপথকে এবং তাদের প্রত্যেকটির ভিতরে কোটি কোটি তারা এবং গ্রহকে এই মুহূর্তে, একই সময়ে, একই সাথে দয়া করছেন।

তৃতীয়ত, রাহমা-ন শব্দটির গঠন এমন যে, এটি একটি অস্থায়ী ব্যাপার নির্দেশ করে। একই ধরণের কিছু শব্দ হল জাওআ’-ন (جوعان) যার অর্থ প্রচণ্ড খুধায় কাতর, আ’তশা-ন (عطشان) প্রচণ্ড পিপাসার্ত। এই ধরণের শব্দগুলোর প্রতিটি একটি অস্থায়ী ধারণা নির্দেশ করে, যা পরিবর্তন হতে পারে। যেমন, খাবার খুধাকে দূর করে দেয়, পানি পিপাসাকে দূর করে দেয়। ঠিক একইভাবে আমরা যদি আল্লাহর ﷻ কথা না শুনি, তাহলে আল্লাহ ﷻ তাঁর রহমতকে আমাদের উপর থেকে তুলে নিতে পারেন। আল্লাহর ﷻ রহমত যে অস্থায়ী, তা রাহমা-ন শব্দটির গঠন নির্দেশ করে।

আররাহি-ম

রাহি-ম এর শেষে যে একটা টান আছে: ‘ইম’ −সেটা ‘সবসময় হচ্ছে’ এমন কিছু নির্দেশ করে। আল্লাহ ﷻ নিরন্তর করুণাময় প্রভু। তিনি মানুষের মত অল্প করুণাময়, মাঝে মাঝে করুণাময় নন। আল্লাহ কিন্তু শুধুই বলতে পারতেন “তিনি পরম করুণাময়”, ব্যাস। কিন্তু একজন পরম করুণাময় কিন্তু সবসময় করুণা নাও দেখাতে পারেন। তিনি সকালে করুণা দেখালেন, রাতে আর দেখালেন না। কিন্তু না, তিনি নিরন্তর করুণাময়। তিনি প্রতি মুহূর্তে আমাদেরকে করুণা করছেন। আপনি যখন সকালে ফজরের এলার্ম বন্ধ করে নামাজ পড়বেন কিনা তা কিছুক্ষন চিন্তা ভাবনা করে আবার ঘুম দেন, তখন আপনার একটা হাত খুলে পড়ে যায় না। আপনি যখন একজন অন্ধ ফকিরের পাশ দিয়ে না দেখার ভান করে হেটে চলে যান, তখন কিন্তু আপনার চোখ দুটা নষ্ট হয়ে যায় না, কারণ আল্লাহ নিরন্তর করুণাময়। আপনি তাঁর এক মামুলি দাস হয়ে দিনের বেশিরভাগ সময় তাঁর আদেশ অমান্য করে, তাঁকে আপনার পরিবারের সদস্যদের চাহিদা থেকে কম গুরুত্ব দিয়ে, ‘লোকে কী বলবে’ এই ভেবে ক্রমাগত তার আদেশ ভেঙ্গে যাবার পরেও তিনি আপনাকে প্রতিদিন ছেড়ে দেন। কারণ তিনি ‘রাহি-ম’ নিরন্তর করুণাময়।

এই দুটি শব্দ আররাহমা-ন এবং আররাহি-ম দিয়ে আল্লাহ ﷻ আমাদেরকে তাঁর দয়ার সম্পর্কে একটি সম্পূর্ণ ধারণা দিয়েছেন। সুতরাং এই আয়াতের একটি উপযুক্ত অনুবাদ হবে—

তিনি এই মুহূর্তে অকল্পনীয় দয়ালু এবং তিনি নিরন্তর দয়ালু।

এখন আল্লাহ ﷻ যদি অকল্পনীয় এবং নিরন্তর দয়ালু হন, তাহলে কি আমরা যা খুশি তাই করে পার পেয়ে যাব? কারণ তাঁর দয়ার তো কোনো শেষ নেই? উত্তর হচ্ছে—

مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ
যিনি বিচার দিনের মালিক

আল্লাহ ﷻ এখানে খুব অল্প কিছু শব্দ ব্যবহার করে আমাদেরকে বলে দিয়েছেন যে, যদিও তাঁর করুণা অসীম, কিন্তু তারপরেও আমাদেরকে আমাদের কাজের বিচার দিতে হবে এবং বিচারক হবেন স্বয়ং আল্লাহ ﷻ। কেউ আমাদেরকে সেদিন তাঁর বিচার থেকে রক্ষা করতে পারবে না এবং কেউ কোনো কাজে আসবে না। কারণ আল্লাহ ﷻ বিচার দিনের মালিক, যেই বিচার দিনের কোনো শেয়ার হোল্ডার নেই।

আরবি মালিক শব্দটির দুটো উচ্চারন রয়েছে, মালিক এবং মা-লিক। মালিক অর্থ রাজা। মা-লিক অর্থ অধিপতি। এখানে আল্লাহ ﷻ লম্বা মা-লিক ব্যবহার করেছেন, যার অর্থ: আল্লাহ ﷻ বিচার দিনের একমাত্র অধিপতি। এই দিন তিনি ছাড়া আর কারও কোনো ক্ষমতা থাকবে না। তিনি হবেন সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। যেমন: একজন রাজার হয়তো অনেক বড় রাজত্ব আছে এবং প্রতিটি প্রজা তার হুকুম শুনে। কিন্তু একজন প্রজা তার বাড়ির ভিতরে তার আসবাব পত্রের সাথে কী করবে, সেটা পুরোপুরি তার ব্যাপার। এখানে রাজার কিছুই বলার নেই। প্রজা হচ্ছে তার আসবাবপত্রের মা-লিক, সে যা খুশি তাই করতে পারে তার আসবাবপত্র নিয়ে। একই ভাবে আল্লাহ হচ্ছেন বিচার দিনের মা-লিক, সেদিন সব ক্ষমতা থাকবে তাঁর। তাকে কোনো বোর্ড মেম্বারদের সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে না।

এখানে একটা লক্ষ্য করার ব্যাপার রয়েছে: কেন বিচার ‘দিনের’ অধিপতি? কেন বিচারের অধিপতি নয়? আমরা যখন বলি – ওই বাড়িটা আমার, তার মানে সাধারণত দাঁড়ায় ওই বাড়ির ভেতরে যা কিছু আছে তার সবই আমার। এমনটা নয় যে বাড়িটা আমার, কিন্তু বাড়ির ভেতরে সব আসবাবপত্র অন্য কারো। একইভাবে আল্লাহ ﷻ যখন বলেন: তিনি বিচার দিনের মালিক, তার অর্থ বিচার দিনে যা কিছু হবে, তার সব কিছুর একমাত্র অধিপতি তিনি। বিচার দিন একটা লম্বা সময় এবং সে দিনে অনেকগুলো ঘটনা ঘটবে, যার সবকিছুরই একমাত্র অধিপতি তিনি। তিনি হবেন একমাত্র জজ। তিনি নিজে প্রত্যেকের বিচার করবেন, কোনো উকিল ধরার সুযোগ থাকবে না।

আরবিতে ইয়াওম يَوْم এর বেশ কিছু অর্থ হয় – দিন, যুগ, পর্যায়, লম্বা সময়। যদিও সাধারণত ‘ইয়াওমি দ্দিন’ সবসময় ‘বিচার দিন’ অনুবাদ করা হয়, কিন্তু আমরা যদি ইয়াওমের অন্য অর্থগুলো দেখি, তাহলে এটা ‘বিচার পর্যায়’ অনুবাদ করা যেতে পারে। বিচার দিন যে আমাদের একটি দিনের সমান নয় বরং একটা লম্বা পর্যায়, তা ইয়াওমের বাকি অর্থগুলো ইঙ্গিত করে।

আরেকটি উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো: কেন আল্লাহ ﷻ এর আগের আয়াতে তাঁর দয়ার কথা বলার পর এই আয়াতে শাস্তির কথা না বলে বিচারের কথা বললেন। এর কারণ হচ্ছে, কিয়ামতের দিন দুই ধরণের মানুষ থাকবে – ১) যারা আল্লাহর ﷻ রহমত পেয়ে জান্নাতে যাবে, আর ২) যারা ন্যায় বিচার পেয়ে জাহান্নামে যাবে। জাহান্নাম কোনো শাস্তি নয়, সেটি ন্যায় বিচার। আল্লাহ ﷻ কাউকে শাস্তি দেন না, তিনি ন্যায় বিচার করেন। যারা জান্নাত পায়, তারা আল্লাহর অসীম অনুগ্রহের জন্য জান্নাত পায়, বিচারের জন্য নয়। সত্যিই যদি আল্লাহ ﷻ আমাদের ভালো কাজগুলোর শুধুমাত্র বিচার করে আমাদেরকে প্রতিদান দিতেন, তাহলে আমাদের সর্বনাশ হয়ে যেত। তখন আপনার আমার একটা নামাজও সঠিক নামাজ হতো না, কারণ আমরা নামাজে দাঁড়িয়ে এমন কিছু নাই যা ভাবি না। আমাদের একটা রোজাও রোজা হতো না, কারণ আমরা রোজা রেখে মিথ্যা কথা বলি, হিন্দি সিরিয়াল দেখি, সুদ খাই, উল্টো পাল্টা জিনিসের দিকে তাকাই, আজে বাজে কথা শুনি ইত্যাদি। আমাদের যাকাত কোনো যাকাত হতো না, কারণ আমাদের অনেকের যাকাত হচ্ছে লোক দেখানো একটা ব্যাপার, যেখানে আমরা আমাদের মোট সম্পত্তির হিসাব যত কম করে করা যায় তা করে, তার ২.৫% যাদেরকে দিলে লোকমুখে অনেক নাম হবে, তাদেরকেই বেশি করে দেই। আমাদের বিরাট সৌভাগ্য যে আল্লাহ ﷻ আমাদের কিছু ভালো কাজকে ১০ গুণ, কিছু ভালো কাজকে ১০০ গুণ, ১০০০ গুণ করে হিসাব করবেন। তা না হলে কেউ কোনোদিন জান্নাত পেত না।

এখন এই আয়াতটির শব্দগুলোর অর্থকে যদি ঠিকভাবে তুলে ধরি, তাহলে এর অর্থ দাঁড়ায়-

বিচার দিনের/পর্যায়ের একমাত্র অধিপতি।

আমরা এই তিনটি আয়াতে আল্লাহর সম্পর্কে একটি সম্পূর্ণ ধারণা পেলাম। এখন আমরা জানি আমাদের প্রভু কে। সুতরাং আমাদের এখন বলা উচিৎ –

إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ
আমরা একমাত্র তোমারই ইবাদত করি এবং শুধুমাত্র তোমারই সাহায্য প্রার্থনা করি

এই আয়াত থেকে শুরু হল আমাদের চাওয়া। এতক্ষন পর্যন্ত আমরা আমাদের প্রভুর পরিচয় পেয়েছি। এখন দাস হিসেবে আমাদের প্রভুর কাছ থেকে কিছু চাওয়ার পালা। এই আয়াতেটির অর্থের গভিরতা এবং বাক্য গঠন অসাধারণ। প্রথমে বাক্য গঠন দিয়ে শুরু করি।

আরবিতে যদি আমরা বলতে চাই: আমরা আপনার ইবাদত করি, তাহলে তা হবে “না’বুদুকা।” কিন্তু আল্লাহ ﷻ এখানে শব্দ দুটো উলটিয়ে দিয়েছেন: “ইয়্যা-কা না’বুদু”। আরবিতে এটা করা হয় যখন কোনো কিছুকে বিশেষ ভাবে চিহ্নিত করা হয়। যেমন আমরা যদি বলি, “প্রশংসা আপনার”, তাহলে তার আরবি হবে “হামদুন লাকা।” কিন্তু আমরা যদি বিশেষ ভাবে বলতে চাই, “প্রশংসা শুধুমাত্র আপনারই” তাহলে আমরা উলটিয়ে বলব, “লাকাল হামদ।” ঠিক একইভাবে “ইয়্যা-কা না’বুদু” অর্থ “আমরা একমাত্র আপনার, শুধুই আপনার ইবাদত করি” এবং “ইয়্যা-কা নাসতা’ই-ন” অর্থ “আমরা একমাত্র আপনার কাছে, শুধুই আপনার কাছে সাহায্য চাই।”

এবার আসি শব্দগুলোর অর্থের গভিরতায়। বেশিরভাগ অনুবাদে না’বুদুকে نعبد ইবাদত বা উপাসনা অনুবাদ করা হয়। সেটি মোটেও না’বুদুর প্রকৃত অর্থকে প্রকাশ করে না। না’বুদু এসেছে আ’বদ عبد থেকে যার অর্থ দাস। আমরা শুধুই আল্লাহর ﷻ উপাসনা করি না, আমরা আল্লাহর ﷻ দাসত্ব করি। এমনটি নয় যে আমরা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়লাম, রোযা রাখলাম, যাকাত দিলাম – ব্যাস, আল্লাহর ﷻ সাথে আমাদের সম্পর্ক শেষ। এরপর আমি যা খুশি তাই করতে পারি। বরং আমরা সবসময় আল্লাহর দাস। ঘুমের থেকে উঠার পর থেকে ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত প্রতিটা কাজে, প্রতিটা কথায় আমাদেরকে মনে রাখতে হবে – আমরা আল্লাহর ﷻ দাস এবং আমরা যে কাজটা করছি, যে কথাগুলো বলছি, তাতে আমাদের প্রভু সম্মতি দিবেন কিনা এবং প্রভুর কাছে আমি জবাব দিতে পারবো কি না। এরকম মানুষ দেখেছেন যারা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মসজিদে গিয়ে পড়ে, কিন্তু ব্যাংকের একাউন্ট থেকে সুদ খায়, সুদের লোণ নিয়ে বাড়ি কিনে, কাউকে ভিক্ষা দেবার সময় বা মসজিদে দান করার সময় মানিব্যাগে সবচেয়ে ছোট যে নোটটা আছে সেটা খোঁজে? বা এরকম মানুষ দেখেছেন হজ্জ করেছে, বিরাট দাড়ি রেখেছে কিন্তু বাসায় তার স্ত্রী, সন্তানদের সাথে চরম দুর্ব্যবহার করে? এরা আল্লাহ ﷻ আবদ্‌ নয় এবং এরা আল্লাহর ﷻ ইবাদত করছে না। এরা শুধুই উপাসনা করছে। উপাসনার বাইরে আল্লাহর ﷻ প্রতি নিজেকে সমর্পণ করে দিয়ে আল্লাহর আবদ্‌ হতে এখনও বাকি আছে।

আরেক ধরণের মানুষ যারা এখনও আল্লাহর ﷻ ইবাদত করা শুরু করতে পারেনি তারা হল সেই সব মানুষ যারা ঠিকই নামাজ পড়ে, রোযা রাখে, যাকাত দেয়, কিন্তু ছেলে মেয়ের বিয়ে দেয় হিন্দুদের বিয়ের রীতি অনুসরন করে গায়ে-হলুদ, বউ-ভাত করে। আরেক ধরণের মানুষ হল যারা মসজিদে বা ইসলামিক অনুষ্ঠানে যায় একদম মুসলিম পোশাক পড়ে, হিজাব করে, কিন্তু বন্ধু বান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশীর বাসায় বা বিয়ের অনুষ্ঠানে যায় একেবারে সার্কাসের মেয়েদের মতো রঙ-বেরঙের সাজসজ্জা করে। আরেক ধরণের আজব বান্দা দেখেছি যারা হজ্জ করতে যায় হিজাব পড়ে, কিন্তু প্লেন সউদি আরবের সীমানা থেকে বের হয়ে অন্য এয়ারপোর্টে নামার সাথে সাথে বাথরুমে গিয়ে হিজাব খুলে ফেলে আপত্তিকর পশ্চিমা কাপড় পড়ে নেয়। এদের সবার সমস্যা একটি, এরা এখনও আল্লাহকে ﷻ প্রভু হিসেবে মেনে নিতে পারেনি। এদের কাছে “লোকে কী বলবে” বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু “আমার প্রভু কী বলবেন” তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়।

আমরা যখন নিজেদেরকে আল্লাহর ﷻ দাস হিসেবে ঘোষণা দিব, তখনই আমরা আমাদেরকে সত্যিকার অর্থে স্বাধীন করতে পারবো। যতদিন সেটা করতে না পারছি, ততদিন আমরা “লোকে কী বলবে” এর দাস হয়ে থাকব। ফ্যাশনের দাস হয়ে থাকব। বিনোদন, সংস্কৃতি, সামাজিকতার দাস হয়ে থাকব। একমাত্র আল্লাহর প্রতি একান্তভাবে দাসত্ব করতে পারলেই আমরা এই সব মিথ্যা “প্রভু”দের দাসত্ব থেকে নিজেদেরকে বের করে আনতে পারবো। যারা সেটা করতে পেরেছেন, তারা জানেন এই পৃথিবীতে সত্যিকার স্বাধীনতার স্বাদ কত মধুর!

নাস্তা’ই-ন نَسْتَعِينُ অর্থ যদিও করা হয় “সাহায্য” কিন্তু নাস্তা’ই-ন এর প্রকৃত অর্থ হচ্ছে – আপনি অনেক চেষ্টা করেছেন, আর আপনার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না, এখন আপনি সাহায্য চান। যেমনঃ রাস্তায় আপনার গাড়ি নষ্ট হয়ে গেছে। আপনি একা ঠেলে পারছেন না। তখন আপনি রাস্তায় কাউকে অনুরোধ করলেন আপনার সাথে ধাক্কা দেবার জন্য। এটা হচ্ছে নাস্তা’ইন। কিন্তু আপনি যদি আরামে গাড়িতে এসি ছেড়ে বসে থেকে রাস্তায় কাউকে বলতেন ধাক্কা দিতে, তাহলে সেটা নাস্তাই’ন হতো না।

আমরা আল্লাহর ﷻ কাছে তখনি সাহায্য চাওয়ার মত মুখ করতে পারবো, যখন আমরা নিজেরা যথেষ্ট চেষ্টা করেছি। জীবনে একবার কু’রআন পুরোটা পড়ে দেখেনি, অথচ আমরা নামাজে আল্লাহর ﷻ কাছে চাচ্ছি, “ও আল্লাহ, আমাকে বেহেশত দেন” – এরকম হাস্যকর কাজ নাস্তাই’ন নয়। আমরা নিজেরা অনেক ইসলামের আর্টিকেল পড়ি, বই পড়ি, লেকচার শুনি, অথচ আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশীদেরকে ইসলামের কথা বলতে লজ্জা পাই, কিন্তু আল্লাহর কাছে ঠিকই চাই -“ও আল্লাহ, আমাকে একজন আদর্শ মুসলমান বানিয়ে দিন” – এটা নাস্তাই’ন নয়।

এই আয়াতটিতে আল্লাহ ﷻ আমাদেরকে শুধু তাঁর কাছে সাহায্য চাইতেই বলেন নি, বরং নাস্তা’ইন শব্দটা ব্যবহার করে আমাদেরকে বলে দিয়েছেন যে, আমাদেরকে যথাসাধ্য চেষ্টা করে তারপরে তাঁর কাছে সাহায্য চাইতে হবে।

এই আয়াতে একটি লক্ষ করার মত ব্যাপার হলো: আল্লাহ ﷻ কিন্তু বলেননি, কিসের জন্য সাহায্য চাইতে হবে। তিনি শুধুই বলেছেন সাহায্য চাইতে। ধরুন আপনি সিঁড়ি থেকে নামতে গিয়ে তিন তলা থেকে গড়িয়ে, নিচ তলায় এসে মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে আছেন এবং আপনার হাত-পা ভেঙ্গে গেছে। এই অবস্থায় আপনি কি বলবেন, “ভাই সব, আমি সিঁড়ি হইতে পড়িয়া গিয়া আমার হাত-পা ভাঙ্গিয়া ফেলিয়াছি। আপনারা অনুগ্রহ করিয়া আমাকে সাবধানে তুলিয়া একটি স্ট্রেচারে করিয়া নিকটবর্তী পঙ্গু হাসপাতালে লইয়া যাইবেন এবং একজন ডাক্তারকে ঘটনা বৃত্তান্ত বলিবেন।” আপনি সেটা করবেন না, বরং আপনি এক কথায় বলবেন – “বাচাও!” এক কথাই যথেষ্ট। ঠিক একইভাবে আল্লাহ ﷻ আমাদেরকে বলেছেন, আমাদের অবস্থা বড়ই খারাপ, এখন আমরা একটা কাজই করতে পারি তা হল বলা, “সাহায্য করুন!”

সুতরাং এই আয়াতটির শুদ্ধত্বর অনুবাদ হবে—

আমরা একমাত্র আপনার, শুধুই আপনার দাসত্ব করি, এবং একমাত্র আপনার কাছে, শুধুই আপনার কাছে অনেক চেষ্টার পরে সাহায্য চাই।

اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ
আমাদেরকে সরল পথ দেখাও

আমরা আল্লাহর কাছে অনেক কিছুই চাইতে পারতাম। যেমন আল্লাহ ﷻ আমাদেরকে জীবনে সফল করে দিন, খাঁটি মুসলমান বানিয়ে দিন, আমাদের সব গুনাহ ক্ষমা করে দিন ইত্যাদি। কিন্তু আল্লাহ ﷻ আমাদেরকে শেখাচ্ছেন যে, আমাদের যা দরকার তা হচ্ছে পথনির্দেশ। এই পৃথিবীটা আমাদের জন্য একটি পরীক্ষা এবং এই পরীক্ষায় সফল ভাবে পাস করার জন্য আমাদের দরকার পথনির্দেশ। আমরা স্কুলে শিক্ষকের কাছে যেমন সাজেশন চাইতাম- কোন চ্যাপটারগুলো পড়তে হবে, কোনগুলো না পড়লেও হবে, কোন প্রশ্নগুলোর উত্তর শিখলেই পরীক্ষায় কমন আসবে -সেরকম আমাদের জীবনের পরীক্ষায় আমাদের আল্লাহর পথনির্দেশ দরকার।

ইহ্‌দিনা এসেছে হুদা هدى থেকে, যার অর্থ পথনির্দেশ। হুদা অর্থ সম্পূর্ণ, বিস্তারিত পথনির্দেশ। এটি শুধুই পথের ইঙ্গিত নয়। যেমন: আপনি কাউকে জিজ্ঞেস করলেন, “ভাই মতিঝিল কোন দিকে?” সে বলল, “ওই পূর্ব দিকে।” এই ধরণের পথনির্দেশ দিয়ে আপনার কোনো লাভ নেই। কিন্তু সে যদি বলত, “এই রাস্তা ধরে সোজা গিয়ে প্রথম বায়ে যাবেন, তারপর তিনটা সিগনাল পার হয়ে ডানে গেলে যে শাপলা চত্বর দেখতে পারবেন, সেখান থেকে মতিঝিল শুরু। চলেন আপনাকে আমি কাকরাইল পর্যন্ত আগিয়ে দেই।” এটা হল হুদা – পথনির্দেশ। আমরা আল্লাহর কাছ থেকে পথের ইঙ্গিত চাচ্ছি না, বিস্তারিত পথ নির্দেশ চাচ্ছি, সেই পথে চলার জন্য সাহায্য চাচ্ছি। আল্লাহ ﷻ আমাদের চাওয়ার এই উত্তরে ৬২৩৬টা পথনির্দেশ সহ এক সম্পূর্ণ কু’রআন দিয়েছেন।

আরেকটি ব্যাপার লক্ষ করুন, এই আয়াতটি এবং আগেরটিতে “আমাদেরকে”, “আমরা” ব্যবহার করা হয়েছে। কেন “আমি” ব্যবহার করা হলো না?

একা ইসলামের পথে থাকা খুবই কঠিন। আপনারা যারা ইসলাম মেনে চলার যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন, কিন্তু আপনার পরিবারের বাকি সবাই ইসলামের ধারে কাছেও নেই, আপনারা জানেন আপনাদের পক্ষে ইসলাম মেনে চলাটা কত কঠিন। প্রতিদিন আপনাকে আপনার পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে আপত্তিকর কথা, কাজ, অনুষ্ঠান সহ্য করতে হচ্ছে, যা আপনাকে প্রতিনিয়ত কষ্ট দেয়, আপনার মন ভেঙ্গে দেয়। আর আপনারা যারা অমুসলিম দেশে আছেন, তারা জানেন যে, এক হালাল খাবার খুঁজে পাবার জন্য আপনাদেরকে কত মাইলের পর মাইল খুঁজে বেড়াতে হয়, জুম্মার নামাজ পড়ার জন্য কত সংগ্রাম করতে হয়। একারণেই আল্লাহ ﷻ আমাদেরকে সম্মিলিতভাবে তাঁর ইবাদত করতে বলেছেন, তাঁর সাহায্য চাইতে বলেছেন এবং তাঁর কাছে পথনির্দেশ চাইতে বলেছেন। যখন একটি পরিবারের সবাই, সমাজের সবাই ইসলাম মেনে চলা শুরু করে, তখন সেই পরিবারের বা সমাজের প্রত্যেকজন সদস্যর জন্য ইসলাম মেনে চলাটা অনেক সহজ এবং আনন্দের হয়ে যায়।

সিরা-ত صراط শব্দটির অর্থ একমাত্র সোজা পথ। আরবিতে পথের জন্য আরও শব্দ আছে যেমন তারিক طريق, শারি’ شارع, সাবিল سبيل ইত্যাদি। কিন্তু এই সব শব্দের বহুবচন হয়, অর্থাৎ একাধিক পথ হয়। কিন্তু সিরা-ত একটি একবচন শব্দ এবং এর বহুবচন নেই। যার মানে দাঁড়ায় – সত্যের পথ একটাই। জীবনের পরীক্ষায় সফল হবার অনেকগুলো পথ নেই, একটাই পথ।

ভাষাগত ভাবে সিরা-ত অর্থ সোজা, চওড়া এবং বিপদজনক পথ। এই রাস্তাটি এতই সরল এবং সোজা যে, যারা এই পথে যাচ্ছে, তাদেরকে সহজেই যে কেউ আক্রমন করতে পারে। একারণেই আল্লাহ ﷻ যখন শয়তানকে বলেছিলেন আদমকে সিজদা করতে এবং সে অবাধ্যতা করেছিল, তখন তাকে বের করে দেবার সময় সে বলেছিল—

ইবলিস বলেছিল, “যেহেতু আপনি আমাকে বিপথগামী করলেন, আমি এদের (মানুষদের) সবার জন্য সিরা-তাল মুস্তাকি’মে ওৎ পেতে থাকব”। [৭:১৬]

আমরা যারা সিরা-তুল মুস্তাকি’মে চলার চেষ্টা করবো, আমাদেরকে শয়তান প্রতি নিয়ত আক্রমণ করবে সেই পথ থেকে বের করে আনার জন্য। শয়তান তার বাহিনী নিয়ে সিরা-তুল মুস্তাকি’মের দুই পাশে ঘাপটি মেরে আছে এমবুশ করার জন্য। আমরা একটু অসাবধানী হলেই তারা আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। প্রতিনিয়ত আমাদেরকে জীবনের শত প্রলোভন, কামনা, বাসনা, রাগ, ঘৃণা, অহংকার থেকে নিজেদেরকে সংযত রেখে খুব সাবধানে এই পথটি পার করতে পারলেই আমরা আমাদের গন্তব্য জান্নাতে পোঁছে যাবো।

siratul mustaqim

এখন সিরা-ত যদি সোজা পথ হয় তাহলে মুস্তাকি’ম অর্থ সরল/সোজা কেন? এখানে বাড়তি মুস্তাকি’মের কি দরকার? মুস্তাকি’ম এসেছে قوم থেকে, যার অর্থ: দৃঢ় ভাবে দাঁড়ানো, প্রতিস্থিত, সুবিন্যস্ত। মুস্তাকি’ম শুধুই সরল পথ নির্দেশ করে না, বরং এটি এমন একটি পথ, যা সুপ্রতিষ্ঠিত এবং ঊর্ধ্বগামী। আমরা এই পথে যত আগাবো, আমরা তত উপরে উঠবো, তত আল্লাহর কাছাকাছি হব, তত সন্মানিত হব, কিন্তু একই সাথে সেটা আমাদের জন্য তত কঠিন হতে থাকবে। সিরা-তাল মুস্তাকি’-ম আমাদেরকে উপরের দিকে আল্লাহর কাছে নিয়ে যায়, কিন্তু শয়তান এবং এই দুনিয়ার কামনা, বাসনা, প্রলোভন আমাদেরকে নিচের থেকে ক্রমাগত টেনে ধরে রাখে। আমরা যত সিরা-তুল মুস্তাকি’মে এগিয়ে যাবো, আমাদের জন্য আরও সামনে এগিয়ে যাওয়াটা তত কঠিন হতে থাকবে। আল্লাহ ﷻ এখানে মুস্তাকি-ম ব্যবহার করে আমাদেরকে আগে থেকেই জানিয়ে দিচ্ছেন যে, সফলতার পথ সহজ নয় এবং এই পথে যত এগিয়ে যাবো, সেই পথে অটল থাকাটা আমাদের জন্য তত কঠিন হবে। তাই আমরা যেন যথাযথ মানসিক প্রস্তুতি নেই।

সুতরাং এই আয়াতটির উপযুক্ত অনুবাদ হবে—

আমাদেরকে একমাত্র সঠিক, প্রতিষ্ঠিত, ঊর্ধ্বগামী, ক্রমাগত কঠিনতর পথের জন্য বিস্তারিত পথনির্দেশ দিন।

صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ
সে সমস্ত লোকের পথ, যাদেরকে তুমি নেয়ামত দান করেছ। তাদের পথ নয়, যাদের প্রতি তোমার গজব নাযিল হয়েছে এবং যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে

এই আয়াতে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য ব্যাপার রয়েছে। প্রথমত আল্লাহ ﷻ বলছেন, তাদের পথ যাদেরকে তিনি নিয়ামত দিয়েছেন। তিনি কিন্তু বলেননি, তাদের পথ যাদেরকে তিনি নিয়ামত দেন বা দিবেন বা দিচ্ছেন। এখানে অতীত কাল ব্যবহার করা হয়েছে। এর বিশেষত্ব হচ্ছে, যারা আল্লাহর নিয়ামত পেয়েছেন, তারা অতীত হয়ে গেছেন। কু’রআনের আল্লাহ ﷻ আমাদেরকে বহু ব্যক্তির এবং জাতির উদাহরণ দিয়েছেন, যারা আল্লাহর নিয়ামত পেয়ে সফল হয়েছেন। যেমন: তিনি আমাদেরকে ইব্রাহিম ﷺ এর উদাহরণ দিয়েছেন। তিনি আমাদেরকে মুসা ﷺ এর উদাহরণ দিয়েছেন। আমাদেরকে মুহাম্মাদ ﷺ এর উদাহরণ দিয়েছেন। আমাদেরকে তাদের পথ অনুসরণ করতে হবে। সফল হবার পথের নিদর্শন আমাদেরকে আগেই দেখিয়ে দেওয়া হয়েছে। সফল হবার জন্য কোনো নতুন পথ আর আসবে না। কেউ যদি আপনাকে কোনো নতুন পথের সন্ধান দিয়ে বলে: এটা হচ্ছে সফল হবার পথ, তাহলে আপনি তার থেকে দূরে থাকুন।

এছাড়াও আরেকটি মনে রাখার ব্যাপার হলো, আমাদের জন্য যারা আদর্শ, তারা কেউ এযুগের কোনো মানুষ নন। আমাদের আদর্শ মানুষরা অনেক আগেই পৃথিবী থেকে চলে গেছেন। তাই আমরা যেন এযুগের কোনো মানুষকে আদর্শ হিসেবে ধরে, তাদের অন্ধ অনুকরণ করা শুরু না করি।

আরেকটি ব্যাপার হল, সুরা ফাতিহা কিন্তু শুধু আমাদেরকেই দেওয়া হয়নি, বরং সাহাবিদেরকেও দেওয়া হয়েছিল। সাহাবিদের বেলায় তাহলে “আনা’মতা আ’লাইহিম” কারা ছিলেন? নবী মুহম্মদ ﷺ-কে যখন আল্লাহ ﷻ সুরা ফাতিহা শিখিয়েছিলেন, তখন তার কাছে অনুসরণ করার মত আদর্শ কারা ছিলেন? কু’রআনে বহু জায়গায় আল্লাহ ﷻ নবীকে ﷺ এবং তার অনুসারিদেরকে (যার মধ্যে সাহাবারাও পড়েন), আগের নবীদের ﷺ এবং কিছু সফল জাতির উদাহরণ দিয়েছেন, যাদেরকে আল্লাহ ﷻ অনুসরণ করার মত আদর্শ বলে বিশেষভাবে চিহ্নিত করেছেন। আমরা কু’রআন পড়লেই অনুসরণ করার মত এমন অনেক আদর্শ খুঁজে পাবো। কু’রআনে শত শত ঘটনা, কথোপকথন এর মধ্য দিয়ে আল্লাহ ﷻ আমাদেরকে সেই আদর্শগুলো শিখিয়েছেন।

ভাষা তাত্ত্বিক দিক থেকে আনআ’মা এসেছে নুউ’-মা نعومة থেকে, যার অর্থ নম্র, শান্ত, শিথিল ইত্যাদি। যেমন গরু, ভেড়াকে আনআ’ম বলা হয়, কারণ তারা সবসময়ই শান্ত, ধিরস্থির থাকে। অন্যদিকে বিড়ালকে দেখবেন সবসময় সতর্ক থাকতে। আল্লাহ ﷻ এখানে আনআ’মা শব্দটি ব্যবহার করে আমাদেরকে শেখাচ্ছেন যে, যারা সিরা-তাল মুস্তাকি’মে চলে গন্তব্যে পৌঁছে গেছে, তাদের উপরে আল্লাহ ﷻ শান্তি বর্ষণ করেছেন। তারা এখন শান্ত, শিথিল।

আয়াতের দ্বিতীয় অংশটি “তাদের পথ নয়, যাদের প্রতি তোমার গজব নাযিল হয়েছে।” প্রচলিত এই অনুবাদে একটি বড় ভুল রয়েছে, যা সাম্প্রতিক অনুবাদগুলোতে ঠিক করা হয়েছে। “তোমার গজব” একটি ভুল অনুবাদ কারণ আরবিতে কোনো “তোমার” নেই, যা আল্লাহকে ﷻ নির্দেশ করে। “মাগ’দুবি আ’লাইহিম” আরবিতে ব্যবহার করা হয় এমন কাউকে নির্দেশ করতে, যার উপর সবাই রেগে আছে। “মাগ’দুবি” শব্দটির অর্থ “ক্রোধের শিকার।” যখন এরকম কোনো শব্দ ব্যবহার করা হয়, যেখানে কে কাজটা করছে তা বলা থাকে না, তার মানে হচ্ছে কাজটা করছে একাধিক জন, একজন নয়। সুতরাং “তোমার গজব” ভুল অনুবাদ। বরং শুদ্ধ অনুবাদ হচ্ছে, “যারা ক্রোধের শিকার হয় না।”

আল্লাহ ﷻ এখানে তাঁর কথা উল্লেখ না করে এই আয়াতটির অর্থকে অনেক ব্যাপক করে দিয়েছেন। এখানে আল্লাহ ﷻ আমাদেরকে সতর্ক করে দিচ্ছেন যে, আমরা যেন নিজের, পরিবারের, আত্মীয়স্বজনের, প্রতিবেশীর – সকল মানুষের এবং অন্যান্য সব সৃষ্টির এবং সর্বোপরি আল্লাহর ক্রোধের শিকার না হই। আল্লাহ ﷻ আমাদেরকে সব ধরণের, সবার ক্রোধের শিকার হতে মানা করেছেন। মানুষের, ফেরেশতাদের এবং আল্লাহর ক্রোধের শিকার কারা হয়, তা কু’রআনের বেশ কিছু আয়াতে পরিস্কারভাবে বলা আছে এবং সেসব জায়গায় আল্লাহ ﷻ পরিস্কারভাবে তাঁকে উল্লেখ করেছেন। সুরা ফাতিহাতে তিনি বিশেষভাবে তাঁকে উল্লেখ করেননি, কারণ তাঁর আমাদের প্রতি নির্দেশ হচ্ছে: আমরা যেন ক্রোধের শিকার না হই, সেটা নিজের ক্রোধ এবং অন্যের ক্রোধ, দুটোই।

আদ্দ—ল্লি-ন এর অর্থ করা হয় “যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে”, কিন্তু এর অনুবাদ হওয়া উচিৎ “যারা পথ হারিয়ে ফেলেছে।” এরা সাধারণত এমন লোক নয় যারা ইচ্ছা করে পথ হারায়, কারণ যারা আল্লাহর বাণী জেনে শুনে অস্বীকার করে ভুল পথে চলে, তারা কাফির, তারা দল্লিন নয়। দল্লিন তারাই, যারা না বুঝে ভুল পথে আছে। যেমন ধরুন, আপনার দুটো বাচ্চা আছে। আপনি বড়টাকে বললেন, “ফ্রিজে অনেক চকলেট আছে, কিন্তু আমি না ফেরা পর্যন্ত তোমরা কেউ ফ্রিজ খুলবে না।” আপনি ফিরে এসে দেখেন দুই জনেই মহানন্দে চকলেট খাচ্ছে। এখন তাদের প্রতি আপনার প্রতিক্রিয়া কী হবে? বড়টা নিশ্চিত ভাবে আপনার আদেশ অমান্য করেছে, এবং ছোটটা না বুঝে ভুল করেছে। বড়টা হবে আপনার ক্রোধের শিকার, কিন্তু ছোটটা সেরকম বকা খাবে না। সুতরাং বড়টা হচ্ছে মাগ’দুবি-র উদাহরণ এবং ছোটটা হচ্ছে দল্লা-র উদাহরণ।

সুরা ফাতিহার কিছু ভাষা তাত্ত্বিক মাধুর্য

১) সুরা ফাতিহার প্রতিটি আয়াত কবিতার ছন্দের মত শেষ হয় ‘ইম’ বা ‘ইন’ দিয়ে। যেমন প্রথম আয়াত শেষ হয় রাহি-ম দিয়ে, দ্বিতীয় আয়াত শেষ হয় আ’লামি-ন দিয়ে, তৃতীয় আয়াত রাহি-ম, চতুর্থ আয়াত দি-ন।

২) সুরাটির মাঝামাঝি যেই আয়াতটি “ইয়্যা-কা না’বুদু…” এর আগের আয়াতগুলো হচ্ছে বিশেষ্য বাচক বাক্য এবং তার পরের আয়াতগুলো হচ্ছে ক্রিয়া বাচক বাক্য।

৩) “ইয়্যা-কা না’বুদু…” এর আগের আয়াতগুলো হচ্ছে আল্লাহর সম্পর্কে ধারণা। এর পরের আয়াতগুলো হচ্ছে আল্লাহর কাছে আমাদের চাওয়া।

৩) সুরা ফাতিহার আয়াতগুলোর উচ্চারন ক্রমাগত ভারি এবং কঠিন হতে থাকে। যেমন প্রথম চারটি আয়াতে দেখবেন সেরকম ভারি শব্দ নেই। কিন্ত “ইয়্যাকা না’বুদু…” থেকে ক্রমাগত ভারি শব্দ শুরু হতে থাকে এবং ক্রমাগত ভারি শব্দ বাড়তে থাকে। যেমনঃ

  • ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যা-কা নাসতাই’ন − দুটা ভারি শব্দ।
  • ইহদিনাস সিরা-তা’ল মুসতাকি’ম − দুটা ভারি শব্দ।
  • সিরা-তা’ল্লাযিনা আনআ’মতা আ’লাইহিম − তিনটা ভারি শব্দ।
  • গা’ইরিল মাগ’ধুবি আ’লাইহিম ওয়া লা দ্দ−ল্লি-ন – চারটা ভারি শব্দ।

সুরা ফাতিহার গভীরতর অর্থানুবাদ

بِسْمِ اللَّهِ   الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ বিসমিল্লাহির রাহমা-নির রাহি-মঅকল্পনীয় দয়ালু, সবসময় দয়ালু আল্লাহর নামে।
الْحَمْدُ   لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল   আ’-লামি-নসকল প্রশংসা, মহিমা এবং ধন্যবাদ আল্লাহর; তিনি সকল চেতন অস্তিত্বের সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারি, যত্নশীল প্রভু।
الرَّحْمَٰنِ   الرَّحِيمِ আররাহমা-নির রাহি-মঅকল্পনীয় দয়ালু, সবসময় দয়ালু।
مَالِكِ يَوْمِ   الدِّينِ মা-লিকি ইয়াওমিদ্দি-নবিচার দিনের/পর্যায়ের একমাত্র অধিপতি।
إِيَّاكَ   نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ ইয়্যা-কা না’বুদু ওয়া   ইয়্যা-কা নাসতাই’-নআমরা একমাত্র আপনার, শুধুই আপনার দাসত্ব করি, এবং একমাত্র আপনার কাছে, শুধুই আপনার কাছে অনেক চেষ্টার পরে সাহায্য   চাই।
اهْدِنَا   الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ ইহদিনাস সিরাতা’ল মুসতাকি’-মআমাদেরকে একমাত্র সঠিক, প্রতিষ্ঠিত, ঊর্ধ্বগামী, ক্রমাগত কঠিনতর পথের জন্য বিস্তারিত পথনির্দেশ দিন।
صِرَاطَ   الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا   الضَّالِّينَ সিরাতা’ল্লা যি-না আনআ’মতা   আ’লাইহিম গা’ইরিল মাগ’দু’বি আ’লাইহিম ওয়ালা দ্দ—ল্লি-নতাদের পথ যাদেরকে আপনি স্বাচ্ছন্দ্য, অনুগ্রহ, কল্যাণ দিয়েছেন, যারা নিজের এবং অন্যের ক্রোধের শিকার হয় না এবং ভুল পথে যায় না।

Fatiha

সুত্র:

লেখাটি http://quranerkotha.com/surah-fatiha/ থেকে কপি করা হয়েছে