অল্প পুঁজিতে করতে পারেন “কার ওয়াশ ব্যবসা”

সামগ্রিক বিনিয়োগ বিবেচনায় গাড়ী ধোয়ার ব্যবসাটি একটি জনপ্রিয় ব্যবসা। জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও নগরায়নের ফলে সমগ্র বিশ্বে গাড়ীর সংখ্যা বাড়ছে। গাড়ীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় দিন দিন এই ব্যবসা শুরু করার সুযোগ তৈরী হচ্ছে। যানবাহন সংশ্লিষ্ট এই ব্যবসাটি বর্তমানে একটি ক্রমবর্ধমান ব্যবসা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি একটি ঝুঁকি মুক্ত ব্যবসার ধারণা। ছোট মূলধন বিনিয়োগ করেই এই ব্যবসাটি শুরু করা যায়।

ব্যবসার ধরণ: এটি একটি সেবামূলক ও লাভজনক ব্যবসা হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। ব্যবসার অবস্থান: গাড়ী ধোয়ার ব্যবসাটি শুরু করতে হলে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভাল এমন জায়গায় একটি খোলা মাঠের প্রয়োজন এবং পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। সম্ভাব্য পুঁজি: এই ব্যবসা শুরু করতে আনুমানিক ১০০০০০ থেকে ২০০০০০ টাকা মূলধন বিনিয়োগ করা প্রয়োজন হতে পারে।

গাড়ী ধোয়ার ব্যবসার বাজার পরিস্থিতি: সারা বিশ্বে এই ব্যবসার একটি বিশাল বাজার রয়েছে। তাছাড়া যেহেতু দিন দিন গাড়ীর সংখ্যা বাড়ছে তাই স্বাভাবিক ভাবেই এই ব্যবসার বাজারও প্রসারিত হচ্ছে।

কিভাবে এই ব্যবসা শুরু করবেন: পর্যাপ্ত পানির সরবরাহ নিশ্চিত করা যায় এমন স্থানে গাড়ী ধোয়ার কাজ করে এই ব্যবসাটি পরিচালনা করা হয়। ব্রাশ ও শ্যাম্পুর সাহায্যে গাড়ী ধুয়ে পরিষ্কার করতে হয়। আপনি চাইলে গাড়ী ধোয়ায় দক্ষ কর্মী নিয়োগ করেও এই ব্যবসাটি শুরু করতে পারেন।

গাড়ী ধোয়ার ব্যবসাটি কেন শুরু করবেন: অন্যান্য ব্যবসার চেয়ে এই ব্যবসায় ঝামেলা ও ঝুঁকি কম থাকায় অনেক উদ্যোক্তাই এই ব্যবসার প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করছেন। তাছাড়া এই ব্যবসার মাধ্যমে সহজেই আর্থিক ভাবে লাভবান হওয়া যায়। গ্রাহক: ব্যস্ততার জন্য যারা গাড়ী পরিষ্কার করতে পারেন না তারা গাড়ী পরিষ্কার করার জন্য গাড়ী ধোয়ার প্রতিষ্ঠান গুলোতে এসে থাকেন। বিশেষ করে প্রাইভেট গাড়ীর মালিক গণ এই ব্যবসার প্রধান গ্রাহক।

যোগ্যতা: এই ব্যবসাটি শুরু করার জন্য বিশেষ কোন দক্ষতার প্রয়োজন পড়ে না। চাইলে যে কেউ কোন গাড়ী ধোয়ার প্রতিষ্ঠান থেকে ২/৩ দিনের প্রশিক্ষণ নিয়ে এই ব্যবসাটি শুরু করতে পারেন। সাবধানতা: গাড়ী ধোয়ার সময় অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে যেনো কোন ভাবেই গাড়ীতে কোন প্রকার দাগ না লাগে। সাবধানতার সাথে গাড়ীর সামনের কাচ ও লুকিং গ্লাস ধৌত করতে হবে। সম্ভাব্য আয়: গাড়ী ধোয়ার ব্যবসাটি শুরু করে মাসিক ২৫০০০ থেকে ৪০০০০ টাকা আয় করা সম্ভব।

তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট।

টয়োটার জ্বালানি সাশ্রয়ী হাইব্রিড গাড়ি মাত্র ১১ লাখ টাকায়!

টয়োটা অ্যাকুয়া হাইব্রিড। দেশের বাজারে পাওয়া যাচ্ছে টয়োটার জ্বালানি সাশ্রয়ী হাইব্রিড কার। এটি একটি রিকন্ডিশন কার। এতে হাইব্রিড সিনারজি ড্রাইভিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। গাড়িটি জ্বালানির পাশাপাশি ব্যাটারিওতেও চলে। ফলে জ্বালানি সাশ্রয় হয়।

পরিবেশবান্ধব এই গাড়িটি ২০১৩ সালের মডেল। এটি ২০১৪ এবং ২০১৫ সালের মডেলেও পাওয়া যাচ্ছে। মডেলেভেদে এবং গ্রেডভেদে এর দাম ভিন্ন হয়। তবে ২০১৩ সালের মডেল পাওয়া যাচ্ছে ১১ লাখ টাকায়। জাপানে জনপ্রিয় এই মডেলটি বাংলাদেশের বাজারে ও জনপ্রিয়তা পেয়েছে। নগরের রাস্তায় এই গাড়ির দেখা মেলে।

টয়োটা অ্যাকুয়া হাইব্রিড গাড়িতে আছে ১৪৯৬ সিসির ইঞ্জিন। এতে ৪ সিলিন্ডার ওয়াটার কুলড ডিওএইচসি ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়েছে। প্রোট্রেল ই ইলেকট্রিক ড্রাইভেন গাড়িটি ৭২ বিএইচপি শক্তি উৎপাদন করতে পারে।

এর ম্যাক্স টর্ক ১১১ এনএম। টপস্পিড ১৮০ কিলোমিটার। ই-সিভিট ট্রান্সমিশন সমৃদ্ধ গাড়িটি ফ্রন্ট হুইল ড্রাইভ। বেশ কয়েকটি রঙে বাংলাদেশের বাজারে গাড়িটি পাওয়া যাচ্ছে। এর ডিজাইন দুর্দান্ত। ছোট খাটো আকৃতির গাড়িটি ফাইভ সিটার বা পাচঁজন বসতে পারে। টয়োটা দাবি করছে গাড়িটিতে ২০ কিলোমিটার মাইলেজ পাওয়া যাবে। লো মেইনট্যান্সের এই গাড়িতে ফুয়েল ট্যাংকের পাশাপাশি ব্যাটারি রয়েছে। গাড়ির ইঞ্জিন চালু থাকা অবস্থায় ব্যাটারি চার্জ হয়।

হাইব্রিড গাড়ি চলার জন্য প্রাথমিক শক্তি হিসেবে হাইব্রিড ব্যাটারি এবং দ্বিতীয় শক্তি হিসেবে জ্বালানি তেল ব্যবহৃত হয়। ব্যাটারির চার্জ যদি শেষ হয়ে যায় সেক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইঞ্জিন চালু হয়। ব্যাটারির শক্তি গাড়ির জন্য যথেষ্ট না হলে হাইব্রিড ব্যাটারি এবং ইঞ্জিন যৌথভাবে শক্তি উৎপাদন করে এবং গাড়ির চাকাকে গতিশীল রাখে। ব্যাটারি চাকার ঘূর্ণন গতি এবং ইঞ্জিনের পরিত্যক্ত কর্মশক্তি থেকে চার্জ সংগ্রহ করে। এভাবেই হাইব্রিড গাড়ি পরিচালিত হয়।

হাইব্রিড গাড়ির সুবিধা প্রসঙ্গে কথা বলেন মেভেন অটোস এর স্বত্ত্বাধিকারী মো. আশফাকুর রহমান। তিনি বলেন, হাইব্রিড গাড়িতে একই সঙ্গে ফুয়েল এবং ব্যাটারির শক্তি ব্যবহৃত হয়। যা ফুয়েল খরচকে অর্ধেকে নামিয়ে আনে। গাড়ির শক্তি বা কার্যক্ষমতাকে হ্রাস না করে যে সুবিধা হাইব্রিড গাড়ি প্রদান করে তা সাধারণ গাড়ি দিতে পারে না। হাইব্রিড গাড়ির মূল্য সাধারণ গাড়ি থেকে বেশি হলেও গাড়িতে ব্যবহৃত জ্বালানির খরচের সঙ্গে তুলনা করলে হাইব্রিড গাড়ি বেশ সাশ্রয়ী।

কীভাবে হাইব্রিড গাড়ি কাজ করে? এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, হাইব্রিড গাড়িতে জ্বালানি এবং ব্যাটারি শক্তি ব্যবহৃত হয়। ইঞ্জিন যখন জ্বালানিতে চলে, তখন ব্যাটারি ইঞ্জিনের পরিত্যক্ত শক্তি সংগ্রহ করে। আবার চাকা ঘুরলে (যেমন; উইন্ডমিল) যে ঘূর্ণন শক্তি উৎপাদন হয় তা থেকেও ব্যাটারি শক্তি পায়।

আর যখনি ব্যাটারি পরিপূর্ণ বা আংশিক চার্জ হচ্ছে তখন ইঞ্জিন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে ব্যাটারির শক্তিতে গাড়ি চলতে থাকে। তবে এসব পরিবর্তন গাড়ি নিজে থেকেই করে। এজন্য আলাদা কোন সুইচ চাপতে হয় না। গাড়ি নিজের প্রয়োজনে ব্যাটারি বা ফুয়েলকে জ্বালানি শক্তি হিসেবে ব্যবহার করে।

হাইব্রিড গাড়ি যেহেতু অটোমোবাইল নির্মাতা প্রতিষ্ঠান থেকেই প্রস্তুত হয়ে আসে, সেহেতু পৃথিবীর নামকরা গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বুঝে শুনেই এসব গাড়ি নির্মাণ করে। তাই এ গাড়ি সিএনজিতে রুপান্তর করা গাড়ির চেয়েও অনেক নিরাপদ এবং কার্যকরী। খরচও কম। রিকন্ডিশনড গাড়িটির দাম মাত্র ১১ লাখ টাকা।

শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক: বাংলার বাঘ

শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, বাংলার পথে প্রান্তরজুড়ে কিংবদন্তি ছড়িয়ে আছে এই নেতার নামে। বালক শেরে বাংলা একবার পড়ে বই ছিড়ে ফেলতেন, কুমিরভরা খরস্রোতা নদী সাঁতরে পাড়ি দিতেন। তবে এই কিংবদন্তি আর লোকমুখে প্রচলিত অর্ধসত্য গল্পের বাইরেও শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ছিলেন এক বিশাল ব্যক্তিত্ব, তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা আর দূরদর্শিতা ছিল অপরিসীম। বাংলা আর বাঙালির জন্য চিন্তা করেছেন এমন নেতার তালিকায় শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের নাম রাখতে হবে সবার সামনের সারিতে।

কলকাতার আইন পাড়ার খ্যাতিমান আইনজীবী ফজলুল হক একদম গোঁড়া থেকে রাজনীতিও ভালোই রপ্ত করেছিলেন। তার যখন রাজনীতিতে হাতেখড়ি কলকাতা তখন বাংলা তো বটেই সর্বভারতীয় রাজনীতিরই কেন্দ্রবিন্দু। ১৯০৬ সালে মুসলিম লিগের পথচলার শুরু থেকেই ফজলুল হক ছিলেন এই দলের সাথে। ১৯১৬ থেকে ১৯২১ সাল পর্যন্ত তিনি নিখিল ভারত মুসলিম লিগের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। কংগ্রেসের সাথেও ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলেন তিনি। সর্বভারতীয় রাজনীতির সাথে গ্রাম বাংলার মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের কথাও চিন্তা করছিলেন। তাই ধীরে ধীরে তিনি বুঝতে পারেন- গ্রাম বাংলার মানুষের মুক্তির পথ অন্য জায়গায়, কলকাতায় বসে সভা সেমিনার করে বক্তৃতায় আগুন ঢেলে দিলে সাধারণ মানুষের শোষণ থেকে মুক্তি হবে না।

কৃষিভিত্তিক বাংলার প্রাণ ছিল রক্ত-ঘাম ঝরিয়ে ফসল ফলানো কৃষকেরা। কিন্তু তাদেরকে প্রতিনিয়ত শোষণ করে ফুলে ফেঁপে উঠেছে একদল জমিদার আর মহাজন। মুসলিম লিগের প্রথম সারির নেতারা নিজেরাই জমিদারীর ঝাণ্ডাবাহক, তাই তারা জমিদারী উচ্ছেদ করে সাধারণ প্রজাদের মুক্তি দেবে এমনটা কল্পনা করাও দুঃসাধ্য ব্যাপার। তাই জমিদারী উচ্ছেদে তাকেই আলাদা করে যুদ্ধে নামতে হবে। বিভিন্ন জেলায় ইতোমধ্যে প্রজাদের আন্দোলন শুরু হয়ে গিয়েছিল। সেগুলোকে সংগঠিত করে যোগাযোগ স্থাপন করার কাজটি হাতে নিলেন হক সাহেব। পূর্ব বাংলার আর দশজন নেতার চেয়ে হক সাহেবের রাজনীতির মৌলিক পরিবর্তনের সূচনা এখানেই।

১৯২১ সালে গৌরনদীতে প্রজা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। প্রজা আন্দোলনকে সফল আর সংগঠিত করতে এক জেলা থেকে আরেক জেলায় যাতায়াত শুরু করেন ফজলুল হক। বিভিন্ন জেলায় থাকা প্রজা আন্দোলনের নেতাদের সাথে যোগাযোগ শুরু করেন। ১৯২৬ সালে ঢাকার অদূরে মানিকগঞ্জে দেনার দায়ে কৃষকদের জমি কেড়ে নেয় জমিদার আর মহাজনেরা। এই ঘটনা খুব একটা নতুন ছিল না তখনের মানুষের জন্য। তবে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ থেকেই কৃষকদের মাঝে অসন্তোষ রূপ নেয় বিক্ষোভে। এই ব্যাপারটিকে নিয়মতান্ত্রিক প্রতিবাদের উপায়ে আনতে ডাক দেওয়া হয় প্রজা সম্মেলনের।

মানিকগঞ্জের মহকুমার ঘীওর হাটের প্রজা সম্মেলনে সভাপতিত্ব করার জন্য আহ্বান জানানো হয় ফজলুল হককে। সেখান থেকেই অত্যাচারী মহাজনদের বিরুদ্ধে প্রকারান্তরে অসহযোগের ডাক দেন তিনি। তিনি বলেন,

দয়া করে জমি যখন নিয়েছে, এবার কর্তারা লাঙ্গল চষুক মাঠে নেমে। ফসল বুনুক, ফসল ফলাক, ফসল কাটুক।

এই ঘটনার পর আন্দোলন প্রায় এক বছর চলে, প্রান্তিক কৃষকরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এই আন্দোলনে। তবে এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় সফলতা জমিদার মহাজনেরাই নতি স্বীকার করে, তারা জমি ফেরত দিয়ে কৃষকদের সাথে মিটমাট করে। এই ঘটনায় অনুপ্রাণিত হয়ে ফজলুল হক এই আন্দোলনকে রাজনৈতিক রূপ দেওয়ার চিন্তা শুরু করেন। ১৯২৭ সালে ‘নিখিল বঙ্গ কৃষক প্রজা সমিতি’ নামে নামে রাজনৈতিক দলের যাত্রা শুরু হয়। তিনি দলের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন। হক সাহেবের বিশাল ব্যক্তিত্ব আর বাগ্মিতার কারণেই দলটি জনপ্রিয় হতে থাকে।

ফজলুল হক একই সাথে মুসলিম লিগেও তার স্থান ধরে রেখেছিলেন। মুসলিম লিগ দিয়ে তিনি সর্বভারতীয় রাজনীতির দরজা খোলা রেখেছিলেন। কিন্তু মুসলিম লিগের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ সর্বাদাই ছিল যে এটি নাইট-নবাবদের দল। ইংরেজদের কাছাকাছি থাকা প্রতিপত্তি সম্পন্ন, বনেদী মুসলমান পরিবারগুলোতে মুসলিম লিগের ছিল শক্ত ঘাঁটি। এই বলয়ে সমাজের একদম তৃণমূল থেকে উঠে আসা নেতা খুবই কম। আবার এই প্রভাবশালী দলটিকে যদি তার রাজনৈতিক বলয় ব্যবহার করে সারা ভারতের সাধারণ মুসলমানের জন্য কার্যকরী একটি সংস্থা করে তোলা যায় তাহলে মোটের উপর লাভ মুসলমানদেরই হবে। এই চিন্তা থেকেই ফজলুল হক একদম প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই মুসলিম লিগের সাথেই ছিলেন।

তবে বাংলার রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এক অদ্ভুত সমস্যারও সৃষ্টি হয়। মুসলিম লিগ আর কৃষক প্রজা পার্টি উভয়েরই কর্মী আর সমর্থকদের একটি বড় অংশ ছিল মুসলমান তরুণ সমাজ। তাই নির্বাচনে মুসলমানদের ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ার সম্ভবনা থেকেই মুসলিম লিগ আর কৃষক প্রজা পার্টির মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এছাড়াও বাংলার প্রভাবশালী মুসলিম লিগ নেতাদের অনেকেরই নিজেদের জমিদারী-জোতদারি ছিল, কৃষক প্রজা পার্টি তার সেই স্বার্থেও কুঠারাঘাত করেছিল। তাই মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ আর ফজলুল হকের মধ্যে মুসলিম লিগের অভ্যন্তরীণ উত্তাপও বাড়তে থাকে।

সেই উত্তাপ থেকেই ১৯৩৬ সালের নির্বাচনে মুসলিম লিগ আর কৃষক প্রজা পার্টির মধ্যে সমঝোতা হয়নি। কৃষক প্রজা পার্টি নিয়ে ফজলুল হক আর জিন্নাহর নেতৃত্বে মুসলিম লিগ একে অপরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায়। বরিশাল জেলার পটুয়াখালী আসনে থেকে ঢাকার নবাব বংশের প্রভাবশালী মুসলিম লিগ নেতা খাজা নাজিমুদ্দীনের জমিদারি। সেখান থেকেই ফজলুল হক আর নাজিমুদ্দীনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছিল ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে। ফজলুল হকের কাছে নাজিমুদ্দীন পরাজিত হয়েছিলেন বড় ব্যবধানে। ১৯৩৭ সালে বাংলায় মুসলিম লিগ আর কৃষক প্রজার এই লড়াই বাংলার বেশ বড় আলোড়ন তৈরি করে। সাধারণ মানুষের কাছে ফজলুল হক এবং তার দলের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ ছিল জমিদারি উচ্ছেদ, জোতদার-মহাজনদের অত্যাচার কমিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি।

নির্বাচনের ফলাফলে কৃষক প্রজা পার্টি সুবিধাজনক অবস্থানে চলে আসে। প্রথমেই কৃষক প্রজা পার্টি কংগ্রেসের সাথে কোয়ালিশনের চেষ্টা করে, কিন্তু অল্পের জন্য তা ভেস্তে যায়। বাধ্য হয়েই মুসলিম লিগের সাথে আলোচনায় শুরু করেন ফজলুল হক। শেষ পর্যন্ত মুসলিম লিগের সাথে কোয়ালিশনে যেতে হয় কৃষক প্রজা পার্টিকে। মুসলিম লিগের সাথে যুক্ত হয়ে মুসলিম লিগের অদূরদর্শী কাজের ভার ফজলুল হকের কাঁধেই চলে আসে। এই মন্ত্রীসভায় স্থান পান প্রভাবশালী মুসলিম লিগের প্রভাবশালী নাইট নবাবরা। ইংরেজ শাসকদের সাথে তাদের আতাতের ফলে কৃষক প্রজা পার্টির নিজেদের ইশতেহার বাস্তবায়নের সুযোগ কমে আসে, জমিদারি উচ্ছেদ থেকে শুরু করে মহাজন-জোতদার শ্রেণীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা ফজলুল হকের জন্য কঠিন হয়ে যায়। নির্বাচনের সময় ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করেও মন্ত্রীসভা গঠনের পর কৃষক প্রজা পার্টির সমর্থন কমতে থাকে সাধারণ মানুষের মধ্যে।

তবে এই ঘটনার দায় অনেকেই চাপান বাংলার কংগ্রেস নেতাদের ঘাড়ে। বাংলার কংগ্রেস নেতারা কৃষক প্রজা পার্টিকে সুযোগ করে দিলে পুরো পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে অন্য রকম হাওয়া বইতো। কিন্তু সেই সমঝোতা না হওয়ায় ফজলুল হকের মতো প্রভাবশালী নেতাও আবার মুসলিম লিগের কাছে বন্দী হয়ে যান। তবে অনেক বাঁধা বিপত্তির মাঝেও ফজলুল হক বাংলার কৃষকদের জন্য ১৯৩৮ সালে ‘ঋণ সালিশি বোর্ড’ গঠন করেন, ১৯৩৯ সালে প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৪০ সালের মহাজনী আইন পাশ হয়। তার উদ্যোগেই শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার শুরু হয়, বাংলার মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় স্কুল-কলেজের সংস্কার, হোস্টেল নির্মাণের কাজ শুরু করেন। প্রাথমিক শিক্ষাকে অবৈতনিক এবং বাধ্যতামূলক করার জন্য বিল পাস করেন। কলকাতা কর্পোরেশনের আইনে সংশোধন করে আলাদা নির্বাচন প্রবর্তন, মাধ্যমিক শিক্ষা বিল নিয়েও কাজ শুরু হয়।

সর্বভারতীয় রাজনীতিতেও তখন উত্তাপ বাড়ছে, মুসলমানদের জন্য আলাদা দেশের দাবি নিয়ে উত্তাল সারা ভারত। মুসলিম লিগের লাহোর অধিবেশনে ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ ফজলুল হক ইতিহাস বিখ্যাত ‘লাহোর প্রস্তাব’ উপস্থাপন করেন। ২৩ মার্চ জিন্নাহর সভাপতিত্বে লিগের অধিবেশন শুরু হয়। জিন্নাহ বরাবরের মতোই তার দ্বিজাতিতত্ত্বের বিভিন্ন দিক ব্যাখ্যা করেন। কেন মুসলমানদের আলাদা আবাসভূমি দরকার তা-ও ব্যাখ্যা করেন। বিকেলে ফজলুল হক যখন তার ঐতিহাসিক প্রস্তাব উত্থাপনের জন্য মঞ্চে আসেন তখন সবাই উঠে দাঁড়িয়ে ‘শের-ই-বাঙ্গাল’ বলে অভিবাদন জানায়। শেরে বাংলার লাহোর প্রস্তাবে একাধিক মুসলিম রাষ্ট্রের রুপরেখা ছিল, যা ক্রমান্বয়ে বদলে একটিতে পরিণত হয়।

শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের গ্রহণযোগ্যতার ধারেকাছেও বাংলায় কেউ ছিলেন না। বাংলার অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক গুরুত্ব তিনি খুব ভালো করেই বুঝতেন। শেরে বাংলা ফজলুল হক তাই জোর দিয়ে বলেছিলেন,

পলিটিকস অব বেঙ্গল ইজ ইন রিয়েলিটি ইকনমিক্স অফ বেঙ্গল।

তবে শেষ পর্যন্ত বাংলা আর বাঙালির শেষরক্ষা হয়নি, বাংলাকে ভাগ করার পক্ষে সায় ছিল না শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের। হিন্দু-মুসলমান রব তুলে বাঙালি পরিচয়টাকেই সর্বভারতীয় নেতারা শিকেয় তুলে রাখছেন। বাঙালি জাতির যে রক্তক্ষরণ হচ্ছে তা ভেতরে ভেতরে ঠিকই টের পাচ্ছিলেন শেরে বাংলা একে ফজলুল হক। আর বাঙালি যদি ফজলুল হককে সঠিক মূল্যায়ন করতে না পারে এর জন্য তাদেরকে ভুগতে হবে অনেকদিন- এমন ভবিষ্যদ্বাণী করে গিয়েছিলেন ফজলুল হকের শিক্ষক আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়। তিনি বলেছিলেন,

আমি কংগ্রেসীদের ভারতীয় জাতীয়তা বুঝি না, আমি বুঝি বাঙালির জাতীয়তা। এ জাতীয়তা প্রতিষ্ঠা করতে পারে একমাত্র ফজলুল হক। ফজলুল হক মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত খাঁটি বাঙালি। সেই সঙ্গে ফজলুল হক মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত খাঁটি মুসলমান। খাঁটি বাঙালি আর খাঁটি মুসলমানের এমন অপূর্ব সমন্বয় আমি আর দেখি নাই। ফজলুল হক আমার ছাত্র বলে ঐ কথা বলছি না। সত্য বলেই এ কথা বলছি। খাঁটি বাঙালিত্ব আর খাঁটি মুসলমানত্বের সমন্বয়ই ভবিষ্যৎ বাঙালির জাতীয়তা। ফজলুল হক ঐ সমন্বয়ের প্রতীক। ঐ প্রতীক তোমরা ভেঙো না। ফজলুল হকের অমর্যাদা তোমরা করো না। আমি বলছি, বাঙালি যদি ফজলুল হকের মর্যাদা না দেয়, তবে বাঙালির বরাতে দুঃখ আছে।

তবে বাঙালির আশা ভরসা আর জাতীয়তাবাদের প্রতীক ফজলুল হকের মন্ত্রীসভার পতন ঘটে ১৯৪১ সালের ডিসেম্বর মাসের শুরুতে।

মুসলিম লিগকে বাদ দিয়ে এবার ফজলুল হক হিন্দু মহাসভা, কৃষক প্রজা পার্টি আর কংগ্রেসের সুভাষপন্থী অংশকে নিয়ে মন্ত্রীসভা গঠন করেন। হিন্দু মহাসভার সাথে জোট করে মন্ত্রীসভা গঠন করায় রাজনীতি সচেতন তরুণ মুসলমান সমাজের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। মুসলিম লিগ এই মন্ত্রীসভাকে ‘শ্যামা-হক’ মন্ত্রীসভা নাম দেয়। যদিও এই মন্ত্রীসভার একজন অর্থাৎ শ্যামাপ্রসাদই ছিলেন হিন্দু মহাসভার মন্ত্রী। মুসলিম লিগের লক্ষ্যই ছিল হক সাহেবকে রাজনীতি থেকে দূরে ঠেলে দেওয়া। ২৮ মার্চ ১৯৪৩ সালে দ্বিতীয় হক মন্ত্রীসভার পতন ঘটে। বাংলার রাজনীতির মঞ্চে মুসলিম লিগের সোহরাওয়ার্দী আর খাজা নাজিমুদ্দিন হয়ে ওঠেন মুখ্য চরিত্র। হক সাহেব জনপ্রিয়তার দৌড়ে পেছনে না পড়লেও বয়সের দৌড়ে পেছনে পড়ে যান। পাকিস্তান আসলে জমিদারি উচ্ছেদ করা হবে, মানুষের অধিকার আদায় হবে এই রবে মুখরিত গ্রামগঞ্জ আর শহর। আপামর পূর্ব বাংলার মুসলমান বাঙালিরা তাই পাকিস্তান আদায়ের উন্মাদনায় মগ্ন।

পাকিস্তান আদায়ে হয়েছিল, কিন্তু সেই সাথে বাংলাকে কেটে দু’ভাগ করা হলো। ফজলুল হকের এই নিয়ে মনে কষ্ট ছিল, মুখে বলে বেড়াতেন না। যে শহরে তার আইন ব্যবসা আর রাজনীতির অগ্নিঝরা দিনগুলো কেটে গিয়েছে, সেই শহর অন্য দেশে ভাবতেও হয়তো কষ্ট লাগতো সাবেক এই মুখ্যমন্ত্রীর।

১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত শেরে বাংলা রাজনৈতিকভাবে বেশ নিষ্ক্রিয় ছিলেন। ঢাকায় স্থায়ী হয়ে আইন ব্যবসা দেখাশোনা শুরু করেন তিনি। এই সময় তিনি পূর্ব পাকিস্তানের এডভোকেট জেনারেলের দায়িত্বও পালন করেন। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের পরে শেরে বাংলা একে ফজলুল হক নতুন করে রাজনীতি নিয়ে ভাবতে শুরু করেন। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য আওয়ামী লিগের সাথে যুক্ত হয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠনের সময় তিনি ছিলেন সামনের সারিতেই। নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রীসভায় আবারো মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে পূর্ব বাংলার দায়িত্ব নেন শেরে বাংলা, তৃতীয়বারের মতো বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসেছিলেন তিনি। তিনবারই তার দল সংখ্যানুপাতিক হারে কম আসন জিতলেও মুখ্যমন্ত্রীর পদটি সবাই শেরে বাংলা একে ফজলুল হককেই ছেড়ে দিয়েছেন, দল-মত ছাপিয়ে তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ছিল আকাশচুম্বী। যদিও যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রীসভাও বেশিদিন টিকেনি। পাকিস্তান সরকারের নানাধরনের ছলাকলার শিকার হয়ে এই মন্ত্রীসভারও দ্রুত পতন হয়।

এরপর পাকিস্তানের রাজনীতিতে জল ঘোলা হয়েছে অনেক, যার অনেককিছুই শেরে বাংলার ব্যক্তিগত পছন্দ ছিল না। রাজনীতি থেকে দূরে সরে থাকার চেষ্টা করেছেন অনেকবার, কিন্তু রাজনীতি তাকে জড়িয়ে রেখেছে চারপাশ থেকে। ১৯৫৫ সালে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় তাকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ নিতে আহ্বান জানানো হয়, ১৯৫৬ সালে তাকে করা হয় পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর। কিন্তু সেই পদও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ১৯৫৮ সালে অভ্যুত্থানে তাকে গৃহবন্দি করা হয়। বয়সের ভারে আর শারীরিক অসুস্থতার কারণে শেরে বাংলাও রাজনীতি থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন অনেকটাই।

১৯৬২ সালের ২৭ এপ্রিল এক মহীরুহের পতন হয়, বাংলার রাজনীতিতে প্রায় অধর্শতাব্দী ধরে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন এই নেতা, হুট করেই তিনি চলে গেলেন সবকিছু ফেলে। তার প্রস্তাবের খুঁটি ধরে দাঁড়িয়ে থাকা দেশ পাকিস্তান তখন ভালো নেই, সেখানে সামরিক শাসকদের কালো ছায়া। তারপর অনেক রোদ, বৃষ্টি আর ঝড়ে সময় পেরিয়ে গেছে, শেরে বাংলার সাধের বাংলার যে টুকরোটি পূর্ব পাকিস্তান হয়েছিল তা সময়ের ফেরে দাঁড়িয়েছে ‘বাংলাদেশ’-এ এসে। গড়িয়েছে অনেক রক্ত, তার রেখে যাওয়া সৈনিকেরা সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে মুক্তি সংগ্রামের।

স্বাধীন বাংলাদেশে শেরে বাংলার নামের ফলক, ম্যুরাল আর ছবিতে ছেয়ে আছে অনেকখানি জায়গা। রাজধানী ঢাকার পিচঢালা পথের পাশে সবুজ ঘাসের বিছানায় জীবনের প্রধান দুই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী খাজা নাজিমুদ্দীন আর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে চোখ বুজে শুয়ে আছেন বাংলার কৃষক-প্রজাদের নেতা, বাংলার বাঘ আবুল কাশেম ফজলুল হক।

This article is about Sher-e-Bangla A. K. Fazlul Huq, the most prominent leader in Bengal politics. 

তথ্যসূত্রঃ

১. পাকিস্তান প্রস্তাব ও ফজলুল হক; অমলেন্দু দে;  পারুল প্রকাশনী

২. আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর; আবুল মনসুর আহমদ; প্রথমা প্রকাশন

সমান নয়, কানাডা-ইউরোপকে ছাড়িয়ে বাংলাদেশ!

গোলাম মোর্তোজা: ঢাকাকে সিঙ্গাপুর বানানো হবে, গত কয়েক বছরে আমাদের মেয়ররা একথা বারবার বলেছেন। ঢাকার পাবলিক টয়লেটগুলো ফাইভ স্টার হোটেলের টয়লেটগুলোর মতো হয়ে গেছে, জানিয়েছেন ঢাকা উত্তরের মেয়র। অর্থমন্ত্রী বলছেন, বিশ্ব অর্থনীতিতে অবদান রাখার সূচকে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ কানাডার সমান হয়ে যাবে। এক বছরের মধ্যে স্পেন, থাইল্যান্ডের সমান হয়ে যাবে।

বিস্ময়কর-কৌতূহল উদ্দীপক এসব সংবাদ জেনে, বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে উৎফুল্লচিত্তে আনন্দিত না হওয়ার কারণ দেখি না। কানাডায় যাওয়ার জন্যে বাংলাদেশের মানুষ দশ-পনেরো লাখ টাকা খরচ করতেও রাজি থাকে। সেখানে যদি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সক্ষমতা কানাডার সমান হয়ে যায়, তার চেয়ে গর্বের আর কিছু হতে পারে না।

তো সে জন্যে আরও কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হবে। আমরা সেই দিনের জন্যে অপেক্ষা করি আর কানাডাসহ বিশ্ব অর্থনীতির শক্তিশালী কিছু দেশের মানুষের আয়-ব্যয় তথা জীবনযাপন সম্পর্কে একটু ধারণা নেওয়ার চেষ্টা করে দেখি।

কানাডাসহ উন্নত দেশগুলো নাগরিকের নিত্য-প্রয়োজনীয় ও সুস্থ মানসিক বিকাশের জন্যে অপরিহার্য উপাদানগুলোকে প্রায় মৌলিক অধিকারের সমান গুরুত্ব দিয়ে থাকে। মাংস, দুধ, ডিম- যাতে সব মানুষ নিয়মিত গ্রহণ করতে পারেন- সেদিকে নজর রাখে।

কানাডা, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, সুইজারল্যান্ড, ইংল্যান্ড, জার্মানি, ইতালি, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুরের মতো ধনী এবং পাশের দেশ ভারত এক্ষেত্রে কী করে, তা জানার চেষ্টা করে দেখি। তাহলে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি কেমন এবং কানাডার সমান হয়ে যাওয়ার পড়ে কেমন হবে বা হতে পারে, একটা ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

প্রথমে বাংলাদেশের বাজারে এসব জিনিসের দাম ও মান সম্পর্কে ধারণা নেওয়া যাক।

বাংলাদেশে এক কেজি গরুর মাংসের দাম ৫২৫ টাকা নির্ধারণ করা হলেও, প্রায় সবখানেই বিক্রি হচ্ছে ৬০০ টাকা বা তারও বেশি দামে। এক কেজি প্যাকেট দুধের দাম ৭০ টাকা। গরুর ফ্রেশ দুধ ৮০ থেকে ১০০ টাকা লিটার। এক ডজন ডিমের দাম ১০০ থেকে ১১০ টাকা। এক লিটার সয়াবিন তেল ১০০ থেকে ১১০ টাকা। বাংলাদেশে ন্যূনতম মজুরি মাসে (পোশাক শ্রমিক) ৮ হাজার টাকা। বিশ্ব ব্যাংকের ২০১৭ সালের হিসাব অনুযায়ী গড় আয় ১ হাজার ৫০০ ডলার। বর্তমানে যা বলা হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৯০০ ডলার।

বিশ্ব অর্থনীতিতে যে কানাডার সমান অবদান রাখার সক্ষমতা অর্জন করবে বাংলাদেশ, সেই কানাডার টরেন্টো থেকে লেখক-সাংবাদিক জসিম মল্লিক সূত্রে জানলাম, সেখানে এক কেজি গরুর মাংসের দাম ৪ ডলার। বাংলাদেশি টাকায় যা ২৫৬ টাকা। এক লিটার দুধের দাম বাংলাদেশি টাকায় ৮৫ টাকা।

কানাডার সর্বনিম্ন মজুরি প্রতি ঘণ্টায় ১৪ দশমিক ৮৫ ডলার। বাংলাদেশি টাকায় যা ৯৫০ টাকা, দিনে ৭ হাজার ৬০০ টাকা, মাসে ২ লাখ ২৮ হাজার টাকা। মাথাপিছু আয় বিশ্বব্যাংকের ২০১৭ সালের হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৪৫ হাজার ডলার।

নিউইয়র্ক থেকে সাংবাদিক নিহার সিদ্দিকী জানালেন, সেখানে এক কেজি গরুর মাংসের দাম ৫০০ টাকা। ডিমের ডজন ১৬০ টাকা। এক লিটার সয়াবিন তেল ১০০ টাকা। দুধের লিটার ৬৫ টাকা। আমেরিকানদের মাথাপিছু আয় প্রায় ৬০ হাজার ডলার।

অস্ট্রেলিয়ার সিডনি থেকে লেখক-সাংবাদিক আকিদুল ইসলাম জানালেন, সেখানে এক লিটার দুধের দাম বাংলাদেশি টাকায় ৬১ টাকা। এক কেজি গরুর মাংসের দাম ৪৮৮ টাকা। ডিমের ডজন ২৪৪ টাকা। ন্যূনতম মজুরি প্রতি ঘণ্টায় ২৫ ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় ১ হাজার ৫২৫ টাকা। দিনে ১২ হাজার টাকা, মাসে ৩ লাখ ৬৬ হাজার টাকা একজন শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি। অস্ট্রেলিয়ানদের মাথাপিছু আয় প্রায় ৫৪ হাজার ডলার।

ইউরোপের অন্যতম ধনী দেশ সুইজারল্যান্ড থেকে সাংবাদিক বাকি উল্লাহ জানালেন, সেখানে এক কেজি গরুর মাংসের দাম ৬০০ টাকা। ৫০ থেকে ৬৫ টাকা এক লিটার দুধের দাম। এক ডজন ডিমের দাম ১৮০ টাকা। সুইজারল্যান্ড সীমান্ত পার হয়ে জার্মানিতে ঢুকলে সব জিনিসের দাম অর্ধেক। সুইজারল্যান্ডের ন্যূনতম মজুরি প্রতি ঘণ্টায় ৮ দশমিক ১ ফ্রাঙ্ক, যা বাংলাদেশি টাকায় ৬৬৫ টাকা; দিনে ৫ হাজার ৩২০ টাকা, মাসে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। মাথাপিছু আয় প্রায় ৮০ হাজার ডলার।

জার্মানির অভিজাত শহর বন থেকে রূপচর্চা বিশেষজ্ঞ রোজী ভূঁইয়া জানালেন, সেখানে এক লিটার দুধের দাম বাংলাদেশের হিসাবে ৬০ টাকা। এক ডজন ডিম ৬৫ থেকে ৭০ টাকা। রান্নার তেল ৯০ থেকে ৯৫ টাকা লিটার। জার্মানির মাথাপিছু আয় প্রায় ৪৭ হাজার ডলার।

লন্ডন থেকে সাংবাদিক শেখ মোহিতুর রহমান বাবলু’র সূত্রে জানলাম, গরুর মাংসের কেজি ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা। এক ডজন ডিম ৯০ টাকা। রান্নার তেল ১০০ থেকে ১১০ টাকা লিটার। দুধের লিটার ৯০ টাকা। ন্যূনতম মজুরি প্রতি ঘণ্টায় ৯০০ টাকা; দিনে ৭ হাজার ২০০ টাকা। মাসে ২ লাখ ১৬ হাজার টাকা। মাথাপিছু আয় প্রায় ৪০ হাজার ডলার।

ইতালির ভেনিস থেকে সাংবাদিক পলাশ রহমান জানালেন, গরুর মাংসের কেজি ৫৫০ টাকা। এক লিটার দুধ ৫০ টাকা। ডিমের ডজন ১২০ টাকা। তেল ১০০ থেকে ১১০ টাকা লিটার। দেশটির মাথাপিছু আয় প্রায় ৩২ হাজার ডলার।

পৃথিবীর অন্যতম ব্যয়বহুল শহর এশিয়ার উন্নত দেশ জাপানের টোকিও। সেখান থেকে সাংবাদিক রাহমান মনি জানালেন, গরুর মাংসের কেজি ১ হাজার ২০০ টাকা। ডিমের ডজন ২০০ টাকা, দুধের লিটার ২০০ টাকা। ন্যূনতম মজুরি প্রতি ঘণ্টায় ১ হাজার ২০০ টাকা; দিনে ৯ হাজার ৬০০ টাকা, মাসে ২ লাখ ৮৮ হাজার টাকা। মাথাপিছু আয় প্রায় ৪০ হাজার ডলার।

এশিয়ার আরেক উন্নত দেশ দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল থেকে আইটি ব্যবসায়ী এমএন ইসলাম জানালেন, ডিমের ডজন ৯৫ টাকা, গরুর মাংস ৭৫০ টাকা কেজি, খাসির মাংস ৭১৫ টাকা কেজি, দুধের লিটার ১১৫ টাকা। মাসে একজন শ্রমিকের ন্যূনতম আয় ২ লাখ টাকার উপরে।

এশিয়ার আরেক ধনী দেশ সিঙ্গাপুর থেকে ব্যবসায়ী মাসুদুর রহমান জানালেন, সিঙ্গাপুরে তো প্রায় সব জিনিসই আমদানি করা। এখানে ফ্রোজেন গরুর মাংসের কেজি ৫৫৮ টাকা। এক ডজন ডিম ১০৮ টাকা। ন্যূনতম মজুরি দিনে ৪ হাজার এবং মাসে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। সিঙ্গাপুরের মাথাপিছু আয় প্রায় ৫৮ হাজার ডলার।

পাশের দেশ ভারতের চিত্রটা দেখে নেওয়া যাক। কলকাতা থেকে সাংবাদিক প্রতীম রঞ্জন বোস জানালেন, বাংলাদেশি টাকায় এক ডজন ডিমের দাম ৬০ টাকা। দুধের লিটার ৪৮ থেকে ৫০ টাকা। গরুর মাংসের কেজি ২১০ থেকে ২৪০ টাকা কেজি, খাসির মাংস ৭০০ থেকে ৭২০ টাকা কেজি। চাল ৪২ থেকে ৫০ টাকা কেজি। ভারতের ন্যূনতম মজুরি বাংলাদেশের চেয়ে বেশি। মাথাপিছু আয় প্রায় ২ হাজার ডলার।

কানাডার একজন শ্রমিক ঘণ্টায় আয় করেন ৭ হাজার ৬০০ টাকা, বাংলাদেশি শ্রমিকের ঘণ্টায় আয় ৩৩ টাকা, দিনে ২৬৭ টাকা। ঢাকার বাজারে এক কেজি পটলের দাম ৮০ টাকা।

কানাডার শ্রমিক দিনে ৮ ঘণ্টা কাজ করে মাসে আয় করেন ২ লাখ ২৮ হাজার টাকা। বাংলাদেশের শ্রমিকের মাসে আয় ৮ হাজার টাকা। তিনি দুই দিনের আয় দিয়েও এক কেজি গরুর মাংস কিনতে পারেন না। কৃষক এক মন ধান বিক্রির টাকা দিয়ে এক কেজি গরুর মাংস কিনতে পারেন না।

কানাডার শ্রমিক এক মাসের আয় দিয়ে একটি গাড়ি কিনতে পারেন।

মাংস, ডিম, দুধ খেতে না পারায় বাংলাদেশে অপরিণত শিশু জন্মহার সবচেয়ে বেশি- এ তথ্য জানিয়েছে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা। আয় এবং প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যে সমঞ্জস্য না থাকায় বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের সুস্থ-স্বাভাবিক মেধা বিকশিত হচ্ছে না। ভারতও মাংস, ডিম, দুধের দাম ক্রয় সীমার মধ্যে রেখেছে। চালের দামও ভারতের চেয়ে বাংলাদেশে কেজিতে ১৫ থেকে ২০ টাকা বেশি।

উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ এমনকী, ভারতেও পণ্যের মান নিয়ে প্রশ্ন নেই। বাংলাদেশে মানসম্পন্ন পণ্য পাওয়া প্রায় অসম্ভব।

কয়েকটি প্রশ্ন ও প্রত্যাশা।

বিশ্ব অর্থনীতিতে অবদান রাখার সূচকে বাংলাদেশ যেদিন কানাডার সমান হবে, সেদিন শ্রমিকের বেতন ২ লাখ ২৮ হাজার টাকা হবে? গরুর মাংসের কেজি ২৫৬ টাকা হবে? সব মানুষ ডিম, দুধ, সবজি, ভাত খেতে পারবেন? ভূমধ্যসাগরের বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের হারিয়ে যাওয়া বন্ধ হবে? ধানের মূল্য না পাওয়ায় কৃষকের আহাজারি বন্ধ হবে?

দাম এবং বৈষম্যে কানাডা বা ইউরোপের সমান নয়, বাংলাদেশ পৃথিবীর প্রায় সব দেশকে ছাড়িয়ে গেছে। সরকারের নীতি নির্ধারকরা প্রতিদিন কয়েকবার করে বলছেন, বাংলাদেশ এখন পৃথিবীর রোল মডেল। রোল মডেল বাংলাদেশ, কানাডা-স্পেন বা থাইল্যান্ডকে ছাড়িয়ে যাবে! দেশের মানুষের ১৯শ ডলারের মাথাপিছু আয়, ৪৫ হাজার ডলার হয়ে যাবে, অপেক্ষা তো মাত্র কয়েক বছরের!

[email protected]

ধীরে ধীরে কি আমরা ঠগবাজ জাতিতে পরিণত হচ্ছি?

উন্নত, অনুন্নত বিভিন্ন দেশ ঘুরার ভাগ্য হয়েছে। কিন্তু সত্যি বলতে কি বিশ্বের কোথাও এমন অবস্থা দেখিনি।

কিছুদিন আগে এক ভয়াবহ প্রতিবেদন দেখলাম। বিদেশ থেকে আমদানি করা শিশুখাদ্যের যেগুলো মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে, সেগুলো আবার নতুন করে লেবেলিং করে বাজারে ছাড়ছে!

যারা মায়ের দুধ পায় না, এমনিতেই সেসব বাচ্চা প্রাকৃতিক পুষ্টি থেকে বঞ্চিত থাকে। কত বেশি নিকৃষ্ট হলে মানুষ নিষ্পাপ বাচ্চাদের জন্য এরকম দুই নম্বরী কাজ করতে পারে!

গত সপ্তাহেই আরেকটা খবরে পড়লাম। মেয়াদ শেষ হওয়া পুষ্টি তেল আবার নতুন করে লেবেল পাল্টে মেয়াদ দিয়ে বাজারে ছাড়ছে। কিছুদিন আগে পাবনায় তীর কোম্পানির পাঁচ বছর আগের মেয়াদ শেষ হওয়া তেলে নতুন লেবেল লাগিয়ে বাজারে ছাড়ে।

রমজান মাস হল সংযমের মাস। অথচ এই মাসেই মানুষ দুর্নিতি করে বেশি। ব্যবসায়ীরা ভেজাল দিয়ে, সিন্ডিকেট করে পণ্যে দাম বাড়িয়ে, ঈদ বকশিসের নামে সন্ত্রাসীরা চাঁদাবাজি, অফিস কর্মচারীরা ঘুষ আদায় করে।

রমজানের শুরুতে চট্টগ্রামে নকল ট্যাং কোম্পানি জব্দ করা হয়। রঙ ও ক্ষতিকারক কেমিক্যাল মিশিয়ে এই নকল ট্যাং খেলে নানা রকম পাকস্থলী ও অন্ত্রের রোগ তো হবেই, এর সাথে ক্যান্সারও হবে।

সারাদিন না খেয়ে রোজা করার ফলে ইফতারে দরকার বিশুদ্ধ ও স্বাস্থ্যকর খাদ্য। অথচ দিনের পর দিন ফেলে রাখা ভাজা তেলেই সব ইফতার বানিয়ে বিক্রি করছে।

গতকাল ঢাকার গুলশানের এক অভিজাত রেস্তোরাঁয় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে ধরা পড়ে ছত্রাকে ঢাকা পুরাতন বাসি পঁচা মুরগী, মাছ, হাঁসের মাংশ, যা রাখা হয়েছিল খদ্দেরদের খাওয়ানোর জন্য।

অভিজাত রেস্তোরাঁতেই যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে বাকি রেস্তোরাঁ গুলোর অবস্থা সহজে অনুমেয়।

ইউরোপ আমেরিকায় বড়দিন উৎসবে, আরব বিশ্বে রমজান ও ঈদ উপলক্ষ্যে ছাড় দেয়, পন্যের দাম কমায়, আর আমাদের দেশে রমজান আসলেই প্রতিযোগিতা বাড়ে দাম বাড়ানোর। নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পন্যের দাম দেড় থেকে দুই গুণ বাড়ে, শপিং মল, মার্কেটের দোকানদাররাও পোশাক পরিচ্ছদ তিন চারগুণ দাম বাড়িয়ে বিক্রি করে।

বিদেশী কসমেটিকস এর নকলে বাজার সয়লাব। এমন কোন কসমেটিকস নেই যার নকল পাওয়া যায় না। এমনকি বাচ্চাদের কসমেটিকসও! এগুলো ত্বকের ক্ষতি করছে তো করছেই, এর সাথে নানা রকম চর্ম রোগ এমনকি স্কিন ক্যান্সার পর্যন্ত হচ্ছে।

দিন পাঁচেক আগে বিএসটিআই ৩১৩টি ভোগপণ্যের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করে, যেখানে বিভিন্ন নামীদামি প্রতিষ্ঠানের ৫২টি পণ্যই নিম্নমানের ও ভেজাল। এর মধ্যে তেল, মসলা, মসলার গুড়ো, লবণ ইত্যাদি রয়েছে।

মিল কারখানায় তো মরিচ গুড়া, হলুদ গুড়ার সাথে রঙ, কাঠের গুড়া মিশানো নিত্যদিনের ঘটনা।

ফল মানুষ খায় পুষ্টি পাওয়ার জন্য। অথচ নানা রকম ক্যামিকেল দিয়ে সংরক্ষণ করার কারণে পুষ্টি পাওয়ার বদলে উল্টো স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়ে।

দান, খয়রাত করতে যাবেন, খোজ নিয়ে জানা যাবে ভিক্ষুকের দোতলা বাড়ি আছে, কয়েক বিঘা জমি আছে। অনেকে ভুয়া বিকলাঙ্গ, অসুস্থ সেজে ভিক্ষায় লিপ্ত। শিশুদের চুরি করে নিয়ে এসে পাতিলের মধ্যে আটকে রেখে বিকলাঙ্গ করে ভিক্ষায় নামানো হচ্ছে। আবার ঘুমের ওষুধ খাইয়ে দিয়ে রাস্তায় শুয়ে রেখে টাকা আদায়ে ব্যস্ত।

অসুস্থ হলে যে ওষুধ খাবেন, সেখানেও রয়েছে ভেজাল ওষুধ সেবনের ভয়। অনেক নামীদামি কোম্পানির ওষুধ নকল করে, আবার মেয়াদ শেষ হওয়া ওষুধ সংগ্রহ করে লেবেল পাল্টে নতুন করে বাজারে ছাড়ে এক ধরণের অসৎ ব্যবসায়ী।

মোবাইল ক্লোন করে, ভুয়া বিকাশ এজেন্ট সেজে, জ্বিনের বাদশা সেজে প্রতারণা করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

ইলেকট্রনিক পন্য কিনবেন? সেখানেও সব নকল পন্য দিয়ে ভরা। এই জন্য চীনাদের দোষ দেয় অনেকে। আসলে তাদের দোষ নেই। তারা ব্যবসার ক্ষেত্রে সৎ। এদেশের ব্যবসায়ীরা যেরকম দাম ও মানের অর্ডার দেয়, তারা সেভাবেই বানিয়ে দেয়।

পীর ব্যবসা তো এদেশের এক নম্বর রমরমা ব্যবসা। বিনা পুজিতে মানুষের বিশ্বাস ও পাপের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে খানকা বানিয়ে কোটি কোটি টাকা আয় করছে৷ সেগুলোর কোন হিসাবও যেমন নেই, আয়করও দেওয়া হয় না। অনেক ভন্ড পীর আবার শুধু টাকা হাতিয়ে নিয়েও ক্ষ্যান্ত দেয় না, সুযোগ বুঝে নারী ভক্তদের ধর্ষণ পর্যন্ত করে।

জাতি হিসেবে ধীরে ধীরে অসুস্থ ও ঠগবাজ জাতিতে পরিণত হচ্ছি।

সবাই যে যেভাবে পারে এক অন্যকে ঠকাতে ব্যস্ত।

জানি না এর শেষ কোথায়! এর মধ্যেও যে সুস্থভাবে বেঁচে আছি এটাই আল্লাহর সবচেয়ে নেয়ামত।

৬৫০ টাকা কিস্তিতে কিনুন সুজুকি ব্রান্ডের গাড়ি!

বর্তমান সময়ে চলার পথে যানবাহনের প্রয়োজন পড়ে সবার। তবে গাড়ি কেনাটা অনেকের কাছেই বিলাসিতার বিষয় অনেকের সাধ্যের বাইরে। কারন এর অধিক মূল্য। তবে সেটি এখন মধ্যবিত্তেরও হাতের নাগালে এনে দিল সুজুকি। কম দাম সাথে সহজ কিস্তি।

আপনার চলার পথকে আরো সহজ, সাশ্রয়ী ও গতিশীল করতে সুজুকি আল্টো আছে আপনার সাথে। আকর্ষনীয় ও মনোমুগ্ধকর কয়েকটি কালারে গাড়িটি পাওয়া যাচ্ছে শোরুমগুলোতে। জ্বালানী সাশ্রয়ী এ গাড়িটি আপনার ভ্রমনে এনে দিবে অন্যরকম অনুভুতি।

মাত্র ৬/- টাকা খরচে (প্রতি কিলোমিটার) চলতে পারবেন নিশ্চিন্তে। গাড়িটি কিস্তিতে কিনতে মাত্র ২,৬৫,০০০/- টাকা ডাউনপেমেন্ট করতে হবে আপনাকে।

প্রতিদিন মাত্র৬৫০/- টাকা কিস্তি হিসেবে পরিশোধ করতে পারবেন। চাইলে মাত্র ১৯,৭৫২/- টাকা মাসিক কিস্তি পরিশোধের মাধ্যমেও গাড়িটি কিনতে পারবেন। সাথে থাকছে ওয়ারেন্টি ১ বছর ও ৪টি ফ্রি সার্ভিস

গাড়িটি কিনতে আজই যোগাযোগ করুন:
ঢাকা: ০১৭০৮৪৮৪৭৭৩ । কুমিল্লা: ০১৮৬৯৮৮৮৪৫৬ । বগুড়া: ০১৭০৪১৬৯৩০৬।
চট্টগ্রাম: ০১৭০৮৪৮৪৭৭৬ । দিনাজপুর: ০১৭০৪১৬৯৩০৮ ।

যশোর: ০১৭০৪১৬৯৩১০ । খুলনা: ০১৭০৮৪৮৪৭৭৫ । ময়মনসিংহ: ০১৭১৪৬৮০৭৭৬ । রাজশাহী: ০১৭০৪১৬৯৩০৯ । রংপুর: ০১৭০৮৪৮৪৭৭৮ । ফেনী: ০১৭১১১২০৬৬৫ । সিলেট: ০১৭১১৮৮১০৩৮

আমার কিছু কথা ছিলো -রোমেলু লুকাকু (বেলজিয়ান স্ট্রাইকার)

ভেঙে যাওয়ার সময়টা খেয়াল আছে আমার। আমাদের ভেঙে যাওয়া, ক্ষয়ে যাওয়া। মা ফ্রিজের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন, গোটা দৃশ্যটা আমার পরিস্কার মনে আছে। চোখের সামনে ভাসে।

তখন আমার ছয় বছর বয়স। স্কুল ব্রেকের সময় সাধারনত বাড়িতে খাবার জন্যে ফিরতাম। প্রতিদিন, একদম প্রতিদিন মেন্যুতে একই খাবার, পাউরুটি, দুধ। আসলে ঐ বয়সে খাবার নিয়ে কেউ চিন্তা করেনা। আসেনা মাথায়। মা যা দেয় বাচ্চারা খেয়ে ফেলে। তারপরও…তারপরও আমি জানতাম ওর চাইতে বেশি কিছু আমাদের সামর্থ্যের মধ্যেই ছিলোনা।

তারপর আরকি, সেদিনটা আসলো। প্রতিদিনের মতো দুপুরে বাড়ি ফিরে সোজা ঢুকে গেলাম কিচেনে। দেখি মা রেফ্রিজারেটরের সামনে দাঁড়িয়ে, হাতে এক বক্স দুধ। আমার খুবই পরিচিত দৃশ্য। এই দৃশ্যে অপরিচিত যে অংশটা ছিলো তা হচ্ছে মা দুধে কি যেন মেশাচ্ছিলেন। খুব ভালো করে মেশাচ্ছিলেন, বুঝতে পারছেন তো? ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি কি হচ্ছে ঘটনাটা। ভালোমতো মিশিয়ে টিশিয়ে মা খাবার আমার সামনে এনে রাখলেন, মুখে সেই পরিচিত হাসিটা, যেন কিচ্ছু হয়নি। সবকিছু একেবারে ঠিকঠাক। কিন্তু আমি বুঝতে পারছিলাম। বুঝে যাচ্ছিলাম আসলে।

আমার মা দুধে জল মেশাচ্ছিলেন। গোটা সপ্তাহ চলার জন্যে আমাদের হাতে টাকা ছিলোনা। আমরা ক্ষয়ে যাচ্ছিলাম, শুধু গরীব না, আমরা মাটিতে মিশে যাচ্ছিলাম।

আমার বাবা ছিলেন একজন পেশাদার ফুটবলার। ছিলেন ক্যারিয়ারের একদম শেষপ্রান্তে, খেলাও নেই টাকাও শেষ। এর প্রথম ধাক্কাটা গেলো আমাদের কেবল টিভির উপর দিয়ে। নো মোর ম্যাচ অফ দ্য ডে। নো সিগনাল।

এরপর বাড়ির ইলেকট্রিসিটি। এমনও সময় গেছে টানা দু তিন সপ্তাহ আমরা অন্ধকারে কাটিয়েছি। আমরা ডুবে যাচ্ছিলাম অন্ধকারে। নিকশ কালো অন্ধকার! রাতে বাড়িতে এসে দেখতাম গোটা বাড়ি প্যাঁচার মতো অন্ধকারে বসে আছে। স্নানের জন্যে গরম জল চাইলে আমার মা স্টোভে কেতলি চড়িয়ে দিতো। গরম জল হতো। শাওয়ারের নীচে দাঁড়িয়ে ছোট্ট একটা কাপ দিয়ে মাথায় ঢালতাম সেই গরম জল।

এমনও সময় গিয়েছে, মা বাড়ির পাশের বেকারি থেকে পাউরুটি আনতেন বাকীতে। বেকারীর লোকজন আমাকে আর আমার ভাইকে চিনতো ঠিক করেই। ওরা আমার মা কে বাকীতে দিতো পাউরুটি। সোমবার বাকীতে নিয়ে শুক্রবার শুধে দিতে হতো।

জানতাম আমরা খুব একটা বিশ্রী সময় পার করছি, নিয়মিত যুদ্ধ করে আমরা বেঁচে আছি। কিন্তু যখন মাকে দেখলাম দুধে জল মেশাতে, বুঝে গিয়েছিলাম সব শেষ। বুঝতে পারছেন তো? এই ছিলো আমাদের জীবন।

ঐদিন আমি মাকে কিচ্ছু বলিনি। মাকে কষ্ট দিতে চাইনি, বেচারিকে আর কত টানাপোড়েনে ফেলবো! চুপচাপ লাঞ্চ শেষ করে আবার স্কুলে চলে গিয়েছিলাম। বিশ্বাস করুন,সেদিন নিজের ভেতর খুব ভাঙাগড়া চললো। ঐ ছয় বছরের বাচ্চাটার ভেতর। মনে হচ্ছিলো হঠাত করেই কে যেন আমার ঘুমটা ভাঙিয়ে দিয়েছে, এতদিন ঘুমিয়ে ছিলাম। আমি কিভাবে যেন জেনে গেছি আমাকে কি করতে হবে। জানতাম কি করতে যাচ্ছি।

মাকে এভাবে বেঁচে থাকতে দেখা যায়না। সম্ভব না। আমি কোনভাবেই নিতে পারবোনা।

ফুটবল নিয়ে যারা কথা বলে তারা খেলোয়াড়দের মানসিক শক্তি নিয়ে কথা বলতে পছন্দ করে। কে চাপে ভেঙে পড়েনা, কে কতো শক্ত মনের ইত্যাদি ইত্যাদি। সেই হিসেবে যদি বলেন, আপনার দেখা ফুটবলারদের মধ্যে আমিই সবচে কঠিন মানসিক সামর্থ্যের মানুষ। আমার মনে পড়ে…অন্ধকার রুমের ভেতর আমার ভাই, মা আর আমি প্রার্থণা করছি…ভাবছি, বিশ্বাস করছি ,জানতাম এদিন বেশিদিন থাকবেনা। বদল আসবেই।

প্রতিজ্ঞাটা নিজের ভেতরেই রেখেছিলাম। প্রতিজ্ঞা্র কথা কাউকে বলতে হয়না তাই বলিনি। কিন্তু মাঝে মাঝে স্কুল থেকে এসে দেখতাম মা কাঁদছে। ভাল্লাগতো না। একদিন বলেই ফেললাম মা কে। “মা, সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। দেখে নিও। আমি আন্দেরলেখটে খেলবো। খুব শিঘ্রীই খেলবো। আমাদের সব ঠিক হয়ে যাবে। তোমাকে এত কষ্ট করতে হবেনা।”

আমার বয়স তখন ছয়।

বাবাকে জিজ্ঞাসা করলাম, “প্রফেশনাল ফুটবল কত বছর বয়স থেকে খেলা যায়?”

বাবা বললেন, “ষোল বছর।”

আমি বললাম,”আচ্ছা, তাহলে ষোলই সই।”

হবে। হতেই হবে। শুধু সময়টার অপেক্ষা।

একটা কথা বলি-প্রতিটা ম্যাচ, প্রতিটা খেলা আমার জন্যে ফাইনাল। যখন পার্কে খেলেছি, ফাইনাল ছিলো। কিন্ডারগার্ডেনে ব্রেক টাইমে যখন খেলেছি-ফাইনাল ছিলো। আমি সিরিয়াস, ভয়ঙ্কর সিরিয়াস। যখনই বলে শট করেছি, চেষ্টা করেছি বলের কভারটা ছিঁড়ে ফেলতে। ফুল পাওয়ার। কোন ছেলেখেলা না, নো ফিটনেস শট। আমার কোন ফিফা ছিলোনা। ছিলোনা কোন প্লেস্টেশন। মাঠে আমি খেলে বেড়াইনি, খুনের নেশা নিয়ে বল পায়ে দাবড়ে বেরিয়েছি।

যখন লম্বা হতে শুরু করলাম, কয়েকজন শিক্ষক, অন্য বাচ্চাদের বাবা মায়েরা খুব ভড়কে যেতো দেখলে। একবার একজন জিজ্ঞাসাই করে বসলো, “এই ছেলে, তোমার বয়স কতো? জন্মেছো কোথায়?”
এই প্রশ্নটা আমি ভুলবোনা কখনোই।

আমার তখন চেহারায় লেখা, “হোয়াট? আর ইউ সিরিয়াস?”

আমার বয়স যখন ১১, লিয়ার্সে ইয়ুথ টিমে খেলছি। একদিন বিপক্ষ দলের এক খেলোয়াড়ের বাবা আমাকে আক্ষরিক অর্থেই মাঠে নামার সময় আটকে দিয়েছিলো। ভাবটা এমন যে” আরে এই ছোকড়ার বয়স কতো? এর আইডি কোথায়? এসেছে কোত্থেকে?”
মনে মনে বললাম, “কোত্থেকে এসেছি? আচ্ছা? আমি এই অ্যান্টওয়ের্পেই জন্মেছি। এসেছি বেলজিয়াম থেকে।“

বাবা ওখানে ছিলেন না। দূরের খেলা গুলোতে আমি একাই যেতাম কারন আমাদের কোন গাড়ি নেই। একেবারে একা একটা ছেলে। আমাকেই দাঁড়াতে হয়েছে আমার জন্যে। আমার অবলম্বন হতে হয়েছে। ব্যাগ থেকে আইডি বের করে সোজা ঐ লোকের হাতে ধরিয়ে দিলাম। সবাই এক এক করে আমার আইডি দেখলো। পরিস্কার মনে আছে ওদের এই তীব্র অবিশ্বাসে আমার শরীরের রক্ত টগবগ করে ফুটছিলো। ঝড়ের বেগে মাথায় ভাবনা চলছে…আপনাদের ছেলেগুলোকে আমি ছিঁড়ে ফেলবো। একদম ছিঁড়ে ফালাফালা করে ফেলবো, এমন ভাবে ছিঁড়বো যাতে ধ্বংস হয়ে যায়। আপনাদের ছেলেরা আজ কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি যাবে…

আমি বেলজিয়ান ফুটবলের ইতিহাসের সেরা হতে চেয়েছি। ওটাই আমার লক্ষ্য। শুধু ভালো না, গ্রেইটও না, একদম সেরা। প্রচন্ড রাগ নিয়ে খেলতাম, এর কারন অনেক…অনেক কারন…কারন আমার অ্যাপার্টমেন্টে ইঁদুর দৌড়ে বেড়ায়…কারন আমাদের মেঝেতে ঘুমোতে হয়…কারন আমি চ্যাম্পিয়নস লীগ দেখতে পারিনা…কারন অন্যেরা আমার দিকে এমনভাবে তাকায় যেন চিড়িয়াখানার কোন আজব জন্তু দেখছে…কারন আমার মাকে আমার দুধের গ্লাসে জল মেশানোর কষ্ট নিয়ে বেঁচে থাকতে হয়…বাকীতে পাউরুটি আনতে হয়…

আমি একটা মিশনে নেমেছি।

যখন আমার বয়স ১২, ততদিনে ৩৪ ম্যাচে ৭৬টা গোল করে ফেলেছি।

প্রতিটা গোল আমি করেছি বাবার জুতো পায়ে দিয়ে। আমার পা বাবার মাপের সমান হবার পর থেকেই আমরা একই জুতো শেয়ার করি।

তো এর মাঝেই আমি একদিন দাদুকে ফোন করেছি। আমার মায়ের বাবা। ভদ্রলোক আমার জীবনের খুব গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষ। কঙ্গোতে এই একটা মানুষের সাথেই আমার যোগাযোগ। কঙ্গোর সাথে এই একটাই আমার সম্পর্ক। আমার বাবা-মা কঙ্গো থেকেই এসেছিলেন। ফোনে দাদুকে বলছিলাম,” আমি খুব ভালো খেলছি দাদু। ৭৬ টা গোল করেছি। লীগ জিতেছি এবার। বড় দলগুলোর চোখ পড়েছে আমার উপর।“

সাধারণত দাদু আমার ফুটবল খেলা নিয়েই সবসময় জানতে চাইতো। খুব উৎসাহী ছিলেন মানুষটা।

দাদু বললেন,” সাবাস রোম, সাবাস। আমার জন্যে একটা কাজ করতে পারবি তুই?”

বাহ! পারবো না কেন? বলেই দেখো।

দাদু বললেন, “আমার মেয়েটাকে দেখে রাখতে পারবি, প্লিজ?”

পুরোপুরি কনফিউজড হয়ে গেলাম। আরে দাদু এসব কি বলছে? সমস্যা কি?

বললাম, “মার কথা বলছো? আচ্ছা, ঠিক আছে। আমরা তো ভালোই আছি। উই আর ওকে।“

দাদু বললেন, “না ,প্রতিজ্ঞা করে বল। প্রতিজ্ঞা করতে পারবি? আমার মেয়েটাকে শুধু দেখে রাখিস। আমার হয়ে দেখে রাখিস কেমন?”

এর ঠিক পাঁচদিন পর আমার দাদুটা মরে গেলো। তখন বুঝলাম আসলে দাদু কি বলতে চেয়েছিলেন।

খুব কষ্ট পেয়েছিলাম আমি। আর চারটা বছর বাঁচলে কি হতো? আর মাত্র চারটা বছর বাঁচলেই আমার দাদুটা দেখে যেতে পারতো আমি আন্দেরলেখটে খেলছি। দেখে যেতে পারতো আমি আমার প্রতিজ্ঞাটা রাখতে পেরেছি। দেখে যেতে পারতো তার মেয়েটা এখন ভালো আছে। সবকিছু ঠিকঠাক।

মাকে বলেছিলাম ১৬ বছরেই হয়ে যাবে।

যদিও আমার দেরি হয়েছিলো। দেরি হয়েছিলো ঠিক ১১ দিন।

২০০৯ এর ২৪ শে মে।

প্লে অফ ফাইনাল। আন্দেরলেখট বনাম স্ট্যান্ডার্ড লিগ।

খুব এলোমেলো একটা দিন। মাতাল একটা দিন। সিজনের শুরুতে আন্দেরলেখটের আন্ডার নাইনটিন দলে আমি ছিলাম। ছিলাম বেঞ্চে। বেঞ্চ গরম করা ছাড়া কোন কাজ নেই। কোচ আমাকে মনে হয় সেজন্যেই রেখেছিলেন। খেলোয়াড়েরা এসে যাতে গরম বেঞ্চে বসতে পারে তাই বেঞ্চে বসে থাকবে রোম। আমার মনে হলো, “আরে আশ্চর্য তো! এভাবে বেঞ্চ লেপ্টে বসে থাকলে ষোলোর আগে আমি প্রফেশনাল কন্ট্যাক্ট সাইন করবো কিভাবে? হবে নাতো এভাবে”।

কোচের সাথে বাজি ধরে ফেললাম।

কোচকে বললাম, “কোচ, শুনুন, আমাকে যদি খেলতে দেন ডিসেম্বরের মধ্যে আমি ২৫ টা গোল করবো। গ্যারান্টি।“

ব্যাটাচ্ছেলে হাসা শুরু করলো। হ্যাঁ, সত্যি খুব জোরে হাসা শুরু করলো।

বললাম, “আচ্ছা ঠিক আছে যান। বাজী।”

কোচ বললেন, “ ওকে, কিন্তু যদি ডিসেম্বরের মধ্যে ২৫ টা গোল না করতে পারিস, আবার সোজা বেঞ্চে।”

“ঠিক আছে। কিন্তু যদি আমি জিতে যাই, আমাদের আনা নেয়ার যে মিনিভ্যান আছে সেটা আপনাকে রেগুলার পরিস্কার করতে হবে।“

“আচ্ছা ব্যাটা যা। ডীল।”

“আরেকটা কথা। আপনি তাহলে প্রতিদিন আমাদের প্যানকেক বানিয়ে খাওয়াবেন।”

আমাদের কোচের জীবনে ওই ছিলো সবচে খারাপ বাজী। এরচেয়ে খারাপ বাজি সে তার ইহজন্মে ধরেছে বলে মনে হয়না।

নভেম্বরের মধ্যেই ২৫ টা গোল হয়ে গেলো। ক্রিসমাসের আগেই আমাদের সবার হাতে প্যানকেক। আমরা সবাই ফ্রিতে প্যানকেক খাই ব্রো।

এটা একটা শিক্ষাও বলতে পারেন। যে ছেলেটা খেতে পায়না, খুব খিদে নিয়ে ঘুড়ে বেড়াচ্ছে তার সাথে মশকরা করা ঠিক না।ঘটি বাটি উড়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে।

Soccer Football – 2018 World Cup Qualifications – Europe – Greece vs Belgium – Athens, Greece – September 3, 2017 Belgium’s Romelu Lukaku celebrates after the match REUTERS/Alkis Konstantinidis

আন্দেরলেখটের সাথে আমি প্রোফেশনাল কন্ট্যাক্ট সাইন করলাম আমার জন্মদিনে, ১৩ ই মে। সাইন করে টরে ফিফা আর টেলিভিশনের ক্যাবল প্যাকেজ কিনে সোজা বাড়ি। ততদিনে ফুটবল সীজন শেষ। বাড়িতে বসে খুব চিল করছি। সে বছর বেলজিয়ান লীগের অবস্থা খুব উড়াধুড়া ধরনের। আন্দেরলেখট আর স্ট্যান্ডার্ড লিগ সিজন শেষ করেছে সমান পয়েন্ট নিয়ে। দুই লীগের প্লে অফ হবে কে চ্যাম্পিয়ন তা ঠিক করার জন্যে।

প্রথম লেগে আমি স্রেফ ফ্যান। টিভিতে খেলা দেখলাম।

সেকেন্ড লেগের আগের দিন কোচের ফোন।

“হ্যালো?”
“হ্যালো,রোম। কি করিস?”
“পার্কে ফুটবল খেলতে বের হচ্ছিলাম।“
“না, না, না, না। এক্ষুনি ব্যাগ গোছা। এক্ষুনি।
“কি? আমি আবার কি করলাম?”
“না, না, না। তোকে এক্ষুনি স্টেডিয়ামে আসতে হবে। ফার্স্ট টীম তোকে চাচ্ছে।“
“ইয়ো…হোয়াট?! আমি?!”
“হ্যাঁ, তুই। এক্ষুনি চলে আয়।“

ফোন রেখে আক্ষরিক অর্থেই দৌড়ে বাবার রুমে ঢুকে গেলাম। ইয়ো! উঠে পরো বাপজান। আমাদের যেতে হবে।“

বাবার বিরক্তি নিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন,” হাহ? কি? কোথায় যেতে হবে?”
“আন্দেরলেখট, ম্যান!”

ঐসময়টা আমি কখনোই ভুলবোনা। স্টেডিয়ামে ঢুকে আমি মোটামুটি দৌড়েই ড্রেসিংরুমে ঢুকে গেলাম। কিটম্যান জিজ্ঞাসা করলো, “তো, কিডো, কোন নাম্বারটা চাস?”

বললাম, “১০ নাম্বার দিন।“

হা হা হা হা হা! আমি আসলে জানিনা। ওই বয়সে আসলে কি ভয় পাওয়া উচিৎ তা জানতাম না।

আমাকে কিটম্যান বললেন, “অ্যাকাডেমী প্লেয়ারদের ৩০ এর উপর নাম্বার নিতে হয়।“
“ওকে। তিন যোগ ছয়, নয় হয়। কুল…ম্যান। আমাকে ৩৬ নাম্বার দিন।“

ঐ রাতে ডিনারে সিনিয়র প্লেয়ারেরা আমাকে দিয়ে গান গাওয়ালো। ঠিক মনে নেই কোন গানটা গেয়েছিলাম। আমিতো তখন ঘোরের মধ্যে।

পরেরদিন আমার এক বন্ধু বাড়িতে এসে আমার খোঁজ করেছিলো। পার্কে খেলতে যাবো কিনা জানতে এসেছে। মা বলে দিলো, “ও তো খেলতে চলে গেছে।”
বন্ধু জিজ্ঞাসা করলো, “খেলতে? কোথায়?”
“আর কোথায়? ফাইনাল খেলতে গেছে।”

বাসে করে আমরা স্টেডিয়ামে গেলাম। প্রতিটা খেলোয়াড়ের গায়ে ক্যুল স্যুট। ধীরস্থির হেঁটে ঢুকছে সবাই। আমার গায়ে এক উৎকট ট্র্যাকশ্যুট চাপানো। টিভি ক্যামেরা সব যেন আমারই মুখের উপরে ধরা। বাস থেকে লকার রুম ৩০০ মিটার। কত হবে আর, মিনিট তিনেকের হাঁটা পথ। লকার রুমে পা রাখা মাত্র আমার মোবাইল মনে হলো পাগল হয়ে গেলো। তিন মিনিটে আমার মোবাইলে ২৫ টা মেসেজ এসেছে। টিভিতে দেখে আমার বন্ধুরা পুরো পাগলা হয়ে গেছে।।
“ব্রো?! তুই এই খেলায় কেন?”
“রোম, কি হচ্ছে এইসব” তোকে টিভিতে দেখাচ্ছে কেন?”

শুধু একজনের মেসেজ ব্যাক করেছিলাম। আমার প্রাণের বন্ধু। লিখেছিলাম, “দোস্ত আমি খেলবো কিনা জানিনা। কি হচ্ছে তাও জানিনা। টিভিতে দেখতে থাক শুধু।“

৬৩ মিনিটের সময় ম্যানেজার আমার কাঁধে চাপড় দিলেন।
আন্দেরলেখটের হয়ে মাঠে নেমে গেলাম। আমার বয়স তখন ১৬ বছর ১১ দিন।

সেদিনের সেই ফাইনালে আমরা হেরেছিলাম। তাতে কি! আমি ছিলাম সুখের সাত সমুদ্রে। মায়ের কাছে দেয়া, আমার দাদুর কাছে দেয়া কথা আমি রাখতে পেরেছি। মাঠে নামার মুহুর্তটাতেই আমি জেনেছি সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। একেবারে সব।

পরের সীজনে, আমি তখনো হাই স্কুলে পড়ছি আবার একই সাথে ইওরোপা লীগে খেলছি। স্কুলে আমি সাধারণত একটা বড় ব্যাগ নিতাম যাতে স্কুল শেষে বিকেলে ফ্লাইট ধরতে পারি। বিশাল ব্যবধানে আমরা লীগ জিতলাম। আফ্রিকান প্লেয়ার অফ দ্য ইয়ারে আমি দ্বিতীয়। কি বলবো…অস্থির…পুরো অস্থির।

এসব কিছুরই আশা আমার ছিলো। জানতাম এরকমই হবে। কিন্তু এত দ্রুত হবে তা জানতাম না। হঠাত করেই মিডিয়া আমার উপর আশা করা বাড়িয়ে দিলো। যেন সমস্ত আশা ভরসা মূল আমি। বিশেষ করে জাতীয় দলে। ঠিক কি কারনে জানিনা, বেলজিয়ামের হয়ে আমি ঠিক ভালো খেলতে পারছিলাম না। হচ্ছিলো না ঠিকঠাক সব।

বাট, ইয়ো-কাম অন। আমার বয়স তখন কত? ১৭! ১৮! না হয় ১৯!

যখন সব ঠিকঠাক হলো তখন খবরের কাগজে বিভিন্ন আর্টিকেলে দেখলাম লিখছে, রোমেলু লুকাকু, দ্য বেলজিয়ান স্ট্রাইকার।

যখন সব ঠিক থাকেনা তখন লিখছে, রোমেলু লুকাকু ,কঙ্গোলিজ বংশোদ্ভত বেলজিয়ান স্ট্রাইকার।

যেভাবে আমি খেলি, সেটা আপনার পছন্দ নাই হতে পারে। অস্বাভাবিক কিছু না। কিন্তু আমি এখানে জন্মেছি। বড় হয়েছি অ্যান্টওয়ের্প, লীগ, ব্রাসেলসে। স্বপ্ন দেখেছি আন্দেরলেখটের হয়ে খেলার। ভিনসেন্ট কোম্পানি হবার স্বপ্ন দেখেছি। আমার মুখের কথা শুরু হয় ফ্রেঞ্চ দিয়ে শেষটা হয় ডাচ। এর মাঝে আমার এলাকা বুঝে কথার মধ্যে স্প্যানিশ বা পর্তুগীজ বা নিদেনপক্ষে লিঙ্গালাও ঢুকে যায়।

কারন আমি বেলজিয়ান।

আমরা সবাই বেলজিয়ান। এজন্যেই এই দেশটা দুর্দান্ত, তাইনা?

আমার দেশেরই কিছু লোক চায় আমি যাতে ব্যার্থ হই, কেন চায় তা আমি ঠিক জানিনা। আসলেই জানিনা। যখন আমি চেলসি তে গেলাম, আমি খেলিনি। সবার হাসি শুনেছি তখন। যখন আবার ধারে ওয়েষ্ট ব্রমে গেলাম খেলতে তখনও আমি ওদের হাসিটা শুনেছি।

সমস্যা নেই। এসব লোকের পরোয়া করিনা। আমার সিরিয়ালে যখন দুধের বদলে জল মেশানো হয়েছে তখন এরা কেউ ছিলোনা। আমার যখন কিছুই ছিলোনা তখন যেহেতু এরা আমার পাশে ছিলোনা তাই এদের পক্ষে আমাকে বোঝা সম্ভব না।

মজার কথা কি জানেন? সেই বাচ্চা অবস্থাতে আমি টানা দশটা বছর চ্যাম্পিয়নস লীগ ফুটবল মিস করেছি। আমাদের টিভি দেখার সামর্থ্যই ছিলোনা। সব বাচ্চারা স্কুলে গিয়ে ফাইনাল নিয়ে কথা বলতো, আমিতো কিছুই জানিনা। জানবো কিভাবে, দেখিনি তো! আমার ২০০২ এর কথা মনে আছে ।সেবার মাদ্রিদ লিভারকুসেনের সাথে খেলেছিলো। সবাই খেলা শেষে এসে বলছিলো, “ ভলিটা! ওহ মাই গড, কি ভলি!”

সবার সাথে সাথে আমিও চোখ কপালে তুলেছি। আসলেই! কি অসাধারন ভলি! এমন ভাব যেনো আমি ভলিটা নিজে চোখে দেখেছি। খুব সুন্দর অভিনয়। দরিদ্রদের মাথা উঁচু করে টিকে থাকতে হলে খুব ভালো অভিনয় জানতে হয়।

এর দু সপ্তাহ পর কম্পিউটার ক্লাসে আমার এক ক্লাসমেইট নেট থেকে ভিডিওটা ডাউনলোড করেছিলো। তখন দেখলাম জিদানের সেই অবিশ্বাস্য ভলি!

ঐ গ্রীষ্মে আমি সেই ক্লাসমেইটের বাড়িতে গিয়েই বিশ্বকাপ ফাইনালে রোনালদো- দ্য ফেনোমেনন এর কীর্তি দেখলাম। তাও নেট থেকে নামানো ফাইল। কতো শুনেছি এই গোলগুলোর গল্প। ঘন্টার পর ঘন্টা সবাই গোলগুলো নিয়ে গল্প করেছে। সেইসব গোল! আমিও সবার কথায় মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিয়ে গেছি।

ওইসময়টায় আমার জুতোয় ছিদ্র ছিলো। বেশ বড় বড়।

ঠিক ১২ বছর পর আমি খেললাম বিশ্বকাপে।

এবারেও খেলবো আরেকটা বিশ্বকাপ। তবে বিষয় কি জানেন, এবারে আমার মাথায় মজা করার ভুত চেপেছে। এত চাপ, নাটকের ভীড়ে আসলে জীবনটা খুবই ছোট। আমাদের দল বা আমাকে নিয়ে যে যা ইচ্ছা বলুক, কিসসু যায় আসেনা। এবার মজাই করবো।

ভাই, শোনেন-যখন ছোট ছিলাম, থিয়েরে অঁরির ম্যাচ টিভিতে দেখার পর্যন্ত সামর্থ্য ছিলোনা ! আর এখন! প্রতিটা দিন ওর সাথে আমাদের জাতীয় দলে থাকছি। শিখছি ওর কাছ থেকে। জীবন্ত এক কিংবদন্তীর পাশে রক্তমাংসের এই আমি দাঁড়িয়ে শুনি কিভাবে দুই খেলোয়াড়ের মাঝের ছোট্ট ফাঁকা জায়গাটায় চিতার ক্ষিপ্রতা নিয়ে দৌড়াতে হয়। যেমনটা অঁরি নিজে করতো। এই দুনিয়ায় অঁরিই সম্ভবত একমাত্র মানুষ যে আমার চাইতে বেশি খেলা দেখেছে টিভিতে। আমরা সবকিছুতেই তর্ক করি। এমনকি পাশে বসে জার্মানীর দ্বিতীয় বিভাগের ফুটবল নিয়েও কথা বলি। পাগলামো বলতে পারেন অবশ্য।

এই যেমন বলি, “থিয়েরি, ফরচুনা ড্যুসেলডর্ফের সেট আপটা দেখেছেন?”

“ডোন্ট বি সিলি রোম। অবশ্যই দেখেছি।”

এইযে দৃশ্যটা, কথাগুলো, এগুলোই আমার জন্যে “কুলেষ্ট থিং”।

প্রায়ই মনে হয়, আহারে, আমার দাদুটা যদি দেখে যেতে পারতো!

আমি প্রিমিয়ার লীগ নিয়ে বলতাম না।

ম্যানচেষ্টার ইউনাইটেড নিয়ে কথা বলতাম না।

চ্যাম্পিয়নস লীগ নিয়ে না।

বিশ্বকাপ নিয়েও না।

কিছু নিয়েই আলাদা করে দাদুকে কিছু বলার নেই আমার। শুধু যদি আমাদের জীবনটা দেখে যেতে পারতো! আরেকটা বার যদি দাদুর সাথে ফোনে কথা বলতে পারতাম, যদি জানাতে পারতাম…

দেখেছো দাদু? বলেছিলাম না? তোমার মেয়েটা ঠিক আছে এখন। আমাদের অ্যাপার্টমেন্টে এখন কোন ইঁদুর নেই। আমাদের আর মেঝেতে ঘুমোতে হয়না। আমাদের এখন কোন কষ্ট নেই। আমরা ভালো আছি। ভালো আছি…

ওদের আর আমার আইডি চেক করতে হয়না। ওরা এখন আমার নামটা জানে। রোমেলু লুকাকু…

মূলঃ দ্য প্লেয়ার্স ট্রিবিউন।
অনুবাদঃ মানিক চন্দ্র দাস।

আমারও আর্মি গার্ড আছে! -জেরদান শাকিরি

আমাদের বাড়িটা ঠিক গরম হতোনা, জানেন! একটা বড় ফায়ারপ্লেস ছিলো ঠিকই। কিন্তু ঐযে পুরানো বাড়ি হলে যা হয় আরকি। বাসেল এর একটা ফার্মের ভেতর পুরোনো বাড়িতে আমরা থাকতাম। এরকম জায়গায় পুরানো বাড়ি হলে যা হয়, একেবারে সেরকম। বরফের মতো ঠান্ডা বাড়ি। ও নিয়ে আমি তেমন একটা মাথা ঘামাইনি। ঘামিয়ে লাভটা কি? মোটামুটি উন্মাদের মত চারপাশ দৌড়ে আমি গা গরম রাখতাম। ঠান্ডা নিয়ে অভিযোগের অন্ত ছিলোনা বেচারা আমার বড় ভাইটার। হবে নাইবা কেন, বেচারার ঘরটা ছিলো ফায়ারপ্লেস থেকে অনেকখানি দূরে। তাও আবার দোতলায়। শীতের দিনে গায়ের উপর গোটা পাঁচেক কম্বল চাপিয়ে ঘুমুতে হতো ওর।

যুদ্ধের ঠিক আগ দিয়ে আমার পরিবার কসভো ছেড়ে পাড়ি জমায় সুইজারল্যান্ডে। আমার বয়স তখন চার। সাথে আমার আরো দুই ভাই। আর বাবা-মা। বেচারারা তিন ছেলে নিয়ে এসে সুইজারল্যান্ডে থিঁতু হতে চাচ্ছিলেন। কাজটা কিন্তু সহজ না, খুব কঠিন। বয়স্ক গাছের শিকড় উপড়ে আরেক জায়গায় নিয়ে লাগানোর পর বাঁচানো যেমন কঠিন, বিষয়টা সেরকম। তার উপর আমার বাবা সুইস জার্মান ভাষাটা পারতেন না। তাই তাঁকে প্রথমেই কাজ করতে হয়েছে রেস্তোরাঁর কিচেন সিঙ্কে। থালা বাসন ধুয়ে দিতেন। পরে বাবা অবশ্য রাস্তার কনস্ট্রাকশন এর কাজ পেয়েছিলেন। মা কাজ করতেন ক্লিনারের। শহরের অফিস বিল্ডিং এ ছিলো তাঁর কাজ। (মায়ের সাথে আমরা তিন ভাই থাকতাম। আমি ছিলাম ভ্যাকুয়াম হেল্পার আর আমার দুই ভাই পরিস্কার করতো জানালা।)

সুইজারল্যান্ড খুব খরুচে দেশ। আমার বাবা মায়ের জন্যে বিষয়টা ছিলো আরো বেশি কঠিন। তাঁরা কসভোতে থেকে যাওয়া আমাদের পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের জন্যে টাকা পাঠাতেন। প্রথম প্রথম আমরা বিমানে চেপে কসভোতে আত্মীয়স্বজনদের দেখতে যেতাম। ওই বয়সের কথা আমার মনে থাকার তো কথা না, মায়ের গল্পে জেনেছি যে আমরা বিমানে চেপে যেতাম। মা বলতেন, “প্লেনে তুই একটা আস্ত শয়তান! সীট বেয়ে উঠে সবসময় পেছনের সীটের লোকজনকে ধরতে চাইতি! চুপ থাকা কাকে বলে ওইসময় যদি তোকে শেখানো যেতো!”

যুদ্ধ শুরু হবার পর সবকিছু খুব কঠিন হয়ে গেলো। কসভোতে যাওয়াতো অসম্ভব। যুদ্ধ চলছে। যারা ওখানে আটকা পড়েছিলো তাদের জন্যে সময়টা খুব কঠিন হয়ে গেলো। আমার কাকার বাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে, আরো অবর্ণনীয় সব কষ্ট। বাবা যতটা বেশি সম্ভব টাকা পাঠানোর চেষ্টা করতেন তখন। প্রয়োজনের চাইতে বেশি একটা পয়সাও খরচ করার কোন উপায় আমাদের ছিলোনা। শুধু এক জন্মদিনে একটা অতিরিক্ত জিনিস গিফট পেয়েছিলাম।

মজার গল্প আসলে—রোনালদো হচ্ছে আমার আইডল। আসল রোনালদো। ওর খেলাটা আমার কাছে যাদু মনে হতো। একেবারে নির্ভেজাল যাদু। ৯৮ এর ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে রোনালদো ইনজুরড ছিলো, হেরেও বসলো একেবারে লেজে গোবরে করে। এই রোনালদো লোকটার জন্যে আমার খুব মায়া লাগছিলো। কষ্ট হচ্ছিলো মানুষটার জন্যে। ঐ বয়সে কি আর কষ্টটা নেয়া যায়! কেঁদেছি খালি রোনালদোর জন্যে। খুব বেশী কেঁদেছি। বিশ্বকাপের মাস তিনেক পরেই আমার সপ্তম জন্মদিন ছিলো। মায়ের কানের কাছে ঘ্যান ঘ্যান শুরু করলাম, “জন্মদিনে আমাকে রোনালদোর হলুদ জার্সি কিনে দিতে হবে। আর কিচ্ছু লাগবেনা। ও মা, আমার রোনালদোর জার্সি লাগবে…”

জন্মদিনের দিন মায়ের হাতে একটাই বাক্স দেখা গেলো। আমার জন্যে। খুলে দেখলাম সেই জার্সি। রোনালদোর হলুদ জার্সি। বাজারে নকল পাওয়া যায়না? ওরকম একটা। নকলই তো হবে, আসলটা কেনার টাকাটাই বা কোথায় আমাদের। বাক্স খুলে আর তর সইছিলো না। জার্সিতে ব্রাজিলের ব্যাজ আছে কিনা সেটাও আমার দেখার কথা মাথায় নেই। হলুদ একটা গেঞ্জি ,পিছনে সবুজ রঙে ৯ লেখা। আমার জীবনের সবচে সুখের মুহুর্ত! প্রতিদিন আমি এই জার্সিটা পড়েছি, টানা প্রায় দশদিন চলেছে জার্সির উপর স্টীম রোলার। সেই জার্সির সাথে আবার হলুদ শর্টস। সেগুলো চেপেই ঘুরতাম।

স্কুলে একমাত্র অভিবাসী শিশু আমিই, আর কেউ নেই। সুইস বাচ্চাগুলো বুঝতোনা আসলে আমি কেন ফুটবল নিয়ে এত ব্যস্ত থাকি, কেন আমার সবটা জুড়ে শুধু ফুটবল। সুইজারল্যান্ডে ফুটবল শুধুই একটা খেলা, ডালভাত টাইপ। দুনিয়ার অনেক জায়গায় ফুটবলের আরেক নাম জীবন, সুইজারল্যান্ডে বিষয়টা তেমন না। আমার সবটাতেই ফুটবল, উদাহরন দিয়ে বললে বুঝবেন।

চার বছর পর ৯৮ এর বিশ্বকাপে রোনালদো মাথায় এক অদ্ভুত চুলের ছাঁট নিয়ে আসলেন খেলতে। ত্রিভূজাকৃতি। দেখেই তো মাথায় ভূত চাপলো। সোজা হেয়ারড্রেসারের কাছে গিয়ে বললাম, “আমাকে রোনালদো ছাঁট দিয়ে দিন”। আমার মাথার চুল ব্লন্ড এবং তার উপরে কোকড়া চুল। ব্লন্ড কোকড়া চুলে ঐ ছাঁট! পাগলা কাজকারবার আর কাকে বলে!

ওরকম চুল নিয়ে গেলাম স্কুলে। সবাই হতভম্ব। কেউ কিছু বলেনি, কিন্তু মনের কথাটাতো বোঝা যায়! সবাই ভাবছিলো আসলে, হালার হইছে কি? করছে টা কি মাথায়?

আমি ওসব পাত্তাটাত্তা দেইনি। আমি ওরকমই। আমার স্কুলটা ছিলো শহরের ভালো এলাকায় আর আমার বাসা ছিলো সবচে খারাপ এলাকার পাশে। বাসা থেকে পাঁচ মিনিটের হাঁটা পথ। কিন্তু মজাটা কি জানেন, এলাকা খারাপ হলেও ভালো ফুটবল খেলাটা ওখানেই হতো। ওখানে যেতে মা পই পই করে বারন করতো , শোনে কে ? প্রতিদিন স্কুল শেষে হেঁটে রওয়ানা দিতাম ওখানে। শুধু খেলার জন্যে। সুইজারল্যান্ড সম্পর্কে লোকজনের খুব ভাল ধারণা, গোটা দেশোটা আসলেই ভালো। কিন্তু এই পার্কটা…এই পার্কটা পুরো পাগলা।

প্রতিটা দল ইউনাইটেড নেশনস এর মতো, টার্কিশ আছে, আফ্রিকান আছে, সার্বিয়ান, আলবেনিয়ান…একদম সব। আর শুধুতো ফুটবল না-সবাই আবার ওই পার্কে ঘুরতে যাচ্ছে, একপাশে জার্মান হিপহপ বাজছে, ছেলেপিলে ফ্রিস্টাইল র‍্যাপিং করছে, আবার হঠাত দেখা গেলো খেলার মাঝে একেবারে মাঝখান দিয়ে মেয়েরা হেঁটে চলে যাচ্ছে। অদ্ভুত জায়গা।

পার্ক যেমনই হোক, ফুটবলটা হতো আসল। রিয়েল ফুটবল যাকে বলে। প্রায়ই মাঠে ঘুষোঘুষি দেখা যেত, এ ওকে ধরে ঘুষোচ্ছে, ও ওকে ধরে পেঁদিয়ে পোদের বিষ ঝেড়ে দিচ্ছে। আমি অবশ্য ওরকম মার খাইনি। মুখটা সবসময় বন্ধ রাখতাম তো, তাই মনে হয় মার খেতে হয়নি। কিন্তু ঐ পার্কে খেলাটা আমাকে আসলেই সাহায্য করেছে। ছোটবেলাতেই জেনে গিয়েছিলাম কিভাবে বড়দের সাথে খেলতে হয়। তাও যেনতেন বড় মানুষ না, এরা খুব সিরিয়াস ধরনের খেলোয়াড়। মজা করতে খেলেনা।

আমার বয়স যখন ১৪ বছর, এফসি বাসেল যুব দলে খেলছি। প্রাগে নাইক কাপে খেলার সুযোগ পেলাম। সমস্যা হয়ে গেলো যে ঐ কাপে খেলতে গেলে কয়েকদিন স্কুল মিস দিতে হয়। টিচারকে বললাম, সোজা মানা করে দিলেন। সুইজারল্যান্ডে টিচারেরা স্কুলিং খুব সিরিয়াসলি নেন, তাই না করাটাই স্বাভাবিক। ভাবলাম, খাইছে! তাহলে অসুস্থ্যের অভিনয় ছাড়া গতি নেই।

বাড়িতে এসে মাকে দিয়ে ফ্লু বা এরকম একটা কিছুর নোট লিখিয়ে স্কুলে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। চলে গেলাম প্রাগ। ঐ টুর্নামেন্টে আমি খুব, খুবই ভালো খেলেছিলাম। এখানেই প্রথমবারের মতো অন্য দেশের ছেলেপিলেদের দেখলাম অবাক হয়ে আমার খেলা দেখছে। নিজেদের মধ্যে ফিসফাস, এইত্তো, এই ব্যাটাই বাসেল থেকে এসেছে। থাকেনা? বোঝা যায়তো আসলে, চেহারার দিকে তাকালেই। খুব গর্ব হলো বিষয়টায়। দারুন এক অনুভূতি।

প্রাগ থেকে ফেরত গিয়ে সোমবার গেলাম স্কুলে। তখনও ভাব ধরে আছি, আমি এখনো অসুস্থ্য। বোঝেনতো আসলে। অভিনয়টা করাই লাগে।

আমাকে দেখেই টিচার বললেন, “জেরদান, এদিকে এসো। তাড়াতাড়ি…”

হাত টাত নেড়ে ডাকছেন ভদ্রলোক। লক্ষন সুবিধের লাগলো না।

স্যারের ডেস্কের কাছে গেলাম। একটা খবরের কাগজ টেবিলে ঠাস করে ফেলে বললেন, “অসুস্থ্য, তাইনা?”

দেখি কাগজের একদম প্রথম পাতায় আমার ছবি। একদম ক্যালানো একটা ছবি, হাতে প্লেয়ার অফ দ্য টুর্নামেন্ট ট্রফি।

স্যারের দিকে তাকানোর সাহসই হলোনা। দুই হাত তুলে দিয়ে শ্রাগ করলাম, মনে মনে বললাম, মারছে। শ্যাষ একদম !

টুর্নামেন্টের পর দেখলাম বেশ ভালোই মনোযোগ পাচ্ছি। তখনও আমাদের পরিবারের জন্য সমস্যা একটাই, টাকা। কারন আমার বাকী দুই ভাইও তখন বাসেল এ খেলছে। যখনই আমাদের কোন টুর্নামেন্টে যাবার জন্যে টাকা দিতে হয় বা অন্য কিছু, আমাদের খরচ তিনগুন। আমার বয়স যখন ১৬ তখন স্পেন এর এক জায়গায় একটা ক্যাম্প আয়োজন করা হলো, স্কিল বাড়ানোর জন্যে আরকি, টাকা লাগবে। কতো? ৭০০ সুইস ফ্রাঁ বা এরকম কিছু একটা। এক রাতে আমার বাবা আমাকে এসে বললেন, “সম্ভব না রে বাপ। এত টাকা আমার হাতে নাই।“

তো কি করা যায়? আমরা তিনভাই মিলে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমি আমাদের আশপাশের এলাকার লোকজনের লনের ঘাস কাটলাম সপ্তাহ তিনেকের মতো। আমার এক ভাই—ঠিক জানিনা ওর কাজটা কি ছিলো। তবে প্রতিদিন একেবারে সেইফটি গ্লাসটাস নিয়ে বেরিয়ে যেতে দেখতাম। নিশ্চয়ই কোন ফ্যাক্টরীতে কাজ করতো। তো যেভাবেই হোক একেবারে শেষ মুহুর্তে তিন ভাই এর টাকা মিলে যোগাড় হলো ৭০০ ফ্রাঁ। গেলাম স্পেনে। ক্যাম্পে যেতে পারবোনা এরকম কোন ভয় আমার হয়নি, ভয় টা কি নিয়ে ছিলো জানেন? আমার টীমমেইটরা বুঝে ফেলছে যে টাকা টা দেয়ার সামর্থ্য আমাদের নেই, এই ভয়টা আমার ছিলো। গরীবের ভাই কিছু থাকুক আর নাই থাকুক আত্মসন্মানবোধটা আছে।

বাচ্চা ছেলেপিলে কোন মাত্রার শয়তান হয় বোঝেন তো। বিশেষ করে এই ১৬ /১৭ বছর বয়সের ছেলেপিলে। আমার অক্ষমতা নিয়ে নির্দয় সব রসিকতা করে একেবারে ভেঙে ফেলবে সবকিছু। খুব অমানবিক হয় এসময় মানুষজন। ট্রেনিং শেষে সবাই কিওস্ক থেকে খেতে যেতো। আমাদের তো কখনোই টাকা ছিলোনা, আমরা একটা না একটা উসিলা বানিয়ে বাড়িতে ফেরত আসতাম। পেটে তখন তীব্র ক্ষিদে। এই ক্ষিদেটা সম্ভবত আমাকে অন্যভাবে সাহাজ্য করেছে সেরাদের বিপক্ষে খেলার তীব্র ক্ষিদেটা বাড়িয়েছে হয়তো এই ক্ষিদেটা। সবসময়।

এর একবছর পর আমি ডাক পেলাম বাসেল ফার্স্ট টীমে খেলার। আমার বয়স ১৭। আমাকে ম্যাচের শেষের ২০ মিনিটের জণ্যে নামানো হলো, আমার মনে হলো ভালোই খেলেছি। তো পরেরদিন আবার গেলাম ট্রেইনিং এ, আমাদের ইয়ুথ টীম কোচ ডেকে বললেন,” কি করলি গতকাল? ভাবিস কি তুই নিজেরে?”

আমি বললাম, “মানে কি? কি বলছেন কোচ?”

“আমি মাত্র ম্যানেজারের সাথে কথা বলেছি। উনি বললেন তুই নাকি খালি ড্রিবলিং করে বেরিয়েছিস। তুই আবার সেকেন্ড টীমে। যা ভাগ এখান থেকে”।

বিশাল একটা ধাক্কা খেলাম। মনে হচ্ছিলো বাসেল এ আমার আর কোন ভবিষ্যত নেই। সব শেষ।

দুই সপ্তাহ পর ঐ ম্যানেজারকেই বরখাস্ত করা হলো। নতুন ম্যানেজার এলেন। তিনি আমাকে ফার্স্ট টীমে ডেকে নিলেন। তারপর আর আমাকে পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। তব একটা মজার ব্যাপার ছিলো তখন। ম্যানেজার আমাকে খেলাতেন লেফট ব্যাক পজিশনে…আর আমি বল বানাতে আর আক্রমন করতে পছন্দ করি…জানেনই তো…ডিফেন্ডারেরা খালি চিৎকার করত মাঠে, “নীচে আয়, নীচে নাম হারামজাদা!”

হা হা হা হা হা! কি আর বলবো, বলুন? তবে কাজ হয়েছিলো বেশ কারন খবরের কাগজগুলোতে দেখতাম নিয়মিত লেখা হচ্ছে, শাকিরির বিশ্বকাপ দলে ডাক পাওয়া উচিৎত…এইসব আরকি।

কোত্থেকে কি হচ্ছিলো আমি জানিনা, ভাবতেও পারছিলাম না। শেষমেষ যখন দলে ডাক পেলাম, খুব আবেগের একটা ব্যাপার ছিলো আমার জন্যে। খবরটা পেয়ে সোজা বাবা-মায়ের সাথে দেখা করার জন্যে ছুটে গিয়েছিলাম। আমার বাবা মা তো খুব খুশি।

সবকিছু কেমন দ্রুত হয়ে গেলো। ১৬ বছর বয়সে স্পেনের ক্যাম্পে যাওয়ার জন্যে আমি লোকের বাগানের ঘাস কাটছি আর সেই আমি ১৮ বছর বয়সেই বিমানে চড়ে বসছি সাউথ আফ্রিকায় বিশ্বকাপ খেলার জন্যে। অদ্ভুত না?

স্পেনের বিপক্ষে যেদিন খেললাম সেদিনকার কথা খুব মনে আছে। খেলতে নেমে দেখি আমার সামনে ইনিয়েস্তা দৌড়াচ্ছে! খেলা বাদ দিয়ে মাথায় এলো, আরে! এই লোকটাকে তো আমি টিভিতে খেলতে দেখি! কি অদ্ভুত! এসব কিছুর পরেও একটা বিষয় আমার আজীবন মনে থাকবে। আমরা যখন প্রথম আমাদের হোটেলে পৌঁছলাম, দেখি আমাদের প্রত্যেকের রুমের সামনে বিশাল এক বন্দুক নিয়ে আর্মির লোক দাঁড়ানো। প্রত্যেকটা দরজায়!আমাদের নিজেদের পার্সোনাল আর্মি! আমার জন্যে এই ঘটনাটা হচ্ছে খুব ক্যুল একটা ঘটনা। মাত্র বছর খানেক আগেও আমি খারুজ একটা এলাকার পার্ক থেকেররাতের বেলায় একা একা ফিরেছি…আর এখন আমার নিজস্ব আর্মি গার্ড!

বাবা মায়ের জন্যে আমার বিশ্বকাপ খেলার মুহুর্তটা খুব গর্বের। বেচারারা একেবারে খালি হাতে সুইজারল্যান্ড এসেছিলেন, সারা জীবন তার বাচ্চাদের জন্যে সুন্দর একটা জীবন দেয়ার জন্যে ভয়াবহ পরিশ্রম করেছেন। মাঝে মাঝে মনে হয় সুইজারল্যান্ড বিষয়ে আমার অনুভূতিটা মিডিয়া ভালো করে বোঝেনি। বা ভুল বুঝেছে। আমার মনে হয় আমার বাড়ি দুইটা। খুবই সিম্পল একটা ব্যাপার। সুইজারল্যান্ড আমার পরিবারকে সব দিয়েছে, আমিও চেষ্টা করি সুইজারল্যান্ড দলটাকে আমার সবটুকু দিতে। আবার যখন কসভোতে যাই,জায়গাটাকে খুব আপন মনে হয়। কোন যুক্তি নেই জানি। স্রেফ আবেগ বলতে পারেন। আবেগের তো কোন যুক্তির প্রয়োজন হয়না।

২০১২ সালে যখন অ্যালবেনিয়ার বিপক্ষে খেললাম, আমার বুটে সুইজারল্যান্ড, অ্যালবেনিয়া আর কসভোর পতাকা লাগানো। সুইজারল্যান্ডের কয়েকটা কাগজ বিষয়টাকে খুব খারাপ ভাবে উপস্থাপন করলো। খারাপ ধরনের সব লেখা ছাপলো। ভয়াবহ সমালোচনার মুখে পড়ে গেলাম। আরে ভাই, এইতো আমার পরিচয়, এ নিয়েও যে কেউ অদ্ভুত সব কথাবার্তা ভাবতে পারে সেটাইতো আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়।

সুইজারল্যান্ডের সবচে ভালো দিক কি জানেন? দারিদ্রতা থেকে মুক্তি বা যুদ্ধ থেকে বেঁচে যারা একটা সুস্থ জীবন চায়, বেঁচে থাকতে চায় সুইজারল্যান্ড তাদেরকে স্বাগত জানায়।

সুইজারল্যান্ডে লেইক, পর্বত ইত্যাদি আছে। পৃথিবীর স্বর্গ বলতে পারেন। এসবের পাশেই আবার আছে আমার খেলার মতো একটা পার্ক যেখানে টার্ক, সার্বিয়ান, অ্যালবেনিয়ান, আফ্রিকানরা খেলে, জার্মান র‍্যাপার গান গায়, মেয়েরা মাঠের মাঝ দিয়ে হেঁটে বেড়ায়। সুইজারল্যান্ড আসলে সবার জন্যে। সবার।

এবারেও যখন বিশ্বকাপে খেলতে নামবো, আমার বুটে থাকবে সুইজারল্যান্ড আর কসভোর পতাকা। কন রাজনীতি বা এরকম কোন কারনে না। থাকবে কারন এই দুই পতাকা আমার জীবনের কথা বলে।

মূলঃ দ্য প্লেয়ারস ট্রিবিউন
অনুবাদঃ মানিক চন্দ্র দাস।

রোদ, ঝড়, বৃষ্টিতে… -অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়া

একটা চিঠির গল্প বলি। চিঠিটা পেয়েছিলাম আমার ক্লাব রিয়েল মাদ্রিদ এর কাছ থেকে। পড়িনি। পড়ার আগেই ছিঁড়ে ফেলেছিলাম।

চিঠিটা কবে পেয়েছিলাম, জানেন? ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালের দিন। ঠিক সকাল ১১ টায়। ট্রেইনারের টেবিলে বসে আছি। পায়ে ইঞ্জেকশন নিতে হবে। কোয়ার্টারফাইনাল ম্যাচে আমার উরুর পেশী ছিঁড়ে গিয়েছিলো। পেইন কিলার নিলে অবশ্য কোন সমস্যা হচ্ছিলো না। সমস্যা হবে কিভাবে, সমস্যা তো হয় ব্যাথা করলে। পেইনকিলার নিলে ব্যাথাটা দমে যাচ্ছিলো।

আমার ট্রেইনারকে বলেছিলাম, “ যদি মরে যাই, মরে যেতে দেবেন। তাতে আমার কিসসু যায় আসেনা। শুধু খেলতে চাই। আমি শুধু খেলতে চাই।“ ঠিক এগুলোই বলেছিলাম।
টেবিলে বসে পায়ে বরফ ঘষছি। এইসময় রুমে এলেন আমাদের দলের চিকিৎসক ড্যানিয়েল মার্টিনেজ। হাতে একটা খাম। উনি বললেন, “অ্যাঞ্জেল, এটা রিয়েল মাদ্রিদ থেকে এসেছে”।

মানে কি?
“ওরা বলছে, খেলার মতো কন্ডিশন এখন তোমার নেই। তোমাকে যাতে আমরা না খেলাই, জোর করছে ।“

বুঝতে পারছিলাম কি হচ্ছে আশপাশে। বাজারে জোর গুজব রিয়াল মাদ্রিদ বিশ্বকাপের পর জেমস রদ্রিগুয়েজ কে সাইন করাতে চাচ্ছে। আমি জানি ওকে আনতে হলে আমাকে বিক্রি করবে রিয়াল। আমার জায়গাটাতো খালি করতে হবে খেলার জন্যে। বিক্রির পণ্যটাকে ওরা নষ্ট করতে চাচ্ছেনা। সহজ হিসেব। ফুটবল যে একটা ব্যাবসা, সেই ব্যাবসায়িক দিকটি আমজনতা কখনো দেখতে পায়না। কিংবা দেখতে দেয়া হয়না।

ড্যানিয়েলকে বললাম চিঠিটা দিতে। হাতে পেয়েই কুচি কুচি করে ছিঁড়ে ফেললাম। পড়ারও প্রয়োজন বোধ করিনি। ওকেই আবার ছেঁড়া টুকরো গুলো দিয়ে বললাম, “ফেলে দাও। আজ সব সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা শুধু আমার।“

ম্যাচের আগের রাতে আমার এক ফোঁটা ঘুম হয়নি। এর একটা কারন হিসেবে বলা যায়, আমাদের হোটেলের বাইরে ব্রাজিলিয়ান ফ্যানরা সারাটা রাত আতশবাজি ফুটিয়েছে। শব্দ ছিলো মারাত্মক। ঠিক জানিনা, শব্দ যদি নাও থাকতো ,ঘুমুতে পারতাম কিনা। বিশ্বকাপ ফাইনালের আগের রাত,সারাটা জীবন যার স্বপ্ন দেখেছি সেই স্বপ্নটা যখন এত কাছে… এই অনুভূতিটা কোনভাবেই আমি বুঝিয়ে বলতে পারবোনা।

ফাইনালে আমি সত্যি সত্যি খেলতে চেয়েছিলাম। তাতে যদি আমার ক্যারিয়ার শেষও হয়ে যেতো, আপত্তি ছিলোনা। সেই সাথে আমি আমার দলের জন্যে কোন জটিল পরিস্থিতিও তৈরী করতে চাইনি। একদম ভোরে বিছানা ছেড়ে গেলাম ম্যানেজারের সাথে দেখা করতে। সাবেলা। আমাদের খুব ভালো সম্পর্ক। খুব কাছের মানুষ আমরা বলতে পারেন। তাঁকে যদি আমি বলতাম শুরু থেকেই খেলতে চাই, লোকটার উপর খুব চাপ হয়ে যেতো। আমাকে খেলানোর জন্যে তাঁর মনে একটা চিন্তা কাজ করতো। সেরকম কিছু করিনি। ওকে গিয়ে আমি আমার বুকে হাত রেখে বলেছি, তোমার যাকে খেলালে ভালো মনে হয়,তাকেই খেলাবে।

বললাম,” যদি আমাকে বসাতে হয়, তাও সই। যদি অন্য কাউকে বসাতে হয় তাহলে সেই অন্য কেউই। আমি শুধু বিশ্বকাপটা জিততে চাই। আমাকে যদি নামাও, মরে যাবার আগ পর্যন্ত খেলবো।“

কেন যেন কেঁদে ফেললাম। কোনভাবেই জলটা আটকাতে পারলাম না। সেই সময়টা হয়তো জানে কেন কেঁদেছি।

ম্যাচের আগে যখন টীম টক হয়, তখন সাবেলা ঘোষনা দিলেন আমার জায়গায় এনজো পেরেজ শুরু করবে। কারন এনজো একেবারে ফিট। কোন সমস্যা নেই। শুনে আমার খারাপ লাগেনি। শান্তিই লাগলো। কোচ তার সেরাদের দিয়ে খেলাবেন। ম্যাচ শুরুর আগে পায়ে আবার ইনজেকশন নিয়ে নিলাম। খেলার দ্বিতীয়ার্ধেও নিয়েছি যাতে কোচ ডাকলেই নামতে পারি মাঠে।

সেই ডাকটা আমার আর আসেনি। হেরে গেলাম। কোনকিছুই আমার কোনরকম নিয়ন্ত্রনে ছিলোনা। আমার জীবনের খুব কঠিন রাতগুলোর একটা। ম্যাচ শেষে মিডিয়া আমার না খেলা নিয়ে যা টা বলতে লাগলো। আমি সত্য কথা বলছি, একটা বিন্দু মিথ্যা কথা বলছি না। বিশ্বাস করুন।

সাবেলার সামনে গিয়ে যে কেঁদে ফেললাম, ও কি আমাকে নার্ভাস ভেবেছিলো? এই ভাবনাটা আমাকে তাড়া করে ফেরে।

বিশ্বাস করুন, ঐ সময়ের ঘটনাটার সাথে নার্ভের কোন সম্পর্ক নেই। আবেগে আমি আটকে ছিলাম। মুহুর্তটা কত দামী, কত সাধনার! প্রায় অসম্ভব একটা স্বপ্নের কত কাছে তখন আমরা।

আমি ছেলেবেলায় যে বাড়িতে থেকেছি ঐ বাড়ির দেয়ালের রঙ কোন একসময় সাদা ছিলো। কবে যে সাদা ছিলো আমার মনে নেই। প্রথম যে রঙটা খেয়াল আছে, বিবর্ন ধূসর। কয়লার গুঁড়োতে আস্তে আস্তে আমাদের দেয়ালগুলো কালো হয়ে গেলো।

আমার বাবা কয়লা নিয়ে কাজ করতেন। মাইনে যে কাজ করে ওরকম না। বাবা আসলে চারকোল বানাতেন। কাজ করতেন আমাদের বাড়ির পেছন দিকটায়। চারকোল কিভাবে বানানো হয় দেখেছেন কখনো? বার্বিকিউ করার জন্যে দোকান থেকে যে চারকোল কেনেন, ওগুলোর কথা বলছি। দোকানে যত সুন্দরই দেখাক, বানানোর প্রক্রিয়াটা কিন্তু খুবই নোংরা। বাবা এই নোংরা কাজটাই করতেন বাড়ির পেছনের চাতালে । চারকোল বানানোর পর ছোট ছোট চারকোল ব্যাগে ভরে বাজারে বিক্রি করতেন। আসলে শুধু বাবা ই নন, তাঁর সাথে ছোট ছোট দুজন হেল্পার ছিলো। আমি আর আমার বোন।

খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে বাবার কাজে সাহাজ্য করতাম। কাজটা কি? চারকোল ব্যাগের ভেতর ঢুকিয়ে গোছানো। মজাই লাগতো আসলে কাজটা। ঠিক কাজ মনে হতোনা। আমাদের বয়স তখন কত হবে,নয় দশ। কাজটাজ করে যেতাম স্কুলে। কয়লার ট্রাক এলে চারকোলের ব্যাগগুলো কাঁধে করে লিভিং রুমের ভেতর দিয়ে সামনের দরজা দিয়ে বের হতাম। তারপর বাবা ব্যাগ ট্রাকে উঠাতেন। এই চারকোলের ব্যাগ টানাটানিতেই আমাদের বাড়িটার দেয়ালের রঙ হয়ে গিয়েছিলো কালো।

কাজ যত নোংরাই হোক, এ দিয়েই আমাদের টেবিলে খাবার জুটতো। এই কজ করেই বাবা বাড়িটাকে ব্যাংকের হাত থেকে বাঁচিয়ে ছিলেন।

আমাদের অবস্থা এরকম ছিলোনা। বাবা খুব ভালো মানুষ। একজনের ভালো করতে গিয়ে বেচারা ওইরকম একটা গাড্ডায় পড়ে গিয়েছিলেন। এক বন্ধু তার বাড়ির গ্যারান্টর হতে বাবাকে অনুরোধ করেছিলেন। বাবা মানুষকে খুব বিশ্বাস করতেন। ব্যাংকের দেনা জমা হয়ে গেলো অনেক এবং সেই বন্ধু একদিন স্রেফ হাওয়া হয়ে গেলো। ব্যাংক তো সোজা পেয়ে বসলো বাবাকে। বেচারা দুদুটো বাড়ির দেনা শোধ করতে শুরু করলেন। আর কিছু করারও ছিলোনা। নিজের পরিবার তো আছেই, তার উপর দু দুটো বাড়ির দেনা! অনেক অনেক চাপ ছিলো মানুষটার উপর।

বাবা একেবারে শুরুতে চারকোলের ব্যাবসা করতেন না। আমাদের বাড়ির সামনের রুমটাকে একটা ছোট্ট দোকানমতো বানিয়েছিলেন। ব্লিচ, ক্লোরিন,সাবান ইত্যাদি পরিস্কার করার জিনিষপত্র ড্রামে করে কিনে ছোট ছোট বোতলে ভরে বিক্রি করতেন। ভালোই ছিলো বিক্রিবাট্টা। আমাদের শহরে লোকজন পরিস্কার করার সিআইএফ কিনতে একেবারে ব্র্যান্ড ব্যাবহার করছে, সেরকমটা ভাবা কঠিন। খুব বেশি খরচসাপেক্ষ হয় গোটা ব্যাপারটা। আমাদের দোকানে এলেই হতো। খুব সস্তায় এক বোতল ডি মারিয়া , ব্যাস কাজ সারা।

সবকিছুই ঠিকঠাক চলছিলো। একদিন তাদের ছোট ছেলে ব্যাবসায় বাগড়া বাধিয়ে দিলো। আসলে মরতেই বসেছিলো ছেলেটা।

হ্যাঁ ঠিকই পড়ছেন। আমিই সেই শয়তান।

ঠিক শয়তান বলাটাও ঠিক হচ্ছেনা। আমার আসলে খুব এনার্জি ছিলো। একেবারে হাইপার অ্যাকটিভ বাচ্চা যাকে বলে। সেই একদিন মা দোকানে সাবান বিক্রি করছিলেন আর আমি ওয়াকারে করে বাড়িতে ঘুরে বেড়াচ্ছি। বাড়ির সামনের দরজাটা খোলাই ছিলো। খোলা না থাকার কোন কারন নেই, কাষ্টমারেরা ও পথেই আসতো দোকানে। বিক্রি নিয়ে মা ব্যস্ত ছিলেন আর আমি এই ফাঁকে সোজা বাইরে…ঘুরে দেখতে চাচ্ছিলাম বাইরেটা!

হাঁটতে হাঁটতে সোজা রাস্তার মাঝখানে। মা রীতিমতো স্প্রিন্ট দৌড়ে গাড়ি চাপার হাত থেকে আমাকে বাঁচিয়েছিলেন। মা খুব নাটক করে বলে ঘটনাটা। ডি মারিয়া ক্লিনিং শপের ওদিনই শেষ দিন। মা বাবাকে বললেন, এভাবে হবেনা। বাচ্চাকাচ্চা সব মরে শুটকি হয়ে যাবে। আমাদের অন্যকিছু করতে হবে।

এরপরেই সেই কয়লা ওয়ালার সাথে বাবার দেখা। ভদ্রলোক সান্তিয়াগো দেল এস্ত্রো থেকে ট্রাকে করে কয়লা আনতেন। মজাটা হচ্ছে গোটা এক ট্রাক কয়লা কেনার সামর্থ্য বাবার ছিলোনা। বহু অনুরোধ করার পর ভদ্রলোক আমাদের প্রথম কয়েকটা শিপমেন্ট বাকীতে দিতে রাজী হন। প্রতিবারই এসে আগের ট্রাকের টাকা নিয়ে পরের ট্রাক কয়লা দিতো মানুষটা। দুটো বাড়ি, পরিবারের মানুষগুলো…ভরণপোষন…সব মিলিয়ে খুব ঝামেলা… । বাবার কাছে ক্যান্ডি বা এরকম কিছু চাইলে বাবা বলতেন, “দু দু্টো বাড়ি আর এক ট্রাক কয়লার দাম দিতে হবে বাবা। পরে দেবোনে”।

এই কথাগুলো বলা বাবার একেবারে অভ্যাস হয়ে গিয়েছিলো।

এক দিনের কথা মাথায় একেবারে গেঁথে আছে। আমার জীবন বদলে যাবার দিনটা। বাবার সাথে ব্যাগের ভেতর চারকোল ঢুকাচ্ছিলাম। প্রচন্ড ঠান্ডা, বৃষ্টি হচ্ছে। মাথার উপর টিনের চাল। কঠিন বৃষ্টি। ঘন্টা কয়েক পরেই আমি স্কুলে যাবো। ওখানে বেশ গরম, বাঁচোয়া। বাবাকে এই ঠান্ডায়, মাথার উপর বৃষ্টি নিয়ে কাজ করতে হবে সারাটা দিন। যদি চারকোল বিক্রি না হয়, আমাদের না খেয়ে থাকতে হবে।

মাথার ভেতর ভাবনা এলো। নিজেকেই বলা শুরু করলাম, এই অবস্থাটা বদলানো দরকার। খুব দরকার।

এজন্যে আমি ফুটবলের কাছে কৃতজ্ঞ।

মাঝে মাঝে অবশ্য জীবনের দামে দেনা চুকোতে হয়। ফুটবল শুরু করেছিলাম খুব অল্প বয়সে। দুষ্টুমি করে মায়ের মাথা খেয়ে ফেলতাম আমি। তাই মা আমাকে একদিন নিয়ে গেলেন ডাক্তারে কাছে। ডাক্তারকে বললেন, “ডাক্তার, আমার ছেলেটা খালি দৌড়য়। একটা মুহুর্তের জন্যে চুপ করে কোথাও বসতে পারেনা। কি করি বলুনতো!”

ডাক্তার খুব ভালো লোক। আর্জেন্টিনার মানুষ। আর্জেন্টাইন হলে যা হয়, উনি বললেন, “সারাদিন ছুটোছুটি করে কি করো? ফুটবল খেলো?”

এভাবেই শুরু হলো আমার ফুটবল খেলা।

ফুটবল নিয়ে আমি ঘোরগ্রস্থ মানুষ বলতে পারেন। সেই শুরু থেকেই। আমি শুধু ফুটবলই খেলেছি। প্রতি দু মাস অন্তর অন্তর আক্ষরিক অর্থেই আমার বুটের তলা ভেঙে যেতো, খেলতাম এতো বেশি। মা শেষে আঠা দিয়ে ঠিক করতেন বুটের তলা। দুমাস পরপর নতুন একজোড়া বুট কেনার টাকা আমাদের ছিলোনা। সাত বছর বয়স যখন ,পাড়ার দলের হয়ে ৬৩ টা গোল করে ফেলেছি। ভালোই খেলতাম মনে হচ্ছে এখন। তো একদিন আমার বেডরুমে মা এসে বললেন, “ রেডিও চ্যানেল তোর সাথে কথা বলতে চায়।“

স্টেশনে গেলাম ইন্টারভিউ দেয়ার জন্যে। খুব লাজুক ছিলাম ঐ বয়সটায়, মুখ দিয়ে দুএকটার বেশি শব্দই বেরোয়নি।

ওই বছরেই বাবার কাছে ফোন এলো। রোজারিও সেন্ট্রালের ইয়ুথ টীমের কোচ আমাকে দলে নিতে চান। খুব কজার একটা পরিস্থিতি ,জানেন! আমার বাবা হচ্ছেন নিওয়েল ওল্ড বয়েজ এর বিরাট সমর্থক। আর আমার মা রোজারিও সেন্ট্রালের পাঁড় ভক্ত। রোজারিওতে না থাকলে আসলে এই দুটো দলের সমর্থকদের মধ্যকার খুব আবেগের রাইভালরিটা ঠিক বুঝবেন না। একেবারে দুই মেরু বলতে পারেন। জীবন মরন টাইপ আরকি। দুইদলের মধ্যকার খেলা হলে আমার বাবা মা একেবারে তাদের সবটুকু দিয়ে চিৎকার চেঁচামেচি করেন। অবশ্যই নিজের দলের গোলের সময় আরকি।

যে জেতে তার কথার চোটে আরেকজন মনে করেন গোটা সপ্তাহ একেবারে কেঁচো হয়ে থাকতে হয়। খুবই কঠিন অবস্থা।

তো বুঝতেই পারছেন সেন্ট্রাল থেকে কল আসায় মায়ের অবস্থাটা। একেবারে উত্তেজনার শেষ সীমায়।

বাবা বললেন,” বুঝতে পারছিনা আসলে। অনেক দূর তো এখান থেকে। নয় কিলো! আমাদের তো গাড়ি নেই। ওকে আনা নেয়া করবো কিভাবে?”

মা বললেন,” আরে এইটা কোন ব্যাপার? চিন্তা করোনা, আমি নিয়ে যাবো।“

জন্ম হলো আমাদের গ্রাসিয়েলার।

গ্রাসিয়েলা আমাদের পুরোনো জংধরা সাইকেলের নাম। হলুদ রঙের। ঐ সাইকেলে চড়িয়েই আমার মা আমাকে প্রতিদিন ট্রেনিং এ নিয়ে যেতেন। সাইকেলের সামনে একটা ছোট্ট ঝুড়ি আর পেছনে আরেকজন বসার জন্যে একটু জায়গা। এই নিয়ে আমাদের গ্রাসিয়েলা। একটা ছোট্ট সমস্যা তখনো ছিলো, আমাদের সাথে তো আমার বোনটাও যাবে। কিন্তু বসবে কি করে? বাবা তখন বুদ্ধি করে সাইকেলের পাশে কাঠের একটা পিঁড়ি জুড়ে দিলেন। ওখানে বসতো বোন।

একজন মা ছোট্ট একটা ছেলেকে সাইকেলের পিছনে আর ছোট্ট একটা মেয়েকে পাশে নিয়ে সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছেন। সাইকেলের সামনের ঝুড়িতে কিটব্যাগ, বুট আর কিছু স্ন্যাকস। আসা যাওয়া…ভয়াবহ সব এলাকা…ঝড়ের মধ্যে, বৃষ্টিতে কিংবা তীব্র ঠান্ডায়…আলো কিংবা অন্ধকারে। পরিবেশ কি তাতে মায়ের কিচ্ছু যায় আসেনা। মা সাইকেল চালাচ্ছে…কল্পনা করুনতো একবার দৃশ্যটা!

গ্রাসিয়েলা আমাদের নিয়ে যেতো সবখানে। যেখানে যেতে চেয়েছি, সবখানে। আমাদের ছোট্ট গ্রেসিয়েলা!

সেন্ট্রালে আমার সময়টা ছিলো খুব কঠিন। মা না থাকলে ফুটবল খেলাটা ছেড়েই দিতাম। দুবা এরকম পরিস্থিতি তৈরী হয়েছিলো। আমার বয়স তখন ১৫। শরীরটা ঠিকঠাক বাড়েনি। শুটকাপটকা ধরনের শরীর আমার। আমাদের কোচ ছিলেন একটু অ্যাগ্রেসিভ ধরনের। শরীর দিয়ে খুব এগ্রেসিভ হয়ে খেলে এরকম খেলোয়াড়দের বেশি পছন্দ করতেন। আমিতো ওরকম না, ছিলামও না, এখনও নই। তো একদিন কি হলো, ডি বক্সের ভেতরে একটা হেড করতে ঠিকঠাক লাফিয়ে উঠতে পারিনি।

ট্রেনিং শেষে কোচ সবাইকে ডাকলেন। আমাকে সবার মাঝে রেখে বললেন, “ খেলাতো পারিস না কোন **টাও। জীবনে কোন ***টাও ছিঁড়তে পারবানা। শালা***”

এরকম একটা পরিস্থিতি…ওই বয়সী একটা ছেলে…একেবারে বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছিলাম। কোচের কথা শেষ হবার আগেই একেবারে ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো কান্নাটা। সবার সামনে একেবারে। দৌড়ে পালিয়েছিলাম ওখান থেকে ।

বাড়ি ফিরে সোজা নিজের রুমে ঢুকে গেলাম। একা একটু কাঁদা দরকার। থাকেনা কিছু সময়, একা থাকা লাগে? একা নিজের সাথে বুঝতে হয়? ওরকম একটা সময় তখন। মা বুঝে ফেলেছিলেন, কোথাও কোন ঝামেলা হয়ে গেছে। ট্রেনিং থেকে ফিরে রাস্তায় খেলি অনেকক্ষন, ঐদিন কোন কথা নেই। কোন খেলা নেই। খুব ভাঙচুর হচ্ছিলো ভেতরে। মা চলে এলেন আমার রুমে। বলতেও খুব ভয় পাচ্ছিলাম। রাগ উঠলে এই এতটা রাস্তা সাইকেল চালিয়ে গিয়ে কোচকে একেবারে খোলা মাঠে মা ঠ্যাঙিয়ে আসবেন, আমি জানি। মা এমনিতে খুব চুপচাপ, শান্ত মানুষ। ওনার ছানাপোনাদের কিছু করছেন তো, দৌড়…ঝেড়ে দৌড় লাগান…আশপাশের এলাকায় থাকাটা একেবারে জীবনের ঝুঁকি বলতে পারেনণইমাকে বললাম মারপিট করেছি।

মা কিন্তু জানতেন ডাঁহা মিথ্যে কথা। অন্য সব মা যা করতেন এই সময়ে, মা ও তাই করলেন। আমার এক টীমমেইটের মা কে ডেকে পুরো ঘটনা শুনে নিলেন।

সব শুনে মা যখন আবার আমার রুমে ফিরলেন, অঝোরে কাঁদছি। বললাম, ফুটবল খেলবো না। আর খেলবো না। পরের দিন আমি আমার রুম থেকেই বের হইনি। স্কুলে যাইনি। সারাটা দিন বিছানায়। খুব বেশি লেগেছিলো ভেতরটায়।মা এসে বিছানায় বসে মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,”তুই খেলবি এঞ্জেল। আজকেই যাবি তুই। ঐ ব্যাটাকে দেখিয়ে দিতে হবে তুই ফেলনা নোস”।

ওইদিনই আমি মাঠে ট্রেনিং এ ফিরেছি। মাঠে যা হলো তাতে আমি অবাক হয়েছি। মানুষের উপর বিশ্বাস এসেছে। যে মানুষের জণ্যে আমাদের দুবেলা খাবার নিয়ে চিন্তাইয় পড়তে হয়েছে, যে মানুষ আমাকে খোলা আকাশের নিচে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছে, সেই মানুষের উপরেই বিশ্বাস ফিরেছে। আমার দলের সতীর্থরা আমাকে নিয়ে একটুও রসিকতা করেনি। বরং সাহাজ্য করেছে প্রাণপনে। বাতাসে যখন বল ভেসে এসেছে ডিফেন্সের খেলোয়াড়েরা আমাকে হেড করার সুযোগ করে দিয়েছে। আমার একটু ভালো লাগানোর জণ্য সতীর্থরা মাঠে সবটুকু উজাড় করে দিলো সেদিন। সবাই এত এত খেয়াল রাখলো আমার! এতটা ভালোলাগা আমার কখনো আসেনি।

তখনও খুব শুটকাপটকা ধরনের শরীর। বয়স হয়ে গেছে ১৬। সেন্ট্রালের সিনিয়র দলে নাম আসেনি। বাবা এ নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় ছিলেন। একদিন রাতে সবাই খেতে বসেছি। বাবা বললেন,” তোর কাছে তিনটা অপশন আছে অ্যাঞ্জেল। আমার সাথে কাজে যেতে পারিস। স্কুলের পড়াটা শেষ করতে পারিস। অথবা ফুটবলে আরেকটা বছর দিয়ে দেখতে পারিস। যদি কাজ না হয় আমার সাথে এসে কাজ শুরু করতে হবে।“

কিছুই বলিনি। কি বলবো আসলে? খুব জটিল পরিস্থিতি তো। আমাদের বাঁচার জন্যে টাকাটাও দরকার।

শেষমেষ মা বললেন। “আরেক বছর খেলুক অ্যাঞ্জেল।“

ডিসেম্বর। ডিসেম্বরের একেবারে শেষের দিকে সেন্ট্রালের পক্ষ হয়ে প্রিমেরা দিভিশিওনে আমার অভিষেক হয়।

আমার খেলোয়াড়ি জীবনের সেই শুরু, ওইদিনই। কিন্তু ভেতরে সত্যটা হচ্ছে আমাদের যুদ্ধ শুরু হয়েছে আরো অনেক আগে। অনেক আগে। আমার বুটের তলা যখন মা আঠা দিয়ে জোড় দিতেন আমাদের যুদ্ধটা শুরু হয়েছে তখন থেকে। গ্রাসিয়েলাতে চাপিয়ে রোদ ঝড় বৃষ্টিতে মা আমাকে যখন ট্রেনিং এ নিয়ে যেতেন, আমাদের যুদ্ধটা শুরু হয়েছে তখন থেকে। এমনকি যখন আর্জেন্টিনায় পেশাদার ফুটবলার হিসেবে যাত্রা শুরু করি, যুদ্ধটা তখনো চলছে। সাউথ আমেরিকার বাইরের কারো পক্ষে বিষয়টা বোঝা খুবই কঠিন। এখানে থেকে না দেখলে, ঐ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে না গেলে কারো পক্ষে বিশ্বাস করা আসলেই কঠিন।

কলম্বিয়াতে একবার ন্যাশিওনাল এর বিপক্ষে খেলতে যেতে হয়েছিলো আমাদের। ঐদিনের কথা আমার খুব বেশি করে মনে আছে। প্রিমিয়ার লীগ বা লা লীগায় যেরকম এয়ার ট্রাভেল ওখানে এয়ার ট্রাভেলটা ওরকম না। বুয়েনস আয়ারসে খেললে যেরকম সেরকমও না। কারন ঐ সময় রোজারিওতে কোন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট ছিলোনা। ছোট্ট একটা এয়ারপোর্ট। যেদিন ওখানে যে বিমান থাকবে সেটাতেই চড়তে হবে। কোন প্রশ্ন করা যাবেনা। করে হবেইবা কি?

এয়ারপোর্টে গিয়ে দেখি ইয়া বড় এক কার্গো প্লেন বসে আছে রানওয়েতে। পেছনে বিরাট র‍্যাম্প ওয়ালা কিছু কার্গো প্লেইন আছেনা? গাড়ি টাড়ি নেয় যে প্লেইনে ওগুলো। দেখা গেলো ওটাই আমাদের, ওতেই চড়তে হবে। নামটাও আমার পরিস্কার মনে আছে। হারকিউলিস।

র‍্যাম্প নেমে এলো। ওয়ার্কাররা প্লেইনের ভেতরে ম্যাট্রেস ঢোকানো শুরু করলেন।

হতভম্ব হয়ে আমরা একজন আরেকজনের দিকে তাকাচ্ছিলাম। হচ্ছেটা কি?

গেলাম প্লেইনের সামনে বসার জন্যে। ওয়ার্কারেরা হাতে হেডফোন ধরিয়ে দিয়ে বললো, “পেছনে চলে যান। ওখানেই আপনাদের বসার জায়গা।“

প্লেইনের তীব্র শব্দ আটকানোর জণ্যে আমাদেরকে মিলিটারি হেডফোন দেয়া হয়েছিলো। প্ল্যাটফর্মে উঠে দেখি কয়েকটা সীট আছে। আর বাকীদের জন্যে প্লেইনের মেঝেতে কার্পেট পাতা। কার্পেটে শুয়ে যাও, আপত্তি নেই কারো। প্লেইন চলা শুরু করলো, আমরা যারা শুয়েছিলাম, পিছলে নেমে যেতে শুরু করলাম। তীব্র শব্দে কেউ কারো কথা শুনতে পাচ্ছিনা। পিছলে যাবার সময় সবাই চিৎকার করে খালি বলছিলো, “পেছনে লাল বাটন থেকে সাবধান। খুব সাবধান। চাপ পড়লে সবকয়টা আজকেই শেষ।“সবাই যে একই কথা বলেছি টা আমরা অবশ্য জেনেছি প্লেইন থেকে নামার পর, ও সময় আমরা কেউই তো শুনতেই পাইনি।

অবিশ্বাস্য একটা ব্যাপার। ঐ জীবনে দিন কাটিয়ে না এলে তাহলে বিশ্বাস করবেন না।

যে জীবন ফড়িঙের, দোয়েলের–মানুষের সাথে তার হয়নাকো দেখা…এরকম ব্যাপারটা। আমার দলের অন্যান্যদের জিজ্ঞাসা করে দেখতে পারেন। সত্যিই হয়েছিলো। আমাদের নিজেদের প্রাইভেট প্লেইন, হারকিউলিস!

তারপরেও একধরনের সুখ নিয়ে আমি ঐ স্মৃতির দিকে তাকাই। রোমন্থন করি। আর্জেন্টিনায় ফুটবল দিয়ে যদি কিছু করতে হয়, যা করা দরকার তাই করতে হবে। দিতে হবে সর্বোচ্চটাই। যেই প্লেইনই এয়ারপোর্টে থাকুক, তাতেই চড়তে হবে। কোন প্রশ্ন করা যাবেনা।
সুযোগ থাকলে সেই প্লেইনে চড়তে হবে ওয়ান ওয়ে টিকেট কেটে। আমার জন্যে এরকম সুযোগটা ছিলো পর্তুগালের বেনফিকায়। আমার ক্যারিয়ারের দিকে তাকিয়ে অনেকে চোখ কপালে তুলে ফেলতে পারেন। ভাবতে পারেন, “ওয়াও, ছেলেটা বেনফিকায় খেলেছে, তারপর রিয়াল মাদ্রিদ, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, এবং পি এসজি।“ বিষয়টা হয়তো দেখতে খুব সাধারন লাগছে। এর মাঝে যে কি গেছে তা কারো জন্যে কল্পনা করাও কঠিন। ১৯ বছর বয়সে বেনফিকায় গিয়ে আমি দুই সীজনও খেলতে পারিনি। আমার বাবা চাকরি ছেড়ে চলে এলেন পর্তুগালে। নিজের স্ত্রীর সাথে তখন গোটা এক মহাসাগর দুরত্ব তাঁর। মাঝে মাঝে রাতে বাবাকে ফোনে কথা বলতে শুনতাম। বাবা কাঁদতেন, বাচ্চাদের মতো কাঁদতেন। মাকে খুব মিস করতেন বাবা।.

কখনো কখনো মনে হতো জীবনে একটা বড় ভুল করে ফেলেছি। হচ্ছেনা কিছুতেই। শুরু থেকে খেলতে পারছিনা। মনে হতো সব ছেড়েছুড়ে সোজা বাড়ি চলে যাই।

এরপর এলো ২০০৮ এর অলিম্পিক। আমার জীবন বদলে দিয়েছে সেই অলিম্পিক। আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে আমার ডাক পড়লো। বেনফিকায় আমি তখনো পুরো নব্বই মিনিট খেলার সুযোগ পাইনি। ঐ সময়টার কথা আমি কখনো ভুলবোনা। এই টুর্নামেন্টে আমি সুযোগ পেয়েছিলাম লিওনেল মেসির সাথে খেলার। অন্য পৃথিবীর, এক অতিমানব খেলোয়াড়। ওর সাথে ফুটবলটা খেলে আমি সবচে বেশি মজা পেয়েছি। আমাকে কিছুই করতে হতোনা, শুধু ফাঁকা একটা জায়গা বের করে একটা ছোট্ট দৌড় দিতে হতো। বল আসবেই ওই জায়গায়। ম্যাজিক। একদম ম্যাজিকের মতো।

আপনার আমার চোখ যেভাবে কাজ করে, লিওর চোখ ওভাবে কাজ করেনা। আমাদের চোখ দুপাশ থেকে দেখে। লিও তো সেরকম করে দেখেই, পাখির মতো ওপর থেকে দেখার এক আশ্চর্য ক্ষমতা আছে লিওর। আমি জানিনা এটা কিভাবে সম্ভব।

আমরা ফাইনালে গেলাম। আমাদের বিপক্ষে নাইজেরিয়া। আমার জীবনের সবচে স্মরণিয় সম্ভবত ঐ দিনটা। আমার গোলে আর্জেন্টিনা অলিম্পিকে গোল্ড পেয়ে গেলো…অনুভূতিটা আসলে বোঝাতে পারবোনা।

আমার বয়স তখন মাত্র ২০ বছর। বেনফিকায় পুরোটা সময় খেলার সুযোগ পাচ্ছিনা। পরিবার আলাদা দুই দেশে থাকেন। ঐ টুর্নামেন্টে খেলার জন্যে ডাক পাবার আগে খুব অসহায় একজন মানুষ ছিলাম আমি। প্রচন্ড অসহায়। আর ঠিক দু বছরের মাথায় আর্জেন্টিনার হয়ে সোনা জিতলাম, বেনফিকাতে খেলছি এরপর ট্রান্সফার হয়ে গেলাম মাদ্রিদে।

খুব গর্বের একটা সময়। শুধু আমার জন্যে না। আমার পরিবার, বন্ধুবান্ধব, সতীর্থ যাঁরা আমাকে দিনের পর দিন সাহস দিয়ে গেছেন, সমর্থন দিয়ে গেছেন সবার জন্যে গর্বের। শুনতে পাই আমার বাবা আমার চেয়ে ভালো ফুটবলার ছিলেন। তাঁর সময়ে খেলতেন আমার চাইতে অনেক ভালো। হাঁটু ভেঙে তাঁর স্বপ্নটা ভাঙে। শুনেছি আমার দাদা আমার বাবার চাইতে ভালো খেলতেন। এক ট্রেন দুর্ঘটনায় দুই পা হারিয়ে তাঁর স্বপ্নটাও হারিয়ে যায়।

আমার স্বপ্নও অনেকবার মৃত্যুর খুব কাছাকাছি চলে গিয়েছিলো। অনেকবার।

বাবা নিরলস কাজ করে গেছেন…টানা দিনের পর দিন…টিনের চালার নীচে…প্রচন্ড গরম, তীব্র শীতের ভেতর…মা সাইকেলের প্যাডেল চালিয়ে গেছেন রোদ,ঝড়,বৃষ্টিতে…ফুটবল নিয়ে আমি দৌড়ে বেড়িয়েছি উন্মাদের মতো…

ভাগ্যে বিশ্বাস করেন কিনা জানিনা। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে আমি প্রথম যে দলের বিপক্ষে গোলটা করেছি, দলটার নাম জানেন?
হারকিউলিস সিএফ।

অনেকটা তো বললাম, এবারে নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন ফাইনালের আগে আমি কেন সাবেলার সামনে গিয়ে কেঁদেছি। আমি নার্ভাস ছিলাম না। আমার ক্যারিয়ার নিয়ে শঙ্কিত ছিলাম না। এমনকি ম্যাচের শুরু থেকে খেলতে পারবো কিনা সেটাও আমার মাথায় ছিলোনা।

এই বুকে হাত রেখে বলছি, আমি শুধু স্বপ্নটাকে ছুঁয়ে দিতে চেয়েছি। চেয়েছিলাম আমার দেশে আমাদের নামটা যেন কিংবদন্তীর মতো করে সবাই মনে রাখে। একদম কাছে চলে গিয়েছিলাম আমরা…একদম।

একারনে আমাদের দলের প্রতি মিডিয়ার আচরনে মনটা ভেঙে গিয়েছিলো। নেগেটিভিটি, সমালোচনা কখনো কখনো সীমা ছাড়িয়ে যায়। খুব অসুস্থ ব্যাপারটা। আমরাতো সবাই মানুষ। এমন অনেক কিছুইতো হয় আমাদের যে বিষয়গুলো অন্যেরা কোনদিন জানতেও পায়না।

ফাইনাল কোয়ালিফাইং খেলা গুলোর আগে আমি সাইকোলজিষ্ট দেখানো শুরু করেছিলাম। মাথার ভেতর সব খুব অসহ্য লাগতো। সাধারনত আমি পরিবারের উপর খুব নির্ভর করি এরকম সময়গুলোতে। ওবার তা হয়নি। জাতীয় দলের উপর প্রেশারটা বেশি, অসম্ভব বেশি ছিলো। সাইকোলজিষ্টের সাথে দেখা করাটা আমার খুব কাজে দিয়েছিলো। ফাইনালের দুই ম্যাচে খুব রিলাক্সড ছিলাম, নির্ভার ছিলাম।

নিজেকে বার বার মনে করিয়ে দিয়েছি, আমি পৃথিবীর সেরা একটা দলের অংশ। খেলছি নিজের দেশের জন্যে। ছেলেবেলায় যে স্বপ্ন দেখেছি, সেই স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে আছি। মাঝে মাঝে পেশাদারিত্ব এই খুব সাধারন বিষয়গুলো মাথা থেকে সরিয়ে দেয়। সরিয়ে না দিলেও ঢেকে রাখে।

এরপর খেলাটা আমার কাছে নিছক খেলাই হয়ে গেলো।

আজকাল সবাই ইনস্টাগ্রাম বা ইউটিউবে দেখে নেয় সবকিছু।
খেলার ফলাফল খুব সহজে জেনে যাওয়া যায় কিন্তু ওর পেছনে কত কত যে ঘাম, আনন্দ-বেদনার কাব্য লুকিয়ে আছে তা কেউ দেখতে পায়না। মেয়েকে সাথে নিয়ে চ্যাম্পিয়নস লীগ ট্রফি সহ ছবি তুলেছি, ছবি দেখে সবার ধারণা বাহ, সবতো ঠিকই চলছে। কোথাও কোন গড়বড় নেই। কিন্তু কেউ জানেনা ঐ ছবিটা তোলার ঠিক এক বছর আগে আমার এই মেয়েটাই প্রিম্যাচিওর অবস্থায় জন্মেছিলো, দুমাস টানা হাসপাতালে ছিলো মেয়েটা। সারা শরীরে লাগানো ছিলো টিউব,তার…

ছবিটায় ট্রফিটার সাথে আমাকে কাঁদতে দেখা গেছে। সবাই ভাবছে জেতার আনন্দে কাঁদছি। ফুটবলের জন্যে কাঁদছি। সত্যিটা কি জানেন? কেঁদেছি আমার মেয়েটার জন্যে। এইযে ও বেঁচে আছে, আমার সাথে বেঁচে ধরে আছে ট্রফি, এই আনন্দে আমি কেঁদেছি।

সবাই বিশ্বকাপ ফাইনাল দেখেছে, ফলটা দেখেছে।

০-১

কত সম্ভব অসম্ভব যুদ্ধ জয় করে আমরা কজন সে জায়গায় পৌঁছেছিলাম, কেউ কি তা জানে?

লিভিং রুমের দেয়াল কি করে সাদা থেকে কালো হয়ে যায়, তা কি জানে কেউ?

টিনের চালার নীচে আমার বাবার দিনের পর দিন পরিশ্রমটা কেউ দেখেনি।

রোদ,ঝড়, বৃষ্টিতে গ্রেসিয়েলায় প্যাডেল চাপা আমার মাকে কি ওরা কখনো দেখেছে?

ওরা হারকিউলিস সম্পর্কে কি জানবে কখনো?

মূলঃ প্লেয়ারস ট্রিবিউন
অনুবাদঃ মানিক চন্দ্র দাস।

এবারের ফিতরা সর্বনিম্ন ৭০ টাকা

আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে এ বছর জনপ্রতি সর্বনিম্ন ৭০ টাকা ফিতরা নির্ধারণ করা হয়েছে। সেইসঙ্গে সর্বোচ্চ ফিতরা নির্ধারণ করা হয়েছে দুই হাজার ৩১০ টাকা।

রাজধানীর বায়তুল মোকাররম মসজিদের সভাকক্ষে ইসলামী ফাউন্ডেশনের জাতীয় ফিতরা নির্ধারণ কমিটির সভায় এই ফিতরা নির্ধারণ করা হয়।

ইসলাম ধর্মের নিয়ম হলো, ঈদুল ফিতরের নামাজের আগেই ফিতরা দিতে হয়। প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলমানের জন্য ফিতরা দেওয়া ওয়াজিব।

গত বছর ফিতরার হার সর্বনিম্ন ৬৫ টাকা ও সর্বোচ্চ এক হাজার ৯৮০ টাকা ছিল।

সারা দেশে গম বা আটার বাজারমূল্য হিসাব করে এই সর্বনিম্ন ফিতরা নির্ধারণ করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী, এক কেজি ৬৫০ গ্রাম গম বা আটা অথবা খেজুর, পনির, যব বা কিশমিশের মধ্যে যেকোনো একটি পণ্যের তিন কেজি ৩০০ গ্রামের বাজারমূল্য ফিতরা হিসেবে গরিবদের মধ্যে বিতরণ করা যায়।

এখন থেকেই কি পারি না মৃত্যুর প্রস্তুতি নিতে- মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী

‘কুল্লুু নাফসিন জা ইকাতুল মাওত।’ ‘প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ নিতে হবে।’ সৃষ্টির শুরু থেকেই আল্লাহতায়ালা এ নিয়মে বেঁধে রেখেছেন তার সব সৃষ্টিকে। মৃত্যুর সুধা প্রত্যেক মানুষকেই পান করে কবরঘরে প্রবেশ করতে হবে।

এ মৃত্যু থেকে বাঁচা বা পালানোর কোনো সুযোগ নেই। আল্লাহ বলেন, কুল ইন্নাল মাওতাল্লাজি তাফিররুনা মিনহু, ফাইন্নাহু মুলাকিকুম। অর্থ, ‘হে নবী! মানুষকে জানিয়ে দাও যারা মৃত্যু থেকে পালিয়ে বেড়ায়, একদিন মৃত্যু এসেই তাদের সঙ্গে মোলাকাত করবে।’ যখন কারও নির্ধারিত সময় এসে পড়বে তখন এক মুহূর্ত আগ-পিছ হবে না। নির্দিষ্ট সময়েই তাকে সাড়া দিতে হবে মৃত্যুর ডাকে।

আমরা যখন মায়ের পেটে ছিলাম তখন আমাদের ছোট্ট দেহে রুহু ফুঁকে দেওয়া হয়েছিল। এ রুহুই আসল জীবন। দেহ খাঁচা ছেড়ে যখন রুহু পাখি চলে যায় তার আপন দেশে তখনই আমরা বলি মানুষটি মরে গেছে। আসলে মানুষটি মরেনি। মরেছে তার মাটির দেহ। রুহু ছাড়া দেহের কীইবা মূল্য! তাই তো রুহুহীন দেহের নাম রাখা হয়েছে ‘লাশ’। আরবি লাশ শব্দটি ‘লা শাইউন’-এর সংক্ষিপ্ত রূপ। এর অর্থ ‘কিছুই না’। রুহু ছাড়া দেহ যে আসলেই কিছু নয় বিষয়টি চমৎকারভাবে ছন্দের ফ্রেমে বন্দী করেছেন বিশিষ্ট ধর্মচিন্তাবিদ ও সুফি ছড়াকার হাফেজ আহমাদ উল্লাহ। ‘দেহ নৌকায়/রুহু ভাসে,/তাই তো মানুষ/কাঁদে হাসে।/দেহ নৌকায়/ রুহু নাই,/কারও আহা/উঁহু নাই।’

বলছিলাম, রুহুই আসল জীবন। রুহু চলে গেলে আমাদের এ ক্ষণস্থায়ী জীবন শেষ হয়ে যাবে। শুরু হবে অনন্ত আখিরাতের জীবন। এ কথা বোঝানোর জন্যই যুগে যগে লক্ষাধিক নবী-রসুল পাঠিয়েছেন আল্লাহ রব্বানা। সর্বশেষ আসমানি গ্রন্থ আল কোরআনের প্রায় এক তৃতীয়াংশজুড়েই আখিরাতের জীবনের আলোচনা করা হয়েছে খোলাখুলিভাবে। যুক্তিতর্কের মানদণ্ডে প্রমাণসহ বলে দেওয়া হয়েছে, একদিন এ পৃথিবী ছেড়ে সবাইকে চলে যেতে হবে আরেক পৃথিবীতে। যার শুরু আছে, শেষ নেই। সেই অনন্ত জীবনে সুখে-শান্তিতে থাকার জন্যই এই অল্প দিনের পৃথিবীতে আল্লাহর আদেশ মেনে চলতে হবে।

এ পৃথিবী ছেড়ে ওই পৃথিবীতে যাওয়ার জন্য আল্লাহতায়ালা একটি বাহনের ব্যবস্থা করেছেন। সেই বাহনটির নামই মৃত্যু। মৃত্যুর বাহনে চড়ে আমরা কবর হয়ে চলে যাব চিরশান্তিময় জান্নাতে। যারা দুনিয়ার জীবনে আল্লাহর আদেশমতো চলেনি তাদের জন্য কিন্তু বিষয়টি সহজ নয়। মৃত্যু থেকে শুরু করে কবর, হাশর, পুলসিরাতসহ প্রতিটি স্টেশন তাদের জন্য কঠিন থেকে কঠিন হতে থাকবে। বদনসিব যারা তারা জান্নাতের বদলে চির-আজাবের স্থান জাহান্নামে চলে যাবে।

আমরা যদি জাহান্নাম থেকে বাঁচতে চাই, চিরশান্তির জান্নাতে যেতে চাই তবে আমাদের মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। মৃত্যুর পরের জীবনের কথা ভেবে প্রতিটি পদক্ষেপ ফেলতে হবে। রসুল (সা.) বলেছেন, ‘বুদ্ধিমান তো সে-ই, যে মৃত্যুর কথা ভাবে এবং মৃত্যু-পরবর্তী জীবনের জন্য কাজ করে।’ এমন ব্যক্তি মৃত্যুতে বিচলিত হয় না, ভয় পায় না। বরং মৃত্যুকে মনে করে খোদার পক্ষ থেকে এক মহাপুরস্কার। কেননা মৃত্যুর বাহনে চড়েই তো সে তার প্রিয়তম আল্লাহর বাড়িতে যাবে, এর চেয়ে আনন্দের আর কী হতে পারে! মুসনাদে আহমাদে আল্লাহর বন্ধু হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর মৃত্যুর ঘটনা বলা হয়েছে। মৃত্যুর ফেরেশতা হজরত আজরাইল (আ.) তার রুহু কবজ করতে এলে তিনি বললেন, ‘তুমি কার নির্দেশে এসেছ?’

‘আল্লাহর নির্দেশে।’

‘আচ্ছা, বলো তো কোনো বন্ধু কি তার বন্ধুর রুহু কবজের নির্দেশ দিতে পারেন?’  ইবরাহিম নবীর প্রশ্ন শুনে আজরাইল ফেরেশতা ঘাবড়ে গেলেন। আল্লাহতায়ালা আজরাইলকে বললেন, ‘আমার বন্ধুকে জিজ্ঞাসা কর— কোনো বন্ধু কি তার বন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে অপছন্দ করবে? মৃত্যু বাহনে না চড়ে তো ইবরাহিম আমার বাড়ি আসতে পারবে না।’ এবার ইবরাহিম (আ.)-এর হৃদয়ে আল্লাহ-প্রেমের ঢেউ জেগে উঠল। তিনি সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ‘ভাই আজরাইল! আর এক মুহূর্তও দেরি করো না। এক্ষুনি আমার রুহু পাখিকে দেহ খাঁচা থেকে মুক্ত করে প্রেমময় আল্লাহর বাড়ি নিয়ে চল।’ এই হলো মৃত্যুসচেতন মানুষের অবস্থা। আর যারা মরণকে ভুলে লাগামহীন জীবনযাপন করে বেড়ায় তাদের কোরআন বলে দিয়েছে, ‘হাত্তা ইজাজা আআহাদাহুমুল মাওতু, কালা রাব্বির জিউন। লাআল্লি আমালু সালিহান ফিমা তারাকতু। কাল্লা, ইন্নাহা কালিমাতুন হুয়া কা-ইলুহা।’ অর্থ, মরণভোলা মানুষের কাছে যখন মৃত্যু এসে পড়বে তখন সে বলবে, ‘হে আল্লাহ! মৃত্যুকে আমার থেকে ফিরিয়ে নিন। আমাকে আবার আমার জীবন-সময় ফিরিয়ে দিন। যাতে বেশি বেশি ভালো কাজ করে মৃত্যুর প্রস্তুতি নিতে পারি। এত দিন আমি মরণকে ভুলে থেকে, মরণের প্রস্তুতি না নিয়ে কী ভুলই না করেছিলাম হে আল্লাহ!’ হে দুনিয়ার মানুষ শোনো! মরণভোলা মানুষটি এখন যা বলছে, এটা কখনই হওয়ার নয়। আর এক মুহূর্তও তাকে দেওয়া হবে না। মরণ তো একদিন আসবেই। যদি আমরা মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নিই তবে হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর মতো হাসিমুখে মরণকে বরণ করতে পারব। আর যদি মৃত্যুকে ভুলে দুনিয়ার রঙে ডুবে থাকি তখন মরণ আসামাত্রই ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যর্থ আরজি জানাতে হবে আল্লাহর দরবারে। অথচ আমাদের সামনে কত অফুরান সময় পড়ে রয়েছে। আমরা কি পারি না এখন থেকেই মরণের প্রস্তুতি নিতে? আখিরাতমুখী জীবন গড়তে?

লেখক : বিশিষ্ট মুফাসসিরে কোরআন ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব।

আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি কঠিন পরিশ্রমের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার জন্য — আল-বালাদ

না! আমি শপথ করছি এই শহরের। এমন এক শহরের যার নাগরিক স্বয়ং তুমি। শপথ করছি জন্মদাতার এবং যা সে জন্ম দেয়। নিঃসন্দেহে আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি কঠিন পরিশ্রমের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার জন্য। সে কি মনে করে যে, তার উপরে কারও ক্ষমতা নেই? বলে কিনা, “অনেক টাকা উড়িয়ে দিলাম।” সে কি মনে করে যে, তাকে কেউ দেখছে না?
আমি কি তাকে দুটো চোখ বানিয়ে দেইনি? একটা জিভ, দুটো ঠোঁট? আমি কি তাকে ভালো-মন্দের পরিষ্কার দুটো পথ দেখিয়ে দেইনি? — আল-বালাদ

শপথ করছি জন্মদাতার এবং যা সে জন্ম দেয়

কুর‘আনে যখন আল্লাহ تعالى কোনো কিছুর শপথ নেন, তার মানে সেটা কোনো বিরাট ব্যাপার। মানুষ যেন তা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা ভাবনা করে। এই সুরাহ’য় আল্লাহ تعالىআমাদেরকে পৃথিবীতে যে প্রাণ জন্ম দেওয়ার পদ্ধতি রয়েছে, তা লক্ষ্য করতে বলছেন। আমরা কি চিন্তা করে দেখেছি, আজকে জন্ম দেওয়ার যে পদ্ধতি আল্লাহ تعالى দিয়েছেন, তার থেকে ভালো কোনো পদ্ধতি কিছু হতে পারে কিনা? যদি কোনো উদ্ভিদ বা প্রাণী তার জন্মদাতা ছাড়াই এমনিতেই জন্ম হতো, তাহলে কী অবস্থা হতো? প্রথম জন্মদাতাকে কে জন্ম দিয়েছিল?

আমরা জানি, মুরগি ডিম পারে, তারপর ডিম থেকে মুরগি হয়। কিন্তু সর্বপ্রথম মুরগি ডিম ছাড়াই কীভাবে জন্ম নিলো? যদি সে ডিম থেকে এসে থাকে, তাহলে সেই ডিম কে পেড়েছিল?

বিবর্তনের ধারনা অনুসারে এক প্রাণী বিবর্তিত হয়ে আরেক প্রাণী তৈরি হয়। তার মানে একসময় এমন একটা প্রাণী ছিল, যা ডিম পাড়ত না। কিন্তু তারপর তা বিবর্তিত হয়ে ডিম পাড়া শুরু করলো। কিন্তু ডিম পাড়ার জন্য যে জটিল অঙ্গপ্রত্যঙ্গ লাগে, সেটা কীভাবে কোনো একটা প্রাণীর মধ্যে হঠাৎ করে তৈরি হলো? একটা প্রাণী আগে ডিম পাড়ত না, কিন্তু এক প্রজন্ম থেকে সেটা হঠাৎ করে ডিম পারা শুরু করলো —সেটা কীভাবে সম্ভব? আবার, কয়েক প্রজন্ম ধরে একটা প্রাণী তার ভেতরে ডিম পাড়ার অঙ্গ একটু একটু করে তৈরী করছিলো, এটাও তো বিবর্তনের বিরোধী। কারণ বিবর্তন জটিল অপ্রয়োজনীয় বা আংশিক অঙ্গ তৈরী করে না। —এভাবে প্রতিটি প্রাণীর প্রথম জন্মদাতা কীভাবে আসলো, তা নিয়ে কি আমরা চিন্তা করেছি? আল্লাহ تعالى যে জন্মদাতার শপথ করেছেন, তার পেছনে এক বিশাল রহস্য রয়েছে। এর সমাধান মানুষ হাজার বছর গবেষণা করেও পায়নি।

আবার ধরুন, পৃথিবীতে জন্মদাতার কোনো ধারনা ছিল না। পুকুর, নদী, নালা, খাল, বিল, মাটি থেকে এমনিতেই কিছুক্ষণ পর পর বিভিন্ন উদ্ভিদ এবং প্রাণী জন্ম হয়ে বেরিয়ে আসতে থাকে। তাহলে কী অবস্থা হতো আমরা কল্পনা করি।

প্রথমত, যদি উদ্ভিদ এবং প্রাণী বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থের মিশ্রণে নিজে থেকেই জন্ম নিতো, তাহলে সেগুলোর কারও মধ্যে কোনো মিল থাকতো না। কারণ রাসায়নিক পদার্থের একেক মিশ্রণ থেকে একে রকমের প্রাণ তৈরি হতো। একবার হয়ত একটা ডাল-পালা, পাতা সহ একটা গাছ তৈরি হতো। আরেকবার ডালের আগায় পাতার বদলে চোখ সহ আরেকটা গাছ তৈরি হতো। আরেকবার একটা প্রাণী তৈরি হতো যার এক পায়ে গাছের মূল, আরেক পায়ে অক্টোপাসের শুঁড়। আল্লাহ تعالى জন্মদাতার ব্যবস্থা করেছেন দেখেই এক ধরণের প্রাণ থেকে একই ধরণের আরও প্রাণ তৈরি হয়। না হলে ভয়াবহ অবস্থা হতো।

দ্বিতীয়ত, কিছু রাসায়নিক পদার্থ একসাথে মিশেই যদি প্রাণ তৈরি হয়ে যেত, তাহলে রাসায়নিক পদার্থের মিশ্রণ থেকে আসলে কখনই জটিল প্রাণ অর্থাৎ কোনো উদ্ভিদ বা প্রাণী হতো না। শুধুই ভাইরাস তৈরি হওয়া সম্ভব হতো, যা আসলে কোনো প্রাণ নয়। আজকে জন্মদাতার ধারনা আছে দেখেই ভাইরাসের থেকেও জটিল প্রাণ তৈরি হওয়া সম্ভব হয়েছে।

যে কোনো ধরনের জটিল প্রাণ তৈরির শর্ত হচ্ছে, তা তৈরি হতে হবে একটি নির্দিষ্ট ডিজাইন অনুসরণ করে। এই ডিজাইনকে জন্মদাতা তার সন্তানের মধ্যে কোনোভাবে দিয়ে দেবে। তারপর সেই ডিজাইন অনুসরণ করে হুবহু না হলেও, খুবই কাছাকাছি অনুরূপ একটি প্রাণ জন্ম নেবে। আর ডিজাইন হতে হবে নিখুঁত এবং একটি সম্পূর্ণ প্রাণী সুস্থ সবলভাবে তৈরী করার ডিজাইন। আল্লাহ تعالى এই ডিজাইন সংরক্ষণ করেন প্রতিটি কোষের ভেতরে ডিএনএ-র মধ্যে।

যেমন, মানুষের ডিএনএ-র মধ্যে আল্লাহ تعالى লিখে দিয়েছেন: কীভাবে মানুষের দেহকে বানাতে হবে। এগুলোর মধ্যে তিন শত কোটি নির্দেশ লেখা রয়েছে। এই নির্দেশগুলো বলে দেয় কীভাবে চোখ, হাত, পা, মাথা, দেহের ভেতরে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সবকিছু বানাতে হবে। কোনটার কী আকৃতি হবে, কী রঙের হবে, কী কাজ করবে। কোনটায় কী সমস্যা থাকবে। কোনটা কখন বিকল হয়ে যাবে। মানুষের শরীরের কয়েক লক্ষ কোটি কোষ কোথায় কোন জায়গায় বসবে, কীভাবে কাজ করবে, এই সবকিছু বলা থাকে ডিএনএ-তে।

এই তিন শত কোটি নির্দেশ বই আকারে ছাপালে ১৩০ খণ্ডের বই হয়, যা পড়তে মানুষের প্রায় ৯৫ বছর লাগবে। এই বিশাল নির্দেশমালা আল্লাহ تعالى সংরক্ষণ করছেন ক্রোমোজোম নামের এমন ক্ষুদ্র একটি ব্যবস্থায়, যা খালি চোখে দেখা তো যা-ই না, সাধারণ অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়েও দেখা যায় না, বিশেষ শক্তিশালী অণুবীক্ষণ যন্ত্র লাগে। আর এই ক্রোমোজোমগুলো, যা কিনা ১৩০ খণ্ডের বইয়ের সমান, হুবহু একইভাবে রাখা আছে দেহের প্রতিটি কোষে। আমাদের দেহে কয়েক লক্ষ কোটি কোষের প্রত্যেকটির মধ্যে ঠিক একইভাবে তিন শত কোটি নির্দেশ লেখা আছে।

তৃতীয়ত, জন্মদাতার ধারনা আছে দেখেই কোটি কোটি বছর ধরে প্রাণ টিকে আছে। কারণ যখন কোনো প্রাণীর এক প্রজন্ম আশেপাশের প্রতিকুল পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে টিকে থাকে, তখন তার ক্রোমোজোমের মধ্যে সেই পরিস্থিতির সাথে খাপখাইয়ে চলার জন্য কী কী পরিবর্তন দরকার হয়েছিল, তা সংরক্ষণ হয়ে যায়। এরপর যখন সেই ক্রোমোজোম থেকে সন্তান জন্ম নেয়, তখন তারা জন্ম নেয় সেই পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে চলার জন্য প্রয়োজনীয় বৈশিষ্ট্য নিয়েই। একে ‘প্রাকৃতিক নির্বাচন’ বলা হয়, যাকে অনেকে বিবর্তন বলে ভুল করেন। এই প্রাকৃতিক নির্বাচন আছে দেখেই উদ্ভিদ এবং প্রাণীজগত হাজারো প্রতিকূলতার মধ্যেও বংশবৃদ্ধি করে টিকে আছে। যদি কোটি বছর আগের আম গাছের ক্রোমোজোম নিয়ে আজকেও আম গাছ জন্ম হতো, তাহলে তা আজকের পৃথিবীর প্রতিকূলতার সাথে লড়াই করে হেরে গিয়ে কয়েকদিন পরেই মরে যেত। আম গাছ বছরের পর বছর নিজে সংগ্রাম করে বেঁচে থেকে, তারপর তার বেঁচে থাকার অভিজ্ঞতাকে ক্রোমোজোমের মাধ্যমে তার সন্তানদের মধ্যে দিয়ে দেয় দেখেই, তার সন্তান জন্ম নিয়েই সেই প্রতিকূলতার সাথে নিজেই সংগ্রাম করে টিকে থাকতে পারে।

মানুষ যদি সময় নিয়ে এই পদ্ধতিটির পেছনে কত বিস্ময়, কত রহস্য আছে তা ভেবে দেখে, তাহলে তারা আল্লাহর تعالى ক্ষমতা, সৃজনশীলতার অসাধারণ সব নিদর্শন খুঁজে পাবে। আল্লাহ تعالى কুর‘আনে মানুষকে বহুবার তাঁর সৃষ্টিজগৎ নিয়ে চিন্তা করতে বলেছেন। এগুলো বলার পেছনে উদ্দেশ্য রয়েছে। কারণ আল্লাহকে تعالى জানার জন্য আমাদের কাছে দুটো মাত্র উপায় রয়েছে। একটি হচ্ছে তাঁর দেওয়া বাণী। আরেকটি হচ্ছে আমাদের চোখের সামনে তাঁর এই বিশাল সৃষ্টিজগৎ। আল্লাহর تعالى সম্পর্কে একটি সুষম ধারনা পেতে হলে শুধু তাঁর বাণী পড়লেই হবে না, একইসাথে তাঁর সৃষ্টিজগৎ নিয়েও গবেষণা করতে হবে। নাহলে আমরা তাঁর সম্পর্কে একটি অসম্পূর্ণ, ভারসাম্যহীন ধারনা নিয়ে থাকবো। আমাদের ইসলাম বোঝা এবং মানা দুটোই ভারসাম্যহীন হয়ে যাবে।

ভারসাম্যহীন ইসলাম মানার ফলাফল হয় ভয়ংকর। প্রচুর ইসলাম নিয়ে পড়ার পরেও দেখা যায় আল্লাহর تعالى প্রতি শ্রদ্ধা তৈরি হয় না। নানা ধরনের সন্দেহ, প্রশ্ন মাঝে মধ্যেই ঈমানে ফাটল ধরিয়ে দেয়। কিছু মন মতো না হলে আল্লাহকে تعالى দোষ দিতে থাকে। “কেন আল্লাহ تعالى এরকম করলো? ওরকম কী হতে পারত না? আমার সাথেই এমন হলো কেন? অন্যের কেন এমন হয় না?” —এই সব প্রশ্ন জর্জরিত করে দেয়। আর সবচেয়ে ভয়ংকর অবস্থা হয় যখন ইসলাম নিয়ে পড়তে পড়তে একসময় ইসলামের প্রতি অনীহা চলে আসে। একবার সেই অবস্থায় চলে গেলে সেখান থেকে ফিরে আসা অনেক কঠিন।

নিঃসন্দেহে আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি কঠিন পরিশ্রমের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার জন্য

আমরা যদি মানুষের জন্ম নেওয়ার পদ্ধতি দেখি, তাহলে দেখবো, মানুষের জন্ম নেওয়ার মুহূর্ত থেকেই শুরু হয় তার পরিশ্রম। জন্ম নেওয়ার সময় তাকে চারিদিক থেকে পিষে সরু একটা সুরঙ্গ দিয়ে চেপেচুপে বের করা হয়। এরপর সে এসে পড়ে এক ভয়ংকর পরিবেশে। এতদিন সে এয়ারকন্ডিশন্ড পানির মধ্যে আরামে ভেসে বেড়াচ্ছিল। স্বয়ংক্রিয়ভাবে শরীরে পুষ্টি চলে যাচ্ছিল। খাওয়ার কষ্ট করতে হচ্ছিল না। এখন শুরু হলো তার ক্ষুধার কষ্ট। চিৎকার দিয়ে মা খুঁজে বের করে খাওয়ার জন্য পরিশ্রম করতে হয়। খেতে গেলে গলায় আটকে যায়। দম বন্ধ হয়ে যায়। হেঁচকি উঠে। তারপর মল ত্যাগের যন্ত্রণা। কিছুক্ষণ পর পর কাপড় ভিজিয়ে প্রস্রাব। তারপর উপর আছে ঠাণ্ডা এবং গরমের কষ্ট। পৃথিবীর যত ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া মহানন্দে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তার ছোট শরীর থেকে যত পারে পুষ্টি নিয়ে যায়। বিছানায় পোকা কুট কুট করে কামড়ায়। কাপড়ের ঘষা লেগে চামড়া জ্বলে লাল হয়ে যায়। কয়েকদিন পর পর সর্দি লেগে নাক বন্ধ, জ্বর, মাথা ব্যাথা। —কষ্টের পর কষ্ট। এভাবে সে হাজারো সংগ্রাম করে একটু একটু করে বড় হয়। একদিন বসা শেখে। তারপর একদিন কোনোমতে দাঁড়াতে পারে। তারপর একটু একটু করে হাটা। দৌড়াতে গিয়ে পড়ে গিয়ে ব্যাথা পাওয়া। বহু বছর সংগ্রামের পর একদিন গিয়ে নিজের দেহের উপর নিয়ন্ত্রণ পায়।

এতো গেল জন্মের প্রথম কয়েক বছর। আসল সংগ্রাম এখনও বাকি। শিশুকাল, বাল্যকাল, কিশোর বয়স, তরুণ, প্রবীণ, বৃদ্ধ বয়সের সংগ্রাম আসছে সামনে। একজন মানুষের জীবনের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সংগ্রামের পর সংগ্রাম। পৃথিবীতে সে আসে কত দুর্বল, অসহায় অবস্থায়। কয়েকদিনের জন্য কিছু শক্তি, সামর্থ্য পায়। তারপর আবার দুর্বল, অসহায় অবস্থায় ধুঁকে ধুঁকে জীবন পার করে একদিন মাটিতে গিয়ে কেঁচো, বিছা, ফাঙ্গাসের খাবারে পরিণত হয়। অথচ এই মানুষই কিনা—

সে কি মনে করে যে, তার উপরে কারও ক্ষমতা নেই? বলে কিনা, “অনেক টাকা উড়িয়ে দিলাম।” সে কি মনে করে যে, তাকে কেউ দেখছে না?

এই দুর্বল মানুষ, যার বেঁচে থাকার জন্য পরিশ্রমের কোনো বিরাম নেই, সেই মানুষই একটু নিজের পায়ে দাঁড়াতে পেরেই মনে করা শুরু করে যে, তার কাজের জন্য কাউকে জবাব দিতে হবে না। তখন সে নিজের লোভ-লালসা মেটানোর জন্য অন্যায়, অবিচার, দুর্নীতি করে। নোংরা বিনোদনে নিজের চরিত্রকে কলুষিত করে ফেলে। যে কোনো মূল্যে সে যা চাই, তাই তাকে পেতে হবে।

এদেরকে যখন কোনো ভালো কাজে কিছু দান করতে বলা হয়, তখন সে বলে, “আরে ভাই, কয়েকদিন আগেই ৮০ লাখ টাকা দিয়ে একটা গাড়ি কিনলাম। এখন আমাকে কিছু দিতে বলবেন না। আপনারা পরে আসেন।” এই ধরনের মানুষ কি চিন্তা করে দেখে না যে, কীসব কাজে সে টাকা উড়াচ্ছে, তার সবই আল্লাহ تعالى দেখছেন?

“সে কি মনে করে যে, তাকে কেউ দেখছে না?”

—এই হচ্ছে মানুষের পাপের মূল কারণ। মানুষ মনে করে যে, সে যখন টেবিলের তলা দিয়ে ঘুষ নিচ্ছে, চুপচাপ ফোনে আলাপ করে প্রজেক্ট থেকে কোটি টাকা মেরে দিচ্ছে, গোপনে মিটিং করে গরিবের হক, দেশের সম্পদ বিদেশে নিজের ব্যাংক একাউন্টে পাচার করে দিচ্ছে —এগুলো কেউ দেখছে না। তার মনে ঠিকই পুলিশ, ডিজিএফআই, দুদকের ভয় আছে; কিন্তু আল্লাহর تعالى ভয় নেই।

“সে কি মনে করে যে, তাকে কেউ দেখছে না?”

—এটাই হচ্ছে তাকওয়ার অভাব। তাকওয়া মানেই হচ্ছে, আল্লাহ تعالى তাকে সবসময় দেখছেন এবং তাকে তার সব কাজের জন্য আল্লাহর تعالى কাছে জবাব দিতে হবে। এই তাকওয়া না থাকলে মানুষ আর মানুষ থাকে না। তখন সে পশুর থেকেও অধম হয়ে যায়। একারণেই কুর‘আনে তাকওয়ার প্রতি এত জোর দেওয়া হয়েছে। একজন মানুষের যতই জ্ঞান, বুদ্ধি, প্রতিভা থাকুক না কেন, তাকওয়া না থাকলে সেগুলো নিজের এবং অন্যের ক্ষতি করতে কাজে লাগাতে খুব একটা বাঁধে না।

আমি কি তাকে দুটো চোখ বানিয়ে দেইনি? একটা জিভ, দুটো ঠোঁট?

আজকে যদি আমাদেরকে বলা হয়, এক কোটি টাকা দেওয়া হবে, চোখ দুটো বিক্রি করে দেন —আমরা কি রাজি হবো? যদি বলা হয়, এক কোটি টাকার বিনিময়ে আপনার জিভ এবং ঠোঁট দুটো দিয়ে দেন —কেউ কি আছে যে রাজি হবে?

আমরা আমাদের শরীরে কোটি কোটি টাকার সম্পদ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি। এই অমূল্য সম্পদগুলো না চাইতেই আল্লাহ تعالى বিনামূল্যে দিয়েছেন। এগুলো অর্জন করার জন্য আমাদেরকে কিছুই করতে হয়নি। এই সম্পদগুলো কেনার জন্য আজকে পৃথিবীতে অনেক অসুস্থ, বিকলাঙ্গ মানুষ তাদের সব সম্পদ দিয়ে দিতে রাজি আছে। অথচ এগুলো আমরা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পেয়েও এগুলোর কদর করি না, আল্লাহর تعالى প্রতি কৃতজ্ঞতা দেখানো তো দূরের কথা।

আল্লাহর تعالى দেওয়া এই অঙ্গগুলো ব্যবহার করেই আমরা আমাদের যাবতীয় সম্পদ অর্জন করি। এগুলো না থাকলে আমাদের জীবনে কোনো অর্জনই থাকতো না। অথচ এগুলো ব্যবহার করে সম্পদ অর্জন করার পর হঠাৎ করে কীভাবে যেন সব সম্পদ ‘আমার’ হয়ে যায়। তারপর আর আল্লাহর تعالى পথে ‘আমার’ সম্পদ খরচ করতে চাই না। —এরচেয়ে বড় অকৃতজ্ঞতা আর কী হতে পারে?

আমি কি তাকে ভালো-মন্দের পরিষ্কার দুটো পথ দেখিয়ে দেইনি? এরপরও সে কঠিন পথে চলার চেষ্টা করেনি। জানো সে কঠিন পথ কী? তা হচ্ছে, দাসকে মুক্তি দেওয়া। অথবা, কঠিন অভাবের দিনে খাবার দান করা, নিকটাত্মীয় এতিমদের এবং দারিদ্রের আঘাতে নিষ্পেষিত অসহায় মানুষকে। তারপর এমন সব মানুষদের একজন হয়ে যাওয়া, যারা গভীর বিশ্বাস করেছে এবং একে অন্যকে ধৈর্য ধারণ করতে তাগাদা দেয় এবং একে অন্যকে দয়া-মমতার প্রতি তাগাদা দেয়। তারাই তো সৌভাগ্যবান দল।

কিন্তু এরপরেও যারা আমার বাণী অস্বীকার করেছে, তারা হতভাগার দল। এদেরকে চারিদিক থেকে আগুন ঘিরে ফেলবে। —আল-বালাদ

আমি কি তাকে ভালো-মন্দের পরিষ্কার দুটো পথ দেখিয়ে দেইনি?

সুধীবৃন্দরা প্রশ্ন করেন, “কেন মানুষকে ইচ্ছার স্বাধীনতা দিয়ে আবার তাদেরকে এত সব নিয়ম দেওয়া হলো? একদিকে স্রস্টা মানুষকে চিন্তাভাবনার স্বাধীনতা দেবে, নিজের ভালমন্দ বোঝার ক্ষমতা দেবে, আবার অন্যদিকে বলে দেবে যে, এটা করা যাবে না, ওটা খাওয়া যাবে না, এটা দেখা যাবে না, ওটা শোনা যাবে না। —স্বাধীনতা দিয়ে আবার স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া—এটা কি স্ববিরোধী কাজ নয়? এরকম স্ববিরোধী কাজ একজন স্রস্টা কীভাবে করতে পারে?”

এই সব সুধীবৃন্দের যাবতীয় যুক্তিতর্ক, জ্ঞানগর্ভ আলোচনা, দার্শনিক চিন্তাভাবনা —এই সবের পেছনে একটাই কারণ লুকিয়ে আছে: এরা তাদের মাথার উপরে কোনো ক্ষমতা আছে তা মেনে নেবে না। এরা নিজের ইচ্ছেমত জীবন পার করতে চায়। যত ইচ্ছে ফুর্তি করতে চায়। সেই ফুর্তি করার মধ্যে বাধা হয়ে দাঁড়াবে, এমন কোনো কর্তৃপক্ষ তারা সহ্য করবে না। তাদের যাবতীয় ‘বুদ্ধিবৃত্তিক’ আলোচনা, গবেষণা, প্রকাশনার পেছনে ঘাঁটলে শেষ পর্যন্ত গিয়ে একটাই কারণ বের হয়— এরা প্রত্যেকে নিজের ইচ্ছেমত পৃথিবীকে পেতে চায়।

প্রথমত, আল্লাহ تعالى  মানুষকে মোটেও বাধ্য করেননি তার কথামত চলতে। তিনি تعالى যদি সত্যিই বাধ্য করতে চাইতেন, তাহলে তিনি মানুষকে চিন্তার স্বাধীনতাই দিতেন না। মানুষকে তিনি تعالى পৃথিবীতে ছেড়ে দিয়েছেন তাদের ইচ্ছেমত চলতে। কিন্তু ইচ্ছেমত চলতে গিয়ে তারা যেন একে অপরের উপর অন্যায় না করে, পৃথিবীর ক্ষতি না করে, সেজন্য মানুষকে ভালো-মন্দের পথ দেখিয়ে দিয়েছেন। যারা ভালো পথে চলবে, তাদেরকে তিনি تعالى বিশাল পুরস্কার দেবেন। আর যারা চলবে না, তাদেরকে তিনি যথাযথ শাস্তি দেবেন।

তাঁর تعالى কোনোই দরকার ছিল না ভালো কাজ করলে মানুষকে পুরস্কার দেওয়ার। তিনি মানুষকে বাঁচিয়ে রাখছেন, খাওয়ার জন্য ফল, ফসল, মাছ-মুরগী দিয়েছেন, সেটাই যথেষ্ট হতে পারত। কিন্তু না। তিনি تعالى অত্যন্ত দয়ালু দেখেই ভালো কাজের জন্য পুরস্কার দেওয়ার ব্যবস্থা রেখেছেন। সেই পুরস্কার এতই কল্পনাতীত যে, মানুষ যেদিন তার ভালো কাজের পুরস্কার নিজের চোখে দেখবে, সেদিন সে নিজেই লজ্জায় পড়ে যাবে। ভাববে, এত বড় পুরস্কার পাওয়ার মত কিছুই তো সে করেনি। —আল্লাহর تعالى উদারতা অসীম। তিনি تعالى পুরস্কার দেওয়ার সময় কোনো হিসেব করেন না।

আবার, তিনি মোটেও বাধ্য নন খারাপ কাজের জন্য মানুষকে শাস্তি দেওয়ার। মানুষ সব একে অন্যকে মেরে, কেটে শেষ করে ফেলুক। কী যায় আসে তাঁর? —কিন্তু না। তিনি মানুষের কষ্টে সমব্যাথি, পরম বিচারক। নির্যাতিত, নিপীড়িতের জন্য তিনি تعالى যথাযথ প্রতিশোধ নেবেন। এই প্রতিশোধ নেওয়ার সময় তিনি تعالى মোটেও বাড়াবাড়ি করবেন না। কেউ শাস্তি পেয়ে বলবে না যে, তাকে তার পাপের তুলনায় অনেক বেশি শাস্তি দেওয়া হয়েছে। সবাই মাথা নিচু করে স্বীকার করবে তার পাপ কত ভয়াবহ ছিল।

দ্বিতীয়ত, মানুষকে যদি ভালো-মন্দের পথ দেখানো না হতো, তাহলে মানুষ তার পশুবৃত্তির দাস হয়ে যেত। এর শত শত প্রমাণ আজকাল আমাদের চোখের সামনেই রয়েছে। মানুষের ভেতরে যতই উদারতা, ভালবাসা, অন্যের জন্য নিজে ত্যাগ করার মানসিকতা থাকুক না কেন, এই সব কিছুকে পরাজিত করে ফেলতে পারে তার লোভ এবং কামনা।

যেই ছেলে বা মেয়ে সকালে একজন ভদ্র, নম্র, বাবা-মা’র অনুগত সন্তান, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, এলাকায় উন্নয়নমূলক কাজে অংশ নেয়; সেই ছেলে-মেয়েই রাত হলে দরজা বন্ধ করে মোবাইলে, কম্পিউটারে নিজের কামনা মেটাতে এমন সব কাজ করে, যা পশুরাও করে না। পশুরা অন্তত অন্যদের করা দেখে নিজেরা তৃপ্ত হয় না। কিন্তু এই ধরনের মানুষরা হয়। এরা সকালে থাকে আলোকিত মানুষ, রাতে হয়ে যায় অন্ধকার পিশাচ।

আবার, একজন সমাজসেবী, দানশীল মানুষ, যাকে সমাজের সবাই শ্রদ্ধা করে, আদর্শ হিসেবে মেনে চলে, তিনিই দেখা যায় বছর শেষে কর ফাঁকি দেন। পণ্য সংরক্ষণ করার জন্য বিষাক্ত ক্যামিক্যাল ব্যবহার করেন। মেয়াদ উত্তীর্ণ কাঁচামাল কম দামে কিনে চালিয়ে দেন। শ্রমিকদের নুন্যতম বেতন দিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করান। ব্যবসার সর্বোচ্চ লাভ নিশ্চিত করার জন্য এই ‘মহান’ মানুষই নিজের স্বার্থে দানব হয়ে ওঠেন।

এভাবে আমরা দেখতে পাই যে, মানুষ যদি আল্লাহ্‌র تعالى দেখানো পথে না চলে, তাহলে তার নিজের নির্ধারণ করা ভালো-মন্দের মধ্যে ভারসাম্য থাকে না। তার ভালো-মন্দের সিদ্ধান্তগুলো অনেকাংশেই তার প্রবৃত্তি দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হয়।  একদিকে তাকে দেখে ভালো মানুষ মনে হয়, কিন্তু অন্যদিকে সাধারণ মানুষের অগোচরে তার পাপের অন্ধকার রাজ্য চলতে থাকে।

এরপরও সে কঠিন পথে চলার চেষ্টা করেনি

ভালো পথে চলাটা মোটেও সহজ নয়, কারণ সেটা মানুষের প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে যায়। মানুষের প্রবৃত্তি হচ্ছে নিজের চাহিদা, কামনা, বাসনা মেটানোর জন্য সবরকম চেষ্টা করা। আমার অমুক ফোন চাই। আমার অমুক ব্র্যান্ডের গাড়ি চাই। আমার অমুক ডিজাইনের কাপড় চাই। আমি অমুক জায়গায় বেড়াতে যেতে চাই। আমি অমুক রেস্টুরেন্টে খেতে চাই। সবসময় শুধু ‘আমি, আমার, আমাকে’। এগুলোর বিরুদ্ধে গিয়ে নিজে থেকে আত্মত্যাগ করা, নিয়মের অধীনে থেকে সংযম করাটা কখনই মানুষের জন্য সহজ কাজ নয়। এর জন্য এক কঠিন পথ পাড়ি দিতে হয়।

যেমন ধরুন, আপনি সিদ্ধান্ত নিলেন যে, কাজের পাশাপাশি একটা ইসলামিক ডিগ্রির জন্য পড়াশুনা করবেন, বা এলাকার মুসলিম ভাইবোনদের সাথে নিয়মিত ইসলামি আলোচনায় অংশ নেবেন, অথবা কোনো স্বেচ্ছাসেবক সংগঠনে কাজ করবেন। আপনার পরিবারের সদস্যরা এই কথা শোনার পর আপনার উপর শুরু হবে তাদের যাবতীয় দাবি এবং অভিযোগের বৃষ্টি। এমনিতেই কাজের বাইরে আপনাকে কম পাওয়া যায়, এখন কেন আরও কম পাওয়া যাবে? যেই কাজ করতে আপনি বাধ্য নন, কেন আপনি সেই কাজের পিছনে এত সময় দেবেন? এগুলো না করে শুধু নামাজ-রোজা করলে ক্ষতি কী হবে? আমরা কী মুসলিম না? এগুলো না করলে কী জান্নাতে যাওয়া যায় না?

—এরকম হাজারো প্রতিকূলতার মধ্যে আপনি কোনোমতে সবাইকে দিনের পর দিন ম্যানেজ করে, নিয়মিত তাদের কটু কথা শুনে হয়তো সপ্তাহে একদিন, দু’দিন করে ইসলামের জন্য পড়াশুনা করবেন। কোনো ইসলামি আলোচনা, সেচ্ছাসেবী কাজে মাসে এক-দুইবার অংশ নেবেন। কিন্তু আপনার এই কাজে সাহায্য করার জন্য কেউ টিভি দেখা কমিয়ে দেবে না। ফোনে গল্প করা বন্ধ করবে না। আপনার পড়ার সময় বাচ্চাগুলোকে অন্য ঘরে নিয়ে যাবে না।

আপনার পরীক্ষাই চলুক, কোনো জরুরি প্রোগ্রামই থাকুক, বা রংপুরে কম্বল বিতরণের দায়িত্বই থাকুক না কেন, বাসায় কোনো মুরব্বি আত্মীয় আসলে, শ্বশুর-শাশুড়ি আসলে, বাচ্চাদের পরীক্ষা চললে কেউ আপনাকে একটুও ছাড় দেবে না। আপনাকে তখন সব বাদ দিয়ে সামাজিকতা করতে হবে। বরং যখন আপনার পড়াশুনার বেশি চাপ যাবে, বা ইসলামি কাজে একটু বেশি সময় দিতে হবে, তখনি আপনার কাছের জনের মাথা বেশি গরম হয়ে যাবে। নিয়মিত ঝগড়া শুরু হবে। আত্মীয়স্বজন নিয়মিত আপনাকে ফোন করে আবার ‘সাধারণ মুসলিম’ হয়ে যাওয়ার জন্য বার বার আপনাকে বোঝাবে। কবে কোন মুসলিমকে পুলিশ ধরে নিয়ে গিয়েছিল, জেলে নিয়ে কীভাবে পায়ের নখ তুলে নির্যাতন করেছিল, কোন ইসলামি দল কবে কোন নিরীহ মুসলিমকে ঘোল খাইয়েছিল —এই সব বলে আপনাকে নিয়মিত ভয় দেখাবে।

কষ্ট না করলে জীবনে কোনো ভালো কিছু পাওয়া যায় না। জান্নাতের বিরাট পুরস্কার তো আর আল্লাহ تعالى এমনিতেই দিয়ে দেবেন না। এর জন্য কঠিন পথ পাড়ি দিতে হবে। আল্লাহ تعالى আমাদেরকে দেখিয়ে দিয়েছেন এই কঠিন পথ কোনটা—

১) দাসকে মুক্তি দেওয়া

আমরা হয়ত ভাবতে পারি যে, আজকেতো আর দাস প্রথা নেই। তাই এই কাজ করার সুযোগ আমাদের আর নেই? হাজার বছর আগের দাসপ্রথা আজকে না থাকলেও, তারচেয়েও ব্যাপক আকারে আধুনিক-দাস ব্যবসা চলছে। এই ব্যবসায় অভাবী মানুষদের ভিসা দিয়ে বিদেশে নিয়ে গিয়ে পাসপোর্ট আটকে রেখে, তাদেরকে দিয়ে অমানুষিক পরিশ্রম করানো হয়। নামমাত্র বেতনের একটা বড় অংশ বিভিন্ন ফী, কমিশন দেখিয়ে দালালরা হাতিয়ে নেয়। অল্প যা থাকে, সেটা দেশে পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দিতে হয়। তারপর নিজে কোনোমতে দুই বেলা খেয়ে, সারাদিন অমানুষিক পরিশ্রম করে, রাতের বেলা খাচার মত গুমোট ঘরে অনেকজন গাদাগাদি করে ঘুমিয়ে থাকে। পরদিন থেকে আবার পশুর মত খাটনি। —এই হচ্ছে আধুনিক দাস প্রথা।

এভাবে শ্রমিক দাসদের জিম্মি করে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, চায়না, মধ্যপ্রাচ্য, আরব এবং আফ্রিকার দেশগুলোতে ব্যাপক উন্নয়ন চলছে। কন্সট্রাকশন কোম্পানিগুলো নামমাত্র খরচে শ্রমিক পেয়ে বিরাট লাভ করে ফুলে ফেপে যাচ্ছে। বিশাল সব দালানকোঠা, রাস্তাঘাট, পার্ক, বিনোদনের হাজারো ব্যবস্থা তৈরি হচ্ছে। তারপর সেসব জায়গায় গিয়ে আমরা পরিবার নিয়ে ফুর্তি করে আসছি। অঢেল টাকা উড়িয়ে আসছি। অথচ এই সব জাকজমকের পেছনে লুকিয়ে আছে লক্ষ শ্রমিক এবং তাদের পরিবারের কান্না।

আজকে পৃথিবীতে ৪ কোটির উপরে দাস রয়েছে, যাদের কান্না, আহাজারি আমরা শুনতে পাই না। এদের মধ্যে ১ কোটি শিশু, প্রায় ২.৫ কোটি শ্রমিক, ১.৬ কোটি জোর করে বিয়ে করতে ধরে আনা অল্প বয়স্ক নারী এবং প্রায় অর্ধ কোটি নানা ধরনের বিকৃত যৌন কাজে আটকে রাখা নারী এবং শিশু।[৪০৮] এই সব দাসদের জীবন পশুর থেকেও অধম। এদেরকে নিয়মিত শারিরিক এবং মানসিক নির্যাতন করা হয়। শিক্ষা, চিকিৎসা দেওয়া হয় না। বন্দী পশুর মত স্বাধীনতার আশায় ছটফট করতে করতে এরা জীবন পার করে দেয়। এরা বেশি ঝামেলা করলে অত্যাচার করে হত্যা করে ফেলা হয়। —এই আধুনিক দাসেরা আজকের আধুনিক যুগের এক ভয়ংকর কালো অধ্যায়। আজকে মানুষ শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তিতে অনেক উন্নত হলেও, মানুষের পাশবিকতা কোনোভাবে কমে যায়নি।

আল্লাহ تعالى আমাদেরকে দাসদের মুক্ত করতে বলেছেন। এইসব আধুনিক দাসদেরকে মুক্ত করার জন্য আমাদেরকে কাজ করতে হবে। কাজটা মোটেও সহজ না। আল্লাহ تعالى আমাদেরকে বলছেনও না যে, কোনো সহজ দায়িত্ব দিয়েছেন তিনি। পরিস্কারভাবেই জানিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি আমাদেরকে দুটো চোখ, জ্বিভ, ঠোট, বুদ্ধিমত্তা, ভালো-মন্দ পথের সন্ধান দিয়েছেন। এগুলোর বিনিময়ে আমাদেরকে আত্মত্যাগ করতে হবে। অসহায় মানুষের পাশে দাড়াতে হবে। আমরা নিজেরা যদি স্বাধীনতা উপভোগ করি, তাহলে যেই সব দুস্থ মানুষরা পরাধীন অসহায় জীবন পার করছে, তাদেরকে স্বাধীন করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করতে হবে।

২) কঠিন অভাবের দিনে খাবার দান করা, নিকটাত্মীয় এতিমদের

ইসলামে এতিম শুধু বাবা-মা হারা ছোট বাচ্চারাই নয়, এমনকি যারা বয়স্ক, যাদের কেউ নেই, যাদের অবস্থার উন্নতি করার কোনো সুযোগ তাদের নেই, তারাও এতিম।[১][১৭১]

সমাজে যত মানুষ রয়েছে, তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি যাদের দেখাশোনা করা দরকার, একটু আদর, একটু ভালবাসা দরকার, তারা হলো এতিম বাচ্চারা। একজন বাচ্চার কাছে তার বাবা-মার থেকে বেশি জরুরি আর কে হতে পারে? ছোট বাচ্চারা অসহায়, দুর্বল। তারা নিস্পাপ, তারা অবুঝ। আজকের নিষ্ঠুর সমাজে বাবা-মা ছাড়া একটি শিশুর একা একা জীবন কী ভয়ংকর কঠিন, এটা আমরা কল্পনাও করতে পারি না। সমাজের অন্য যে কারো থেকে তাদের সাহায্য দরকার সবচেয়ে বেশি। আমরা যদি তাদের সাহায্যে এগিয়ে না আসি, তাহলে তারা কোথায় যাবে?

আমরা কয়জন জানি আমাদের এলাকায় এতিম কারা? আমরা প্রতিদিন মসজিদে নামাজ পড়তে ঢুকি এবং নামাজ শেষে বের হয়ে যে যার কাজে চলে যাই। নামাজের সময় পাশে বসা ছেড়া কাপড় পড়া মলিন মুখের অসহায় দেখতে মানুষটার খবর নেওয়ার প্রয়োজন পর্যন্ত অনুভব করি না। এতিমদের সাথে ইহসান করতে হলে প্রথমে আমাদেরকে তো আগে জানতে হবে আমাদের এলাকায় এতিম কারা!

আমাদেরকে মসজিদ দেওয়া হয়েছে যেন আমরা এলাকার মুসলিম ভাইদের খোঁজ খবর রাখি, একে অন্যের সাথে পরিচিত হই, বিপদে আপদে এগিয়ে যেতে পারি। কিন্তু আজকে মসজিদ শুধুমাত্র একটা ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করার জায়গায় পরিণত হয়েছে। কোনোমতে নামাজ শেষ করে ডানে বামে না তাকিয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বের হয়ে যেতে পারলেই বাঁচি।[১]

আল্লাহ تعالى এই আয়াতে আমাদেরকে বড় স্ট্যান্ডার্ড দিয়েছেন। আমাদেরকে অভাবের দিনেও খাবার দান করতে হবে। যখন আমি নিজেই অভাবে আছি, নিজের খাবারের সংস্থান নিয়ে সংগ্রাম করছি, সেই অবস্থায় অন্য অভাবীদের খাবার দিতে হবে। আজকাল আমরা সচ্ছ্বল অবস্থায় গেলে এক্তু আক্তু দান করা শুরু করি। নিজে এত ভালো আছি, ভালো-ভালো খাচ্ছি, দামি কাপড় পড়ছি, সুন্দর সব জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছি—নিজের কাছেই তখন খারাপ লাগা শুরু হয় যে, আমার আশেপাশে মানুষ কত কষ্টে আছে। তখন বিবেকের দংশনে দান করা শুরু করি। কিন্তু যখনি এক্তু সমস্যায় পড়ি, ব্যাংক ব্যালেন্সে শুন্য একটা কমে যায়, তখনি সব দান বন্ধ করে হাতপা গুটিয়ে ফেলি।

এই আয়াতে আল্লাহ تعالى আমাদের কাছ থেকে আশা করেন যে, আমরা কঠিন অভাবের সময়ও অনাহারী মানুষদের খাবার দেবো। শুধুই সচ্ছ্বলতার সময় নয়।

৩) দারিদ্রের আঘাতে নিষ্পেষিত অসহায় মানুষকে

মিসকিন ٱلْمَسَٰكِين হচ্ছে খুবই গরিব মানুষরা, যাদের জন্য খাদ্য, বাসস্থান, কাপড় যোগাড় করা খুবই কঠিন। এরা সবসময় অভাবী। একজন এতিমের হয়ত উত্তরাধিকার সুত্রে সম্পত্তি থাকতে পারে। কিন্তু এদের কোনো সম্পত্তি থাকা তো দুরের কথা, মৌলিক চাহিদা পূরণ করার মতো সামান্য অবস্থাও নেই। এরা হচ্ছে সমাজের ভুলে যাওয়া, হারিয়ে যাওয়া ধুলোয় ধূসরিত মানুষেরা।

আজকে আপনার-আমার পরিবার নিয়ে থাকার জন্য বাসা আছে। রাতে খাওয়ার মতো খাবার ফ্রিজে রাখা আছে। কালকে বাইরে পড়ার মতো কাপড় আছে। কিন্তু মিসকিনদের এসব কিছুই নেই। তারা প্রতিটা দিন কষ্টে, ভয়ে থাকে: কীভাবে তারা আগামীকাল কিছু খাবার, পড়ার মতো পরিষ্কার কাপড়, থাকার মতো জায়গা জোগাড় করবে। বেঁচে থাকার জন্য প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করা ছাড়া আর কিছু নিয়ে চিন্তা করার মতো অবস্থা তাদের নেই।[১][১১]

আজকে এমন কোনো অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা নেই, যা বাধ্যতামূলকভাবে দেশের সকল মিসকিনদের অভাব দূর করে তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে বাধ্য। একমাত্র একটি ইসলামিক রাষ্ট্রের পক্ষেই সম্ভব সরকারি পর্যায়ে উদ্যোগ নিয়ে, জনগণের কাছ থেকে বাধ্যতামূলকভাবে যাকাত সংগ্রহ করে, একটি তহবিল গঠন করে, দেশের সকল মিসকিনদের অভাব দূর করার ব্যবস্থা করা।

যতদিন ইসলামিক আইন প্রতিষ্ঠা না হচ্ছে, ক্যাপিটালিস্ট অর্থনীতি ধনীদেরকে আরও ধনী বানিয়ে যাবে, এবং গরিবদেরকে আরও গরিব বানাতে থাকবে। আজকে পৃথিবীতে এমন কোনো ব্যবস্থা নেই, যা সম্পত্তিকে সুষমভাবে বণ্টন করে ধনী-গরিবের মধ্যে যে বিরাট পার্থক্য, তা দূর করতে পারে। যার ফলে সবসময় এমন কিছু মানুষ থেকে যায়, যারা তাদের প্রয়োজনের চেয়ে হাজার গুণ বেশি সম্পত্তি নিয়ে থাকে, যা তারা আমোদ ফুর্তিতে নষ্ট করে। অন্যদিকে এমন কিছু মানুষ সবসময় থেকে যায়, যারা দুই বেলা খাবারও জোগাড় করতে পারে না। সম্পদ সুষমভাবে বণ্টনের এমন কোনো পদ্ধতি কোনো সরকার যদি তৈরি করার চেষ্টাও করে, তখন দেশের বড় বড় ধনকুবেররা ব্যবস্থা করে দিবে যেন সেই সরকার বেশিদিন টিকে থাকতে না পারে।

আল্লাহর تعالى বিরুদ্ধে মানুষের একটি সাধারণ অভিযোগ হলো: আল্লাহ تعالى কেন পৃথিবীতে এত মানুষ পাঠাল, কিন্তু তাদের জন্য যথেষ্ট খাবার, প্রাকৃতিক সম্পদ, থাকার জায়গা দিয়ে পাঠাল না। এটি একটি বিরাট ভুল ধারণা যে, পৃথিবীতে এত যে গরিব মানুষ, তার মূল কারণ পৃথিবীতে সম্পদের অভাব। পৃথিবীত মাত্র ১% মানুষ পুরো পৃথিবীর ৪৮% সম্পদ দখল করে রেখেছে।[১৭৩] মোট জনসংখ্যার অর্ধেক, যা কিনা প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন মানুষ, আজকে পৃথিবীর মোট সম্পদের মাত্র ১% এর উপর বেঁচে আছে!

শুধু তাই না, মাত্র ২% সবচেয়ে ধনী মানুষগুলো পুরো পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি বাড়ি এবং জমির মালিক। বাকি অর্ধেক জমি এবং বাড়ির মধ্যে বাকি ৯৮% জনসংখ্যা বসবাস করছে। মানুষের মধ্যে আজকে যে এই চরম বৈষম্য, তার প্রধান কারণ মানুষের সীমাহীন লোভ, দুর্নীতি এবং ক্যাপিটালিস্ট অর্থনীতি। সুদ একটি বড় কারণ যা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে করে বড় লোকরা বসে বসে আরও বড় লোক হয়, আর মধ্যবিত্ত এবং গরিবরা অমানুষিক খাটার পরেও দিনে দিনে আরও গরিব হতে থাকে।

পুরো পৃথিবীর সব মানুষকে, পুরো ৬ বিলিয়ন মানুষের প্রত্যেককে, একটি বাসা এবং সামনে একটি ছোট বাগান দিলেও পৃথিবীর সব মানুষকে যুক্তরাষ্ট্রের এক টেক্সাস অঙ্গরাজ্যেই জায়গা দেওয়া যাবে। আল্লাহ تعالى আমাদেরকে এক বিরাট পৃথিবী দিয়েছেন, কিন্তু মাত্র ২% লোভী মানুষের কারণে আজকে ১.৬ বিলিয়ন মানুষ দিনে একবেলাও খেতে পারে না।

বছরে ৩০ বিলিয়ন ডলার খরচ করলে, সারা পৃথিবী থেকে ক্ষুধা দূর করে ফেলা সম্ভব। একটি লোকও তখন না খেয়ে থাকবে না। অথচ বছরে ১২০০ বিলিয়ন ডলার খরচ হয় অস্ত্রের পেছনে। একটি বিশেষ দেশের খাবার অপচয়ের পেছনে নষ্ট হয় ১০০ বিলিয়ন ডলার। ‘অবিস’ বা অতিরিক্ত মোটারা বছরে ২০ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত খাবার খায়।[১৭৪] একদিকে মানুষ না খেয়ে মারা যায়, আর অন্যদিকে মানুষরা অতিরিক্ত খেয়ে ধুঁকে ধুঁকে মারা যায়।

৪) আর তারপর এমন সব মানুষদের একজন হয়ে যাওয়া, যারা গভীর বিশ্বাস করেছে এবং একে অন্যকে ধৈর্য ধারণ করতে তাগাদা দেয় এবং একে অন্যকে দয়া-মমতার প্রতি তাগাদা দেয়। তারাই তো সৌভাগ্যবান দল।

দাসদের মুক্তি দেওয়া, এতিমদের দায়িত্ব নেওয়া, গরিবদের সাহায্য করা —মানুষের প্রতি এই দায়িত্বগুলো পালন করা সহজ নয়। এর জন্য গভীর বিশ্বাস দরকার। একইসাথে মানুষকে ধৈর্য ধরতে তাগাদা দিতে হয়। কারণ এই কাজগুলো করার জন্য সময় এবং পরিশ্রম দুটোই দরকার। দাসদের মুক্ত করা মোটেও সহজ নয়। এর জন্য আইনি জটিলতায় যেতে হবে। দিনের পর দিন আন্দোলন করতে হবে। দাস ব্যবসায়ীদের আক্রমণের শিকার হতে হবে। নানা প্রতিকুলতার মধ্যে ধৈর্য ধরে, মানুষকে দয়া-মমতা-সহমর্মিতার প্রতি অটুট থাকার জন্য তাগাদা দিতে হবে।

আর সমাজের অভাবী মানুষগুলোর পাশে দাঁড়ানোর জন্য একসাথে মিলে কাজ করতে হবে। নানা বাধা আসবে। ঐক্য নষ্ট হয়ে যাবে। মানুষ হাল ছেড়ে দেবে। কিন্তু তারপরেও ধৈর্য ধরে, একে অন্যকে দয়া-মমতার আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরে এগিয়ে যেতে হবে।

যারা এই সংগ্রাম করে যাবেন, তারাই একদিন হবেন জান্নাতের পথে এগিয়ে চলা সৌভাগ্যবান কাফেলার একজন।

কিন্তু এরপরেও যারা আমার বাণী অস্বীকার করেছে, তারা হতভাগার দল। এদেরকে চারিদিক থেকে আগুন ঘিরে ফেলবে।

দাসদেরকে মুক্তি দেওয়া, অভাবের সময় এতিম, গরিবদের খাবার দেওয়া, নিজে বিশ্বাসী হয়ে অন্যদেরকে ধৈর্য এবং দয়া-মমতার প্রতি আহবান জানানো —এগুলো সবই সর্বজন স্বীকৃত ভালো কাজ। কোনো মানুষ বলবে না যে, এগুলোর একটাও অপ্রয়োজনীয় কাজ। কিন্তু কিছু মানুষ আছে, যারা এগুলো করবে তো না-ই, করার দায়-দায়িত্বও অস্বীকার করবে। এরা মানুষ নামের পশু। এইসব নরপশুরা হবে কিয়ামতের দিন হতভাগার দল। ভীষণ শাস্তি অপেক্ষা করছে এদের জন্য।

[১] বাইয়িনাহ এর কু’রআনের তাফসীর। [২] ম্যাসেজ অফ দা কু’রআন — মুহাম্মাদ আসাদ। [৩] তাফহিমুল কু’রআন — মাওলানা মাওদুদি। [৪] মা’রিফুল কু’রআন — মুফতি শাফি উসমানী। [৫] মুহাম্মাদ মোহার আলি — A Word for Word Meaning of The Quran [৬] সৈয়দ কুতব — In the Shade of the Quran [৭] তাদাব্বুরে কু’রআন – আমিন আহসান ইসলাহি। [৮] তাফসিরে তাওযীহুল কু’রআন — মুফতি তাক্বি উসমানী। [৯] বায়ান আল কু’রআন — ড: ইসরার আহমেদ। [১০] তাফসীর উল কু’রআন — মাওলানা আব্দুল মাজিদ দারিয়াবাদি [১১] কু’রআন তাফসীর — আব্দুর রাহিম আস-সারানবি [১২] আত-তাবারি-এর তাফসীরের অনুবাদ। [১৩] তাফসির ইবন আব্বাস। [১৪] তাফসির আল কুরতুবি। [১৫] তাফসির আল জালালাইন। [১৬] লুঘাতুল কুরআন — গুলাম আহমেদ পারভেজ। [১৭] তাফসীর আহসানুল বায়ান — ইসলামিক সেন্টার, আল-মাজমাআহ, সউদি আরব [১৮] কু’রআনুল কারীম – বাংলা অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত তাফসীর — বাদশাহ ফাহাদ কু’রআন মুদ্রণ কমপ্লেক্স। [১৯] তাফসির আল-কাবির। [২০] তাফসির আল-কাশ্‌শাফ। [৪০৮] Anti-Slavery International. (2018). What is modern slavery? – Anti-Slavery International. [online] Available at: https://www.antislavery.org/slavery-today/modern-slavery/ [Accessed 25 Mar. 2018].