মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিলুপ্ত করতেই বঙ্গবন্ধু হত্যা: আমির হোসেন আমু

তখন আমি ঝালকাঠি জেলার গভর্নর। বঙ্গবন্ধু সমস্ত মহকুমাকে আগেই জেলায় রূপান্তরিত করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি প্রত্যেকটি জেলায় একজন করে গভর্নর নিয়োগ করেন। পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশ কৃষক-শ্রমিক আওয়ামী লীগ নামে নতুন একটি দল গঠন করেন। সেই লক্ষ্যেই আমাকে তিনি ঝালকাঠি জেলার গভর্নর নিয়োগ করেছিলেন। তখন আমাদের গভর্নরদের এডমিনিস্ট্রেটিভ ট্রেনিং দেয়ার জন্য ঢাকায় আনা হয়েছিল। পাশাপাশি বাংলাদেশ কৃষক-শ্রমিক আওয়ামী লীগে যাদের জেলাভিত্তিক নেতা তৈরি করা হয়েছিল, সম্পাদক এবং যুগ্ম সম্পাদক এদের ৫ জন করে ঢাকায় আনা হয়েছিল রাজনৈতিক প্রশিক্ষণের জন্য। অর্থাৎ একটি জেলার সব রাজনৈতিক নেতারা এবং প্রশাসনিক প্রধান যে এমপিরা ছিলেন, তারা প্রত্যেকেই ঢাকায় ছিলেন।

আমি ঢাকায় থাকলে প্রতিদিন সন্ধ্যার পরে বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বর বাসভবনে যেতাম এবং কিছুক্ষণ সেখানে থাকতাম। বঙ্গবন্ধু আলোচনা করতেন, শুনতাম, চলে আসতাম। কিন্তু ১৪ আগস্ট আমাদের গভর্নরদের দুটি সংবর্ধনা ছিল। একটি রেজিষ্ট্রেশনভিত্তিক ময়মনসিংহ রোডে, এডিও কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে। দ্বিতীয়টি পুরান ঢাকায় মুক্তধারা পাবলিকেশন থেকে আমাদের সংবর্ধনা দিয়েছিল। আমরা সন্ধ্যায় যখন পুরান ঢাকায় মুক্তধারা পাবলিকেশন্সে গেলাম তখন প্রোগ্রামটা শেষ হতে প্রায় ১০টার বেশি বেজে গেল। সুতরাং সে দিন আমার আর বঙ্গবন্ধুর বাসায় যাওয়া হলো না। অনুষ্ঠান শেষে আমি ২৫ নম্বর হাজি ওসমান গণি রোডে আমার খালার বাসায় চলে এলাম।

ভোর আনুমানিক ৫টা হবে, আমার খালা দরজায় কড়া নেড়ে আমার ঘুম ভাঙালেন। খালা আমাকে রেডিও শুনতে বললেন। রেডিওর কাছে আসতেই শুনতে পেলাম, ‘আমি মেজর ডালিম বলছি। খুনি শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে।’ এই একটা কথাই বারবার বলছে। তো এর আগে একটা রিউমার ছিল, পাকিস্তানিরা হিলট্যাক্স দিয়ে একটা ঘোষণা দিতে পারে, ইত্যাদি ইত্যাদি। এমনো শোনা যাচ্ছিল যে, যারা কারাবন্দি ছিল তারা প্রতিদিনই লকআপ খোলার পরে বাইরে উঁকি দিয়ে দেখত বাইরে পাকিস্তানি পতাকা উড়ছে কিনা। ফিসফাসের এ বিষয়টা বঙ্গবন্ধুর কানেও এসেছিল। তিনি আমাদের বারবার সাবধান করেছেন। তবে তাঁর ওপর যে হামলা হতে পারে এ ধরনের ধারণা কখনোই ছিল না বা তিনি কখনো বিশ্বাস করেননি। সে দিন রেডিওর ওই খবর শুনে আমি ভাবলাম, এটা হয়তো তেমনই একটা রিউমার। হয়তো দশ মিনিট পরেই ঠিক হয়ে যাবে। খালাকে এ কথা বলে আমি বাথরুমে চলে গেলাম। কিন্তু বাথরুমে যতক্ষণ ছিলাম, ওই একই কথা রেডিওতে বেজে যাচ্ছিল। আমার মধ্যে একটা সন্দেহ কাজ করতে লাগল। বাথরুম থেকে বেরিয়ে ওজু করে নামাজ পড়লাম। এরপর মোশতাকের বিষয়টা জানতে পারলাম। একজন গভর্নর হিসেবে আমার বাসায় সব সময় পুলিশ প্রোটেকশন ছিল। কিছুক্ষণের মধ্যে নানক, কাশেম এবং সালাম (বর্তমানে কানাডা প্রবাসী) এরা রাস্তায় এসে আমাকে ডাকল। আমি বারান্দায় গিয়ে তাদের দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম- ‘কী খবর’। ওরা বলল- চলে আসেন। আমি চিন্তা করলাম, আমার বের হওয়ার একটাই রাস্তা। এখন যদি আমি বের হই, তবে পুলিশের মধ্যে রিঅ্যাকশন কী হতে পারে। নানককে বিষয়টা দেখতে বললাম। ওরা বাড়ির ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখল, বেশির ভাগ পুলিশ ঘুমানো। বলল, ‘অসুবিধা নেই, চলে আসেন।’ আমি তাড়াতাড়ি করে একটি ব্রিফকেস গোছালাম। এরপর শেখ মণির বাসায় ফোন করলাম। রিং হচ্ছে, নো রেসপন্স। তারপর ফোন করলাম আব্দুর রব সেরনিয়াবাত বাসায়। রিং হচ্ছে, বাট নো রেসপন্স। সবশেষ ফোন করলাম বঙ্গবন্ধুর বাসায়। কিন্তু নো রেসপন্স। আমি কন্টিনিউ এই তিন বাসায় বেশ কয়েকবার ফোন দিলাম। অবশেষে ফোন করা বন্ধ করে দিয়ে নিচে নেমে এলাম। এক হাবিলদার তাড়াতাড়ি শার্ট গায়ে দিয়ে আমার পেছন পেছন এল নাজিরাবাজার পর্যন্ত। আমি বললাম, তুমি থাকো। আমার খেয়াল ছিল না যে মোশতাকের বাসা আগামসি লেন। ওই রোডে ঢুকতেই মনে হলো কারফিউ, অন্ধকার, আর্মির গাড়ি ভর্তি। আমি কিছুটা ঘাবড়ে গেলাম। কারণ আমার ব্রিফকেসে তখন একটা স্টেনগান আর একটা রিভলবার। নানক বলল, কী করবেন। আমি বললাম, বিসমিল্লাহ বলে হাঁটা শুরু করো। সাধারণ পথচারীর মতো আমরা হেঁটে আগামসি লেন পার হলাম। হাঁটতে হাঁটতে বললাম, একটা কাজ করি, কোনো ধরনের গ্যাঞ্জাম হলে আমরা তো সব সময় কেরানীগঞ্জ চলে যাই। এখন সেখানে গেলে সবাইকে পাব। নানক বলল, ‘সেখানে তো কেউ নেই। সবাইকে শেষ করে ফেলেছে।’ এতক্ষণ যাই হোক বিষয়টা বিশ্বাস হচ্ছিল না। কিন্তু নানকের কথায় এবার যেন গায়ের রক্ত সব ঠাণ্ডা হয়ে এল। হাত-পা কিছুটা কাঁপতে শুরু করল। বললাম, কী করব এখন। নানক বলল- ‘আপনি এখন আপাতত কোনো শেল্টারে চলেন। পরে খোঁজখবর নিয়ে আপনাকে সব জানাব।’

আমি লালবাগে আমার এক আত্মীয়ের বাসায় গিয়ে উঠলাম। সেখানে হঠাৎ আর্মির গাড়ির শব্দ শুনলাম। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি আমি যে বাসায় আছি ঠিক উল্টাপাশের বাসায় দুটি আর্মির গাড়ি দাঁড়ানো। পরে জানতে পারলাম, ওটা মেজর ডালিমের শ্বশুরবাড়ি। ভয় পেয়ে সেখান থেকে ভোর রাতে বেরিয়ে গেলাম। তোপখানা রোডে আরেকজনের বাসায় এলাম। ওখানে দুই রাত্রি ছিলাম। ওখানে মুসলিম লীগের এক এমপির ছেলে থাকে শুনে নিরাপদ মনে হলো না। ওখান থেকে চলে এলাম তোপখানা রোডে আমাদের আজিজ কন্ট্রাক্টর ছিল, তার বাসায়। সেখানেও দুদিন ছিলাম।

লুকিয়ে থেকে ফাঁকে ফাঁকে আমি সবার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছি। এর মধ্যে খবর পেলাম, আবদুর রাজ্জাক, ডা. সেলিম এরা মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের ওখানে বসে। আমি সেখানে দেখা করতে যাব বলে সিদ্ধান্ত নিলাম। কিন্তু ওদের নাকি সন্দেহ করা শুরু করেছে। তাই সেখান থেকে ওইদিনই ওরা সরে যায়। এরপর ফণী দা’র বাসায় গেলাম একদিন। সেখানে জানাশোনা কয়েকজনের সঙ্গে দেখা হলো। আমি মূলত ওই পারে যাওয়ার কী ব্যবস্থা সেই বিষয়ে জানতে গিয়েছিলাম। ফণী দা বললেন, এখন আমার কাছে কোনো খবর নেই। তোমরা আপাতত গা ঢাকা দিয়ে থাক। যদি কোনো খবর হয়, আমি জানাব। ওখান থেকে চলে এলাম। এরপর আমার এক দুলাভাইয়ের বাসায় গেলাম। সেখান থেকেই আমি গ্রেপ্তার হলাম। গ্রেপ্তার করেই আমাকে রেডিও স্টেশনে নিয়ে গেল। সেখানে তারা ৬ জনে মিলে আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করল সারারাত। আর্মস আছে কার কার কাছে। আমার কাছে কী পরিমাণ আর্মস আছে। বিভিন্নজনের সম্পর্কে তারা জানতে চাইল। আমি বলেছি, দেখেন আমি মফস্বলে রাজনীতি করি। পার্লামেন্ট যখন থাকে আসি। আমি এতসব ঢাকার খবর জানি না।

সকালে আমাকে কন্ট্রোলরুমে হ্যান্ডওভার করা হলো। কন্ট্রোলরুমে ঢুকেই কেঁপে গেলাম। দেয়ালে রক্তের দাগ। একটি ইলেকট্রিক চেয়ার। কন্ট্রোলরুমে আমার নাম লিস্ট করে দিয়ে ওরা চলে যায়। এর মধ্যে ওখানে যে পুলিশের ইন্সপেক্টর ছিলেন, ওর বাড়ি ছিল পটুয়াখালী। সে হয়তো আমাকে দেখে চিনেছে। তাই তাড়াতাড়ি করে আমার কাছে এসে বলল, ‘স্যার, যদি আপনার কোনো সোর্স থাকে তাহলে আপনি ফোন করেন। এখান থেকে বের করে নিয়ে যেতে বলেন। আপনার আয়ু বিকেল পর্যন্ত। বিকেলের পরে আপনাকে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। তাই আমার এখান থেকে টেলিফোন করেন। আমি রিস্ক নিয়ে আমার টেলিফোন ব্যবহার করতে দিলাম।’ লোকটার কথা শুনে কিছুটা ভড়কে গেলাম। তাড়াতাড়ি আইজি নুরুল ইসলামকে ফোন দিলাম। উনি বললেন, আমি জানি। রাত থেকে আমার কাছে খবর আছে। আমরা চেষ্টা করছি যাতে আপনাকে নিরাপদে জেলখানায় নেয়া যায়। এরপর গোলাম মোর্শেদের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। সেও একই কথা বলল- আমরা সতর্ক আছি। আমরা এনএসআইয়ের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছি। তবে আপনাকে জেলখানায় পাঠাতে পারি তাহলে বের হতে অনেক সময় লাগবে। তখন আমাদের গালাগালি করবেন না। আমি বললাম, সমস্যা নেই আমাকে জেলখানায় দেন। এরপর বরিশালের এসপি, কিছু আর্মির লোকজনের কাছেও সে সময় ফোন দিয়ে বিষয়টা জানালাম। ফোন শেষ করে এসে নামাজে দাঁড়ালাম। একটানা নামাজ পড়লাম। জোহরের নামাজ শেষ করে আসর নামাজে যখন সিজদায় গেলাম, তখন খসখস শব্দ শুনতে পেলাম। আমি ভয় পেয়ে আর সিজদা থেকে উঠছি না। এমন সময় পেছন থেকে স্যার, স্যার বলে কেউ ডাকল। আমি সিজদা থেকে উঠতেই রমনা থানার ওসি আনোয়ার বলল, স্যার তাড়াতাড়ি ওঠেন। ৩টা বাজে। আপনি তাড়াতাড়ি ওঠেন। আপনার সময় বিকেল ৪টা পর্যন্ত। ৪টার মধ্যে আপনাকে থানায় হ্যান্ডওভার করতে হবে। এটা আমাদের নির্দেশ। আমি কিছুটা আশ্বস্ত হলাম যে, আমাকে সেফ করার চেষ্টা চলছে। এরপর আমাকে তার গাড়িতে করে রমনা থানায় নিয়ে গিয়ে ফরম পূরণ করে নিয়ে গেল সেন্ট্রাল জেলে। বাইরে বসে আমরা শুনেছি যে, সেন্ট্রাল জেলে কিছু গোলমাল হয়। আমি ওসিকে বললাম, মন্ত্রীদের যেখানে রাখা হয়েছে সেখানে আমাকে রেখ। অন্য কোথাও রেখ না। সে বলল, সেখানেই রাখা হবে। সে দিন ছিল প্রথম রোজা। ইফতার শেষে কাগজপত্র সব ঠিকঠাক করে আমাকে নিয়ে গেল তিন নম্বর রুমে। এক নম্বর রুমে ছিলেন নজরুল ইসলাম সাহেব, তাজউদ্দীন সাহেব, দুই নম্বর রুমে ছিলেন কামরুজ্জামান, শেখ আজিজ ওনারা। তিন নম্বর রুমে ছিলাম ইউনুস আলী সাহেব, সামাদ সাহেব, আমি।

বঙ্গবন্ধু হত্যার আগে এবং পরে বেশ কিছু রিউমার ছড়ানো হয়। বঙ্গবন্ধুর পরিবার অনেক সম্পদের মালিক। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক, দেশ বিকিয়ে যাচ্ছে, দুর্ভিক্ষ নিয়ে নানা নেগেটিভ আলোচনা হয়েছে। ওই সময়ে জাসদের ‘গণকণ্ঠ’ নামে পত্রিকা সবচেয়ে বেশি এই বিষয়গুলো হাইলাইট করেছে। তবে এটা মূলত একটা আন্তর্জাতিক প্রচারণা ছিল। পাকিস্তান-আমেরিকা মিলিতভাবে চেষ্টা করেছে বঙ্গবন্ধুর সুনামহানি করতে, এ দেশকে আবার তাদের করায়ত্ত করতে। এটা তারা বহুবার করার চেষ্টা করেছে। এরপর ১৯৭৪-এ তারা খাদ্যের জাহাজ ঘুরিয়ে দিয়েছে। দেশে দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি করেছে। এগুলো ছিল মূলত একটা প্লট তৈরি করা ‘১৫ আগস্ট’ সংঘটিত করার জন্য। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরে দেখা গেল, এসব কোনো কিছুই সত্য ছিল না। ব্যাংকেও কোনো টাকা ছিল না, সোনা-দানাও ছিল না, এমনকি তার বাসা সার্চ করেও তেমন কিছু পাওয়া গেল না। ফলে এগুলো যে তার বিরুদ্ধে এক ধরনের অপপ্রচার ছিল তা প্রমাণিত হয়।

বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিষয়টি সে সময় আওয়ামী লীগ প্রতিরোধ করতে পারল না। কারণ বঙ্গবন্ধুর হত্যার খবরে সবাই একটা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যায়। বজ্রপাতের মতোই ঘটনা ঘটেছে। কল্পনাতীত। তাছাড়া জেলাগুলো তো খালি ছিল। না হলে জেলাগুলো থেকে দুএকজন নেতাও যদি আওয়াজ দিত তাহলেই কিন্তু সারাদেশে আগুন লেগে যেত। এছাড়া রক্ষীবাহিনী যারা জেলায় জেলায় ছিলেন তারা কিন্তু চেষ্টা করেছেন অন্য নেতাদের দিয়ে কিছু করানোর জন্য। কিন্তু কেউ কোনো জেলায় উপস্থিত ছিলেন না। রক্ষীবাহিনীর লিডার বিদেশে। সুতরাং এটা যে একটি সুপরিকল্পিত ঘটনা, তা স্পষ্ট।

একটা হত্যাকাণ্ড যখন সংঘটিত হয়, তখন বিচার্যের বিষয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায় যে, এতে লাভবান হয়েছে কারা। এটা বের করতে পারলেই হত্যাকারীদের বের করা সম্ভব হয় এবং তাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বোঝা যায়। আমরা যদি দেখি ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে খুনিরা লাভবান ছিল কীভাবে? একটা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অধিকারী যিনি, একটি দেশকে যিনি সৃষ্টি করেছেন, যে কিনা এ দেশকে স্বাধীন করেছেন, সে জাতির জনককে হত্যা করা হলো। বঙ্গবন্ধুর হত্যার মধ্য দিয়ে ষড়যন্ত্রকারীরা দেশকে আবার পঞ্চাশের দশকে নিয়ে যায়। অর্থাৎ যে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছিল সেটা আবার সৃষ্টি করা হয়েছে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর। কারণ সাম্প্রদায়িক রাজনীতি তো নিষিদ্ধ ছিল। সেটা আবার চালু করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে হত্যা করা হয়েছে। এছাড়াও প্রধান আরো কয়েকটি বিষয় লক্ষণীয়। যেমন, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড যখন সংঘটিত হয়, তখন জাতীয় সংবিধান যে ৪ মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে ছিল, হত্যার পরে সে চার মূলনীতি ছুড়ে ফেলে দেয়া হয়। দ্বিতীয়ত, যে বাংলাদেশ বেতারের মাধ্যমে সারা দুনিয়ার মানুষ মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের খবর শুনেছিল, সে বাংলাদেশ বেতারের নাম পরিবর্তন করে রেডিও পাকিস্তানের মতো রেডিও বাংলাদেশ নাম রাখা হয়। তৃতীয়ত, একাত্তরের পরাজিত শক্তিদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিকভাবে পুনর্বাসিত করা হলো। চতুর্থত, বাংলাদেশের সংবিধানে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির কোনো স্থান ছিল না। কিন্তু সে অনুচ্ছেদ তুলে দিয়ে এ দেশে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রবর্তন করা হলো। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, মূল্যবোধকে হত্যা করা হলো। গোলাম আযমের নাগরিকত্ব না থাকার পরও তাকে দেশে এসে রাজনীতি করার সুযোগ তৈরি করে দেয়া হলো। এই কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে আমরা বুঝতে পারব যে, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড কোনো ব্যক্তির হত্যাকাণ্ড নয়, কোনো পরিবারের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ড ছিল না, একাত্তরের পরাজিত শক্তির প্রতিহিংসা এবং তাদের সেই স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধকে বিলুপ্ত করে দিয়ে এ দেশকে আবার একটি নব্য পাকিস্তানি দেশে রূপান্তরিত করার মূল প্রেক্ষাপটই ছিল একাত্তরের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যায় খন্দকার মোশতাক একটি বড় ভূমিকা পালন করেছেন। খন্দকার মোশতাকের রাজনৈতিক চরিত্র এবং রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা বিশ্লেষণ করলে দেখব, তিনি কোনো সময়ই একটি অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক বা প্রগতিশীল রাজনীতির পক্ষের ব্যক্তি ছিলেন না। তারপরও তিনি আওয়ামী লীগে ছিলেন এটাই বাস্তব এবং সিনিয়র নেতৃত্বের মধ্যেই তার অবস্থানটাই ছিল। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রাথমিক পর্যায়ে যে সরকার গঠন হয়েছিল, সেই সরকারে তিনি পররাষ্ট্রের দায়িত্বে ছিলেন। যেহেতু তখন বাংলার, এমনকি প্রত্যেকটি বাঙালির কাছে বঙ্গবন্ধু অন্যরকম একটি সেন্টিমেন্ট। বঙ্গবন্ধুকে ফিরে পেতে হবে, তিনি বেঁচে আছেন কিনা, এ প্রশ্নই সারাক্ষণ সবার মনে ঘুরপাক খাচ্ছে, খন্দকার মোশতাক তখন একটি সূ² চাল চেলেছিল। তিনি বক্তব্যের শুরুতেই বললেন যে, ‘তোমরা বঙ্গবন্ধুকে চাও না স্বাধীনতা চাও?’ অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুকে যদি চাও তবে স্বাধীনতা পাবে না। তার মানে হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর নাম ব্যবহার করে মুক্তিযুদ্ধ থেকে সরিয়ে আনা। তখন আমরা এর পাল্টা বলেছিলাম যে, বঙ্গবন্ধু এবং স্বাধীনতা এক এবং অভিন্ন। আমরা একসঙ্গেই দুটো চাই। তখন থেকেই কিন্তু তার পোস্ট সাসপেন্ডেড। এন্ড হি ওয়াজ নট এট অল টু মুভ এনি হোয়ার এজ এ ফরেন মিনিস্টার। তিনি তখন অন্তরীণ ছিলেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তার কোনো মুভমেন্ট ছিল না। আমাদের আবদুস সামাদ আজাদ সাহেবকে আন অফিসিয়ালি দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আমাদের বিভিন্ন কমিটি ছিল, তিনি তখন তাদের সঙ্গে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় লবিংয়ে গিয়েছিলেন, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রচারণা চালিয়েছেন। কিন্তু মোশতাক কোথাও যেতে পারেননি। তাকে যেতে দেয়া হয়নি। ওই সময় থেকেই তার কর্মকাণ্ড প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। পরবর্তীকালে আমরা ১৫ আগস্টের সকালে যখন শুনলাম যে খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে এবং তিনি রাষ্ট্রপতি হয়েছেন, তখন তার সম্পৃক্ততা পরিষ্কার হয়ে গেল। তার কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়েই তিনি প্রমাণ করেছেন, তিনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। কলাকুশলীদের মধ্যেও ছিলেন। প্রত্যেকটি পদক্ষেপের মধ্যেই তার উপস্থিতি ছিল। ফলে তিনি আর অস্বীকার করেননি। সরাসরি রাষ্ট্রপতি হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা শুরু করলেন।

হত্যাকারীরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে নিশ্চয়ই সফল হয়েছে, বলেই ২১ বছর ক্ষমতায় তারাই ছিল। ফলে ১৯৭৫-এর ১৪ আগস্ট আমরা যে পর্যায়ে ছিলাম, সেখানে আনা সম্ভব হয়নি রাজনৈতিকভাবে। অর্থাৎ ২১ বছরে যারা দেশটিকে পরিচালনা করেছিল তারা প্রকৃত অর্থে ওই হত্যাকাণ্ডের যে মূল উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সে দিকে ধাবিত ছিল। এবং তাদের মাধ্যমেই একদিকে যেমন মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তিরা রাজনৈতিক, সামাজিকসহ সব ধরনের মর্যাদা পেয়েছে, ঠিক তেমনি বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীরাও ওই সরকারগুলোর আমলেই বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি পেয়েছে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে নির্বাচিত হয়েছে। সুতরাং যারা ২১টি বছর এই রাষ্ট্র পরিচালনা করেছিল, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর তাদের সব কর্মকাণ্ড মূলত প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে তাদের সহায়ক ছিল। ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধু কন্যার নেতৃত্বে প্রথমে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকেই আমরা আবার সেই ১৯৭৫-এর ১৪ আগস্টের অবস্থানে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা শুরু করি। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের বিচার নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়েছিল ইনডেমনিটি এক্টের মাধ্যমে। আমরা সেটা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পার্লামেন্টে ওভার রুল করে দিয়ে হত্যার বিচারকার্য পরিচালনা করি। হত্যার রায় হয়। কিন্তু তারপরও ষড়যন্ত্র এত প্রকট ছিল যে, সেই রায় সে সময়ে কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তী সময়ে ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর সেই রায় কার্যকর করা সম্ভব হয়েছিল এবং ২০০৯ সাল থেকেই মূলত আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, মূল্যবোধ, জাতীয় চার নীতি ফিরিয়ে আনা এবং বঙ্গবন্ধুর যে স্বপ্ন সোনার বাংলা, অর্থনৈতিক মুক্তি- সেই কাজগুলো শেখ হাসিনার নেতৃত্বে শুরু করি। এখনো সেই কাজ অব্যাহত রয়েছে এবং আজকে আমরা বিশ্ব দরবারে মর্যাদাশীল বাঙালি জাতি। যে বাঙালিকে মনে করত ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে দেশে দেশে ঘুরে বেড়ায়। সেই আমরা এখন বাংলাদেশের সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিনিধি হিসেবে বিদেশে যাই। আমাদের মর্যাদার আসনে বসানো হয়। আমরা অনেক সময় কী-নোট স্পিকার হই, আমরা মূল স্পিকার হই, আমরা প্রিজাইড করি, বিভিন্ন অনুষ্ঠান এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় আমাদের দেশ বিজয় লাভ করে। ইন্টারন্যাশনাল পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) মতো ফোরমের প্রেসিডেন্ট আমাদের দেশ থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। কমনওয়েলথে আমাদের স্পিকার নির্বাচিত হয়েছে। সুতরাং সারাদেশ, দুনিয়ার মানুষ আজকে এই পার্লামেন্টকে স্বীকৃতি দেয় বলেই এই পার্লামেন্টের সদস্যরা আইপিইউর প্রেসিডেন্ট হয়। এই পার্লামেন্টের স্পিকারই কমনওয়েলথের প্রেসিডেন্ট হয়। যেহেতু এরা সারা দুনিয়ার কাছে স্বীকৃত প্রেসিডেন্ট।

বঙ্গবন্ধুর চেতনাকে ধারণ করেই আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। তাঁর রাজনৈতিক চেতনার যে মূল বিষয় ছিল- অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক, অর্থনীতির ভিত্তি এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদ। আমরা সেই চেতনাগুলোকে অন্তরে লালন করছি। তিনি যেটা চেয়েছিলেন, অর্থনৈতিক মুক্তি। সেই অর্থনৈতিক মুক্তির দিকেই আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। আজকে আমরা ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের রেটিং অনুযায়ী নিম্ন মধ্যম আয়ে প্রবেশ করেছি। ওখান থেকে আমরা কিন্তু মধ্যম আয়ের দেশে পদার্পণ করছি এবং ২০২১ সালের আগে আমরা মধ্যম আয়ের দেশে পদার্পণ করব। এরপর ২০৪১ সালের মধ্যে আমরা উন্নত দেশে পদার্পণ করব। সুতরাং বঙ্গবন্ধুর অর্থনৈতিক মুক্তির যে লক্ষ্য ছিল সেটা বাস্তবায়িত হচ্ছে।

আমরা অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছি। তবে ব্যক্তিগতভাবে কারো জমিজমা নিয়ে বিরোধ থাকলে তাকে রাজনৈতিক বিষয়ে না আনাই ভালো। যেমন দাঙ্গা বলতে আমাদের দেশের মানুষ ১৯৫০ সাল পর্যন্ত বুঝত, হিন্দু-মুসলমানের মধ্যকার যে মারামারি। কিন্তু আমরা দেখলাম ১৯৫৪ সালে যখন যুক্তফ্রন্ট নির্বাচিত হলো, সেই যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা ভাঙার জন্য বাঙালি-বিহারি দাঙ্গা বাধলো। কর্ণফুলী পেপার মিল এবং আদমজী জুট মিলে বাঙালি-বিহারি দাঙ্গা করে সে দিন সেরে বাংলা মন্ত্রিসভা ভেঙে দেয়া হলো।

বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী যারা পালিয়ে আছে তাদের দেশে ফিরিয়ে এনে শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য আমরা চেষ্টা চালাচ্ছি। কারণ তারা যেসব দেশে আছে, সেসব দেশের একটা আইনকানুন আছে। সে সব আইনকানুনের কারণে কিছু বেরিকেড আছে। আমাদের পক্ষ থেকে চেষ্টা হচ্ছে, এগুলো উত্তরণ করে তাদের ফিরিয়ে আনা।

আমির হোসেন আমু : আওয়ামী লীগ নেতা, সংসদ সদস্য, শিল্পমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।

অনুলিখন : মরিয়ম সেঁজুতি, দৈনিক ভোরের কাগজ

দিল্লির লালকেল্লা লাল নয়, ছিল সাদা! জানুন এমন আরও না জানা কথা

দিল্লী ভ্রমণ মানেই লাল দূর্গে একবার অন্তত যেতেই হবে। মোগল স্থাপনার এই অনন্য নিদর্শন নিজের চোখে না দেখলেই নয়। আর একটি স্থাপনা শুধু পাথরের দেয়াল নয়, এর সাথে জড়িয়ে আছে অযান্ত্রিক যুগের মেধা আর শিল্পমনের পরিচয়, জড়িয়ে আছে সেই সময়ের শাসকের গল্প, শ্রমিকের গল্প, জীবনের গল্প। তাই সময়কে যারা জানতে চান তারা বার বারই ছুটে যান প্রাচীন স্থাপত্যের কাছে।

১৬৩৯ সালে যখন শাহ জাহান তার রাজধানী আগ্রা থেকে নিয়ে আসেন দিল্লীতে তখন তিনি এই দূর্গ নির্মাণের নির্দেশ দেন। তখন এই স্থানের নাম ছিল শাহজাহানাবাদ, বর্তমানে জায়গাটিকে আমরা পুরাতন দিল্লী হিসেবে চিনি। এর নির্মাণে সময় লেগেছিল এক দশক। যমুনা নদীর পানি দিয়ে পূর্ণ করা হত এর পরিখাগুলো। এখন সেই নদী আর নেই। সেই সময়ের গল্প আজও বিস্ময় জাগায়, অনেক কিছুই যেন বিশ্বাস হতে চায় না, অনেক প্রশ্নের উত্তর আজও মেলে না।
বেড়াতে যাওয়ার আগে জেনে নিন মজার কিছু তথ্য। আপনি সরসরি ভ্রমণেও অনেক কিছুই হয়ত মিস করে যাবেন। প্রচলিত ইতিহাসের পেছনেও আছে অনেক গল্প, অনেক কথা যা ইতিহাস আপনাকে জানাতে চায়। জানুন, এরপর দেখুন। ভ্রমণ হবে আরও উপভোগ্য।

তুলে ধরছি এমন কিছু মজার তথ্য-

রং মহল। ছবি- সংগৃহীত

লাল দূর্গ প্রকৃতপক্ষে ছিল সাদা

দূর্গটির নাম লাল আবার দেখতেও সবার আগে চোখে পড়ে এর লাল ইট রঙ্গা দেয়াল। কিন্তু দূর্গটি মোটেই এভাবে নির্মিত হয় নি। ইন্ডিয়ার নৃতাত্ত্বিক গবেষণায় পাওয়া তথ্যমতে, দালানের বিভিন্ন অংশে ব্যবহার করা হয়েছিল চুনাপাথর। তাই শ্বেতবর্ণই ছিল এর প্রকৃত বর্ণ। কিন্তু একসময় এর শুভ্রতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এর উজ্জ্বলতা মলিন হয়ে এলে বৃটিশরা দুর্গের দেয়ালে লাল রং করে দেয়।

লাল কেল্লার প্রকৃত নাম লাল কেল্লা নয়

উঁচু লাল দেয়াল যা ঘিরে আছে দূর্গটিকে তার রঙই দিনে দিনে মানুষের মুখে মুখে এর নাম দেয় লাল কেল্লা। দেয়ালটি নির্মিত হয়েছিল লাল পাথর আর ইট দিয়ে। ব্রিটিশরা দূর্গটিকে ডাকতে শুরু করে ‘রেড ফোর্ট’ আর স্থানীয়রা ডাকে ‘লাল কেল্লা’। কিন্তু এর প্রকৃত নাম ছিল ক্বিলা-ই-মুবারাক।

স্থাপত্যশিল্পী

বিশাল এই কেল্লাটির স্থাপত্যশিল্পীদের নাম নিশ্চয়ই জানতে চাইবেন আপনি? আজকে যা দেখে বিস্ময়ে অভিভূত হচ্ছেন আপনি তার নকশা করেছিলেন ওস্তাদ হামিদ এবং ওস্তাদ আহমেদ।

কোহিনূর ছিল এখানেই

শাহজাহানের সিংহাসনে স্থান পেয়েছিল কোহিনূর একথা জানি আমরা সবাই। সেই সিংহাসন ছিল লাল কেল্লায়। পুরো আসনটিই ছিল খাটি সোনার, খচিত ছিল নানান মূল্যবান রত্নে। দেওয়ান-ই-খাস এ রাখা ছিল সিংহাসনটি। সিংহাসনের শীর্ষে শোভা পেত বিশ্বের সবচেয়ে বড় হিরাটি।

লাহোর গেট

লাল কেল্লার দুইটি প্রধান পথ। একটি দিল্লী গেট আর অন্যটি লাহোর গেট। ২য় পথটির নাম লাহোর গেট কারণ লাহোরের সাথে এর সংযোগ রয়েছে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, ইন্ডিয়া আর পাকিস্তান এক সময় একই দেশ ছিল।

একটা ওয়াটার গেটও আছে এখানে
৩য় একটি বহির্গমণ পথ আছে দূর্গটির। যমুনা নদীর তীরেই ছিল কেল্লাটি। নদীর সাথে সহজ সংযোগ রাখতেই তৈরি হয়েছিল এই গেটটি। নদী যদিও এখন আর কাছে নেই, তবে আছে নামটি।

বার্ডস আই ভিউতে দূর্গটি দেখতে ছিল এরকম। ছবি- সংগৃহীত

দূর্গটি অষ্টকোণী
বার্ডস আই ভিউ থেকে চমৎকার এই স্থাপনাটি দেখতে অষ্টকোনী। ২৫৬ একর জায়গা জুড়ে এর বিস্তৃতি। লাল প্রাচীরের বেষ্টনীটি উপর থেকে দেখতে একটি পারফেক্ট অষ্টভূজ।

রং মহল
রং মহল বাস্তবেই ছিল রঙের প্রাসাদ। এখানে বাস করতেন সম্রাটের পত্নী, উপপত্নী এবং দাসীগণ। পাশের খাস মহলেই থাকতেন সম্রাট যাতে যে কোনো সময় আসতে পারেন রং মহলে। রাতের খাবার বা হালকা নাস্তা করতে এখানেই আসতেন তিনি। সম্রাট ছাড়া অন্য কারও মহলে প্রবেশ ছিল নিষিদ্ধ।

নাক্কারখানা
কেল্লার সঙ্গীতের আসর বসত এখানে। প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে বসত সেই আসর। প্রাসাদের সম্মুখেই অবস্থিত এই জায়গাটি। অভিজাত ব্যক্তিরা এখানে গান শুনতে আসতেন হাতির পিঠে চড়ে।

সুরক্ষা ব্যবস্থা
কেল্লাটিকে ঘিরে আছে একটি বিশাল পরিখা। এর পানি আসত যমুনা নদী থেকে। কেল্লার নিরাপত্তার স্বার্থে পরিখায় রাখা হত কুমির। কোনভাবে শত্রুপক্ষের কেউ যদি কুমিরের এই পরিখা পার হয়েও যেত তার জন্য কেল্লার গায়ে মাখানো থাকত তেল। যতই চেষ্টা করুক না কেন কুমিরের খাদ্য হওয়া ছাড়া আর কোন উপায় থাকত না তার।

বাহাদূর শাহ বন্দী ছিলেন এখানে
শাহ জাফর তখন দিল্লীর সম্রাট। বাহাদূর তার উপাধি। কিন্তু ভূখন্ড চলে গেছে ব্রিটিশদের দখলে। দেওয়ানি খাসের সামনে ব্রিটিশ কোর্ট বসে। সম্রাটকে রাজদ্রোহী হিসেবে দোষী সাব্যস্ত করা হয় সেই কোর্টে! তার উপাধি কেড়ে নেওয়া হয়। পরে তাকে নির্বাসন দেওয়া হয় বর্তমান মায়ানমারে।

কেল্লার সকল মূল্যবান বস্তু চুরি করে ব্রিটিশরা
মোগল শাসনের শেষ সময়ে ব্রিটিশরা কেল্লার দখল নেয়। তারা এর মূল্যবান সকল আসবাব, পাথর, রত্ন বিক্রী করে দেয়। স্থাপত্যের গায়ে খচিত রত্ন বিক্রী করার জন্য তারা স্থাপত্যের দেয়ালের প্রচুর ক্ষতি সাধন করে। আর এজন্যই আপনি আজ যে কেল্লা দেখতে পাবেন তাতে সেই রত্নশোভা আর নেই।

এটি বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ
ইউনেস্কো লাল কেল্লাকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে ঘোষণা করে ২০০৭ সালে।

জ্ঞান আমাদের মনকে বড় করে। আপনি যত দেখবেন তত বদলে যাবে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি। তাই দেখুন, জানুন। ভ্রমণ করুন, নতুন থেকে নতুনের কাছে যান। সৃষ্টি তা প্রকৃতির হোক আর মানুষের, তার রহস্য মুগ্ধ করবে আপনাকে।

চারদিকে আগুন দিলে সবাই ছোটাছুঁটি করছিল, ফিরে দেখি সব শেষ’

স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরও বরিশালের গৌরনদী উপজেলার রীরঙ্গনা বিভা রানী মজুমদার (৬১) মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পায়নি। ১৯৭১ সালের বীরঙ্গনা বিভা রানী আজ সংসারের চাকা সচল রাখতে মাঝে মধ্যে তাকে ধাত্রীর কাজ করতে হয়।

জীবনযুদ্ধে প্রতিবন্ধী সন্তান সাগর মজুমদার (২৮)কে নিয়ে তার আরেক সংগ্রাম। বীরাঙ্গনাকে নিয়ে ঘর করতে রাজি না হওয়ায় স্বামীও তাকে ত্যাগ করেছে। আর জীবনযুদ্ধের কঠিন বাস্তবতায় বৃদ্ধা বিভা রানী সন্তানকে নিয়ে সাগরে ভাসছেন। তিনি বলেন, সাগরকে নিয়ে আজ আমি সাগরে ভাসতাছি।

বরিশালের গৌরনদী উপজেলার টরকী চর এলাকায় বাবা উমেশ চন্দ্র মন্ডলের সাড়ে চার শতক জমিতে টিনের ঘর। এ টিনের ঘরেই একমাত্র ভাই উপেন্দ্র নাথ মন্ডলকে নিয়ে বিভা রানী মজুমদার সেলাই মেশিন চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ আসতেই বিভা রানী অনেকটা আনমনা হয়ে যান। বলতে থাকেন, আমার বাবা টরকীচরে বহুদিন ধরে বসবাস করেছেন। উনি ক্ষুদ্র ব্যবসা করতেন। এখানে আমরা ৪ বোন ও ১ ভাই ছিলাম। ১৯৭১ সালে আমি টরকী হাইস্কুলে অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী ছিলাম। জ্যৈষ্ঠ মাসে এখানে পাকিস্তানী মিলিটারীদের নিয়ে আসে স্থানীয় রাজাকাররা। চারিদিকে আগুন দিতে শুরু করে। লোকজন যে যেদিক পারে ছোটাছুঁটি করছিল।

আমার বাবা তখন পর্যন্ত বাড়িতে অবস্থান করেন। এমন সময় সবাই বাবাকে স্থান ত্যাগ করতে বললে বাবা আমাদের নিয়ে কালকিনির রমজানপুরের দিকে ছুটলেন। কিন্তু তখন আমরা দিকদ্বিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছিলাম। আমিসহ কয়েকজন আখক্ষেতের মাঠে রাজাকারদের হাতে ধরা পড়ে যাই। সেদিন ওদের হাত থেকে আমরা কেউ রেহাই পাইনি।

পরবর্তীতে আমাদেরকে বাবা খুঁজে ঘরে নিয়ে আসে। বাড়ি ফিরে দেখি সব শেষ। একমাত্র আমার চাচাদের বসত ঘরটি ব্যতিত আমাদের বাড়ির ১৪টি ঘর পাকিস্তানী হানাদাররা সম্পূর্ণ পুড়িয়ে দিয়েছে। বাবা দ্রুত শ্রাবন মাসে একই গ্রামের অনুকুল মজুমদার নামের একজনের সাথে আমার বিয়ে দেন। পরবর্তীতে আমরা দুটি পরিবারের ১০ জন টরকী থেকে নৌকাযোগে আটদিন পর ভারতে গিয়ে পৌঁছি। দেশ স্বাধীনের পর সবাই আবার দেশে ফিরে আসি। দেশে ফিরে আমার স্বামী যুদ্ধচলাকালীন সময়ে আমার ওপর রাজাকারদের নির্যাতনের কাহিনী জানতে পেরে হঠাৎ কিছু না জানিয়ে উধাও হয়ে যায়। পরবর্তীতে ছেলে সাগর জন্মাবার চার মাস পর (১৯৮৮ সালে) পূর্ণরায় ফিরে এসে আমাকে সে ত্যাগ করে ভারতে চলে যান। সেই থেকে আজ পর্যন্ত প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়ে কোন রকম বেঁচে আছি।

তিনি আরও বলেন, আমি আগে তাঁতে লুঙ্গি বুনতাম। ছোটবেলা থেকেই সেলাইয়ের কাজ করতাম। তাই এখন অর্ডারে কাপর-চোপর সেলাই করে জীবিকা নির্বাহ করছি। মাঝখানে স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবেও আমি ১০ বছর কাজ করেছি। যে কারণে আমাকে আসে পাশে ধাত্রীর কাজও করতে হয়। তখন বীরঙ্গনার বিষয়টি এলাকাবাসী জানলেও আমার অবিবাহিত বোনদের ও ছেলের সম্মানহানির জন্য লোকলজ্জায় বীরঙ্গনার ঘটনাটি স্থানীয় ৩/৪ জন মুক্তিযোদ্ধা ছাড়া কারও কাছে বলিনি।

ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, যুদ্ধের সময়ে সম্ভ্রম হারানোর কারণে আমার সংসার জীবন ভেঙ্গে গেছে। আমি বীরঙ্গনা হয়েও স্বাথীনতার ৪৫ বছর পরও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাইনি। সরকারি ভাবে আমি কোন সাহায্য সহযোগীতা পাইনি। এমনকি আমাদের কোন তালিকাও করা হয়নি। অথচ আমার জীবন কাহিনী স্থানীয় সকল মুক্তিযোদ্ধারা জানেন।

উপজেলার বার্থী ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার আলহ্বাজ আবদুল হালিম সরদার বলেন, বিভা রানী মজুমদার স্বীকৃতি পেতে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের এখন পর্যন্ত আবেদন করেননি। আবেদন করলে যাচাই বাছাই করে কেন্দ্র সুপারিশ পাঠানো হবে।

গৌরনদীতে আবিষ্কার হলো চারশ’ বছরের পুরানো পুঁথি

সম্প্রতি বরিশালের গৌরনদী উপজেলার স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ে প্রাচীন  হাতে লেখা একটি পুঁথির সন্ধান মিলেছে। নলচিড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়
কর্তৃপক্ষ সযত্নে পুঁথিটি সংরক্ষণ করছেন। প্রধান শিক্ষক মো. নুরুল আলম জানান তাঁরা বইটি দান হিসাবে পেয়েছেন উপজেলার বাটাজোর ইউনিয়নের বাহাদুরপুর গ্রামের আশুতোষ দাসের কাছ থেকে। অবিভক্ত ভারতে রাজনৈতিক দল কংগ্রেসের স্থানীয় নেতা ছিলেন আশুতোষবাবু। পাঁচ বছর আগে তিনি পরলোকগমন করেন, তার আগে দুর্লভ পুঁথিটি স্কুলে দান করে যান।

পুঁথিটির আলোকচিত্র বাংলাদেশ জাতীয় যাদুঘরে পাঠানো হলে সেখানকার সহকারী পরিচালক প্রাচীন ভাষা বিশেষজ্ঞ ড. শরিফুল ইসলাম এর ভাষা সংস্কৃত এবং লিপি বাংলা বলে শনাক্ত করেছেন। তিনি আরো বলেন পুঁথিটি তুলোট কাগজের হওয়ার কথা এবং এটি প্রণয়ন করা হয়েছে খুব সম্ভব চোদ্দ থেকে ষোলো শতকের মধ্যে। অর্থাৎ পুঁথিটি চারশ’ থেকে ছয়শ’ বছর বয়সী।

বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে তুলোট কাগজ তৈরি হতো মেস্তা ও পাট থেকে। এ ধরনের হাতে তৈরি কাগজ বঙ্গদেশে প্রচলিত ছিল বারো শতক থেকে ষোলো শতক পর্যন্ত, জানান ড. শরিফুল। তবে পুঁথির বিষয়বস্তু কী সে সম্পর্কে তিনি কিছু বলেননি।

মো. নুরুল আলম জানিয়েছেন পুঁথিটি যাতে পোকায় না কাটে সেজন্য এর ভাঁজে ভাঁজে নিমপাতা দিয়ে রাখা হয়েছে।

মাহিলাড়া সরকার মঠ

নবাব আলীবর্দি খানের ১৭৪০-১৭৫৬ সনের শাসনামলে সরকার রুপরাম দাস গুপ্ত নামক এক ব্যাক্তি কর্তৃক নির্মিত। ইহা সরকার মঠ নামেও পরিচিত। মঠটির উচ্চতা ভুমি হতে প্রায় ২৭.৪০ মিটার। মঠটি বর্গাকারে নির্মিত, ভিতরে একটি কক্ষ এবং পশ্চিম দেয়ালে একটি খিলান যুক্ত প্রবেশ পথ সহ অলংকরণ রয়েছে। বর্নিত বিবেচনায় মঠটি পর্যটন এলাকা হিসাবে চিহ্নিত করা যেতে পারে।

উল্লেখ্য যে, মাহিলাড়া মঠটি প্রত্মতত্ব অধিদপ্তর  কর্তৃক ঐতিহাসিক মঠ হিসেবে স্বীকৃত পেয়েছে।

অবস্থান:
মাহিলাড়া, গৌরনদী।
কিভাবে যাওয়া যায়:
মাহিলাড়া বাস স্ট্যান্ড রিক্সায় যাওয়া যায়।

হযরত মল্লিক দূত কুমার শাহ রাঃ মাজার

হযরত মল্লিক দূত কুমার পীর সাহেব রাঃ এর মাজার শরীফ গৌরনদী উপজেলাধীন লাখেরাজ কসবা গ্রামে অবস্থিত। মাজারটি আরবের ইয়েমেনের বাদশাহর দ্বিতীয় পুত্র বাদশা জাহাঙ্গীরের আমলে স্থাপিত। মাজার সংলগ্ন উত্তর পার্শে একটি মসজিদ রয়েছে।

এই উপমহাদেশে তিনি মূলত ইসলাম প্রচারের জন্য এসেছিলেন। তার আমলে কসবা গ্রামের খাজনা মওকুফ করেছেন বলে বলে গ্রামটির নাম হয়েছে লাখেরাজ কসবা। স্থানীয় ভাবে জানা যায় যে, তিনি বাঘের পিঠে চড়ে বেড়াতেন এবং গাভীগুলো স্বেচ্ছায় তাকে দুধ পান করাতেন।

অবস্থান:
টরকী বন্দর বাসস্ট্যান্ড, গৌরনদী, বরিশাল।

কিভাবে যাওয়া যায়:
টরকী বন্দর বাসস্ট্যান্ড নেমে হেটে যাওয়া যায়।

কসবা মসজিদ

কসবা মসজিদটি গৌরনদী উপজেলাধীন কসবা গ্রামে অবস্থিত নয় গম্বুজ বিশিষ্ট এ মসজিদটি বাগের হাটের ষাট গম্বুজ মসজিদের অনুরূপ বর্গাকারে নির্মিত এ মসজিদের পরিমাপ ১১.৬৮ মিটার ×১১.৬৮ মিটার এবং দেয়াল গুলো ২.১৮ মিটার চওড়া। মসজিদের সম্মুখ ভাগ ফুল ও অন্যান্য নকসায় ভরপুর। মসজিদের চার কোনে চারটি গোলাকার টারেক রয়েছে। টারেক গুলো রেখায় অলংকৃত। মসজিদের উল্লেখ যোগ্য বৈশিষ্ট্য হল। কার্নিশ গুলো বর্গাকারে নির্মিত। উত্তর ও দক্ষিণ দিকে একটি খিলান যুক্ত প্রবেশ পথ আছে। পূর্ব দিকে মসজিদের ভিতরে প্রবেশের জন্য তিনটি পথ রয়েছে। পশ্চিম দেয়ালে তিনটি মেহরাব আছে। মসজিদটি দেখে মনে হয় ইহা পঞ্চদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় খান জাহান রহঃ এর আমলে নির্মিত।

অবস্থান:
লাখেরাজ কসবা।

কিভাবে যাওয়া যায়:
টরকী বন্দর বাস স্ট্যান্ড নেমে হেটে বা রিক্সায় যাওয়া যায়।

 

মুক্তিযুদ্ধে গৌরনদী

১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক ঘটনাবহুল সাধারণ নির্বাচনের পরে পশ্চিম পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে যখনই টালবাহানা শুরু হল। তখনই সমগ্র বাঙালী জাতি বুঝতে পারল বাঙালীর তথা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ছাড়া বিকল্প নেই। বাঙালী জাতীর একমাত্র অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবার রহমানের একটি নির্দেশের অপেক্ষা ছিল সাত কোটি বাঙালী। প্রিয় নেতা কখন স্বাধীনতার জন্য জনযুদ্ধের ডাক দেন। অপেক্ষার প্রহর শেষ হলও ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দান লাখো লাখো জনতায় সমগ্র মাঠটি কানায় কানায় পরিপূর্ণ। এছাড়া বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ স্বাধীনতার যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। মুক্তিকামী মানুষের শুধু একটিই আবেগ ছিল প্রিয় নেতা কখন নির্দেশ দিবে। অবশেষে মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ডাক ‘‘এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম’’ ‘‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম।’’ ঘরে ঘরে দুর্গ করে তোল। শত্রুর মোকাবেলা করে এ দেশকে স্বাধীন করতে হবে। মহান নেতার এই ভাষণ প্রতিটি মুক্তিকামী জনতার মনে দীক্ষামন্ত্রের মতো কাজ করতে লাগলো।

৭১’র ২৫ মার্চ ঘুমন্ত মানুষের উপর রাতের অন্ধকারে পশ্চিম পাকিস্তানী কাপুরুষ শাসক গোষ্ঠী অতর্কিত হামলা চালায়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণা পত্রটি ই-পি-আরের ওয়ারলেস যোগে চট্টগ্রামের কালুর ঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচার হওয়ার সাথে সাথে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয় গৌরনদীর মুক্তিকামী মানুষ। বরিশাল অঞ্চলে তখনও পুরোপুরি যুদ্ধ শুরু হয়নি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মন্ত্রী সভার সদস্য ও কৃষককুলের নয়নমণি আব্দুর রব সেরনিয়াবাদের সার্বিক সহযোগিতায় গৌরনদী কলেজ মাঠে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ শুরুর পদক্ষেপ নেয়া হয়। গৌরনদী থানা থেকে আনা ৩০টি রাইফেল দিয়ে শুরু হল ট্রেনিং। গৌরনদী কলেজ মাঠে ট্রেনিং কমান্ডার সাইলেন্সর কাশেমের উদ্বুদ্ধকরণ বক্তৃতা যুব সমাজকে উৎসাহিত করেছিল।

২৫শে এপ্রিল ১৯৭১ হঠাৎ করে বেলা আনুমানিক ১১টা  দিকে লক্ষ্মণ দাস সার্কাসের মালিক অরুণ দাস খবর দেয় মাদারীপুর থেকে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া যান নিয়ে বরিশালের উদ্দেশ্যে রওনা করছে। গৌরনদীর মুক্তিযোদ্ধারা খবর পাওয়ার সাথে সাথে পাক সেনাবাহিনীকে প্রতিরোধ করার জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। বেজ কমান্ডার সৈয়দ আবুল হোসেনের নেতৃত্বে ৩৩ জন মুক্তিযোদ্ধা ও ডা: আ.ন.ম হাকিম বোহরামের নেতৃত্বে ৩০ জন যোদ্ধা ভুরঘাটা গিয়ে পাক হানাদার প্রতিরোধ করার জন্য পরিকল্পনা করে ভূরঘাটার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। টরকীর কটকস্থল পৌছা মাত্রই দেখতে তারা দেখতে পান পাকিস্তানী হায়েনাদের সাঁজোয়া যান এসে গেছে। সাথে সাথে মুক্তিযোদ্ধার দল বিভক্ত হয়ে চারদিক থেকে পজিশন নেয়। পাক হায়েনাদের গাড়ী পৌঁছা মাত্রই যোদ্ধারা হায়েনাদের উপর গুলি চালালে শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ। সেনাবাহিনীর ২২টি গাড়ীর সাথে মাত্র ৬২ জন মুক্তিযোদ্ধা হালকা অস্ত্র দিয়ে প্রায় তিন চার ঘণ্টা যুদ্ধ করে অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত পাক সেনাবাহিনীর সাথে। যুদ্ধে চার মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন এবং আটজন পাকিস্তানী সেনাবাহিনী নিহত হন। যে চারজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন তারা হলেন গৈলার আলাউদ্দীন বক্স (আলা বক্স)। তার সমাধি করা হয় গৈলা হাইস্কুলের দক্ষিণ পাশে। বাটাজোর দেওপাড়ার মোক্তার হোসেন। তার সমাধি করা হয় ধানডোবা বড়বাড়ি বোর্ড স্কুলের পিছনের বাড়ীর একটি বাঁশ বাগানে। নাঠৈ গ্রামের সৈয়দ হাশেম আলী। তার সমাধি করা হয় নাঠৈ ঈদগাহ ময়দানের পাশে। চাঁদশী গ্রামের পরিমল মণ্ডল। তার সমাধি করা হয় চাঁদশী মণ্ডল বাড়ীতে। এটা ছিল গৌরনদীর তথা বরিশালের প্রথম পাক হানাদার প্রতিরোধ ও সম্মুখ যুদ্ধ। ২৫ এপ্রিলের পর থেকেই সমস্ত বরিশালে যুদ্ধ ছড়িয়ে পরে।

গৌরনদীর বিভিন্ন জায়গায় রাজাকার, পীচ কমিটি, লুটেরাও সমস্ত স্বাধীনতা বিরোধীরা ছিল উল্লসিত। পাকিস্তানী সেনাদের এই হত্যাযজ্ঞে বাংলাদেশের সব জায়গার মতো তারা বেপরোয়া হয়ে উঠল। গৌরনদী উপজেলার রাজাকার, পীচ কমিটি, স্বাধীনতা বিরোধীরা গৌরনদীর বিভিন্ন ইউনিয়ন, গ্রাম-গঞ্জে নারী হত্যা, শিশু হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট শুরু করে।

১৯৭১ সালের  ২৯ এপ্রিল বাটাজোরে ইউনিয়নের প্রথম শহীদ হন ইউপি চেয়ারম্যান সোনামদ্দিন মিঞা। এছাড়া ১৮ মে ১৯৭১ স্থানীয় রাজাকার মানিক রাঁড়ী ও খাদেম মিলিটারির সহায়তায় বাটাজোর ইউনিয়নের হরহর গ্রামের বাড়ৈ পাড়ায় চালানো হয় হত্যাযজ্ঞ। শিশু থেকে বৃদ্ধকে পাকসেনারা ব্রাশ-ফায়ারে হত্যা করে।

১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ এ এদেশ শত্রু মুক্ত হলেও গৌরনদী মুক্ত হয় ২২ ডিসেম্বর ১৯৭১। হোসনাবাদের নিজাম উদ্দিন আঁকনের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনী ও আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর নেতৃত্বে মুজিব বাহিনী যখন পশ্চিমা হায়েনাদের কজ্বা করে এনেছিল তখন ২২ ডিসেম্বর ১৯৭১ পাকিস্তান হানাদাররা মিত্রবাহিনীর মেজর ডি.সি দাসের নিকট আত্মসমর্পণ করেন। এই আত্মসমর্পণের মধ্যে ২২ ডিসেম্বর ১৯৭১ গৌরনদী শত্রু মুক্ত হয়। গৌরনদীর আকাশে উদিত হয় স্বাধীনতার লাল সূর্য।

সিপাহী আলাউদ্দিন

১৯৪৬ সালের ১৬ জানুয়ারী বরিশাল জেলার আগৈলঝাড়া উপজেলার সুজন কাঠি গ্রামে সিপাহী মোঃ আলাউদ্দিন জন্মগ্রন করেন । তার পিতার নাম আবুল হাসেন এবং মাতার নাম ভানু বিবি।

১৯৬৪ সালের জুলাই মাসের ১৬ তারিখ মোঃ আলাউদ্দিন সেনা বাহিনীতে যোগদান করেন। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে সিপাহী আলাউদ্দিন দেশকে শত্রু মুক্ত করার জন্য মুক্তি বাহিনীতে যোগদান করেন।

১৯৭১ সালের ২৫ এপ্রিল ৯ নং সেক্টরে যুদ্ধ চলাকলীন বরিশাল জেলার গৌরনদী উপজেলার কটকস্থল নামক স্থানে হানাদার বাহিনীর গোলার আঘাতে শাহাদাৎ বরন করেন।

শহীদ সিপাহী আলাউদ্দিন এর দেহ গৈলা মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পাশে সমাহিত করা হয়েছে।