আলহাজ্ব আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ’র প্রতি খোলা চিঠি

ভাই,
শুরুতেই আমার সংগ্রামী ছালাম নিবেন। কেমন আছেন? আশাকরি কুশলেই আছেন। হ্যা জানি মানসিক ভাবে ভালো নেই আপনি। কারন যার যায়, সেই যানে হারানোর বেদনা। এই আগস্টেই আপনি হারিয়েছিলেন আপনার পিতা এবং আদরের ধন, মানিক রতন প্রিয় সন্তান সুকান্ত বাবু সহ পরিবারের অনেকেরে। কিন্তু ভাই, কি আর করার!! আপনি জানেন, আপনিই আমাদের শেষ আশ্রয়স্থল। তাইতো সময় অসময়ে আমরা আপনার কাছেই ছুটে যাই আমাদের সকল সমস্যার সমাধান খুঁজতে। আর আপনিও আমাদের কখনো নিরাশ করেন না এবং দরজা বন্ধ করে রাখেন না। যদিও আপনার অজান্তে কিছু চাটার কারনে মাঝে মাঝে দরজা বন্ধ থাকে। কিন্তু আপনি যখন ধমকের সুরে কথা বলেন তখন চাটারা সেই দরজা আবার খুলে দিতে বাধ্য থাকে। কিন্তু আপনি হয়তো জানেন না, চাটারা আজ আপনাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে!! আর সেটা জানানোর জন্যই আজকে আমার এই খোলা চিঠি লেখা আপনার প্রতি।

আমি জানি না আমার এই চিঠি আপনার দৃষ্টিগোচর হবে কিনা?? আল্লাহ্‌ কিনা পারে!! আল্লাহ্‌ সহায় থাকলে হয়তো আমার এই চিঠিটা আপনি পড়লেও পড়তে পারেন। আবার নাও পড়তে পারেন। কিন্তু তারপরও লিখছি এই ভেবে যে, আমিতো লিখেছি!! বাকি সব আল্লাহ্‌র ইছছা।

ভাই, আমরা (গৌরনদী বাসী) আলহামদুলিল্লাহ ভালোই আছি!! কারন আপনার মতো এমন অভিভাবক যাদের আছে তারা কি কখনো খারাপ থাকতে পারে। না, কখনোই না। ভাই, আমরা সবাই খেয়ে পড়ে মাশ আল্লাহ্‌ ভালোই আছি। কিন্তু অতীব দুঃখের সাথে আপনাকে আজ বলতে বাধ্য হচ্ছি, ভাই আমরা ভালো আছি ঠিকই, কিন্তু শান্তিতে নাই। আমরা বাইরে যাওয়ার আগে চিন্তা নিয়ে বাইরে যাই যে, আমরা কি আবার অক্ষত অবস্থায় ঘড়ে ফিরতে পারবো কি?? না!! ভাই আপনি জানেন?? আমার মনে হয় আপনি জানেন না যে, আমারা যখন ঘড়ের বাইরে আসি তখন আমাদের মা’য়েরা পথ পানে চেয়ে থাকে তার প্রিয় সন্তানটি কি বেঁচে আছে, নাকি মরে গেছে!! নাকি নেশার কালো ছোবোলে ডুবে গিয়ে আত্মহননে মগ্ন আছে!! ভাই, এমনো ঘটনা আছে যে, মেয়েটি কলেজে পড়তো এবং কলেজে পড়া কালীন সময়ে বিজয় দিবসের সকালে কলেজ ক্যাম্পাসে মাইকে বাজানো বঙ্গবন্ধুর সেই জ্বালাময়ী ভাষণ শুনে মনে মনে কল্পনা করতো, আমিতো অতীব রক্ষনশীল পরিবারে জন্ম গ্রহন করার কারনে বঙ্গবন্ধুর মতো জয় বাংলা শ্লোগান দিতে পারবো না। কিন্তু আল্লাহ্‌ যদি কোনোদিন আমারে একটা সন্তান দেয় সেই সন্তানটির মুখে যেদিন আমি জয় বাংলা শ্লোগানটা শুনবো সেদিন ভেবে নেবো, আমার সন্তানই আমার হয়ে বঙ্গবন্ধুর মতো জয় বাংলা শ্লোগান দিতেছে। কিন্তু ভাই, সেই দিনের সেই কলেজ পড়ুয়া মেয়েটি বা ছেলেটি ঠিকই আজকে একটি সুন্দর ফুটফুটে সন্তানের বাবা-মা হয়েছে, কিন্তু তারা এখন কেমন জানি উল্টো ভাবতে শুরু করেছে!! ভাই জানেন সেই কলেজ পড়ুয়া সদ্য বাবা-মা হওয়া ছেলে-মেয়েটি এখন কি ভাবে?? তারা ভাবে আমার সন্তানটি যদি আজকে জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু শ্লোগান দেয় তাহলে হয়তো সে কোনো একদিন লাশ হয়ে যাবে, না হয় নেশার কালো থাবায় নিঃশেষ হয়ে যাবে। ভাই, তারা এটা নিয়ে ভাবে না যে, আমার সন্তানটি জয় বাংলা শ্লোগান দিলে, জয় বাংলা শ্লোগানের বিরোধীতা কারীদের দ্বারা লাশ হবে। তারা এটা ভেবে ঘুমের ঘোরেও জেগে যায় যে, তাদের প্রিয় সন্তানটি জয় বাংলা শ্লোগান ধারী একজন চাটার আঘাতে লাশ হয়ে যাবে, অথবা জয় বাংলা শ্লোগান ধারী একজন চাটার পৃষ্ঠপোষকতায় নেশার কালো ছোবলে নিঃশেষ হয়ে যাবে!!

ভাই, সারা বাংলাদেশের সবাই এবং বিশ্বের অনেক মানুষ জানে, আপনার মেধার কারনেই এবং রাজনৈতিক পরিপক্কতার কারনেই অশান্ত চট্রগ্রামে শান্তি ফিরে আসছিলো। সেদিন আপনি যদি বাংলাদেশের সেই অপরুপ সৌন্দর্যে মহিমান্বিত পাহাড়ে শান্তি ফিরিয়ে না আনতে পারতেন, তাহলে হয়তো বাংলাদেশের পাহাড় আজো অশান্ত থাকতো। কিন্তু আপনি সেদিন বাংলাদেশ সহ সারা বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছিলেন কিভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হয়। কিন্তু ভাই, আপনি জানেন কি, আপনার বাবা শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত যেই গৌরনদী কে ভালোবেসে জেলা বানানোর জন্য আপ্রান চেষ্টা করে গেছেন এবং বর্তমানে আপনি আপনার বাবার অসমাপ্ত কাজকে বাস্তবে রুপ দেয়ার জন্য প্রানপন চেষ্টা করে যাচ্ছেন, ঠিক তখনই কিছু স্থানীয় চাটা এবং সুযোগ সন্ধানিরা শান্ত গৌরনদীকে আজ অশান্ত করার জন্য এমন কোনো ঘৃণিত কাজ নাই, যা তারা করে যাচ্ছে না। ভাই আপনি জানেন কি, বসন্তের কোকিলের মতো উড়ে এসে জুড়ে বসা কিছু বসন্তের চাটারা আজ রক্তের হলি খেলায় এমনভাবে মেতেছে যে, তারা এখন বিচার করতে পারে না যে, কোনটা লাল রং, আর কোনটা রক্ত!! তারা এখন রক্তকেও মনে করে বাজার থেকে কিনে আনা লাল রং।

ভাই, আপনি চাইতেছেন কিভাবে গৌরনদী-আগৌলঝাড়ার মানুষের জীবন মান উন্নত করা যায়। আপনি চাচ্ছেন কিভাবে গৌরনদীর অবকাঠামোগত উন্নয়ন করে গৌরনদীকে জেলা বানানো যায়। কিন্তু ভাই, আপনি জানেন কি, কিছু চাটারা আজ গৌরনদীর মেরুদণ্ড ভেঙ্গে দেয়ার পায়তারা হিসেবে গৌরনদীকে মাদকের অভয়ারণ্যে পরিনত করার ষড়যন্ত্রে মত্ত হয়ে আছে?? ভাই কিছু চাটারা আজ আপনার নাম ভাঙ্গিয়ে প্রশাসনকে নিজেদের পকেটের রুমাল বানিয়ে সেই রুমাল গৌরনদীর তরুন সমাজের মাথায় বেধে দিয়ে বলতেছে, যাও এখন আর রোদ, বৃষ্টির ভয় নাই। এখন যত পারো ততো ঘুরে বেরাও খোলা আকাশের নিচে। আর সেই সুযোগে গৌরনদীর তরুন সমাজ ভেসে যাচ্ছে মাদক নামের বানের পানিতে!!

ভাই, আরো লিখতে মনে চাইতেছে!! ভাই’র কাছে ভাইয়ের লেখার কি শেষ আছে!! ভাই আপনি হয়তো জানেন না, গৌরনদীর মানুষ আপনাকে কতোটা ভালোবাসে!! ভাই, আমি দেখেছি!! হ্যা ২০০১ এর পর আপনার জন্য অনেক মানুষ কেঁদেছে আর বলেছে ১৯৯৬-২০০১ সময়ে আপনি গৌরনদী বাসীর জন্য যা করেছেন, যা আপনার আগে আর কেউ করতে পারে নাই। আপনার হয়তো এখন মনে প্রশ্ন জাগতে পারে তাহলে ২০০১ এর নির্বাচনে আমি কেনো পরাজিত হইলাম!! ভাই, আপনি যদি ছদ্মবেশে বের হন, তাহলে দেখতে পারবেন তারা আপনার খারাপ কিছু বলে না। হ্যা তারা এটা বলে, হাসানাতরে খাইলো কিছু চাটারা। যেই চাটারা আপনার নাম ভাঙ্গিয়ে এমন কোনো অপকর্ম নাই যা তারা করে নাই। আর সেই চাটারাই সব সময় দরজা বন্ধ করে রাখতো আর বলতো ভাই এখন ঘুমিয়ে আছে, তারে বিরক্ত করা যাবে না। অথচ আপনি কিনা অধীর আগ্রহ নিয়ে বসে আছেন সেই অবহেলিত নিপীড়িতদের কথা শোনার জন্য!!

ভাই সেই চাটারা কিন্তু এখন আবার মাথাচারা দিয়ে উঠছে!! হয়তো আপনাকে সেটা সেই চাটারা বুঝতে দিতেছে না। ভাই, আপনি জানেন কি? জননেত্রী শেখ হাসিনা দেশকে ডিজিটাল করার সুবাদে আজকে আমরা সবাই সবার কাছাকাছি হয়ে গেছি। পৃথিবীর যে যেখানেই থাকুক না কেনো আমরা আজ সবাই সবার সুখ দুঃখ গুলোকে ভাগাভাগি করতে পারি!! ভাই, গৌরনদীর অনেক বিএনপি সমর্থকরাও আজ বলাবলি করতেছে, গৌরনদী’র বর্তমান রাজনৈতিক, সামাজিক এবং পরিবেশ গত অবস্থা নিয়ে তারাও বিব্রত!! কিভাবে তারা বিব্রত?? ভাই আমরা যারা প্রবাসে থাকি, অথবা অনলাইনে অন্য এলাকার কারো সাথে আমাদের প্রিয় গৌরনদী নিয়ে কথা বলি তখন আমরা সবাই ভুলে যাই কে বিএনপি কে আওয়ামীলীগ, আমরা তখন মনে করি আমরা সবাই গৌরনদী’র!! আর যখন আমরা শুনি, আজকে মাদকের কারনে একটা ছেলে খুন হইছে, তখন আমরা সেই চট্রগ্রামের মানুষের কাছে হাসির পাত্র হয়ে যাই। চট্রগ্রামের সেই ব্যাক্তিটি তখন ভাবে না যে আমি কি আওয়ামীলীগ, নাকি বিএনপি!! তখন সে আঙুল উচিয়ে বলে, দেখ দেখ এটা আলহাজ্ব আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহর গৌরনদীর মানুষ!! তাদের এলাকায় এতো অশান্তি, অথচ তারা আবার আমাদের চট্রগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠা করে বড় বড় কথা বলে!! ভাই, তখন কার মাথা ঠিক থাকে বলেন??

ভাই, অনেক লিখে ফেলেছি। আশাকরি ক্ষমা সুলভ চোখে দেখবেন। ভাই, এই আগস্টে ভালো থাকতে বল্লেও জানি ভালো আপনি থাকতে পারবেন না। তবুও ছোটো ভাই হিসেবে আপনার মঙ্গলময়, সু-স্বাস্থ্য, সুন্দর জীবন এবং দীর্ঘায়ু কামনা করছি। আল্লাহ্‌ হাফেয।

– ইতি আপনার ছোটো ভাই নোবেল উদ্দিন

অপ্রয়োজনীয় যৌনতায় মিডিয়ার অবক্ষয়

ইদানিং নানা পদের খবর, গুঞ্জন, সুখবর আর কুখবরে আছন্ন হয়ে আছে পুরো বাংলাদেশের মিডিয়া। কারো আছে ট্যক অব দ্যা টাউন হবার তাড়া আবার কারো আছে শর্টকার্টে বড় কোন তারকা হয়ে যাওয়ার তাড়া। আর কেউ কেউ এই ফাকে কামিয়ে নিতে চায় কাড়ি কাড়ি টাকা। যারা সিনেমা বানান, সিনেমা বানানোর কারিগরদের নিয়ে একটা কথা প্রচলিত ছিল, মেলবোর্নে অনেক বন্ধুর কাছ থেকে শুনতাম – “যদি তুমি ভাল ফিল্ম-মেকার না হতে পার, তাহলে পর্ন ভিডিও বানাও” কারন সবচেয়ে সহজ “SELL” হলো সেক্স। আর এই মুহুর্তে এটিই হচ্ছে মিডিয়ার আনাচে কানাচে। নতুন নতুন কিছু সিনেমা-নাটকের ট্রেইলর দেখে এর চাইতে বেশী কিছু মনে হচ্ছে না। বাংলা সিনেমাকে এতদিন মানুষ প্রত্যাখ্যান করে আসছে ঠিক এই কারনেই। পারিবারিক বিনোদনের খাতা থেকে বাংলা সিনেমা বাদ পড়ে গেছে কত আগেই। সেখানে জায়গা করে নিয়েছিল হিন্দি সিনেমা। টিভি মিডিয়ারও নড়বড়ে অবস্থা কারন ভারতীইয় চ্যানেলগুলোর কারনে। তবুও মন্দের ভাল, ভারতীয় চ্যানেলগুলো বন্ধ করা নিয়ে অনেক আন্দোলন হচ্ছে আর হয়তো রেজাল্টও পাওয়া যাবে এর মধ্যে। কিন্ত আরেকটা ব্যাপার আমাদের ভুলে গেলে চলবেনা দেশে এত এর টিভি চ্যানেল থাকা সত্তেও কেন মানুষ ভারতীয় চ্যানেলের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছিল। এখানে হয়তো প্রডাকশনের কোয়ালিটিটাই মূখ্য ছিল। অন্তত দেশী গুলোর কাছে থেকে তাদের প্রোডাকশনগুলো একটু নজর কাড়া ছিল তাই।

কিন্তু ইদানীং এই টিভি মিডিয়া – বা ছোট পর্দার মিডিয়া নিয়েও দেখা যাচ্ছে নানা রকমের অসামাঞ্জস্যতা। দেশী টিভি ড্রামা-সিরিয়াল গুলো আস্তে আস্তে সেসব বাংলা সিনেমার রুপ ধারন করছে একটু একটু করে। আর নাটকগুলোরে মূল সেলিং পয়েন্ট হয়ে উঠছে যৌনতা। কয়েকটা নাটকের হালকা-পাতলা ট্রেইলর আর কাটপিস দেখে অন্তত তাই মনে হচ্ছে। আসলে, আজকাল যে সে নাটক বানানো শুরু করে দিয়েছে। যার মোবাইলে ক্যামেরা আছে সেই এখন ।”ফিল্ম-মেকার” – টাইপের অবস্থা। এটা দোষের কিছু না আবার খুব একটা বড় ব্যাপারও না। যাচ্ছে তা বানালেই কিন্তু সবাই ফিল্ম-মেকার হয়ে যাচ্ছে। আর আজকাল সেলিব্রিটি হওয়া কোন ব্যাপারও না। পত্রিকায় আর্টিকেল করলেই হয়ে যায় সেলিব্রিটি। আর ইদানীং ট্যক অব দ্যা টাউন হবার জন্য উদ্ভট বা বিতর্কিত কাজ করার যে কালচার শুরু হয়েছে তা রীতিমত হাস্যকর। নাটকগুলো নাকি আজকাল সপরিবারে বসে দেখার অবস্থা নেই। কেন নেই আমার জানা নেই – তবে অনেকেই বলছে। আর কথার সত্যতা জানতে চাইলে YouTube এ খোজ লাগালেই স্যাম্পেল পেয়ে যাবেন। দর্শককে দেশী টিভি মুখী করার জন্য এই ধরনের চেষ্টা একটু হাস্যকর বটে। তবে সবকিছুই এই কেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছে। আপনার কোন পন্যের বিজ্ঞাপন তেমন একটা চলছে না? একটা মডেল নিয়ে আসুন, তাকে কিপ্টের মত খুব অল্প-কাপড় পড়তে দিন আর পন্যটি ধরিয়ে একটি ছবি তুলে টাঙ্গিয়ে দিন কোন বড় বিলবোর্ডে – সাবাশ! আপনার পন্য কিন্তু হিট হয়ে গেল! বিজ্ঞাপনের নান্দনিক কোন ব্যাপার থাকুক না থাকুক Erotic অবস্থায় মডেল তো আছে! আর কি লাগে! ক্রিয়েটিভ ব্রিলিয়ান্স যে আসলে এখানেই মরে যাচ্ছে তা হয়তো কেউ বুঝতে পারছে না। কারও বোঝার দরকারও নেই। টিভি-চ্যানেলগুলো কাড়ি কাড়ি টাকা গুনছে, মডেল হ্যাপি, প্রডিউসার হ্যাপী, দর্শকরাও হ্যাপী! আর কি লাগে!

দেশের কতিপইয় সদ্য জেগে উঠা নাটক-মেকার, মডেল, অভিনেতা-অভিনেত্রী – সবারই গানে একই ধরনের সুর। কেউ ট্যালেন্ট দেখানোর জন্য নেই এখানে। আছে অন্যকিছু দেখানোর জন্য। বাংলা সিনেমার সেই কলিযুগের মত। সুস্ত্র ধারার সিনেমা নিয়ে যেরকম আন্দোলন হয় এখন, কদিন পরে সুস্থ ধারার টিভি নিয়ে আন্দোলন শুরু হবে মনে হয়। এগুলো কোন কনজারভেটিভ চিন্তা-ভাবনা না, তবে সুস্ত্র মস্তিস্কের চিন্তা। হ্যা, কাহিনীর প্রয়োজনে হয়তো বিশেষ কোন অর্থে চিত্রনাট্যে যৌনতা এক-আধটু থাকতে পারে তবে যৌনতা নিয়ে চিত্র-নাট্য বানানোটা থার্ডক্লাস ট্রিক ছাড়া আর কিছুই না। অতি অল্পসময়ে কিছু করে ফেলার মরিয়া প্রয়াস। তবে যে মিডিয়া সবার বিনোদনের জন্য – যাকে আমরা জেনারেল মিডিয়া বলে থাকি – সেই মিডিয়াতে অর্থাৎ টিভি-বা ছোট পর্দার মিডিয়াতে এগুলো শুরু হয়ে গেলে আস্তে আস্তে দর্শকপ্রিয়তা হারাবে। কারন পারিবারিক বিনোদনের মাধ্যমগুলোকে এভাবে নষ্ট করলে অতি শীঘ্রই আমাদের ছোট মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রির যা অবশিষ্ট আছে তাও যাবে। মানুষ টিভি দেখা বন্ধ করে দিবে । বাংলা সিনেমার মত বাংলা নাটক দেখতে গেলে অন্যরা লজ্জা দেয়া শুরু করবে। টিভি গুলো সাধারন দর্শক হারাবে আর হারাবে কোটি কোটি টাকার বিজ্ঞাপন ক্লায়েন্ট। তখন তাদের উপার্জনের একমাত্র পথ হয়ে দাঁড়াবে আজে বাজে পর্ণ ড্রামা চালানো – যখন সবাই ঘুমিয়ে থাকবে আর এক শ্রেনীর মানুষ Adult Entertainment হিসেবে টিভি দেখবে আর কিছু কিছু বিজ্ঞাপন চলতে পারে যেমন ধরেন নানা ধরনের মলমের বিজ্ঞাপন, যৌন রোগের অসুখের বিজ্ঞাপন, হার্বাল …… থাক আর নাই বললাম। আপনি-আমি যদি টিভি দেখা বন্ধ করে দেই বা বাসায় যদি অভিভাবকরা বাংলা টিভি দেখার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে, তাহলে কে কি করতে পারবে! শেষ মেষ দেখা যাবে আমরা নেপালি চ্যানেল, বার্মিজ চ্যানেল, চাইনিজ চ্যানেল দেখছি (যদি হিন্দি চ্যানেল বন্ধ করে দেয়া হয়)।

আমি দেশীয় সুস্থ ধারার চলচ্চিত্র নির্মাতাদের অনুরোধ করছি তারা যেন এগুলোর কড়া সমালোচনা, প্রতিবাদ এর এসমস্ত ডিরেক্টর, প্রডিউসার এবং শিল্পীদের ১০০% বয়কট করেন। কারন, তারা যদি না করেন, তাহলে আর কেউ করার নেই। আমার মত থার্ড গ্রেডের ফিল্ম মেকারের কথা ক’জনে শুনবে। তবে এভাবেই যদি চলত থাকে, তাদের উপর সরাসরি ইফেক্ট পড়বে যারা এই মিডিয়া লাইন দিয়ে পেট চালান – জীবনের সব ধরনের উপর্জনের জন্য মিডিয়ার উপর নির্ভরশীল। আমার মত থার্ড গ্রেডের ফিল্ম মেকারদের কথায় কিছু না হলেও এই ধরনের অবস্থানে তেমন কোন ইফেক্ট পড়বেনা কারন এটি আমার পেশা না – নেশা। হয়তো এই লেখাটির জন্য আমাকে অনেকেই গালি দিবেন, অনেকেই সমালোচনা করবেন, অনেকেই বলবেন “হাউ আনস্মার্ট” অথবা “কোন গ্রাম থেকে উঠে আসছে কে জানে” টাইপের কমেন্ট। যারা এগুলো বলতে চান বলতে পারেন তবে আমার তেমন কোন মাথা ব্যাথা নেই। আমি চট্টগ্রামের থার্ড গ্রেডের নাম-ছাড়া ফিল্ম-মেকার তাই না! তবে এধরনের প্রোডাকশন, নাটক বা সিনেমা যারা বানাবে, সেসব যেন চট্টগ্রামে চলতে না পারে সেটার জন্য যা করার তাই করব। প্রচার, প্রসার এবং ক্যাম্পেইন – যা দরকার। আমার শহর থেকে আমি শুরু করলাম…… আপনি চাইলে আপনার শহর থেকে শুরু করতে পারেন! আমি জানি, এগুলো নিয়ে আওয়াজ দিলে হাজারো মানুষের সাপোর্ট পাব, আপনারাও আওয়াজ দেন, নিজ নিজ জায়গা থেকে, তাহলেই হয়ে যাবে। একটি সুস্থ ধারার মিডিয়া গড়ে তুলতে হবে হিটলার টাইপের কাজ করতে হবে। এবার থেকে তাই আজে বাজে প্রোডাকশন দেখা গেলে নেগেটিভ প্রমোশন চলবে – অন্তত আমার আওয়ার মধ্যে যত নেটওয়ার্ক আছে সেসবে। আশা করি আমি কিছু কিছু মানুষের সাপোর্ট পাব – আর না পেলেও কোন সমস্যা নেই।

ভাল থাকবেন আশা করি।

কেমন হবে গৌরনদী জেলার প্রস্তাবিত মানচিত্র

প্রস্তাবিত গৌরনদী জেলার অধীনে থাকবে গৌরনদী সদর উপজেলা, আগইলঝাড়া উপজেলা, মুলাদি উপজেলা, বাবুগঞ্জ উপজেলা, উজিরপুর উপজেলা, বানরিপারা উপজেলা ও কালকিনি উপজেলার একাংশ (কয়ারিয়া, রমজানপুর ও সাহেবরামপুর ইউনিয়ন)।

প্রস্তাবিত গৌরনদী জেলার মোট আয়তন হবে ১১৭৭.৮২ বর্গ কিঃ মিঃ (বরিশাল জেলা থেকে আসবে ১১১৪.৫৭ বর্গ কিঃ মিঃ ও মাদারীপুরের কালকিনি থেকে যোগ হবে ৬৩.২৫ বর্গ কিঃ মিঃ) (গৌরনদী উপজেলা- ১৪৪.১৮ বর্গ কিঃ মিঃ, আগইলঝাড়া উপজেলা- ১৬১.৮২ বর্গ কিঃ মিঃ, বাবুগঞ্জ- ১৬৪.৮৮ বর্গ কিঃ মিঃ, মুলাদি- ২৬১.০২ বর্গ কিঃ মিঃ, উজিরপুর- ২৪৮.৩৫ বর্গ কিঃ মিঃ, বানরিপারা-১৩৪.৩২ বর্গ কিঃ মিঃ, কালকিনি- ৬৩.২৫ বর্গ কিঃ মিঃ (কয়ারিয়া ইউনিয়ন- ২০.৮১ বর্গ কিঃ মিঃ + রমজানপুর ইউনিয়ন- ১৯.৫০ বর্গ কিঃ মিঃ + সাহেবরামপুর ইউনিয়ন- ২২.৯৪ বর্গ কিঃ মিঃ)।

প্রস্তাবিত গৌরনদী জেলার আয়তন হবে ১১৭৭.৮২ বর্গ কিঃ মিঃ। এই আয়তন নিয়েও জেলা গঠন করা সম্ভব কারণ এই আয়তনের চেয়েও কম আয়তন নিয়ে বাংলাদেশে অন্তত ১২ টি জেলা আছে (ঝালকাঠি- ৭৪৯ বর্গ কিঃ মিঃ, মেহেরপুর- ৫৪৯ বর্গ কিঃ মিঃ, নারায়ণগঞ্জ- ৭৫৯ বর্গ কিঃ মিঃ, ফেনী- ৯২৮ বর্গ কিঃ মিঃ, নড়াইল-৯৯০ বর্গ কিঃ মিঃ, মাদারীপুর- ১১৪৫ বর্গ কিঃ মিঃ, মুন্সীগঞ্জ- ৯৫৫ বর্গ কিঃ মিঃ, নরসিংদী- ১১৪১ বর্গ কিঃ মিঃ, রাজবাড়ী- ১১১৯ বর্গ কিঃ মিঃ, চুয়াডাঙ্গা- ১১৭৭ বর্গ কিঃ মিঃ, মাগুরা- ১০৪৯ বর্গ কিঃ মিঃ, জয়পুরহাট- ৯৬৫ বর্গ কিঃ মিঃ)।

কালকিনির ৩ টা ইউনিয়ন যোগ হবে গৌরনদী সদর উপজেলার সাথে। কালকিনির ৩ টা ইউনিয়ন গৌরনদীর সাথে যুক্ত করার পিছনে কিছু যৌক্তিক ব্যাখ্যা আছে। এই ৩ টা ইউনিয়ন ভৌগলিকগতভাবে মুলাদি ও গৌরনদীর মাঝামাঝি অবস্থিত এবং এই এলাকার লোকজন কালকিনি বা মাদারীপুরের চেয়ে গৌরনদীর উপরে বেশি নির্ভরশীল। তাহলে গৌরনদীর ইউনিয়ন সংখ্যা বেঁড়ে দাঁড়াবে মোট ১০ টা ও আয়তন হবে ২০৭.৪৩ বর্গ কিঃ মিঃ।

প্রস্তাবিত গৌরনদী জেলার পৌরসভা হবে মোট ৩ টা (গৌরনদী,উজিরপুর ও বানরীপাড়া), ইউনিয়ন সংখ্যা হবে মোট ৪৮ টা ( গৌরনদী- ৭ টা + আগইলঝাড়া- ৫ টা + বাবুগঞ্জ- ৬ টা + মুলাদি- ৭ টা + উজিরপুর- ৯ টা + বানরীপাড়া- ১১ + কালকিনি- ৩ টা ) ও সরকারী কলেজ সংখ্যা হবে ৩টা (সরকারী গৌরনদী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, সরকারী চাখার কলেজ ও বানরীপাড়া সরকারী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক কলেজ)।

গৌরনদী জেলা হলে বরিশাল বিভাগের জেলা সংখ্যা বেঁড়ে দাঁড়াবে ৭ টা (গৌরনদী, বরিশাল, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, বরগুনা, ঝালকাঠি ও ভোলা) ও বাংলাদেশের জেলা সংখ্যা বেঁড়ে দাঁড়াবে ৬৫ টা।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রস্তাবিত গৌরনদী জেলার আসন সংখ্যা হবে ৩টা (গৌরনদী-আগইলঝাড়া, বাবুগঞ্জ-মুলাদি ও উজিরপুর-বানরীপাড়া)।

মোহাম্মদ টিপু সুলতান

কেন গৌরনদীকে জেলা হিসেবে দেখতে চাই?

গৌরনদীকে জেলা হিসেবে দেখতে চাওয়ার দাবী আজ নতুন কিছু নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই এই দাবী করা হয়ে আসছে। অত্র এলাকার জনগণের দাবীর প্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ১৯৭৫ সালের ১ ই জানুয়ারি গৌরনদীতে এক সমাবেশে উক্ত আসনের তৎকালীন মন্ত্রী আব্দুর রব সেরনিয়াবাদ এর উপস্থিতিতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব গৌরনদীকে জেলা হিসেবে ঘোষণা করবেন।

অবশ্য ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার পরে বিষয়টা আর বেশিদূর এগোয়নি। তারপরে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পাল্টানোর সাথে সাথে পাল্টে যেতে থাকে অত্র অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য, ফিকে হতে থাকে গৌরনদীকে জেলা হিসেবে দেখার স্বপ্ন।

স্বপ্ন বলে কথা, আমরা এখনও স্বপ্ন দেখে চলেছি। আমাদের গৌরনদী অনেক আগে থেকেই মহকুমা ছিল। স্বাধীনতার আগে অত্র এলাকা জুড়ে শুধুমাত্র ২ টা জেলা ছিল ( বরিশাল-১৭৯৭ ও পটুয়াখালী- ১৯৬৯ )।

১৯৮৪ সালে যখন সব মহকুমাগুলোকে জেলা হিসেবে ঘোষণা করা হল তখনও গৌরনদীকে বঞ্চিত করা হয়েছে।

১৯৮৪ সালে এরশাদ সরকার বরিশাল জেলাকে ভেঙে ৫ টা জেলাতে ভাগ করলো ( বরিশাল, পিরোজপুর, বরগুনা, ঝালকাঠি ও ভোলা ) অথচ গৌরনদীকে মহকুমা থেকে ডিমোশন দিয়ে উপজেলা বানিয়ে রাখা হলো।

 

কেন আমরা গৌরনদীকে জেলা হিসেবে দেখতে চাই ?

  • দেশের অন্যান্য মহকুমাগুলো ইতোমধ্যে জেলা হয়ে গেছে। আমরা গৌরনদী মহকুমাকে জেলা হিসেবে দেখতে চাই।
  • ১৯৭৫ সালের ১ই জানুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান কথা দিয়েছিলেন যে গৌরনদীকে জেলা হিসেবে ঘোষণা করা হবে, তাই আমরা এখনও আশায় বুক বেধে আছি।
  • বরিশালের ৫ টি পৌরসভার ( গৌরনদী, বাকেরগঞ্জ, মেহেন্দিগঞ্জ, বানরীপাড়া ও উজিরপুর ) মধ্যে আমাদের গৌরনদী পৌরসভার অবস্থান জনসংখ্যায় ১ম ও আয়তনে ২য় ও “ক” শ্রেণীভুক্ত।
  • আমাদের গৌরনদীর টরকী বন্দর বরিশাল জেলার ভীতর সবচেয়ে বড় স্থল বন্দর। বাণিজ্যিক, ভৌগলিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে উক্ত অঞ্চলটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

 

গৌরনদীকে জেলা হিসেবে ঘোষণা করলে সুফল?

  • গৌরনদীতে সকল মন্ত্রণালয়ের অফিস খোলা হবে, নতুন অফিস আদালত তৈরি হবে ।
  • নবগঠিত জেলাকে কেন্দ্র করে নতুন নতুন শিল্প কারখানা তৈরি হবে, এলাকার মানুষের অনেক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে, ফলে অত্র এলাকার মানুষ অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হবে ।
  • নবগঠিত জেলার উন্নয়নের জন্য জেলা পরিষদ নতুন ও স্বতন্ত্র বাজেট পাশ করবে, ফলে অত্র এলাকার উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে ।
  • নবগঠিত জেলাকে কেন্দ্র করে নতুন নতুন মান সম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে ফলে, অত্র এলাকার মানুষজন শিক্ষা-দীক্ষা ও জ্ঞান- বিজ্ঞানে এগিয়ে যাবে।
  • অত্র এলাকার জায়গা জমির দাম বৃদ্ধি পাবে।
  • দেশকে যতগুলো ক্ষুদ্র ইউনিটে ভাগ করে দেয়া যাবে, ঐ ক্ষুদ্র ইউনিটকে কেন্দ্র করে তার উন্নয়ন আরও বেশি ত্বরান্বিত হবে, এই পদ্ধতি এখন সর্বজন স্বীকৃত।

উপরের আলোচনাগুলোর মাধ্যমে অত্র অঞ্চলের সকলের চাওয়া পাওয়ার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে কিনা তা বিবেচনা করার দায়িত্ব আপনাদের। উল্লেখিত কথাগুলো খুবই কম লোকজনের সাথে কথা বলে উঠে আসা ইনফরমেশনের ভিত্তিতে লেখা।

শুনেছি গৌরনদীকে জেলা বাস্তবায়নের জন্য নাকি “গৌরনদী জেলা বাস্তবায়ন পরিষদ” নামের একটা প্রতিষ্ঠান আছে। তারা কি আদৌ একটিভ কিনা জানিনা, তারা এই স্পর্শকাতর ইস্যুটা নিয়ে কি কাজ করছে তা আমার বোধগম্য নয়।

বৃহত্তর গৌরনদীবাসিদের প্রাণের দাবী বাস্তবায়নের লক্ষে আমরা ভবিষ্যতে কি কর্মপরিকল্পনা নিয়ে কাজ করলে ভালো হয় বা আমরা কীভাবে দাবীটিকে সামনে নিয়ে এগুতে পারি সে বিষয়ে সবাই উপদেশ দিলে কৃতজ্ঞ হব।

যদি উপরোক্ত আলোচনার সাথে কেউ একমত হয়ে থাকেন তাহলে শেয়ার করে আমাদের দাবীকে সকলের মাঝে ছড়িয়ে দিয়ে আমাদের দাবীকে আরও জোরালো করুণ।

 

মোহাম্মাদ টিপু সুলতান

ফেসবুক গ্রুপ : গৌরনদী জেলা বাস্তবায়ন আন্দোলন

দাসত্ব!

না, ২০০ বা ১০০ বছর আগের ঘটনা নয়।

২০১৪ সালের হিসাবে সারা বিশ্বের সাড়ে ৩ কোটি মানুষ দাসত্বের স্বীকার।

ভারতের ১.১% মানুষ দাসত্বের বন্ধনে আটকে আছে।

বাংলাদেশেও এর সংখ্যা কম নয়, আমাদের দেশেও লাখ লাখ লোক দাস হয়ে আছে।

দাসত্বের প্রথা কেবল বর্বর অসভ্য দেশেই নয়, চালু আছে আমাদের দেশেও। কীভাবে?

নিজের বাসার দিকেই তাকান। কোনো শিশুকে দুই পেট কিংবা এক বেলা খাবার বিনিময়ে কি করে রেখেছেন ভৃত্য? পানি আনানো, অমুক তমুক সব কাজের ভার দিয়েছেন চাপিয়ে? কিংবা নিজের শিশুর ব্যাগ টানাবার জন্য আরেকজন শিশুকে লাগিয়ে দিয়েছেন কাজে?

ভাবছেন, এক মুঠো ভাত দিয়ে কৃতার্থ করে দিয়েছেন, কতো মহত আপনি, না খেতে পাওয়া কাউকে তো বাঁচাচ্ছেন, তাই না? আহা, কত দয়ার শরীর আপনার, তাই না?

বাংলাদেশের ৪ লাখের বেশি শিশু (৫-১৭ বছরের) আজ বাড়িতে কাজের ছেলে/মেয়ে হিসাবে কাজ করে। তার মানে বাংলাদেশে দাসত্ব প্রথা চালু করে রেখেছে অন্তত ৪ লাখ পরিবার। আপনার, বা আপনার আত্মীয়, বন্ধু, স্বজন, এরা সবাই, বা কেউ না কেউ এই আধুনিক দাস মালিকদের তালিকায় পড়ে, তাই না?

একটি শিশুকে দাস করে রাখা মহত্ব নয় — তার মৌলিক অধিকার, শিক্ষা, বেড়ে ওঠা — এসবের বদলে আপনি যদি তাকে ফাই ফরমাশ খাটাতে লাগান, তবে আপনি মহৎ নন, বরং নিন্দিত ঘৃণিত দাস মালিকদের সাথে আপনার আদৌ পার্থক্য নাই কোনো।

এ নিয়ে আগে লেখার সময়ে অনেকে তেড়ে এসেছেন নিজেদের মহত্ব নিয়ে, কত বাচ্চাকে ভাত দিয়ে খাটিয়ে খাটিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছেন, সেই ফিরিস্তি নিয়ে। কিন্তু তাঁদের মাথায় এটা ঢোকেনা, এই কাজটার সাথে দাসত্বের কোনোই পার্থক্য নাই। বাড়ির কাজের শিশুরা, ভাতের বিনিময়ে সকাল ৭টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত যে খাটুনি খাটানো হয় তাদের, সেটা কেবল “কাজের ছোকরা” বা “কাজের মেয়ে” এই ছদ্ম নামে দাসত্বের আধুনিক প্রকাশ মাত্র।

দাসত্বের অবসান হোক, শিশু শ্রমের অবসান হোক, বাচ্চাদের ঘরের কাজে লাগানোর অসভ্য বর্বর প্রথাটি বন্ধ হোক।

সেটা শুরু করেন আপনার ঘর থেকেই।

আজকেই।

লিখেছেন : রাগিব হাসান

ট্রুথ এন্ড টিপস এবাউট আমেরিকা

ঝংকার মাহবুব :

১. বাংলাদেশে প্রেমিকা থাকলেও প্রেমের পরিবেশ পাবেন না। আর আম্রিকায়, প্রেমের পরিবেশ পাইলেও প্রেমিকা পাবেন না।

২. কোনো কাস্টমার সার্ভিসে ফোন দিলে, please listen carefully, we have recently changed our menu, হুদাই অনেকক্ষণ হাবিজাবি শুনাতে। এমনকি এক মিনিট পরে ফোন দিলেও বলবে we have recently changed our menu । খালি খালি ফাইজলামি। তাই আমি কিছু শুনার আগেই, শুন্য প্রেস করে দেই। মাক্সিমাম সময়ে কাস্টমার রিপ্রেজেন্টেটিভের কাছে সরাসরি কল চলে যায়। ব্যস অনেকক্ষণ বকর বকর শুনা লাগে না। কাস্টমার সার্ভিসে কল দেয়ার ভালো সময় সকাল বেলা। দ্রুত পাওয়া যায়।

—-

খাবার দাবার

—-

৩. ভুলেও ওদের বলবেন না কোক ভরে দিতে, পুরা গ্লাস বরফের মধ্যে এক চা চামচ কোক দিবে। তাই দেশী পোলাপান, কোক বা পানি উইথ নো আইস চায়। আর আম্রিকান পোলাপান পারলে বরফ চাবায় চাবায় খায়।

৪. কেউ আপনারে কোন রেস্টুরেন্ট এ খাইতে যাইতে বল্লে, ভুলেও ভাইবেন না যে সে খাওয়াবে। হামেশাই, হিজ হিজ হুজ হুজ। যার যার খাবারের বিল সে সে দিবে। এমন কি, প্রেমিক প্রেমিকারা নিজেদের বিল আলাদা আলাদা দেয়। এমনকি বাসায় দাওয়াত দিলে সঙ্গে কিছু নিয়ে আসতে বলবে বা টাকা চাহিয়া বসলে, অবাক হবার কিছু নেই।

৫. একই মানুষ দেখলাম, আম্রিকাতে হোটেলের বেয়ারা এক গ্লাস পানি এনে দিলে, থাঙ্কু থাঙ্কু বলে গলা ফাটায় ফেলে, অথচ দেশে কোনো রিক্সাওয়ালা বা চা ওয়ালারে ভুলেও থাঙ্কু বলে না।

৬. এইখানের মানুষগুলা দুধ সবসময় ঠান্ডা খায়। জাস্ট ফ্রিজ থেকে বের করে খায়। অন্যদিকে বাঙ্গালীরা গরম করে খায়। এইদেশের মানুষ বুঝতে পারে না কোনো আমরা গরম করে খাই। এই দেশেও টেটনা পোলাপান আছে। একদিন সকালে, আমার এক কলিগ বল্লো, “মানুষ ই একমাত্র প্রাণী যারা অন্য প্রাণীর (গরুর, ছাগল বা মহিষের) দুধ খায়” তারপর জিগ্যেস করলো, The guy who discovered milk….What was he doing with that cow?

—-

জিম হেফাজত

—-

৭. জিম বা সুইমিং পুলের লকার বা শাওয়ার রুমে, দৃষ্টির হেফাজত করুন। উড়নচন্ডি হয়ে,লাজ লজ্জার মাথা খেয়ে কেউ কেউ ঘুরে বেড়ায়।

৮. শাওয়ারের গরম পানি আর ঠান্ডা পানির knob বা পানি ছাড়ার টেপ যে কত হাজার রকমের আছে। আল্লাহ মালুম। কোনটা যে কোন দিকে ঘুরাইলে কখন গরম পানি আর কখন ঠান্ডা পানি বের হবে সেটা বের করতে খবর হয়ে যায়। তাই বাথটাবের বাইরে দাড়াইয়া, এক মিনিট অপেক্ষা কইরা নিশ্চিত হয়ে নিবেন যে, এই পানির তাপমাত্রা ঠিক আছে। নচেৎ শাওয়ারের মধ্যে দাড়াইয়া knob ঘুরাইতে থাকলে, বরফের মত ঠান্ডা পানি দিয়ে আপনার বারোটা বেজে যাবে।

কেনাকাটা

৯. আমাদের আরেক সমস্যা হলো, অনলাইনে বিমানের টিকেট বা দামী কিছু কিনলে বিশ্বাস হয় না আবার ফোন করে ভ্যারিফাই করি, সত্যি সত্যি টিকেট কনফার্ম তো !!!

১০. ওয়ালমার্টে গেলে, enter আর exit এর জন্য আলাদা আলাদা দরজা। তাও বাঙালি exit এর দরজা দিয়েই ঢুকবে। আর ওয়ালমার্টে তিনমাসের মধ্যে যে কোনো কিছু রিটার্ন দেয়া যায়। মোটামুটি সব স্টোরেই রিটার্ন পলিসি তিন মাসের মত। তাই অনেক বাঙালি আর ভারতীয় ওভেন, টিভি এমনকি ম্যাট্রেস কিনে আড়াই মাস ব্যবহার করে ফেরৎ দেয়। খুবই খারাপ ব্যাপার স্যাপার। ইচ্ছে করে ব্যবহার করে, রিটার্ন দিয়ে ফুল টাকা ফেরৎ নিয়ে আসে। একবার নাকি এক ভারতীয় ম্যানেজার, একজনকে কফি মেকার কিনার সময় বলে দিছে, তিন মাস পর ফেরৎ দিতে আসলে, ধুয়ে আইনেন, প্লিজ।

১১. কমলা একটা বিরক্তিকর ফল। খোসা সরানোর পরও সাদা সাদা আশ সরাতে হয়। ভিতরের বিচি এর দিকে খেয়াল রাখতে হয়। প্রথম প্রথম আসার পর একদিন ভাবলাম কমলা কিনি। দোকানে দেখলাম ডজন খানেক ছোট ছোট কমলার দাম ৬ ডলারের মত। পাশে দেখি বড় বড় সাইজের কমলা কিন্তু দাম ৪ ডলারের মত। আমি ভাবলাম কম দামে যদি বড় জিনিস পাওয়া যায়, তাইলে ছোট গুলা কিনমু কেন। ফিলিং লাইক এ বস। খুশি খুশি বাসায় এসে আয়েশ করে কমলা খেতে গিয়ে দেখি তিতা তো তিতা, মেগা লেভেলের তিতা। এই তিতা কমলা আরেকজনরে দেখাতেই সে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি টাইপ অবস্থা। সে বলে, মিঞা লেভেল পইড়া কিনবা না। লেভেলে দেখি লেখা আছে, গ্রেপ ফ্রুট। দেখতে অলমোস্ট কমলার রং এবং হালকা বড় সাইজ। তারপর আর কোন দিন কমলা কিনছি কিনা মনে নাই।

গ্রিন আপেলের ক্ষেত্রেও মোটামুটি একই কাহিনী। আপনি খাইতে পারবেন না। চরম টক। যদিও আম্রিকানরা দেদারসে খাইয়া ফেলবে, আরামসে।

১২. অনেক সময় রেস্টুরেন্ট এর সামনে লেখা থাকে, no public toilet আর বাথরুম বেশি চেপে গেলে হন্যে হয়ে, কোনো শপিং মলে গিয়া বাথরুম খুঁজে না পাইলে, কাউরে জিগ্যেস করেন। ভুলেও ফিটিং রুমে গিয়ে অনেকক্ষণ পর চিল্লায় উঠবেন না, “Hey, there is no toilet paper here”

কণ্ঠশিল্পী কবির সুমন এবং কিছু কথা

তসলিমা নাসরিন :

আমার দীর্ঘদিনের বন্ধু ভাস্কর সেন নিয়ে এসেছিলেন কবীর সুমনকে আমার কাছে। তখন দু’হাজার সাল। সে রাতে সবাইকে নিয়ে আহেলিতে গিয়েছিলাম বাঙালি খাবার খেতে। অনেকক্ষণ গল্প হয়েছিল সুমনের সঙ্গে। তাঁর ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করাটা, নাম পাল্টানোটা, আমি সরাসরিই বলেছি আমার পছন্দ হয়নি। সুমন বলেছিলেন, তিনি হিন্দুদের ভিড়ে মুসলমান হতে আর মুসলমানের ভিড়ে হিন্দু হতে পছন্দ করেন। এভাবেই তিনি তাঁর সেকুলারিজমের লড়াই করেন। বলেছিলাম, এখানে হিন্দু ওখানে মুসলমান হওয়ার দরকার কী, সবখানে মানববাদী হলেই তো হয়! আমি যেমন! হিন্দু আর মুসলমানের বিরুদ্ধে যা কিছু বৈষম্য, মানববাদী হিসেবে আমি তার প্রতিবাদ করি! শেষ পর্যন্ত দেখলাম, সুমনের পদ্ধতিটাই সুমনের পছন্দ। যাবার সময় সুমন বলেছিলেন, সেকুলারিজমের কসম, এই কলকাতায় আপনার নিরাপত্তার জন্য আমি যা কিছু করার করবো।

কী যে মিথ্যে ছিল সেই প্রমিজ! এর কিছুকাল পরেই সুমন নিজেই ফতোয়া দিলেন আমার বিরুদ্ধে। টিভিতে আমার দ্বিখণ্ডিত বইটি মেলে ধরে মুহম্মদ সম্পর্কে কোথায় কী লিখেছি তা শুধু পড়ে শুনিয়ে শান্ত হননি, বইয়ের কোন পৃষ্ঠায় কী আছে, তাও বলে দিয়েছেন, এবং এও বলেছেন আমার বিরুদ্ধে মৌলবাদীদের জারি করা ফতোয়াকে তিনি সমর্থন করেন। এমনিতে নব্য-মুসলিমদের সম্পর্কে বলাই হয় যে তারা মৌলবাদীদের চেয়েও দু’কাঠি বেশি মৌলবাদী। সত্যি কথা বলতে কী, মৌলবাদিদের অত ভয়ংকর ফতোয়াকেও আমি অত বেশি ভয়ংকর মনে করিনি, যত করেছি সুমনের ফতোয়াকে। বারবারই সুমন বলেছেন, তাঁর পয়গম্বর সম্পর্কে আমি জঘন্য কথা লিখেছি, আমার শাস্তি প্রাপ্য। যে সুমনকে এতকাল নাস্তিক বলেই আমরা জানতাম, গানও লিখেছেন ভগবানকে কটাক্ষ করে, তিনি কিনা সমর্থন করছেন কলকাতার রাস্তায় মঞ্চ তৈরি করে ফতোয়াবাজ মৌলবাদীরা আমার যে মাথার মূল্য ঘোষণা করেছে, সেটি! সে রাতে ভয়ে আমার বুক কেঁপেছে। সে রাতেই আমি প্রথম জানালা দরজাগুলো ভালো করে লাগানো হয়েছে কিনা তা পরখ করে শুয়েছি। সে রাতে আমি সারারাত ঘুমোতে পারিনি। মৌলবাদীরা কোনোদিনই স্পষ্ট করে বলতে পারেনি ইসলাম সম্পর্কে কোথায় আমি ঠিক কী লিখেছি, প্রমাণ দেখাতে পারেনি আমার ইসলাম-নিন্দার। কিন্তু সুমন আমার বই হাতে নিয়ে ক্যামেরার সামনে বসেছেন। পড়েছেন সেই সব লেখা। দর্শককে বলেছেন, বিশ্বাস না হয় আপনারই পড়ুন, দেখুন কী লিখেছে। ক্যামেরা দ্বিখণ্ডিত বইয়ের সেইসব পৃষ্ঠায়। যে কেউ, যে কোনও জঙ্গি মুসলমান সে রাতে ভাবতে পারতো, মরি তো মরবো, তসলিমাকে মেরে মরবো। আমি থাকতাম মুসলিম অধ্যুষিত পার্ক সার্কাসের কাছেই রওডন স্ট্রিটে। এই ঘৃণ্য কাজটা কিন্তু কোনও মৌলবাদী করেনি, করেছে সাংস্কৃতিক জগতের নামি দামি প্রগতিশীল বলে খ্যাত এক শিল্পী। অবিশ্বাস্য লাগে সবকিছু। কেমন যেন শ্বাস কষ্ট হতে থাকে। যেন সুস্থ স্নিগ্ধ খোলা হাওয়া নেই আর কোথাও।

শুরু থেকেই সুমন আমার বই নিষেধাজ্ঞার পক্ষে। কলকাতা হাইকোর্ট আমার বইটির ওপর থেকে একসময় নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছিল। এটি মুক্তচিন্তার মানুষদের কাছে সুখবর হলেও সুমনের কাছে সুখবর ছিল না। কলকাতা বইমেলাতেও মুসলিম মৌলবাদীদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের পক্ষ নিয়ে আমার পাঠকদের গালিগালাজ করেছেন সুমন। কেউ কেউ বলে, ওদের কাছ থেকে নানান সুযোগ সুবিধে পান তিনি। আমি জানিনা কী সেই সুযোগ সুবিধে যার জন্য তিনি বাক স্বাধীনতার বিপক্ষে যান, মুসলিম সন্ত্রাসীদের পক্ষে তর্ক করেন। আমার বিশ্বাস হয় না সুমন সত্যিই মুহম্মরদকে পয়গম্বর মানেন, বা ইসলামে সত্যিই বিশ্বাস করেন। যখন যেটা তার প্রয়োজন, সেটায় বিশ্বাস করেন। বামপন্থীদের বিরুদ্ধে গান বেঁধেছেন, যখন ডানপন্থীদের আশ্রয় তাঁর দরকার। মুসলিম মৌলবাদীদের সব সরকারই পেন্নাম করে। সুতরাং ওই মৌলবাদী দলে ভিড়লে তাঁর লাভ বৈ ক্ষতি হবে না, সম্ভবত জানতেন।

সুমনের গানের কথাগুলো খুব ভালো। সেসব কথা বাংলার লক্ষ মানুষ বিশ্বাস করলেও সুমন বিশ্বাস করেন না। তিনি বামপন্থায় বিশ্বাস করেও ডানপন্থী রাজনীতিতে ঢুকেছেন নিতান্তই ক্ষমতা আর টাকা পয়সার জন্য। গানে উদারতার কথা বললেও নিজে তিনি অত্যন্ত স্বার্থপর, ক্ষুদ্র মনের, হিংসুক।

সুমন বলেছেন তিনি পলিগ্যামাস লোক। বহুনারীর সঙ্গে সম্পর্ক তাঁর। সে থাক, কিন্তু তিনি যে বড্ড নারীবিরোধী লোক। তাঁর জার্মান বউ মারিয়াকে তিনি শুধু মানসিক ভাবে নয়, শারীরিক ভাবেও নির্যাতন করতেন। মারিয়া মামলা করেছিলেন সুমনের বিরুদ্ধে। পুলিশ সুমনকে গ্রেফতার করেছিলো ১৯৯৯ সালে। বধুনির্যাতন মামলায় সহজে কেউ জামিন পায় না, কিন্তু সুমন পেয়েছিলেন। ক্ষমতার লোকেরা তাঁকে জামিন পেতে সাহায্য করেছিলেন। মারিয়ার ফ্ল্যাট, জিনিসপত্র–এসব কিন্তু সুমন তাঁকে ফেরত দেননি। মারিয়া শেষ পর্যন্ত সুমনকে ডিভোর্স দিয়ে খালি হাতে জার্মানিতে ফেরত যেতে বাধ্য হয়েছিলেন।

কলকাতায় তাঁর জনপ্রিয়তা খানিকটা কমতে শুরু করলে তিনি দু’হাজার সাল থেকে ঘন ঘন বাংলাদেশে যেতে থাকেন। বাংলাদেশে জনপ্রিয় হতে গেলে শুধু রুদ্রর গান গাইলেই চলে না, ভীষণ রকম তসলিমা বিরোধী হতে হয়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আর সমরেশ মজুমদারের মতো এই তথ্যটি সুমনও জেনেছিলেন। আর, হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণ করলে তো সোনায় সোহাগা।

এই সেদিন বর্ধমানে মুসলিম মৌলবাদীদের বোমা হামলার পরিকল্পনা ধরা পড়ার পর সুমন একে বিজেপির কীর্তি বলেছেন, মুসলিম মৌলবাদীদের আশ্রয়দাত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের সুদৃষ্টি পাওয়ার আশায়। ক্ষমতার বড় লোভ সুমনের। টাকা পয়সারও লোভ প্রচণ্ড। অথচ কী ভীষণ আদর্শবাদী লোক বলে ভাবতাম মানুষটাকে। এখনও অবশ্য প্রচুর লোককে বোকা বানিয়ে চলছেন। অভিনয় ভালো জানেন বলে এটি সম্ভব হচ্ছে।

(তসলিমা নাসরীনের ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে সংগৃহীত)

(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামতের জন্য কর্তৃপক্ষ দায়ী নহে)

পুরুষেরা কামোত্তেজনায় কাতরালেই বা অসুবিধে কী?

তসলিমা নাসরিন : মেয়েদের মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত কালো পর্দায় ঢেকেও শান্তি হচ্ছে না সৌদি আরবের। এখন থেকে মেয়েদের চোখও, বিশেষ করে যে চোখগুলো সুন্দর, ঢেকে রাখতে হবে। চোখ ঢাকলে মেয়েরা দেখবে কী করে! তাদের দেখার দরকার নেই। মেয়েদের দেখাটা জরুরি নয়। তারা অন্ধ হয়ে যাক। তারা খানা খন্দে পড়ুক, মরুক। অনাত্মীয় পুরুষেরা যেন মেয়েদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ না দেখে। মেয়েরা কোনও না কোনও পুরুষের সম্পত্তি। অন্যের সম্পত্তির দিকে তাকানোটা আর যেখানেই চলুক, সৌদি আরবে চলবে না।

মেয়েদের আকর্ষণীয় চোখের দিকে যদি চোখ পড়ে বাইরের পুরুষের, তবে কে হলফ করে বলতে পারে, সেই পুরুষ কামোত্তেজনায় কাতরাবে না, ধর্ষণের চেষ্টা করবে না! পুরুষেরা ধর্ষণের চেষ্টা করবে ধরে নিয়েই মেয়েদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে মেয়েদের। শরীর তো বটেই, মেয়েদের চোখও ঢেকে রাখার ব্যবস্থা হচ্ছে। তাদের কোনও কিছু দেখার অধিকার আর নেই। চোখ থাকতেও অন্ধত্বকে বরণ করে নিতে তারা বাধ্য হচ্ছে।

অথচ, অবাক কাণ্ড, ধর্ষণের চেষ্টা যারা করবে বলে আশংকা করা হচ্ছে, তাদের দমনের, তাদের শোধরানোর, তাদের পরামর্শ দেওয়ার কিন্তু কোনও ব্যবস্থা সৌদি আরবে নেই।

আমার প্রশ্ন, পুরুষেরা কামোত্তেজনায় কাতরালেই বা অসুবিধে কী! উত্তেজনা সামলানোর ক্ষমতা কি সৌদি পুরুষের নেই? যদি না থাকে, তবে ওদের শেখানো হোক কী করে তা সামলাতে হয়। শিখলে মেয়েরা অন্তত চোখ খুলে রাস্তাঘাটে চলাফেরা করতে পারবে। খানা খন্দে পড়তে হবে না, মরতে হবে না। নীতিপুলিশের জ্বালায় মেয়েরা বাধ্য হচ্ছে আস্ত এক একটা কালো কফিনের মধ্যে ঢুকে যেতে। চোখগুলোকেও এখন থেকে বোরখা পরাতে হবে নয়তো জেল খাটতে হবে। নীতিপুলিশকে পুষছে কিন্তু সৌদির রাজ পরিবার। এই ক’মাস আগেই নাকি নীতিপুলিশদের সংস্থা রাজপরিবার থেকে তিপ্পান্ন মিলিয়ন ডলার উপহার পেয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র কি কখনও সৌদি আরবের মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে কথা বলেছে? কেউ শুনিনি। সৌদি আরবের কাছে যুক্তরাষ্ট্র এখন অস্ত্র বিক্রি করছে। ষাট বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র। ছোটখাটো কোনও অংক নয় কিন্তু। তো এই সময় যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে কি পারতো না বলতে যে তোমরা মেয়েদের ওপর অত্যাচার বন্ধ করো, তারপর অস্ত্রের বেচা কেনা হবে? সৌদি আরবের মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র মুখ খোলে না, কিন্তু নানা দেশের মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে ভীষণই উদ্বিগ্ন, চেঁচিয়ে সর্বনাশ করছে, সাবধান করে দিচ্ছে পৃথিবীর অনেক দেশকেই। শুধু সেই দেশটিকেই সাবধান করছে না, যে দেশটি মেয়েদের মানবাধিকার সবচেয়ে বেশি লংঘন করছে। এর একটিই হয়তো কারণ, এমন বিলিয়ন ডলারের খদ্দেরকে যুক্তরাষ্ট্র অখুশি করতে চায় না। দিনের শেষে টাকার হিসেবটাই দেখছি আসল হিসবে।

সৌদি আরব মেয়েদের মানুষ বলে মনে করে না। ধর্ষিতা হওয়ার শাস্তি ধর্ষিতাকেই দেয়। আত্মীয়-পুরুষ ছাড়া অন্য কোনও পুরুষের সঙ্গে কোনও মেয়ের কথা বলা, চলা ফেরা বারণ। স্বামীর অনুমতি ছাড়া মেয়েদের ঘরের চৌকাঠ পেরোনোও নিষেধ। বৈষম্যের সহস্র শৃংখলে বন্দি নারী। নারী হয়ে জন্ম নিয়েছে বলেই ভুগতে হচ্ছে বর্বর পুরুষের এই পৃথিবীতে। ধর্ম আর পুরুষতন্ত্রের শাসন সৌদি আরবে। পুরুষেরই দাপট সে দেশে। সুতরাং যদি আদৌ কারোর ক্ষমতা থাকে সৌদি মেয়েদের দুর্দশা দূর করার, পরাধীনতার গহ্বর থেকে তাদের উদ্ধার করার, সে নিঃসন্দেহে সৌদি পুরুষের। মেয়েদের বিরুদ্ধে সৌদি আইনের প্রতিবাদ করতে এ পর্যন্ত খুব বেশি সৌদি পুরুষকে অবশ্য দেখা যায়নি।

মন্দ কাজ বন্ধ করার একটা কমিটি আছে সৌদি আরবে, সেই কমিটির লোকেরাই বলেছে তারা মেয়েদের হাতছানি দেওয়া চোখ নিষিদ্ধ করেছে। কোন চোখ হাতছানি দেয়, কী করে বুঝবো! যে চোখে কাজল, সেই চোখ তো বটেই, তার ওপর চোখের আকার আকৃতি ভালো, এমন চোখও পাপের চোখ, হাতছানির চোখ। চোখ সুন্দর হলেও কোনও ক্ষমা নেই, সে চোখ নিষিদ্ধ। আর যে চোখে কাজল নেই! কাজল না থাকলেও সে চোখ নিষিদ্ধ হতে পারে, শুধু দেখতে ভালো হওয়ার অপরাধে।

মেয়েদের বিরুদ্ধে এই আইনটিকে ইতিমধ্যে একশ ভাগ সমর্থন করেছেন সৌদি রাজপুত্র নাইফ। এই আইনটি এমনই এক বর্বর নারীবিরোধী আইন, এই আইনে যে-কোনও মেয়েকে যখন তখন দোষী সাব্যস্ত করা যায়, জেলে পাঠানো যায়, চাবুক মারা যায়। যেন এ মেয়েদের অপরাধ তারা মেয়ে। যেন এ মেয়েদের অপরাধ তাদের চুল চোখ মুখ আছে, যেন এ তাদের অপরাধ তাদের বুক পেট তলপেট আছে, তাদের পা আছে, পায়ের পাতা আছে। যেন মেয়েরা মানুষ নয়, মেয়েরা এক শরীর পাপ। এই পাপকে, এই লজ্জাকে ঢেকেঢুকে অপরাধীর মতো বাঁচতে হবে, যদি বাঁচতেই হয়। কমিটির লোকেরা দুনিয়ার মুসলিমদের কাছে আবেদন করেছেন, নতুন আইনটিকে সকলেই যেন সমর্থন করে, যেহেতু এই আইন ইসলামের আইন। ইসলামের প্রশ্নে দ্বিমত করে, সাধ্য কার!

‘যৌন উত্তেজনা বেড়েছে তোমার, সে তোমার সমস্যা, আমার নয়। তোমার সেটি বাড়ে বলে আমার নাক চোখ মুখ সব বন্ধ করে দেবে, এ হতে পারে না। আমি তোমার ব্যক্তগত সম্পত্তি নই যে তুমি আমাকে আদেশ দেবে আমি কী পরবো, কীভাবে পরবো, কোথায় যাবো, কতদূর যাবো। তোমার সমস্যার সমাধান তুমি করো। আমাকে তার দায় নিতে হবে কেন! যৌন উত্তেজনা আমারও আছে, সে কারণে তোমার নাক চোখ মুখ ঢেকে রাখার দাবি আমি করিনি। আমার ইচ্ছে হলে আমি চোখে কাজল পরবো, কাজল কালো চোখ দেখলে যদি তোমার সমস্যা হয়, তাহলে আমারে চোখের দিকে তাকিও না। যদি তারপরও চোখ চলে যায় মেয়েদের চোখের দিকে, আর তোমার ঈমানদণ্ড নিয়ে তুমি বিষম মুশকিলে পরো, তাহলে শক্ত করে নিজের চোখদুটো বেঁধে রাখো কালো কাপড় দিয়ে। এর চেয়ে ভালো সমাধান আর হয় না। তোমাকে উত্তেজিত করে এমন জিনিস তোমাকে দেখতে হবেনা। তুমিও বাঁচবে, আমিও বাঁচবো।‘ — জানিনা সৌদি মেয়েরা কবে বলবে এমন কথা।

আজ সারা বিশ্ব হাসছে সৌদি আরবের কাণ্ড দেখে। নামতে নামতে তারা কতদূর নিচে নেমেছে! মেয়েদের সর্বাঙ্গ নিষিদ্ধ করেছে, এমনকী চোখও। এত ঘৃণা করে ওরা মেয়েদের! বুঝিনা সব মেয়েকে কেন আজও তারা মেরে ফেলছে না! কেন জ্যান্ত কবর দিচ্ছে না, কেন দূর করে দিচ্ছে না দেশ থেকে! কেন এত ঘৃণার পরও মেয়েদের বাঁচিয়ে রাখছে। সম্ভবত বাঁচিয়ে রাখছে একটিই কারণে, পুরুষেরা যেন ওদের ভোগ করতে পারে, সম্পত্তির ওপর অধিকার আছে তো মালিকের।

[তসলিমা নাসরীনের ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে সংগৃহীত]

(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামতের জন্য কর্তৃপক্ষ দায়ী নহে)

ভার্জিনিটি

আমেরিকান ছেলেরা তাঁদের গার্লফ্রেন্ডের ভার্জিনিটির ধার ধারে না। গার্লফ্রেন্ডের পূর্বে চৌদ্দটি ছেলের সাথে শারীরিক সম্পর্ক থাকলেও কিছু যায় আসে না। গার্লফ্রেন্ড তাঁর সাথে রিলেশন থাকা অবস্থায় চীট না করলেই হলো। একই নিয়ম বয়ফ্রেন্ডের বেলাতেও আমেরিকান মেয়েদের এসব নিয়ে মাথা ব্যথা নেই।

সমস্যা হয়ে গেছে আমাদের। আমাদের ‘ভার্জিনিটি’ নিয়ে আপাত মুহূর্তে লেজে-গোবরে অবস্থা। আমরা প্রেম করার সময় ‘আমেরিকান’ প্রেম করতে চাই, কিন্তু বিয়ে করার সময় ‘খাঁটি বাঙালী’ বিবাহ করতে চাই। আমাদের বর্তমান সময়কার প্রজন্মের প্রেমে শারীরিক সম্পর্ক না থাকলে সে প্রেমকে ম্যাড়ম্যাড়ে বা বোরিং বলে ধরে নেয়া হচ্ছে। সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার। মেয়েরাও আস্তে আস্তে এই ব্যপারটা মেনে নিচ্ছে। “প্রেম টিকিয়ে রাখতে যদি ‘সেক্স’ কম্পালসরী হয়, তাহলে সেক্সে ক্ষতি কি…??” এই যুক্তি তাঁদের মাথায় সেট হয়ে গেছে দিনে দিনে। অবশ্য সিচুয়েশন তাঁদের এটা মেনে নিতে একপ্রকার বাধ্য’ই করে দিয়েছে।

এখন প্রবলেমটা হয়েছে অন্য জায়গায়। বাসর রাতে সব বাঙালী ছেলেই কোন এক বিচিত্র কারণে গাইনী ডাক্তার হয়ে যায়। তারা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বের করতে চায়, বউ এর সতীচ্ছদ পর্দা ঠিক আছে তো? নাকি আগেই কেউ হরণ করেছে। স্বামী ভদ্রলোক তখন নিজের ঝুলিতে কয়টি মেয়ের সতীচ্ছদ জয় করা আছে, সেটা কোন এক বিচিত্র কারণে ভুলে যান।

কোন কারণে মেয়েটা ‘ভার্জিন’ না হলে তো কথা’ই নেই। বিবাহবিচ্ছেদ বিষয়টা এখনো আমাদের দেশে তেমন ‘কুল’ হয়ে উঠে নি। তবে এক’ই বিছানায় দুজন দু’পাশে মুখ করে শুয়ে থাকার নিয়ম এদেশে অনেক প্রাচীন। বিয়ের পর বেডরুমে শান্তি না থাকা মানে দুনিয়া অশান্ত হয়ে যাওয়া।

প্রিয় প্রজন্ম, ভবিষ্যতের কথা একবার ভাববে কি…??
— ফ্র্যাঙ্ক অ্যাভিগন্যাল

লিখেছেন :

Lima Kabir Lima Kabir

(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামতের জন্য কর্তৃপক্ষ দায়ী নহে)

মীর কাসেমের মন খারাপ!

জামাত নেতা মীর কাসেমের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিলো গত রমজানে। আমি তখন কাসিমপুর কারাগারে বন্দি। যেদিন আমাকে একজন চোর-গুন্ডা বা বদমাসের মতো মহা যতন করে গ্রেফতার করা হয়েছিলো সেদিন আমার নামের সঙ্গে এমপি নামক একটি পদবীও ছিলো। আমাকে নেয়া হলো প্রথমে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে – তারপর কি মনে করে যেনো সন্ধ্যার পর পরই পাঠানো হলো কাসিমপুর। গভীর রাতে আমি যখন কারা ফটক অতিক্রম করে আমার বন্দী নিবাসের দিকে যাচ্ছি তখন ক্ষুধা, ক্লান্তি, অবসাদ এবং অপমান আমাকে বিধ্বস্ত করে দিয়েছিলো। জীবনের প্রথম কারাবাস- আমার চৌদ্দ গোষ্ঠীর কেউ ওখানে যায়নি- আর তাই আমি জানতাম না ওখানকার নিয়ম কানুন, সুযোগ সুবিধা বা অসুবিধা সমূহ।

কাসিমপুর কারাগারের মূল ফটক পার হয়ে অনেকখানি পথ হেঁটে যেতে হয়। তখন সম্ভবত ১৪ বা ১৫ রোজা চলছিলো। আকাশে অর্ধচন্দ্রের মিষ্টি আলো। আমি হাঁটছি সঙ্গে ২জন কারারক্ষী, চারিদিকে গা ছম ছম করা সুনশান নিরবতা। ভয়ে ভয়ে কারারক্ষীদেরকে বললাম- আমি যেখানে থাকবো সেখানে আর কে কে আছেন। তারা বললো – মীর কাসেম, মাহমুদুর রহমান এবং গিয়াস উদ্দিন আল মামুন। রাতে কারো সঙ্গে দেখা হবে না – তবে সকালে দেখতে পাবেন সকলকে। সকালে দেখা হলো মীর কাসেমের সঙ্গে। করমর্দন করলেন এবং আমার দিকে অতীব আশ্চর্য নয়নে তাকিয়ে বললেন- আপনাকে বেশ চেনা চেনা মনে হচ্ছে! কোথায় যেনো দেখেছি! আমি বললাম টিভিতে দেখেছেন। তিনি ও আচ্ছা বলে তখনকার আলোচনার ইতি টানলেন। আমি কিছুটা মনক্ষুন্ন হলাম। কারন জনাব মাহমুদুর রহমান কিংবা জনাব গিয়াস উদ্দিন আল মামুন যতোটা আন্তরিকতা, আগ্রহ এবং খোলামেলা ব্যবহার দেখালেন সে তুলনায় জনাব মীর কাসেমের অভিব্যক্তি ছিলো স্বতন্ত্র। আমার মনে হলো – লোকটি ভীষন রাশভারী, বেরসিক অথবা মনে প্রানে প্রচন্ড আওয়ামী বিদ্বেষী। কিন্তু আমার সেই ভুল ভাঙ্গতে খুব বেশী সময় লাগেনি।

রোজার মাসে আমরা ইফতারী এবং রাতের খাবার একসঙ্গে খেতাম। রোজার পর সকালের নাস্তা, দুপুরের খাবার এবং রাতের খাবার একসঙ্গে খেতাম। প্রথমে আমরা ছিলাম ৪ জন। পরে আমাদের সঙ্গে যোগ হয় অপর জামাত নেতা এটিএম আজহার। তাকে গাজীপুর জেলা কারাগার থেকে কাসিমপুরে আনা হয় রমজানের ঠিক কয়েকদিন পর। আমরা ফজর বাদে বাকী নামাজ জামাতে আদায় করতাম। আর প্রতি বিকেলে আমাদের ভবনের সামনে খোলা মাঠে চেয়ার নিয়ে বসে গল্প গুজুব করতাম- আবার মাঝে মধ্যে হাঁটা হাঁটি করতাম। ২/৩ দিন পর আমার সঙ্গে অন্যসবার মতো মীর কাসেমের সম্পর্কও স্বাভাবিক হয়ে যায় এবং আমরা পরস্পরের প্রতি সম্মান রেখে বন্ধুর মতো আচরন করতে থাকি।

জেলখানার অখন্ড অবসরে আমি প্রায়ই হাঁফিয়ে উঠতাম। নামাজ কালাম, তছবীহ তাহলিল, বই পড়া, ঘুম, ব্যায়াম- সবকিছু রুটিন মতো করার পরও হাতে অনেক সময়। মন ভার হলেই আমি বারান্দায় পায়চারী করতাম। মীর কাসেম তখন পরম স্নেহে আমাকে তার রুমে ডেকে নিতেন নতুবা আমার রুমে আসতেন। তিনি কথা বলতেন কম এবং শুনতেন খুব বেশী। তিনি আমার জীবন, দর্শন, রাজনীতি, ধর্ম, প্রেম-ভালোবাসা, সমাজ, সংসার, নির্বাচনী এলাকার খুঁটিনাটি নিয়ে মেধাদীপ্ত প্রশ্ন করতেন এবং সবকিছু শোনার পর সুন্দর বা আলহামদুলিল্লাহ ইত্যাদি বলেই ক্ষান্ত থাকতেন। কয়েকদিন পর আমি বুঝলাম মীর কাসেম সাহেব সমাজের অন্য মানুষের মতো নন। এ আমি বুঝেছিলাম তার আচার আচরন, চালচলন, কথাবার্তা, খাদ্যাভ্যাস এবং ইবাদত বন্দেগীর ধরন দেখে। যেসব বিষয়ে আমার মনে প্রশ্ন জাগতো আমি নির্দিধায় সেগুলো তাকে জিজ্ঞাসা করতাম এবং তিনি সাধ্য মতো সুন্দর করে আমাকে সবকিছু বুঝিয়ে বলতেন।

জেলে যাওয়ার আগে বহুজনের কাছে বহুবার তার ব্যাপারে বহু কথা শুনেছি। তার নাকি হাজার হাজার কোটি টাকা। তিনি জামাতের প্রধান অর্থ যোগানদাতা, দেশে বিদেশে তার রয়েছে নামে বেনামে বহু প্রতিষ্ঠান। দেশের মধ্যে চলাফেরার জন্য তিনি সব সময় নাকি নিজস্ব হেলিকপ্টার ব্যবহার করেন -ইত্যাদি। তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় গুজুবটি হলো- তিনি নাকি যুদ্ধাপরাধের বিচার বানচালের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৪০০ কোটি টাকা ব্যয় করে লবিষ্ট ফার্ম নিয়োগ করেছেন। আমি ওসব গাঁজাখুরী গল্প বিশ্বাস করতাম না আবার যারা ওসব বলতো তাদের সঙ্গে তর্কও করতাম না। কারন গুজুবকারীদের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক স্তর এতো নীচু মানের যে তাদের সঙ্গে তর্ক করাটাই মস্তবড় এক নির্বূদ্ধিতা। আমি নিজে ব্যবসা বানিজ্য করি সেই ১৯৯১ সাল থেকে। বাংলাদেশে কয়জন ধনী আছে এবং কোন কোন ধনীর কি কি ব্যবসা আছে তা মোটা মুটি নখদর্পনে। বাংলাদেশের ধনীদের বসবাসের কযেকটি এলাকা আছে – তাদের মেলা মেশার জন্য কয়েকটি ক্লাব আছে, তাদের ব্যক্তিগত বিলাসিতার গাড়ী, বাড়ী, নারী, বাগানবাড়ী, বন্ধু বান্ধব, সভা-সমিতির এবং ব্যবসায়ী সংগঠনের নাম ধাম অনেকের মতো আমিও জানি। ঐ সমাজে মীর কাসেম নামে কোন লোক নেই। মিরপুরের কোন এক জায়গায় পাঁচ কাঠার ওপর নির্মিত একটি পৈত্রিক বাড়ীতে স্বাধীনতার পর থেকেই তিনি অন্যান্য ভাইদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে থাকেন।

মার্কিন রাজনীতি, অর্থনীতি এবং লবিষ্ট ফার্ম সম্পর্কে আমার ধারনা বাংলাদেশের অনেকের চেয়ে স্পষ্ট। কারণ ঐ বিষয়ের ওপর আমার মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের ফেলোশীপ রয়েছে। ওখানকার লবিষ্ট ফার্ম গুলো কি কি কাজ করে বা করতে পারে তা আগে জানতে হবে। দ্বিতীয়তঃ রাষ্ট্র হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিভাবে যুদ্ধাপরাধের বিচার বানচাল করবে? যুক্তরাষ্ট্র কেনো- পৃথিবীর কোন দেশের কি সেই ক্ষমতা আছে ? আর আমরাই কি সেই আগের অবস্থায় আছি? যেখানে জননেত্রী শেখ হাসিনা-যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ফোন ধরেন না! বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে সাক্ষাৎকার দেন না, সফররত মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিংবা জাতিসংঘের বিশেষ দূত তারানকোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন না সেখানে কোন লবিষ্ট ফার্ম কি করবে তা নিয়ে গল্প বানানোর নির্বুদ্ধিতা আমার সাজে না। মার্কিন সমাজের বেশির ভাগ নাগরিক দিন আনে দিন খায়। শতকরা ৯০ ভাগ লোকের সামনে ৫ হাজার ডলার নগদ ফেললে তারা ভয় পেয়ে যায়। কাজেই বাজারের গুজুব নিয়ে কথা না বলে আমি কথা বলতাম ১৯৭১ সাল নিয়ে এবং জানার চেষ্টা করতাম ঐ সময়ে তার ভূমিকা সম্পর্কে।

একদিন কথা প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করেছিলাম-জেলে থাকার কারনে আপনার ব্যবসা বানিজ্যে কি কোন সমস্যা হচ্ছে না ? তিনি বললেন – ঝামেলার মতো কোন ব্যবসা বানিজ্য নেই। চট্রগ্রাম কেন্দ্রীক একটি ডেভেলপার কোম্পানী আছে। এখন ফ্ল্যাট ব্যবসায় বাজার মন্দা থাকার কারনে নতুন কোন প্রজেক্ট নেই। সেন্ট মার্টিন – টেকনাফ রুটে ২ টা জাহাজ চলে কেয়ারী সিন্দাবাদ নামে। সিজনাল ব্যবসা । ভালো চলছে। অন্যদিকে নয়া দিগন্ত ও দিগন্ত টিভিতে অনেক পরিচালক আছেন আর উভয় কোম্পানীই পাবলিক লিমিটেড। কাজেই টেনশন নেই। ব্যবসা – বানিজ্য- ছেলেরাই দেখাশুনা করে। অন্যদিকে ইবনে সিনা বা ইসলামী ব্যাংকে আমার পরিচালক পদ অনেকটা অনারারী ধরনের। এসব প্রতিষ্ঠানে অনেক জামাত নেতার মতো আমিও ছিলাম পরিচালনা পরিষদে। এই প্রতিষ্ঠান গুলোর গঠন প্রক্রিয়া এবং পরিচালন পদ্ধতি দেশের অন্যান্য প্রতিষ্ঠান গুলোর মতো নয়। যেমন ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানদের মধ্যে বেশ কয়েকজন ছিলেন যাদের একটাকার মালিকানাও ব্যাংকটিতে ছিলো না।

আমি মীর কাসেম সাহেবের কথা শুনছিলাম এবং তার রুমের চারিদিকে চোখ বুলাচ্ছিলাম। জামা কাপড়, সাজ সজ্জা, আসবাব পত্র কোন কিছুই আমার কাছে অসাধারন মনে হয়নি বিশেষ করে ডিভিশন প্রাপ্ত অন্যান্য কয়েদীদের তুলনায়। আমরা সবাই জেলখানার ভেতরের দোকান থেকে কিনে মিনারেল ওয়াটার খেতাম। অন্যদিকে মীর কাসেম খেতেন সাধারন টেপের পানি। কোন বিদেশী ফল মূল খেতেন না। জাম্বুরা, আনারস, আমড়া, কলা প্রভৃতি দেশী ফল সময় ও সুযোগ মতো খেতেন। আমাদের সবার রুমে ৬টি করে সিলিং ফ্যান ছিলো। আমরা নিজেরা সব সময় সব গুলো ফ্যান ছেড়ে রাখতাম। মীর কাসেম ভুলেও সে কাজটি করতেন না – দরকার পড়লে একটি মাত্র ফ্যান ছাড়তেন। তার এই অবস্থা দেখে গিয়াস উদ্দিন আল মামুন প্রায়ই বলতেন- স্যার এতো টাকা দিয়ে কি করবেন! তিনি জবাব না দিয়ে শুধু হাসতেন। ইতিমধ্যে আমার সঙ্গে তিনি আরো খোলামেলা এবং আন্তরিকতা দেখাতে লাগলেন। আর এই সুযোগে আমিও নানা রকম বেফাস কথা বলে তার মানসিক অবস্থা বুঝার চেষ্টা করতাম। একদিনের একটি কথার জন্য আমার আজও আফসোস হয়-কেন আমি ওমন করে সেদিন ওকথা বলতে গিয়েছিলাম! ঘটনার দিন বিকেলে আমি, মাহমুদুর রহমান এবং মীর কাসেম সাহেব আমাদের কারা প্রকোষ্ঠের সামনের মাঠটিতে চেয়ারে বসে গল্প করছিলাম। হঠাৎ আমি প্রশ্ন করলাম- ভাই আপনার ওজন কতো ? তিনি বললেন ৯২ কেজি? আমি বললাম সর্বনাশ তাড়াতাড়ি কমান! না হলে সিরিয়াস ঘটনা ঘটে যাবে। কি ঘটনা ঘটবে- তিনি পাল্টা প্রশ্ন করলেন । আমি বললাম হাব ভাবে মনে হচ্ছে আপনার ফাঁসি হবে! তিনি বললেন তাতে কি ? আর ফাঁসির সাথে ওজনের কি সম্পর্ক? আমি বেওকুফের মতো বলে ফেললাম- শুনেছি শায়খ আব্দুর রহমানের অতিরিক্ত ওজনের জন্য তার লাশ ফাঁসিতে ঝুলানোর এক পর্যায়ে ঘাড় থেকে – – – – – -। আমার কথা শুনে উনি শিশুর মতো হো হো করে হেসে উঠলেন। তারপর হাসতে হাসতে আসমানের পানে তাকালেন এবং বললেন- এমপি সাহেব! সব ফয়সালা তো ঐ আসমান থেকেই আসবে ! আমার মুখের ওপর যেনো বজ্রপাৎ হলো- বুকটা ছ্যাৎ করে উঠলো। আমি অনেকটা অমনোযোগী হবার ভান করে এদিক ওদিক তাকাতে থাকলাম কিন্তু কিছুতেই নিজের দূর্বলতা গোপন রাখতে পারলাম না। আমি তার মুখপানে তাকালাম। আমার চোখ অশ্বস্তিতে জ্বালা পোড়া করতে লাগলো। আমি দু’হাতে মুখ ঢেকে চোখের আড়াল করতে চেষ্টা করলাম। তিনি তখনো আকাশের পানে তাকিয়ে ছিলেন।

এই ঘটনার পর আমি মনে মনে তওবা করলাম এবং সিদ্ধান্ত নিলাম জীবনে আর বেফাস কথা বলবো না। মাহমুদুর রহমান সাহেব, মামুন সাহেব ও আমি বেশির ভাগ সময়ই রাজনৈতিক আলাপ আলোচনা করতাম। আর মীর কাসেম সাহবে শুধু শুনতেন। একদিন মামুন বললেন – স্যার! আমি আপনার মতো বেওকুফ লোক জিন্দেগীতে দেখিনি। আপনি তো বিদেশ ছিলেন। দেশে এসে ধরা দিলেন কেনো? তিনি শিশুর মতো প্রশ্ন করলেন- বিদেশে কেনো থাকবো? মামুন আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন- শুনেন! কথা শুনেন ! তিনি মামুনের কথার জবাবে বললেন – আমি তো নিজে জানি যে আমি কি করেছি! তাই নিজের কর্মের ওপর বিশ্বাস করেই দেশে ফিরেছিলাম। তা ছাড়া দেশের বিচার ব্যবস্থার প্রতিও আমার আস্থা ছিলো । তার উত্তর শুনে মামুন মহা বিরক্ত হয়ে বললো – স্যার খান! আরেকটা রুটি খান। আমি আর মাহমুদুর রহমান মুচকী মুচকী হাসতে লাগলাম।

মীর কাসেমের ২টি অভ্যাস নিয়ে আমরা হাসা হাসি করতাম। প্রতি ওয়াক্ত নামাজে সে একেক সেট পোশাক পরতেন। আমরা চার ওয়াক্ত নামাজ জামাতে আদায় করতে গিয়ে দেখতাম প্রতিবারই তিনি পোশাক পরিবর্তন করে আসতেন। মামুন ছিলো দারুন মুখপোড়া প্রকৃতির- বলতেন কেন চার বেলা পোশাক পরিবর্তন করেন ? তিনি বলতেন – ৪ বেলা নয় – আমি তো ৫ বেলা পোশাক পরিবর্তন করি। একজন রাজা বাদশাহ বা সম্মানীত লোকের দরবারে আমরা যেমন পরিপাটি নতুন পোশাকে হাজির হই- তেমনি আল্লাহর দরবারে হাজির হতে গিয়ে আমি দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সময় পোশাক পরিবতর্ন করি।

পোশাক পরিবর্তন ছাড়াও তার আরেকটি অভ্যাস ছিলো প্রতি বিকেলে নীচে নেমে সকলের সঙ্গে সালাম বিনিময় ও করমর্দন করা। আমাদের সেলের প্রধান গেটের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি রাস্তায় চলাচলকারী আসামী এবং অন্য সেলের কয়েদীদের সঙ্গে সালাম ও শুভেচ্ছা বিনিময় করতেন। আসামীদের মধ্যে কিলার আব্বাস সহ বেশ কয়েকজনের বাড়ী ছিলো মিরপুরে। তিনি তাদের সঙ্গে একটু বেশী আন্তরিকতা দেখাতেন। মামুন টিপ্পনি কাটতেন – স্যার মিরপুর থেকে ইলেকশন করবেন তো ! তাই জেলে বসে সব কিছু ঠিক ঠাক করছেন। তিনি শান্ত শিষ্ট ভঙ্গিতে সিরিয়াস হয়ে উত্তর দিতেন- আরে নাহ;কোন ইলেকশন না । আমি প্রতিবেশীর হক আদায় করার চেষ্টা করছি।

যেদিন তার কোর্টে হাজিরা থাকতো সেদিন সকালে তিনি আমাদের সবাইকে সালাম জানিয়ে যেতেন। ট্রাইবুনালে হাজিরার দিন তিনি সব সময় স্যুট নিয়ে যেতেন। ফিরে এসে বিভন্ন বিষয় মজা করে বর্ননা করতেন। তাকে আমরা মুখ কালো করে থাকতে দেখিনি কোনদিন। হঠাৎ একদিন নাস্তার টেবিলে দেখলাম মীর কাসেম সাহেবের মন খুব খারাপ। আমরা জিজ্ঞাসা করলাম ব্যাপার কি? কি হয়েছে? তিনি বললেন-একটি বিষয় চিন্তা করতে করতে রাতে আর ঘুম হলো না। আর সে কারনেই রাত থেকে মনটা ভার হয়ে আছে। আমরা কথায় বেশ সিরিয়াস হয়ে গেলাম। প্রবল উৎকণ্ঠা নিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম-কি নিয়ে সারারাত চিন্তা করলেন আর কেনোই বা এতো মন খারাপ হলো? তিনি মুখ ভার করেই জবাব দিলেন- কাল রাতে একটি জার্নালে পড়লাম সাইবেরিয়া, আইসল্যান্ড এবং এন্টার্কটিকার বরফের স্তর বিশ্বব্যাপী পরিবেশ বিপর্যয়ের কারনে দ্রুত গলে যাচ্ছে। এভাবে গলতে থাকলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বাংলাদেশ ও মালদ্বীপের মতো দেশ সমূদ্রের জলরাশির মধ্যে বিলীন হয়ে যাবে। বাংলাদেশ যদি বিলীন হয়ে যায় তবে ১৭ কোটি মানুষের কি হবে ? আমি পুরো বেওকুফ হয়ে গেলাম এবং তার মুকের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ভাবলাম- হায়রে মানুষ! যার নিজের জীবনের যেখানে ঠায় ঠিকানা নেই সেখানে তিনি কিনা ভাবছেন এ্যান্টার্কটিকার বরফ নিয়ে।

আমার ওয়াক্তের নামাজ সহ তারাবীর নামাজে তিনিই ইমামতি করতেন। নামাজ শেষে লম্বা মোনাজাত ধরতেন। আমরা ছাড়াও আরও ৭/৮ জন সেবক কয়েদি আমাদের সঙ্গে নামাজ আদায় করতেন। প্রতি দিনকার মোনাজাতে বলতেন- ” হে আমাদের পরওয়ার দিগার। তুমি আমাদের কর্ম, আমাদের মন এবং বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বেখবর নও। আমরা যদি অন্যায় করে থাকি- তাহলে আমাদের বিচার কর! আর যদি অন্যায় না করে থাকি তবে তোমার রহমতের চাদর দিয়ে আমাদের আচ্ছাদন করে রাখো। তোমার উত্তম ফয়সালা, রহমত এবং বরকত সম্পর্কে আমরা যেনো হতাশ হয়ে না পড়ি এজন্য আমাদের চিত্তকে শক্তিশালী করে দাও। ইয়া আল্লাহ! আমরা বিশ্বাস করি পৃথিবীর কোন জালেমের জুলুম কোনদিন তোমার মাহবুব বান্দাদের একচুল ক্ষতি করতে পারেনি। হায় আল্লাহ! তুমি আমাদেরকে তোমার মাহবুব বানিয়ে নাও। আমাদেরকে এই কারাগার থেকে বের কর- তোমার দেয়া নেয়ামত-আমাদের পরিবার পরিজন সন্তান সন্ততিদের নিকট আমাদেরকে ফেরত যাবার তওফিক দাও। এই কারাগারের চার দেয়ালের বেদনা এবং অপমান থেকে আমাদেরকে এবং আমাদের পরিবার পরিজনকে রক্ষা কর। হে মালিক-বাংলাদেশের প্রতি তুমি রহম কর। দেশের ক্ষমতাসীনদেরকে ন্যায় বিচার করার তওফিক দাও। আর আমাদের বিশ্বাসকে মজবুতি দান করো। তোমার রহমতের আশায় চাতক পাখির মতো আকাশ পানে তাকিয়ে থাকি! তোমার দরবারে হাত পাতি- হে আল্লাহ তুমি আমাদের গুনাহ সমূহ মাফ করো, আমাদেরকে দুনিয়া ও আখেরাতে অতি উত্তম প্রতিদান দাও এবং সর্বাবস্থায় আমাদেরকে হেফাজত করো। আমীন।

লেখক: গোলাম মাওলা রনি

(এই পোষ্টটি দৈনিক নয়া দিগন্তে প্রথম প্রকাশিত হয়েছে)

(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামতের জন্য কর্তৃপক্ষ দায়ী নহে )

চুমুর মতো চমৎকার জিনিস আর হয় না

চুমুর মতো চমৎকার জিনিস আর হয় না। দিন দুপুরে চুমু খাব, প্রকাশ্যে খাব, একশ লোককে দেখিয়ে চুমু খাব। -এরকম একটি আন্দোলন চলছে এখন ভারতে। কেরালা থেকে কলকাতায়…

ছেলে মেয়েদের রাস্তায়-নদীর পাড়ে-পার্কে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসতে দেখলেই পুলিশ এসে ঝামেলা করে। প্রেম করা যেন অন্যায়। ভালবাসা টালবাসা চলবে না। প্রেম, চুমু, হাত ধরে হাঁটা-এসব নাকি অশ্লীল। ভায়োলেন্স কি অশ্লীল? আমার মনে হয় না কেউ বলবে ভায়োলেন্স অশ্লীল।

রাস্তা ঘাটে মানুষকে অসম্মান কর, গালি দাও, যৌন হেনস্থা কর, মারো, গরিব পকেটমারকে সবাই মিলে মারতে মারতে মেরেই ফেল, কিছুই অশ্লীল নয়। অশ্লীল সেই দৃশ্যই যখন তুমি ভালোবেসে কারো হাত স্পর্শ করবে, ভালোবেসে কারো ঠোঁটে চুমু খাবে।

ভালবাসা অপরাধ, চারদিকে ঘৃণার জয়জয়কার।

[ফেসবুক থেকে সংগৃহিত]

(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামতের জন্য কর্তৃপক্ষ দায়ী নহে)

কেন পারি না: তসলিমা নাসরিন

‘আমার কাছে এই জীবনের মানে কিন্তু আগাগোড়াই অর্থহীন,

যাপন করার প্রস্তুতি ঠিক নিতে নিতেই ফুরিয়ে যাবে যে-কোনওদিন।

গ্রহটির এই মানবজীবন ব্রহ্মাণ্ডের ইতি-হাসে

এক পলকের চমক ছাড়া আর কিছু নয়।

ওই পারেতে স্বর্গ নরক এ বিশ্বাসে

ধম্মে কম্মে মন দিচ্ছে, কী হয় কী হয়, সারাক্ষণই গুড়গুড়ে সংশয়।

তাদের কথা বাদই দিই সত্য কথা পাড়ি,

খাপ খুলে আজ বের করিই না শখের তরবারি!

মানুষ তার নিজের বোমায় ধ্বংস হবে আজ নয়তো কাল,

জগত টালমাটাল।

আর তাছাড়া ক’দিন বাদে সূয্যিমামা গ্যাস ফুরিয়ে মরতে গিয়ে

দেখিয়ে দেবে খেলা,

সাঙ্গ হবে মেলা

জানার পরও ঝাঁপিয়ে পড়ে ছিঁড়ে কামড়ে তুচ্ছ কিছু বস্তু পাওয়ার লোভ,

ভীষণ রকম পরস্পরে হিংসেহিংসি ক্ষোভ।

মানুষের, কই যাবে দুর্ভোগ!

তাকত লাগে ভবিষ্যতের আশা ছুড়ে করতে কারও মহানন্দে মুহূর্তকে ভোগ।

ভালোবাসতে শক্তি লাগে, হৃদয় লাগে সবকিছুকেই ভাগ করতে সমান ভাগে,

ক’জন পারে আনতে রঙিন ইচ্ছেগুলো বাগে?

ভুলে যাস এক মিনিটের নেই ভরসা,

তোর ওই স্যাঁতসেঁতে-সব-স্বপ্ন-পোষা কুয়োর ব্যাঙের দশা

দেখে খুব দুঃখ করি, দিনদিনই তোর বাড়ছে তবু দিনরাত্তির কাদাঘাটা।

অরণ্য তুই কেমন করে এত বছর কামড়ে আছিস দেড় দু’কাঠা?

ধুচ্ছাই,

সমুদ্দুরে চল তো যাই!’

কবিতাটা মনে আছে, লেখার পর খুব ভালো লেগেছিল। ভালো লাগার প্রধান কারণ ছিল, প্রেম-বিরহের বিষয় থেকে বেরিয়ে আসা। একটা মুক্তির স্বাদ পেয়েছিলাম। প্রেম কবিতার বড় একটা বিষয়, তবে এক ধরনের শেকলও বটে। কবিতাটা লেখার পর আনন্দের আরও একটি কারণ ছিল, ছন্দ। মাত্রাবৃত্ত আমাকে বড় আনন্দ দেয়। অক্ষরবৃত্ত যদি জীবনযাপন, স্বরবৃত্ত যদি খেলার মাঠ, মাত্রাবৃত্ত তবে প্রেম। আর, বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসা? সে উতল হাওয়া। কোনও কিছু লেখার বছর দু’তিন পর এরকম খুব হয় আমার যে সেটি পদ্য হোক কী গদ্য হোক, আর ভালো লাগে না। বিষয় হয়তো ভালো, বিষয় নিয়ে সব সময় খুব বেশি আপত্তি করি না, শুধু প্রকাশ নিয়ে করি। প্রকাশ স্বচ্ছ নয়, স্পর্শ করছে না, বানের জল নেই, তুমুল তুফান নেই, আমি তাই দূরে সরাতে সরাতে যাই পুরনো প্রাচীন যা কিছু আছে সব। নতুনের দিকে যেতে চাই প্রতিদিন।

বেশ কয়েক বছর থেকে আমি ভাবছি, কবিতা আর ছোটখাটো নিবন্ধ প্রবন্ধ না হয় আমি লিখতে পারি নানা বিষয় নিয়ে, নিজের অভিজ্ঞতা, দর্শন, উপলব্ধি ইত্যাদির ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু উপন্যাস কেন বিচিত্র বিষয় নিয়ে লিখি না! এর কারণ, বিচিত্র বিষয়ে আমার অভিজ্ঞতা নেই। একবার একজন বলেছিলেন, গ্রামের জীবন নিয়ে লেখো। আমি বলেছি, লিখবো কী করে, গ্রামে কোনওদিন যাইনি, থাকিনি। গ্রাম দেখেছি মূলত ট্রেন থেকে বা গাড়ি থেকে, আর শহরের গা ঘেঁষে যে গ্রামগুলো, সেখানে সব মিলিয়ে চারপাঁচ বার যে যাওয়া হয়েছে, তাও সামান্য ক্ষণের জন্য। খুব কাছ থেকে গ্রামের মানুষদের জীবনযাপন দেখিনি। বস্তির জীবন? সেও দেখা হয়নি। চোর, বদমাশ, ভিখিরি, নেশাখোর, শ্রমিক, রাজনীতির জগত, বিজনেস পাড়া, বেশ্যা বাড়ি, না, কিছুই কাছ থেকে দেখা হয়নি।

ছোটবেলা থেকেই খুব জানতে চাইতাম জগতটাকে। খুব দেখতে চাইতাম, কিন্তু দেখতে দেওয়া হয়নি। মামারা কাকারা দাদারা কিশোর বয়স থেকেই টই টই করে শহর ঘুরতো। কত কোথাও যেত, বন্ধুর বাড়ি, এই পার্ক, ওই মাঠ, সার্কাস, ঘোড়দৌড়, বাজার, দোকানপাট, সিনেমা, থিয়েটার, বন বাঁদাড়, বস্তি, পুকুরপাড়, নদীর পাড়, এই মেলা, সেই মেলা, কত নানা রকম মানুষের সঙ্গেও মিশতো, কথা বলতো, বন্ধুত্ব করতো- অবাধ স্বাধীনতা ছিল ওদের, ছেলে হওয়ার স্বাধীনতা। আমাদের মেয়েদের তা ছিল না। শুধু ইস্কুল আর বাড়ি, এর বাইরে কোথাও যাওয়া বারণ ছিল। বাবার ওপর খুব রাগ হতো, যেহেতু বাড়ির বাইরেটা, জগতটা বাবা দেখতে দিত না। কিন্তু এখন আর সেই রাগটা হয় না, কারণ মেয়েদের জন্য বাইরেটা খুব খারাপ ছিল। আমিও যদি দাদারা যেভাবে ঘুরতো সেভাবে ঘুরতাম, আমাকে দুদিনেই ছিঁড়ে খেয়ে ফেলতো লোকেরা, অথবা ভীষণ বদনাম হতো আমার। বাবা পায়ের টেংরি ভেঙে চিরকালের জন্য হয়তো ঘরে বসিয়ে রাখতো। বাড়িতে বাবাদের মামাদের দাদাদের বন্ধুরা এলে ভেতরের ঘরে চলে যেতে হতো। মেয়েদের নাকি পুরুষলোকদের আলোচনার মধ্যে থাকতে নেই। ঘরের জীবন খুব চিনি বলে বাইরের অচেনাকে চেনার বড় ইচ্ছে ছিল। মেয়েদের ইস্কুল কলেজে পড়েছি। মেয়েদের সঙ্গেই মিশেছি। ছেলেরা বড় এক রহস্যের মতো ছিল। মেডিকেল কলেজে ছেলেরাও পড়েছে আমাদের সঙ্গে, কিন্তু শৈশব কৈশোরে একটা দূরত্ব তৈরি হয়ে গেলে যা হয়, দূরত্বটা বড় হলেও বজায় থাকেই। সমাজটা যদি ছেলেদের মতো মেয়েদের ঘোরাফেরাকে সহজে মেনে নিত, তাহলে মেয়েরা জগত দেখার সুযোগ থেকে এত ভয়ঙ্করভাবে বঞ্চিত হতো না। আর জগত খুব খুঁটিয়ে না দেখলে জগত নিয়ে প্রবন্ধ বা পদ্য হয়তো লেখা যেতে পারে, কিন্তু উপন্যাস লেখা যায় না। উপন্যাসে বর্ণনা করতে হয় সব খুঁটিনাটি। জীবন যাপনের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম সবকিছু। আমার উপন্যাসগুলোয়, আমি তাই লক্ষ্য করেছি বৈচিত্র্য নেই। মধ্যবিত্ত মেয়েদের ঘরের জীবন, তাদের দুঃখ সুখই আমার উপন্যাসের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। ফাঁকি দিতে পারলে বানিয়ে বানিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রের, ক্ষেত-খামারের, কল-কারখানার, জাহাজঘাটের, অথবা অন্য কোনও বিশাল পটভূমি নিয়ে উপন্যাস লিখতে পারতাম। কিন্তু মুশকিল হলো, ওই ফাঁকিটাই আমি দিতে পারি না। অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার সমৃদ্ধ হলে শুধু উপন্যাসে নয়, অন্য লেখাতেও বৈচিত্র্য আসে। জানি কেউ কেউ বলবেন, ঘরের জীবনটা যখন জানি, ঘরের জীবনটাকেই ঠিকঠাক ফুটিয়ে তুলি না কেন। সে চেষ্টা আমি করি, কিন্তু দুঃখটা তো থেকে যায়। চার দেয়ালের মধ্যে জীবনের বেশির ভাগ সময় কাটিয়ে দেওয়ার দুঃখ। একটা নারীবিদ্বেষী সমাজে জন্ম হলে মেয়েরা জীবনের কত কিছু থেকে যে বঞ্চিত থাকে! ঘরের জীবনটা আমার দাদারা দেখেছে, বাইরের জীবনটাও দেখেছে। আর, আমি আর আমার বোন মেয়ে হয়ে জন্মেছি বলে শৈশব, কৈশোর আর তারুণ্যজুড়ে শুধু ঘরের জীবনটাকেই দেখেছি। আমাদের তো অধিকার আছে সবকিছু দেখার এই পৃথিবীর! নাকি নেই?

শুধু জন্মের সময় শরীরে ছোট একটা পুরুষাঙ্গ ছিল না বলে কত অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছি! আমার দাদারা পুরুষাঙ্গ নিয়ে জন্মেছে, দুনিয়া দেখেছে, কিন্তু লেখার ক্ষমতা নেই বলে কিছুই লিখতে পারেনি। হয়তো অন্য খাতে খাটিয়েছে অভিজ্ঞতা। লেখার হাত থাকলেও অভিজ্ঞতার অভাবে অনেক সময় আমি মন খারাপ করে বসে থাকি। সেদিন খুব ইচ্ছে হয়েছিল কনস্ট্রাকশন ওয়ার্কারদের নিয়ে, ট্রেড ইউনিয়নিস্টদের নিয়ে বড় একটা উপন্যাস লিখি। কিন্তু ওদের জীবন পুরুষ হয়ে বিচরণ করলে যতটা দেখা সম্ভব, মেয়ে হয়ে ততটা সম্ভব নয়। বাইরের পৃথিবীর প্রায় সবখানেই, প্রায় সব জায়গায় মেয়েরা অনাকাঙ্ক্ষিত, অবাঞ্ছিত।

যা কিছুই ঘটুক, পুরুষাঙ্গ নিয়ে জন্ম নিইনি বলে আমার কিন্তু দুঃখ হয় না, বরং স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি। কারণ পুরুষশাসিত সমাজে ওই ছোট্ট অঙ্গটা থাকা খুব ভয়ঙ্কর, রীতিমতো মাথা নষ্ট করে দেয়, নীতিবোধ বলে, বিচারবোধ বলে প্রায় কিচ্ছু থাকে না, ভাবার-চিন্তা করার শক্তি লোপ পাইয়ে দেয়, নিজেকে ঈশ্বরের মতো বড় বলে মনে হয়, মূর্খতা আর মূঢ়তার মুকুট পরেই বসে থাকা হয় কেবল। পুরুষ হয়ে জন্মালে আমি আর দশটা পুরুষের মতো হতাম না এ কথা নিশ্চয় করে কী করে বলবো, নাও যদি হতাম, পুরুষ জাতটা তো আমার জাত হতো, যে জাতের বেশির ভাগই অবিবেচক, কূপমণ্ডূক! হয়তো অনেকে বলবে বেশির ভাগ পুরুষই ভালো, সমানাধিকারে বিশ্বাস করে, শুধু হাতেগোনা ক’জন পুরুষই করে না। তাই যদি হয়, বেশির ভাগ পুরুষই যদি সমানাধিকারে বিশ্বাস করে, তবে সমাজে সমানাধিকারের আজও দেখা নেই কেন? কে বাধা দেয়? বেশির ভাগ পুরুষই যদি পুরুষতন্ত্র বিরোধী, তবে আজো কেন এত বহাল তবিয়তে, এত জাঁকিয়ে, সমাজজুড়ে বৈষম্যের মূল অপশক্তি পুরুষতন্ত্র টিকে আছে?

লেখক : নির্বাসিত লেখিকা।