পিয়াস করিম প্রসঙ্গ ধরে যৌনতা বিষয়ক কিছু কথা

সদ্য সমাহিত পিয়াস করিমের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার লক্ষ্যে প্রচার করা হয়েছে যে ভায়াগ্রা সেবনের ফলে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। আমি আমার আগের লেখায় বলেছি, হুমায়ূন আজাদের মৃত্যুর পর বলা হয়েছিলো যে মদ্যপানের ফলে তাঁর মৃত্যু ঘটেছে। আমি দেখিয়েছি, মরণোত্তর নিন্দা হচ্ছে বাঙালীর রাজনৈতিক সংস্কৃতির পশ্চাৎপদতা।

বক্ষ্যমান নৌটে আমার তর্ক হচ্ছেঃ পিয়াস করিম যদি ভায়াগ্রা সেবন করেও থাকেন, তাহলে নৈতিক সমস্যা কোথায়? ভায়াগ্রা যদি যৌনশক্তি বর্ধক ওষুধ হয়ে থাকে, আর যদি তিনি তা সেবন করে থাকেন, তাহলে আমাদের সমস্যা কী?

নিন্দুকদের অভিযোগ সত্য ধরে নিয়েই তর্ক করতে চাই। পিয়াস করিম ভায়াগ্রা সেবন করেছিলেন বলে এর প্রতিক্রিয়ায় যদি তাঁর মৃত্যু হয়ে থাকে, তাতে তাঁর অপরাধের কী আছে? তিনি তো আত্মহত্যা করার জন্য ভায়গ্রা খাননি।

পিয়াস করিম যদি ভায়াগ্রা খেয়ে থাকেন, তাহলে নিশ্চয় তিনি যৌনসঙ্গম উপভোগ করার জন্য খেয়ে থাকবেন। এতে অনৈতিকতার বা লজ্জার কিছু নেই। আমি বরং সেজন্যে তাঁকে ধন্যবাদ দেবো। আমি বুঝবো তিনি যৌনসঙ্গমকে উপভোগ করার ব্যাপারে যত্নশীল ছিলেন।

যৌনতা নিয়ে, সঙ্গম নিয়ে, আমাদের এতো প্রেজুডিস কেনো? আমরা কি যৌনসঙ্গম করি না? আমরা কি আমাদের পিতা-মাতার যৌনসঙ্গমের ফল নই? আমাদের সন্তান-সন্ততিরা আমাদের যৌনসঙ্গমের পরিণতি নয়? গোটা মানবজাতি কি মানব-মানবীর যৌনসঙ্গমের উৎপাদন নয়?

সুস্বাদু খাদ্য ও স্বতঃস্ফূর্ত যৌনসঙ্গমের চেয়ে মানুষের জীবনে আনন্দতর আর কী আছে? কেনো আমরা ভান করি যে আমরা ভাজা মাছটি উল্টে খেতে পারি না?

আমার ধারণা, অধিকাংশ পুরুষ যৌনসঙ্গমের ব্যাপারে স্বার্থপর, আনাড়ি ও স্বৈরাচারী। আমি নারীবাদী বিভিন্ন লেখিকার লেখা পড়ে বুঝেছি যে, তাঁরা মনে করেন পুরুষদের যৌনানুভূতি শিশ্ন-ভিত্তিক। নারীর মতো সমগ্র দেহ যৌন-সংবেদনশীল নয়। আর তাই অধিকাংশ পুরুষ বস্তুতঃ যৌনসঙ্গমে স্বল্পায়ু ও সদা পরাস্ত।

যৌনসঙ্গমে পুরুষের এই পরাজিত মানসিকতাই তাঁদেরকে কৃত্রিমভাবে যৌনতা-বিরোধী করে তোলে। মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় ডিফেন্স মেকানিজম। এটি পুরুষ-মানসিকতার একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব। তাই সে একই সাথে কামুক ও রক্ষণশীল। নারীর শরীর আবৃত করতে পুরুষের যতো দাবী, নারীর ততো নয়। কারণ, পুরুষ ভীত – একদিকে হারবার ভয় ও অন্যদিকে হারাবার ভয়।

পুরুষ নিজের দুর্বলতা ঢাকতে সমগ্র যৌনতাকেই ষ্টিগমাটাইজ করে ট্যাবু তৈরি করে। তাই, মা ও মেয়ে যতো সহজে প্রজননতা তথা যৌনতা নিয়ে আলোচনা করতে পারেন, পিতা ও পুত্র তা পারেন না।

পুরুষ শাসিত সমাজে সৃষ্ট বিধি-বিধান পুরুষের পক্ষে যাবে, এটিই স্বাভাবিক। প্রতিটি ধর্মের অবতার পুরুষ হওয়ার কারণে ধর্মের বিধি-বিধানও পুরুষের যৌন-হীনমন্যতা ঢাকতে তৎপর, যদিও কোনো কোনো অবতার এ-বিষয়ে উৎসাহী ও যত্নশীল ছিলেন বলে পুরুষের যৌনসুখ বৃদ্ধি-কল্পে কিছু-কিছু পরামর্শও দিয়ে গিয়েছেন।

আমি তো মনে করি, প্রতিটি মানুষের উচিত উপযুক্ত বয়সে যৌনসঙ্গম উপভোগ করা। প্রতিটি পরিপূর্ণ মানুষের উচিত যৌনসঙ্গমকে শিল্পের ও ক্রীড়ার নিপুনতায় রপ্ত করা। মানুষের উচিত তাঁর পাওয়া একটি মাত্র জীবনের সীমিত সময়ের মধ্যে যতোদিন পারে, ততোদিন যৌনসঙ্গমের মাধ্যমে দেহের সুখ অনুভব করা।

মানব জাতির এহেন সুখের বিষয়কে কারা কবে কালিমালিপ্ত করেছে, সেটি গবেষণার বিষয়। তবে, এই অঞ্চলে একসময়ে যৌনসঙ্গমের কলাকে যে শিক্ষণীয় মনে করা হতো, তার সম্ভাব্য উজ্জ্বলতম প্রমাণ মেলে উড়িষ্যার কোনার্ক সূর্যমন্দিরে। কোনার্ক সূর্যমন্দিরে নর-নারীর যৌনসঙ্গমের চমৎকার সমস্ত ভঙ্গির ভাষ্কর্য করা আছে। এ-সমস্ত ভঙ্গি অতি শিল্পময় ক্রীড়ানৈপুন্যমণ্ডিত।

যৌনসঙ্গম একটি মহান মানবিক কর্ম। এটি মানব সভ্যতার ধারক। সুখের উৎস। আনন্দের উৎস। পৃথিবীতে একমাত্র যৌনসঙ্গমই সাম্যবাদী সুখ, যা কোনো বাড়তি উপকরণ ছাড়াই স্বাভাবিক মানুষের অতিগুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় প্রবৃত্তি তৃপ্ত করতে পারে।

যৌনসঙ্গম সংজ্ঞানুসারে অস্বার্থপর। এটি খাদ্যের চেয়ে মহত্তর। খাদ্য একক-ভোগ্য, কিন্তু যৌনসঙ্গম যুগল-ভোগ্য। স্বাভাবিক যৌনসঙ্গম প্রকৃতিগভাবেই সহযোগিতামূলক এবং সৃষ্টিশীল। যৌনসঙ্গম যা সৃষ্টি করতে পারে, অন্য কোনো মানবিক ক্রিয়া তার চেয়ে মহান কিছু সৃষ্টি করতে পারে না। আমরা জানি, সেই সৃষ্টির নাম জীবন। মানব জাতির অস্তিত্বের জন্য এখনও পর্যন্ত যৌনসঙ্গম অপরিহার্য।

সুতরাং প্রতিটি উপযুক্ত মানব-মানবীর উচিত যৌনসঙ্গমকে উন্নত শিল্পবোধে ও সৌন্দর্যবোধে পরম উপভোগ্য রূপে তাঁর সঙ্গী বা সঙ্গিনীর সাথে আনন্দ ও সুখ সহভাগের উদ্দেশে যত্নের সাথে উপভোগ করা। বাঙালীর উচিত হবে যৌনসঙ্গমের ধারণা, আবেগ ও চর্চার ব্যাপারে হীনমন্যতা থেকে মুক্ত হওয়া।

লিখেছেন : মাসুদ রানা
শনিবার ১৮ অক্টোবর ২০১৪

নিউবারী পার্ক, এসেক্স, ইংল্যাণ্ড

সৌদী আরব হজের আত্মাটিকে ব্যবসাপণ্য করেছে

এক ব্যক্তি একবার হজ করার সংকল্পে তিল তিল করে অর্থ জমিয়েছিলেন। হজ্জে যাবার ঠিক আগে তার দেখা হয় এক অনাহারী পরিবারের সঙ্গে। উনি সঞ্চিত অর্থ এই পরিবারকে দিয়ে দে্ন। ভাগ্যে তার হজ করা নেই হয়তোবা এমন ভেবে সৃষ্টিকর্তার কাছে ক্ষমা চান। ঘটনাটির কথা শুনে আমাদের মহানবী মুহাম্মদ(সাঃ) বলেন, নিশ্চয়ই সৃষ্টিকর্তা ঐ মহৎ ব্যক্তির হজ কবুল করেছেন।

হজ ইসলাম ধর্মের পাঁচটি স্তম্ভের একটি। কিন্তু এই হজ পালনের পূর্ব শর্ত খুব কঠিন। হজে যাবার জন্য সৎ পথে উপার্জন করতে হয়; নিজের পারিবারিক দায় সমাপনান্তে এই হজব্রত পালন করতে হয়। এমনকি চোখের সামনে নিরন্ন মানুষের মিছিল দেখেও না দেখার ভান করে হজপালনে কেবল সৌদী আরব ঘুরে আসা হয়; হজ হয়না। যারা দুর্নীতির পয়সা হজ করেন; ট্যাক্স ফাঁকি দেয়া পয়সায় হজ করেন, সরকারের টাকায় হজ করেন, পবিত্র ধর্ম ইসলামকে ব্যবহার করে গজিয়ে ওঠা জামায়াতে ইসলামের পয়সায় হজ করেন, ধর্ম-ব্যবসার মুনাফার পয়সায় হজ করেন; সৃষ্টিকর্তা এসব হজ অবশ্যই কবুল করেননা। কারণ অধিকার বঞ্চিত মানুষের সম্পদ লুন্ঠন করে, তাদের জন্য বরাদ্দ হক মেরে হজ করার মধ্যে পবিত্র ধর্মের কোন সহযোগ নেই। আমাদের দেশ থেকে যারা হজে যান; অবশ্যই তারা সম্পদের অসম বন্টনের সুযোগ নিয়ে হজে যান।আর এরকম দরিদ্র দেশের সরকারেরও হজের জন্য অর্থ ব্যয় মানে গরীবের হক মেরে গজিয়ে ওঠা ভি আইপিদের হজে পাঠানোর অনৈতিক নাটক।

সৌদী আরবে আজকের যে হজপালন হয়; তা ইসলামের সাম্যবাদী সুষম সমাজের ধারণাকে অগ্রাহ্য করে। হজ পালন করতে গিয়ে কেউ থাকবেন গরম তাঁবুতে; কেউ থাকবেন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত তাঁবুতে; এমন কোন বিধান ইসলামে নেই। হজ পালন সবাইকে একই রকম কষ্টের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। সুতরাং দেখাই যাচ্ছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত তাঁবুর ব্যবস্থা করে সৌদী সরকার মানুষে মানুষে ভেদাভেদ করছে। একটি পবিত্র উপলক্ষের যে নির্মম ব্যবসায়ীকরণ করেছে সৌদী সরকার তা ইসলামের মূল আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

ব্যবসার তাগিদে মহানবী মুহাম্মদের (সাঃ) স্মৃতিধন্য স্থান গুঁড়িয়ে দিয়ে সেখানে সেভেন স্টার হোটেল বানানোর মত কাজ যে সৌদী আরবের কতৃপক্ষ করতে পারে; তারা পুরোপুরি ব্যবসায়ী মনষ্ক ও অসাধু। এরা ইসলাম ধর্মের সঙ্গে প্রকারান্তরে শত্রুতা করছে; যেটি আমরা সাধারণ মানুষ চ্যালেঞ্জ করছিনা।

বাংলাদেশের বর্ষীয়ান নেতা ও টাঙ্গাইলের সিদ্দিকী পরিবারের সদস্য লতিফ সিদ্দিকী বাংলাদেশের বাস্তবতায় হজে গিয়ে ৫০০ কোটি টাকা প্রতিবছর আমরা সৌদী সরকারকে দিয়ে আসতে পারি কীনা সে প্রশ্ন তুলেছেন। কারণ বাংলাদেশ একটি সামষ্টিক পরিবার। এই পরিবারের প্রায় অর্ধেক সংখ্যক মানুষকে দারিদ্র্যে বিশীর্ণ রেখে হজে গেলে সৃষ্টিকর্তা তা গ্রহণ করবেন না অবশ্যই।

লতিফ সিদ্দিকী একজন প্র্যাকটিসিং মুসলমান। ধর্মপালনের পাশাপাশি ধর্ম-দর্শন নিয়ে অনেক পড়াশুনা করেছেন। ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে উনার যে পড়াশুনা আছে; আজ আমরা যারা তাকে মুরতাদ বলে গালি দিচ্ছি তাদের সে পড়াশুনা নেই। লতিফ সিদ্দিকীর পরিবারটি ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর সিদ্দিকী(রাঃ) এর পরিবারেরই উত্তরসূরী (লিনিয়েজ)। এই পরিবারের মেয়ে বিবি আয়েশা (রাঃ) যেহেতু আমাদের মহানবীর স্ত্রী ছিলেন; সিদ্দিকী পরিবারটি আমাদের নবীজীর আত্মীয়।

আর হজের শুরুর দিকটিতে এর আয়োজনেও অনেক অবদান আছে এই সিদ্দিকী পরিবারের। সিদ্দিকী বংশের উত্তরসূরী হিসেবে তাদের প্রচলিত সাম্যবাদী হজের সঙ্গে আজকের শ্রেণীবিভাগ করা ব্যবসামুখী হজের প্রসারে খুবই আহত বোধ করেছেন লতিফ সিদ্দিকী।

আমরা তপশীলি সম্প্রদায়ের লোক; শ্রেণী বৈষম্যের কারণেই মূলতঃ আমরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছি। সেইখানে হজের শ্রেণী বৈষম্য নিয়ে আমাদেরই প্রথম প্রতিবাদ করার কথা। কিন্তু যেহেতু আমাদেরই ভাইবোনেরা সৌদী আরবে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করে; তার চুরির অপরাধে আমার গরীব শ্রমিক ভাইয়ের শিরশ্ছেদ করে; আমাদের সাহস নেই মনিবের বিরুদ্ধে দুটো কথা বলার। আমরা দলিত হিসেবে জন্মেছি; দলিত হয়েই মরবো; এতে দোষের কিছু নেই।

কিন্তু যে সিদ্দিকী পরিবার ইসলামের গোড়াপত্তনে আমাদের মহানবীর পাশে ছিলেন; সেই পরিবারের লিনিয়েজের সদস্যের তো মানসিক দুর্বলতা থাকবে না সৌদী আরবের আজকের ব্যবসা মনষ্কতাকে চ্যালেঞ্জ করতে। কারণ আজ যে শেখ বংশ মক্কা-মদিনার ব্যবসা খুলেছে; এরা তো শিক্ষিত নয়; সিদ্দিকীদের মতো শ্রমে ও ঘামে গড়ে তুলেনি ইসলামের স্তম্ভগুলোকে। এরা মরুভূমির দস্যু ছিল; পরে ভাগ্য চক্রে বাজবংশ খুলে বসে। ইসলামে কোন রাজবংশের অনুমোদন নেই। এই অনৈসলামিক শেখ রাজবংশ সৌদী আরবের নিরাপত্তার কাজ এমেরিকা ও ইজরায়েলী সেনাদের হাতে দিয়ে নিজেরা পেট্রোলিয়াম ব্যবসার মুনাফা লুটছে। শেখ বংশের যুবরাজরা প্রায়ই পশ্চিমে অনৈসলামিক কাজে ধরা পড়লে ডিপ্লোম্যাটিক ইমিউনিটি দিয়ে তাদের ছাড়িয়ে আনা হয়। আর আমাদের গরীব বাংলাদেশী ভাইয়ের কগাছা তার চুরিকে অনৈসলামিক বলে তার শিরশ্ছেদ করছে।

আর আজ যেসব লোক সৌদী আরবের পয়সায় বাংলাদেশে ব্যবসা বানিজ্য করে খাচ্ছে এরাও গোবরে পদ্মফুল ইসলাম সম্পর্কে বেশী কিছু জানে না। টোকাই থেকে অনেকে মন্ত্রীও হয়েছে। আর যে হুজুরেরা ইসলামের অনুভূতির ঠিকাদারী করছে; এদের বেশীর ভাগই আমাদের তপশীলি সমাজ থেকে আসা নও মুসলিম। যারা সৌদী আরবে ভিক্ষুক বা বেকার ছিল; তাদের অনেককে বিন কাসেমের জাহাজে করে ভারতবর্ষে পাঠানো হয়েছিল কর্ম সংস্থানের জন্য। এরাই নিজেদের শাহ সূফী এই সেই নাম চড়িয়ে আজ ইসলামের ঠিকাদার হয়েছে। তারা মক্কা-মদিনার একদা ভিক্ষুক বংশের ছেলে আজ তাদের তপশিলী থেকে নও মুসলিম মব দিয়ে মিছিল করিয়ে মহানবীর অতিপ্রিয় সিদ্দিকী পরিবারের (লিনিয়েজ) একজন সদস্যের মুন্ডু চাইছে। বাঘের গাল ছাগলে চাটার এমন উদাহরণ সহসা চোখে পড়ে না।

(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামতের জন্য কর্তৃপক্ষ দায়ী নহে )

সৌজন্যে : প্রিয়.কম

Maskwaith.Ahsan's picture

Maskwaith.Ahsan

ধর্ম বনাম উৎসব: ফরহাদ মাজহার

‘কোরবানি’ একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান, এটা সেকুলার অর্থে ধর্মভাবহীন কোনো ‘উৎসব’ নয়। ধর্মীয় অনুষ্ঠান বলার অর্থ হচ্ছে, আনুষ্ঠানিকতা ও বৈষয়িকতা এর বাহ্যিক বা বাইরের দিক; প্রধান উদ্দেশ্য আত্মিক বা আধ্যাত্মিক উদবোধন বা বোধন। এই উদযাপনকে নানা দিক থেকে ব্যাখ্যা করা যায়। নৃতত্ত্ববিদরা যা অনেক সময় করে থাকেন। সে যাই হোক, সেকুলার যুগে আত্মা, আত্মিকতা, আধ্যাত্মিকতা ইত্যাদি নিয়ে কথা বলা দার্শনিকদের জন্য বিশাল এক মুসিবতের কারণ হয়ে পড়ে। মুশকিলটা সেকুলার ও ধার্মিক দুই দিক থেকেই আসে। সেকুলাররা ধর্ম নিয়ে যখন কথা বলেন, তখন তার ভাবগত দিকের গুরুত্ব মানেন না, আর ধার্মিকরা ধর্মের দার্শনিক আলোচনাকে ঈমান আকিদার দিক থেকে বাড়তি আপদ গণ্য করেন। ধর্ম পালনই ধর্ম। ধর্মের অন্তর্গত চিন্তার ব্যাখ্যা অনেক সময় বদ্ধমূল মত ও প্রথাকে ধর্মের ভেতর থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। ধর্মতত্ত্ববিদদের জন্য তা অস্বস্তির কারণ ঘটাতে পারে।

সেকুলার যুগে ধর্মকে বৈষয়িকতা থেকে কিংবা বৈষয়িকতাকে ধর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন জ্ঞান করে কথা বলা হয়। ধর্ম আমরা ইহলোকেই পালন করি, যদিও এটা ধরে নেয়া হয় যে, ধর্ম একান্তই একটি পারলৌকিক ব্যাপার। ইহলৌকিক চর্চা হিসেবে যে কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিকতা ও বৈষয়িকতা রয়েছে। কোরবানির একটা আনুষ্ঠানিকতা আছে, আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধানের জন্য প্রাণীকে উৎসর্গ করার ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক বিধিবিধান। তেমনি পশুরও বৈষয়িকতা আছে। গরু, ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা কেউই কাল্পনিক বস্তু নয়। ইহলোকেই তাদের সংগ্রহ ও নির্বাচন করতে হয়। পশুর অর্থনীতি আছে। আর বাংলাদেশে আমরা জানি, এর সঙ্গে গভীর আন্তঃদেশীয় বাণিজ্য ও জটিল রাষ্ট্রীয় সম্পর্কও রয়েছে। প্রচুর গরু ভারত থেকে আসে। বলা হয়, ভারতীয়রা ধর্মীয় কারণে গরু বধ করে না বলে গরুসকল চালান হয়ে বাংলাদেশে আসে। আর এখানে তারা কোরবানিতে জবাই হয়ে মুসলমানের ধর্ম পালনের উপায় হয়। হিন্দুর গরু সীমান্ত অতিক্রম করে মুসলমানের কোরবানির পশুতে পরিণত হয়। এই বাণিজ্যের বিরুদ্ধে ভারতীয় হিন্দু ভয়ংকরভাবে প্রতিবাদী হয়েছেন বা আপত্তি করেছেন বলে শুনিনি বা জানি না; কিংবা হিন্দুর গরু বলে মুসলমান তাকে জবাই করবে না, এমন ফতোয়া কেউ বাংলাদেশে দিয়েছেন বলে জানি না। ধর্মের আনুষ্ঠানিকতা বা বৈষয়িকতাকে তাহলে বাজার ব্যবস্থার বাইরে এ যুগে বিচার করা অর্থহীন।

অন্যদিকে বৈষয়িকতার সঙ্গে আমাদের দৈনন্দিন সম্পর্কের কোনো আধ্যাত্মিক চরিত্র নাই- এটাও ভুয়া দাবি। ওপরে ধর্মের আনুষ্ঠানিকতা ও বৈষয়িকতার দিকটা আমরা যত সহজে বোঝাতে পেরেছি, বস্তু জগৎ বা ইহলৌকিক জগতের সঙ্গে মানুষ মাত্রেরই সম্পর্ক ‘আধ্যাত্মিক’ এই দিকটা বোঝানো তুলনামূলকভাবে কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয় মোটেও। এতটুকু যদি বুঝি যে জগতের সঙ্গে আমি কীভাবে সম্পর্কিত হব, সেটা পূর্বনির্ধারিত কিছু নয়, সেটা আমার মন বা আত্মারও ব্যাপার, তাহলে আমার আত্মা বা মন যা নির্ণয় করে, তাকে নিছক আনুষ্ঠানিক বা বৈষয়িক জ্ঞান করার কোনো যুক্তি নাই। সেটা আত্মাবিষয়ক বা আধ্যাত্মিক ব্যাপারও বটে। হতে পারে সেটা প্রথাগত, প্রাচীন বা প্রচলিত ধর্ম নির্ধারণ করে দিচ্ছে না। কিন্তু সেটা আধ্যাত্মিক নয় এই দাবিও ভুল।

একটা উদাহরণ দিচ্ছি। জগৎ মানুষের সামনে শুধু ভোগের জন্য হাজির, আর মানুষ মাত্রই খাদক- এই দাবি কোনো সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়, আধ্যাত্মিক অনুমান বা বিশ্বাস মাত্র। কিন্তু আধুনিক বা সেকুলার সমাজের ভিত্তিটাই এই অনুমান বা বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। পাশ্চাত্যের ‘স্পিরিট’ বা ‘স্পিরিচুয়াল’ কথাটার অনুবাদ আমরা করি আধ্যাত্মিক- এই অনুবাদ সংকীর্ণ; এতে মনে হয় ‘স্পিরিট’ নিয়ে কথা বলার মানে ধর্মতাত্ত্বিক বিষয় নিয়ে কথা বলা; ধর্মের সঙ্গে বস্তুজগতের বিশেষ সম্পর্ক নাই। অতএব ইহলৌকিক প্রসঙ্গ স্পিরিচুয়াল বা আধ্যাত্মিক আলোচনায় পরিত্যাজ্য। তারা ভিন্ন বিষয়।

অথচ পাশ্চাত্য দর্শনে ‘স্পিরিট’ বা ‘স্পিরিচুয়াল’ কথাটার মানে স্রেফ ধর্মতাত্ত্বিক অর্থে স্পিরিচুয়াল কিছু নয়। ইহলৌকিকতার মধ্যে মানুষের মন নিজেকে ও জগৎকে কীভাবে জানে, কীভাবে সম্পর্কিত হয়, কীভাবে ধর্ম, সংস্কৃতি, নৈতিকতা, রাষ্ট্র ইত্যাদি গড়ে তোলে সেই অর্থে স্পিরিটের কারবারের কথা বলা হয়। এর ভালো একটি উদাহরণ হচ্ছে কার্ল মার্কসের গুরু হেগেল। তার ‘ফেনোমেনলজি অফ দ্য স্পিরিট’ কোনো আধ্যাত্মিকতা বিষয়ক বই নয়। মানুষের জ্ঞানস্পৃহা, ইচ্ছা, নৈতিকতা ও সংকল্প কীভাবে নিজের স্বভাবগুণে বিকশিত হয় সেটাই তিনি এ বইয়ে দেখাতে চেষ্টা করেছেন। দেখা যাচ্ছে স্পিরিট বা স্পিরিচুয়াল কথাগুলোর পরিভাষা নির্মাণের ক্ষেত্রে আমরা যেভাবে ‘আত্মা’, ‘আধ্যাত্মিকতা’ ইত্যাদি অনুবাদ গ্রহণ করি এবং আমাদের চিন্তার ব্যাকরণে নিত্য নির্বিচারে ব্যবহার করছি, তার ফলে ধর্ম, সমাজ ও ইতিহাস নিয়ে পরিচ্ছন্ন আলোচনা-পর্যালোচনা বেশ কঠিন ব্যাপার হয়ে উঠেছে। এখানে পত্রিকার কলামে এই গুরুত্বপূর্ণ অথচ জটিল বিষয় অল্পকথায় বুঝিয়ে বলা কঠিন। তবে আশা করি বোঝা কঠিন নয় যে, জগৎ বা প্রকৃতি মানুষের ভোগ বা খাদ্য হওয়ার জন্য সৃষ্টি হয়েছে আর মানুষ মানেই ভোগী ও খাদক এটা একান্তই একটি আধ্যাত্মিক বিশ্বাস ও অনুমান। একে মেনে নেয়া নিজেকে আধ্যাত্মিক জগতে নিক্ষিপ্ত করে রাখার মতোই ব্যাপার। জগৎ মায়া কিংবা পরকালই শুধু সত্য, ইহলোক মিথ্যা- এই দাবি ঠিক যে অর্থে আধ্যাত্মিক, ঠিক একইভাবে মানুষের পরমার্থ তার ভোগী জীবনে- জগতের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক শুধু খাদ্য/খাদকের সম্পর্ক এই অনুমানও সমান আধ্যাত্মিক।

দুই
কোরবানি নিয়ে ভাবতে গিয়ে সেকুলার যুগে আত্মা, আধ্যাত্মিকতা, আধ্যাত্মিকতা ইতাদি নিয়ে কথা বলা দার্শনিকদের জন্য বিশাল এক মুসিবত- এটা সূচনাতেই মেনে নিতে হচ্ছে। বলার বাস্তবিক কারণ রয়েছে। কোরবানির বিরুদ্ধে বেশ কয়েক বছর ধরে অনেকের কাছ থেকে আপত্তি শুনি। এদের সবাই ধর্মবিরোধী বা সেকুলার নন মোটেও। বরং যেভাবে কোরবানিকে তার ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক তাৎপর্য থেকে বিচ্যুত করে একে নিছকই পশু জবাই করার ব্যাপারে পরিণত করা হচ্ছে, তাতে তারা উদ্বিগ্ন। আর একে নজির হিসেবে গণ্য করে ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে যে নেতিবাচক প্রচারণা বিশ্বব্যাপী চালানো হয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের এই কালে, তা রাজনৈতিক দিক থেকে বিপজ্জনক। ফলে একে উপেক্ষা করা কঠিন।

তাহলে এই উদ্বিগ্নতা বা উৎকণ্ঠা নিরসন করতে হলে কোরবানির আধাত্মিক তাৎপর্য কী- এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার দরকার আছে। এখানে সেই তাৎপর্যের হদিস দেয়া আমার উদ্দেশ্য নয়। যারা ধর্মবিদ এবং এসব বিষয়ে কথা বলার অধিকারী, তারা সেটা নিশ্চয় করবেন। এবং করছেনও। ধর্মতত্ত্বের দিক থেকে হজরত ইব্রাহীম (আ.) নিঃশর্তে আল্লাহর আদেশ মানছেন। তাঁর নিজের ইচ্ছা, ভালোবাসা, মমতা, পারিবারিক সম্পর্ক ও রক্তের বন্ধন সব আল্লাহর প্রতি তাঁর আনুগত্যের তুলনায় তুচ্ছ। সবকিছুর ঊর্ধ্বে আল্লাহর আদেশ- এই সত্য প্রতিষ্ঠা করার মধ্য দিয়ে তিনি যেমন ইসলামে অপরিসীম গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে নিয়েছেন, তেমনি ইসলাম এই সত্যকে জারি রাখার জন্য প্রিয় সন্তানকে আল্লাহর হুকুমে কোরবানি দেয়ার মুহূর্তটি বারবার মনে করিয়ে দিতে আগ্রহী। মনে করিয়ে দেয়ার মানে এটা নয় যে, প্রতিটি পরিবারকে একটি করে পশু কোরবানি দিতে হবে। এমনকি কোরবানি ওয়াজিব নাকি সুন্নত এই তর্কও তো বিভিন্ন মাজহাবের মধ্যে রয়েছে। বলা হয় আখেরি নবী বনি হাশেম গোত্রের জন্য একটি মাত্র দুম্বা কোরবানি দিতেন।

কিন্তু সেসব ভিন্ন তর্ক। ইসলামের কাছে মূল প্রশ্ন হচ্ছে, আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য। কিন্তু সেটা পরীক্ষা মাত্র। কারণ হজরত ইব্রাহীম (আ.) ইসমাইলকে কোরবানি দেননি। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ায় তাঁরই আদেশে একটি দুম্বা কোরবানি করেছেন।

মূল কথা হচ্ছে, কোরবানি মাংস খাওয়ার ‘উৎসব’ নয়, এটা ধর্মীয় অনুষ্ঠান। তাহলে যে কাজ ধর্মভাবের স্ফুরণ ঘটায় না, কিন্তু ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে নিছকই ‘উৎসব’ জ্ঞান করে পশু বধে পর্যবসিত হয়, সেটা যে কোনো ধর্মপ্রাণ মানুষকে ব্যথিত করে, সন্দেহ নাই। এটা তো মিথ্যা নয়, ভোগীর কাছে কোরবানি আসলে মাংস খাওয়ার উৎসবের অধিক কিছু নয়। কোরবানির মাংস বিলিয়ে না দিয়ে যেভাবে ফ্রিজে ফ্রিজে দীর্ঘ সময় রাখা হয়- নিজের ভোগের জন্য- তাকে ‘ধর্মীয়’ ভাবা খুবই কঠিন বৈকি। এতে ফ্রিজ কোম্পানির ব্যবসাও বেড়েছে। ধর্মীয় অনুষ্ঠান কেন নিছক উৎসবে পর্যবসিত হল, তার কারণ অর্থনীতি ও সমাজের রূপান্তর। বাজার থেকে পশু কিনে এনে তাকে ‘প্রিয় বস্তু’ হিসেবে কোরবানি দেয়ার মধ্যে ধর্মের মহিমা কতটুকু কায়েম হয়, সেটা ধর্মতাত্ত্বিকরা ভালো বুঝবেন। আমি এ বিষয়ে আলোচনার অধিকারী নই, তবে বুঝতে পারি বাজার ব্যবস্থা ধর্মের যে রূপান্তর ঘটিয়েছে ও ঘটাচ্ছে, ধর্মতত্ত্ব তাকে প্রতিরোধ করার সামর্থ্য বিশেষ রাখে না। উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার কারণ এখানেই।

ধর্মের তাহলে সমাজতত্ত্ব আছে। তার অর্থনীতিও আছে। ঈমান আকিদার দিক ধর্ম পালন আর সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও দর্শনের জায়গা থেকে ধর্মের বিচার আলাদা। কোনো ধর্মকেই বিচ্ছিন্নভাবে পাঠ করা যায় না। বোঝাও যায় না। যে ঐতিহাসিক বাস্তবতায় ইসলামে কোরবানির প্রচলন হয়েছে, তাকেও বাস্তব ইতিহাস হিসেবে বোঝার দরকার আছে। বোঝার দরকার আছে সব দিক থেকেই।

বাংলাদেশে সেই হিম্মত গড়ে উঠুক। এই ঈদে সেই প্রত্যাশা জানিয়ে সবাইকে শুভেচ্ছা।

(এই পোষ্টটি দৈনিক যুগান্তরে প্রথম প্রকাশিত হয়েছে)

শিশুরা যখন অবলোকনকামী বিনোদনের জকি

ফারুক ওয়াসিফ : রাষ্ট্রের পতন হয় সশব্দে, কিন্তু নীতি-নৈতিকতার মৃত্যু ঘটে নীরবে, দিনে দিনে। আমাদের সমাজে নীতির মৃত্যু এ রকম নিঃশব্দেই হচ্ছে। টেলিভিশনের কিছু কিছু অনুষ্ঠানে তার আভাস মিলছে। মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের শিশুদের উটের দৌড়ের জকি করা নিয়ে দুনিয়াজুড়ে অনেক কথা হয়েছে। টেলিভিশনের মাধ্যমে শিশুদের বিনোদনের জকি করা নিয়ে সরব হওয়া এখনকার জরুরত।

 

এসব অনুষ্ঠান দেখার প্রভাবে অনেক শিশুর মধ্যে অল্প বয়সে যৌনতার বোধ জন্মায়। এসব শিশু সহজেই বিচ্যুত হয়, তাদের জীবন আর সহজ থাকে না। মা-বাবাদের এসব ভাবা উচিত, কারণ এসব নিয়ে তাঁদের উদাসীনতা কিংবা সম্মতির অধিকারটি বৈধ নয়। শিশুরা তাঁদের সম্পত্তি নয়, তারা সমাজেরও অংশ, ভবিষ্যতের পথিক। অর্থ, খ্যাতি, সম্মান শিশুর প্রয়োজন নয়, তা বড়দের প্রয়োজন। শিশুদের দরকার নির্মল আনন্দ, খেলাপ্রিয়তা ও জানার-মেশার উচ্ছ্বাস। তাদের বড় করে দিলে চলবে না, বড় হতে দিতে হবে।

 

ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের নিন্দা হয়, শিশু ও তাদের প্রতি বড়দের কোমল আবেগের বাণিজ্যিক ব্যবহারও অপরাধ। দেশি চ্যানেলগুলো এই পথে নবীন বলে রয়েসয়ে দেখায়। কিন্তু ভারতের হিন্দি চ্যানেলগুলো যে রকম তুখোড় দক্ষতা অর্জন করেছে, তাতে ভাষা ও সীমানা পেরিয়ে তার ডাক আমাদের ঘরে ঘরে সচিত্র বাজছে। সাম্রাজ্য কেবল ভয় বা লোভ দেখিয়েই তার আধিপত্য ছড়ায় না, আনন্দের পিচ্ছিল পথেও তা ভিন্নতাকে গলিয়ে তরল করে। তারই প্রমাণ বাংলাদেশেও হিন্দি সিরিয়ালের পাশাপাশি শিশুদের নাচ-গানের প্রতিযোগিতার তথা রিয়েলিটি শো’র বিপুল জনপ্রিয়তায়। উন্নত প্রযুক্তি আর পুঁজির জোরে এসব চ্যানেলই এখন উপমহাদেশের জনসংস্কৃতিকে প্রভাবিত করছে। অন্যরা বাধ্য হচ্ছে তাদের অনুকরণ করতে। দৃশ্য বা ইমেজের ক্ষমতা এতই সর্বজনীন যে, ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির ঘের তা অনায়াসেই ভেঙে ফেলছে।

 

বিজ্ঞাপনে শিশু বিনোদনেও শিশু। মনের নাম মহাশয় যা সওয়াও তা-ই সয়। শিশু ও শৈশবের বাণিজ্যিক ব্যবহার হয়তো অনেকেরই চোখ সয়ে গেছে, বিনোদনে ব্যবহারও হয়তো সয়ে যাচ্ছে। যেকোনো চ্যানেলে ১০টি বিজ্ঞাপনের কমপক্ষে সাতটিতেই তারা। তারা গাড়ি-বাড়ি, টিভি-ফ্রিজ, পানীয়, সাবান, হরলিকস মায় বালতি বা ঢেউটিনের গুণগান করে! শিশুদের স্বার্থবোধ তেমন থাকে না। তাই তাদের সরল ও সুন্দর জবানে ও অভিনয়ে পণ্যের সুখ্যাতি দেখে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে, ব্যবসা সত্য না, মুনাফা সত্য না, পণ্যমুগ্ধ শৈশবই সত্য। অভিভাবকেরা অর্থ পাচ্ছেন, শিশুটিও স্টার হচ্ছে। আর ঘরের শিশুরা ভাবছে, ওই শিশুটির মতো আমারও খ্যাতি দরকার, টাকা দরকার। আর দরকার ওই সব বিজ্ঞাপিত পণ্য। মা-বাবারা তাদের আবদারে হার মানেন, বাজারে ছোটেন। শিশুরাও হয়ে যায় ওই সব পণ্যের স্থায়ী ক্রেতা। পণ্যায়িত সমাজে একটি নতুন শিশুর জন্ম তাই একজন সম্ভাব্য ক্রেতারও জন্ম। এ যুগে মিডিয়াই এখন আমাদের চোখ-কান-মন। মায়ের ছেলে বা বাবার মেয়েটি ঘরে শেখে, স্কুলে শেখে, টিভি দেখেও শেখে। কিন্তু কী শেখে আসলে?

 

ওই সব অনুষ্ঠান আমাদের শৈশবের নতুন কুঁড়ির নাচ-গান নয়। ধুমধাড়াক্কা হিন্দি ছবির চটুল গানের সঙ্গে ততোধিক হট নাচ। দূর থেকে দেখলে মনে হবে বুঝি বলিউডি তারকারাই মঞ্চ কাঁপাচ্ছে, দর্শকের মনে ঢেউ তুলছে। সেই পোশাক, সেই বিশেষ ভঙ্গি, সে রকম শরীর চঞ্চল করা কথা ও সুর। একটি তিন-চার বছর বয়সী বালিকা অসম্ভব কসরত করে যে নাচটি করে, ফিল্মের দৃশ্যে তা করেছিল স্বল্পবসনা কোনো হার্ট থ্রব নায়িকা। নাক টিপলে দুধ বেরোবে, এমন বয়সী বালক ‘চুম্মা চুম্মা দে দো’ গানের সঙ্গে নাচা কি নিরীহ বিনোদন? দুটি বালক-বালিকাকে প্রেমঘন গানে নাচানো কি সভ্যতা? বহুদিনের বহু অনুশীলনে তারা এসব শিখেছে। আর আমরা চোখ ভরে দেখে মন ভরে মজে যাচ্ছি। বিনোদনের ছাপ্পা মারা চোখে দেখায় বিব্রত হচ্ছে না,আর আনন্দ আমাদের বিবেককে করে দিচ্ছে অবশ।

 

ভারতের প্রায় প্রতিটি হিন্দি-বাংলা চ্যানেলে এ রকম একটি অনুষ্ঠান সারা বছর চলে। ইদানীং দেশি চ্যানেলগুলোও সেই ধারায় চলা শুরু করেছে। একটি চ্যানেল বছরখানেক আগে এ রকম একটি নাচের প্রতিযোগিতা চালায় এবং সম্প্রচারও করে। স্কুলভিত্তিক প্রতিযোগিতাও হয়। অনেক শিক্ষক মেনে নেন, অনেক অভিভাবকেরা খুশি হন। বলাবাহুল্য, নাচগুলো শিশুসুলভ ছিল না। প্রাপ্তবয়স্কদের বিনোদন নিয়ে প্রশ্ন থাক, শিশুদের ওপর তা চাপিয়ে তাদের মানসিক-দূষণ কেন আমরা সইব? এ উৎপাত প্রথম দেখা যায় মার্কিন মুলুকে। সেখান থেকে আসে ভারতে, এখন বাংলাদেশেও তা রমরমা। গল্পের হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা জাদুর বাঁশি বাজিয়ে শিশুদের চুরি করে নিয়ে গিয়েছিল, আর আজ শিশুদের শৈশবিক কোমলতা চুরি হচ্ছে বড়দের বেহুঁশ বিনোদনের খায়েশে। আজকের হ্যামিলনের বাঁশি বাজাচ্ছে জাদুর বাক্স টেলিভিশন। বোকা বাক্সটি এখন আর বোকা নেই।

 

এভাবে শিশুদের একাধারে ‘খুদে প্রাপ্তবয়স্ক’ বানানো হয়, অন্যদিকে তারা হয় বড়দের ‘আনন্দের পুতুল’। অমিতাভ বচ্চন অভিনীত পা ছবিতে ছোট্ট একটি শিশুর প্রোজোরিয়া নামের দুরারোগ্য রোগে বুড়িয়ে যাওয়ার বেদনা ও জটিলতায় দর্শক কাঁদে। আর এসব বিনোদনের ছলে ছোট মনে বড়র ভাব সংক্রমণের রোগটিকে কী বলব? বললে ‘সেক্সুয়ালাইজেশন অব চাইল্ডহুড’ বা ‘শৈশবের যৌনকরণ’ই বলতে হয়। সংস্কৃতির তি এক প্রজন্মে শেষ হয় না। বহু প্রজন্ম ধরে তার জের চলে।

 

ভারতে এর প্রতিবাদ হচ্ছে। সেখানকার মানবাধিকার কমিশন ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের এ ধরনের প্রতিযোগিতায় না টানতে বলেছে। অস্ট্রেলীয় সরকার তাদের দেশে গণমাধ্যমে শিশুদের যৌনসামগ্রী করে তোলার বিরুদ্ধে নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। তাতে বলা হয়, শিশুদের এমনভাবে দেখানো উচিত নয়, যাতে অন্য শিশুরা ভুল বোঝে বা এ ধরনের যৌনাত্মক আচরণকেই স্বাভাবিক ভাবতে শেখে। বয়স হওয়ার আগেই তাদের বোঝানো হয় কোনটা আকর্ষণীয়, কোনটা সেক্সি, নারী কী, পুরুষ কী, রোমান্টিকতা কী, প্রেম কী, দেহের আকর্ষণ কী। তারা ভাবে, এসবের গুণেই বুঝি জীবনে সুখ ও সফলতা আসবে। মনে রাখা দরকার, মানুষের ব্যক্তিত্ব, রুচি শৈশবেই গড়ে ওঠে। বাকি জীবনে তার ছাপ পড়ে। এসব মাধ্যমের মনোসাংষ্কৃতিক কর্মসূচি আসলে কনজিউমারিস্ট ভোগী নাগরিক তৈরির প্রিএম্পটিভ কর্মসূচি; শিশুরা তার ল্য। আর শিশুদের দখল করা মানে আগামির সমাজকে প্রভাবিত করা। আজকের সামান্য বিনোদন ভবিষ্যতের মানুষকে অনেকভাবে বদলে দিতে পারে সেই হুশ আজ খবই প্রয়োজন।

অর্থ, খ্যাতি, সম্মান শিশুর প্রয়োজন নয়, তা বড়দের প্রয়োজন। শিশুরা তারই খোরাক। দেখার বিষয় হচ্ছে, যৌনায়িত কনজিউমারিজম শিশুদের মধ্যে প্রাপ্তবয়স্কের অনুভূতি ও চাহিদা তৈরি করতে চায়, আবার তরুণ-যুবাদের মধ্যে দেখতে চায় শিশুসুলভ আদিখ্যেতা, একদিকে তীব্র আÍপরতা অন্যদিকে জীবনজগত নিয়ে অসচেতনতা, প্লেফুলনেস, মজা আর ইলেকট্রনিক গেজেটের পুতুলবিলাস আর নিজেকে সাজাবার বালখিল্য। এরা যেন কোনোদিন বড় হবে না_ অন্তত বিজ্ঞাপনের ভাষা তাই-ই বলে।

 

ইন্ডিয়ান আইডল থেকে শুরু করে ছোটে ওস্তাদের মতো রিয়েলিটি শো’র নির্মাতারা চান প্রতিযোগিতার উত্তেজনা ও আনন্দ-বেদনা টিভির সামনে বসা শিশু ও তাদের অভিভাবকরাও পাক। কিন্তু বিষয়টা অত সরল নয়। প্রতিযোগিতার নামে যে বিধ্বংসী জিগীষা তাদের মধ্যে জাগানো হয়, যে অনিশ্চয়তার চাপ তাদের স্নায়ুতে ফেলা হয় তাতে যে কারো মন-মস্তিষ্কে স্থায়ী প্রভাব পড়ে যেতে পারে। শিশুদের অভিভাবক ও দর্শকদের মনের ওপর প্রভাবও হিসেব করতে হবে। কোটি কোটি মানুষের দৃষ্টির সামনে দাঁড়িয়ে পারফর্ম করায় বয়স্কদেরই ভিরমি খাবার যোগাড়, সেখানে শিশুদের জীবন-মরণ প্রতিযোগিতায় ঠেলে দেওয়ার মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব বিপর্যয়কর। অনুষ্ঠান নির্মাতারা চান, প্রতিযোগিতার উত্তেজনা ও আনন্দ-বেদনার শামিল টিভির সামনে বসা শিশু ও তাদের অভিভাবকেরাও হোন। এর জন্য তাঁরা স্ক্রিপ্ট তৈরি করে বিচারকদের-উপস্থাপকদেরও খেলান। বিচারকেরা এমনভাবে শিশুদের অতি প্রশংসা বা চরম নিন্দা করেন, যাতে ছেলেমেয়েদের আবেগের চরম প্রকাশ ঘটে এবং দর্শক তা দেখতে পায়। আবার উপস্থাপকদের করা হয় তাদের কাছের লোক। এই দুইয়ের দোলাচল শিশুর মনটাকেও আশা-নিরাশার দোলায় পেন্ডুলামের মতো দোলায়। দোল বেড়ে গেলে তা প্রতিযোগীদের মনের ওপর চাপ ফেলে। পরাজিত শিশুর কান্নার ঢেউ তার বাবা-মাকেও ধসিয়ে দেয়। বিষয়টার মধ্যে তখন সত্যির রসায়ন আরো গাঢ় হয়। এটাই নাকি নির্মাতাদের সাফল্য ও জনপ্রিয়তার শর্ত। কিন্তু এ রকম মানসিক চাপে অনেকের মন ভেঙে যায়। কোটি কোটি মানুষের দৃষ্টির সামনে বয়স্করাই ভিরমি খান। সেখানে শিশুদের এমন হাড্ডাহাড্ডি প্রতিযোগিতা আর স্নায়ুর ওপর চাপ সৃষ্টি করা বিচারের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব বিপর্যয়কর।

 

পশ্চিমবঙ্গের একটি চ্যানেলে ১৬ বছর বয়সী শিঞ্জিনী সেনগুপ্তকে বিচারকেরা কঠোর সমালোচনা করেন। কোটি দর্শকের চোখের সামনে শিঞ্জিনী অপমান গিলে প্রাণপণে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে। কিন্তু পারে না। তার হাসিখুশি মুখ কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বেদনায় কুঁচকে যায়, চোখ দিয়ে অঝোরে ঝরতে থাকে অশ্রু। বাড়ি ফেরার পর তার রহস্যজনক পাঘাত হয়, কথা বলা ও নড়াচড়া বন্ধ হয়ে যায়। মা-বাবাকে চিনতেও ব্যর্থ হয়। অনেক চিকিতসার পরও শিঞ্জিনীর মধ্যে ভয়ের লক্ষণ কাটেনি। একই রকম পরিস্থিতিতে মুম্বাইয়ের স্টুডিওতে এক কিশোরী আত্মহত্যার চেষ্টা চালায়। এ রকম ঘটনা অজস্র। আলোর নিচের এই অন্ধকার আর নিষ্ঠুরতার কথা দর্শকেরা জানে না। তাঁরা শুধু আনন্দ পেতে চান এবং ভুলিয়েভালিয়ে তাঁদের সেটাই দেওয়া হয়। জাদুর বাক্স এভাবে বড়দের বানিয়ে ফেলে আনন্দপিপাসু অবোধ শিশু।

 

এভাবে চলতে পারে না। ঢাকা-চট্টগ্রামসহ নিমশহরের নিম মধ্যবিত্তদের কাছে এখন খ্যাতি ও অর্থ সমার্থক। তার জন্য শিশুদের ব্যবহার যে নৈতিকতায় বাধা হওয়ার কথা, পুরনো সেই নৈতিকতা বিশ্বায়িত মার্কিন সংস্কৃতির তোড়ে ভেসে গেছে। দেশিই হোক আর বিদেশিই হোক, আমাদের শিশুদের এসবের আছর থেকে বাঁচাতে হবে। সরকার, অভিভাবক সমাজ, শিশু মনস্তত্ত্ববিদসহ সবারই সরব হওয়া দরকার। শিশুদের নৈতিক, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখার স্বার্থে মুদ্রণমাধ্যম ও দৃশ্যমাধ্যমে প্রচারিত যেকোনো বিজ্ঞাপন বা অনুষ্ঠানে শিশুদের উপস্থাপন বিষয়ে কার্যকর নীতিমালা থাকতে হবে। সরকার শিশুনীতি নিয়ে কাজ করছে। গণমাধ্যম নিয়েও নীতিমালা হচ্ছে। রাজনীতিতে শিশুদের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হলেও এ বিষয়ে স্পষ্ট করে কথা নেই। আমরা অবিলম্বে এ বিষয়ে স্পষ্ট বিধিমালা চাই। তার তদারকি ও নজরদারির জন্য আলাদা সেলও করে দিতে হবে। শিশুবিশেষজ্ঞ, শিক মহল, মনস্তত্ত্ববিদ ও অভিভাবকদের এ বিষয়ে দায়িত্ব আছে। শিশুদের বিকাশ কোনোভাবেই নিশ্চিত হবে না, যদি না বড়দের সমাজ ঠিক হয়।

 

শিশু-কিশোরদের নৈতিক, মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখার স্বার্থে গণমাধ্যম ও বিজ্ঞাপনে শিশুদের বাণিজ্যিক ব্যবহার এবং যৌনানুভূতি জাগানো উপস্থাপন বন্ধ করা সংস্কৃতির স্বার্থেও দরকার। রিমোট কন্ট্রোলার হাতে করে চ্যানেল পাল্টানোর স্বাধীনতায় ভুললে চলবে না। কারণ, টিভির রিমোট আপনার হাতে হলেও সংস্কৃতির রিমোট কন্ট্রোলার অন্যদের হাতে। তাতে শুধু নৈতিকতার লখিন্দরই ভেসে যাবে না, সংস্কৃতির বেহুলাও তার সঙ্গী হবে; তারা নাচবে ইন্দ্রের রাজসভায়।

 

ইতিহাসে স্বর্ণযুগ চিহ্নিত থাকে, কিন্তু আইয়ামে জাহেলিয়াত বা অন্ধকার যুগের সূচনায় কোনো ঘণ্টা বাজে না। নীরবেই তা শুরু হয়ে যায়। এক চীনা জল্লাদের সাধনা ছিল, এমনভাবে মানুষের কল্লা কাটা, যাতে তারা টেরও না পায়। বছরের পর বছর তিনি সূক্ষ্মভাবে মানুষের মাথা কাটার সাধনা চালিয়ে গেলেন এবং একদিন এত নিখুঁতভাবে একজনের মাথা কাটলেন যে হতভাগা লোকটি কিছু টের না পেয়ে প্রশ্ন করে, ‘কই, আপনি তো কিছু করছেন না।’ জল্লাদ মহাশয় সাধুপুরুষের মতো হেসে বললেন, ‘জনাব, মাথাটা একটু ঝাঁকান, টের পাবেন।’ ঝাঁকুনি না খেলে আমরাও বুঝব না, আমাদেরও মাথা বিনোদনের রেশমি সুতোয় খাঁড়ায় কত সুকৌশলে কাটা পড়ছে।

প্রথম প্রকাশ: ৪-১০-২০১০

উপরে ব্লাউজ পরলেই কি, আবার ব্লাউজ না পরলেই কি!

সহযোদ্ধা শামীমা মিতুর সঙ্গে সহমত জানাচ্ছি, সঙ্গে আরো বলতে চাই, পদ্মা নদীর মাঝিতে রূপা গাঙ্গুলী যখন ব্লাউজবীহিন ভেজা শাড়ীতে জলের উপর উঠে এলো তখন তা মোহনীয় হয়ে ওঠে। কিংবা চোখের বালীতে যখন ঐশর্য্য রায় ব্লাউজবীহিন শাড়ী পড়ে শট দেন তা হয়ে যায় এক দর্শনীয় অপূর্ব মুহুর্ত। তখন আপনাদের মনের ভেতর নান্দনিকতা ফুটে ওঠে।

আপনারা নিজে কিভাবে শালীনতা বজায় রাখেন সেসব বর্ণনা দিয়ে বেড়ান। আপনার নিজের বানানো নান্দনিকতায় চলতে হবে অন্যদের? কে আপনাকে সেই অধিকার দিলো?

আমাদের দেশের আদিবাসী মা-বোনেরা যখন থামি পড়েন তখন তা দেখে মুমিন বান্দাদের ঈমানদন্ড দাঁড়িয়ে যায়। তারা সুযোগ সময় পেলে পাহাড়ের গায়ে বেড়ে ওঠা শিশুকেও ছাড়ে না। অসম্ভব সুন্দর এই পোশাক থামি দেখে তাদের মাথা ঘোরে আর বলে এটাকে অশালীন লাগে !! ওরা ধর্ষিত হবে না তো কারা হবে?

সচিব ভাষন দিয়ে বেড়ান, রাতের বেলায় স্কার্ট পড়ে বের হলে তার নিশ্চয়তা দিতে পারবেনা। কেউ কেউ বলেন, আমি বাসায় স্কার্ট, টি শার্ট, প্যান্ট পড়লে অন্য কেউ বেড়াতে এলে টুক করে পোশাক বদলে সামনে যাই আর তাই শালীনতা !! তাহলে আফ্রিকার জঙ্গলে যেসব নারী কোনদিন পোশাক পড়তেই শেখেনি তারা সব অশালীন?

আমাদের বাংলাদেশ ছিল জলাশয়, জলাঞ্চল। ইতিহাস ঘাটলেই দেখা যায়, এ দেশের বেশিরভাগ মানুষ হিন্দু ধর্মে বিশ্বাসী ছিল। কোন এক ডাকাত ঘোড়া নিয়ে আসলো আর লক্ষণ সেন নদী পথে পালিয়ে গেল তখন পর্যন্ত এদিকে মুসলমানের বাস পর্যন্ত ছিল না। যে দেশের গ্রামাঞ্চলের নারীরা এখনো ব্লাউজ ছাড়া শাড়ী পরে কাজ করতে সাচ্ছন্দ্যবোধ করে, বা অামার চেনা এক অঞ্চলের মানুষ আছেন তারা শাড়ী কেনার পয়সা নাই বলে পেটিকোট আর ব্লাউজ পরে একটা গামছা জড়িয়ে দিনানিপাত করছে তারা আপনাদের চোখে অশালীন কিংবা আপনাদের নান্দনিকতায় বাধা দেয়!!

ধিক ধিক ধিক !! আপনি আপনার পছন্দ নিজের মধ্যে রাখুন। আপনার ভাল লাগবে না, তাই অন্যের কাছে ভাল লাগবে না এমন ভাবাটাই অনধিকার চর্চ্চার মধ্যে পড়ে। অবশ্য আপনি তা বুঝবেন না, কারন এ ধরনের দেখানো নৈতিক বাণী না লিখলে আপনি ফেসবুকে লাইক কামাই করতে পারবেন না।

শামীমা মিতু লিখেছেন, -প্যান্টের ভেতর আন্ডারওয়ার পরে ছেলেরা এটা আমরা সবাই জানি, এই আন্ডারওয়ার প্যান্টের উপ্রে পরলে সুপারম্যান হয়! শাড়ীর নীচে ব্লাউজ পরে নারী এটা আমরা সবাই জানি, এই ব্লাউজ শাড়ীর উপ্রে পরলে হয় খানকি!

পদ্মা নদীর মাঝি সিনেমায় ব্লাউজ ছাড়া শাড়ী পরে নায়িকা চম্পা পেয়েছিলেন জাত অভিনেত্রী্র খেতাব। তার লাক্স সুন্দরী শাড়ীর উপর ব্লাউজ পরে হয়ে গেলেন করপোরেট বেশ্যা। মুমিনরা, ফাতরারা, ধর্ষন পেজের লাইকাররা গালিগালাজে ভরিয়ে তুলছেন আর শিল্প বোদ্ধারা এর মাঝে দেশ ও সংস্কৃতির ধ্বস দেখতে পাচ্ছেন।

আমি বলি, নারীকে যখন পন্য বানানো হয় তখন নীচে ব্লাউজ পরলেই কি, আর উপরে ব্লাউজ পরলেই কি, আবার ব্লাউজ না পরলেই কি! আমাদের মিডিয়া এই পন্য বানানোর কাজ তো দীর্ঘদিন ধরেই নির্লজ্জের মতো করে আসছে। আর তা থেকে সুড়সুড়ি নেয়ার লোকই এদেশে সবথেকে বেশি।

আর সংস্কৃতি ধ্বংসের কথা যারা বলছেন তাদের বলবো, বিমানবন্দরের সামনে টেনে হিচড়ে মৌলবাদিরা যে লালনের ভাষ্কর্য নামিয়ে ফেলেছিল আমরা আজও তা পুনঃস্থাপন করতে পারিনি বরং নির্লজ্জের মতো ভুলে গেছি।

লেখক: শামীমা মিতু ও ফারাজানা কবির খান স্নিগ্ধা

এই বিভাগে প্রকাশিত মতামতের জন্য কর্তৃপক্ষ দায়ী নহে

Farzana Kabir Khan Snigdha's picture

Farzana Kabir

সৌজন্যে : প্রিয়.কম

ফ্যাশন শো এবং আমাদের নারীরা

মিডিয়া এবং ব্যবসায়ীরা তরুনী মেয়েদের ফ্যাশন শো নামে অর্ধ নগ্ন করে বর্তমানে নানা অনুষ্ঠান বানাচ্ছে। দিন দিন তরুণ সমাজ ধর্মীয় মূল্যবোধকে ভুলে নগ্নতার দিকে ধাবিত হচেছ। লাক্স-চ্যানেল আই সুপার ষ্টার নামে তেমনি একটি অনুষ্ঠান হয়ে গেল কিছুদিন আগে। এই অনুষ্ঠানে শাড়ি পরা একটি মেয়েকে নিয়ে বেশকিছু দিন ধরে ফেসবুকসহ মিডিয়ায় শাড়ি ও নারী নিয়ে কথা হচ্ছে।

নারীবাদীদের সুরেই বলি শাড়ি একান্তই মেয়েদের পোশাক। তারা যেভাবে ইচ্ছে সেভাবেই পরতে পারে। কিভাবে পরবে, কিসের নিচে পরবে নাকি উপরে পরবে। সেটা তাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। স্বীকার করছি এবং মানছিও বিষয়টা। কিন্তু কোন মেয়ে যখন গলায় ওড়না প্যাচায় কিংবা হিজাব পরে রাস্তায় বের হয় সেটাও তো তারই ব্যক্তিগত ব্যাপার তাই না? তখন দেশ, সমাজ রসাতলে যাচ্ছে বলে নারীবাদীরা মুখে খই ফোটায় কেন?

বিষয়টা আর কিছুই নয় নারীকে যখন কেউ অর্ধ্বনগ্ন করে উপস্থাপন করে তখন সেটা কে নারীর স্বাধীনতা হিসেবে ধরা হয়। এখানও তেমনি নারীদেরকে পণ্য হিসেবেই উপস্থাপন করা হয়েছে। মানুষ মাত্রই প্রকৃতিগত ভাবেই সুন্দর। কিন্তু সেই সৌন্দর্য দেখানোর নাম করে নারীকে এখন অসভ্যতার চরম শিখরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। আর এখানেই নারীবাদীরা নিশ্চুপ। এখানে দেয়া ছবিটা দেখে কোন ভদ্র সমাজের লোক বলবে না যে ছবিটা সুন্দর হয়েছে। ছবিটা হচ্ছে অশ্লীলতার একটা চরম নির্দেশন। অবশ্য অশ্লীলতার সংজ্ঞা বিভিন্ন জনের কাছে বিভিন্ন রকম হতে পারে। তাই হয়তো পশ্চিমা দুনিয়ায় উলঙ্গ হয়ে মঞ্চে ক্যাটওয়াক করলেও সেটাকে তারা ফ্যাশন হিসেবেই নেয়। ফ্যাশনের উদ্দেশ্যই হলো তথাকথিত সৌন্দর্যকে ফুটিয়ে তোলা, নারীর দেহ প্রদর্শন করা। কে না জানে যে, নিষিদ্ধ যে কোন কিছু্র প্রতিই কিন্তু মানুষ সব সময় দুর্নিবার আকর্ষণ অনুভব করে।

অনেকেই বলবেন ফ্যাশনও তো একটা পেশা। বেশ্যাবৃত্তিও তো একটা পেশা। সেই জন্য কি বেশ্যাবৃত্তিও সমাজের জন্য হালাল হয়ে যাবে। সমাজটাই এমন হয়েছে যে, দিনদিন মানুষ খারাপের দিকেই ধাবিত হচ্ছে। তাই হয়তো বলা যায় হাতে রিমোট থাকলেই যে সবাই পিস টিভি দেখবে এটা ভাবাটা বোকামী। তাই যদি হতো এতো আলোচনা-সমালোচনার পরেও বেশির ভাগ নারীরা (কিছু কিছু পুরুষও আছে) হিন্দি সিরিয়াল দেখতো না। যা থেকে মূলত শেখার কিছুই নেই। যারা নারীদের আরও আধুনিক হতে বলে (উগ্রতা অর্থেই বলছি) এবং যারা এই ছবিটার পক্ষে কথা বলছেন তাদেরকে বলছি পুরুষের মতো করে নারীরাও কি শুধু স্যান্ডো গেঞ্জি (মাঝে মধ্যে পুরুষরা যেভাবে খালি গায়ে থাকে) রাস্তায় বের হতে পারবে? নারী আর পুরুষের মধ্যে কিছু গঠনগত পার্থক্য আছে বলেই আমরা পুরুষ ও নারীকে চিনতে পারি। গোপন জিনিস গোপনেই থাকা উচিৎ। সেটা পুরুষের হোক আর মেয়েরই হোক। তা না হলে মানুষ আর পশুর মধ্যে পার্থক্যটা থাকলো কোথায়?

অনেকেই বলবেন মুক্ত বিশ্বের এই যুগে যেখানে ঘরে ঘরে ডিশ, হাতের নাগালেই ইন্টারনেট বিশাল দুনিয়া সেখানে লাক্স- চ্যানেল আইর এই অনুষ্ঠানটি খুব বেশি কিছু নয়। বাঙ্গালীর মূ্ল্যবোধের সাথে যেটা যায় না সেটা না করলেই কি নয়? তথাকথিত অতি আধুনিক! কিছু মানুষ যারা নিজেদের সমাজ-সভ্যতা ও স্বকীয়তাকে বিসর্জন দিয়ে পাশ্চাত্যকে অনুকরণ করে ভাবে আমরা সভ্য হয়ে গেলাম তাদের কে বলবো এই ছবিটার দিকে ভাল করে তাকাতে। হয়তো বলবেন যুগে যুগে পোশাকে বির্বতন ঘটে। আগে যেভাবে মানুষ পোশাক পড়তো এখন তো সেভাবে কেউ পড়ে না। পোশাকের বিবর্তন আর নগ্নতা কিন্তু এক জিনিস নয়। কালের পরিবর্তনে পোশাকের পরিবর্তন ঘটছে সেটাও কিছু উর্বর মস্তিষ্কের মানুষের কারণেই। আমি বলবো এই রকম অসভ্য, বেহায়া পোশাকের চেয়ে বোরকা অনেক উত্তম।

এই বিভাগে প্রকাশিত মতামতের জন্য কর্তৃপক্ষ দায়ী নহে।

মোকসেদুল ইসলাম's picture

মোকসেদুল ইসলাম

সৌজন্যে: প্রিয়.কম