আর্কাইভ

একটি মাধবি : জসিম মল্লিক

মানুষ কত বদলে গেছে।

বজলু যে বাá ভড়ে কত্ত কী আনলো তাতেও কেউ উৎফুল্ল হলোনা। আত্মীয় স্বজনকে খুশী করা আজকাল বড় টাফ হয়ে গেছে। বজলুর ভাতিজা হাসিবের বউকে ড্রেস কেনার জন্য বিশ হাজার টাকা দিল। টাকা পেয়ে খুউব যে খুশী হয়েছে তা মনে হলো না। মনে হয় আরো বেশী প্রত্যাশা করেছিল। একটা সুষ্ক হাসি দিয়ে চলে গলো হাসিব। যাওয়ার সময় কিছুই বললো না। একটু পরই এলো ভাগ্নে দুলাল। স্মার্ট ছেলে। সে জগতের তাবৎ খোঁজ খবর রাখে। দুলাল ছেলেটা বজলুর খুউব ভক্ত। বজলুও ওকে পছন্দ করে।

বৃষ্টিটা আরো জোড়ে শুরু হয়েছে। একটু আগেই ভোঁ বাজিয়ে স্টিমার ঘাটে ভিড়েছে। যে দামী গাড়িটা এসেছিল সেটা থেকে নামল একটি পরিবার। সেখানে একটি মেয়ে আছে। সুন্দর দেখতে। মেয়েটিকে আগে কোথায় যেনো দেখেছে। কোথায় দেখেছে? মনে পড়েছে। একটি নাটকের অনুষ্ঠানে। সঙ্গে আর একটি মেয়ে ছিল। খুব হাসাহাসি করছিল। মেয়েটি হাসলে দারুন লাগে দেখতে। গালে টোল পড়ে। অনেকেই সেদিন মেয়েটিকে খেয়াল করছিল।

সেটা ছিল শব্দাবলীর নাটক। নাট্যকার নিজেও উপস্খিত ছিল সেদিন। মেয়েটি লেখকের সাথে খুউব হেসে হেসে কথা বলছিল। অটোগ্রাফ নিচ্ছিল। লেখকও মেয়েটির সাথে খুউব মজা মারছিল। বজলু কী একটু ঈর্ষা ফিল করেছিল! কথাটা মনে হতেই একটু হাসি পেলো। ওর কোনো ঈর্ষা হবে! তবে লেখকদের যে অনেক মজা এটা মেনে নিয়েছিল।

আজকে স্টীমারে তেমন ভীড় নেই। অল্পকিছু লোকজন উঠলো

বজলুর একদম বড় ভাই কাদের এসেছে শেষ মুহূর্তে । দুলাল এখনও আছে। বজলু সবার ছোট। স্টীমার ছাড়ার সময় হয়ে গেছে। মন খারপ করা ভোঁ বেজে উঠল। যারা সি অফ করতে এসেছিল তারা নেমে গেল। বড় ভাই অনেকক্ষন জেটিতে দাঁড়িয়ে থাকল। স্টীমার যতক্ষন না বাঁক নিল ভাই দাঁড়িয়েই থাকল বজলুর দিকে তাকিয়ে।

২.

স্টীমারের কেবিনে হঠাৎ কেমন শূন্য মনে হলো নিজেকে। এতক্ষন সবাই ছিল। এখন কেউ নেই। মানুষ এ রকম ভাবেই একা হয়ে যায়। পাখী হয়ে যায়। মা প্রায়ই কথাটা বলে বজলুকে। তুই একটা পাখী। এই দেখি আবার দেখি না। আমার প্রাণ পাখী উড়ে চলে যায়। এরপর মা কাঁদে। সন্তানের জন্য মায়ের কান্নায় কোনো ফাঁক নেই।

স্টীমারের বাটলার চা দিয়ে গেল। কেবিনের ভিতর বসেই চা খেলো বজলু। আজ কিছুতেই মন বসাতে পারছে না। আর এক সপ্তাহ পর চলে যাবে। আসার দিন বরং অনেক হৈ চৈ করে এসেছে ঢাকা থেকে। শিলা ছিল। ছিল ফরাসী মেয়ে এলিন মারটিন, কানাডিয়ান ছেলে-মেয়ে কনি এবং রডনি এডওয়ার্ড। ছিল জোছনা রাত। দুদিন আগের কথা। আজ যদি ওয়েদার ভাল হয় তাহলে আজও চাঁদ দেখতে পাওয়ার কথা। যদিও এখনও বৃষ্টি পড়ছে অল্প অল্প। ভালো লাগছে বজলুর। নদীর পানিতে বৃষ্টির পতন বড় অসাধারণ। যেমন অসাধারণ চাঁদের আলো। মেঘ কেটে গেলে আজ ফুল মুন হওয়ার কথা।

আটটার দিকে বজলু স্টীমারের সেলুনে ঢুকলো। কয়েকটা বাচ্চা ছোটা ছুটি করছে। পাঁচ ছয় বছরের এক বাচ্চাকে কাছে ডাকল বজলু। এলো মেয়েটি। ফুটফুটে দেখতে।

কি নাম তোমার!

তিত্লি।

বাহ্ সুন্দর নামতো তোমার!

তুমি স্কুলে পড়?

হু

কী পড়!

নার্সারী টু।

তুমি কার সাথে এসেছো।

আমার মা আর ভাইয়া। আমাদের সাথে একটা চাচু আছে, জানো চাচু না খুব মোটা!

তাই নাকি!

বজলু হাসলো তিত্লির কথা শুনে।

একটি দশ বছরের ছেলে এসে বললো, এই তিতলি তোমাকে মা ডাকে।

তোমার কি নাম!

তাজিন!

তুমি কি তিতলির ভাই!

হু। কেমন করে বুঝলেন!

তোমাকে দেখে!

সবাই আমাদের দেখেই বুঝে ফেলে।

তুমি কোন ক্লাসে পড়।

ক্লাস ফাইভ।

কোন স্কুল

জিলা স্কুল।

তাই! আমিও ওই স্কুলের ছাত্র ছিলাম।

জানেন এখন না স্কুলটা আগের মতো নেই। পচা হয়ে গেছে।

তোমার বাবা আসেনি!

বাবাতো নেই! বাবা মারা গেছে তিন বছর আগে!

ও তাই! কি হয়েছিল!

ব্রেন ক্যান্সার!

আইএ্যাম সরি তাজিন!

ইটস ওকে!

তিত্লি আর তাজিনের সাথে বজলুর জমে উঠলো। ওরা বজলুর রুমটা দখলে নিল। একটু পর পর ওদের মা এসে খবর নিচ্ছে। হেসে বললেন, আপনাকে খুব বিরক্ত করছে না!

বজলু বলল, মোটেই না। আমার বরং ওদের সাথে ভাল লাগছে। সময়টা কাটছে ভাল।

তাজিনরা নেমে যাবে চাঁদপুর। ওখান থেকে রাতের ট্রেনে চিটাগাং।

বজলু বলল, শোনো তাজিন, ঠিকমত পড়াশুনা করবে ওকে! মায়ের কথা শুনবে।

তাজিন মাথা নেড়ে সায় দিল।

চিটাগাং পৌঁছে ফোন করো !

আচ্ছা করবো।

তাজিন সত্যি সত্যি ফোন করেছিল।

৩.

একটু পর সেলুনটা আলোকিত করে এলো সেই মেয়েটি। একটি দেড় দু’ বছরের শিশু সাথে। কাছ থেকে মেয়েটিকে আর একটু বেশী বয়সী মনে হয়। ছাব্বিশ সাতাশ হবে। এর আগে মনে হয়েছিল তেইশ চব্বিশ।

কিছুক্ষন আগে বজলু যখন পিছনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছিল তখন মেয়েটি একবার বাইরে এসেছিল। ময়েটির কেবিন আর বজলুর কেবিন একই রো’তে। মাঝখানে অন্য একটি কেবিন। মেয়েটি বাইরে বেশীক্ষন থাকেনি। আধো আলোতে মেয়েটি একবার তাকিয়েছিল। বজলুও। ততক্ষনে বৃষ্টিটা থেমে গেছে। চাঁদের ফ্যাকাশে আলো দিগন্তে ছড়িয়ে পড়ছে। একটু পরই ফক ফকা হয়ে যাবে।

বাচ্চাটা ছোটা ছুটি করছে দেখে বজলু কোলে তুলে নিল। একটু কোলে থেকেই আবার মোচর দিয়ে নেমে গেলো। আবার এলো বজলুর কোলে। বাচ্চাটা মজা পাচ্ছে। মেয়েটি হাসছে কান্ড দেখে।

খুব দুষ্ট হয়েছে।

আপনার বাচ্চা বুঝি!

মেয়েটি হেসে মাথা নাড়ল।

ছেলে না মেয়ে!

বলেনতো!

মেয়ে।

মেয়েটি শব্দ করে হাসলো। সুন্দর হাসিটা। গালে টোল পড়ে।

বজলু বুঝল ভুল করেছে। ছেলে হবে।

সবাই এই ভুল করে।

মেয়েটি দাঁড়িয়ে কথা বলছিল। বজলু বলল, বসেন না। মেয়েটি বসল রুমের অন্য খাটে।

কে কে যাচ্ছেন।

কেউ না।

আপনাকে মনে হয় দেখেছি আগে।

কোথায় বলেনতো!

পড়শুদিন শব্দাবলীর নাটকে।

হ্যাঁ।

মেয়েটিও যে বজলুকে দেখেছিল সেটা উহ্য থেকে গেলো। বজলু খুউব সুপুরুষ দেখতে। যে কেউ একবার দেখলে ওকে ভোলে না। সুপুরুষ বলেই নয় ওর মধ্যে এমন একটা কিছু আছে যা আকৃষ্ট করে মানুষকে।

মেয়েটি বের হয়ে গেল একটা হাসি দিয়ে। বাচ্চাটা জ্বালাচ্ছিল তাই। একটু পর বাচ্চাটা আবার এলো দৌড়ে। মেয়েটিও এলো। ধরে নিয়ে গেলো বাচ্চাটাকে। যাবার সময় মেয়েটি একটি ছোট্ট কাগজ ছুড়ে দিল বজলুর খাটে।

মেয়েটির বয়স ছাব্বিশ সাতাশই হবে। আঁটোসাটো সালোয়ার কামিজ পড়েছে। চোসা ত্রিপিস সেটে ম্যাচিং সুতার এমব্রয়ডারি ও সিকোয়েন্সের কাজ। অসম্ভব সুন্দর ফিগার। একেবারে মন খারাপ হয়ে যাওয়ার মতো।

কাগজটি খুলে দেখল, লেখা কল মি। দুটো ফোন নম্বর। একটা গ্রামীনের, আর একটা বোধহয় বাংলালিংক।

দশটার দিকে বজলু ফোন করল।

কি করছেন! চিনতে পেরেছেন! ৪ নম্বর কেবিন থেকে বলছি। নাম বজলু।

মেয়েটি সন্ত্রস্তভাবে হসে বলল, হু।

কি করছেন!

বাচ্চাকে ঘুম পারাচ্ছি!

ডিনার করেছেন!

না।

আমার সাথে করেন!

ওকে।

অর্ডার দিচ্ছি। বলে ফোন রাখল বজলু।

মনে মনে হাসিই পেলো বজলুর। এসব কি হচ্ছে! মেয়েটির কি যেনো একটা ব্যাপার আছে। থাকগে বজলুর কিছু যায় আসে না। অনেক সময় নিজেকে পরিস্খিতির উপর ছেড়ে দিতে ইচ্ছে করে। পূর্বাপর চিন্তাও অনেক সময় লোপ পায় মানুষের।

একটু পরই মেয়েটির পাল্টা ফোন। শুনুন, আপনি খেয়ে নেন প্লীজ। আমার একটু প্রবলেম আছে।

কিসের প্রবলেম।

একজন আছে স্টীমারে আমাকে চেনে। দেখলে কি ভাববে।

ওকে। নো প্রবলেম।

আপনি মাইন্ড করেছেন!

বজলু হেসে বলল, আরে না।

রাত গভীর। বারোটা প্রায়। সেলুনের লাইট নিভে গেছে। মেয়েটি আর ফোন দেয়নি। বজলুও না। বজলু বাইরে এলো। আহ্ কী সুন্দর রাত। বাইরে একেবারে ফকফক করছে। অনেকদুর পর্যন্ত দেখা যায় প্রান্তর। একটা সিগারেট জ্বালালো। স্টীমার ঢেউ কেটে যাচ্ছে। সেই ঢেউয়ের উপর চাঁদের আলো পড়ে চিক চিক করছে। সুন সান নিরবতা। হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল। কেঁপে উঠল বজলু।

কি করছেন!

এইতো বাইরে দাঁড়িয়ে আছি। আপনার কথা ভাবছিলাম।

ঠান্ডা লাগবে না!

লাগলেইবা!

কী ভাবছিলেন আমার কথা বলুনতো!

আপনি খুব সুন্দর!

আপনি আরও সুন্দর। শুনুন বাইরে দাঁড়িয়ে থাকবেন না।

ওকে যাচ্ছি ভিতরে। আপনি কি করছেন!

এইতো বাবুকে ঘুম পাড়ালাম। আপনি ঘুমাবেন না!

ঘুম আসবে না।

কেনো!

কি জানি, জানি না।

প্লীজ ঘুমানোর চেষ্টা করেন।

আপনি কি ঘুমিয়ে পড়তে চান!

আমারও ঘুম আসবে না।

ওকে ফাইন। তাহলে আসুন গল্প করি। একরাত না ঘুমালে এমন কিছু আসে যায় না। চলে আসুন আমার রুমে।

এমা কি বলে! কত্ত সাহস!!

চলে আসুন।

কেউ যদি দেখে!

কেউ দেখবে না। সব ঘুমিয়ে।

৪.

ফোন রেখে দিল। বজলু জানে আসবে না। তাও রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করতে থাকলো। বুকের মধ্যে ড্রাম পেটানোর শব্দ হচ্ছে। যদি আসে! তাহলে!! বজলু বারান্দার দরজাটা একটু ফাঁক করে অপেক্ষায় থাকলো। দেখলো সত্যি আসছে একটি মানুষ। সতর্ক পায়ে। যেনো কেউ না দেখে ফেলে। দরজার কাছে আসতেই টান দিয়ে মেয়েটিকে ভিতরে নিয়ে এলো। মেয়েটি ভয়ে কাঁপছে।

বজলুর রুম অন্ধকার। মেয়েটি সম্ভবত রাতের পোশাক পড়ে আছে। পাতলা নাইটি টাইপ কিছু হবে। বজলু একটা এডিডাসের ট্রাউজার আর টী শার্ট পড়েছে। মেয়েটি অসহায়ের মতো নিজেকে বজলুর বুকের মধ্যে সপে দিল। বজলু তেমন দ্বিধা না করেই মেয়েটির মুখটা তুলে ধরে চুমু খেলো। মেয়েটির নরম অথচ দৃঢ় বক্ষ সেটে আছে বজলুর বুকে। চুমু আরো গভীর করলো বজলু। মেয়েটির বুকের দৃঢ়তা চলে এলো হাতের নাগালে। স্পষ্ট টের পাচ্ছে ছোঁয়া। হঠাৎই যেনো মেয়েটি বুঝতে পারলো কিছু একটা ভুল হয়েছে। বজলুকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল।

আমার ভয় করছে।

কম্পিত গলায় বজলু বলল, কিছু ভয় নেই। কেউ কিছু দেখবে না।

না আমার ভয় করছে। আমি যাই। মেয়েটি চলে গেলো।

একটার দিকে চাঁদপুর এলো স্টীমার। বজলুর আর ঘুম আসবে বলে মনে হয় না। তাজিনরা নিশ্চয়ই নেমে গেছে। মেয়েটি কি অদ্ভুত। মেয়েরা বড় অদ্ভুত প্রানী। এলো। আবার চলে গেলো। এক ঘন্টা পর স্টীমার ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো। আর চার ঘন্টা সময় আছে মাত্র হাতে। স্টীমার যখন মেঘনায় পড়লো তখন বজলু স্বর্ণাকে ফোন দিল।

চলে গেলে যে! বজলু তুমি করে বলছে।

ভয় করছিল যে!

কিছু ভয় নেই।

কেউ দেখে ফেললে কি হবে বলেন!

কিছু হবে না। তুমি আসো।

না।

আমি বলছি আসো।

আপনার অনেক সাহস।

আমি তোমার অপেক্ষায় আছি।

সত্যি সত্যি স্বর্ণা আবারও এলো। সর্ন্তপনে। বজলু এবার সবধরনের প্রস্তুতি নিয়েই ছিল। বজলুকে শক্ত করে ধরে গভীর চুমু দিয়ে বলল, তুমি কি বলোতো!

কী!

তোমার মধ্যে কী আছে!

কিছু নাইতো!

তুমি কী করেছো আমার!

স্বর্ণাকে শুইয়ে দিল খাটে। কোনো প্রতিরোধ নেই। চুমু খেতে থাকলো কপালে, গালে, ঠোঁটে, গলায় সর্বত্র। স্বর্ণা পুরোপুরি আত্মসমর্পনের জন্য প্রস্তুত। সাড়া দিচ্ছে। আবার কি যে হলো মেয়টির। সে বিজলুকে ধাক্কা মেরে উঠে চলো গেলো আবার। বজলু বোকা হয়ে গেলো।

সে রাতে আর কিছু ঘটলো না। খুব সকালে নেমে যাবার আগে স্বর্ণা আবার এলো বজলুর রুমে। মুখে অপরাধী ভাব।

আই’ম সরি।

ইটস ওকে।

বজলুকে একটা চুমু খেয়ে চলে গেলো। বলল, ফোন করবে কিন্তু। তোমার সাথে সন্ধ্যায় দেখা হবে। ঘুরবো তোমার সাথে। স্বর্ণাকে ফোন করেছিল বজলু। স্বর্ণা ধরেনি ফোন। আর কখনও। স্বর্ণার অনেক কিছু অজানা থেকে গেলো। আর কি কখনও দেখা হবে স্বর্ণার সাথে! মানুষ কত বদলে গেছে।

৫.

বজলু আর এলিন মার্টিন স্টীমারের সামনে খোলা ডেকে বসে গল্প করছিল। পরশুদিনের কথা। যেদিন বজলু বরিশাল যাচ্ছিল। স্টীমার তখনও ছাড়েনি। মেয়েটি একা একা বসেছিল। বুড়িগঙ্গার পচা পানির গন্ধ পেটের মধ্যে সব গুলিয়ে দিচ্ছিল। বজলু ভাবল মেয়েটিকে একটু সঙ্গ দেয়া যাক। একটি সুন্দর মেয়ে একাকী বসে আছে ! বজলু জানে ইউরোপীয়ানরা জীবন যুদ্ধে লড়তে লড়তে নি:সঙ্গ জীবনকেই বেশী পছন্দ করে। দিনের পর দিন একাকী থেকে এদের অভ্যাস। এই মেয়েটি যে ইউরোপিয়ান তা মোটামুটি নিশ্চিত। মুখের গড়ন দেখে বোঝা যায়। তাছাড়া বজলু দীর্ঘদিন আমেরিকায় থাকে। মাল্টিকালচারের দেশ আমেরিকা। ঘুরেছে অনেক দেশ।

বজলু কাছে গিয়ে বলল, হাই।

মেয়েটি হেসে বলল, হাই।

মনে হয় মেয়েটি একজন কথা বলার লোক পেয়ে হাফ ছেড়ে বেঁচেছে। সাদা মানুষ দেখলে আমাদের দেশের মানুষরা এখনও একটু দূরত্ব বজায় রেখে চলে। কেনো কে জানে। হতে পারে সেটা ভাষার সমস্যা। সেটা দুপক্ষেরই অবশ্য।

মেয়েটির পোষাক বেশ রাখঢাক। মনে হয় কেউ বলে দিয়েছে এখানে বেশী খোলামেলা হওয়া যাবে না। আসলে কথাটা ঠিক না। বাংলাদেশের মেয়েরাই এখন ইউরোপিয়ানদের সমকক্ষ হওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছে।

সুন্দর দেখতে মেয়েটি। দারুন স্বাস্খ্যবান। বয়স আন্দাজ করতে পারছে না বজলু। বজলু কখনও মেয়েদের বয়স ঠিকমত আন্দাজ করতে পারে না। যদিও বয়স নিয়ে বজলুর একটুও মাথাব্যথা নেই। তাছাড়া মেয়েদের বয়স জানতে চাওয়াও শোভন না। এই মেয়েটির আটাশ উনত্রিশ হওয়ার সম্ভবনা।

বজলু দেখল মেয়েটির পাশের তিনটি চেয়ারই খালি। বসে পড়ল একদম পাশেরটায়।

তোমার দেশ কোথায়!

ফ্র্যান্স।

বজলু যা ভেবেছিল তাই ঠিক। ইউরোপিয়ান।

ফন্স্যান্সের কোথায় থাক তুমি!

প্যারিস।

প্যারিস! ওয়াও! আমার খুুব পছন্দের জায়গা।

তাই!

আমি বেশ কয়েকবার গিয়েছি ওখানে।

তুমি এখানে কোথায় থাক!

আমি আসলে আমেরিকা থাকি তবে বছরে একবার আসা হয়ই। আমি বজলু, বজলুর রহমান। বলে হাত বাড়ালো। মেয়েটিও হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, আমি মার্টিন। এলিন মার্টিন।

নাইস টু মিট ইউ মার্টিন।

নাইস টু মিট ইউ রমান।

মার্টিনের হাতটা বেশ সফট। কিছুক্ষন ধরে থাকল বজলু। ডেল কার্নেগি বলেছে এমন উঞ্চতার সাথে করমর্দন করবে যেনো তাতে তোমার আন্তরিকতটা প্রকাশ পায়।

মার্টিন যাচ্ছে পটুয়াখালীর কলাপাড়া। সে এসেছে সিডরের ব্যাপারে। ফরাসী একটা এনজিওতে কাজ করে। ওদের এনজিওর কাজ হচ্ছে পুর্নবাসন। পৃথিবীর বিভিন্ন গরীব দেশগুলোতে কাজ করার অভিজ্ঞতা তার রয়েছে। বিশেষকরে আফিন্সকার দেশগুলোতে। এইজন্যই মার্টিনের ইংরেজী বেশ ভাল। না হলে ফরাসীদের ইংরেজী অতি জঘন্ন। প্রায়োজন না হলে বলতেও চায় না। কথায় কথায় মার্টিনের কেবিন নম্বরটাও জেনে নিল।

জানো মার্টিন প্যারিস শহরটা আমার অসাধারণ লাগে। আমি অনেক বড় বড় শহর ঘুরেছি কিন্তু প্যারিস সত্যি অনন্য। কী একটা যেনো আছে এই শহরাটায়। মানুষজনও খুউব ভাল। ফেন্সন্ডলি।

থ্যাঙ্কস রমান।

তোমার কেমন লাগছে বাংলাদেশ!

অতি চমৎকার।

বজলু জানে কোনো বিদেশী অন্য দেশে গিয়ে সে দেশের খারাপ বলবে না।

সুন্দর না আমাদের দেশটা! মানুষজন কত ভাল। কত অল্পতে খুশী তারা।

এটা তুমি ঠিক বলেছো। সিডরে সব খুইয়েও মানুষ লড়াই করছে উঠে দাঁড়ানোর জন্য। এটা আমাকে মুগ্ধ করেছে। তোমার দেশের মানুষ খুউব আন্তরিক এবং ফেন্সন্ডলি।

এদেশের মানুষেরা প্রকৃতির সাথে লড়াই করে বেঁচে থাকে। আমাদের দেশের মানুষের মতো মানুষ পৃথিবীর আর কোথাও পাবে না। বাই দ্য ওয়ে, চা কফি কিছু খাবে!

মার্টিন অমায়িক হেসে প্রত্যাখ্যান করল। বজলু তাতে গা করল না। এটা ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকার লোকদের স্বভাব।

মার্টিন মেয়েটা সত্যি সুন্দর। কী অসাধারণ। ইউরোপীয়দের চেহারায় একধরণের রুক্ষতা থাকে, মার্টিনের তা নেই। মার্টিনকে খুউব ভাল লেগে গেলো।

বজলু যখন গল্পে মজে গেছে তখনই শিলা এসে ডাকাডাকি শুরু করলো। মার্টিন কি ভাবল কে জানে। সঙ্গে সঙ্গে উঠে গেলো।

নাইস টকিং ইউ মার্টিন।

শিলার উপর মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো। এর আগেই অবশ্য কার্ড নিয়েছে মার্টিনের। বজলু নিশ্চিত জানে মার্টিনকে ই-মেইল করলে রিপ্লাই দেবেনা। বজলু ঠিকই ই-মেইল করেছিল। রিপ্লাই পায়নি।

তুই একটা কী শিলা!

কোনো কী করেছি!

দেখছিস না একজন বিদেশী মহিলার সাথে কথা বলছি! তোরা একদম এটিকেট জানিস না।

ভালো হয়েছে। তোমার এত কী ওর সাথে!

একা একা যাচ্ছিল তাই গল্প করছি।

এমনভাবে কথা বলছিলে যেনো কতকাল ধরে চেনো। গায়ের সাথে গা লাগিয়ে।

শোন্ ওরা তোদের মতো না। রাতে এক রকম সকাল হলে আর এক রকম।

আমরা বুঝি এ রকম!

তো কি।

মনে হয় অনেক মেয়ে দেখেছো! আমার মনে হয় তুমি আসলে মেয়েদের চেনোই না। তোমার চোখ নেই।

হয়েছে পাকামি করতে হবে না।

তুমি শুধু রূপে ভোলো। ওই বিদেশীটা দেখতে ভাল তাই গলে পড়েছো। দেখতে ভাল না হলে এত খাতির জমাতে না।

তুইওতো দেখতে ভাল তাই বলে কি আমি গলে পড়েছি! বেশী বক বক করিস।

৬.

শিলা মেয়েট একটু অন্যরকম । একটু চাপা ধরনের সৌন্দর্য। কমনীয় স্বভাব। বজলুর খুউব পছন্দ। গত বছর যখন দেশে আসে তখন প্রথম পরিচয়। এর আগে কোনোদিন দেখেইনি এই মেয়েকে বজলু। খুউব অল্প সময়ে শিলার সাথে একটা হৃদ্যতা হয়ে গেলো। শিলা ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে সোস্যাল ওয়েলফেয়ারে থার্ড ইয়ারে পড়ে। হালকা পাতলা গড়নের মেয়েটিকে শাড়ি পড়লে চমৎকার দেখতে লাগে। আজকে অবশ্য পড়েছে জয়সুরি সিল্কের কামিজে ব্রোকেট, এপ্লিক কাজ সঙ্গে ব্রোকেট দোপাট্টা। শিলার বড় ভাই থাকে পেনসালভেনিয়ায়। শিলার সাথে ওর মাও বরিশাল যাচ্ছে। শিলার মা উত্তরাতে তার ছোটবোনের কাছে এসেছিল বেড়াতে।

নাজমা আপার নাত্নির জন্মদিন ছিল সেটা। একটা চাইনিজ রেষ্টুরেন্টে অনুষ্ঠান হয়েছিল। পুরো অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল শিলা মেয়েটি। শাড়ি পড়ে এসেছিল বলেই বজলু ভড়কে গিয়েছিল। চোখ সড়াতে পারেনি বজলু। শাড়ি পড়লেই মেয়েরা বদলে যায়। ফুটে তার সৌন্দর্য। নাজমা আপা পরিচয় করিয়ে দেয়ার পর থেকেই ফিচকে মেয়েটি বজলুকে ভাইয়া সম্মোধন করতে লাগল। যদিও বয়স এবং সম্বোধন নিয়ে বজলুর একটুও মাথাব্যথা নেই।

বজলুও সুযোগ খুঁজছিল শিলাকে একটু ভড়কে দেয়ার। রেষ্টুরেন্টের আড্ডার ফাঁকে ভীড়ের মধ্যে শিলার পিছনে গিয়ে ফর্সা পেট ছুঁইয়ে দিল। কেউ কিছু বুঝতেই পারলো না। মেয়েদের পঞ্চন্দ্রিয় বলে একটা জিনিস আছে।

শিলা ঘার ঘুরাতেই বজলু বলল, খুব সুন্দর দেখতে তুই।

থ্যাঙ্কস বলে শিলা অন্য দিকে চলে গেলো।

আবার সুযোগ বুঝে বজলু বলল, তুই করে বলছি বলে কী রাগ হয়েছে! শিলা ভ্যাংচি কেটে বলল, আমার অনেক ভাল্লাগছে।

অনুষ্ঠান শেষে ওরা গিয়েছিল পার্কে। পার্কটা সুন্দর। বরিশালের মতো জায়গায় এ রকম পার্ক ভাবা যায় না। আগে এ রকম ছিল না। সুন্দর সুন্দর রাইড আছে। শিশুদের জন্য আদর্শ জায়গা। কিত্তনখোলা নদীর তীর ঘেষে পার্কটি। ভিতরে বেশ সবুজ গাছ গাছালি । শিলা ওর দু’বন্ধুকে নিয়ে ফুচকা খাচ্ছিল। তখন প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেছে। একটা সুন্দর দেখতে ছেলের সাথে খুব ফিচকামি করছিল। ছেলেটি দেখতে বেশ হ্যান্ডসাম। উল্টো করে মাথায় হ্যাট পড়া। বজলুকে দেখেই শিলা ডাকল।

ভাইয়া আসো।

বজলু ওদের সাথে জয়েন করলো।

ফুসকা খাও ভাইয়া।

শিলার মুখে ভাইয়া ডাক শুনতে ভালই লাগছে।

আমি ফুসকা খাবো না। তোরা খা।

কেনো পেট খারাপ হবে! আমার ভাইয়াও দেশে আসলে কিছু খেতে চায়না। ভয় পায়।

ওকে ফাইন। খাচ্ছি।

থাক জোর করে খেতে হবে না।

আসলে জন্মদিনের অনুষ্ঠানে এত খাওয়া হয়েছে। পেট একদম ফুল।

ছেলেটি ভিতরে যেতেই শিলা বলল, ওর নাম মুরাদ। অষ্ট্রেলিয়ায় পড়াশুনা করেছে নাকি। বাবার ব্যবসা দেখছে এখন। রহস্যময় একটা হাসি দিয়ে বলল, আমাকে বিয়ে করতে চায়। প্রপোজাল পাঠিয়েছে।

বজলু বলল, ভালোতো। হ্যান্ডসাম আছে।

কেমন একটু মেয়েলি না!

শিলার সাথের একটা মেয়ে বলল, আমারতো ভালই লাগে ছেলেটাকে।

শিলা বলল, তাহলে ঝুলে পর।

অন্য একটা মেয়ে বলল, তোর জন্যই তো পারছে না। তোর মধ্যে কী পেয়েছে আল্লাহই জানে।

আচ্ছা ঠিক আছে আমি ওকে বলে দিব। তোরা দু’জনই ওকে বিয়ে করতে চাস।

ছেলেটি এসে পড়ায় চুপ হয়ে গেলো শিলা। বজলুকে খাতির করার জন্য ব্যস্ত হয়ে গেলো ছেলেটি।

কফি খান ভাই। ভাল কফি আছে।

ওকে। দিতে বলেন।

বলে এসেছি।

মুরাদ ছেলেটার মধ্যে গদ গদ একটা ভাব আছে। যদিও এধরনের ছেলেদের বজলুর বেশী পছন্দ না। ভালই যদি লাগে কাউকে কেড়ে নেয় না কেনো! বেশিরভাগ মেয়েরাইতো চায় তাদের পুরুষরা তাদের ছিনিয়ে নিক। দুমরে মুচরে ফেলুক। যে পুরুষ ভদ্রতা দেখাতে যাবে সে ঠকবে নির্ঘাত। পরে সারা জীবন অনুশোচনায় ভুগবে।

এভাবেই পরিচয় এবং ঘনিষ্ঠতা শিলার সাথে। গতবার যে ক’দিন ছিল বরিশাল প্রতিদিনই প্রায় শিলার সাথে ঘুরেছে। রানুদের বাসায় গিয়েছে। থেকেছে ঘন্টার পর ঘন্টা। শিলা দ্রুত সহজ হয়ে যায় বজলুর সাথে। মনে হয় বজলুর সঙ্গ সে বেশ উপভোগ করে। শিলা মেয়েটিকে বজলুর বেশ ভাল লাগতে লাগল। বেশ কেয়ারিং। ডীপ ফিলিংস আছে।

বেশীর ভাগ সুন্দরী মেয়েদেরই ধারণা সব ছেলেরাই মেয়ে দেখলেই প্রেম করতে চায়। শিলা তা মনে করে না। সাধারণত মেয়েদের আইকিউ বেশ কম থাকে। কিন্তু এই মেয়েটির আইকিউ খুব ভাল। অনেক ব্যাপার সহজ ভাবে নেয়ার ক্ষমতা আছে। মেয়েরা যেমন যুক্তির ধার ধারে না। কিন্তু এই মেয়েটি সব কিছু যুক্তি দিয়ে বিশ্লেষন করতে চায়। শিলার প্রতি প্রগাঢ় একটা আকর্ষণ জন্ম নেয়। বজলু সেবার আমেরিকা চলে যাওয়ার পরও শিলার সাথে নিয়মিত কথা হতো।

৭.

মার্টিন চলে যাওয়ার পর বজলু সেলুনে ফিরে এসে পত্রিকা পড়ায় ব্যস্ত হয়ে গেলো। শিলার উপর একটু ক্ষুব্দ। শিলা ব্যাপারটা বুঝতে পেরে সুযোগ বুঝে বজলুকে ওদের কেবিনে টেনে নিয়ে গেলো, তোমার সাথে আমার জরুরী কথা আছে।

বজলু একটু কী চমকালো! কী কথা বলবে শিলা! মার্টিনের সাথে ঘনিষ্ঠ হয়ে গল্প করছিল বলে মাইন্ড করেছে! তাতে বজলুর কি আসে যায়। ওতো অন্য একটা ছেলেকে ভালবাসে। বিয়েও করবে হয়তো। এটা কি সেই অজানা প্রেমিকটির প্রতি বজলুর ঈর্ষা!

খালাম্মা কোথায়!

আম্মু অন্যরুমে বসে গল্প করছে।

শিলাকে এতটা কাছ থেকে কখনও দেখেনি বজলু। হঠাৎ কি যে হলো ওর। এমনিতেই শিলা বজলুর অনেকখানি জুড়ে আছে। ওর স্পর্শ পাবার জন্য তীব্র আকাংখা তৈরী হয়ে আছে। বজলু চট করে উঠে কেবিনের দরজাটা লক করে দিল।

শিলা চমকে বলল, কী করছ ভাইয়া!

কি বলবি বল।

দরজাটা খুলে দাও।

না!

প্লিজ ভাইয়া। আম্মু কি ভাববে।

শিলা কিছু বুঝে উঠার আগেই ওকে জড়িয়ে ধরে ওর চিকন দুটো ঠোঁটে চুমু খেলো বজলু।

ঘটনাটা এতই দ্রুত ঘটলো যে শিলা ওর ভাষা হারিয়ে ফেললো। শিলা কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু আবারও ওকে চুমু খেলো।

কিছুক্ষন পর বজলু উঠে দরজাটা খুলে দিল।

শিলার চোখ মুখ লাল হয়ে গেছে। হাপাচ্ছে। বজলু ওর চোখের ভাষা পড়ার চেষ্টা করলো। সেখানে রাগ বা ঘৃনা আছে কিনা দেখার চেষ্টা করলো।

হেসে বলল, রাগ করেছিস! খুউব ইচ্ছে করল যে।

শিলা বলল না যে সে মোটেও রাগ করেনি। ও কেনো রাগ করতে যাবে। বজলুর সাথে কি রাগ করা যায়!

তাও বলল, কেনো এমন করো!

মন খারাপ করেছিস!

এ রকম আর করো না প্লীজ।

আচ্ছা আর করবো না। এবার বল কি বলতে চেয়েছিলি।

কিছুনা এমনি।

শিলা নিশ্চয়ই কিছু বলতেই চেয়েছিল। মেয়েদের এই রহস্যময়তার কাছে বজলু বড়ই অসহায়।

একটা কথা বলব শিলা!

বল।

তুই খুব সুন্দর।

শিলা হেসে বলল জানি তো।

শিলার একটু হাসিতেই পরিবেশটা দ্রুত হালকা হয়ে গেলো।

তোকে আমি খুব লাইক করি।

জানি।

সে রাতে ওরা অনেক গল্প করেছিল। একটা চুমু ওদের অনেকদুর এগিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু শিলা যে কি বলতে চয়েছিল সেটা আর জানা হলো না।

বজলু যে এবার একটা দিন থাকল বরিশাল শিলা কেনো যেনো বিশেষ গুরুত্ব দিল না। বাসায়ও যেতে বলল না। তবে শিলা এরকম মেয়েই না। শিলা অন্য সবার থেকে আলাদা। মানুষ কত বদলে গেছে।

৮.

বজলুর রহমান। নিজের নাম নিয়ে সে খুউব অসন্তষ্ট। বজলু একটা নাম হলো! একবার টরন্টোর বন্ধু শমিতা বলেছিল তোমার নামটা একেবারে রোমান্টিক না। শুনে বজলুর খারাপ লেগেছিল। বজলু বলেছিল নামে কী যায় আসে! বিদেশে এসে অনেকে নিজের নাম বদলে ফেলে। বজলুর এক বন্ধু আছে নাম খালেক। সে একটা ফেন্সঞ্চাইজের মালিক। তার নাম এখন ম্যাক। আসলে নামে কী কিছু যায় আসে! বজলু অসুস্খ হয়ে শুয়ে শুয়ে এসব ভাবছিল। ওর চলে যাওয়া অনিশ্চিত হয়ে গেলো। আরো কিছদিন মনে হচ্ছে তাকে থাকতেই হবে ঢাকায়। এই সুযোগে যাদের সাথে দেখা সাক্ষাৎ হলোনা সেটা করে নেয়া যাবে।

বজলুর একমাত্র সমস্যা সে মানুষের মন পড়তে পারেনা। বিশেষকরে মেয়েদের মনতো নয়ই। মানুষকে এই না বুঝতে পারার অসহায়ত্ব ওকে অনুক্ষন ভোগায়। বেশীরভাগ মানুষকেই বোঝা যায় না। মেয়েদেরতো আরো নয়। প্রেম ব্যাপারটা আসলে কি? বজলু কী কখনও কারো প্রেমে পড়েছে! বজলু কী শিলার প্রতি দুর্বল! দুর্বলতার কারনটা কী!

বজলু দেশে এলে ধানমন্ডিতে থাকে বেশীরভাগ। ওর এক বন্ধুর বাড়ি। বন্ধুর বাবা বেশ বড়লোক। পুরো একবিঘা জায়গার উপর বাড়ি। বাড়িটি গাছগাছালিতে ছাওয়া হলেও ধানমন্ডির নৈশব্দতা হারিয়ে গেছে। রাস্তা পা দিলেই রাজ্যের শব্দযন্ত্রণায় অতিষ্ট হতে হয়। প্রায় সব বাড়িগুলোয় ডেভলপারদের হাতে পড়ে বহুতল ভবনে রুপ নিয়েছে। সকালে জগিং করতে উঠে এইসব দৃশ্য ভাল করে দেখে বজলু।

মতিউরদের পুরো বাড়িতে মানুষজন বেশী নেই। ওদের ঢাকায় আরো বাড়ি আছে। দোতালায় ওর বন্ধু থাকে বাবা মার সাথে। ওরা বজলুকে নিজের ছেলের মতোই দেখে। নিচতলাটা পুরো খালি। বন্ধু মতিউর এখন বিজনেসের কাজে শাংহাই আছে। বজলুর কোনো অসুবিধাই হচ্ছে না। মহা আরামে আছে। চাকর বাকরে ভরা বাড়ি। ঢাকায় বজলুর বলতে গলে কোনো আত্মীয়পরিজন নেই। বন্ধুরাই ওর আত্মীয়।

এক সময় ঢাকায় বজলুর অনেক বন্ধু ছিল। এখনও আছে। বজলুর মনে হয় ঢাকার মানুষরা একটু একটু বদলে যাচ্ছে। মেয়েরা আরো বেশী। যাদের সাথে ঘনিষ্টতা ছিল তারাও একটু দুরের হয়ে গেছে।

বজলু মিলাকে ফোন দিল। ফোন ফোন খেলায় মেতে উঠতে ইচ্ছে করলো। ফোন করা এখন কত সহজ হয়ে গেছে এদেশে। প্রায় প্রতিটা মানুষের হাতে ফোন। মিলার সাথে পরিচয় হয়েছিল বছর দুই আগে। উত্তরা থাকে মিলা। মিলা যে বিবাহিত তাতে কিছু অসুবিধা হয়নি বন্ধুত্বে। মিলা খুব ডাকসাইটে সুন্দরী না হলেও খুবই আকর্ষনীয়। বিশেষকরে ওর দুটো চোখ এবং হাসি।

সেই দিনটা ছিল ভাল একটা দিন। মিলা ফোন করে যেতে বলল। তখন সন্ধ্যা। এর আগেরদিন অবশ্য অফিসের পর গুলশানে এসেছিল মিলা। নিজের ড্রাইভারকে বিদায় করে দিয়ে বজুলর সাথে ঘুরেছে গাড়িতে। বজলুই পৌঁছে দিয়েছে বাসায়। অনেক কথা হয়েছিল। তুমি করে বলেছিল। বজলুর হাতে হাত রেখেছিল। ওর হাজবেন্ড গেছে ব্যবসার কাজে মালয়েশিয়া।

মিলা এই মুহূর্তে পরে আছে একেবারে ঢিলেঢালা পোষাক। কেয়ারলেস। একটা শার্ট আর ঢোলা ট্রাউজার্স। শার্টের উপরের দুটো বোতাম খোলা। ওর সুগভীর বক্ষযুগল বড় বেশী স্ফুঠিত। নীল সাগরের মতো গভীর বক্ষদ্বয়ের সম্মিলন। মসৃন দুটো পা ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করে। þিöভলেস শার্টের দুটো সুডৌল হাতে রাজ্যের পেলবতা। চোখে কিসের যেনো ডাকাতিয়া বাঁশি।

বসল মুখোমুখি। খাবার তুলে দিচ্ছে নিজের হাতে। ঘরটার মধ্যে একটা সুঘ্রান ছড়াচ্ছিল। চমৎকার করে সাজানো ঘর। মন ভালো হয়ে যায়। কোথা থেকে সুন্দর মিউজিক ভেসে আসছে। বড় বেশী রোমান্টিক করে তোলা হয়েছে পরিবেশটাকে। এর আগেতো এত সৌন্দর্য চোখে পড়েনি!

বজলু কথা হারিয়ে ফেলেছে। ঘরটার মধ্যে একটা নিরবতা ঝুলে আছে। মিলাও কিছু বলছে না। বজলু একটু কেক দাঁতে কেটে বলল, সুন্দরতো!

কী।

সবকিছু।

সবকিছু কী!

তোমার ঘর, মিউজিক..।

ব্যস!

আর তুমি।

আকরাম হচ্ছে মিলার হাসবেন্ড পারভেজের বন্ধু। আকরামের সাথেই মিলাদের বাসায় নিয়ে গিয়েছিল। আকরাম গার্মেন্টস ব্যবসায়ী। ঢাকায় ওর বিরাট ব্যবসা। সম্ভবত ব্যবসার কোনো ব্যাপারে আকরাম গিয়ে থাকবে। সেদিনই পরিচয় ওই পরিবারটির সাথে। তখনই বজলু বুঝেছিল মিলা নামের মানুষটির সাথে আবার দেখা হবে। এটাই শেষ নয়। কিছু কিছু ব্যাপার আগে থেকেই বোঝা যায়। চোখের ভাষা আর ঠোটের কাঁপন অনেক বার্তা আগাম পৌঁছে দেয়। মিলাকে দেখেই বুঝেছিল সেটা বজলু।

সত্যি খুব সুন্দর লাগছে আজকে সবকিছু। বলল বজলু।

বজলু টের পাচ্ছে ওর ভিতরের স্পন্দন। কথা কেঁপে যাচ্ছে। হার্টবিটের শব্দ নিজেই শুনতে পাচ্ছে। মিলা ওর অসাধারন দুটো চোখ মেলে তাকিয়ে হাসল শুধু। মিলাকে খুব স্বাভাবিক মনে হচ্ছে। ওর ভিতরে কোনো উত্তেজনার ভাব লক্ষ করা যাচ্ছে না।

বজলু উঠে গিয়ে মিলার পাশে বসল। মিলা মৃদু ধাক্কা দিয়ে বলল, উহু নিজের জায়গায় গিয়ে বসো।

না। তোমার পাশে বসতে ইচ্ছে করছে। বলে মিলার হাত তুলে নিল হাতে। মিলার সুন্দর আঙুলে ঠোঁট ছোঁয়ালো। মিলা ওর দিকে তাকালো চোখ বড় বড় করে।

কী হচ্ছে এসব।

কিছু না। তুমি এত সুন্দর কোনো মিলা।

বানিয়ে কথা বলবা না। আমি এত সুন্দর না।

তোমার মনটা অনেক সুন্দর।

তুমি অনেক পটাতে পারো।

বিদ্যা! মোটেও পটাচ্ছি না।

বজলু যেটা করলো সেটার জন্য বজলু নিজেও প্রস্তুত ছিলনা। মিলার চুল এবং শরীর থেকে এমন যাদুকরী সুঘ্রান ছড়াচ্ছিল যে বজলু নিজেকে সম্বরণ করতে পারছে না। বজলু মিলার মুখটা কাছে নিয়ে চুমু খেলো ঠোঁটে। মিলা মনে হয় প্রস্তুত হয়েই ছিল। সে গভীর আশ্লেষে বজলুর দুটো ঠোঁট মুখে পুরে নিল। চুম্বনের এমন মোহনিয়তা আছে বজলুর জানা ছিলনা। মিলা বজলুর গলায় বুকে সর্বত্র্য চুমু খেয়েই চলেছে। বজলুও মিলাকে পরম মমতার সাথে আকড়ে ধরে রেখেছে। মিলার শার্টের বোতাম খুলে গেছে। ঘরের শুনশান নিরবতায় দুজন মানুষের ভালবাসার নি:শাস ব্যতিত আর কিছুই নেই প্রকৃতিতে। মিলা বজলুর কোলে উঠে বসেছে। ওর দিকে মুখ করে। কিন্তু মিলার হঠাৎ কী হলো। সে নেমে গেলো কোল থেকে। বলল, না!

কী! বজলু বিস্ময়ের সাথে বলল।

কিছু না।

মিলার মুখ চোখ লাল। কিছুটা হাপাচ্ছে।

তুমি যাও।

না!

প্লীজ যাও।

বজলু মিলাকে আবার কাছে টেনে নিতে যায়। কিন্তু মিলা সরে যায়। দুজনের একটা কানামাছি খেলা চলতে থাকে। মিলা দ্বিধান্বিত। সবকিছু কী বেশী তাড়াতাড়ি হয়ে যাচ্ছে! বজলু মিলাকে জোর করে আকড়ে ধরে। বজলু নিজেকে প্রত্যাখ্যাত ভাবতে পারছে না। মিলা কেনো ডাকলো! কেনো আবার এরকম আচরন করছে! কিছুই বুছতে পারে না বজলু। মিলা দৌড়ে বেডরুমে গেলো। বজলু সেখানে গিয়েই মিলাকে জোর করে খাটে শুইয়ে ফেললো। বুকের মধ্যে আকড়ে ধরে ওকে পিষে ফেলতে চাইছে। মিলা ঠাস করে একটা চর মারলো বজলুর গালে।

বজলু এরপরও চাইলে মিলাকে পেতে পারতো। কিন্তু বজলু উঠে গেলো।

তুমি যাও!

ওকে। আবার কবে দেখা হবে।

আর দেখা হবে না।

বজলু সত্যি সত্যি সেদিন চলে এসেছিল। মেয়েরা কত অদ্ভুত। মিলা পরে নিজেই বজলুকে ফোন করেছে। মেয়েদের মন বোঝা সত্যিই কঠিন।

৯.

মিলাই ফোন ধরল। তিন চার মাস আগে মিলার একটা মেইল পেয়েছিল। তখনও ঠিক ছিল না বজলু বাংলাদেশ আসবে। অনেকদিন পর মেইল পেয়ে বজলুর ভালো লেগেছিল। বজলুর ধারনা হয়েছিল মিলার সাথে সম্পর্ক চুকে বুকে গেছে চিরদিনের জন্য। বজলু একটু আবেগের বশবর্তী হয়ে দীর্ঘ রিপ্লাই দিয়েছিল। মিলা কিন্তু আর কোনো পাল্টা রিপ্লাই করেনি। তখনই জানিয়েছিল ও একটি পুত্র সন্তানের মা হয়েছে। খুউব হ্যাপী। লিখেছে তার সময় কাটানোর আর কোনো অসুবিধা নেই। বজলু যে বাংলাদেশে এসেছে এটা মিলার জানা নেই।

কেমন আছো মিলা!

ওহ্ তুমি!

থ্যাংকস চিনেছো বলে।

চিনবো না কেনো। কবে এসেছো।

বজলু কৌশলী উত্তর দিল, এই তো।

কোথায় উঠেছো!

ধানমন্ডি। তোমার ওখানে উঠতে পারলে ভাল হতো। তোমার গেষ্টরুমটা সুন্দর।

মিলা একটু কাষ্ঠ হাসি দিয়ে বলল, থাক হয়েছে। ধানমন্ডিতে কার বাসায়!

একটা সুসজ্জিত গেষ্টহাউজে উঠেছি।

ধানমন্ডিতে আবার গেষ্ট হাউজ আছে জানতাম না তো!

আরে ঢাকা শহরে কত কী হচ্ছে। ঢাকায় থেকেও জানো না! আসবা নাকি দেখা করতে!

আমার সময় নেই।

ভালো কথা তোমার বেবি কেমন আছে।

ভালো আছে।

ব্রেষ্টফিড করেতো!

করবে না কেনো!

পুত্রের বাবার অসুবিধা হয় না!

হলে হবে।

কী নাম রেখেছো!

এখনও রাখিনি। একটা নাম দাও।

একটা নাম দেবো। রাখতে হবে কিন্তু।

কথা দিচ্ছি না। পছন্দ না হলে রাখবো কেনো।!

তোমার বাবুকে দেখতে আসবো না!

তুমি কতদিন থাকবা!

জানিনা। যতদিন বলবা।

ফাজলামি রাখো। ঠিক আছে। পরে কথা হবে। বাবু কাঁদছে।

বজলু বুঝতে পারছে মিলা বেশী বাড়তে চায় না। বজলুর একটাই সমস্যা মন বুঝতে পারে না। দু’বছরের ব্যবধানে মানুষ কত বদলে যায়। তবু যে কথা বলেছে মিলা। গত দু’বছর বলতে গেলে যোগাযোগই ছিল না। কিন্তু বজলু পরিষ্কার জানতে চায় বজলুর প্রতি ওর সেই দুর্বলতাটা আছে কিনা। বজলুকে আগের মতো পেতে চায় কি না।

বজলু ঠিক করলো সে অপেক্ষা করবে। সে তো এখনই চলে যাচ্ছে না। দেখা যাক না কী হয়। মিলা যদি সব ভুলে গিয়ে থাকে তাতে খুব অসুবিধা হবে না। ভুলে যাওয়াই যখন নিয়তি তখন এসব নিয়ে বেশী ভাবার কোনো মানে হয় না। মানুষ কত বদলে গেছে!

এরপর ফোন দিল রূপাকে।

রূপার সাথে বজলুর পরিচয় অনেক দিনের। যদ্দুর জানে রূপা এখন একা। ওর বাসা রামপুরার ওয়াপদা রোডে। রূপার মধ্যে প্রেম প্রেম খেলার একটা অভ্যাস আছে। ওর জানা মতে রূপা এ পর্যন্ত অর্ধশতাধিক প্রেমিক এবং তিনজন স্বামী বদল করেছে। ওয়াপদা রোডের যে বাড়িটিতে রূপা থাকে সেটা তার প্রথম স্বামীর। রূপার নিজের নামে লিখিয়ে নিয়েছিল। সেই বিয়েটা হয়েছিল অতি ধুমধাম করে। সেটা রূপার প্রথম বিয়ে হলেও ওর স্বামীর ছিল দ্বিতীয় বিয়ে। বিয়েটা দেড় বছর মাত্র টিকেছিল। বজলু আমেরিকা থেকে বিয়ে খেতে এসেছিল। ডাকসাইটে সুন্দরী বলতে যা বোঝায় রূপা তাই। কী একটা প্রবাদ আছে না অতি সুন্দরী না পায় বর অতি ঘরনী না পায় ঘর। রূপার অবস্খা তাই। তারপরও রূপা জগতের সুখী লোকদের একজন। পোষাক বদলের মতোই পুরুষ সঙ্গী বদল করে। কিছু একটা অদৃশ্য কারণে রূপা কখনই বজলুকে বন্ধুর চেয়ে বেশী কিছু ভাবেনি। রূপার প্রতি বজলুর একটা দুর্বলতা থাকা সত্বেও বজলু দূরত্ব বজায় রেখেই চলেছে। ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব বলতে যা বোঝায় রূপা তাই। বজলুর মাধ্যমে ওর বেশ কয়েকজন বন্ধু রূপার সাথে প্রেম করার সুযোগ পেয়েছে। নিয়মিত যোগাযোগের অভাবে বজলুর সাথে কিছু দূরত্ব তৈরী হয়েছে। নিউইয়র্কে রূপার একজন পুরনো প্রেমিকের কাছ থেকেই ফোন নম্বর যোগাড় করেছে বজলু। রূপার একটা ভাল গুন হচ্ছে সে তার পুরনো স্বামী বা প্রেমিকদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে। এমনকি মাঝে মাঝে তাদের সাথে মেলা মেশাও করে।

রূপা তুমি কোথায়!

অফিসে। কে বলছেন!

রূপা একটা ভাল চাকরী করে বজলু জানে। গুলশানে অফিস। রূপার প্রথম স্বামীই চাকরীটা করে দিয়েছিল। রূপার পরের দুটা বিয়েও বেশীদিন টেকেনি। দ্বতীয়জন ছিল একজন ব্যাংকার। এই বিয়েটা টিকেছিল আট মাস। আর সর্বশেষজন ছিল একজন সাংবাদিক। সাংবাদিকের সাথে ঘর করেছিল সারে নয় মাস। রূপার অতি পুরুষপ্রীতির জন্যই একটার পর একটা বিয়ে ভেঙ্গে যেতে থাকে। সাংবাদিক স্বামী নাকি রূপাকে ভালোই পিটুনি দিতো। কিন্তু রূপা তাতে মোটেও দমে যায় নি। রূপা যে এই জগতের একজন ব্যতিক্রমী নারী একথা বলা যায় নি:সন্দেহে।

বলোতো কে!

দেখেন এই সাত সাকালে আপনি কে এই পরীক্ষা আমি দিতে পারবো না।

খুব ব্যস্ত নাকি!

খুব স্বাভাবিক, উই নো।

আ এ্যাম সরি রূপা।

কে বলছেন!

ঠিক আছে পরে কথা হবে।

ওকে দেন। মাথা এখন গরম।

বাইদ্য ওয়ে তুমি কি আগের চাকরিতেই আছো!

ইয়া!

দুপুরে আসি তোমাকে পিক করতে! একসাথে লাঞ্চ করা যাবে!

আগেতো বলবেন আপনি কে।

একটা সারপ্রাইজ হয়ে যাক।

দেখেন আমি এত কিউরিসিটি নিতে পারি না। তাছাড়া অচেনা কারো সাথে আমি লাঞ্চে যাবো এটা আশা করেন কিভাবে!

তাই নাকি! স্ট্রেঞ্জ!!

আ’এ্যাম রিয়েলি বিজি।

শোনো আমি অচেনা কেউ না। আমি বজলু।

ও!

চিনেছো!

চিনবো না কেনো! বাট তোমার সাথে দেখা করবো না।

কেনো রূপা!

তুমি খুব খারাপ মানুষ!

আমি কী করেছি সোনা!

ঢং করোনা। আমার কোনো খবরই তুমি রাখোনা।

খবর না রাখলে ফোন করলাম কিভাবে!

আচ্ছা আজকে রাখি।

আবার কখন!

কী!

তোমার সাথে আমার!

ফাজলামি করোনা।

বজলু হেসে বলল, আসছি কিন্তু দুপুরে।

এই না! বলে ফোন রেখে দিল রূপা।

বজলু বেশ হতাশ হলো। রূপা পরিষ্কার করে কিছু বলল না। রূপা বেশ ফেন্সন্ডলি।

বজলুকে বন্ধু হিসাবে খুউব গুরুত্ব দিতো। মানুষ কত বদলে যায়। বজলু নিজেকে মনে

করিয়ে রাখল আর কখনও রূপাকে ফোন করবে না। কখনও না। মানুষ কত বদলে গেছে!

১০.

কাপ্তাই। বিকেলের দিকে এখানে এসে পৌঁছেছে বজলু। বজলুর এক কাজিন আছে আর্মির

মেজর, আকবর হোসেন নাম। সেই এখন কাপ্তাই বাধঁ এলাকার ইনচাজর্। কাপ্তাই ড্যাম

এখান থেকে খানিকটা দুরে। ওরা একটা রিসোর্টের বাইরে চেয়ারে বসে গল্প করছিল।

ফেরার সময় বাঁধ এলাকা ঘুরে যাবে। এখন যেখানে বসে আছে খুব সুন্দর জায়গাটা।

একট ু আগেই আর্মির স্পীডবোট দিয়ে পুরো কাপ্তাই লেক ঘুরিয়ে আনা হয়েছে। বজলুর

সাথে এসেছে মতিউর আর চট্টগ্রামের বন্ধু কুতুবি। কুতুবি একজন ব্যাংকার। ঢাকা ব্যাংকের

বড় অফিসার। এত সুন্দর নৈসর্গিক দৃশ্য চারিদিকে যে মন ভরে যায়। চারিদিকে উচ ু উচ ু

পাহাড়। ওদিকটায় পাঁচশ মাইল পর্যন্ত শুধু বনভূমি। পুরো এলাকাটা আর্মির নিয়ন্ত্রণে।

শান্তি বাহিনীর উৎপাত কমে গেছে। তবে বৃক্ষ চোরদের উৎপাত আছে। ফরেষ্ট

এরিয়ার গাছপালা চুরি না হলে প্রতি বছর নাকি এই খাত থেকে সরকার দশহাজার কোটি টাকা রাজস্ব অর্জন করতে পারতো।

ঢাকা ছাড়ার পর থেকেই এত ভাল লাগছে! ঢাকা শহরটা যেনো একটা ওভেনের মতো হয়ে

গেছে। সর্বত্র দম বন্ধ করা উচু উচু দালান, গাছ গাছালি নেই বললেই চলে, পার্কগুলো দখল হয়ে গেছে। কিভাবে ওই শহরে এত মানুষ টিকে আছে কে জানে। দিনে রাতের অধিকাংশ সময়ই বিদ্যুৎ থাকে না। শরীর পুড়তে থাকে। রাস্তায় চলাচল করা যায় না জান যটের কারণে। এক জায়গা থেকে আর এক জায়গা যেতেই দিন পার। বাইরের দেশে থাকার কারনে বজলুর একটু অসুবিধা হয় বটে তবে সয়ে যায় সবকিছু।

কিছ ু রাজনীতিবিদ আর সরকারী কর্মচারীদের সীমাহীন দুর্নীতির কারণে দেশের কোনো

অবকাঠামোই ঠিকমত দাঁড়াতে পারেনি। দেশের সরকার প্রধানরা তার সাঙ্গ পাঙ্গদের নিয়ে

প্রতিযোগিতা করে দুর্নীতি করেছে। দেশের সাধারন মানুষের বিশ্বাসকে পূঁজি করে তাদের

শুধু ঠকিয়েছে। দুর্নীতির অভিযোগে জেলে যাওয়াকেও তারা লজ্জার মনে করে না। জেলে

বসেও হম্বিতম্বি করে। আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে কখনও স্বীকার করেনা যে সে দুর্নীতি

করেছে। কথায় আছে চোরায় না শোনে ধর্মের কাহিনী। বজলুর যদি ক্ষমতা থাকতো তাহলে

সব দুর্নীতিবাজদের জাহাজে ভরে সাগরে ফেলে দিয়ে আসতো। যে যখন ক্ষমতায় যায় সেই

ক্ষমতার অপব্যবহার করে। কথায় আছে যে যায় লঙ্কা সেই হয় হনুমান ভাবে বজলু।

সুþ ÿ হওয়ার পরই ডাক্তারের পরামশের্ চেঞ্জের জন্য প্রথমে এসেছে কáবাজার। বেশ

কয়েকদিন অসুখে ভুগেছে বজলু। অসুস্খতার কয়েকদিন বড়ই বোরিং কেটেছে সময়। ঢাকার

লোকজন এত ব্যস্ত যে কারো দেখা করতে আসারও সময় নেই। লোকজন যতনা ব্যস্ত

তারচেয়ে বেশী ব্যস্ততার ভান করে বলে বজলুর মনে হয়েছে। বাড়িতে কাউকে জানায়নি

অসুস্খতার কথা। জানিয়ে দরকার কি। মতিউরের ফ্যামিলির লোকজন যা করছে ওর জন্য

তা ভোলার নয়। কáবাজার থেকে চট্টগ্রাম শহরে এসেছে কুতুবির সাথে। ওখান থেকেই

কাপ্তাই।

কáবাজার ওরা দু’দিন ছিল। মতিউর শাংহাই থেকে ফিরে এসেই বলল, চল ঘুরে আসি।

বজলু বলল কোথায়!

কáবাজার!

বজলুও চাচ্ছিল ঢাকার দমবন্ধ পরিবেশ থেকে দুরে কোথাও যেতে। কিন্তু কাউকে বলতে

ইচ্ছে করেনি। কাউকে বদার করতে ইচ্ছে করছিল না। মানুষের মধ্যে ভীষন কৃত্তিমতা বজলুকে বেশ অবাক করে।

মজার ব্যাপার বজলু আগে কখনও কáবাজার যায়নি। সে পৃথিবীর অনেক সমুদ্র সৈকতে

গেছে কিন্তু কáবজার যাওয়া হয়নি। কáবাজার এসে বজলু এতটাই মগ্ধু হলো যে খুশীতে

চোখে পানি এসে গিয়েছিল। এত সুন্দর সমুদ্র সৈকত যে নিজের দেশেই আছে তা বজল ু

ভাবতেই পারেনি! একট ু যত ড়ব নিলে কáবাজার সমুদ্র সৈকত হতে পারে পৃথিবীর সেরা সমুদ্র সৈকতের একটি। আয় হতে পারে অনেক বৈদেশিক মুদ্রা। আইনশৃংখলা ভালো থাকলে সারা পৃথিবীর পর্যটকরা ছুেেট আসতো বাংলাদেশ এমনটাই মনে হয় বজলুর কাছে।

যে হোটেলে উঠেছে সেটাও খুব সুন্দর। হোটেলের জানালা থেকে সৈকতের ফেনিল জলরাসি

দেখা যায়। অপরূপ সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত দেখে মুগ্ধ হতে হয়। নারী পুরুষরা ছুটা ছুটা

করছে। ছুটে যাচ্ছে পানিতে। জেলেরা মাছ ধরছে। আহা কী অপূবর্ এই দেশ! বজলুও নেমে পড়েছেল পানিতে। খুব মজা করেছে।

প্রথম দিনই সাগর পাড়ে পরিচয় হয়ে গেলো সুরাইয়ার সাথে। কাকতলীয়ভাবে সুরাইয়াও

উঠেছে একই হোটেলে। আলাপ করে জেনেছে। সুরাইয়া এসেছে ঢাকা থেকে। একটা

গ্রুপের সাথে। সুরাইয়ার বন্ধুর ডিপার্টমেন্টের সাথে। সুরাইয়া গেষ্ট। সুরাইয়ার এক ভাই নাকি থাকে চট্টগ্রাম।

সকালে ভলভোর লাáারি বাসে খুব ভোরে কáবাজার এসে পোঁছেছে বজলুরা। ইচ্ছে করেই

গাড়ি নিয়ে আসেনি। এত আরামদায়ক বাস থাকতে কে গাড়ি নিয়ে আসে! হোটেলে উঠেই

ব্রেকফাস্ট করে একটু ফেন্সস হয়ে বীচের ড্রেস পড়ে ছুটে এসেছিল সূর্যোদয় দেখতে। দপুওে লাঞ্চ কওে একটু ঘুমিয়ে আবার এলো। তখনই সুরাইয়ার সাথে পরিচয়। সুরাইয়া সিক্ত বসনা হয়ে আরাম করছিল ছাতার নিচে বসে আর পা দোলাচ্ছিল। সাথে ওর চেয়ে কমবয়সী একটি মেয়ে। মতিউর আর কুতুবি কোথায় যেনো ঘুরছে। কুতুবি চিটাগাং থেকে এসে জয়েন

করেছে ওদের সাথে।

একট ু আগেও ওরা দুজন পানিতে ছুটা ছুটি করছিল। বজল ু মগ্ধু হয়ে দেখছিল। মেয়েটি

জিন্সের প্যান্ট আর ফতুয়া পড়া। খালি পা। ফর্সা দুটি পা দিয়ে বালুতে আঁকি বুঁকি করছিল।

সাধারনের চেয়ে একট ু মোটা মতো মেয়েটিকে দেখতে বড়ই আকর্ষনীয় লাগছিল। চোখে

চশমা। বেশ পাওয়ার বোঝা যায়। চশমার গ−াসে পানির ফোটা জমে আছে। বজলু দুর

থেকে কয়েকটি ছবি তুলল। যদিও এটা শোভন নয়। মেয়েটি কী দেখেছে ছবি তুলতে!

মেয়েটি ওর দিকেই আসছে! কিছ ু বলবে নাকি!

মেয়েটি কাছে আসতে বজলুই হেসে বলল, খুব সুন্দর না!

মেয়েটি একটু থতমত খেয়ে ওর দিকে তাকালো। বুঝতে পারেনি। বজলু আবার বলল, খুব সুন্দর তাইনা!

মেয়েটি বলল, আমাকে বলছেন!

হু। আপনাকেই।

কী!

সবকিছু। এমনকি আপনি যে ছুটাছুটি করছিলেন তাও।

মেয়েটি বলল, আপনি এতকিছু খেয়াল করছিলেন।

আমার সবকিছু অদ্ভুৎ সুন্দর লাগছে।

মেয়েটি ছাতার নিচে চলে গেলো। মেয়েটিকে কাছ থেকে দেখে মনে হলো অদ্ভুত এক সারল্য আছে চোখে মুখে। এই যে সিক্ত বসনা হয়ে আছে তাতে খুব একটা আড়ষ্ট ভাব নেই। মুক্ত বিহঙ্গের মতো। বোঝাই যায় জীবনের জটিলতা এই মেয়েকে তেমন স্পর্শ করেনি।

বজলু নিজে থেকেই মেয়েটিকে বলল, চলুন না হাটি।

মেয়েটি অবলীলায় বলল, চলুন। সঙ্গী মেয়েটিও চলল।

হাটতে হাটতে ওরা খানিকটা দুর চলে এসেছে। মেয়েটির সারল্য বজলুকে মুগ্ধ করছে। কথা বলতে বলতেই জানা গেলো ওরা একই হোটেলে উঠেছে।

জানেন আমি এই প্রথম এলাম কáবাজার।

যাহ্।

বিদ্যা!

মেয়েটি খুক করে হেসে ফেলল।

হাসছেন কেনো!

এমনি।

ঢাকায় কোথায় বাসা!

খিলগাঁও।

আপনার কে কে আছে।

মা এবং আরো দুই বোন। একবোন চট্টগ্রামে বিয়ে হয়েছে।

বাবা নেই!

না।

আএ্যামসরি।

ইটস ওকে।

মেয়েটি বজলু বিষয়ে কিছু জানতে চাচ্ছে না দেখে বজলু নিজেই বলে যাচ্ছে ওর কথা।

আপনি কতদিন থাকবেন!

বেশীদিন না। যাওয়ার কথা ছিল আগেই। অসুস্খ হয়ে আর যেতে পারলাম না।

আমার না বিদেশ একদম ভালো লাগেনা।

বজলু কিছু বলল না। সূর্য ডুবছে। আদিগন্ত সুমুদ্রের পানির উপর অস্তগামী সূর্যের আলো পড়ে এক অপাকৃত দৃশ্যের অবতারনা হয়েছে। অপূর্ব এই গোধুলি। ওরা নীরবে হাঁটছে। পরিবেশ একটা বড় ফ্যাক্টর। মানুষকে বদলে দেয়। এখন ফিরে যাচ্ছে।

সুরাইয়া আবার বলল, আচ্ছা বিদেশে যারা থাকে তাদের সম্পর্কে অনেক কথা শুনি। এসব কী সত্যি!

কী শোনেন!

অনেক কথা। আমার এক কাজিন আছে, দেশে থাকতে খুব দুষ্টু ছিল। কিভাবে যেনো আমেরিকা যায়। ওখানে গিয়ে বিয়ে করে এক ফিলিপিনোকে। কাগজের জন্য। দেশে আসলে এমন ভাব করে যেনো ও বিল গেটস।

সবাইতো আর এক রকম না।

আপনাকে একটা কথা বলব!

বলেন।

আমার বিয়ে দিতে চায় একজন প্রবাসীর সাথে। অস্ট্রেলিয়া থাকে ছেলে। না জেনে কী বিয়ে করা ঠিক! ওরা ছেলে সম্পর্কে কিছু জানে না।

আমার মনে হয় ভালো লোকরা বিদেশ যায় না।

আপনার ধরনা ঠিক না। বিদেশে ভালো লোক যেমন আছে, খারাপ লোকও আছে।

কি জানি বাবা আমার ভয় লাগে।

তবে বিদেশ গিয়ে অনেকে বদলে যায় এটা ঠিক। আসলে এটা ডিপেন্ড করে।

আচ্ছা আজকে যাই!

আপনার ফোন নম্বরটা দেবেন! ঢাকায় যেয়ে কথা বলবো!

সুরাইয়া বজলুকে ফোন নম্বর দিল।

একটা কথা বলব!

সুরাইয়া মাথা নাড়লো।

আপনি খুউব ভাল। পরিচিত হয়ে ভালো লাগেছে।

সুরাইয়া কিছু না বলে একটু ঘারটা নাড়লো। এটা ওর অভ্যাসের মতো, ঘাড় নাড়ানো। বজলু লক্ষ্য করেছে। ওর চমৎকার লেগেছে।

১১.

রাত থেকেই অঝোর ধারায় বৃষ্টি। ঢাকার বৃষ্টির আলাদা একটা গন্ধ আছে। সকালে ঘুম থেকে উঠেও দেখে বৃষ্টি পরছে। ক’দিনের ভ্যাপসা গরম কমে গেছে। আগস্ট মাসের শেষ। একটা পাতলা চাদর গায়ে জড়িয়ে বজলু শুয়ে আছে। উঠতে ইচ্ছে করছে না। একটু আগে মোফাজ্জল চা দিয়ে গেছে। বাড়িটা বেশ শুনশান। মতিউর চলে গেছে ওর অফিসে। চিটাগাং থেকে ওরা এসেছে দু’দিন হলো। অফিস যাওয়ার সময় ইন্টারকমে ফোন দিয়েছিল।

কিরে শালা এখনও ঘুমোচ্ছিস!

কী করবো দোস্ত। যা বৃষ্টি। দারুন লাগছে।

শুয়ে না থেকে উঠে পর। প্রেম ফেন্সম কর।

ধুর! ঢাকার মেয়েদের সাথে কিছু হবে না। সব কেমন যেনো আর্টিফিসিয়াল হয়ে গেছে।

তাতো হবেই। তুই কি মনে করেছিস সব মেয়েরা তোর বুকে এসে ঝাপিয়ে পরবে!

তা না। সবাই খুব নিজেকে ইর্ম্পটেন্ট ভাবে। ফোন করলেই বলে বিজি।

স্বাভাবিক।

তোর গার্লফেন্সন্ডরা কোথায়!

আমি ওসবের মধ্যে নেই বাবা। মেয়েদের পিছনে ভ্যাজর ভ্যাজর করতে ভালো লাগেনা। ওয়েস্ট অফ টাইম উই নো! যখন দরকার হবে বেষ্ট মেয়ে খুঁজে নেওয়া কোনো ব্যাপার না ঢাকায়। জাস্ট স্পেন্ড মানি, থ্রি ফোর থাউজেন্ড, দ্যাটস ইট ম্যান।

আই ওয়ান্ট লাভ। চাইনা বাঁচতে আমি প্রেমহীন হাজার বছর..।

তুইতো শালা বিশ্বপ্রেমিক। তোর কপালে দু:খ আছে। প্রেম ফেন্সম ওসব বুলশিট জিনিস।

ওকে ভাগ তুই।

দুপুরে আয়। একসাথে লাঞ্চ করা যাবে।

ওকে বস।

বজলু রেডি হয়ে ফোন করলো সুরাইয়াকে। বৃষ্টিটা কমে এসেছে। একটু আগে ড্রাইভার খবর নিয়ে গেছে বের হবে কিনা বজলু।

সুরাইয়া কেমন আছেন!

ওহ আপনি!

ঠিকঠাক মতো পৌঁছে ছিলেনতো!

হু।

সুরাইয়া মুখে যত না কথা বলে তারচেয়ে বেশী ইঙ্গিতে বলে বেশী। ঘার নেড়ে জবাব দেয়। মনে হয় ফোনেও সে ঘার নাড়ছে।

বিকেলে আপনি কী ফন্সী আছেন!

হু।

বজলু হাসলো।

হাসছেন কোনো!

আপনি শুধু হু হু করছেন তাই।

ওহ।

শোনেন সুরাইয়া। পাঁচটায় বসুন্ধরা সিটিতে আসতে পারবেন!

হু।

বজলু হেসে বললো ঠিক পাঁচটায়। ফুটকোর্টে।

বজলু বের হয়ে দেখলো রাস্তায় মহা ট্রাফিক। একটা কালার ল্যাবে গিয়ে কáবাজারের ছবিগুলো ওয়াশ করালো। রাপা প্লাজায় গিয়ে কিছু গিফ্ট কিনলো। তারপর গেলো মতিউরের অফিসে। মতিঝিল পৌঁছতে প্রায় দেড় ঘন্টা লেগে গেলো। হেভি হাই ফাই অফিস মতিউরের। বজলু যেতেই চা এসে গেলো।

দোস্ত তোর রিসেপশনিষ্ট মেয়েটা তো হেভি। ঢাকার মেয়েগুলেকে দারুন সুন্দর লাগে দেখতে!

ভারতীয় টিভি সিরিয়ার দেখে দেখে মেয়েগুলো খালি সাজ সজ্জা করে। যখন সিরিয়াল শুরু হয় তখন কথা বলার হুস থাকে না। ডিজগাস্টিং!

নাম কিরে মেয়েটার!

ও বাবার সিলেকশন! নজর দেয়া যাবে না। চল বের হই।

কোথায়!

সোনারগাঁয়ে লাঞ্চ করবো। ওখানে আরো দু’একজন আসবে। বিজনেসের ব্যাপারে।

গাড়িতে বসে মতিউর জিজ্ঞেস করলো সুরাইয়ার সাথে কথা হয়েছে!

হু।

দেখা হবে!

হু।

হু হু করছিস কিনো!

বজলু হেসে বললো, সুরাইয়া মেয়েটা সারাক্ষন হু হু করেতো তাই।

ধুর শালা বলে দুজনেই হেসে উঠল।

পাঁচটা। দুর থেকে দেখতে পেলো সুরাইয়াকে। মেয়েটার সময় জ্ঞ্যানের প্রশংসা করলো বজলু মনে মনে। আজকে মেয়েটিকে একদম অন্যরকম লাগছে। সুতি কামিজে অ্যাপলিক কাজ, শো বোতাম ও এমব্রয়ডারি করা। নাকে একটা ডায়মন্ড। কáবাজওে নাকের ডায়মন্ড দেখেনি। বজলুর জন্য কী এটুকু সেজেছে! এছাড়া আর তেমন সাজেনি।

প্রথমেই যেটা করলো বজলু সেটা সুরাইয়ার প্রশংসা, আপনাকে খুউব সুন্দর লাগছে।

সুরাইয়া কিছু বলছে না দেখে বজলু বলল, আচ্ছা আমি কী আপনাকে তুমি বলতে পারি!

সুরাইয়া মাথা নাড়লো শুধু।

কী খাবেন!

আমি জানি না।

ওকে ফাইন।

ওরা একটা টেবিল বেছে নিয়ে বসলো। একটু পরই দোকানীরা আসতে শুরু করলো। নিজেদের খাবারের সাফাই গাওয়া আরম্ভ করলো। এটা খান ওটা খান বলে পিড়া পিড়ি শুরু করছে। ব্যপারটা খুবই বিরক্তিকর!

বজলু কিছু খাবারের অর্ডার দিল।

বজলু দুগালে হাতের ভর রেখে কিছুক্ষন চুপ চাপ বসে থাকলো। এক আধটু দেখলো সুরাইয়াকে। সুরাইয়া স্বভাবসুলভ একটু হাসলো। বজলুর মনের মধ্যে অনেক কথা কিন্তু কি দিয়ে যে শুরু করবে বুঝে উঠতে পারছে না। বজলু জীবনে বহুবার এই পরিস্খিতি মোকাবলো করেছে। আজও করছে। বজলুর ভাবনার মধ্যে আসলে কোনো স্খিতিশীলতা নাই তাই সে কোনো কিছু আদায় করে নিতে পারে না। সুরাইয়া যে আসবে এটা ও ভাবেনি প্রথম। মনে করেছিল শেষমুহুর্তে হয়ত নাও আসতে পারে। তবে বজলুকে এত সহজে ইগনোর করা যায় না। বজলু সবকিছুই পায়, আবার পেয়েও হারায়। বা পেতে পেতে হারায়।

সুরাইয়া তুমি এসেছো আমি খুব খুশী হয়েছি। তোমাকে বিশেষ ভালো লেগেছে। তোমার মধ্যে কী যেনো একটা আছে।

সুরাইয়া কিছু বলছে না দেখে বজলু বলল, তুমি কিছু বলছো নাতো।

আপনার কথা শুনছি।

তোমার কিছু বলার নাই বুঝি!

সুরাইয়া একথায় হাসলো শধু।

বজলু কáবাজারের ছবিগুলো বের করে সুরাইয়াকে দিল। সব তোমার।

খুউব সুন্দর হয়েছে!

তোমার পছন্দ হয়েছে!

হু। আপনার ছবি তোলার হাত খুব ভালো।

সুরাইয়া তোমাকে একটা কথা বলি!

বলেন।

তুমি আমাকে তুমি করে বলবে!

ঠিক আছে বলবো। তবে আজ না।

কোনো!

একটু সময় লাগবে।

তুমি থাকায় কáবাজার আমার কাছে আরো আনন্দময় হয়ে উঠেছিল।

আমরাও খুব এনজয় করেছি।

তুমি বেড়াতে পছন্দ করো!

খুউব!

আমি অনেক ঘুড়ে বেড়াই!

ইস্ ছেলেদের কী মজা!

তুমিও চাইলে পারো।

কিভাবে!

ওইযে অস্ট্রেলিয়ার পাত্র বিয়ে করলে! বলেই হেসে ফেললো বজলু। জাস্ট কিডিং।

আমি একদম বিদেশের ছেলে বিয়ে করতে চাই না।

বজলু হতোদ্যম হয়ে বলল, কেনো সুরাইয়া!

জানি না। আমি বিদেশে গিয়ে থাকতেই পারবোনা। মাকে রেখে আমি যাবো না। তাছাড়া…।

তাছাড়া কি!

না কিছু না।

আচ্ছা চলো তোমার মায়ের সাথে পরিচিত হয়ে আসা যাক।

যাবেন আপনি!

সিউর!

সুরাইয়া সাথে সাথে বললো চলেন এখনই যাই।

বজলু ভাবতেই পারেনি যে সুরাইয়া ওকে ওদের বাসায় নিতে রাজী হবে।

কেউ কিছু মনে করবে না!

নাহ। কী মনে করবে। মা আমার ইমিডিয়েট বড় বোন শুধু থাকি।

খিলগাঁও সুরাইয়াদের বাসায় যেতে অনেকটা সময় লাগলো। গলির ভিতর ঘিজি ঘিজি রিáা। একটা দোকান থেকে বজলু প্রচুর মিষ্টি কিনলো।

সুরাইয়া বললো এত মিষ্টি কে খাবে!

তুমি খাবে। আমরা সবাই খাবো।

সুরাইয়াদের পাঁচতালা বাড়ি। ওরা পাঁচ তালায়ই থাকে। চারতালায় ওর এক খালা থাকে ভাড়া। অন্যান্য তালাও সব ভাড়া দেয়া। ওদের দুটো দোকান আছে। তাও ভাড়া দেয়া। ওর বাবা মারা যাওয়ার সময় এসব রেখে গেছেন। এগুলোই ওদের আয়ের উৎস। সুরাইয়ার বয়স বাইশ তেইশ হবে। এবছর অনার্স ফাইনাল দেবে।

ওরা যখন পৌঁছলো তখন রাত আটটা হয়ে গেছে। দরজা খুললো সুরাইয়ার বোন। মেয়েটিকে দেখে চোখ চরক গাছ হয়ে গেলো বজলুর! নজরকারা সুন্দরী মনে হয় একেই বলে। সুরাইয়ার চেয়ে এক বছরের বড়। পিঠাপিঠি। বজলুকে পরিচয় করিয়ে দিল ওর বোন আর মায়ের সাথে। সুরাইয়ার মা খুব শান্ত একজন মহিলা।

কিছুক্ষন আগে কারেন্ট চলে গেছে। বেশ গরম রাগছিল বজলুর। কিন্তু বালো লাগছিল খুব। চমৎকার সুরাইয়াদের ফ্যামিলিটা। সবাই এত ভালো। ওর বোনটা বেশ হাসি খুশী।

সুরাইয়া বললো চলেন ছাদে যাই।

চলো।

ছাদে যেয়ে দেখলো হালকা চাঁদ উঠেছে। যদিও ঢাকার আকাশে চাঁদ দেখা যায় না। ফুর ফুওে বাতাস। চারিদিকে বিল্ডং আর বিল্ডিং। বিদেশে এ রকম গায়ে গায়ে বিল্ডিং থাকে না। এক বিল্ডিং থেকে আর এক বিল্ডিং এর কিছু দেখা যায় না, এমনকি কেউ ডাক দিলেও কিছু শোনা যাবে না।

সুরাইয়া।

উ।

তুমি খুব ভাল।

আগেও বলেছেন।

আমাকে তুমি করে বলো প্লীজ।

সুরাইয়া খুট করে হেসে বলল, না।

ওরা চুপচাপ হাঁটছে ছাদে। কেউ কোনো কথা বলছে না। সুরাইয়া মেয়েটি এত কম কথা বলে! মেয়েটিকে বুঝতেই পারছে না। হঠাৎই বজলু বলল, আমি কী তোমার হাতটা ধরবো!

না।

বজলু থমকে বলল, কেনো সুরাইয়া!

আমি একজনকে ভালবাসি। ঢাকায়ই থাকে।

ওহ। আইএ্যাম সরি।

না না ইটস ওকে।

বজলুর সাথে শিলা, রূপা, স্বর্ণা, সুরাইয়া, মিলা আর কারো সাথেই দেখা হলোনা। ওর ফিরে যাওয়ার সময় হলো। সেখানে আবার পুরনো জীবনের হাতছানি।

১২.

মানুষ বদলে গেছে। মানুষ আর আগে মতো নাই। বজলু ওর চাওয়া পাওয়ার হিসেব কষে দেখলো চমৎকার সব অভিজ্ঞতা হচ্ছে মানুষ সম্পর্কে। অভিজ্ঞতার ঝুলি মোটামুটি ভরে উঠছে। ওর এই তিরিশ বছর বয়সে এতো অভিজ্ঞতা বোধকরি ষাট বছরেও কারো হয়না। বজলুর ফিরে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে। অসুস্খতার কারনে কয়েকটা দিন বোনাস থাকা হয়ে গেলো। আর তিন দিন পর ফöাইট। দেশের মানুষ যতই বদলে যাক চমৎকার জীবন এখানকার। বৈচিত্র্য আছে। বিদেশের মতো না। প্রানের স্পন্দন আছে। নিজের দেশ বলে কথা। সেই উনিশ বছর বয়সে দেশ ছেড়েছে। গত পাঁচ বছর থেকে বলতে গেলে প্রতি বছর দেশে আসে বজলু। মা আছে বলেই আসে। না হলে এত ঘন ঘন আসা হতো কিনা কে জানে। অনেক উচ্ছাস নিয়ে আসে প্রতি বছর কিন্তু সে রকম কিছু ঘটেনা। কিছ বিচ্ছেদের বেদনা নিয়ে ফিরে যেতে হয়। যাদের দেখে গেছে তাদের কাউকে হয়ত আর দেখবে না। তাছাড়া মানুষ অনেক বদলে গেছে।

বিদেশেও রয়েছে বজলুর অসংখ্য সব অভিজ্ঞতা। এর শেষ কোথায় কে জানে! পাঁচ বছর আগে একবার একজন বলেছিল ওর আইকিউ নাকি পঞ্চাশ বছর বয়সের লোকের আইকিউর সমান। কথাটা বজলুর একদম বিশ্বাস হয়নি। বজলুর আইকিউ খুউব ভালো নয়। ও যা মনে করে প্রায়শ:ই তা হয় না। যা চায় তা ওর মতো করে পায় না।

এর মধ্যে সুরাইয়া একদিন ফোন করেছিল।

আপনি কী আমার উপর মাইন্ড করেছেন!

বজলু হেসে বলল, নাহ। মাইন্ড করবো কেনো।

আপনি অনেক ভালো। আপনাকে বাসার সবাই খুব লাইক করেছে!

কিন্তু তুমি করোনি।

আমিও করেছি। আমিরিকা গিয়ে ফোন করবে।

ওকে। শোনো সুরাইয়া তোমাকে কখনও ভুলবো না। তোমরাও অনেক ভালো। তুমি করে বলার জন্য ধন্যবাদ।

বজলু ফোনেই শুনতে পেলো সুরাইয়ার হাসি।

বিয়েতে দাওয়াত পাঠিও কিন্তু।

আসবে তো!

পাঠিয়েই দেখো না।

রূপা বা মিলা কারো সাথেই আর দেখা হয়নি। ফোনেও কথা হয় নি। স্বর্ণার কথা খুব মনে পরছিল। চাঁদনি রাতের সেই স্মৃতি। মেয়েটি কেমন পাগল না! আর ফোন দিলো না কখনও।

শিলার সাথে দেখা হলো কালকে। বজলু জানতো দেখা হবেই। এটা ঠিক যে মনে মনে একটু অভিমান পর্ব চলছিল। শিলা এরকম মেয়েই না যে বজলুকে ভুলে যাবে। ও অন্যদের মতো না। ওর কথা যখন খুব ভাবছিল তখনই শিলার ফোন।

অনেক দিন বাঁচবি। একই বলে টেলিপ্যাথি।

কোনো আমার কথা মনে করছিলা!

হু। ফোন দিসনি কোনো এতোদিন পাজী!

দেখলাম তুমি আমার কথা কতটুকু মনে রেখেছো।

আসলে আমি একটু অসুস্খ ছিলাম। তারপর ঢাকায়ও ছিলাম না! তবে তোকে খুব মিস করেছি। ভেবেছিলাম আর কেউ না হলেও তুই খোঁজ খবর নিবি।

আসলে ভাইয়া আমার পরীক্ষা চলছিল..।

এনিওয়ে। পরশু চলে যাচ্ছি বুঝলি।

তোমার সাথে দেখা করবো।

চলে আয় না।

ওকে আসছি।

শিলা এসেছিল। বজলুর জন্য অনকেগুলো শার্ট কিনে নিয়ে এসেছে। সুন্দর করে সেজে এসেছিল শিলা অনেক গল্প করলো। বজলুর হাত ধরলো। গালে চুমুও খেয়েছিল। চোখে পানি চিক চিক করছিল। বজলুর খুব ইচ্ছে করছিল শিলাকে অনেক আদর করে। কিন্তু ও কথা রেখেছে। তুই হচ্ছিস আমার একটি মাধবী বুঝলি!

(সমাপ্ত)

আরও পড়ুন

Back to top button
Translate »