আর্কাইভ

সরিষার মধ্যেই ভূত আছে!

ওয়ালি-উর-রহমানঃ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার সামনাসামনি মোট চারবার দেখা হয়েছে। দুবার জেনেভায়। দুবার বাংলাদেশে। ১৪ আগস্ট ১৯৭৫ সন্ধ্যায়। প্রতিবারই বিভিন্ন বিষয়ের ফাঁকে সংবিধান নিয়ে কথা হয়েছে। একবার তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, সবাই আমার কাছে কিছু না কিছু চাইতে আসে। তুই কিছু চাইলি না। আমি বিনীতভাবে বললাম, 'স্যার আপনি যা দিয়েছেন তার বেশি আমার কিছুই চাওয়ার নেই।' প্রিয় পাঠক, আপনারা জানেন প্রায় একই সময় থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া এবং বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে যাত্রা করে পৃথিবীর পথে। সে সময় জিডিপির দিক দিয়ে বাংলাদেশ অনেকের চেয়ে এগিয়েছিল। সদ্য স্বাধীন একটি দেশ একদিকে বিধ্বস্ত জনপদ, অন্যদিকে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র। একদিকে জাসদ অন্যদিকে সর্বহারা। ইরাক, মিসর, ইয়েমেন ছাড়া সারা আরব বিশ্ব বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তানের অন্যতম মিত্র চীন মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে থাকায় স্বাধীন বাংলাদেশের উন্নয়নে বঙ্গবনু্লর শাসনামলে কোনো ভূমিকাই রাখেনি।

বরং তারা জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদস্য লাভের বিরোধিতা করেছে। বাংলাদেশ বিরোধী শক্তিকে নানাভাবে সহায়তা করেছে। আমাদের দেশের পিকিংপন্থিরা স্বাধীনতার দীর্ঘদিন পরও এ দেশকে পূর্বপাকিস্তান মনে করত। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীকে তারা নিজেদের প্রধানমন্ত্রী ভাবতেন।

১৯৯৬ থেকে ৯৮ আমি যখন বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিদের বিভিন্ন দেশ থেকে ধরে আনার জন্য গঠিত জাতীয় আন্তর্জাতিক টাস্কফোর্সের সমন্বয়কারী হই, তখন এ দায়িত্বপ্রাপ্তিকে আমার চাকরি জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অধ্যায় হিসেবে গণ্য করেছিলাম। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে আজকের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন একটি নীরব মিছিলের আয়োজন করেছিলেন। সেই মিছিলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে মনজুরুল আলম আর আমি অংশ নিয়েছিলাম। রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড নিয়ে লিবিয়া একটি সেমিনারের আয়োজন করেছিল। সেই সেমিনারে আমি অংশ নিয়েছিলাম_ এসব অপরাধে পররাষ্ট্র সচিব আমাকে ওএসডি করল। স্বরাষ্ট্র সচিবের কাছে গেলাম। তিনি ব্যঙ্গোক্তি করে বললেন, তুমি দুটো কুকুর পোষ। এদের নিয়ে হাঁট। আমি গর্জে উঠে বললাম, তাই তো আপনি কুকুরের মতো বিহেভ করছেন। আমি যখন টাস্কফোর্সের প্রধান হই, তখন এসব কথা মনে পড়ছিল।

টাস্কফোর্সের দায়িত্ব নিয়েই আমি যখন খুনিদের অবস্থান জানতে খোঁজ-খবর নেওয়ার চেষ্টা করছিলাম তখন আঁতকে উঠি। ফারুক, রশীদ, আজিজ পাশা, কিসমত হাসেম, মহিউদ্দিন_ এরা কতটা ক্ষমতাশালী বাংলার মানুষ তা কোনোদিন ভাবতে পারবে না। কেউ কেউ কূটনৈতিক দায়িত্ব পেয়েছিলেন পুরস্কার হিসেবে। সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের রাষ্ট্র পুরস্কৃত করেছে। বেতন-ভাতা দিয়েছে, পার্লামেন্টে বসিয়েছে। ১৯৯৬-এর ১৫ ফেব্রুয়ারির তথাকথিত নির্বাচনে খুনি রশীদকে বেগম জিয়া বিরোধীদলীয় নেতা বানিয়েছিলেন স্বাধীনতাবিরোধীদের পৃষ্ঠপোষকতা দিতে। ১৯৭৫-এর পটপরিবর্তনের পর প্রতিটি সরকার ১৯৯৬-এর ১২ জুনের আগ পর্যন্ত তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছে। ১৯৯৬ সালের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন মরহুম আবদুস সামাদ আজাদ, প্রতিমন্ত্রী ছিলেন আবুল হাসান চৌধুরী এবং পররাষ্ট্র সচিব ছিলেন ফারুক সোবাহান। ফারুক সোবাহান অমুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের পররাষ্ট্র বিভাগে চাকরি করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি প্যারিসে প্রথম সচিব ছিলেন। পরবর্তীকালে অনেকের মতো দেশে ফিরে আসেন। যেহেতু তিনি বিশিষ্ট নাগরিক রেহমান সোবহানের ভাই, তাই পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে তার নিয়োগপ্রাপ্তি নিয়ে কেউ হইচই করেনি। টাস্কফোর্স দেখাশোনা করা ছাড়াও আমাকে আরও কিছু কাজ করতে হয়েছে। যেমন একদিন ফারুক সোবাহান মিনমিন করে ফোনে বললেন প্রধানমন্ত্রী চাচ্ছেন আপনি দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেখা করে তাকে দেশে নিয়ে আসেন স্বাধীনতার রজতজয়ন্তীতে। যে স্বাধীনতা ফারুক সোবাহানরা কখনো চাননি, সেই স্বাধীনতার 'রজতজয়ন্তী' উদযাপনের বিষয়ে আমার মতো মুক্তিযোদ্ধাকে নির্দেশ দিচ্ছেন! আমি সাউথ আফ্রিকা গেলাম। রজতজয়ন্তীতে নেলসন ম্যান্ডেলাও এলেন। টাস্কফোর্স নিয়ে কাজ করার সময় আবার দেখলাম শর্ষের মধ্যে ভূত। বঙ্গবন্ধু যেমন তার শত্রুদের শনাক্ত করেও শাস্তি দিতে পারেননি। আমিও প্রকৃতপক্ষে অনেকের কাছ থেকে কাক্সিক্ষত সহযোগিতা পাইনি। অনেকেই এ ব্যাপারে অস্বচ্ছ ভূমিকা পালন করেছেন। রবার্ট মুগাবের সঙ্গে আলাপ করে আমি যখন আজিজ পাশাকে প্রায় ধরেই ফেলেছিলাম, সে সময় আমাকে দ্রুত ঢাকায় আসতে বলা হলো। হুদাকে নিয়ে আসতে পেরেছিলাম ব্যাংকক থেকে। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে বাকি সবাই আমাকে প্রতি পদে পদে নিরুৎসাহিত করেছেন। সরকারের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিকভাবে প্রচারের জন্য একটি বুকলেট বের করা হয়। সেখানে কোনো প্রকাশক বা ঠিকানা নেই। খুনিদের ব্যাপারে কোথায় তথ্য পাঠানো হবে, তাও নেই। এসব আচরণ দেখে আমি আজ নিশ্চিত, শর্ষের মধ্যেই ভূত লুকিয়ে ছিল। টাস্কফোর্সের সমন্বয়কারী হিসেবে আমি যোগাযোগ করি ইন্টারপোল এমআই-৫-সহ বিশ্বের বড় বড় গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে। বাংলাদেশের খ্যাতিমান গোয়েন্দা কর্মকর্তা আবদুল কাহহার আখন্দ এসব ব্যাপারে আমাকে বিশেষভাবে সহযোগিতা করেছেন। ডিআইজি হান্নান সাহেবের সহযোগিতায় আমরা খুনিদের ছবি দিয়ে একটি পোস্টার বের করেছিলাম, এগুলো বাংলাদেশ মিশনগুলোয় ঝুলানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ২০০১-এর নির্বাচনের পর টাস্কফোর্সের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। বিএনপি-জামায়াত আমলে খুনিদের অনেকেই জেল থেকে ছাড়া পায়। বেকসুর খালাস পায় কেউ কেউ। মেজর খায়রুজ্জামানকে প্রথম মিয়ানমার, পরে মালয়েশিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় রাষ্ট্রদূত করে পাঠানো হয়। কারণ তিনি জিয়াউর রহমানের আমলের সিনিয়র মন্ত্রী মশিউর রহমান জাদু মিয়ার জামাতা। কিসমত হাশেমও বেকসুর খালাস। আমি জানতে পেরেছি যে, টাস্কফোর্স রিপোর্টসহ প্রায় ২০-৩০ কেজি ওজনের ফাইল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আসার পর অতি গুরুত্বপূর্ণ অনেক ফাইল গায়েব করে ফেলা হয়েছিল। যার ভেতরে বঙ্গবন্ধুর জেনেভা সফরের ফাইলও ছিল। ইতিহাসের একটি বিরাট অংশ হারিয়ে গেল। এখন হয়তো অনেকে বলবেন যে, আমাকে তো দায়িত্ব দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাকে কেন সব বিষয় অবহিত করিনি? এটা সম্ভব ছিল না। উচিত হতো না। তিনি সরকারপ্রধান। তার দায়দায়িত্ব অনেক। দেশ-বিদেশের প্রতিটি বিষয় তাকে দেখতে হয়। মাঝে মাঝে তার সঙ্গে যোগাযোগ করে পরামর্শ নিয়েছি। আমার কাজে কারা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে তাও তাকে জানিয়েছি। তিনি বলতেন, সময়ে সব ঠিক হয়ে যাবে।

৭ বছর পর আজ আবার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ওয়াদার মধ্যে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের বিচারের কথাও ছিল। এছাড়া এটা ছিল বাংলার মানুষের প্রাণের দাবি। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার না হলে বাংলাদেশ পৃথিবীর বুকে আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারত না। এ জাতি অভিশপ্ত হিসেবে বিবেচিত হতো। জনকের রক্তে এদেশ রঞ্জিত। শিশুর রক্তে এদেশ কলঙ্কিত। প্রসূতি মাতার রক্তে এদেশ কাতর_ এমন লজ্জা আমাদের তাড়িয়ে বেড়াতো। বঙ্গবন্ধুকে খুন করে এ জাতিকে বিশ্বসভায় লজ্জিত করা হয়েছিল। ১৯৯৬ সালের আগে খুনিদের পদভারে প্রকম্পিত হয়েছে চারদিক। তার পর শুরু হয় তাদের বিচার প্রক্রিয়া। খুনিদের কারও কারও ফাঁসি হলেও এখনো পালিয়ে বেড়াচ্ছে কেউ কেউ। কোন পাপী বাঙালি এদের সঙ্গে মিত্রতায় মগ্ন। আমরা এ বর্বরোচিত হত্যার বিচার চেয়েছিলাম। বিচারের রায় প্রদান করা হয়েছে। যেসব দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত খুনি দেশের বাইরে পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করছে তাদের ধরে এনে রায় কার্যকর হোক_ বাংলাদেশের জনগণের এখন এটাই কাম্য।

খবর: সংগৃহিত

আরও পড়ুন

Back to top button
Translate »