দালালচক্রের নিয়ন্ত্রণে গৌরনদী ভূমি অফিস

আহছান উল্লাহ: দালালদের হাতে অরক্ষিত হয়ে পড়েছে বরিশালের গৌরনদী ভূমি অফিস। দালালচক্রের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে সেবাগ্রহীতারা। অফিসের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারীর যোগসাজশে চলছে নানা অনিয়ম। প্রভাবশালী দালালরা অফিসের গোপনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ নথি অবাধে নাড়াচাড়া করছে। তাদের দেখলে মনে হয়, তারাই অফিসের হর্তাকর্তা।

কোনো সেবাগ্রহীতা অনিয়মের প্রতিবাদ বা অভিযোগ করলে পরবর্তী সময়ে তাদের সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হয়। তাই হয়রানির ভয়ে কেউ মুখ খোলার সাহস পায় না। ভূমি অফিসের কেউ সরকারি বিধি-বিধানের তোয়াক্কা করে না। অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী দীর্ঘদিন একই অফিসে চাকরি করার সুবাদে প্রভাবশালী বনে গেছেন। মোটা অঙ্কের উেকাচ ছাড়া কোনো কাজ করে দেন না তাঁরা।

সম্প্রতি দুদক বরিশালের পরিচালক জুলফিকার আলীর নেতৃত্বে একটি দল গৌরনদী উপজেলার বিভিন্ন অফিসে হানা দেয়। ওই সময় ভূমি অফিসের নানা অনিয়মের ব্যাপারে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।

গত শনিবার দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ভূমি অফিসের অফিস সহকারী আলওয়াল হোসেন সাপ্তাহিক ছুটির দিনে কার্যালয়ের কক্ষ খুলে বারান্দা দিয়ে হাঁটাচলা করছেন। আর অফিসকক্ষের ভেতরে প্রভাবশালী দালাল ওহাব সিকদার ও সুলতান আহম্মদ সুরক্ষিত আলমারি খুলে ফাইলপত্র ঘাঁটছেন। এ সময় ওই কক্ষে উপজেলার পিংগলাকাঠী গ্রামের আবদুল গফুর নামের একজন সেবাগ্রহীতাও বসে ছিলেন।

বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, প্রভাবশালী পাঁচজন দালাল নিয়মিত ভূমি অফিস চষে বেড়ান। সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও একাধিক অফিস সহকারী দালালদের নিয়ে অফিসের গুরুত্বপূর্ণ নথি বের করে রহস্যজনক কার্জক্রম চালাচ্ছেন।

প্রভাবশালী পাঁচ দালাল হচ্ছেন ওহাব সিকদার, আনোয়ার হোসেন, সুলতান আহম্মেদ, নাসির উদ্দিন ও ইউনুচ মিয়া। এর মধ্যে সুলতান আহম্মেদ ভূমি অফিস থেকে দুই বছর আগে পিয়নের পদ থেকে অবসরে গেছেন। গৌরনদী ভূমি অফিসের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে দালালরা বেপরোয়াভাবে সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি করছেন। নামজারির সেবা থেকে শুরু করে যেকোনো কাজের জন্য মোটা অঙ্কের উেকাচ নিচ্ছেন তাঁরা। দালালদের দাপটে সেবাগ্রহীতারা কোনো অনিয়মের প্রতিবাদ করার সাহস পায় না।

অফিসের একটি সূত্র জানায়, ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রায় ৬১৮টি জমির নামজারি ঝুলে আছে। এর সঙ্গে চলতি বছর আরো অনেক নতুন কেস জমা পড়েছে।

সূত্রটি আরো জানায়, সরকারি বিধি মোতাবেক একটি নামজারি কেস অনলাইনে আবেদনের পর সরকারি নির্ধারিত ফি এক হাজার ১৭০ টাকা জমা নিয়ে ২৮ দিনে নিষ্পত্তি করার কথা। সরকারি ফির কয়েক গুণ বেশি উেকাচের টাকা দিয়েও গ্রাহকদের কাঙ্ক্ষিত সেবা মিলছে না। টিকাসার গ্রামের কৃষক সেলিম বেপারি জানান, অফিস সহকারী আলওয়াল হোসেনকে একটি নামজারি কেসের জন্য সাড়ে আট হাজার টাকা উেকাচ দিয়েও কোনো লাভ হয়নি। প্রায় দুই বছর ভোগান্তির পর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দিলে বরিশাল জেলা প্রশাসকের কার্যালয় বিষয়টি তদন্ত করে। কিন্তু আজও তিনি কোনো প্রতিকার পাননি। অভিযোগ দেওয়ার কারণে উল্টো প্রভাবশালী আলওয়াল তাঁকে নানাভাবে নাজেহাল করছেন।

গৌরনদী বন্দরের কামাল হোসেন জানান, তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ দিয়ে লাভ নেই। কেননা ঘুষ দেওয়ার কোনো প্রমাণ থাকে না। এ ছাড়া তাদের নেপথ্য শক্তির কারণে এখানে অনেকেই সুবিচার পাচ্ছে না। আরো জানা যায়, গৌরনদী ভূমি অফিসের অফিস সহকারী কাম কম্পিউিটার অপারেটর সাজেদা বেগম, নুর হোসেন পাইক দালালচক্রের সঙ্গে যোগসাজশের মাধ্যমে অনিয়ম করেই চলছেন। অফিসের জনগুরুত্বপূর্ণ গোপন নথিপত্র, ফাইল, ভলিউম দালালদের হাতে তুলে দিচ্ছেন তাঁরা। এসব কারণে গৌরনদী ভূমি অফিস অরক্ষিত হয়ে পড়েছে বলে সচেতন মহলের দাবি।

এ ব্যাপারে গৌরনদী উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক জামাল উদ্দিন বলেন, ভূমি অফিসে প্রভাবশালী দালালচক্র প্রতিনিয়ত সাধারণ মানুষকে হয়রানি করছে।

উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফারিহা তানজিন বলেন, এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা প্রমাণ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রথম প্রকাশঃ কালেরকন্ঠ