আর্কাইভ

ভ্যালেন্টাইন নয় ফ্রাঙ্কেনস্টাইন

মৃদুল আহমেদ : একটা চাপা কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছে। নারীকণ্ঠ নয়, পুরুষকণ্ঠ।
ভোর এখনো হয়নি। হালকা হালকা আলো ফুটছে। শরফুদ্দিন সাহেব এ রকম সময়ই পার্কে হাঁটতে আসেন রোজ। বাড়ির কাছের পার্ক, আসতে লাগে দুই মিনিট।
তাঁর একটু ভয় ভয় লাগল। জিন-ভূত না তো! অবশ্য এত দিন ধরে পার্কে আসছেন, দু-তিনবার কুকুরের ধাওয়া খাওয়া ছাড়া সে রকম কোনো ঝামেলায় পড়েননি! একবার শুধু ধাওয়া খেয়ে দৌড়ানোর সময় বিশ্বাসঘাতক লুঙ্গিটা পট করে খুলে গিয়েছিল। ভোরবেলা বলে বেঁচে গেছেন। কেউ দেখেনি, বদমাশ কুকুরগুলো ছাড়া।
মোড় ঘুরতেই দেখলেন পার্কের বেঞ্চে একটি ছেলে বসে আছে। সেটা দেখে আরও ঘাবড়ে গেলেন তিনি। ছিনতাইকারী-ফিনতাইকারী না তো!
কিন্তু এভাবে ভয় পাওয়া তো তাঁর মানায় না। তিনি পার্কের ‘সহস্রবর্ষ সুস্বাস্থ্য সংঘে’র প্রেসিডেন্ট। তাঁদের স্লোগান, ‘স্বাস্থ্যই সকল সাহসের মূল!’
একটু এগিয়ে ছেলেটিকে বললেন, ‘এই যে ভায়া! এই রাতভোরে পার্কে বসে কান্নাকাটি কেন?’
ছেলেটি চমকে উঠল। তারপর ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। ২৩-২৪ বছরের একটি ছেলে। মাথার চুল উষ্কখুষ্ক! চোখ দুটো ভেজা এবং লাল। বলল, ‘ও, ভোর হয়ে গেছে! আমি ভাবছিলাম, এখনো রাত…।’
শরফুদ্দিন সাহেব গম্ভীর হয়ে বললেন, যাও, বাড়ি যাও। বাড়িতে গিয়ে কান্নাকাটি করো গে!
ছেলেটি অসহায় চোখে তাকিয়ে আবার মুখ ঢেকে বসল।
শরফুদ্দিন সাহেব মনে মনে একটু প্রসন্ন বোধ করলেন। দুর্বল চরিত্রের ছেলেছোকরা দেখলে তার মতো বুড়ো মানুষদের ভালোই লাগে। নিজেকে জোয়ান মনে হয়। গলাবাজ চ্যাংড়া হলে বুকটা ধড়াস ধড়াস করে। মনে হয়, এই বুঝি অপমান করে বসল!
প্রসন্ন বোধ করলেন বলেই বোধ হয় পুরো পার্কটা একবার চক্কর দিয়েই তিনি এসে ছেলেটার পাশে বসলেন। বললেন, বিষয়টা কী?
ছেলেটা ততক্ষণে খানিকটা ধাতস্থ হয়েছে। শূন্য চোখে তাকিয়ে বলল, ‘কোনো বিষয় নেই।’
চাকরি পাচ্ছ না? পরীক্ষায় ফেল? ব্যবসায় লস?
ছেলেটি শুকনো হাসি হাসল একটা।
হুম!…তিনি গম্ভীর হয়ে আড়চোখে হাসিটা দেখে নিয়ে বললেন, সারা রাত কি এই পার্কেই কাটিয়েছ নাকি?
‘সে রকমই!’
বুঝতে পেরেছি!
‘কী বুঝলেন?’
হূদয়ঘটিত ব্যাপার!
ছেলেটির মুখ শক্ত হয়ে উঠল। বলল, ‘হূদয়? কিসের হূদয়ের কথা বলছেন? পাথর বলুন, পাথর! একদম খাঁটি গ্রানাইট পাথর!’
শরফুদ্দিন সাহেব মুচকি হাসলেন, আহা, এত খেপেছ কেন? মেয়েরা ওপরে ওপরে একটু এ রকম শক্তই হয়! নারকেলের মতো! ওপরে কঠিন, ভেতরে কোমল!
ছেলেটি বলল, ‘ও কথা বলবেন না, আঙ্কেল! নারকেল? হুঃ! পাঁচ বছর ধরে ওই নারকেলের খোলা ফাটানোর চেষ্টা করছি, আমার নিজের খুলিই এখন ফেটে যাওয়ার জোগাড়…।’
আরে পাঁচ বছরেই হাঁপিয়ে উঠলে! কবি বলেছেন, নারীর মন, সখা সহস্র বছরের সাধনার ধন!
ছেলেটি খেদের গলায় বলল, ‘রাখুন, কবিদের কথা! যা মন চায় তা-ই লেখে ওরা! সহস্র বছর পরে পেয়ে লাভটা কী, বলেন? বাচ্চাকাচ্চা জন্ম দেওয়ার মতো অবস্থায় থাকব কি না, সেটাও দেখার বিষয়!’
শরফুদ্দিন সাহেব চিন্তিত গলায় বললেন, সমস্যাটা কী? নারকেল ফাটছে না কেন?
‘জানি না তো! কত ভালোবাসি ওকে, সেও আমাকে বাসত একসময়!’
তারপর?
‘তারপর বয়স বাড়তে লাগল। হিসাব করা শুরু করল। আমার বাবার টাকা নেই, বড়লোক আত্মীয়স্বজন নেই, ভালো কোনো চাকরি নেই, লেখাপড়ায় মাঝারি…।’
শরফুদ্দিন সাহেব বললেন, হুম, একদম সোনার টুকরা পাত্র বলতে যা বোঝায়, তা অবশ্য তুমি নও!
‘সোনার পাত্র না হয়ে বরং এনামেলের বাসনই হলাম, কিন্তু ভালো তো বাসি! সবই করতে পারি ওর জন্য! কী করি বলুন তো, আঙ্কেল!’
শরফুদ্দিন সাহেব চোখ বুজে গলার ভেতরে গুরুক গুরুক করে একটু আত্মপ্রসাদের হাসি হেসে নিলেন। বললেন, সত্যি ওর জন্য সব করতে পারো?
‘কী মনে হয় আপনার? কাল সারা রাত পার্কে বসে চোখের পানি ফেলতে ফেলতে মশার কামড় খেলাম কার জন্য? হাত দুটো একদম মোরব্বা হয়ে গেছে, এই দেখুন…।’
তাহলে শোনো, দ্বাপর যুগে পাত্রপাত্রী নির্বাচনের অনেক পদ্ধতি ছিল। একটার নাম তো জানো, স্বয়ম্বর সভা। রাজারা এসে চেয়ারে গ্যাঁট হয়ে বসত! যাকে পছন্দ হয়, তার গলায় মালা তুলে দিত রাজকন্যা! বাকিরা মুখ চুন করে বাড়ি ফিরত!
‘আমার মতো!’
সবাই তোমার মতো না! মহাবীর ক্ষত্রিয়দের কারও যদি সেই মেয়েকে ভীষণ পছন্দ হতো, সে বাহুবলে মেয়েটিকে হরণ করে নিয়ে যেত সবার সামনে! আই লাভ ইউ, পারলে ঠেকাও! তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুন এভাবেই সুভদ্রাকে সবার সামনে হরণ করে নিয়ে গিয়েছিলেন!
ছেলেটি চোখ গোল গোল করে শুনছিল। শুকনো গলায় বলল, ‘কী বলতে চাইছেন?’
বলতে চাইছি, বীরভোগ্যা বসুন্ধরা! নিজেকে বলো, বল বীর, চির উন্নত মম শির। তারপর বুকডন দাও! প্রথমে বিশটা, তারপর পনেরো পনেরো করে মোট পঞ্চাশটা। এরপর বেইলি মারো এক শটা! এরপর…
‘এরপর?’
শরফুদ্দিন শিশুর মতো সরল হাসি হাসলেন, তাও আমায় বলে দিতে হবে?
ছেলেটি একটি চাপা গর্জন করল। তারপর দাঁড়িয়ে গেল বেঞ্চ থেকে। গোটা বারো বুকডন দিয়ে ছুটে বেরিয়ে গেল পার্ক থেকে!
শরফুদ্দিন সাহেব একগাল হাসি নিয়ে আবার হাঁটা শুরু করলেন। সহস্রবর্ষ সুস্বাস্থ্য সংঘের কেউ তখনো আসেনি।
* * *
একগাল হাসি বাসি হয়ে গেল বাড়ি ফিরতেই। বাসার সামনে প্রতিবেশীদের জটলা। হাত-পা ছড়িয়ে হাপুস নয়নে কাঁদছেন হালিমা। শরফুদ্দিন সাহেবকে দেখেই হাউমাউ করে উঠলেন, ওগো, আমাদের সর্বনাশ হয়ে গেছে গো! সকালবেলা এক ডাকাত ছেলে আমাদের রাসুকে তুলে নিয়ে গেছে গো! এই বড় লাল লাল চোখ, মাথায় ঝাঁকড়া চুল, দরজা খুলতেই ঘরে ঢুকে রাসুর হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে চলে গেল! আমি আটকাতে গেছি, বলল, বীরভোগ্যা বসুন্ধরা! সরে যান, নইলে এক ঘুষিতে খুলি ফাটিয়ে ফেলব!

Prothom-Alo.com

আরও পড়ুন

মন্তব্য করুন

Back to top button
Translate »