আর্কাইভ

আপনাদের প্রতি অভিশাপ পড়বে

পীর হাবিবুর রহমান : ১. রহস্যময় রাজনীতি! কেলেঙ্কারির পর কেলেঙ্কারি। সরকার কঠোর হস্তে দমন করতে পারে না বিরোধী দল কর্মসূচি গ্রহণ দূরে থাক, মন থেকে প্রতিবাদ করে না। হায় সেলুকাস! কী বিচিত্র এই দেশ! সেনাশাসক এরশাদকে দুর্নীতির কলঙ্ক গায়ে মাখিয়ে স্বৈরশাসকের তকমা কপালে তুলে দিয়ে ছাত্র জনতার বুকের রক্ত আর ঘাম ঝরা নিরন্তর সংগ্রামে বিদায় করে যে গণতন্ত্র উদ্ধার হলো তার কুড়ি বছরের হিসাবের খাতা আজ কালো কালিতে অাঁকা। এক দিনে হয়নি। দিনে দিনে হয়েছে। এরশাদ জমানার লুটেরাদের প্রধান দুই দল শহীদের রক্ত শুকাতে না শুকাতেই ভাগাভাগি করে নিয়েছেন। গণতন্ত্রের নামে যেমন করে ব্যক্তির শাসন, দলবাজ ও গোষ্ঠীর লুণ্ঠন যেভাবে তীব্র থেকে তীব্র হয়েছে তাতে মানুষ বুক ভরা বেদনা, অসন্তোষ ও হতাশা নিয়ে বাস করছে। লাগামহীন দুর্নীতি, অনিয়ম, অন্যায়, জুলুম, ক্ষমতার লড়াই, রক্তপাত, সহিংসতা সব মিলে জাতির জীবনে ব্যাপক গণসমর্থন নিয়ে ওয়ান-ইলেভেন এসেছিল। ওয়ান-ইলেভেনকে সব মহল সমর্থন দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত সেটিও ব্যর্থ হয়েছে। সেনাসমর্থিত সুশীলদের শাসন রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, আমলা এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-শিক্ষক থেকে সাধারণ মানুষের জন্য সুখকর হয়নি। জনপ্রিয়তা হারিয়ে সেই শাসককেও পিছু হটতে হয়েছে। মানুষ গণতন্ত্রই চেয়েছে। গণতন্ত্র জারি হয়েছে। সংশোধন চেয়ে জনগণের ভোটে নির্বাচিত রাজনীতিবিদদের হাতেই ক্ষমতা তুলে দিয়েছে।

ওয়ান-ইলেভেনের ঝড়ে পতিত সরকার ও বিরোধী দল নিয়মিত ট্যাঙ্ পরিশোধ করা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জোর করে আদায় করে নেওয়া হাজার হাজার কোটি টাকা ফিরিয়ে দিতে কোনো ভূমিকা রাখেনি। ওয়ান-ইলেভেনকে সমালোচনার তীরে সরকার ও বিরোধী দল ক্ষতবিক্ষত করলেও সেইসব কুশীলবদের আইনের আওতায় আনেননি। মাঝখানে রাজনীতিবিদদের ওপরে খড়গ নেমেছে। সিভিল সোসাইটিকে সমালোচিত করা হয়েছে। মাঝখানে দেশের আইন মানা নিয়মিত ট্যাঙ্ পরিশোধ করা ব্যবসায়ীদের টাকাও ফিরিয়ে দেওয়া হয়নি। অদ্ভুত সব ব্যাপার-স্যাপার।

২. সুশাসন, আইনের শাসনের কথা বলে দুর্নীতি ও লুটপাটের বিরুদ্ধে জেহাদি ডাক দিয়ে দিনবদলের সনদ ঘোষণা করে ক্ষমতায় আসা মহাজোট সরকারের আমলে প্রথম রাষ্ট্রীয় কেলেঙ্কারি শেয়ারবাজারে ৩২ লাখ বিনিয়োগকারীকে রিক্ত-নিঃস্ব করে ৪০ হাজার কোটি টাকা লুট করে নেওয়ার ঘটনা। সরকার সিভিল সোসাইটির সমালোচনা, মধ্যবিত্তের অসন্তোষ, মিডিয়ার ভূমিকার কারণে শেষ পর্যন্ত শেয়ার কেলেঙ্কারির তদন্ত করিয়েছে। সরকার খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদের মতো একজন সৎ, নিষ্ঠাবান, সাহসী মানুষের হাতে তদন্ত তুলে দিয়েছিল। লুটেরারা তার চরিত্র হননের চেষ্টা করলেও তাকে দমাতে পারেনি। তিনি দ্রুত দায়িত্বশীলতার সঙ্গে তদন্ত রিপোর্ট জমা দেন। শেয়ার কেলেঙ্কারির খলনায়কদের চেহারাই সেখানে ফুটে ওঠেনি, শেয়ারবাজারকে লুটেরাদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য গ্রহণযোগ্য ও যুক্তিনির্ভর পরামর্শও দেওয়া হয়েছিল। সরকার তা কার্যকর করেনি। শেয়ার কেলেঙ্কারির খলনায়কদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দূরে থাক উল্টো লুটেরা সিন্ডিকেটের হাতে শেয়ারবাজার তুলে দিয়েছে। অর্থমন্ত্রী একজন সৎ, উচ্চশিক্ষিত পণ্ডিত মানুষ হলেও গণমানুষের আকাঙ্ক্ষা লালন করে ভূমিকা রাখতে পারেননি বলে তার ইমেজ আজ কোন পর্যায়ে নিজেও জানতে পারছেন না। বিরোধী দল ক্ষমতায় যাওয়ার আন্দোলনের কর্মসূচিতে দলের নেতা-কর্মীই নন, সাধারণ মানুষের প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও নির্মম সত্য যে, এই শেয়ারকেলেঙ্কারির মতো জনগণকে রিক্ত-নিঃস্ব করা লুটেরাদের বিচারের দাবিতে এক দিন সংসদে ওয়াক আউট করেনি বা রাজপথে একটি গণমিছিলের কর্মসূচিও দেয়নি। শেয়ার কেলেঙ্কারির নায়করা সরকার ও বিরোধী দলের অন্দর মহলে অবাধ যাতায়াত করেন বলে, উভয়ের ছায়ায় বাস করেন বলে গণমানুষের রাজনীতির কথা বলা উভয়পক্ষ মানুষের স্বার্থ না দেখে লুটেরাদের স্বার্থ দেখেছেন। অর্থমন্ত্রী শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের ব্যথিত করেছেন। বিনিয়োগকারী রিক্ত-নিঃস্ব হয়ে আত্দহনন করেছে। লুটেরারা সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে ফুলে ফেঁপে বড় হয়েছে।

৩. পদ্মা সেতু আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইস্তেহারের কোন জায়গায় ছিল মানুষ তা জানত না। সরকার জনগণকে পদ্মা সেতু প্রশ্নে আগ্রহী করেছে। মন্ত্রীদের অতিকথনে মানুষ স্বপ্ন দেখেছে। শেষ পর্যন্ত বিশ্বব্যাংক শর্ত দিয়ে চিঠি দিয়েছে। শর্ত পূরণ না করায় ঋণচুক্তি বাতিল করে দিয়েছে। কানাডিয়ান কোম্পানির দুজন কর্মকর্তা সেখানে গ্রেফতার হয়েছে। বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত বা আদালতে তারা মুখ না খোলা পর্যন্ত প্রকৃত সত্য জানা যাচ্ছে না। সরকার অবাধ তথ্য প্রবাহের সুযোগ নিশ্চিত করতে তথ্য অধিকার আইন করলেও বিশ্বব্যাংকের সেই চিঠিতে কী আছে তা মানুষ জানে না। কিন্তু মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের সরে যাওয়ার ঘটনাই নয়, দিনের পর দিন বিতর্ক মানুষকে ব্যথিত করেছে। মানুষ বিশ্বাস করে এখানে বড় ধরনের দুর্নীতি ঘটে গেছে। এই দুর্নীতিতে কারা জড়িত সেটাই এখন জানার অপেক্ষা চলছে। অর্থমন্ত্রী একদিকে বলছেন পদ্মা সেতু হবেই, বিশ্বব্যাংকের ঋণ পাওয়া যাবে। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর বামে বসা কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী নিরন্তরভাবে বিশ্বব্যাংককে আক্রমণ করে কথা বলছেন। মন্ত্রী নেতারা যেন আমেরিকার সঙ্গে যুদ্ধের ভাষায় কথা বলছেন। মানুষ মনে করছে এর পরিণতিতে আর যাই হোক পদ্মা সেতু হলেও এই আমলে হচ্ছে না। কিন্তু কেলেঙ্কারি যদি ঘটে থাকে তাহলে সত্য কি গোপন থাকবে? অভিযুক্তরা বহাল তবিয়তে থাকবে?

৪. বাংলাদেশের ব্যাংক ঋণের ইতিহাসে ভয়ঙ্কর কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে হলমার্ক নামের এক নামসর্বস্ব গ্রুপের নামে। রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক হোটেল রূপসী বাংলা শাখা থেকে একা হলমার্ককে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে যার বিপরীতে গ্যারান্টি বলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব নাই। এর বিপরীতে যেসব এলসি খোলা হয়েছে তা ভুয়া সাইনবোর্ড সর্বস্ব। একসময় গার্মেন্টে চাকরি করে এই ব্যবসায় আসা হলমার্ক মালিকের সঙ্গে আছে সমাজের একদল লোভী, অমানবিক, মধ্যস্বত্বভোগী, ফটকা, আদর্শহীন, মূল্যবোধের অবক্ষয়ে পচে যাওয়া গণবিরোধী মুখ। সরকার ও বিরোধী দলের রাজনৈতিক ছায়া পাওয়া দালাল, ব্যাংকের দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা, কমিশন খাওয়া পরিচালনা বোর্ডের কোনো কোনো সদস্য, সাবেক এমডি ও বর্তমান চেয়ারম্যান রয়েছেন যাদের কথা মানুষের ঘরে ঘরে চলে গেছে। যাদের কথা মধ্যরাতের টিভি টকশো ও প্রিন্ট মিডিয়ায় উঠে আসছে। তবুও এখন পর্যন্ত না ঋণগ্রহীতা, না ঋণদাতা চক্র, না তদবিরবাজ দালাল কাউকেই আটক করা হয়নি। ব্যাংক চেয়ারম্যান বাহারুল ইসলাম সাবেক এমডি হুমায়ুন কবির, পরিচালক দল, কর্মকর্তাদের গ্রেফতার করে যৌথ জেলে কেন জিজ্ঞাসাবাদ হবে না। দেশের ব্যাংক পাড়ার ইতিহাসে এমন বিতর্কিত কেলেঙ্কারির পরও সরকার কাউকে গ্রেফতার করেনি। বিরোধী দল এত বড় কেলেঙ্কারি নিয়ে সমাবেশ দূরে থাক, একটি মানববন্ধন করা দূরে থাক, সংবাদ সম্মেলন করে অবিলম্বে এই সিন্ডিকেটকে গ্রেফতারের দাবিও জানাচ্ছে না। গণমানুষের স্বার্থ লুট হয়ে যাচ্ছে। প্রকৃত ব্যবসায়ীরা প্রজেক্ট প্রোফাইল নিয়ে ব্যাংক পাড়ায় দৌড়াচ্ছেন। রাজনৈতিক নিয়োগপ্রাপ্ত পরিচালকদের পিছন পিছন হাঁটছেন। ঋণ মিলছে না। কলকারখানা বিক্রি করছেন। বিশ্বমন্দার অর্থনীতির কঠিন সময়ে সরকার ব্যাংক ঋণের সুদ বাড়াচ্ছে। প্রকৃত ব্যবসায়ীদের দিচ্ছে না। ব্যাংকের তারল্য সংকট চলছে। অথচ, সরকারের ছায়ায় প্রভাবশালীদের নির্দেশে সিন্ডিকেট টাকা লুটে নিয়ে যাচ্ছে মানুষের। বাংলাদেশ ব্যাংকের সব ব্যাংকের ওপর নজরদারি পরিদর্শন নিয়মিত করার কথা থাকলেও তারাও ব্যর্থ হয়েছেন। লোকবল থাকা সত্ত্বেও তা করেননি বলে মিডিয়ায় আসার পর হলমার্ক নিয়ে পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার জন্য চিঠি দিয়েছেন। তদন্তে নেমেছেন। পৃথিবীর কোনো দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রাজনৈতিক নিয়োগ দেওয়া হয় না। আমাদের এখানে হয়। তবুও গভর্নর পদে বর্তমান পর্যন্ত যারা এসেছেন তারা আদর্শ ও নীতির প্রশ্নে মানুষের মাঝে উজ্জ্বল ভাবমূর্তি রেখেছেন। রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোতে ব্যাংক সম্পর্কে ধারণা নেই এমন সব রাজনৈতিক কর্মীদের পরিচালক পদে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। দিনে দিনে তাই অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা ও কেলেঙ্কারি বাড়ছে। অর্থমন্ত্রী হলমার্কের ঋণ কেলেঙ্কারি নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্যোগকেও বাধাগ্রস্ত করছেন। এভাবে লুটপাটকেই নয় দিনদুপুরে সাগর চুরিই নয়, মহাডাকাতিকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিলে, ব্যবস্থা না নিলে রাজনৈতিক শক্তির প্রতি মানুষের আস্থাই বিলোপ হবে না, নব্য মাফিয়া চক্রের অব্যাহত লুটপাটে অর্থনীতির চাকা স্তব্ধ হয়ে যাবে। এই অন্যায় জনগণ মানবে না। মানুষের ভাষা শাসক ও বিরোধী দল সবাইকে আজ উপলব্ধি করতে হবে। আর কোন ব্যাংকের কোন কোন শাখায় এমন কেলেঙ্কারি ঘটে গেছে তা তদন্তে সাবেক গভর্নর ড. ফরাসউদ্দিন, ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ, সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদদের নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করে ব্যাংক পাড়ার লুটেরা সিন্ডিকেট চিহ্নিত করার পাশাপাশি আর কত কেলেঙ্কারি আড়াল হয়ে আছে তা উদঘাটন করতে হবে। মিডিয়ায় প্রতিদিন ফাঁস হচ্ছে নতুন নতুন কেলেঙ্কারির খবর। পেছনে নাকি সব রাঘব বোয়াল।

৫. মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মাননীয় বিরোধী দলের নেত্রী, মাননীয় রাজনীতিবিদরা আপনাদের বিবেকের কাছে প্রশ্ন_ দেশের প্রতিটি স্তরে, রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি, অনিয়ম, অন্যায় যেভাবে ক্যান্সারের মতো ছড়িয়ে পড়ছে তা রোধ করার দায়িত্ব কি আপনাদের নয়? আপনারা সংসদে বসুন। মন্ত্রিসভার বৈঠক করুন। নিজ নিজ দলের প্রেসিডিয়াম ও স্থায়ী কমিটির সভা ডাকুন। একটি দেশ এভাবে চলতে পারে না। এই স্বাধীন দেশের জন্য জাতির মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম, জেল-জুলুম, ফাঁসির মঞ্চে আরোহণ করেছেন। একটি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রাম ও সুমহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে কত ত্যাগ, তিতিক্ষার সংগ্রামে শামিল ছাত্রজনতার অবদানে, রক্তে আমাদের ইতিহাস সমৃদ্ধ হয়েছে। আদর্শবাদী রাজনৈতিক শক্তির নেতৃত্ব, জাতীয় বীরদের গেরিলা যুদ্ধ ও ৩০ লাখ শহীদের রক্তে অর্জিত এই দেশের দুর্নীতি যদি রোধ করা যেত ৪১ বছরে আমারা সিঙ্গাপুর-মালয়েশিয়া থেকে পিছিয়ে থাকতাম না। যুদ্ধবিধ্বস্ত সদ্য স্বাধীন দেশে ১৯৭২ সালের ৮ অক্টোবর পিজি হাসপাতালের রক্ত সংরক্ষণাগার এবং নতুন মহিলা ওয়ার্ডের উদ্বোধন উপলক্ষে দেওয়া ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন। এ পর্যন্ত পাওয়া তালিকায় ৫০ জন ডাক্তারকে শহীদ হতে হয়েছে। ৫০ জন ডাক্তার তৈরি করতে কী লাগে তা আপনারা জানেন। দুনিয়ার ইতিহাসে দেখা যায় এমনকি যুদ্ধক্ষেত্রেও ডাক্তারদের হত্যা করা হয় না। …কিন্তু পাকিস্তানি নরপশুরা এত বড় পশু যে, তারা আমার ডাক্তারদের ধরে নিয়ে হত্যা করেছে। ডাক্তার নুরুল ইসলামকে বলেছি, পিজি হাসপাতালের দেওয়ালের কাছে পাথরে এসব ডাক্তারদের নাম ও ইতিহাস লিখে রাখুন। যাতে প্রত্যেক ডাক্তার দেখে যে স্বাধীনতা সংগ্রামে তাদের দান কতখানি। এরফলে বোধহয় দেশের জনগণের প্রতি তাদের দরদ বাড়বে। সেদিন তিনি আরও বলেন, পয়সা দিয়ে সবকিছু হয় না …পয়সার সঙ্গে আরেকটি জিনিসের দরকার সেটা হলো মানবতাবোধ। আমার মনে হচ্ছে আপনারা বেয়াদবি মাফ করবেন, আমরা যেন মানবতাবোধ হারিয়ে ফেলেছি। পয়সা কোনো জায়গায় কম দেওয়া হচ্ছে না। ভিক্ষা করে হোক, বন্ধু রাষ্ট্রদের কাছ থেকে সাহায্য নিয়ে হোক, ব্যাংকের থেকে সাহায্য নিয়ে হোক, গ্রান্ট নিয়ে হোক পয়সা এনে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু জাতীয় চরিত্র আমাদের নষ্ট হয়ে গেছে। আমি কুমিল্লার জনসভায় বলেছিলাম যে, শেখ মুজিবুর রহমানকে বেটে খাওয়া যাবে, বাংলাদেশ সোনারবাংলা করতে পারবেন না, যদি সোনার মানুষ গড়তে না পারেন। আপনাদের কাছে বলতে গেলে বলতে হয় আমি যেন আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছি। আমি যেদিকে চাই, সেদিকে মানুষ খুব কম দেখি। মানুষ এত নীচ হয় কী করে? মানুষ মানুষের কাছ থেকে অন্যায়ভাবে পয়সা নেয় কী করে? মানুষ গরিব দুঃখীর কাছ থেকে কী করে লুট করে, আমি বুঝতে পারি না। এত রক্ত, ৩০ লাখ লোকের জীবন, এত শহীদ, এত মায়ের আর্তনাদ, এত শিশুর আর্তনাদ, এত বাপ-মায়ের ক্রন্দন, দেওয়ালে দেওয়ালে রক্তের লেখা, রাস্তায় রাস্তায় রক্তের স্বাক্ষর, আর সেইখানে বসে সরকারি কর্মচারীরা যদি তাদেরই টাকা-পয়সা খায়, তাদের জীবন নিয়ে যদি ছিনিমিনি খেলে, এ দুঃখ বলার জায়গা কোথায় আছে, আমাকে বুঝিয়ে বলুন। আইন দিয়ে তো এটা করা যায় না। এটা মানুষের হৃদয়ের পরিবর্তনের দরকার, মনের পরিবর্তনের দরকার। মানবতাবোধ জাগ্রত হওয়ার দরকার। আপনারা বেয়াদবি মাফ করবেন। মেডিকেল কলেজের ভেতর ঢোকা যায় না দুর্গন্ধে। কেন…? আপনারা কেন যখন তখন ছুটি ভোগ করেন? আমি আশা করি ভবিষ্যতে আপনারা নিশ্চয়ই এদিকে লক্ষ্য রাখবেন। আপনারা যারা বড় ডাক্তার আছেন, যারা স্পেশালিস্ট আছেন তারা গ্রামের দিকে কেন যাবেন না? গ্রামে তো শতকরা ৯৫ জন লোক বাস করে। তারাই সম্পদ দিয়ে আপনাদের সবকিছু বজায় রেখেছে। নতুন শহর দেখেন, আপনাদের দোতলায় অফিস দেখেন, পোস্ট গ্র্যাজুয়েট মেডিকেল ভবন দেখেন, যেখানেই যান দেখবেন সবকিছু বাংলাদেশের দুঃখী মানুষের পয়সায় গড়া। তাদের দিকে কেন নজর দেবেন না? সাদা কাপড়-চোপড় দেখলেই কেন তাড়াতাড়ি দরজা খুলে দেন আর দুঃখী মানুষ আসলেই কেন তাদের রাস্তায় বের করে দেন এই মনোভাবের পরিবর্তন আপনাদের করতে হবে। আমি শুধু আপনাদের ডাক্তার সাহেবদের বলছি না, এটা যেন আমাদের জাতীয় চরিত্রের মধ্যে এসে গেছে…। শৃঙ্খলা ফিরে না আসলে কোনো জাতি বড় হতে পারে না। সততা ফিরে না আসলে কোনো জাতি বড় হতে পারে না। আপনাদের প্রতি অভিশাপ পড়বে। ৩০ লাক লোকের আত্দা আপনাদের অভিশাপ করবে। আপনারা দেখেছেন মুসলিম লীগের বড় বড় লিডাররা যারা বড় বড় বাড়ি করে আরামে ছিল, একদিন অভিশাপে বাড়ি থেকে বিতাড়িত হয়েছে, আমাদের এই দেশে চরিত্রের পরিবর্তন না এলে এমন একদিন আসবে, এমন ঝড় আসবে, যে ঝড়ে আপনারা ভেঙে চুরমার হয়ে যাবেন। আপনারা শুধু নিজেকে অপমান করছেন না। সাড়ে সাত কোটি মানুষকে অপমান করছেন। আপনারা অপমান করছেন শহীদদের আত্দাকে।’ তিনি সেদিন পরিষ্কার বলেছেন, তিনি বাংলার দুঃখী মানুষের নেতা। বাংলার দুঃখী মানুষের সঙ্গেই তিনি থাকবেন।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, ৪০ বছর আগে বঙ্গবন্ধু যে আশঙ্কা ব্যক্ত করেছিলেন দিনে দিনে মূল্যবোধের অবক্ষয়ে আমরা মানবতা হারিয়ে পয়সার জন্য কোন তলানিতে এসে ঠেকেছি? সরকারি প্রকৌশলী, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, চিকিৎসক, এমপি-মন্ত্রী ও উজিরে ঘামাঘারা রাতারাতি পরিবার-পরিজন সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে বিত্তশালী হয় কেমন করে? বঙ্গবন্ধুর দুঃখী মানুষের অধিকারের কথা বারবার আপনার রাজনৈতিক বক্তৃতায় এসেছে। শেয়ারকেলেঙ্কারির লুটেরাদের, ব্যাংক কেলেঙ্কারির লুটেরাদের, কিছু লুটেরা মন্ত্রী-এমপিদের, সরকারি আমলাদের, মধ্যস্বত্বভোগী ফটকা দালালদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে বঙ্গবন্ধুর আত্দা কি ক্রন্দন করবে না? তার স্বপ্নের বাংলাদেশ কি ফিরে আসবে?

আপনি শপথ নেওয়ার অনেক পরে ওবায়দুল কাদেরকে যোগাযোগমন্ত্রী করেছেন। মানুষ কখনো ভুল করে না। মানুষের চাওয়াও বেশি নয়। মানুষ পদ্মা সেতুও চায় না। যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য স্বাভাবিক রাস্তাঘাট, সেতু-কালভার্ট, পরিচ্ছন্ন ট্রেন, বাস, সময়সূচি মেনে চলাটুকুতেই খুশি। এবার ঈদে মানুষ খুশিতে বাড়ি গেছে, ফিরেছে। একজন ওবায়দুল কাদের আপনার হয়ে সারা দেশ পাগলের মতো সফর করেছেন। মানুষের মুখোমুখি গেছেন। মানুষ এখনো রাজনীতিবিদদের প্রতি আস্থা হারায়নি, সেটি প্রমাণ করেছেন। সুনাম কুড়িয়েছেন। এরশাদ জমানায় অনেক নাম মানুষের মুখে মুখে ছিল। শ্যালক মহিউদ্দিন থেকে জেঠিস মমতা ওয়াহাব থেকে শুরু করে প্রেমিকা জিনাত পর্যন্ত। একজনের নাম মানুষ শোনেনি। তার নাম জিএম কাদের। এরশাদের ভাই। আপনি তাকে বাণিজ্যমন্ত্রী করার পর এবার রমজানে বাজার নিয়ন্ত্রণে থেকেছে। তার কোনো ব্যবসা নেই, বাজার সিন্ডিকেট নেই। মানুষ জেনেছে। ঈদের পর মানুষ বলাবলি করছে, ওবায়দুল কাদেরের মতো ১০ জন মন্ত্রী হলে সরকারের জনপ্রিয়তাই বাড়ত না, মানুষেরও স্বস্তি আসত। সেই ১০ জন লোক এখনো আপনার সংসদের প্রথম-দ্বিতীয় সারিতে শোভা পায়। মন্ত্রী হিসেবে আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, আবদুল জলিল, শেখ ফজলুল করিম সেলিমদের নামের সঙ্গে সাফল্যের গৌরব জড়িয়ে আছে। তাদের অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বের ভাবমূর্তি এখনো কাজে লাগানো যায়। আপনার টিমেই অনেক তরুণ রয়েছেন সংসদের ভেতরে-বাইরে যারা সাফল্যের সঙ্গে অনেক বড় মন্ত্রণালয় চালাতে পারেন। বঙ্গবন্ধুর সেই স্বপ্নের চিকিৎসক ডা. প্রাণ গোপাল দত্তকে যোগ্য জায়গায় বসিয়েছেন। কর্মকে তিনি যেমন করে ইবাদতের মতো নিয়েছেন, তার প্রতিষ্ঠানকে যেমন করে গণমুখী করেছেন, সেখানে প্রাইভেট প্রাকটিসের কাড়ি কাড়ি টাকার মোহ ত্যাগ করে মেডিসিনের অধ্যাপক এবিএম আবদুল্লাহর মতো বিখ্যাত চিকিৎসক সাধারণের সেবা করতে এগিয়ে এসেছেন। আমি ঈদে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে দেখে এসেছি ডাক্তার নেই, ওষুধ নেই, রোগী আছেন, চারদিকে ময়লা, আবর্জনা দুর্গন্ধময় পরিবেশে হাসপাতালটিই যেন অসুস্থ। এটি সারা দেশের চিত্র। বঙ্গবন্ধু ৭২ সালের বক্তৃতায় পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার ওপর জোর দিয়েছিলেন। তিনিও প্রশ্ন করেছিলেন, যারা ডাণ্ডা দিয়ে শাসন করত, তাদের সময় পরিষ্কার রাখা গেলে এখন কেন নয়? আমারও প্রশ্ন_ মার্শাল ‘ল’ শুরু হলে, ওয়ান-ইলেভেন এলে সবাই সাফসুতরো হয়ে যান, গণতন্ত্রে কেন এত দায়হীন হন? ৪১ বছরে সরকারি হাসপাতালের এমন বেহারা রেখে মন্ত্রী ঘুমান কী করে নাক ডেকে? যোগাযোগমন্ত্রী এই নিয়ে ৫৩ জেলা দৌড়াতে পারলে বাকি মন্ত্রীরা দৌড়াতে পারেন না কেন? স্বাস্থ্যমন্ত্রী কতটা হাসপাতালে শৃঙ্খলা ফিরিয়েছেন? তার সঙ্গে যখন মিঠু নামের লুটেরা যুক্ত হয়ে যায়, মিডিয়ায় এলেও লজ্জা পান না, তখন হাসপাতালও পাতালে চলে যায়।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি জানেন, ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দেওয়া ভাষণে আমাদের মহান নেতা শেখ মুজিব বলেছেন, ‘আমার কৃষক, আমার শ্রমিক দুর্নীতিবাজ নয়। ২০ ভাগ শিক্ষিত মানুষের মধ্যে ৫ ভাগ ঘুষ খায়, ব্লাক মার্কেটিং করে, বিদেশে টাকা চালান দেয়। এই ৫ ভাগ শিক্ষিত, ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ।’ তিনি চরিত্রের সংশোধন করার তাগিদ দিয়ে আত্দশুদ্ধি করতে বলেছেন। তিনি আরও বলেছেন, ‘আমাদের লেখাপড়া শিখিয়েছে কে? ডাক্তারি পাস করায় কে? ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করায় কে? সায়েন্স পাস করায় কে? অফিসার করে কে? কার টাকায়? বাংলার দুঃখী মানুষের টাকায়।’ ‘৭৫ সালের হিসাব দিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেছেন, ‘একজন ডাক্তার হতে সোয়া লাখ টাকার মতো খরচ পড়ে। ইঞ্জিনিয়ার করতে এক লাখ খরচ পড়ে। বাংলার গরিব জনগণ এই টাকা দিয়েছে। গরিবের টাকায় ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার সাহেব, অফিসার সাহেব। তার টাকায় রাজনীতিবিদ সাহেব। তার টাকায় সব সাহেব। তাদের কী ফেরত দিচ্ছেন? আত্সমালোচনা করুন, আত্দশুদ্ধি করুন, তাহলেই হবেন মানুষ।’

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, বঙ্গবন্ধু ৪০ বছর আগে অসহায়ের মতো বলে গেছেন, আমার ডানে চোর, বায়ে চোর। যাকে যেখানে বসাই সেই চুরি করে। আজ ৪০ বছর পর ১৬ কোটি মানুষের দেশে দুর্নীতিবাজের সংখ্যা কত পার্সেন্ট? আপনি ডানে-বায়ে তাকান। সামনে তাকান। পিছনে তাকান। জনগণের জন্য, দেশের জন্য বঙ্গবন্ধু রাজনীতি করেছেন। চোর-ডাকাতদের হাত থেকে শেয়ারবাজার, প্রশাসন, ব্যাংক, বীমা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা উদ্ধার করতে হলে আপনাকেই সাহসী ভূমিকা নিতে হবে। মানুষের ভাষা শুনুন। কঠোর হস্তে দমন করুন। যারা ব্যাংকের টাকা, শেয়ারবাজার, রাস্তাঘাট, সেতু, কালভার্ট, স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মন্দির, বিদ্যুৎ, গ্যাস, কাবিখা, কাবিটা, এতিমের টাকা লুটে নিয়ে যায় তাদের ওপর সত্যি সত্যি আল্লাহর অভিশাপ পড়বে

আরও পড়ুন

মন্তব্য করুন

আরও দেখুন...
Close
Back to top button
Translate »