ইভিএম’এ ব্যাপক সাড়া ॥ কয়েকটি
বিচ্ছিন্ন ঘটনা ॥ সর্বত্র ঈদের আমেজ
হাসান মাহমুদ, বিশেষ প্রতিনিধি, বরিশাল থেকে ॥ বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্যদিয়ে বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনের ভোট গ্রহণ সকাল আটটা থেকে শুরু হয়ে একটানা বিকেল চারটা পর্যন্ত চলেছে। নগরীর অধিকাংশ ভোট কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, শনিবার সকাল থেকেই পুরুষ ভোটারদের পাশাপাশি নারী ভোটারদের উপস্থিতি ছিলো চোখে পড়ার মতো। তারা ঈদের আমেজে আগামী ৫ বছরের জন্য তাদের পছন্দের প্রার্থীকে নগর পিতা নির্বাচনের জন্য তিনদফা বৃষ্টি ও অসহনীয় গরমকে উপেক্ষা করে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন।
এদিকে প্রথমে বিভিন্ন প্রার্থীরা ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট দেয়ার ব্যাপারে আপত্তি করলেও এবারই সর্বপ্রথম ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট দিতে পেরে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন সাধারন ভোটাররা। ভোট গ্রহন শুরুর পর থেকে কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়াই শান্তিপূর্ণ ভাবে এখানে ভোট গ্রহন সমাপ্ত হয়েছে। শনিবার সকাল আটটায় ভোট গ্রহণ শুরু হওয়ার পর সাড়ে ৮টায় ১৪ দল সমর্থিত সম্মিলিত নাগরিক কমিটির প্রার্থী আলহাজ্ব শওকত হোসেন হিরণ (টেলিভিশন) নূরিয়া হাইস্কুল কেন্দ্রে ভোট দেন। সকাল সোয়া নয়টার দিকে বরিশাল পলিটেকনিক কলেজ কেন্দ্রে ভোট দিয়েছেন ১৮ দলের প্রার্থী আহসান হাবিব কামাল (আনারস) এবং সকাল সোয়া দশটার দিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী মাহমুদুল হক খান মামুন (দোয়াত-কলম) উত্তর বগুড়া সড়কের মথুরা পাবলিক স্কুল কেন্দ্রে ভোট দিয়েছেন।
ভোট প্রদান শেষে আহসান হাবিব কামাল সাংবাদিকদের বলেন, এখন পর্যন্ত নির্বাচন সুষ্ঠু হচ্ছে। তবে এ ধারা অব্যাহত থাকবে কি না তা নিয়ে তিনি সংশয় প্রকাশ করেন।
অপরদিকে ভোট প্রদান শেষে শওকত হোসেন হিরন সাংবাদিকদের বলেন, ইনশ্আল্লাহ আমি জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, মেয়র থাকাকালীন সময়ে আমি নগরীর অনেক উন্নয়ন করেছি। জনগণ তার মূল্যায়ন করবেন। তিনি আরো বলেন, আমি পুনরায় মেয়র নির্বাচিত হলে ভবিষ্যতেও উন্নয়নের এ ধারা অব্যাহত থাকবে। এ সময় তিনি নির্বাচন সুষ্ঠু হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন।
স্বতন্ত্র প্রার্থী মাহমুদুল হক খান মামুন তার নিজের ভোট দেয়ার পর সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করে বলেন, তার সর্মথকদের হয়রানী ও হুমকি দেয়া হচ্ছে। মামুন বলেন, দোয়াত-কলম মার্কার সমর্থকদের পলাশপুর ও নূরিয়া ভোট কেন্দ্রে ঢুকতে দেয়া হয়নি। এমনকি তাদের বিভিন্ন ধরনের হুমকিও দেয়া হচ্ছে। জয় প্রসঙ্গে মামুন বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হলে জয়ের বিষয়ে আমি শতভাগ আশাবাদী।
মামুনের স্ত্রী লাইজু খান অভিযোগ করে বলেন, হিরণের সর্মথকেরা দোয়াত-কলম সর্মথকদের হয়রানী ও হুমকি দিয়েই থেমে থাকেনি, তারা ১৮টি ভোট কেন্দ্র থেকে আমাদের প্রতিনিধিদের বের করে দিয়েছে। তবে সরেজমিন ঘুরে এ অভিযোগের কোন সত্যতা মেলেনি।
সকাল আটটায় ভোট শুরুর পূর্বে নগরীর প্রাণকেন্দ্র অশ্বিনী কুমার টাউন হল, সদর গার্লস, সরস্বতী স্কুল, বরিশাল কলেজ, মথুরানাথ পাবলিক স্কুল, কাউনিয়া আদর্শ প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ প্রায় ৩০ টি ভোট কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, আগে ভাগে ভোট দেয়ার জন্য ভোর থেকেই ভোটাররা দীর্ঘলাইনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। এসব কেন্দ্রে পুরুষ ভোটারদের পাশাপাশি নারী ভোটারদের উপস্থিতি ছিলো লক্ষ্যনীয়। ভোট কেন্দ্রের বাহিরে প্রার্থীদের সমর্থক ও ভোটারদের উপস্থিতিতে দিনভর পুরো বরিশাল নগরীতে ছিলো ঈদের আমেজ। ভোট শুরুর পূর্বে প্রখর রোদ থাকলেও মাঝখানে তিনদফা আষাঢ়ের বৃষ্টিও থামাতে পারেনি ভোটারদের। তারা রোদ ও বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন।
মোর জীবনে পেরতোম মেশিনে ভোট দিলাম
এই প্রথমবারের মতো সিটি নির্বাচনে বরিশালের ১৬ নং ওয়ার্ডের দুটি ভোট কেন্দ্রে ব্যবহার করা হয়েছে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম)। নগরীর জিলা স্কুল কেন্দ্রে ভোট দেয়ার পর মোঃ হারুন-অর রশিদ নামের এক ভোটার তার অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ করে আঞ্চলিক ভাষায় বলেন, মোর জীবনে এই পেরতোম মেশিনে ভোট দিলাম। খুবই ভালো লাগছে, কোন ঝামেলা নাই। সরকারি কর্মাশিয়াল কলেজ কেন্দ্রের ভোটার ফরিদুন নেছা বলেন, এখন থেকে বিশ্বের অন্যান্য দেশের ন্যায় বাংলাদেশের প্রতিটি ভোটেই ইভিএম পদ্ধতি ব্যবহার করা উচিত। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, এ ভোটিং পদ্ধতিতে দ্রুত ভোট দেয়া সম্ভব হচ্ছে।
সাংবাদিকদের বের করে দিলেন এস.আই
ভোট কেন্দ্রে প্রবেশ করায় সংবাদিকদের গায়ে হাত তোলার অভিযোগে পুলিশের উপ-পরিদর্শককে (এস.আই) প্রত্যাহার করা হবে বলে জানিয়েছেন ম্যাজিষ্ট্রেট মোঃ আশরাফুল হক। শনিবার বেলা ১১টায় নগরীর দক্ষিণ আলেকান্দা সরকারি শিশু পরিবার কেন্দ্রে সাংবাদিকরা প্রবেশ করতে চাইলে পুলিশ বাঁধা দেয়। এ সময় সাংবাদিকরা প্রিজাইডিং অফিসারকে ডাকতে বললে দায়িত্বে থাকা পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এস.আই) ওসমান ব্যাগ নিয়ে ঢোকা যাবে না বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারন করেন। একপর্যায়ে তিনি প্রথম আলোর ফটো সাংবাদিক সাজিদ, বাংলানিউজের স্টাফ করেসপন্ডেন্ট সেরাজুল ইসলাম সিরাজ, ডেইলি স্টারের ফটো সাংবাদিকসহ সংবাদ সংগ্রহের জন্য ওই কেন্দ্রে যাওয়া বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের সাংবাদিকদের সঙ্গে ধ্বস্তা-ধ্বস্তি করে গলা ধাক্কা দিয়ে কেন্দ্রের বাইরে বের করে দেন। খবর পেয়ে নির্বাচনে দ্বায়িত্বরত ম্যাজিষ্ট্রেট মোঃ আশরাফুল হক ঘটনাস্থলে পৌঁছে এস.আইয়ের পক্ষে ক্ষমা চান এবং তাকে প্রত্যাহার করা হবে বলে জানান।
হিরণ সমর্থকদের ওপর হামলা
নগরীর ৫নং ওয়ার্ডের শহীদ জিয়াউর রহমান নিন্ম মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে মেয়র পদের প্রধান দুই প্রতিদ্বন্ধী হিরণ ও কামালের সমর্থকদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে। সকাল পৌনে দশটার দিকে পলাশপুর ওয়ার্ড আ’লীগের সহসভাপতি আব্দুস সোবাহানের বুকে থাকা টেলিভিশন প্রতীক ছিঁড়ে ফেলে কামাল সমর্থক আবুল কাশেম। এনিয়ে উভয়ের মধ্যে বাকবিতন্ডার একপর্যায়ে কাশেম ও তার লোকজনে সোবাহানের ওপর হামলা চালালে উভয় গ্র“পের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার পর ওই ভোট কেন্দ্রে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
একটি কেন্দ্রে এক ঘণ্টা ভোটগ্রহণ স্থগিত
নগরীর রূপাতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে প্রায় এক ঘন্টা ভোটগ্রহণ স্থগিত ছিলো। দুপুর সোয়া দুইটার দিকে অপ্রীতিকর পরিস্থিতির কারণে প্রিজাইডিং অফিসার ভোটগ্রহণ বন্ধ করে দেন। পরবর্তীতে এক ঘন্টা পর কড়া নিরাপত্তার মধ্যদিয়ে পূর্ণরায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়। জানা গেছে, টেলিভিশন প্রতীক ঝুলিয়ে একজন ভোটার তা ভোট দিতে আসলে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী কামালের লোকজন জাল ভোট দেয়ার অভিযোগ তুলে তাকে বেধম মারধর করে। আ’লীগ সমর্থিত প্রার্থী হিরণ খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য ঘটনাস্থলে উপস্থিত প্রতিদ্বন্ধী প্রার্থী কামালের সাথে কুশল বিনিময় করতে গেলে কামালের সমর্থকেরা হিরণকে গালিগালাজ শুরু করে। একপর্যায়ে দু’পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এতে হিরন, কামাল ও সাবেক এমপি আবুল হোসেন আহত হন।
কামাল অভিযোগ করেন, হিরণ তার কর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ এনে নিজেই ভোটগ্রহণ বন্ধ করে দিয়েছেন। এ অভিযোগ অস্বীকার করে হিরণ বলেন, এই কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ আগেই বন্ধ করা হয়েছিল। আমি দেখতে আসলে মাহমুদ নামের কামালের এক সমর্থক আমার ওপর হামলা চালায়। এ সময় সে পিস্তলও বের করে হুমকি দেয়। ওই কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার আশরাফুল কবির বলেন, অপ্রীতিকর অবস্থার কারণেই ভোটগ্রহণ বন্ধ রাখা হয়েছিলো। পরে রিটার্নিং অফিসার নির্দেশনা দিলে এক ঘন্টা পর আবার ভোটগ্রহণ শুরু হয়।
আ’লীগ-বিএনপি সংঘর্ষ
সকাল ১০টার দিকে কাউনিয়া বালিকা বিদ্যালয়ে আ’লীগ ও বিএনপির কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, মেয়র প্রার্থী হিরণের স্ত্রী জেবুন্নেছা আফরোজ ছাত্রলীগ কর্মীদের নিয়ে ওইকেন্দ্র পরিদর্শনে যান। একই সময় সেখানে জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি মনোয়ার হোসেন জিপুর নেতৃত্বে ছাত্রদল নেতা-কর্মীরা কেন্দ্রের ভেতরে প্রবেশ করেন। এ নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। একপর্যায়ে শুরু হয় হাতাহাতি। ভোট কেন্দ্রে দায়িত্বরত আইন শৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা উভয় পক্ষকে কেন্দ্রের বাইরে বের করে দিলে নাজিরের পুল এলাকার বসে ছাত্রলীগ কর্মীরা বিএনপির কর্মীদের ওপর হামলা চালায়। এসময় উভয়ের মধ্যে হামলা ও পাল্টা হামলায় মহানগর যুবদলের সভাপতি রফিকুল ইসলাম শাহীন, জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি মনোয়ার হোসেন জিপু, ছাত্রদল কর্মী ইমন, আজম ও রুবেল আহত হয়। ঘটনার পরপরই ওই এলাকায় বিপুল সংখ্যক র্যাব, পুলিশ, বিজিবি অবস্থান গ্রহণ করে।
এ সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে আওয়ামীলীগ সমর্থিত সম্মিলিত নাগরিক কমিটির মেয়র প্রার্থী আলহাজ্ব শওকত হোসেন হিরণ-টেলিভিশন, বিএনপি সমর্থিত জাতীয়তাবাদী নাগরিক পরিষদের মেয়র প্রার্থী আহসান হাবিব কামাল-আনারস ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাহমুদুল হক খান মামুন-দোয়াত কলম প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্ধীতা করেন। এছাড়াও নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডে সাধারণ কাউন্সিলর পদে ১১৬ জন ও সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর পদে ৪৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্ধীতা করেছেন। এখানে মোট ভোটার সংখ্যা ২ লক্ষ ১১ হাজার ২৫৭ জন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লক্ষ ৭ হাজার ৬২৫ জন ও নারী ভোটার ১ লক্ষ ৩ হাজার ৬৩২ জন।
এ রির্পোট লেখা পর্যন্ত ভোট গণনা চলছে।