আর্কাইভ

গৌরনদীর সর্বজন শ্রদ্ধেয় মহার্লোকীয় মহারাজ মন্ডল

সুযোগ পেয়েছেন তারাই কেবল অনুধাবন করতে পেরেছেন মহারাজ স্যার কত উচুঁ মানের শিক্ষক ছিলেন। তার আদর্শে তাঁরই পদস্পর্শে জেগে উঠেছে বরিশালের গৌরনদীর মাটি। শিক্ষার আলোয় বিকশিত হয়েছে গৌরনদীর প্রতিটি প্রত্যন্ত গ্রাম। এ অঞ্চলের প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে রয়েছে মহারাজ মন্ডলের স্থান।

মাদারীপুর জেলার কালকিনি উপজেলার এক শান্ত-নিভৃত গ্রাম ঘুঙ্গিয়াকুল। চারদিকে তথাকথিত আধুনিকতার ছিটে-ফোঁটা ছাপ থাকলেও তার জৌলুস কিংবা আভিজাত্য স্পর্শ করেনি ওই গ্রামকে। সন্ধ্যা হতেই চারদিকে সুনশান নীরবতা। এ গ্রামে রাত নামে নৈঃশব্দের নান্দনিকতায়। গ্রামের খেটে খাওয়া অধিকাংশ লোক রাতের প্রথম প্রহরেই বিছানায় এলিয়ে দেয় ক্লান্ত শরীর। মহারাজ মন্ডলে পিতা বিপিন বিহারী মন্ডল ঘুঙ্গিয়াকুল গ্রামের এক সাধারণ কৃষক। বসতভিটে ছাড়া আবাদী জমি সামান্যতম তার। আর্থিক টানপোড়ন ছিল নিত্যদিনের সাথী। বিপিন বিহারী মন্ডলের সংসারের ঘানি টানতে হয়েছে হাটে চাল বেচা কেনা করে। বিংশ শতাব্দীর বাঙালিরা শিক্ষা-দীক্ষায় ছিলেন অনেক পিছনে। বিপনি মন্ডল ও ছেলেকে লেখাপড়া শেখাতে আগ্রহী ছিলেন না। নিজের প্রচন্ড আগ্রহ, একাগ্রতা এবং পিতামহীর একান্ত ইচ্ছায় মহারাজ মন্ডল লেখাপড়া চালিয়ে যান। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে ভর্তি হন বীরমোহন উচ্চ বিদ্যালয়ে। একদিকে সংসারে লোকসংখ্যা বেড়ে যাওয়ার সাথে সাথে আর্থিক দৈন্যও বাড়তে থাকে লাগামহীনভাবে। রুদ্ধ হয়ে যেতে থাকে মহারাজ মন্ডলের উচ্চ শিক্ষা গ্রহনের সাধ। যুবক মহারাজ বাবাকে চালের ব্যবসায় সহযোগিতা করেন। পড়ার খরচ জোগানের জন্য সামান্য বেতনে প্রাইভেট পাড়োনো শুরু করেন। ক্লাসেও উপস্থিত হন রীতিমত।

৪৭-এর দেশবিভাগ অনেকের মতো মন্ডল পরিবারেরও ভাগ্য ফেরায়নি। দারিদ্রতার কষাঘাত প্রত্যয়দীপ্ত মহারাজকে করেছে ক্লান্ত, করেছে বিচলিত। কিন্তু বিচ্যুত করতে পারেনি তার লক্ষ্য থেকে। ১৯৫০ সালে মহারাজ মন্ডলের জীবনের এক স্মরনীয় বছর। এ বছর তিনি দ্বিতীয় বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশ সম্পন্ন করেন। অধিক আগ্রহ-উদ্দীপনা নিয়ে মহারাজ মন্ডল মাদারীপুর নাজিমউদ্দিন কলেজে একাদশ শ্রেণীতে ভর্তি হন। তৎকালীন সময় ঘুঙ্গিয়াকুলের সাথে মাদারীপুরের যোগাযোগের একমাত্র বাহন ছিলো নৌকা। প্রতিদিন সাত মাইল নৌকা বেয়ে কলেজে আসতে হতো মহারাজ মন্ডলকে। প্রতিদিন সূর্য ওঠার আগে রওনা করে বাড়ি ফিরতে সন্ধ্যা, আবার কখনো রাত। প্রত্যাহিক এ কঠোর প্ররিশ্রম দমাতে পারেনি মহারাজ মন্ডলকে। বরং তাঁকে করেছে আরো উৎসাহী ও মনোযোগী।

 

ফলস্বরূপ ১৯৫২সালে তিনি আইকম প্রথম বিভাগে পাশ করেন। একদিকে সংসারের চরম আর্থিক অনটন, অন্যদিকে নিজ আয়ে পড়ালেখা চালানো। মাঝে মাঝেই দোটানায় পড়তে হতো তাকে। এছাড়া সংসারের বড় ছেলে হিসেবে গুরুদায়িত্ব তার ওপর। অগত্যা টেকেরহাটের একটি বিদ্যালয়ে মাসিক ৭৫ টাকা বেতনে চাকুরি নেন। এই মহান শিক্ষকের শিক্ষকতা জীবন এখান থেকেই শুরু। এখানে শিক্ষকতার পরে তিনি চলে আসেন বরিশাল জেলার উজিরপুর থানার কার্ফা উচ্চ বিদ্যালয়ে। একদিকে অভিভাবকত্বের গুরুদায়িত্ব, অন্যদিকে নিজের উচ্চশিক্ষা গ্রহনের তীব্র আকাঙ্খা। জ্ঞানপিপাসু মহারাজ মন্ডল সবদিক সামলান সুদক্ষ কারিগর রূপে। কার্ফা স্কুলের শিক্ষক থাকাকালীন তিনি ১৯৫৬ সালে চাখার কলেজ থেকে ২য় বিভাগে বি.এ পাশ করেন। ১৬ সেপ্টেম্বর ১৯৫৬ সালে মহারাজ মন্ডল আসেন তার নতুন কর্মস্থলে। বর্তমান ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের পাশে গৌরনদী উপজেলার আশোকাঠী নামক স্থানে। জমিদার মোহনলাল সাহার প্রতিষ্ঠিত গোলপাতার দোচালা লম্বা ঘরে পালরদী মাধ্যমিক বিদ্যালয়। সামনে বিস্তৃত মাঠ। মাঠের কোল ঘেঁষে প্রবাহিত বড় খরস্রোত খাল। এ মনোরম পরিবেশ মহারাজ মন্ডলের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বাবু অমূল্য রতন ভৌমিকের আন্তরিকতায় মুগ্ধ হন মহারাজ মন্ডল। ধন্য হন এই জ্ঞানতাপসের স্পর্শে। শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ পথচলা। ১৯৬৫-২০১০সাল। গোলপাতার ঘর থেকে সুরম্য অট্টালিকা।

ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যা দুই শতাধিক থেকে ২০০০-এর কাছাকাছি। এসবই হয়েছে অনেক কঠোর পরিশ্রম, সদিচ্ছা ও আপ্রাণ প্রচেষ্টার ফলে। আর পালরদী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এ উত্তরণের অগ্রনায়ক ছিলেন বাবু মহারাজ মন্ডল। জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য তুচ্ছ জ্ঞান করেছেন তিনি। শিক্ষার উৎকর্ষ সাধন ও প্রসারে তিনি এক নিবেদিত প্রাণ। কিছু দিতে হলে নিজেকেও হতে হয় উপযুক্ত। ১৯৬৫ সালে ঢাকা শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ থেকে মহারাজ মন্ডল বি. এড কোর্স সম্পন্ন করেন। এখানেও তিনি মেধার দ্যুতি ছড়িয়েছেন। লাভ করেছেন প্রথম শ্রেণীতে যষ্ঠ স্থান। আধুনিক শিক্ষার প্রতি অনুরাগী মহারাজ মন্ডল বৃটিশ কাউন্সিল থেকে ইংরেজীতেও প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। ছাত্র-ছাত্রীকে দেখেই তার সুপ্ত প্রতিভা আঁচ করতে পারতেন তিনি।

শিক্ষাকতার ৪০ বছরে অনেক মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীকে তিনি করেছেন পিতৃেহে লালন-পালন। প্রধান শিক্ষক হিসেবে অভিভাবকহীন অনেক ছাত্র-ছাত্রীর তিনি হয়েছেন অভিভাবক। হতাশার অন্ধকারে তিনি সর্বদা তাদের যুগিয়েছেন আশার আলো। নিজের কামনা-বাসনাকে জলাঞ্জলি দিয়ে জীবন জ্ঞান সাধনায় ব্যাপৃত এই মহান পুরুষ জীবন সায়াহ্নে এসে পাননি কিছুই। তিনি ছিলেন জাতি-ধর্ম-বর্ণের উর্দ্ধে। এই আলোকিত মানুষটির মহাপ্রস্থানঘটে ২০০৫ সালের ৯ জুলাই। দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর ঢাকায় লালবাগের ভাড়াটিয়া বাড়িতে তিনি পরলোকগমন করেন। ছাত্র-ছাত্রীদের অনুরোধে স্কুলের প্রতিষ্ঠাতার সমাধির পাশে স্কুল প্রাঙ্গণেই সমাধিস্থ করা হয় মহারাজ মন্ডলকে। এই মহান শিক্ষাগুরুর কর্মের নিষ্ঠা ও আদর্শ জাগ্রত হয়ে থাক আগামী প্রজন্মের মাঝে।

লেখক: খোকন আহম্মেদ হীরা, সম্পাদক Gournadi.com

আরও পড়ুন

Back to top button