আর্কাইভ

ক্যান্সার হাসপাতালের টাকা লোপাটকারী এলাকায় সমাজ সেবক

টাকা লোপাটকারী আব্দুস ছালাম সরদার তার নিজ এলাকা বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলায় একজন সমাজ সেবক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে এলাকার বিভিন্ন আবদুস সালামধর্মীয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মোটা অংকের অনুদান, নিজের ছবি সংবলিত উন্নতমানের হাজার-হাজার ক্যালেন্ডার বিতরনসহ নানা সামাজিক কর্মকান্ডে নিজেকে জড়িয়ে এলাকায় একজন সমাজ সেবক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। এরইমধ্যে বিভিন্ন গণমাধ্যমে আব্দুস সালাম সরদারের ছবিসহ ক্যান্সার হাসপাতালের সাড়ে তিন কোটি টাকা লোপাটের খবর প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই এলাকায় তোলপাড় শুরু হয়েছে। মুখ খুলতে শুরু করেছেন এলাকার খেটে খাওয়া সাধারন মানুষেরা। গতকাল শনিবার সালাম সরদারের নিজ গ্রাম আগৈলঝাড়া উপজেলার বড় বাশাইল এলাকা ঘুরে পাওয়া গেছে চমক প্রদত্ত তথ্য। ওই গ্রামের ব্যবসায়ী শ্যামল ঘটক জানান, মৃত লতিফ সরদারের পুত্র আব্দুস সালাম সরদার। লতিফ সরদার ছিলেন পেশায় একজন কৃষক।

একই গ্রামের ওবায়েদ হাওলাদার, নিহার রঞ্জন হালদারাসহ একাধিক ব্যক্তিরা জানান, গত ডিসেম্বর মাস থেকে সালাম নিজ এলাকায় নানা সামাজিক কর্মকান্ডে নিজেকে জড়িয়ে নেন। তারই ধারাবাহিকতায় তিনি (সালাম) রাজিহার হাইস্কুলে ২০ হাজার টাকা, রামানন্দের আঁক গ্রামের রামযাত্রায় ২০ হাজার টাকা, রাজিহার গ্রামে যাত্রাপালার নামে ৪০ টাকাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনুদান দিয়ে আসছিলো। এছাড়াও তিনি এলাকার অসহায়, দুঃস্থ ও কন্যাদ্বায়গ্রস্থ পরিবারের মাঝে মোটা অংকের টাকা অনুদান ছড়ায়। তিনি নিজের ছবি সংবলিত উন্নত মানের ২০১১ সালের হাজার-হাজার ক্যালেন্ডার ছাঁপিয়ে এলাকায় বিতরন করেন। হঠাৎ করে তিনি (সালাম) এলাকায় হয়ে যান বিশিষ্ট সমাজ সেবক। তার এ আমল পরিবর্তন ও নিজেকে সমাজ সেবায় জড়িয়ে নেয়ার বিষয়টি এলাকার অনেকেই ভিন্ন ভিন্ন খাতে দেখেছিলেন। অতিসম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে আব্দুস সালাম সরদারের ছবি সংবলিত ক্যান্সার হাসপাতালের সাড়ে তিন কোটি টাকা আত্মসাতের খবরটি প্রকাশিত হওয়ার পর পুরো এলাকায় তোলপাড় শুরু হয়ে যায়।    

সূত্রমতে, জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ইউজার ফিসহ বিভিন্ন ডায়াগনোস্টিক ফি বাবদ আদায় করা প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা লোপাট করেন হাসপাতালের ক্যাশিয়ার আব্দুস সালাম সরদার। সূত্রে আরো জানা গেছে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ক্যাশিয়ার সালামের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের বিষয়ে গোপনে তৎপরতা চালাচ্ছে। তবে আব্দুস সালাম নিজেও স্বীকার করেছেন, তার কাছে হাসপাতালের গত সাত মাসের উপার্জিত অর্থ রয়েছে। তিনি খুব শিঘ্রই সেগুলো জমা দিয়ে দেবেন। সূত্রে উল্লেখ রয়েছে, হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক মোল্লা ওবায়দুল্লাহ বাকী জানিয়েছেন, তার কাছে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ এখনো আসেনি। হাসপাতালের আদায় করা সমুদয় অর্থ সরকারের কোষাগারে জমা দেয়ার নিয়ম। তিনি আরো জানিয়েছেন, কিছু হয়ে থাকলে মামলা-মোকদ্দমা বা পুলিশ ডেকে তো সমাধান করা যাবে না, এজন্য কিছু কৌশল নিতে হবে। দুর্নীতি করে থাকলে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।

হাসপাতালের একাধিক সূত্রের ভিত্তিতে সূত্রে আরো উল্লেখ রয়েছে, পরিচালকের দায়িত্ব নেয়ার কিছুদিনের মধ্যেই অধ্যাপক মোল্লা ওবায়দুল্লাহ বাকী হাসপাতালের ডার্ক রুম সহকারী আব্দুস সালামকে ক্যাশিয়ারের দায়িত্ব দেন। এরপর থেকেই তিনি (সালাম) হাসপাতালের বিভিন্ন খাতের আদায় করা অর্থ জমা দিতে গড়িমসি শুরু করেন। কিন্তু চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাপের মুখে তিনি কয়েক মাস জমা দেন। গত বছরের এপ্রিল মাস থেকে সালাম সরদার টাকা জমা দেয়া থেকে বিরত থাকেন। এভাবে তিনি গত বছরের অক্টোবর পর্যন্ত আদায় করা কোনো টাকা কোষাগারে জমা দেননি। শেষ দিকে এসে তিনি অফিসে আসাও কমিয়ে দিয়েছেন। মাসের শেষের দিকে এসে কোনো রকমে চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতাদি পরিশোধ করে যান। হাসপাতালে প্রতি মাসে সরকার নির্ধারিত ইউজার ফি, টিকেট ফি, সিট ভাড়া, প্যাথলজি, ডায়াগনস্টিক, এক্স-রে, সিটিস্ক্যান, আলট্রাসনো, মেমোগ্রাফি, রেডিওথেরাপি ফি, এন্ডোস্কপি ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ফি থেকে প্রায় অর্ধ কোটি টাকা আদায় হয়। গত বছরের এপ্রিল থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা এ বাবদ আদায় হয়েছে। ওই অর্থ আব্দুস সালাম জমির ব্যবসা ও ফ্ল্যাট-বাড়ি বানানোর কাজে ব্যবহার করেছেন। আব্দুস সালাম নিজেও স্বীকার করেছেন, রাজধানীর কাছেই পূবাইলে তিনি প্রায় আট বিঘা জমি কিনেছেন। টঙ্গীতে তিন তলা বাড়িও বানিয়েছেন। সরকারি হাসপাতালে ইউজার ফিসহ অন্যান্য বাবদ আদায়কৃত অর্থের একটি অংশ সরকার পায়, আরেকটি অংশ পায় সংশ্লিষ্ট বিভাগের অধ্যাপক, চিকিৎসক, টেকনোলজিস্ট, নার্স ও কর্মচারীরা। চিকিৎসক, কর্মচারীদের কমিশনের বিষয়টি উচ্চ আদালতে মীমাংসাধীন থাকায় এটি আপাতত বন্ধ রয়েছে। এ সুযোগে ক্যাশিয়ার আব্দুস সালাম সরদার হাসপাতালের সাড়ে তিন কোটি টাকা আত্মসাত করে এলাকায় সমাজ সেবক হয়েছেন। তার নিজ এলাকার সচেতন গ্রামবাসী সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়সহ দুর্নীতি দমন কমিশনের কাছে তদন্ত সাপেক্ষে দুর্নীতিবাজ আব্দুস সালাম সরদারের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

আরও পড়ুন

Back to top button
Translate »