আর্কাইভ

ধর্ম নিয়ে লেখালেখির বিপদ!

ফজলুল বারীধর্ম নিয়ে লেখালেখি করি কম। এর বড় কারন নিজে এর অনেক কম জানি। বিষয়টিও স্পর্শকাতরও। এসবের সঙ্গে অনেক মানুষের বিশ্বাস-আবেগ ধর্মজড়িত। ঘরে ভাত নেই পরনে কাপড় নেই, কিন্তু ‘দোয়াললিন’ না ‘জোয়াললিন’  এমন ঘরানার বিতর্ক নিয়ে খুনোখুনি আমাদের দেশে কম হয়নি। রামের জন্মভূমি বিতর্কে হিন্দু মৌলবাদীদের হাতে বাবরি মসজিদ ভাঙ্গা করে ভারতের মতো পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রের দেশের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার থাবা পৌঁছেছে বাংলাদেশ পর্যন্ত! এসব পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে  রাজনৈতিক নোংরামিও কম হয়নি। এরশাদ তার বিরুদ্ধে আন্দোলনকে ভিন্নপথে সরাতে দাঙ্গা সজ্জার কাজ করেন। যুব সংহতির  পান্ডারা বঙ্গভবন থেকে মিছিল করে গিয়ে হামলা শুরু করে পুরনো ঢাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িতে-দোকানে । বিএনপিপন্থী সাংবাদিক গিয়াস কামাল চৌধুরী তখন যে ভয়েস অব আমেরিকায় ভুল রিপোর্ট পাঠিয়ে সারাদেশে দাঙ্গা বিস্তারের কাজ করেছিলেন, তা তিনি এরশাদ না কার পক্ষে করেছিলেন আজ পর্যন্ত সেটি একটি জ্বলজ্বলে প্রশ্ন! ধর্ম নিয়েও প্রিয় আবিদ রহমান ভাই’র বাংলানিউজে কিছু লেখালেখি-নাড়াচাড়া নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে।

অষ্ট্রেলিয়ায় প্রধানমন্ত্রী জুলিয়া গিলার্ড থেকে শুরু করে এদেশের উল্লেখযোগ্য মানুষজন ধর্মে বিশ্বাস করেন না। কিন্তু এদেশে আইন করে ধর্মে বিশ্বাসীদের অধিকারকে প্রটেকশন দেয়া আছে। অর্থাৎ এখানে কেউ কারও ধর্মকে আঘাত বা কটাক্ষ করতে পারেন না। করেনও না। এদেশে নাগরিকত্ব বা যে কোন শপথে ধর্মে বিশ্বাসী বা অবিশ্বাসী উভয়পক্ষের জন্য পৃথক ব্যবস্থা আছে। ধর্মে বিশ্বাসীরা ধর্ম গ্রন্থ ছুঁয়ে বা এরনামে শপথ নেন। অবিশ্বাসীদের ক্ষেত্রে এ নিয়ে কোন বাধ্যবাধকতা নেই। যার ধর্ম তার কাছে।

 যতগুলো ধর্মেগ্রন্থের যতটা পড়েছি, মনে হয়েছে এগুলো আসলে গল্পগ্রন্থ বা অনেকগুলো গল্পের সংকলন। এবং এসব গল্প সমূহ প্রায় একই রকমের। যার যার ধর্ম বা ব্যক্তিদের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রেখে সেগুলোর সংকলন-উপস্থাপন করা হয়েছে। আদিকালে যখন রাষ্ট্র, সংবিধান, আইন-কানুন ছিলনা তখন ধর্মের আবির্ভাব হয়। পৃথিবীতে নানা সময়ে অনেক মতবাদ এসেছে। হারিয়ে গেছে। কিন্তু ধর্মগুলো হারায়নি। আমি-আপনি যেভাবে দেখি বা পছন্দ-অপছন্দ যাই করিনা কেন এটাতো মানতে হবে। কোরানকে একপক্ষ একসময় বলেছিলেন বা এখনও বলেন যে এটি আসলে হযরত মোহাম্মদ (দঃ)’এর ব্যক্তিগত ডায়েরি ছাড়া আর কিছু নয়।

কিন্তু ১৪০০ বছরেরও আগের কোন ধরনের একাডেমিক পড়াশুনা ছাড়া একজন মানুষের পক্ষে এ ধরনের ডায়েরি লেখা সম্ভব ছিল কিনা, সে প্রশ্নটি সামনে প্রশ্নের উত্থাপনকারীরা পিছিয়েছেন। আবার কোরান বা ইসলামের আদিধারা হযরত মোহাম্মদের(দঃ) সময়কার মতো করে যে মুসলিম প্রধান দেশ বা সমাজে যে  অবিকল বহাল নেই সেটিওতো সত্য। ধর্ম নিয়ে বাংলাদেশে বেশি ঘাটাঘাটির বিপদও আছে। কারন ইসলামেই বলে দেয়া আছে খোদাতায়ালার অনেক কিছু নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবেনা। ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করে যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াতে ইসলামী। কিন্তু এর অন্যতম যুদ্ধাপরাধী নেতা মতিউর রহমান নিজামির বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতির আঘাতের অভিযোগে আওয়ামী লীগের সরকারি উদ্যোগে মামলা হয়েছে। নিজামির উপস্থিতিতে তাকে হযরত মোহাম্মদের সঙ্গে তুলনা করে বক্তৃতা দিয়েছেন জামায়াতের এক নেতা। নিজামির বিষয়টাতে আরাম লেগেছে! তাই তিনিও এর প্রতিবাদ করেননি!

ধর্মকে এমন যে যার মতো ব্যবহারের হাতিয়ার করে নিয়েছে! কাবা শরীফের হেফাজতকারী সৌদি আরবে যে যুগের পর যুগ রাজতন্ত্র চলছে বা দুনিয়ার নানান মুসলিম দেশের অত্যাচারী একনায়করা যে পালিয়ে সেখানে আশ্রয় পায়, এটি ইসলামের কোন কিতাব সমর্থন করে? বা যুগে যুগে দেশে দেশে যে ইসলামিক আইনের সংস্কার হয়েছে বা এখনও হচ্ছে তাতে কী ইসলাম হারিয়ে গেছে? বাংলাদেশের একশ্রেনীর মুসলিম নেতা এখন নারী নীতির বিরোধিতা করছেন, আইয়ুব খানের মুসলিম পারিবারিক আইনের আগের অবস্থা কী ছিল? বা সেই মুসলিম পারিবারিক আইনটি তারা আর বাতিল করতে বলেননা কেন? এখনতো নিজেরাই বিয়ে-শাদি সেই আইনেই দিব্যি করে যাচ্ছেন!

আরব দেশে এখনও মুসলিম পরিবারের বিয়েতে ঢোল বাজানো হয়। মুসলিম পরিবারে অতিথি গেলে আনন্দ প্রকাশে মেয়েরা উলুধবনি দেয়। বাংলাদেশে এসব করতে গেলে কী হিন্দুস্থানী কালচার বলে চিল্লাচিল্লি শুরু করা হবেনা? অথচ বিয়েতে ঢোল বাজানো নিয়েতো একটি হাদিসও আছে। হাদিসটি হচ্ছে, বিয়েটি এমনভাবে করবে যাতে লোকজন জানে। ওই সময়ে যেহেতু আজকের মতো ম্যারেজ রেজিষ্টার, কোর্ট কাছারি ছিলনা, সে ব্যবস্থা-হাদিসটি সেভাবে এসেছিল।

বাংলাদেশের বিশিষ্ট এক ব্যক্তি তার নাম না প্রকাশের শর্তে ধর্ম নিয়ে তার মূল্যায়নে আমাকে বলেছিলেন, তিনি বিশ্বাস করেন কোরান সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্মগ্রন্থ, ইসলাম সর্বশ্রেষ্ঠ জীবনব্যবস্থা, হযরত মোহাম্মদ(দঃ) সর্বশেষ মহাপুরুষ। এরজন্যই তিনি বিশ্বাস করেন ইসলামী জীবন ব্যবস্থা আর নিখুঁত বাস্তবায়ন করা সম্ভব না। এ ব্যাপারে তার ঝুক্তিটি ছিল, হযরত মোহাম্মদ(দঃ) তার জীবদ্দশায় এই জীবনব্যবস্থাটি কোরানের মতো করতে বাস্তবায়ন করতে পেরেছিলেন। কিন্তু তার মৃত্যুর পর আর সেটি তার করা মতো বহাল আর থাকেনি। নানাদেশে নানান লোকজন এটিকে যার যার মতো করে নিয়েছে। কোরানে যেহেতু বলা হয়েছে তিনিও সর্বশেষ মহাপুরুষ, তার পর আর কোন মহাপুরুষ আসবেন না কাজেই সেই জীবন ব্যবস্থা আর হযরত মোহাম্মদের(দঃ) মত করে বাস্তবায়ন সম্ভব না।

১৯৯৭ সালে মিশরে গিয়ে দেখি সেখানে আইন করে ব্যাংকের সুদ হালাল। মিশরের আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয় দুনিয়ার ইসলামী শিক্ষা-গবেষনার সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান। ইসলামী নানা বিষয়ের সেখানে যুগোপযোগী গবেষনা হয়। গ্র্যান্ড মুফতি নামের একটি সরকারি পদ আছে মিশরে । নানা বিষয়ে ফতোয়া দেন গ্র্যান্ড মুফতি। সেটি সেখানে আইন হিসাবে গ্রহন করা হয়। ব্যাংকের সুদ হালাল ঘোষনা সম্পর্কে গ্র্যান্ড মুফতির যুক্তি ছিল, ইসলামের যে যুগে সুদ হারাম করা হয় তখন গরিব মানুষ ক্ষুধার জন্য ঋণ করত। সে যেখানে ঋণেরই শোধ দেবার ব্যাপারে সামর্থ্যহীন, সেখানে সুদের বিষয়টি তার জন্য জুলুম হয়ে যেত। এখন ব্যাংক সারা দুনিয়ার ব্যবসা করে। সেখান থেকে গ্রাহককে লভ্যাংশ দেয়। মিশরের সেই মুফতি অবশ্য বুদ্ধিমান।  তিনি জানতেন, তার ফতোয়া নিয়ে সারা দুনিয়ার মুসলিম নেতারা গোলমাল পাকাতে পারে। তাই তিনি একটি ব্র্যাকেট দিয়ে বলেন, এই ফতোয়া শুধু মিশরের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তাই তার সেই ফতোয়ার প্রভাব মিশরের বাইরে আসেননি। বাংলাদেশের কোন মুফতি-মৌলভীও কোনদিন ফতোয়া দিয়ে বলেননি যে মিশরের সঙ্গে সম্পর্ক হারাম বা ওই দেশে কেউ যাবেননা। অবশ্য বলা হয় বাংলাদেশের মুফতি-মৌলভীরা মতে না মিললে যাকে তাকে মুরতাদ ঘোষনা, বিবি তালাক ছাড়া ফতোয়া কম জানেন বা চর্চা করেন কম।

বাংলাদেশের সিংহভাগ মানুষ ধর্মভীরু। কিন্তু ধর্মান্ধ না। মনসিকভাবে সেক্যুলার। সে কারনে ঈদ উৎসবের পর পহেলা বৈশাখ দেশের বড় উসব। একুশে ফেব্রুয়ারি, ছাব্বিশে মার্চ, ষোল ডিসেম্বরেও রাজপথে জনতার ঢল নামে। দুনিয়ার নানা মুসলিম দেশ ঘুরে মনে হয়েছে, বাংলাদেশের যারা ধর্মকর্ম করে তারা তা সিরিয়াসলি করে। পাকিস্তান বা অনেক দেশের মুসলমানদের মতো অভিনয় করে কম। আরব দেশে দেখবেন একদল লোক সারাক্ষন লম্বা তসবীহ হাতে বিড়বিড় কিছু পড়ছে। আবার পাশ দিয়ে কোন সুন্দরী মেয়েকে হেঁটে যেতে দেখলে টিজিং করতে দেরি করেনা! উজবেকিস্তানে গিয়ে দেখি সব কবরের সঙ্গে মৃতের ছবি লাগানো। বাংলাদেশে এটা কী কল্পনা করা সম্ভব? সেদেশের এক ধর্মীয় নেতাকে বলা হয় তোমাদের মেয়েদের পোশাক দেখে মনে হয়না এটি মুসলিম প্রধান দেশ!

সেই ধর্মীয় নেতা বিস্ফোরিত চোখে জানতে চান, কোন দেশ থেকে এসেছ। বাংলাদেশ বললে বলেন, ইমাম বুখারি-তিরমিজির নাম শুনেছ? বোখারি শরীফ, তিরমিজি শরীফ পড়ে পড়ে তোমরা ইসলামের চর্চা শেখার চেষ্টা করেছো বা করছো। কিন্তু ঠিকমতো না করাতে এমন প্রশ্ন করলে। এরপর সেই ধর্মীয় নেতা বলেন, ইসলাম কোন পোশাকি ধর্ম না। অন্তরে ধারন করার ধর্ম। কাজেই পোশাক দেখে বলব মুসলমান কীনা, এটা ঠিক না। লেবাননে দুরয বলে একটি মুসলিম সম্প্রদায় আছে। যারা চল্লিশ বছর বয়স হবার পর ধর্ম-কর্ম শুরু করে। যুক্তি দেখিয়ে বলে হযরত মোহাম্মদ(দঃ) চল্লিশ বছর বয়সে নবুওত পেয়েছিলেন।

ইরাকের মসুলে এক এলাকা দিয়ে যাবার সময় গাইড বললেন,  জায়গাটির নাম নবী ইউনুস। জিজ্ঞেস করলাম কোন ইউনুস, ইনি কী হযরত ইউনুস (আঃ)? যার নাম করে আমরা বিপদে পড়লে খতমে ইউনুস তথা লাইলাহা ইল্লা আন্তা—পড়ি? ইয়েস বলতেই গাড়ি থামাতে বলি গাইডকে। ওজু করে জিয়ারতের উদ্দেশে ভিতরে যেতেই দেখি হযরত ইউনুসের(আঃ) সমাধির পাশে অনেক নারী-পুরুষ! এমন দুনিয়ার নানা দেশে মাজারের ভিতরে নারীদের দেখলে হযরত শাহ জালালের (রঃ) মাজারের কথা মনে পড়ে যায়। আমাদের শেখ হাসিনা বা খালেদা জিয়া শাহ জালালের (রঃ) মাজার জিয়ারত করে নির্বাচনী প্রচারনা শুরু করেন। কিন্তু মাজারের ভিতরে যাবার কোন নিয়ম-অধিকার তাদের নেই। কারন তারা নারী। দুনিয়ার সব মাজারে তারা যেতে পারলে শাহ জালালের (রঃ) মাজারে কেন যেতে পারবেননা? প্রশ্নটি তুললে কী কিল একটা মাটিতে পড়বে? না তারা ভোট পাবেন?

ধর্ম নিয়ে আমাদের দেশের চিন্তাবিদদের মধ্যেও রকমফের আছে। একশ্রেনীর লোকজন মুসলিম মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে আর অন্য ধর্মের মৌলবাদীদের পক্ষে বলাটাকে প্রগতিশীল চিন্তা মনে করেন! উগ্র মৌলবাদ তা যে কোন ধর্মের হোক তা ক্ষতিকর। কার্টুনিস্ট আনিসের কথা আমরা ভুলে যাইনি। বাংলাদেশে দাগী সব যুদ্ধাপরাধী, খুনী, ধর্ষক, দুর্নীতিবাজ, লম্পট সব থাকতে পারে, জন্মভূমির অধিকার করে গোলাম আজমকে প্রটেকশন দিয়েছে সুপ্রীমকোর্ট! কিন্তু দাউদ হায়দার, তসলিমা নাসরিন দেশে আসতে পারেন না। একবার আমাদের এক বন্ধু অম্লান দেওয়ান বিচিন্তা’য় ‘কৃষ্ণের বেলায় লীলাখেলা আমার বেলায় দোষ’ শিরোনামের একটি লেখা লিখলে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। হিন্দু মৌলবাদীদের হামলা-আক্রমনের ভয়ে তখন অনেক দিন বিচিন্তার সাইনবোর্ড পর্যন্ত খুলে রাখতে হয়েছে!

বাংলাদেশে এখন হিন্দি সিরিয়াল বিশেষ জনপ্রিয় হওয়াতে নাগরিকদের অনেকে এখন হিন্দি ভাষাও জানেন। ওইসব হিন্দি সিরিয়ালের কমন গল্পটা কী? বিলাসবহুল সব পরিবার, নানান কুটনামিতে বিপদে পড়ে আর বাড়ির মন্দিরে গিয়ে প্রার্থনা করে! বাংলাদেশের সব টিভি সিরিয়ালে যদি বাড়ির ভিতর এমন একটি মসজিদ বা নামাজের ঘর রাখা হতো তাহলে প্রতিক্রিয়া কী দাঁড়াত? কবি নজরুলের জীবনে এমন একটি গল্প আছে। প্রচুর কীর্তন নজরুল। আবার তিনি যখন ভগবানের বুকে পদচিহ্ন এঁকে দেবার কথা লিখেন হিন্দু মৌলবাদীরা তার বিরুদ্ধে ক্ষেপেন। আবার কীর্তন লেখা নিয়ে মুসলমান মোল্লা-পন্ডিত তখন তাকে মুরতাদ থেকে শুরু করে  গালমন্দ যা কিছু সম্ভব, এর কিছুই বাদ দেননি। এর রাগে নজরুল একবার কয়েকদিনের জন্য এক ঘরের ভিতর ঢুকে সে কয়দিনে যে পরিমান হামদ-নাত, ইসলামী গান লিখেছেন, পরে দেখা গেল পুরো বাংলা ইসলামী সাহিত্যে হামদ-নাত, ইসলামী গান  এর আগে কেউ লিখেননি।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে গবেষনায় আগরতলা, কলকাতায় দীর্ঘদিন থেকে কাজ করা হয়েছে। একাত্তরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সামরিক রাজধানী ছিল আগরতলা। কলকাতা ছিল রাজনৈতিক রাজধানী। একাত্তরের কলকাতায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লিখতে লিখতে নরেন মুখার্জি নামের একজন সাংবাদিক বিশেষ জনপ্রিয় হন। কৃত্তিবাস ওঝা নামে তিনি লিখতেন। কলকাতা থেকে ট্রেন ধরে নৈহাটির বাড়িতে দেখা করতে গিয়ে চমকে যেতে হয়। মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত খালি মুক্তিযুদ্ধের সময়কার পত্রিকা, বই সহ নানা দলিলের ব্যক্তিগত সংগ্রহশালা! সেই নরেন মুখার্জির একটি অনুসন্ধান শুনে চমকে যেতে হয়। যা আমরা সাধারনত ভাবি না বা সেভাবে ভাবার চেষ্টাও করিনা!

নরেন মুখার্জি বলেন মুক্তিযুদ্ধের সময় যত শ্মরনার্থী ভারতে আসেন তার ষাট শতাংশ বা এরবেশি ছিলেন হিন্দু ধর্মাবলম্বী। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় সে তুলনায় হিন্দু ধর্মাবলম্বীর সংখ্যা কম কেন? এ ব্যাপারে তার অনুসন্ধানটি হচ্ছে একাত্তরে ভারতে যাওয়া হিন্দু ধর্মাবলম্বী যুবকদের বেশিরভাগ ওপারে গিয়েই যার যার মাসির বাড়ি পিসির বাড়ি চলে যায়। যুদ্ধতো বেশিরভাগ করেছে চাষাভূষার ছেলেরা। শ্মরনার্থী শিবির ছাড়া যাদের কোন আশ্রয় ছিলনা। যুদ্ধে না জিতলে বাংলাদেশ না হলে তাদের কোন ভবিষ্যত হবেনা, এমন ভেবেই তারা জানপ্রাণ দিয়ে যুদ্ধ করে। নরেন মুখার্জির সেকথাগুলা লিখার পর উল্টো নিজেকে ‘সাম্প্রদায়িক’ গালমন্দ শুনতে হয়েছে।

নমস্কার বাংলাদেশ’ নামের একটা বই আছে আমার। রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কারনে বাংলাদেশের হিন্দুরা কী করে শুধুমাত্র সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা নয় সারা বছরে নিরবে দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যায়, এর কিছু কেস স্টাডি সেখানে আছে। কিন্তু এসব দেশান্তরী মানুষদের খুব কম সংখ্যক ভারতে গিয়ে ভালো থাকেন। তাদের বেশিরভাগের জায়গা হয় বস্তিতে। এদেশে একশ্রেনীর হিংস্র প্রকৃতির মানুষজন সারা সময় তাকে যেমন মালাউন বা ঢেঢাইয়া বলে গালি দেয়, ভারতে স্থানীয়রা যেখানে তাদেরকে গালি দেয় রিফিউজি অথবা বাঙ্গাল নামে। এই মানুষজনের জন্ম বাংলাদেশে, সারা সময় মনের মধ্যে বাংলাদেশ, কিন্তু একবার দেশ ছেড়ে চলে গেলে আর দেশে ফিরতেও পারেননা। মন বেশি খারাপ করলে পরিবার-পরিজন নিয়ে সীমান্তে এসে জন্মভূমি বাংলাদেশকে নমস্কার জানিয়ে চোখ মুছতে মুছতে ফিরে চলে যান। এটি নমস্কার বাংলাদেশের মূল ম্যাসেজ।

বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা স্বৈরশাসকরা নিজেদের রক্ষায় রাজনীতির সঙ্গে ধর্মকে জড়িয়েছে। পরবর্তি গণতান্ত্রিক শাসনেও ভোটের রাজনীতির নিরাপত্তায় সেখানে আর কেউ হাত দেবার চেষ্টা করেনি। এমন কী দেশের সুপ্রীমকোর্ট পর্যন্ত না। এভাবে মুক্তিযুদ্ধের মূলধারা থেকে হারিয়ে গেছে বাংলাদেশ! পাকিস্তান রাষ্ট্রের অভিজ্ঞতায় যে চিন্তাধারাটি ছিল ধর্ম থাকবে ধর্মের জায়গায়, যার ধর্ম তার কাছে, রাষ্ট্র তার কাজে ধর্মকে জড়াতে গিয়ে এক ধর্মকে মাথায় তোলার নামে আরেক ধর্ম বা তার আনুসারীদের নিচে নামিয়ে দেবেনা বা মানসিক অনিশ্চয়তায় ফেলবেনা! ধর্মের নামে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরোধিতা থেকে শুরু করে খুন-ধর্ষন-লুটতরাজ-রাহাজানি এসবের কী করেনি একাত্তরের জামায়াত সহ ধর্মীয় দলগুলো? এখনও তারা ধর্মের নামে আটকে দিতে চাইছে যুদ্ধাপরাধী-মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধকারীদের বিচার! এরা নির্বাচনে জিতলে দেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর কী নির্যাতন নেমে আসে তাতো ২০০১ সালের নির্বাচনের পর সর্বশেষ দেখেছে দেশের মানুষ! কালিয়াকৈরের তেমন এক আক্রান্ত গ্রামে সরেজমিন রিপোর্ট করে গেলে দেখা যায় ভাঙ্গা প্রতিমার পাশে বসে আছেন ভয়ার্ত পুরোহিত। আগুনে বেশ খানিকটা পুড়ে যাওয়া গীতার পাশে আবার এককপি জনকন্ঠ! পুরোহিত গীতার একলাইন পড়লে এরপর পড়েন জনকণ্ঠের রিপোর্টের এক লাইন! নাম শুনে হাউমাউ কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে বলেন, আপনার রিপোর্টই পড়ছিলাম, আমাদের এই দেশে যে কি হবে!

বাংলাদেশে সবশেষ সংবিধান সংশোধনীর পরও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিচু করে দেখার রাষ্ট্রীয় বাতিকটি থেকেই গেল! রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম বহাল রাখার পর সনাতন সহ অন্য ধর্মাবলম্বীরা মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশটিতে সাংবিধানিক দ্বিতীয় শ্রেনীর নাগরিক থেকেই গেলেন! এবং তা সবশেষ ঘটল মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বের সংগঠন আওয়ামী লীগের মাধ্যমে! অর্পিত সম্পত্তি আইনের গড়িমসি দেখে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মতোও অক্ষমের আর্তনাদের মতো ছুঁড়তে হয় হাত পা! ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের যে দলটির স্থায়ী ভোটব্যাংক মনে করা হয়, বা যেন আওয়ামী লীগও যেন মনে করে, এছাড়া তারা যাইব কই!

ফজলুল বারীঃ সিডনি প্রবাসী সাংবাদিক 

আরও পড়ুন

Back to top button