আর্কাইভ

আওয়ামী লীগে নবীণ প্রবীণের বাহাসে সাংগঠনিক কর্মকান্ড স্থবির

উম্মে রুম্মান, বরিশাল ॥ আওয়ামী লীগের নবীণ এবং প্রবীণনেতাদের মধ্যে দোষারোপের বাহাস চলছে। নবীণ নেতারা সঠিক ভাবে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড না বোঝায় সরকারকে বিভিন্ন সমস্যায় পড়তে হচ্ছে বলে প্রবীণ নেতাদের অভিযোগ। অপরদিকে নবীণ নেতাদের অভিযোগ প্রবীণদের অতিকথনে সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত এবং দলের বিভিন্ন কাজে ব্যাঘাত ঘটছে। তারা অযথাই সমালোচনা করে বিরোধী পক্ষের হাতে ইস্যু তুলে দিচ্ছেন। একমাত্র একারণেই দলের সাংগঠনিক কর্মকান্ড অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছে বলে মনেকরছেন সাধারণ কর্মীরা।

গত এক বছরে বেশ কিছু সাংগঠনিক কর্মসূচী হাতে নিলেও কার্যত একটিরও পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে পারেনি দলটি। বরং বিরোধী দলের কর্মকান্ডের জবাব দিতে বক্তৃতাবাজিতে ব্যাস্ত সময় কাটাচ্ছেন নেতারা। এতে সাংগঠনিক ভাবে আওয়ামী লীগ দূর্বল হয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন পদে না থাকা আওয়ামী লীগের নেতারা। নাম প্রকাশ না করা শর্তে পদ বঞ্চিত আওয়ামী লীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ক্ষোভের সাথে বলেন, বর্তমানে চোখে পড়ার মতো সাংগঠনিক কোন কর্মকাণ্ড নেই। সবাই পকেট ভরায় ব্যস্ত। তিনি বলেন, দল ঠিক না থাকলে নেতারা নেতাগিরি দেখাবেন কোথায়? সাধারণ মানুষ নেতাদের থেকে ভালবাসা চায়। কিন্তু বর্তমান নেতারা না পারেন মানুষকে ভালো বাসতে না পারেন দেশের জন্য কিছু করতে। সবাই শুধু বঙ্গবন্ধুকে সাইনবোর্ড হিসেবে ব্যবহার করে পকেট ভরছেন।

২০০৮ সালের নির্বাচনে পুরনো-নতুনের সম্মিলনে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি চালুর লক্ষ্যে আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা প্রায় ১০০ নবীণ নেতাকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন দেন। তাদের বেশির ভাগ বিজয়ী হলেও দলের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে তারা সর্ব মহলে সমালোচনার পাত্রে পরিণত হয়েছেন। দলকেও সমালোচনায় ফেলছেন।

এদিকে নবীণ সংসদ সদস্যরা মনে করেন, তাদের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগই মিথ্যা। এসব অভিযোগ তোলার উদ্দেশ্য হচ্ছে ভবিষ্যতে তাদের মনোনয়ন কেড়ে নেয়া। তবে মহাজোটের ক্ষমতাগ্রহনের এই তিন বছরে সরকারের যত সমালোচনা সবই নবীন নেতাদের বিরুদ্ধে। তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের মধ্যে রয়েছে- ক্ষমতার প্রভাব, দলাদলি, কোন্দল, তৃণমূল কর্মীদের অবহেলা, নির্বাচনী এলাকায় নেতা-কর্মীদের বাদ দিয়ে নিজস্ব বলয় তৈরি, সরকারি জমিতে অবৈধ স্থাপনা গড়ে তোলা, নিয়োগ-তদবিরসহ নানা অনৈতিক কর্মকান্ড। এ কারণেই নবীন সংসদ সদস্যরা নিজ এলাকায় জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহরের ধারণা। এ কারনে দলের তৃণমূলের গঠন প্রক্রিয়ার জন্য বার বার উদ্যোগ নেয়ার পরেও তা ভেস্তে যাচ্ছে।

প্রথমবারের মত নির্বাচিত যেসব সংসদ সদস্য বিভিন্ন সময়ে বিতর্কিত হয়েছেন তারা হলেন- পটুয়াখালী-৩ আসনের গোলাম মাওলা রনি, কক্সবাজার-৪ এর আবদুর রহমান বদি, চট্টগ্রাম-১০ এর এম আবদুল লতিফ, ঢাকা-১৪ এর মো. আসলামুল হক আসলাম, ময়মনসিংহ-১০ আসনের গিয়াসউদ্দিন আহমেদ, পাবনা-৫ এর গোলাম ফারুক খন্দকার প্রিন্স, নারায়ণগঞ্জের সারাহ বেগম কবরী, ঢাকার সানজিদা খানম, পিরোজপুর-১ আসনের একেএমএ আউয়াল, পিরোজপুর-৩ আসনের ডা. আনোয়ার, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ৩-এর আবদুল ওদুদ, নেত্রকোনার মোস্তাক আহমেদ রুহী, চুয়াডাঙ্গা-১ এর সোলায়মান হক জোয়ার্দার সেলুন, মেহেরপুর ১-এর জয়নাল আবেদীন প্রমুখ।

সরকারী জায়গা দখল করে নিজের নামে স্থাপনা তৈরী, সরকারী কর্মকর্তাদের গায়ে হাত তোলা, দলের প্রবীণ নেতাদের নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সমালোচনা করা, দলীয় হাইকমান্ডের নির্দেশনা না মানাসহ বিভিন্ন অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি। তবে এদের মধ্যে আব্দুর রহমান বদি এবং গোলাম মাওলা রনি এসব কাজ করে বেশি বেশি শিরোনামে এসেছেন। যোগাযোগ মন্ত্রীর মন্ত্রিত্ব পাওয়া নিয়ে মন্তব্যর কারনে গত ২০ অক্টোবর আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের সভায় খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এমপি রনিকে কঠোর ভাষায় ভৎসনা করেন। তিনি তাকে বেইমান, মীরজাফর বলে অভিহিত করেন। পটুয়াখালীর স্থানীয় নেতা-কর্মীরা মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী এমপি রনিকে যথার্থই বলেছেন। কক্সবাজার-৪ আসনের সদস্য আবদুর রহমান বদির বিধি লঙ্ঘন করার কারনে উখিয়া উপজেলা পরিষদের নির্বাচন স্থগিত করতে বাধ্য হয় নির্বাচন কমিশন। কক্সবাজারের একটি সড়ক মেরামত ও ঠিকাদার নিয়োগ নিয়ে তিনি নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল হালিমকে মারধর করেন। গত সংসদ নির্বাচনে কক্সবাজারের চারটি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগের একমাত্র এমপি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার মাত্র ২৩ দিন পর তিনি টেকনাফ উপজেলা নির্বাচনের দিন সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার ও ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তা গিয়াসউদ্দিনকে মারধর করেন। এরপর তার হাতে প্রহৃত হন টেকনাফের বন কর্মকর্তা মুজিবুর রহমান। এ ছাড়া  ভোটার তালিকা তৈরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে টেকনাফের প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক আবদুল জলিল ও পুলিন দে প্রহৃত হন এমপি বদির হাতে।

এসব বিষয় নিয়ে দলের প্রবীণ রাজনীতিবিদরা অনেকটা বিব্রত। তারা মনে করেন নবীণরা এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দলের ক্ষতি করছেন। বিষয়টি নিয়ে দলের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত শনিবার বলেছেন, কিছু লোক ব্যক্তি স্বার্থে কাজ করছে। এ জন্য দল ও জোটের পুনর্মূল্যায়ন করা দরকার। দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ওবায়দুল কাদের রবিবার বলেছেন, আওয়ামী লীগ আত্মসমালোচনা করে ভুল শোধরানোর চেষ্টা করছে। রাতারাতি সব সমস্যার সমাধান আসবে, এমন চিন্তা করা ঠিক নয়। সংসদে এবং দলীয় ফোরামে আমরা সরকার এবং দলের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সমালোচনা করি। এর জন্য কাউকে শোকজ করা হয় না। এছাড়া নবীণদের নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সমালোচনা করছেন দলের প্রবীণ একাধিক নেতা।

“দলের মধ্যে এ ধরনের দ্বন্দ্ব থাকা ঠিক নয়” উল্লেখ করে দলের সভাপতি মন্ডলীর সদস্য এডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন ভারের ডাককে বলেন, বসয়সের তারতম্যের কারনে নবীণরা অনেক কথাই বলে ফেলেন যেটা ঠিক নয়। তাছাড়া ২৫ বছরের যুবকের অভিজ্ঞতা আর ৫০ বছরের অভিজ্ঞতা এক হতে পারে না। তবে বিপরীতমুখি বক্তব্য কেউ যদি দিয়ে থাকে তবে সেটা ব্যক্তিগত আক্রোশের বশবর্তী হয়ে দিতে পারে। দলের ভিতর কোন সমস্যা নেই। তারপরও এটা আমাদের কাম্য নয়। বড় দল হলে তার মধ্যে বিভিন্ন মতের মানুষ থাকবে। তবে কারো বিরুদ্ধে কারো কোন অভিযোগ থাকলে তা প্রকাশ্যে বলা উচিত নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।

আরও পড়ুন

Back to top button
Translate »