আর্কাইভ

নারী নির্যাতন – জেগে উঠুন একসাথে

নাজুমল হক ॥ বিশ্বের যা কিছু মহার চির কল্যানকর তার অর্ধেক করিয়াছে নারী আর অর্ধেক নর। নারী পুরুষের পৃথিবী। পৃথিবীতে নারী পুরুষ সমান অধিকার নিয়ে জন্ম গ্রহণ করে। কিন্তু জন্ম নেওয়ার পরে তাদের উপর বৈষম্য করা হয়। তাদের নারী বলে অবজ্ঞা করা হয়। এটা পরিবার এমন কি সমাজের সকল ক্ষেত্রে। তাদের আলাদা করে দেখা হয়। নারীদের বৈষম্যের প্রথম সূত্রপাত পরিবার। পরিবার থেকেউ তাকে নানা ভাবে নিগৃহীত করা হয়। তাদের মনে এ ধারণা দেওয়া হয় তোমরা নারী সবকিছু তোমাদের জন্য না। তোমাদের নির্দিষ্ট সীমানার মধ্যে চলতে হবে। নির্দিষ্ট কিছু কাজ করতে হবে। আর এই সীমানা ও নিধিনিষেধের কারণে দেশে নারী নির্যাতন বাড়ছে। ৭ মার্চ প্রকাশিত মানবধিকার সংগঠন অধিকার তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, নারী দিবস ঘোষিত হওয়ার ১০০ বছর এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৪০ বছর অতিক্রান্ত হলেও এ দেশে নারীর প্রতি সহিংসতার ভয়াবহতা কমেনি। দেশে নারীর প্রতি সহিংসতার মধ্যে পারিবারিক সহিংসতা, যৌতুকসংক্রান্ত সহিংসতা, ধর্ষণ, অ্যাসিড নিক্ষেপ, অবৈধ ফতোয়া, যৌন হয়রানি অন্যতম। পাশাপাশি সামাজিক বৈষম্যে তুলনামূলক দরিদ্র নারীরা ব্যাপকভাবে সহিংসতার  অধিকারের তথ্যানুযায়ী, ১ জানুয়ারি ২০০১ থেকে চলতি বছরের ২৯ ফেব্র“য়ারি পর্যন্ত যৌতুক সহিংসতায় দুই হাজার ৩৩৮ জন নারীকে হত্যা এবং এক হাজার ২৫ জনকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা  হয়েছে। এ ছাড়াও মানষিক নির্যাতনসহ বিভিন্ন কারণে ১৭২ জন আত্মহত্যা করেছেন। ধর্ষণের শিকার হলেও বেশির ভাগ নারী বিচার চাইতে যান না। গুটিকতক যেসব নারী বিচার চাইতে যান, তাদের পুলিশ-প্রশাসন-সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ে যথেষ্ট হেনস্তার সম্মুখীন হতে হয়। ধর্ষণের শিকার নারীকে আদালতে বারবার প্রশ্ন করে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করা হয়। এ ছাড়া ভিকটিম ও সাক্ষীদের প্রতিরক্ষামূলক কোনো আইন না থাকায় জামিনে মুক্ত হয়ে অভিযুক্ত অপরাধীরা ভিকটিম ও সাক্ষীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করে বলেও অভিযোগ পাওয়া যায়। ১ জানুয়ারি ২০০১ থেকে চলতি বছরের ২৯ ফেব্র“য়ারি পর্যন্ত আট হাজার ৪৭৮ জন নারী ও মেয়ে শিশু ধর্ষণের শিকার  হয়েছেন। অন্যদিকে নারীর প্রতি অ্যাসিড সন্ত্রাস চলছেই। ১ জানুয়ারি ২০০৩ থেকে চলতি বছরের ২৯ ফেব্র“য়ারি পর্যন্ত এক হাজার ২৯ জন নারী ও মেয়ে শিশু অ্যাসিড সহিংসতার শিকার  হয়েছেন।

এসব নির্যাতন সহ্য করার পরও নারীরা কর্মক্ষেত্রে নিজ যোগ্যতার আলোকে আলোকিত হচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি বিরাট অংশ নারীকে জুড়ে রয়েছে। বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প নারী নির্ভর হয়ে পড়েছে। আজ এ শিল্প এমন এক পর্যায়ে পৌছেচে যেখানে নারীকে বাদ দিয়ে এ শিল্প কল্পনা করা যায় না। কিন্তু সেখানেও তারা বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। তাদের ঠিকমত বেতন দিচ্ছে না। বেচে থাকার জন্য চাহিদামত বেতন কাঠামো করা হয় নি। মিল, কল-কারখানা, হাট-বাজার, অফিস-আদালতসহ সকল স্তরে নারীদের পদচরণা বিশেষ ভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সকল ক্ষেত্রে তারা নিজ প্রতিভা বিকশিত করে সফল হচ্ছে। ফলে তাদের নারী বলে অবহেলা করার সুযোগ নেই।

আমাদের দেশের নারী নির্যাতনের প্রধান ক্ষেত্র হল পরিবার। দেশে নারী নির্যাতনের ৯৫ ভাগ নারী কোন না কোন ভাবে পরিবারের দ্বারা নির্যাতনের শিকার হয়। পরিবারের প্রধানের দ্বারা তারা দিনের পর দিন নির্যাতনের শিকার হলেও লোক লজ্জার ভয়ে কিছুই বলে না। আমরা জানতে পারি নির্যাতনের মাত্রা যখন বেড়ে যায় তখন। তখন আইনের আশ্রয় নেওয়া ছাড়া আর কিছু করার থাকে না। ইসলাম ধর্ম নারীকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে। পবিত্র আল কোরআনে বলা হয়েছে “মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত”। অর্থাৎ নারীকে সর্বচ্চ আসনে বসানো হয়েছে। কিন্তু সমাজে নারীরা এত অবহেলিত কেন? আসলে পুরুষ তান্ত্রিক সমাজে কিছু কিছু পুরুষের কারণে নারীরা আজ নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। তবে এর থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আমাদের ভাবতে হবে আমরা নারীরা না থাকলে পৃথিবীর মুখ দেখতাম না। কোন নারী অসহ্য যন্ত্রনা সহ্য করে আমাদের পৃথিবীর আলোর মুখ দেখিয়েছে। আমাদের অরক্ষিত এই পৃথিবীতে বসবাসের উপযোগী করে গড়ে তুলেছেন। তাদের স্নেহ, আদর ও ভালোবাসায় আজ আমরা সঠিক ভাবে চলতে শিখেছি। আর এ জন্য নারী-পুরুষ সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। কারণ গুটিকয়েক পুরুষ নামের পশুর জন্য গোটা পুরুষ দায়ী হতে পারে না। নারী নির্যাতন কারীদের সমাজে একঘরে করতে হবে। তাদের ঘৃণা করতে হবে। বয়কট করতে হবে সমাজের সকল কর্মকান্ড থেকে নারীদের ছোট ছোট নির্যাতনের প্রতিবাদ করতে হবে। সকলের অবস্থান থেকে প্রতিবাদ করতে হবে। সমাজ নারী নির্যাতনমুক্ত হবে এমন প্রত্যাশা সকলের।

লেখক : মো. নাজমুল হক, রোভার স্কাউট, সাংবাদিক ও কলাম লেখক

আরও পড়ুন

মন্তব্য করুন

Back to top button
Translate »