আর্কাইভ

দুষ্টু!

মোহাম্মদ গোলাম নবী ॥ আড়মোড়া ভেঙ্গে কুদরত অস্তস্তিতে পড়ে গেলো। পুরো শরীরে এক চিলতে কাপড়ও নেই। গেলো কোথায়? পা নেড়ে লুঙ্গিটা খোঁজার চেষ্টা করল। পেলো না। একটু কাত হয়ে দেখার চেষ্টা করল ফ্লোরে পড়ে আছে কিনা? না তাও নেই। তার মধ্যে অস্তস্তি বাড়তে লাগল। এসিটা চলছে না, নাকি? কেমন একটা ভ্যাপসা গরম পড়ছে মনে হয়। পরক্ষণেই মনে হলো এসি কেন চলবে না। ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলেও যাতে বাসার সব কিছু চলে, সেরকম জেনারেটরই তো লাগানো হয়েছে। তাহলে? বালিশের পেছনে হাত দিয়ে রিমোটটা নিতে গিয়ে দেখে নেই। মেজাজটা বিগড়াতে শুরু করল। কিন্তু উঠে গিয়ে যে কাপড় পড়বে কিংবা  রিমোট খুজঁবে এমন কোন চিন্তা তার মাথায় এলো না। বরং জানলার দিকে তাকিয়ে সে আতকে উঠল। একপাশের জানালার দুই স্তরের পর্দার প্রথম স্তরের ভারী পর্দাগুলো একপাশে গুটানো। নিচে স্বচ্ছ নেটের পর্দাটা দেখা যাচ্ছে। সে দেখল জানালাগুলোও খোলা। কুদরত বুঝতে পারল কেন তার গরম লাগছে। এসি বন্ধ। কারেন্ট নেই। হয়তো জেনারেটরও নষ্ট হয়ে গেছে। তিনতলার এই দিকটাতে কয়েকটা গাছ আছে। বিছানায় শুয়ে গাছগুলো দেখা যায়।  তবে গাছগুলোর একটা পাতাও নড়ছে না। ভ্যাপসা গরমটা সেজন্যই লাগছে।

কুদরতের লাল চার্জার ফ্যানটার কথা মনে পড়ল। কতো বছর আগের কথা হবে? প্রায় ৩৭ বছর। দেখতে দেখতে কিভাবে সময় চলে যায়। তখন সে সরকারি চাকরি করে। ছোট্ট একটা বাসায় থাকে। তার সেইসময়কার সরকারি কোয়ার্টারটা এই বেডরুমে ঢুকিয়ে দেওয়া যাবে। কিন্তু ওই কোয়ার্টারটাই তখন একটি তার প্রিয় ছিলো। সবে স্বাধীন হওয়া যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে সব কর্মকর্তা তখন সরকারি বাড়ি পায়নি। সে তুলনায় তো সে লাকিই ছিলো বলতে হবে। সেই বাড়িতে তার দুটো চার্জার ফ্যানও ছিলো। একটা সাদা। অন্যটা লাল। একটি দিয়েছিল তার লন্ডন প্রবাসী এক আত্মীয়। অন্যটি সে নিজে আমেরিকা থেকে আসার সময় নিয়ে এসেছিল। তবে বাসায় এনে দেখে যে, ওটা চীনে বানানো। তখন অনেক সময় ছিলো। কোন জিনিস কোথায় বানানো সেটাও দেখার সময় পাওয়া যেতো। এখন সেই সময় পাওয়া যায় না। হঠাৎ করেই কুদরতকে স্মৃতি কাতরতায় পেয়ে বসল। সে যে ন্যাংটো অবস্থায় বিছানায় শুয়ে আছে সেটা ভুলে স্মৃতি রোমন্থনে ঢুকে গেলো।

ইলেকট্রনিক্স জিনিসের প্রতি তার খুব দুবর্লতা ছিলো। কোরিয়া থেকে সে একবার একটা কর্ডলেস ফোন এনেছিল। পাঁচ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে ফোনটা কাজ করত। বন্ধু বান্ধবদের সঙ্গে এনিয়ে গল্প করতে তার খুব ভালো লাগতো। ততোদিনে সে অনেক উপরের স্তরের সরকারি কর্মকর্তা। একদিন তার এক বন্ধু তাকে রসিকতা করে বলল, শুনেছি তুই মাঝে মাঝে বঙ্গভবনে যাস। প্রেসিডেন্ট এরশাদের সঙ্গেও তোর নাকি দেখা হয়। তার জন্য কোন একটি ইলেকট্রনিক ডিভাইস যদি খুঁজে দিতে পারতি, যা দিয়ে তিনি পাঁচ কিলোমিটার দূর থেকেও কাজ সারার তৃপ্তি পেতে পারতেন। প্রেসিডেন্ট এরশাদকে নিয়ে অনেক ধরনের গুজব বাজারে চালু ছিলো। শোনা যেতো তিনি দিনে ও রাতে নারী সঙ্গ খুবই উপভোগ করতেন। তাদেরকে একান্তে পেতে তার ভালো লাগতো। এনিয়ে মুখরোচক অনেক গল্পও চালু আছে। তখনও ছিলো। কিন্তু এরশাদকে নিয়ে তার বন্ধুর রসিকতা তার ভালো লাগেনি। এরশাদের প্রায় সমবয়সী কুদরতের সেদিন মনে হয়েছিল মানুষ এতো নোংরা হয় কেন? কুদরত নিজেকে সবসময় একজন সৎ ও নীতিবান সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে ভাবতে পছন্দ করতেন। তাছাড়া তার পারিবারিক সহায় সম্পদের তো অভাব নেই। সরকারিভাবে তিনি যা পাচ্ছিলেন সেটাও কম নয়। তার মধ্যে তখন কোন নারী প্রীতি ছিলো না। অন্য কারো তেমনটা থাকতে পারে সেটাও তিনি মানতে রাজী ছিলেন না। তার মনে হলো তার সেই বন্ধু খায়ের এখন কোথায় আছে খোঁজ নিতে হবে। আজকে খায়ের ওই রসিকতা করলে তিনি মোটেই অপছন্দ করবেন না। মানুষের জীবন কতো অদ্ভুত। কুদরতের ভাবনার ডানাগুলো আরো প্রসারিত হতে থাকে। খায়েরকে তার মনে হয় সময় থেকে এগিয়ে থাকা মানুষ। তিনি জীবনকে চিনতে খায়েরের চেয়ে অন্তত ২০ বছর বেশি সময় নিয়েছেন। শেখ মুজিব, জিয়া, এরশাদ সব আমলেই তিনি সুযোগ পেয়েছিলেন। তখন থেকে শুরু করলে তার জীবনটা আরো কতো বেশি রঙ্গিন হতে পারত, ভাবতেই নিজের উপর মেজাজ খারাপ হলো কুদরতের। যদিও এখন তার অনেক কিছুই হয়েছে। কিন্তু সেই যৌবন কই। তার বয়স এখন আশি ছুঁই ছুঁই। এই বয়সে কি অতো ধকল সইবে। যৌবনের কথা মনে হতেই কুদরতের মনে হলো সে উলঙ্গ হয়ে শুয়ে আছে। রুমের মধ্যে সকালের রোদ ঢুকে পড়েছে। কিন্তু তার লুঙ্গিটা গেলো কই?

দরজা খুলে কেউ একজন ঢুকলো। কুদরত দ্রুত দুই হাত দিয়ে নাভির নিচের জায়গাটা ঢেকে ফেলল। আগন্তুক বলল, কি উঠবে না?

কুদরত অলস চোখে আগন্তুকের দিকে তাকিয়ে বলল, কিন্তু আমার লুঙ্গিটা কই?

আগন্তুক মুচকি হেসে বলল, ওটা তো ভিজিয়ে ফেলেছো। ওয়াশিং মেশিনে দিয়ে দিয়েছি।

সবে যৌন বিষয় সম্পর্কে জানা কিশোরের মতো কুদরতের চোখমুখ লাল হলো, মুখ দিয়ে বের হয়ে এলো- দুষ্টু!

http://mgnabi.wordpress.com/2012/06/12

আরও পড়ুন

Back to top button
Translate »