আর্কাইভ

নগর পরিকল্পনায় কৃষি

নিতাই চন্দ্র রায় ॥ সিন্ধু সভ্যতায় এক অভিজাত ও উন্নত প্রযুক্তি সম্পন্ন  নগর সংস্কৃতির পরিচয় পাওয়া যায়। এই শহরগুলি ছিল এই অঞ্চলের প্রাচীনতম  নগর ব্যবস্থা। নগর উন্নয়ন ও পরিকল্পনায় এই অঞ্চলের মানুষের যতেষ্ঠ জ্ঞান ছিল। এখানে একটি পৌর সরকারের অস্তিত্ব ছিল। এই সরকার ব্যবস্থায় স্বাস্থ্য সচেতনতা যেমন গুরুত্ব পেত, তেমনি নাগরিকদের ধর্মীয় রীতিনীতি পালনে সুবিধা-অসুবিধার দিকে নজর রাখা হত। এ অঞ্চলের রাস্তাঘাট ও জল নিকাশ ব্যবস্থা মধ্যপ্রাচ্য, ভারত ও পাকিস্তানে আবিস্কৃত যে কোনো প্রাচীন সভ্যতার চেয়ে অনেক উন্নত ছিল। জনসংখ্যা কম থাকলেও দূরদর্শিতা ছিল নগর পরিকল্পনাবিদদের। নগরের শস্যাগার, গুদাম,ইট নির্মিত অঙ্গন ও রক্ষা প্রাচীরগুলিতে উন্নত স্থাপত্যকলার পরিচয়পাওয়া যায়।

হরপ্পা ও মহেঞ্জোদাড়োতে নগরোন্নয়ন পরিকল্পনার অন্তর্গত ছিল বিশ্বের প্রথম পানি নিকাশ ব্যবস্থা। শহরের প্রধান রাস্তাগুলো ছিল ৩০ ফুট ও গলিপথগুলো ছিল ১০ ফুট চওড়া এবং ৫ ফুটের চেয়ে কম প্রশস্ত  কোনো রাস্তাই পাওয়া যায়নি সেখানে। প্রাচীন ও পরিণত সিন্ধু এলাকাসমূহে খেজুর, আঙ্গুর এবং আনারস উৎপাদনের প্রমান পাওয়া যায়। বলদ, গাড়ি ও লাঙ্গল টানত। গরু দুধ দিত। মানুষের অন্যতম পেশা ছিল শিকার। অন্যদিকে সুমেরু সভ্যতা গড়ে উঠেছিল ইউফ্রেতিস ও ট্রাইগ্রিস নদীর তীরে। সুমেরিয় নগরগুলি ছিল কৃষি ভূমির কাছাকাছি। সুমেরিয়রা বার্লি, গম, খেজুর ও সবজি চাষ করত। সেই সঙ্গে গরু, ছাগল, ভেড়া ও গাধা পালন করত। ভেড়ার পশম দিয়ে তৈরী করত পোষাক। কৃষি কাজের পাশাপাশি সুমেরিয়রা ব্যবসা করত। পৃথিবীর ইতিহাসের প্রাচীন সভ্যতাগুলির অন্যতম হচ্ছে মিশরীয় সভ্যতা। নীল নদকে কেন্দ্র করে এ সভ্যতা গড়ে ওঠে। চীনা সভ্যতার মূল ভিত্তি ছিল কৃষি। এ এলাকার প্রাচীন জনগোষ্ঠি হোয়াংহু নদীর দু’ধারে উর্বর এলাকা জুড়ে চাষ করত জব,গম,ধান ও নানা ধরনের শাক-সবজি। পালন করত বিভিন্ন ধরনের পশু। তাঁরা রেশম কীটের ব্যবহার জানত। এর সুতা দিয়ে তাঁরা  মজবুত ও সুন্দর  বস্ত্র বানাত।

সিন্ধু সভ্যতার সাথে সবচেয়ে বেশি সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায় সুমেরু সভ্যতার। কৃষি কর্মের উন্নতি সত্ত্বেও এটি ছিল একটি বাণিজ্য ভিত্তিক নগর সভ্যতা। চীন, সুমেরীয় ও মিশরের প্রাচীন সভ্যতার চেয়ে সিন্ধু সভ্যতা ছিল বেশি অগ্রসর ও উন্নত। আধুনিক সময়ের শ্রেষ্ট প্রত্বতাত্তিক গবেষক, গর্ডন চাইল্ডের মতে বিভিন্ন সৌধ,ঘনবসতিপূর্ণ বিস্তৃত এলাকা, খাদ্য উৎপাদনের সাথে জড়িত নয় এমন শ্রেণী, শাসক, বণিক, কারিগর এবং শিল্প, সাহিত্য ও বিজ্ঞানচর্চা ইত্যাদি ছিল নগর বিপ্লবের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আবার অনেকের মতে কেবল বাণিজ্যই নগর বিকাশের একমাত্র নির্ণায়ক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না। নগরায়নের সাথে দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, ভৌগোলিক ও আবহাওয়াগত বাস্তবতা অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত। তবে বিভিন্ন নগর বিভিন্ন বাস্তবতার প্রেক্ষিতে বিকশিত হয়েছে। কোথাও মূখ্য ভূমিকা পালন করেছে কৃষি। কোথাও ব্যবসা-বাণিজ্য। কোথাও নিহিত ছিল অন্য কোনো কারণ। কোথাও হয়তোবা কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য, রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্মিলিতভাবে নগর বিকাশকে অনিবার্য করে তোলেছে।

অ্যাকশন এইড নামের একটি আর্ন্তজাতিক সাহায্য সংস্থা বলছে বাংলাদেশের সামনে বর্তমানে রয়েছে ০৩ টি বড় সমস্যা। যার ওপর নির্ভর করছে দেশের বাঁচা-মরা। সমস্যা ৩ টি হলো উষ্ণতা বৃদ্ধি, সম্পদের প্রতুলতা ও খাদ্য সংকট। বিশ্বের অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশই এই তিন সংকট মোকাবেলায় অপ্রস্তুত। তবে সবচেয়ে বেশি অপ্রস্তুত ১০ টি দেশের মধ্যে বাংলদেশের স্থান  হলো পাঁচ নম্বরে। কৃষি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবেলায় বাংলাদেশের প্রস্তুতি সন্তোষজনক নয়। জলবায়ু উষ্ণতার কারণে শুধু উপকূলীয় এলাকাগুলো আক্রান্ত হবে তা না দেশের উত্তরাঞ্চলের মরু প্রবণ এলাকাগুলোতেও এর প্রভাব পড়বে। অ্যাকশন এইড বলছে, জলবায়ু উষ্ণতার কারণে  যে ৫ টি দেশে বেশি  খাদ্য সংকট দেখা দিবে বাংলাদেশ তার মধ্যে একটি। খাদ্যদ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধিতে তার কিছু  আলামত এখনই  দেখা যাচ্ছে। কৃষি জমি হ্রাস, বাজটে কৃষি খাতে অপ্রতুল বরাদ্দ, জ্বালানী তেল ও সারের মূল্য বৃদ্ধি ও পল্লি এলাকায় বিদ্যুত সরবরাহের ঘাটতি এবং জলবায়ু উষ্ণতার ফলে আগামী বছরগুলুতে বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদন বছরে প্রায় ৪ শতাংশ হারে হ্রাস পেতে পারে।

বাংলাদেশে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ৯৯৩ জন লোক বাস করে। বাংলাদেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১.৩৯%  চীনে ০.৬% ,শ্রীলক্ষায় ০.৫% থাইল্যান্ডে ০.০৭% এবং মিয়ানমারে ০.৯%।

বাংলাদেশে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে আমেরিকার চেয়ে ৩১ গুণ বেশি লোক বাস করে। আমেরিকায় মাথা পিছু কৃষি জমি বাংলাদেশের চেয়ে ২১ গুণ  বেশি। অষ্ট্রেলিয়া ও কানাডায় প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ২ ও ৩ জন লোক বাস করে। অষ্ট্রেলিয়াতে মাথা পিছু কৃষি জমি বাংলাদেশের চেয়ে ৩৪৬ গুণ বেশি।

বাংলাদেশে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে চীনের চাইতে ৬ গুণ এবং ভারতের চাইতে ৩ গুণ বেশি লোক বাস করে। বাংলাদেশের কৃষি জমির শতকরা ৬৩ ভাগ শস্য উৎপাদন কাজে ব্যবহার হয়। অন্যদিকে ভারতে ৫০% পাকিস্তানে ২৫%, শ্রীঙ্কায় ১৪% চীনে ১০% জমি শস্য উৎপাদন কাজে ব্যবহার হয়।

২০৫০ সালে পৃথিবীর লোক সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ৯০০ কোটি। এ বর্ধিত জনসংখ্যার খাদ্য যোগাতে হলে কৃষি উৎপাদন শতকরা ৭০ ভাগ বাড়াতে হবে। পৃথিবীতে ভূখা লোকের সংখ্যা বর্তমানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০০ কোটি। এসব কারণে  পৃথিবীতে নগরীয় কৃষি  দ্রুত প্রসার  লাভ করছে। ১৯৯৩ সালে পৃথিবীর উৎপাদিত খাদ্যদ্রব্যের ১৫% উৎপাদিত হত নগর এলাকায়। ২০১৫ সালে আশা করা হচ্ছে পৃথিবীর উৎপাদিত খাদ্যদ্রব্যের শতকরা ৩৩ ভাগ উৎপাদিত হবে নগরে। ইউএনডিপি বলছে, ১৯৯৬ সালে পৃথিবীর প্রায় ৮০ কোটি লোক নগর কৃষির সাথে জড়িত ছিল। বর্তমানে নগর কৃষি সাথে জড়িত লোকের সংখ্যা আরও অনেক বেশি। তাঁরা নগর ও তার আশেপাশে শাকসবজি, ফলমূল ও ভেষজ উদ্ভিদ উৎপাদন করছে। হাঁস-মুরগী, গরু- ছাগল, ভেড়া পালন করছে। জলাশয়ে মাছ ও জলজ উদ্ভিদ উৎপাদন করে তাদের পারিবারিক প্রয়োজন মিটাচ্ছে। বর্তমানে উন্নয়নশীল দেশের দরিদ্র  জনসংখ্যার শতকরা প্রায় ৫০ ভাগ লোক নগরে বসবাস করে। অথচ আজ থেকে ১২/১৪ বছর আগে নগরে বসবাস কারি লোকের সংখ্যা ছিল ১৬ থেকে ১৭%। নগরকৃষি ক্ষুধা ও দ্রারিদ্র দূরিকরণে বলিষ্ট অবদান রাখে। পরিবেশ, স্বাস্থ্য ও নগরবাসির পুষ্টি সমস্যা সমাধানে নগর কৃষি অবদান অনস্বীকার্য। নগরের বর্জ্য ও পয়ঃনিকাশের অব্যবস্থাপনার কারণে নগরবাসীর আক্রান্ত হচ্ছে বিভিন্ন সংক্রামক রোগে। স্বাস্থ্য সমস্যাগত কারণে প্রতি বছর পৃথিবীর বিভিন্ন নগরে ৪ মিলিয়ন শিশুসহ প্রায় ৫.২ মিলিয়ন লোক মারা যায়।

পৃথিবীর শতকরা ২ভাগ এলাকা নিয়ে নগরগুলি গঠিত হলেও পৃথিবীর মোট সম্পদের শতকরা ৭৫ ভাগ  ভোগ করে নগরবাসী। ব্যাংককের শতকরা ৬০ ভাগ জমি কৃষি কাজে ব্যবহার করা হয় এবং নগরের শতকরা ৭২ ভাগ পরিবার খাদ্য উৎপাদন কাজের সাথে জড়িত। বাংলাদেশে ৩১৫ টি নগরে বর্তমানে প্রায় ৫ কোটি লোক বাস করে। দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১.৩৯% হলেও নগর গুলিতে ৩.৭%হারে  জনসংখ্যা বৃদ্ধির পাচ্ছে। গ্রামের তুলনায় নগরগুলিতে মানুষের মাথাপিছু আয় বেশি। শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান, আবাসন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় নগরগুলি গ্রামের তুলনায় অনেক অগ্রগামী। ফলে মানুষ গ্রাম ছেড়ে প্রতি নিয়ত নগরের অভিবাসি হচ্ছে। মানুষের অতিরিক্ত সংখ্যা পরিবেশ, আবকাঠামো, খাদ্য, পুষ্টি ও পানির ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করছে। এ কারণে টেকসই নগর পরিকল্পনা জরুরী হয়ে পড়ছে। এদেশের নগরগুলি গ্রামে এবং গ্রামগুলি নগরে গিয়ে শেষ হয়েছে।  আমাদের অধিকাংশ নগরই নদী তীরে অবস্থিত। নগর গুলির ও তার আশেপাশের উর্বর জমিকে কেন্দ্র করেই বাংলাদেশে কৃষির বিকাশ। কৃষি আমাদের খাদ্য, বস্ত্র, জ্বালানি, শিল্পের কাঁচামাল ও রফতানি পণ্য যোগায়।  কৃষিকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশে নগরায়নের কথা ভাবা যায় না।

নদীকে কেন্দ্র করেই বাংলাদেশে নগরগুলি গড়ে উঠেছে। সহজ নৌ যোগাযোগ তাঁর অন্যতম কারণ। একধরনের শিল্পপতিরা মনে করে নদীগুলি শিল্প বর্জ্য ফেলার জন্য উপযুক্ত স্থান। তাই দেখা যায় শীতলক্ষা, বুড়িগঙ্গা, বালু, তোরাগ, ভৈরব, মেঘনা, পশর, কর্নফুলি, পদ্মা প্রভৃতি নদীর তীরে   অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে  পরিবেশ বিনাশী শিল্প কারখানাগুলো। নদী নালা, খাল-বিল, পুকুর-ডোবা ভরাট করে, গাছপালা, বনভূমি উজার করে আমরা নির্মাণ করছি তপ্ত দ্বীপের মত মানুষ বসবাসের অযোগ্য বহুতল বিশিষ্ট অপরিকল্পিত নগর। যেখানে সুপেয় পানি নেই। পুষ্টিকর খাবর নেই। ফুল নেই। ফল নেই। বিদ্যুত নেই। গ্যাস নেই। পয়ঃনিকাশের ব্যবস্থা নেই।  নিঃশ্বাস নেয়ার মত বিশুদ্ধ বাতাস নেই। পার্ক নেই। পাখি নেই। সবুজ বৃক্ষ নেই। যত দিন যাচ্ছে নগবাসীর সমস্যা  ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে।যানজট, জলাবদ্ধতা,শব্দ , বায়ু ও পানি দূষণে দুর্বিসহ হয়ে উঠছে নগরবাসীর জীবন। এ কথা স্বীকার করতেই হবে নগরীয় এসব সমস্যা সমাধানের জন্য প্রয়োজন গনতান্ত্রিক, স্বনির্ভর ও স্বশাসিত নগর সরকার। নগর সরকার গঠনের দাবি তাই  দিন দিন জোরদার হচ্ছে।

২০২০ সালে বাংলাদেশের শতকরা ৫০ ভাগ অর্থাৎ ৮.৫ কোটি লোক নগরে বাস করবে এবং ২০৫০ সালে দেশের ১০০% অর্থাৎ ২৭ কোটি লোক নগরে বসবাস করবে। তখনকার  বাংলাদেশ হবে নগরীয় বাংলাদেশ এবং নগরীয় কৃষির বাংলাদেশ। তাই আমাদের কে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য কৃষিকে নগর পরিকল্পনার অর্ন্তভূক্ত করে নগরবাসীর জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য নগর ও তার আশে পাশে উৎপাদনের ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য গ্রামীণ কৃষির সাথে সাথে নগরীয় কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলার ব্যাপারে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত  গ্রহণ করতে হবে।

নিতাই চন্দ্র রায়
ডিজিএম(সম্প্রঃ)
সেতাবগঞ্জ সুগার মিলস্ লিঃ
ডাকঘলঃ সেতাবগঞ্জ দিনাজপুর

আরও পড়ুন

মন্তব্য করুন

Back to top button
Translate »