আর্কাইভ

জালিয়াতির মাধ্যমে শত শত কোটি টাকার জমি দখল করেছে জাপা মহাসচিব – ভূয়া জমি দেখিয়ে ব্যাংক থেকে সাত কোটি টাকা ঋণ উত্তোলন

এম.মিরাজ হোসাইন, বরিশাল ॥ পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটায় মহা জালিয়াতির মাধ্যমে মহাজোটের শরীক জাতীয় পার্টির মহাসচিব আলহাজ এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার তার মালিকানা প্রতিষ্ঠান কে আর ফ্যাশন ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের নামে শত শত কোটি টাকার ভূমি দখল করে নিয়েছেন। স্থানীয় ভূমি ও সাব রেজিষ্ট্রি অফিসের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের যোগসাজশে এ দখল প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দখলকৃত জমির প্রকৃত মালিকরা হাওলাদার বাহিনীর সন্ত্রাসীদের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। এমনকি সরকারি জমিতে বসবাসকারী সংখ্যালঘুসহ একাধিক পরিবারের উপর হামলা চালিয়ে তাদের বসত ঘর গুড়িয়ে দিয়ে দখলে নিয়েছে  সরকারি জমি। বর্তমানেও বহু পরিবার রয়েছে উচ্ছেদ আতংকে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, দখল কৃত জমির মধ্যে সরকারি জমি থাকলেও তা উদ্ধারে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নেই কোন ভূমিকা। এমনকি ওই ভূয়া জমি দেখিয়ে একটি বেসরকারি ব্যাংক থেকে অন্তত সাত কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে।

কুয়াকাটা পৌর এলাকায় পা দিলেই চারিদিকে চোঁখে পড়বে কে আর ফ্যাশন ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড’র মালিকানা দাবি করে ফসলি জমি থেকে বসত বাড়িসহ বিভিন্ন স্থানে টানানো অসংখ্য সাইনবোর্ড। হঠাৎ করে এত জমির মালিক ওই প্রতিষ্ঠানটি হল কি করে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্য কর তথ্য।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, কুয়াকাটার অবস্থান উপজেলার লতাচাপলী ইউনিয়নের লতাচাপলী মৌজায়। আরএস রেকর্ড অনুযায়ি ওই মৌজায় ৭১৫টি খতিয়ান রয়েছে। অথচ জালিয়াতির মাধ্যমে ৭৪৪ নম্বর একটি খতিয়ান তৈরি করে ১২০৩ নম্বর একটি লুচ খতিয়ান খোলা হয়। পরবর্তিতে যা এসএ ৬৬২ নম্বর খতিয়ান ভুক্ত করে।

এমনকি জালিয়াতির মাধ্যমে সৃষ্টি করা আরএস ৭৪৪ নম্বর খতিয়ান সম্পর্কে পটুয়াখালী রেকর্ড রুমের কালেক্টরেট শাখার ২০০৭ সালের ২১ জানুয়ারির ১৫ নং ও ২০০২ সালের ৩৭ নং অনুসন্ধানপত্রে কোন অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি।

অস্তিত্ব খুঁজে না পাওয়ায় ২০০৯ সালের ৩ সেপ্টেম্বর তৎকালীন কলাপাড়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. লিয়াকত আলী ওই খতিয়ানটি বাতিল করে দেয়। বাতিল আদেশে বলা হয়েছে, লতাচাপলী মৌজার অস্তিত্ববিহীন ৭৪৪ নং আরএস খতিয়ানটির বরাতে এসএ ১২০৩ নম্বর লুচ খুতয়ানটি ১৪-খে/০৭-০৮ নং নামজারি মামলার মাধ্যমে সৃজন করা হয়। কিন্তু তা বৈধ কাগজপত্রে সৃজিত না হওয়ায় বাতিল করা হলো।

কলাপাড়া পৌর শহরের কুমার পট্টি এলাকার বাসিন্দা মো. সেরাজুল হক মিয়া গং ১৯৬৮-৬৯ সনের ১১৭-কে নামজারি  মামলার মাধ্যমে ওই ভূয়া খতিয়ান তৈরি করে ১১ একর আট শতক জমির মালিক হয়েছিলেন।

ওই ভুয়া খতিয়ানটি বাতিল করে দেওয়ার পর কেআর ফ্যাশন ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড’র পক্ষে ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে আলহাজ এবিএম রহুল আমিন হাওলাদার সিরাজুল ইসলাম গং দের কাছ থেকে ৬.০৭ একর ভূমি নাম মাত্র মূল্যে ক্রয় করেন। যা ২০১০ সালের ৬ জুলাই খেপুপাড়া সাব রেজিষ্ট্রি অফিসের সাব রেজিষ্ট্রার মো. আসাদুল ইসলাম দলিল রেজিষ্ট্রি করে দেন। দলিল নং ৪৭১২/ ২০১০।

এরপর পূর্বের দেয়া নিজের আদেশ উপেক্ষা করে ততকালীন কলাপাড়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. লিয়াকত আলীসহ অপর কর্মকর্তারা বিপুল অংকের অর্থের বিনিময়ে  কেআর ফ্যাশনের নামে নামজারি করে দেয়। নামজারি নং ১৯৪-কে/০৮-০৯, ৪১৯-কে/১০-১১ ও ১৪৯-কে/১১-১২।

প্রকৃত পক্ষে ৬৬২ নং খতিয়ানে মোট ২২.১৬ একর ভূমি রয়েছে। যার মধ্যে ওয়ারিশ সূত্রে ১৮.৮৩ একর ভূমির প্রকৃত মালিক মো. শাহআলম গং এবং মাচুইচং মগনি গং ৩.৩৩ একর। মো. শাহআলম গংদের কাছ থেকে পানি উন্নায়ন বোর্ড ৯.০৩ একর ভূমি অধিগ্রহন করে ষাটের দশকে বেড়ি বাঁধ নির্মান করে এবং বাঁধের স্লোপে পিলার দিয়ে জমির সীমানা নির্ধারন করে বনায়ন করে। অথচ জালিয়াতির মাধ্যমে কেআর ফ্যাশন ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড প্রকৃত মালিকদের জমি দখলে করে সীমানা দেয়াল নির্মান করেছে।

পাউবোর উপকূলীয় বাঁধ পূর্ণবাসন প্রকল্পের অধীনে ওই সীমানার বনায়ন পরিচর্যার জন্য ২০০২  সালের ২২ জুন সাতটি পরিবারের সাথে ১২ বছর মেয়াদী চুক্তি করে। প্রত্যেক পরিবারকে বাঁধের স্লোপে বসবাসের জন্য পাঁচ শতক করে জমি প্রদান করে পাউবো।

গত মাসের শেষের দিকে ওই সীমানার মধ্যে বসবাস করা বিমল শীলের পরিবারের উপর কেআর ফ্যাশন লিমিটেড’র সন্ত্রাসীরা হামলা চালিয়ে বিমল শীল (৪০) ও তার বাবা বসন্ত শীলকে (৭০)  গুরুতর জখম করে। তাদের বসবাস করা বসত ঘর গুড়িয়ে দিয়ে কেআর ফ্যাশন পাউবোর জমি দখল করে সীমানা দেয়াল নির্মান করে। বর্তমানে ওই পরিবারটি এলাকা ছেড়ে সন্ত্রাসীদের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। এছাড়া রশিদ ঢালির পরিবারকেও উচ্ছেদ করে ওই সন্ত্রাসীরা। বর্তমানে রতন মিয়াসহ অপর পরিবারগুলোকে উচ্ছেদ করতে সন্ত্রাসীরা অব্যাহত হুমকি প্রদান করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
তাছাড়া একই খতিয়ানে জালিয়াতির মাধ্যমে সৃজিত ১২৭৬ নং দলিল বলে নাফ্রা মগ ১.৩২ একর ভূমি ভোগদখল করতেন। ওই দলিল বাতিলের দাবিতে পটুয়াখালী যুগ্ম জেলা জজের ১ম আদালতে একটি মামলা হয়। যার নং ৪৫/২০০৬। ওই মামলার প্রেক্ষিতে আদালত বিগত ৭ জানুয়ারি ২০০৮ সালে দলিলটি বাতিল করে। কিন্তু ওই আদেশ অমান্য করে নাফ্রা মগের কাছ থেকে কেআর ফ্যাশন লিমিটেডে’র পক্ষে এবিএম রহুল আমিন হাওলাদার ১.৩২ একর ভূমি ৫৫৪১/১০নং দলিলের মাধ্যমে খরিদ করে জোর করে দখলে নিয়েছেন।

অপর দিকে একই মৌজার এসএ ৯৭৪ খতিয়ানের ৫৩৮৭/৫৩৮৯/৫৩৯০ নং দাগ থেকে খেপুপাড়া সাব রেজিষ্ট্রি অফিসের ১৯৬৩ সালের ৫ এপ্রিল ৯৪৮ নং দলিলের মাধ্যমে মো. সিরাজুল হক ও মো. সেকান্দার আলী সিকদার যৌথভাবে ৪.৬২ একর ভূমি ক্রয় করেন। সেকান্দার আলী সিকদার মারা যাওয়ার পর তার স্ত্রী রিজিয়া বেগম ও এক মাত্র পুত্র মো. ইকবাল হোসেন ওয়ারিশ সূত্রে মালিক হন। কিন্তু সিক্সষ্টার খ্যাত মো. কামরুজ্জামান গংরা ইকবাল হোসেনের ভুয়া স্বাক্ষর ও অন্যের ছবি ব্যবহার এবং তার মাকে মৃত্যু দেখিয়ে দুই একর এবং মো. সিরাজুল হক’র অংশের এক একর জমি সাব কবলা রেজিষ্ট্রি করে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। দলিল নং ৩৪৪১, তারিখ ৩ আগষ্ট ২০০৬। উক্ত দলিল রেজিষ্ট্রি করেন খেপুপাড়া অফিসের তৎকালীন সাব রেজিষ্টার মো. জাহাঙ্গীর আলম।

পরবর্তিতে সিক্স ষ্টার’রদের কাছ থেকে কেআর ফ্যাশন লিমিটেড’র পক্ষে ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবিএম রহুল আমিন হাওলাদারের নামে দলিল করা হয়। দলিল নং ৩৬৮৭, তারিখ ২৩ মার্চ ২০১০। এমনকি জালিয়াতির মাধ্যমে সৃষ্ট ওই জমির মর্গেজ দেখিয়ে স্যোসাল ইনভেষ্টমেন্ট ব্যাংক (এসআইবিএল) ঢাকার গুলশান শাখা থেকে সাত কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। স্মারক নং এসআইবিএল/ জিইউএল/ আইএনভি/ ২০১২/৩১৯৭ তারিখ ৬ আগষ্ট ২০১২। অভিযোগ রয়েছে, ওই জাল দলিলটি প্রথমে নিজের নামে না করিয়ে সিক্সষ্টার গ্রুপের নামে করান হাওলাদার।

জমির প্রকৃত মালিক দাবিদার মো. ইকবাল হোসেন’র জাতিয় পরিচয় পত্র নং ৭৮১৫৭৩। দীর্ঘ দিনের ভোগদখলে থাকা জমিতে কেআর ফ্যাশন লিমিটেড’র লোকজন জালিয়াতির মাধ্যমে মালিকানা দাবি করে সাইন বোর্ড টানালে তিনি বাঁধা প্রদান করেন। এতে হাওলাদার বাহিনীর সন্ত্রাসীরা তাকে প্রাণ নাশের হুমকি প্রদান করে। বর্তমানে সন্ত্রাসীদের ভয়ে তিনি জমিতে যেতে পারছেন না বলে অভিযোগ করেন।

এভাবে কুয়াকাটায় শত কোটি টাকা মূল্যের ভূমি ক্ষমতার দাপটে ও দুর্নীতিবাজ সাব রেজিষ্ট্রার, ভূমি অফিসের কর্মকর্তা এবং সন্ত্রাসী বাহিনীর মাধ্যমে অবৈধভাবে দখল করে রেখেছেন কেআর ফ্যাশন লিমিটেড মালিক পক্ষ।

৬৬২ নং খতিয়ান থেকে ক্রয় সূত্রে প্রকৃত মালিক দাবিদার এমএম বিল্ডার্সের কুয়াকাটা অফিসের দায়িত্বে থাকা মো. খোকন মিয়া অভিযোগ করে বলেন, জালিয়াতির মাধ্যমে কুয়াকাটায় শত শত কোটি টাকার জমি দখল করে নিয়েছে কেআর ফ্যাশন ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড’র মালিক পক্ষ। তারা ব্যক্তিমালিকানা জমি ছাড়াও সরকারি জমি দখল করে নিচ্ছে। প্রতিবাদ করায় মামলা হামলা ও খুন জখমের ভয় ভীতি দেখানো হচ্ছে তাকে। তিনি আরো অভিযোগ করে বলেন, এ সকল জালিয়াতি কাজে সহায়তা করছেন কুয়াকাটা পৌর আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ভূমি দস্যু মনির ভূঁইয়া, মহিপুর তহশিল অফিসে কর্মরত তহশিলদার দেলোয়ারসহ কলাপাড়া ভূমি ও সাবরেজিষ্ট্রি অফিসের একাধিক কর্মকর্তা। সকল ভুক্তভোগিরা জরুরী ভিত্তিতে এসব দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাসহ ভূমি দখল মুক্ত করতে প্রধান মন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।

এব্যাপারে জাপা মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার অন্যের বা সরকারী জমি দখলের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন আমি টাকা দিয়ে জমি ক্রয় করেছি সেই জমি দখল নিয়েছি। তিনি স্থানীয় সংসদ সদস্য পানীসম্পদ প্রতিমন্ত্রী মাহাবুবুর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেন আমার ক্রয়করা জমি তার লোকজন দখলের পায়তারা করছে। আমার টাকায় কেনা জমি আমি দখলে গেলে সেখানে হামলা হয় এবং আমার লোকজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। তার পরও আমার বিরুদ্ধে জমি দখলের অভিযোগ করার বিষয়টি দু:খজনক বলে দাবী করেন রুহুল আমিন হাওলাদার।

আরও পড়ুন

Back to top button
Translate »