আর্কাইভ

একাত্তরের দুঃসহ্য স্মৃতি আজো পিড়া দেয়

স্টাফ রিপোর্টার ॥ “দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা, কারো দানে পাওয়া নয়” গানের শ্বাশত বাণী আমাদের মহান স্বাধীনতা অর্জনে বাঙালী জাতির ত্যাগের ইতিহাসকে সদা জাগ্রত করে ১৬ কোটি বাঙ্গালির হৃদয়কে। ৭১’এর ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে পাক হানাদার বাহিনী আর তাদের এ দেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশামস্, শান্তি কমিটির জল্লাদদের অত্যাচার, নির্যাতন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগের শিকার হয়ে আহত হয়েছিলেন স্বাধীনতাকামী অসংখ্য বাঙালী। ওইসব আহতদের চিকিৎসা সেবা দিয়েছিলেন কতিপয় মহানুভব ব্যক্তিরা। তাদের মধ্যে দক্ষিণাঞ্চলের উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন-বরিশালের তৎকালীন গৌরনদী ও বর্তমান আগৈলঝাড়া উপজেলার পয়সা গ্রামের একটি খ্রীষ্টিয় পরিবার।

একাত্তরের দুঃসহ্য স্মৃতি আজো পিড়া দেয়সেই দুঃসহ স্মৃতির কথা বর্ণনা করতে গিয়ে অশ্র“সিক্ত হয়ে পরেন ওই পরিবারের তিন বোন ও একভাই। সম্প্রতি তাদের মা স্বীকৃতিপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা মনা রানী ব্যানার্জী ও অতিসম্প্রতি তাদের বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা বি.কে রনজিতের মৃত্যুতে তারা এখন শোকে পাথর হয়ে গেছেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে তাদের পরিবারের সকলেরই ছিলো বিশেষ অবদান। ভারতে প্রশিক্ষণ নিয়ে ওই পরিবারেরই সন্তান শ্যামল ব্যানার্জী ৯নং সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধা সংগঠক হেমায়েত বাহিনীর সাথে যুদ্ধে অংশগ্রহন করে রণাঙ্গনে বীরত্বেও ভূমিকা পালন করেন। ফলশ্র“তিতে যুদ্ধপরবর্তী সময়ে শ্যামল ব্যানার্জীকে দেয়া হয় সনদপত্র। তা আজ কেবলই স্মৃতি। আজো মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে শ্যামল ব্যানার্জীকে তালিকাভুক্ত করা হয়নি। ফলে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে পুরো পরিবারটির মধ্যে। সেই দুঃসহ্য দিনের স্মৃতি চারন করতে গিয়ে মনা রানী ব্যানার্জী ও বি.কে রনজিতের মেয়ে কবিতা রানী ব্যানার্জী, মমতা ব্যানার্জী, অজানা ব্যানার্জী বলেন, যুদ্ধ শুরুর পর বাবা-মা আমাদের কাকা সুজিত ব্যানার্জী ও বড়ভাই শ্যামল ব্যানার্জীকে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে প্রশিক্ষন গ্রহনের জন্য ভারতে পাঠিয়ে দেন। এদিকে আমাদের সহযোগীতায় বাবা-মা আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা সেবা দেয়ার জন্য অতিগোপনে পয়সা গ্রামের আমাদের নিজ বাড়িতে, শুয়াগ্রাম ও আস্কর গ্রামের পরিত্যক্ত দুটি বাড়িতে হাসপাতাল পরিচালনা শুরু করেন। পয়সা গ্রামে পরিচালিত হাসপাতালে পর্যায়ক্রমে ছয়জন, শুয়াগ্রামে দশজন, আস্করে ১৫ জন সহযোগী নিয়ে প্রায় সহস্রাধীক আহত মুক্তিযোদ্ধাকে আমরা চিকিৎসা সেবা দিয়েছি। এছাড়াও যেখানে মুক্তিযোদ্ধারা আহত হতেন সেখানে পুরো টিম নিয়ে গিয়ে আমরা চিকিৎসা করেছি। যুদ্ধচলাকালীন সময় স্থানীয় রাজাকারদের কাছে এ খবর পেয়ে পাক সেনারা একাধিকবার আমাদের বাবা রনজিত ও মা স্ত্রী মনা রানীকে ধরে নেয়ার জন্য অভিযান চালিয়ে ব্যর্থ হয়। আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা সেবা করে ঔষধ সরবরাহ করতে ওইসময় আমাদের বাবা বি.কে রনজিতকে গোলার ধান, ঘরের চালার টিন ও আসবাবপত্র বিক্রি করতে হয়েছিলো। এভাবেই আমাদের জীবনে কেটে গেছে যুদ্ধজয়ের অসংখ্য দুঃসহ্য ঘটনা।

সূত্রমতে, দেশ স্বাধীনের পর বি.কে রনজিত ও তার স্ত্রী মনা রানীর স্বপ্ন ছিলো পয়সারহাটে একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত করার। কিন্তু তাদের স্বপ্ন আর পূরন হয়নি। এরআগেই তাদের বিদায় নিতে হয়েছে এ ধরনী থেকে। মৃত্যুর পূর্বে বি.কে রনজিত ও তার স্ত্রী মনা রানী ব্যনার্জী তাদের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও সনদপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা পুত্র শ্যামল ব্যানার্জীকে তালিকাভুক্তির জন্য বিভিন্নস্থানে ধর্ণা দিয়েও হয়েছেন ব্যর্থ। তৎকালীন সময়ের স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কতিপয় নেতৃবৃন্দের দাবিকৃত টাকা দিতে না পারায় শ্যামল ব্যানার্জীকে মুক্তিযোদ্ধার তালিকাভূক্তি করা হয়নি। কবিতা রানী ব্যানার্জী বলেন, সেই দুঃসহ্য দিনের স্মৃতি কখনও ভোলার নয়; যা আজও আমার মনে রেখাপাত করে। সেদিনকার আমাদের কাছ থেকে চিকিৎসা সেবা নিয়ে প্রাণে বেঁচে যাওয়া যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা কোথায় কিভাবে বেঁচে আছেন তাহা আমি বলতে পারবো না। তার ধারণা লাল-সবুজ পতাকার মাঝখানের লাল অংশে মিশে আছে ওইসব মুক্তিযোদ্ধারা। সাবেক ইউপি সদস্য অজানা ব্যানার্জী আক্ষেপ করে বলেন, স্থানীয় কতিপয় ভূমিদস্যুরা আমার বাবার সম্পত্তি আত্মসাত করার জন্য নানামুখী ষড়যন্ত্রসহ আমাদের মেরে ফেলারও চেষ্ঠা করছে। তারই ধারাবাহিকতায় প্রভাবশালী ওই ভূমিদস্যুরা হয়রানীর উদ্দেশ্যে আমাদের বিরুদ্ধে বরিশাল আদালতে মামলা দায়ের করেছে। ভূমিদস্যুদের কবল থেকে রক্ষা পেতে ও একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে শ্যামল ব্যানার্জীর নাম মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় অর্ন্তভূক্ত করার জন্য মুক্তিযোদ্ধা পরিবারটির সদস্যরা প্রধানমন্ত্রীর আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

আরও পড়ুন

Back to top button
Translate »