আর্কাইভ

১২০ বছর পূর্তিতে শিক্ষার্থীদের মিলন মেলা – বঙ্গবন্ধুসহ অসংখ্য মন্ত্রী-এমপি কৃতিমান ব্যক্তিরা ছিলেন গৈলা স্কুলের ছাত্র

নিজস্ব সংবাদদাতা ॥ ১৯৭৫ সনের ১৫ আগস্ট ভয়াল কালো রাতে ঘাতকদের নির্মম বুলেটে নিহত স্বাধীনতার স্থপতি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, সাবেক মন্ত্রী শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত ও প্রয়াত মন্ত্রী সুনীল কুমার গুপ্ত, সাবেক উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ব্রিগেডিয়ার এম.এ মালেক (অবঃ), বর্তমান মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, সমকালের সহযোগী সম্পাদক অজয় দাশ গুপ্ত, নোবেল বিজয়ী অমীয় দাশগুপ্ত, কলকাতার বেথুন কলেজের প্রিন্সিপাল তটিনী গুপ্তা, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দু’বার পিএইচডি ডিগ্রী অর্জনকারী সুরেন্দ্র নাথ গুপ্ত, সচিব আব্দুল মান্নান হাওলাদার সহ অসংখ্য কৃতিমান ও কীর্তিময় ব্যক্তিদের স্মৃতিবিজড়িত বরিশালের ঐতিহ্যবাহী আগৈলঝাড়া উপজেলার গৈলা মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ১২০ বছর পূর্তি উৎসব ছিলো গতকাল বুধবার।

বর্তমানে দেশ-বিদেশে কর্মরত অসংখ্য গুনিব্যক্তিরা ছিলেন গৈলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। ওই বিদ্যালয়ের ১২০ বছর পূর্তি উৎসব উপলক্ষ্যে দিনব্যাপী ব্যাপক কর্মসূচী পালন করা হয়। এসব কর্মসূচীতে বর্তমান ও প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রীদের মিলন মেলা বসেছিলো স্কুল চত্বরে। কর্মব্যস্ততার কারণে দূরে থাকায় দীর্ঘদিন দেখা হয়নি ছোট্ট বেলার সহপাঠীদের সাথে। তাই অনেকদিন পর পুরনো দিনের স্মৃতিকে স্মরণ করে একে অপরকে কাছে পেয়ে আবেগ আপ্লুত হয়ে জড়িয়ে ধরেন বুকের মাঝে। সূত্রমতে, আগৈলঝাড়ার প্রতিটি ঘরের ছেলে-মেয়েদের শিক্ষিত করে গড়ে তোলার জন্য ১৮৯৩ সনের ২৩ জানুয়ারি ফুলশ্রী গ্রামের শিক্ষানুরাগী কৈলাশ সেন প্রথমে গৈলা কালুপাড়া গ্রামের ঐতিহ্যবাহী দাসের বাড়িতে বিদ্যালয়টির কার্যক্রম শুরু করেন। পরবর্তীতে শিক্ষার্থী বৃদ্ধি পাওয়ায় দাসের বাড়ির সম্পত্তির ওপরেই বর্তমানস্থানে স্কুলটি স্থানান্তর করা হয়। গৌরনদী-গোপালগঞ্জ সড়কের পাশ্ববর্তী আগৈলঝাড়ার গৈলা নামকস্থানে বর্তমানে এ মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়টির অবস্থান। এ বিদ্যালয়টি এতদাঞ্চলের সর্বপ্রথম মাধ্যমিক পর্যায়ের স্কুল। দাসের বাড়ির সেই বিদ্যালয়টি আজ অত্র এলাকার শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়েছে। স্কুলের পাশ্বেই রয়েছে ১৯৭১ সনের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় দক্ষিণাঞ্চলে সড়কপথে সর্বপ্রথম সম্মুখ যুদ্ধে নিহত শহীদ সিপাহী আলাউদ্দিন ওরফে আলা বক্সের সমাধীস্থল। ষষ্ট থেকে দশম শ্রেনী পর্যন্ত এ বিদ্যালয়ে বর্তমানে দেড় হাজার ছাত্র-ছাত্রী অধ্যায়নরত রয়েছে। আর তাদের পাঠদানের জন্য নিয়োজিত রয়েছে ৩৭ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা ও কর্মচারী। দীর্ঘদিন থেকে এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা প্রতিবছর অষ্টম শ্রেনীর জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ-৫ সহ আশাব্যঞ্জক ফলাফল করে কৃতিত্ব অর্জন করে আসছে। প্রতিবছর মেধাবী শিক্ষার্থীদের মাঝে সৈয়দ আবুল হোসেন ট্রাস্টের পক্ষ থেকে বৃত্তি প্রদান করা হয়। ১২০ বছর হাঁটি হাঁটি পা পা করে এ বিদ্যালয়টি গোটা জেলার মধ্যে একটি স্বনামধন্য বিদ্যাপীঠ হিসেবে সুনাম অর্জন করেছে। পাঠদানে শিক্ষকদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে বর্তমানে বিদ্যালয়টি মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। সূত্রে আরো জানা গেছে, এ বিদ্যালয় থেকে পাস করে অনেক শিক্ষার্থীরা দেশে-বিদেশে প্রচুর সুনাম অর্জন করেছেন। ১৮৯৩ সনে গৈলা মাধ্যমিক বিদ্যালয় চালু হবার পর ওইসময় অনেক শিক্ষার্থীরা বরিশাল বিএম বিদ্যালয় থেকে গৈলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। গৈলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান শিক্ষক ছিলেন ফুলশ্রী গ্রামের কৈলাশ চন্দ্র সেন। তিনি বিএ পাস করে সরকারি ম্যাজিষ্ট্রেটের চাকুরি পেয়েছিলেন। কিন্তু অবহেলিত আগৈলঝাড়ার জনপদের মানুষের শিক্ষার কথা ভেবে তিনি সরকারি চাকুরী ছেড়ে প্রধান শিক্ষকের পদ গ্রহণ করেছিলেন। দীর্ঘ ৩৭ বছর স্কুল পরিচালনার কাজ করে তিনি অবসরগ্রহণ করেন। গৈলা মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরে শিক্ষা-দীক্ষায় গৈলার খ্যাতি ভারত বর্ষসহ বিশ্বের সর্বস্তরের মানুষের কাছে ছড়িয়ে পরে।

এ স্কুলের খন্ডকালীন সময়ের ছাত্র ছিলেন স্বাধীনতার স্থপতি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, সাবেক মন্ত্রী আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, মন্ত্রী সুনীল কুমার গুপ্ত, ব্রিগেডিয়ার এম.এ মালেক (অবঃ), বর্তমান মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, সমকালের সহযোগী সম্পাদক অজয় দাশ গুপ্ত। এছাড়া এ স্কুলের দু’জন ছাত্র কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ পাশ করেন। ওই স্কুলের ছাত্রী তটিনী গুপ্তা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থান লাভ করেন। পরবর্তীতে তিনি পড়াশুনায় সমান কৃতিত্ব দেখান। তিনিই এতদাঞ্চলের প্রথম মহিলা গ্রাজুয়েট ছিলেন। কর্মজীবনে তিনি কলকাতার বেথুন কলেজের প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। গৈলা স্কুলের আরেক প্রাক্তন ছাত্র সুরেন্দ্র নাথ গুপ্ত ১৯২০ সনে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও ১৯২২ সনে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দু’বার পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করেন। এ এলাকায় তিনিই প্রথম পিএইচডি ডিগ্রিধারী ব্যক্তি। ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় তার লেখা ভারতীয় দর্শনের ইতিহাস ৫টি খন্ডে প্রকাশ করা হয়েছিলো। এছাড়াও গৈলা স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন দেশে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারসহ বিভিন্ন ধরনের গুরুত্বপূর্ন পদে দায়িত্ব পালন করছেন। এ অঞ্চলের শিক্ষা-দীক্ষায় গৈলা স্কুল তার ঐতিহ্য এখনও ধরে রেখেছে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ গোলাম ছরোয়ার জানান, ঐতিহ্যবাহী গৈলা মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ১২০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে গতকাল বুধবার সকাল দশটায় বনার্ঢ্য র‌্যালী, মিষ্টি বিতরন এবং বিকেল চারটায় আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। স্কুল পরিচালনা কমিটির সভাপতি মোঃ ইউসুফ হোসেন মোল্লার সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন বরিশাল জেলা প্রশাসক মোঃ শহিদুল আলম। বিশেষ অতিথি ছিলেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ আবুল কালাম তালুকদার, সমকালের সহযোগী সম্পাদক ও প্রাক্তন ছাত্র অজয় দাশ গুপ্ত, উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান মোঃ জসিম সরদার, জেলা সহকারী কমিশনার রুবেল মাহমুদ, হাসিম উদ্দিন, আল-মুক্তাদির হোসেন, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবুল হোসেন, ওসি মোঃ সাজ্জাদ হোসেন। বক্তব্য রাখেন সহাকারি শিক্ষক শাহাদাত হোসেন, নির্মল কৃষ্ণ ভদ্র, লিওনী শিখা সিকদার, জহিরুল হক প্রমুখ। শেষে মেধাবী শিক্ষার্থীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ ও গৈলা স্কুল এবং দেশের স্বনামধন্য শিল্পীদের সমন্ময়ে এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।

১২০ বছর পূর্তিতে শিক্ষার্থীদের মিলন মেলা - বঙ্গবন্ধুসহ অসংখ্য মন্ত্রী-এমপি কৃতিমান - ব্যক্তিরা ছিলেন গৈলা স্কুলের ছাত্র

আরও পড়ুন

মন্তব্য করুন

Back to top button
Translate »