সারা বাংলা

টাঙ্গাইলে গরুর আবাসিক হোটেল

(জনকণ্ঠ) বিদেশে পোষা কুকুর বিড়ালের জন্য রেস্টুরেন্ট বা হোটেলের কথা শোনা যায়। কিন্তু আমাদের দেশে গরু, মহিষ ও ছাগলের আবাসিক হোটেলের কথা বোধ হয় ইতোপূর্বে কেউ শোনেননি। তাই এ ধরনের আবাসিক হোটেলের কথা শুনে অনেকেই হয়ত আশ্চর্য হবেন। খুব বেশি দূরে নয়, টাঙ্গাইল জেলার ভূঞাপুর উপজেলার গোবিন্দাসী এলাকায় গড়ে উঠেছে এই ধরনের ‘আবাসিক হোটেল।’ মানুষ থাকার জন্য আবাসিক হোটেল রয়েছে প্রতিটি শহরেই। এটা আমাদের সকলেরই জানা। কিন্তু আজব হলেও সত্য যে, টাঙ্গাইলে গড়ে ওঠা গরু রাখার জন্য আবাসিক হোটেল থেকে আয়ের টাকায় চলছে আড়াই শতাধিক পরিবার।

বঙ্গবন্ধু সেতুর প্রায় সাড়ে ৬ কিলোমিটার দূরে যমুনা নদীতীরবর্তী ভূঞাপুরের গোবিন্দাসী গরুর হাটকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে আড়াই শতাধিক পশুর আবাসিক হোটেল। এই হোটেলগুলোর জন্যই এখানকার বিভিন্ন হাটে নিরাপদ পরিবেশে গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া বেচাকেনার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। অল্প সময়েই গোবিন্দাসী হাট পরিণত হয়েছে দেশের অন্যতম বৃহত্তম পশুর হাটে। সারা বছর হোটেলগুলোতে কমবেশি গরু থাকে। কিন্তু প্রতিবছর ঈদ উপলক্ষে হাটে গরু বেশি ওঠায় হোটেলগুলোতে পশুর চাপও বেশি থাকে। আর তাই ঈদকে সামনে রেখে পশুর এ আবাসিক হোটেলের ব্যবসা এখন জমে উঠেছে।

টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলায় অবস্থিত গোবিন্দাসী গরুর হাট ইতোমধ্যে জমে উঠেছে। সারা দেশের পাইকারি ও খুচরা ক্রেতা-বিক্রেতাদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে গোবিন্দাসী গরুর হাট। প্রতিদিন সারাদেশ থেকে আসা শত শত ট্রাক গরু যাচ্ছে এ হাট থেকে। এবার গরুর আমদানিও অনেক বেশি হয়েছে। তবে দাম নিয়ে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের মাঝে বিপরীতধর্মী বক্তব্যও রয়েছে। পাইকারি বিক্রেতারা বলছেন, এ বছর বেশি গরু আমদানি হলেও দাম আগের বছরের চেয়ে অনেক কম। ক্রেতার অভাব রয়েছে বলেও জানান তাঁরা। অপরদিকে ক্রেতাদের অভিযোগ, গরুর দাম হাঁকা হচ্ছে অনেক বেশি। ফলে প্রচুর ক্রেতা থাকলেও চড়া দামের কারণে গরু কিনতে পারছে না অনেকে। যমুনা নদীর পারে গড়ে ওঠা গোবিন্দাসী গরুর হাট মূলত পাইকারি হাট হিসেবেই সারা দেশে পরিচিত। সড়ক ও নৌপথে ভাল যোগাযোগ ব্যবস্থা ও তুলনামূলক কম দাম হওয়ার কারণে ঢাকা, রংপুর, সিলেট ও চট্টগ্রাম ছাড়াও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা ছুটে আসেন এ হাটে। তবে প্রতিবছরের মতো এবারও নানা অজুহাতে চাঁদা আদায়ের কারণে দূর-দূরান্ত থেকে আসা ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছে ব্যবসায়ীরা।

জানা যায়, ৬০-এর দশক থেকে যমুনা নদীর তীরে গোবিন্দাসী গ্রামে বসে গরুর হাট। সে সময় সপ্তাহে একদিন সেখানে বেচাকেনা হতো নিত্যপণ্য ও গৃহস্থালির বিভিন্ন জিনিসপত্র। স্থানীয়রা ৭০-এর দশকে হাটটিতে অল্প পরিসরে বেচাকেনা শুরু করে গরু-ছাগল। আশির দশকের শেষভাগে যমুনা নদীর নৌপথে কিছু কিছু করে হাটে আসতে থাকে ভারতীয় গরু। দেশের উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে সহজেই এ হাটে গরু নিয়ে আসায় অল্প দিনেই পাইকারদের দৃষ্টি কাড়ে গোবিন্দাসী গরুর হাট। নব্বই দশকে এসে জমজমাট গরুর হাটে পরিণত হয় এটি। সারা বছর প্রতি রবি ও বৃস্পতিবার সপ্তাহে এ দু’দিন হাট বসে থাকে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত জমজমাট বেচাকেনা হলেও এ হাটে এখনও নেই সরকারী কোন অবকাঠামো সুযোগ সুবিধা। বঙ্গবন্ধু সেতু কর্তৃপক্ষের অধিগ্রহণকৃত জমিতে গোবিন্দাসী হাটের উত্তর পাশের বিশাল চরাঞ্চলের খোলা জায়গা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে হাট। পাইকাররা শুরুতে ট্রাক ও নৌকায় গরু এনে হাটের আশপাশের মানুষের বাড়ির সামনে এনে জড়ো করে রাখতেন। ঝড়-বৃষ্টির সময় এসব বাড়ির গোয়ালঘরেই জায়গা হতো পাইকারদের কিছু গরুর। আশ্রয় পেতেন পাইকাররাও। বিনিময়ে তারা বাড়ির মালিককে নামমাত্র কিছু অর্থ দিতেন।

এভাবে টাকা রোজগারের এই সহজ সুযোগ ও পাইকারদের চাহিদার কারণে হাটের আশপাশের বাসাবাড়ির মালিকরা তাদের খোলা জায়গায় টিনের ছাপড়া দিয়ে ঘর তুলে দেয় হাটে আসা পশুর জন্য। ভাড়ার বিনিময়ে গরু রাখা শুরু হয় সেখানে। পরবর্তীতে এসব ঘরই পরিচিতি লাভ করে গরুর আবাসিক হোটেল হিসেবে। দিন দিন বাড়তে থাকে এ হোটেলের সংখ্যা। হোটেলের গণ্ডি ছড়িয়ে পড়ে গোবিন্দাসীর আশপাশের খানুরবাড়ি, ভালকুটিয়া, কুকাদাইর, রাউৎবাড়ি, জিগাতলা, বাগবাড়ি, স্থলকাশি, মাটিকাটা ও চিতুলিয়াপাড়াসহ আরও অন্তত ১০/১২টি গ্রামে। হাট শুরুর প্রায় ২/৩দিন পূর্বেই হাটে এসে এসব হোটেলে গরু রাখেন পাইকাররা। আর এ জন্য হোটেলে গরু প্রতি তাদের প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ টাকা গুনতে হয়। আর এই হাটে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকার ও ব্যাপারীরা গরু বেচতে ও কিনতে আসেন। তাদের থাকার জন্য এখানে যেমন আবাসিক হোটেল রয়েছে তেমনি তাদের গরু নিরাপদে রাখার জন্যও রয়েছে গরুর আবাসিক হোটেল। এসব হোটেলে গরু এক রাত রাখার জন্য হোটেল মালিককে দিতে হয় গরুপ্রতি ৩০ থেকে ৪০ টাকা। আর এ থেকে হোটেল মালিকদের আয় হয় মাসে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা। প্রতিটি আবাসিক হোটেলে গরু-মহিষ ধারণক্ষমতা ৩০ থেকে ৪০টি। সেখানে মজুদ আছে খড়সহ পর্যাপ্ত পশু খাদ্য। বেশিরভাগ হোটেলের পাশেই আছে গোসলের পুকুর।

গরুর পাইকার রমজান আলী জানান, প্রতিহাটে শ’খানেক করে গরু এনে হাটের ২/১ দিন আগে হোটেলে রাখেন। হাটের দিন গরু বিক্রি করে বিকেলে তিনি চলে যান। গরু অবিক্রীত থাকলে সেগুলো হোটেলে রেখে নিশ্চিন্তে চলে যেতে পারেন। গরু ফিরিয়ে নেয়ার কোন ঝামেলা থাকে না। আবাসিক হোটেল মালিকরা সেগুলো দেখাশুনা করেন। পরের হাটে আবার নতুন করে আনা গরুর সঙ্গে সেগুলো বিক্রি করতে পারেন। হোটেলে গরু রেখে পাইকাররাও মাত্র ৭০/৮০ টাকায় খাওয়া দাওয়া সেরে নিতে পারেন। গরু রাখা ও পাইকারদের থাকা খাওয়ার এত সুন্দর ব্যবস্থা দেশের অন্য কোন গরুর হাটে নেই। রাত যাপনকালে গরু বিক্রির টাকা আবাসিক হোটেল ব্যাংক মালিকের কাছে নিরাপদ গচ্ছিত রাখা যায়। গরু রাখার ভাড়া টাকার বাইরেও হোটেল মালিকদের বাড়তি আয় হয় গরুর গোবর থেকে। গোবর থেকে জৈব সার ও ঘুটে তৈরি করে এ বাড়তি আয় করেন তারা।

যমুনা নদীর ভাঙ্গনে সব হারিয়ে এসব হোটেল মালিকরা গরুর আবাসিক হোটেল চালিয়ে এখন জীবিকা নির্বাহ করছেন। সরকারের সহযোগিতা পেলে এ হোটেলগুলোতে গরু থাকার ব্যবস্থা আরও সহজ হতো। স্থানীয় প্রশাসন, হাট কমিটি ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের তৎপরতার কারণে হাটে চুরি, ডাকাতি নেই বললেই চলে। বছরে ইজারা বাবদ এ হাট থেকে সরকার কয়েক কোটি টাকা রাজস্ব আয় করছে। এই আয় বাড়াতে ও দেশের বৃহত্তম এ হাটের খ্যাতি ধরে রাখতে সর্বস্তরের মানুষের সমন্বিত প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত এ হাটে সরকারীভাবে অবকাঠামো গড়ে তোলা জরুরী বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়ে টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক মাহবুব হোসেন বলেন, স্থানীয় গ্রামবাসীর উদ্যোগে গরু রাখার জন্য একটি ব্যবস্থা করেছে। যাকে বলা আবাসিক গরুর হোটেল। মানবিক দিক থেকে এটি একটি ভাল পদক্ষেপ। স্থানীয় প্রশাসনের যদি কিছু করার থাকে তাহলে অবশ্যই করা হবে। ইজারাকৃত স্বীকৃত হাটে যে উপার্জন হয় নিয়ম অনুযায়ী হাটে উত্তোলনকৃত টাকার আনুপাতিকহারে তা ব্যয় করতে হয়। সে অনুপাতে হাটের অবকাঠামোসহ অন্যান্য উন্নয়ন করা হবে।

সৌজন্যে: দৈনিক জনকণ্ঠ


ফেসবুকে মন্তব্য করুন :

টি মন্তব্য
মন্তব্যে প্রকাশিত যেকোন কথা মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। Gournadi.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের কোন মিল নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে Gournadi.com কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নিবে না

আরো পোষ্ট...