বরিশাল

কেমন আছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস

শরীর ভালো যাচ্ছে না সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাসের। বলা যায় তিনি অসুস্থ। কিছু দিন আগে ঢাকার বারডেম হাসপাতালে প্রায় ১৫ দিন চিকিৎসা নিয়ে বাসায় ফিরেছেন। তবে বয়সজনিত নানা রোগে তিনি এখন অনেকটাই কাবু। ফোন করলেও রিসিভ করেন না। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও তেমন কথাবার্তা বলেন না।

দেশের একাদশ রাষ্ট্রপতি ছিলেন বরিশালের স্বনামখ্যাত সন্তান অ্যাডভোকেট আবদুর রহমান বিশ্বাস। আগে বনানী মসজিদে নিয়মিত জুমার নামাজ পড়তেন; এখন মসজিদে যেতে পারছেন না। নাতি-নাতনিদের নিয়ে বাসায়ই সময় কাটে তার। বই পড়ে, কোরআন তিলাওয়াত করে, পত্রিকা পড়েই দিন কেটে যাচ্ছে তার। এই তথ্য দেন বরিশাল সদর উপজেলার শায়েস্তাবাদ ইউনিয়নের হবিনগর গ্রামের শামসুল আলম বিশ্বাস। শামসুল আলমের বাবা মরহুম আবদুল কাদের বিশ্বাস ছিলেন আবদুর রহমান বিশ্বাসের মেজ ভাই। বড় ভাই আবদুল গফুর বিশ্বাসও বেঁচে নেই। তিন ভাইয়ের মধ্যে রহমান বিশ্বাসই জীবিত।

জানতে চাইলে সাবেক রাষ্ট্রপতির ষষ্ঠ ছেলে অ্যাডভোকেট জামিলুর রহমান শিবলী বিশ্বাস বলেন, ‘আব্বা আল্লাহর ইচ্ছায় ভালো আছেন। বয়স হয়েছে, চেকআপ করতে মাঝেমধ্যে হাসপাতালে যান। আগে মাঝেমধ্যে বাড়ির বাইরে বের হলেও এখন সেভাবে পারেন না। শরীর ভালো থাকলে জুমার নামাজ পড়তে মসজিদে যান, নইলে ঘরেই নামাজ আদায় করেন।

অনেক দিন বরিশালে আসেন না।’ এক প্রশ্নের জবাবে শিবলী বিশ্বাস বলেন, ‘আমরা এখন রাজনীতিতে নেই। ভবিষ্যতে থাকব কি না, তা সময়ই বলে দেবে।’শিবলী বিশ্বাস জানান, তার বাবা অসুস্থ বলে মুঠোফোন ব্যবহার করেন না। বাসায় ফোন করে বিভিন্ন বিষয়ে সাংবাদিকরা তার মন্তব্য জানতে ফোন করলে তিনি সেগুলো রিফিউজ (প্রত্যাখ্যান) করেন।

শিবলী বিশ্বাস বলেন, ‘আব্বা কোনো বিষয়ে মিডিয়ায় বক্তব্য দিতে আগ্রহী নন। আমার কথাই তার কথা।’ সূত্র জানায়, ঝুট-ঝামেলামুক্ত থাকতে মিডিয়া এড়িয়ে চলছেন ৮৭ বছর বয়সী আবদুর রহমান বিশ্বাস। পারিবারিক ঘনিষ্ঠজন ছাড়া কারো সঙ্গে যোগাযোগ করছেন না। ব্যক্তিগত প্রয়োজনে তার সঙ্গে কেউ যোগাযোগও করতে পারছেন না। নিজ গ্রাম হবিনগরের মানুষ ছাড়া কাউকে সাক্ষাৎও দেন না। ঢাকার গুলশান ২ নম্বরের ভাড়া বাসায় (রোড ৯৯, বাড়ি ১৫) দুটি বাংলা, একাধিক ইংরেজি দৈনিক পত্রিকা এবং বই পড়ে ও কোরআন শরিফ তিলাওয়াত করে সময় কাটে তার। পুরোপুরি অবসরে আছেন তিনি। রাজনীতি থেকে অনেক দূরে, নীরবে নিভৃতে জীবনের শেষ সময়গুলো পার করছেন তিনি।

সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস বরিশাল এসেছিলেন ২০০৪ সালে। ওই সময় বরিশাল জিলা স্কুলের ১৭৫ বছর পূর্তি উৎসবে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন। তিনি ওই স্কুলের ছাত্র ছিলেন। গত বছর ঈদুল আজহায় তার গ্রামের বাড়ি আসার কথা ছিল, কিন্তু শেষতক আসেননি। সাবেক রাষ্ট্রপতির বড় ছেলে শামসুদ্দোহা কালাম বিশ্বাস চিরকুমার। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্স ডিগ্রিধারী, লেখালেখিতে মগ্ন। পাশাপাশি ব্যবসা করছেন।

মেজ ছেলে প্রকৌশলী এনসানুল কবির জামাল বিশ্বাস ছিলেন তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)। তার ভাই তৎকালীন এমপি ডা. এহতেশামুল হক নাসিম বিশ্বাসের মৃত্যুর পর শূন্য আসনে মনোনয়নের প্রত্যাশায় চাকরি ছেড়ে দেন তিনি। কিন্তু মনোনয়ন পাননি। পরে ব্যবসায় মনোনিবেশ করেন।

সেজ ছেলে মিজানুর রহমান এ হাসান মনু বিশ্বাস ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর। এখন অবসরে।

চতুর্থ ছেলে ডা. এহতেশামুল হক নাসিম বিশ্বাস ঢাকার পিজি হাসপাতালের নাক-কান-গলা বিভাগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে চাকরি করেছেন দীর্ঘদিন। পরে সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়ে ১৯৯৬ সালে সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-৫ (সদর) আসনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। কিন্তু ১৯৯৮ সালের ১২ মার্চ অকালে মারা যান।

পঞ্চম সন্তান আঁখি বিশ্বাস ঢাকার শহীদ আনোয়ারা কলেজে অধ্যাপনা করছেন, তার স্বামী সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল নিজামউদ্দিন আহম্মেদ।

সপ্তম সন্তান রাখি বিশ্বাস গৃহিণী, তার স্বামীও সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।

অষ্টম সন্তান ব্যারিস্টার রোমেন বিশ্বাস রুবেল বিদেশে অবস্থান করছেন। আবদুর রহমান বিশ্বাসের সহধর্মিণী হোসনে আরা রহমানও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমএ।

সূত্র আরও জানায়, এই পরিবারের কেউ এমএ পাসের নিচে নেই। সাবেক রাষ্ট্রপতি জনসেবামূলক কর্মকাণ্ডের জন্য শায়েস্তাবাদে একটি ফাউন্ডেশন করেছেন। ওই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে দরিদ্র ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ায় সহযোগিতা করা হয়।

১৯২৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর সদর উপজেলার শায়েস্তবাদের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আবদুর রহমান বিশ্বাস। তার বড় ভাই আবদুল গফুর বিশ্বাস টানা ৩৬ বছর চেয়ারম্যান ছিলেন শায়েস্তাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের।

১৯৪৩ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন রহমান বিশ্বাস। পরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএম ও আইন শাস্ত্রে ডিগ্রি নেন।ষাটের দশকের শুরুতে কিছু দিন তিনি জেলার বাবুগঞ্জ পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। এরপর শিক্ষকতা ছেড়ে বরিশালে আইন পেশায় আত্মনিয়োগ করেন।

পাকিস্তান আমলে জেনারেল আইয়ুব খানের শাসনামলে মুসলিম লীগে সম্পৃক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে রাজনীতি শুরু তার। ’৬২ সালে পূর্ব পাকিস্তান আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ’৬৫ সালে ওই পরিষদের হুইপ হয়েছিলেন। ’৬৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশগ্রহণ করেন তিনি। ’৭৪ ও ’৭৬ সালে দুবার বরিশাল বারের সভাপতি নির্বাচিত হন। প্রায় একই সময়ে (’৭৬-৭৭ সালে) তিনি বরিশাল পৌরসভার চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। ’৭৭ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বিএনপির রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন তিনি। ’৭৮ থেকে ’৮০ সাল পর্যন্ত জিয়া সরকারের পাটমন্ত্রী এবং ’৮০ থেকে ’৮১ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারের সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছিলেন।

১৯৯১ সালে বরিশাল-৫ (সদর) থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন আবদুর রহমান বিশ্বাস। সে বছরই তিনি সংসদের স্পিকার এবং একই বছরের ৮ অক্টোবর দেশের একাদশ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

সৌজন্যে: বাংলাদেশ প্রতিদিন


ফেসবুকে মন্তব্য করুন :

টি মন্তব্য
মন্তব্যে প্রকাশিত যেকোন কথা মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। Gournadi.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের কোন মিল নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে Gournadi.com কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নিবে না

আরো পোষ্ট...

Leave a Reply