ফিচার

মুক্তিযুদ্ধের ৪৩ বছর, আমাদের প্রত্যাশা পূরণ: জহুরুল ইসলাম জহির

১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক ঘটনাবহুল সাধারণ নির্বাচনের পরে পশ্চিম পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে যখনই টালবাহানা শুরু করল। তখনই সমগ্র বাঙালী জাতি বুঝতে পারল বাঙালীর তথা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ছাড়া বিকল্প নেই। বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ স্বাধীনতার যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। প্রস্তুত একটি লাল সবুজের পতাকা ছিনিয়ে আনার জন্য। গোটা জাতি অধীর আগ্রহে অপেক্ষমাণ,  অপেক্ষার প্রহর শেষ হলও ১৯৭১। ৭১’র   ২৫ মার্চ, সেই ভয়াল কালো রাতে  ঘুমন্ত মানুষের উপর পশ্চিম পাকিস্তানী কাপুরুষ শাসক গোষ্ঠীর অতর্কিত  হামলা। এ হামলার পর শুরু হল পশ্চিমা পাক হানাদারদের অর্থনৈতিক বৈষম্য, শোষণ ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে বাঙালী জাতির  সশস্ত্র সংগ্রাম। শুরু হল মুক্তিযুদ্ধ। আমরা দেশ প্রেম, বৈষম্য দূরীকরণ, দেশের সমৃদ্ধি অর্জন, বাক স্বাধীনতা, মৌলিক অধিকার অর্জন ও স্বাধীন ভূখণ্ড ও আমার প্রিয় লাল সবুজের পতাকা পাওয়ার চেতনায় দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের পর দেশের প্রতিটি মানুষ সশস্ত্র সংগ্রামে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। সে সময় প্রতিটি মানুষের একটি বাসনা ছিল স্বাধীন দেশটি হবে আমার।  দেশের ইতিহাস ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠা ও রক্ষায় আমার সমান অংশীদারিত্ব। পশ্চিমা শাসক শোষকদের বৈষম্যের বিরুদ্ধে স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনে কোন জাতি বা গোষ্ঠী অংশ নেননি। দেশ মাতৃকার স্বাধীতার জন্য মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খৃষ্টান সহ উপজাতীয়রা সকলেই অংশ নিয়েছে। সকলেই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মুক্তি যুদ্ধে  অংশ নিয়েছি। স্বাধীন করেছে আমার স্বপ্নের সোনার বাংলা।

স্বাধীনতার ৪৩ বছর পরে আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে আমরা কি পেয়েছি মুক্তিযুদ্ধের স্বাদ? আমরা প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি মুক্তিযুদ্ধের চাওয়া পাওয়া? আমরা কি বহন করছি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা? আমরা কি শোষণ বৈষম্যের ঊর্ধ্বে থাকতে পেরেছি? আমরা কি প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি গণতান্ত্রিক ধারা? এর উত্তর আমাদের প্রত্যেকেরই জানা। স্বাধীনতার ৪৩ বছর পরেও আমাদের প্রত্যাশা পুড়ন হয়নি। প্রিয় পাঠক আমি এ কথা লিখে আপনাদের হতাশ করছি না। আমি এটাই বলতে চাই স্বাধীনতাত্তর ৪৩ বছর  আমরা যদি সেদিনকার অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে পথ চলতে পারতাম তাহলে আমরা উপরোক্ত প্রশ্নের ইতিবাচক উত্তর দিতে পারতাম এবং এতদিনে পুড়ন হতো আমাদের প্রত্যাশা, আমাদের স্বপ্নের সোনার বাংলা। তারপরেও আমি বলবো, আমরা এগিয়েছি বহুদূর। আমরা আশান্বিত আমাদের স্বপ্ন পুড়নে অগ্রযাত্রা  অবশ্যই একদিন কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌছবে।

আমি ৭১র মুক্তিযুদ্ধ ও গৌরনদীর প্রেক্ষাপট সম্পর্কে কিছু কথা বলতে চাই। ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীনতা যুদ্ধের বিজয় ঘোষিত হলেও দেশের সর্বশেষ পাক-হানাদার মুক্ত হয়েছিলো বরিশালের গৌরনদী। দীর্ঘ ২৮ দিন মুক্তিবাহিনী ও মুজিব বাহিনীর যৌথ আক্রমণের পর ২২ ডিসেম্বর গৌরনদী কলেজে অবস্থানরত শতাধিক পাক সেনা মিত্র বাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলো। পাক সেনারা অত্র এলাকায় নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে পাঁচ সহস্রাধিক নিরীহ জনসাধারণকে হত্যা ও তিন শতাধিক মা-বোনের ইজ্জত হরণ করে। ’৭১ সনের ২৫ এপ্রিল পাক সেনারা ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক দিয়ে এ জনপদে প্রবেশের মাধ্যমে হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। তাদের প্রবেশের খবর শুনে গৌরনদীর স্বেচ্ছাসেবক দলের কর্মীরা গৌরনদীর কটকস্থল (সাউদেরখালপাড়) নামকস্থানে পাক সেনাদের প্রতিহত করার জন্য অবস্থান নেয়। হানাদাররা সেখানে পৌঁছলে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধের মুখে পরে। সেইদিন (২৫ এপ্রিল) পাক সেনাদের সাথে সম্মুখ যুদ্ধে প্রথম শহীদ হন গৌরনদীর নাঠৈ গ্রামের সৈয়দ আবুল হাসেম, চাঁদশীর পরিমল মন্ডল, গৈলার আলাউদ্দিন ওরফে আলা বক্স ও বাটাজোরের মোক্তার হোসেন। মুক্তিযোদ্ধাদের গুলিতে ওইদিন ৮ জন পাক সেনা নিহত হয়। এটাই ছিলো বরিশালসহ গোটা দক্ষিণাঞ্চলে স্থলপথে প্রথম যুদ্ধ এবং এরাই হচ্ছেন প্রথম শহীদ। পাক সেনারা গৌরনদীতে প্রবেশের দ্বার মুখ খাঞ্জাপুর নামকস্থানে মোস্তান নামক এক পাগলকে গুলি করে হত্যা করে। ২৫ এপ্রিল মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে ৮ জন পাকসেনা নিহত হবার পর তারা ক্ষিপ্ত হয়ে এলোপাথাড়ি গুলি ছুঁড়তে থাকে। ওই নরপশুদের গুলিতে সেইদিন দু’শতাধিক নিরীহ গ্রামবাসী মারা যায়। হানাদাররা গৌরনদী বন্দরসহ পার্শ্ববর্তী এলাকার শত শত ঘর বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করেছিলো। মে মাসের প্রথম দিকে পাকবাহিনী গৌরনদী কলেজে স্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করে। ক্যাম্পে ছিল আড়াই শতাধিক সৈন্য ও স্থানীয় অর্ধশত রাজাকার-আলবদর। গৌরনদীর বাটাজোর, ভুরঘাটা, মাহিলাড়া, আশোকাঠী, কসবাসহ প্রতিটি ব্রিজে পাক মিলিটারিদের ব্যাংকার ছিলও। উত্তরে ভুরঘাটা, দক্ষিণে উজিরপুরের শিকারপুর, পশ্চিমে আগৈলঝাড়ার পয়সারহাট, পূর্বে মুলাদী পর্যন্ত গৌরনদী কলেজ ক্যাম্পের পাক সেনাদের নিয়ন্ত্রণে ছিলো। তাদের দোসর ছিলো এলাকার রাজাকার, আলবদর ও পিচ কমিটির সদস্যরা। হত্যাকাণ্ড, লুটতরাজ, নারী ধর্ষণসহ নানা কাজে এরা পাকসেনাদের সহযোগিতা করতো। পাক সেনারা গৌরনদী কলেজের উত্তর পার্শ্বে একটি কূপ তৈরি করে সেখানে লাশ ফেলতো। কলেজের উত্তর পার্শ্বে হাতেম পিয়নের বাড়ির খালপাড়ের ঘাটলায় মানুষ জবাই করে খালের পানিতে শত শত লাশ ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে। পাক সেনারা গৌরনদী গার্লস হাইস্কুলের পার্শ্ববর্তী পুল ও গয়নাঘাটা ব্রিজের ওপর বসে শত শত লোক ধরে এনে হত্যা করে লাশগুলো খালে ফেলতো।

সর্বশেষ গৌরনদী কলেজে পাক সেনাদের ক্যাম্পে মুজিব বাহিনী ও নিজাম বাহিনী যৌথ আক্রমণ চালিয়েছিলো। কলেজের পশ্চিম দিক থেকে মুজিব বাহিনী ও পূর্বদিক থেকে নিজাম বাহিনী আক্রমণ করে। দীর্ঘ ২৮ দিন যুদ্ধের পর পাক সেনারা পরাস্ত হয়। একপর্যায়ে ওই বছরের (১৯৭১ সনের) ২২ ডিসেম্বর গৌরনদী কলেজে অবস্থানরত পাক সেনারা মিত্র বাহিনীর মেজর ডিসি দাসের মাধ্যমে মুক্তিবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে।

আমাদের জাতীয় চাওয়া পাওয়ার পাশাপাশি স্বাধীনতার ৪৩ বছর পূর্তিতে স্থানীয়ভাবে আমার প্রত্যাশা আমরা  চাই হানাহানি মুক্ত গৌরনদী, দূর্বৃত্তায়ন মুক্ত সহাবস্থানের রাজনীতি, আমরা চাই দল, মত, গোত্র, বর্ণ, মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টানসহ সকল সম্প্রদায়ের সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি।  যেখানে থাকবে না সন্ত্রাস ও নৈরাজ্য। রাজনৈতিক পরিচয় নয়, ন্যায় ও মানবতাই সব কিছুর ঊর্ধ্বে থাকবে। সামাজিক বন্ধন অটুট রেখে আমরা গৌরনদীর উন্নয়নে ঐক্যবদ্ধ হবো। এ প্রত্যাশা পূরণে আগামি পথ চলায় আমরা সবাই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে গড়ে তুলবো শান্তিময় সুন্দর গৌরনদী।

লেখক: জহুরুল ইসলাম জহির, সাবেক সভাপতি, গৌরনদী প্রেসক্লাব ও সাবেক চেয়ারম্যান গৌরনদী বিআরডিবি।


ফেসবুকে মন্তব্য করুন :

টি মন্তব্য
মন্তব্যে প্রকাশিত যেকোন কথা মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। Gournadi.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের কোন মিল নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে Gournadi.com কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নিবে না

আরো পোষ্ট...

Leave a Reply