বরিশাল

যানজটে বেসামাল, বরিশাল এখন দূর্ভোগের নগরী

তন্ময় তপু ॥ বরিশালের নাগরিক জীবনে বিড়ম্বনার আরেক নাম যানজট। এ যানজটের আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়েন নগরবাসী। সীমাহীন এ ভোগান্তি থেকে কিছুতেই রেহাই মিলছে না। প্রতিদিন নষ্ট হচ্ছে বরিশাল শহরবাসীর মূল্যবান কর্মঘন্টা। নাভিশ্বাস উঠেছে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীসহ সব পেশার মানুষদের। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে থমকে দাড়িয়েছে সাধারণ জীবনযাত্রা। বরিশালের নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, এ যানজটের কারণে জন মানুষের মূল্যবান সময় নষ্ট তো হচ্ছেই। কিন্তু এক রকম নির্বিকার কর্তৃপক্ষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অদ্যাবধি নেয়া হয়নি কোন কার্যকর পদক্ষেপ। প্রতি রমজানের শুরু থেকে প্রায় প্রতিদিনই বরিশাল নগরী জুড়ে শুরু হয় অসহনীয় এবং ভয়াবহ যানজট। এর ধারাবাহিকতায় চলতি বছরও দেখা গেছে একই চিত্র।

বরিশালের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল নথুল্লাবাদ থেকে শুরু করে নগরীর প্রাণকেন্দ্র পর্যন্ত ভরা থাকে যানবাহনে। বিশেষ করে ব্যাটারীচালিত অটোরিক্সাগুলোর কারণে বেশী যানজট বলে জানিয়েছেন অনেকে। নগরীর রাজপথ থেকে শুরু করে আশ পাশের সড়কগুলোতেও এখন শুধু যানজট আর যানজট। সবমিলিয়ে যানজটে প্রাণ যায় যায় অবস্থা নগরবাসীর। বছরের অন্যান্য সময়ের চেয়ে রমজানে ভ্রাম্যমান মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া এবং যানবাহনের অতিরিক্ত চাপকে দায়ী করছে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ। বিএমপি’র ট্রাফিক বিভাগের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ঈদকে সামনে রেখে নগরীতে অবৈধ অটোরিক্সা ঢুকে পড়া, যত্রতত্র রাস্তাঘাট খোড়াখুড়ি, ভ্রাম্যমান দোকানপাট বেড়ে যাওয়াসহ বেশ কয়েকটি কারণ যানজটের সৃষ্টি হয়।

বরিশাল মেট্রোপলিটন এলাকায় কয়েক লক্ষাধিক মানুষ স্থায়ী ভাবে বসবাস করেন। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বরিশাল মহানগরীতে প্রায় ১৫ হাজারের বেশী রিক্সা ও অটো রিক্সা চলাচল করে। যার মধ্যে অবৈধ অটোরিক্সাই রয়েছে প্রায় ১হাজার ৭’শ। এগুলো বিএমপি’র ট্রাফিক বিভাগের টোকেন সিস্টেমে চলে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে তার কোন প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। এসব যানবাহনের কারণে নগরবাসীর নিত্যসঙ্গী থাকে যানজট। তবে প্রতিবছর মরার উপর খাঁড়ার ঘা’র এর মত রমজান এলেই অতিরিক্ত আরো অন্তত কয়েক’শ বিভিন্ন ধরনের গাড়ী শহরে প্রবেশ করে। আশপাশের উপজেলা থেকে এসে বরিশাল নগরীতে যোগ হয় অতিরিক্ত কয়েক’শ রিক্সা। মৌসুমী এসব যানবাহন ও রিক্সা চালকদের বেশিরভাগেরই ট্রাফিক আইন সম্পর্কে ধারণা থাকে না। ফলে যত্রতত্র যানবাহন দাড় করিয়ে যানজট সৃষ্টি করে থাকেন। এর বাইরে যানজটের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা দেয় ঈদ মার্কেট কেন্দ্রিক যানজট। গৃহীনিসহ যারা মাসের খুব কম সময় ঘরের বাইরে বের হন, ঈদ সামনে রেখে তারা পুরো মাস ব্যস্ত থাকে কেনাকাটায়। এতে নগরজুড়ে যোগ হয় বাড়তি চাপ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ঈদুল ফিতরের আগে রমজানের শুরুতে বরিশালের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষ বরিশাল নগরীতে আসেন। এদের কেউ কেউ আসেন ঈদকে সামনে রেখে ছোটখাটো ব্যবসা করে বাড়তি কিছু আয় রোজগার করতে। বিশাল এ সংখ্যার লোকজন পুরো মাসজুড়ে নগরীর বিভিন্ন ফুটপাতসহ যত্রতত্র ভ্রাম্যমান দোকান খুলে বসেন। অনেকে আসেন পুরো মাসজুড়ে ভিক্ষা বৃত্তি করতে। আবার অনেকে প্রত্যন্ত এলাকা থেকে বিভাগীয় শহরে আসেন প্রতিষ্ঠানের জন্য মালামাল কিনতে। সূত্র বলছে, অন্যান্য সময়ে বরিশাল বিভাগীয় শহরে যে পরিমান লোক প্রবেশ করে তার চেয়ে চারগুন লোক রমজান মাসজুড়ে প্রবেশ করে। এর বেশির ভাগ লোকজন নিজেদের ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানের মালামাল কেনাসহ অন্যান্য কারণে বরিশাল নগরীতে অবস্থান নেয়। বাড়তি এ চাপ সামলাতে অতিরিক্ত যানবাহন ও রিক্সা যোগ হয় নগরীতে।

তবে অন্যবারের চেয়ে এ বছর যানযট নিরসনে সর্বাত্মক চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন নগর ট্রাফিক প্রধান ( উপ পুলিশ কমিশনার) আবু সালেহ মোঃ রায়হান। বলেছেন যানযট নিয়ন্ত্রনে রাখতে ঈদ উপলক্ষে নগরীতে ৭০ জন ট্রাফিক পুলিশ সদস্য কাজ করছে। এছাড়া গুরুত্বপূর্ন স্থানে বসানো হচ্ছে চেক পোষ্ট। উদ্দেশ্য নগরীতে অবৈধ যানবাহন প্রবেশ বন্ধ করা এবং অনাকাংখিত ঘটনা এড়ানো। ট্রাফিক প্রধান বলেন কিছু দিন পর লঞ্চ ঘাট ও বাস টার্মিনালে ঘরমুখী যাত্রীদের চাপ বাড়তে শুরু করবে সে সময় এই দুই স্থানে যানযট নিরসনে বিশেষ ব্যবস্থা প্রয়োগ করা হবে। আর নগরীর গুরুত্বপূর্ন সড়কে প্রয়োজনে যানচলাচল শিথিল করা হবে। তবে নগরবাসী ও সংশ্লিষ্টদের ধারনা প্রতিবছরের মত এবারও ঈদে যানযট ভোগান্তিতে পড়তে হবে নগরবাসীকে।

শুধু মাত্র অটোরিক্সার কারণেই ভেস্তে যাবে যানযট নিয়ন্ত্রনে গ্রহন করা ট্রাফিক বিভাগের সকল কৌশল। কারণ যানবাহনের আধিক্য ও সড়ক অপ্রশস্ত থাকলে শুধু মাত্র কৌশলই পারে না কোন স্থানের যানযট নিয়ন্ত্রন করতে। তাই ঈদের আগেই নগরী থেকে অটো রিক্সা উচ্ছেদের দাবী জানিয়েছেন তারা।

সূত্র মতে, ৩০ জুন থেকে নগরীর ব্যাটারী চালিত অটো রিক্সা উচ্ছেদের খবরে আসন্ন ঈদে যানযট ভোগান্তি নিরসনের আভাস মিলেছিলো। কিন্তু কিছু দিন আগে নগর ট্রাফিক বিভাগ ও সিটি কর্পোরেশন যৌথ সভা করে উচ্ছেদের সময় পরিবর্তন করে ঈদের পর নির্ধারন করে। ফলে এই ঈদেও যানযটের ভোগান্তী থেকে মুক্তি পাচ্ছে না নগরবাসী ও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা মানুষেরা। কারন মূলত অটো রিক্সাই নগরীতে যানযট সৃষ্টির একমাত্র কারণ। ঈদের আর মাত্র দিন দশেক বাকি থাকলেও ইতিমধ্যেই নগরজুড়ে শুরু হয়ে গেছে ঈদ কেন্দ্রীক যানযটের চিরচেনা দৃশ্য। বিশেষ করে দিনের মধ্য ভাগে ও বিকেলে এবং সন্ধ্যার পরে তীব্র যানযট সৃষ্টি হচ্ছে নগরীর গুরুত্বপূর্ন সড়কগুলোতে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো থেকে জানা গেছে অর্ধযুগ পূর্বেও সাধারন দিন তো দূরের কথা ধর্মীয় উৎসবগুলোতেও নগরীতে যানজট তৈরী হতো না। এর একমাত্র কারণ হচ্ছে ওই সময়ে নগরীতে অটো রিক্সার আধিক্য ছিলো না।পরে ধীরে ধীরে নগরীতে অটোর আধিক্য বেড়ে যেতে শুরু করায় বাড়তে থাকে যানযট। বর্তমান সময়ে যা ব্যাপক আকার ধারন করেছে। অপর একটি সুত্র জানিয়েছে বরিশাল নগরীতে বর্তমান সময়ে যে ধরনের যানযট সৃষ্টি হচ্ছে তা নিয়ন্ত্রনে রাখা সম্ভব। ট্রাফিক বিভাগের কৌশল ও কর্তব্য পরায়নতা যানযট মুক্ত রাখতে পারে নগরীকে। তবে যান চলাচলে ধীর গতিসহ সামান্য যট তৈরী হলেও তা থাকবে সহনীয় পর্যায়ে।

পুলিশ সদর দফতরের প্রতিবেদন অনুযায়ী যে ১৯ কারণে যানজট বৃদ্ধি পায় সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- অপ্রশস্ত রাস্তা, যত্রতত্র রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং, রাস্তা ও ফুটপাত দখল করে হাট-বাজার, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ, দোকানপাট বসানো, রাস্তায় নির্মাণসামগ্রী রাখা, আবাসিক ও বাণিজ্যিক বহুতল ভবনে কারপার্কিং না থাকা, পার্কিং থাকলেও বন্ধ রাখা, রাস্তায় যত্রতত্র বাস, মিনিবাস ও অটোরিকশা থামিয়ে যাত্রী উঠানামা করা।

নগর পরিকল্পনাবিদরা যানজটের মূল কারণ হিসেবে রাজধানী ঢাকা অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠাকে দায়ী করা হয়েছে। সামসুল নামের বিএম কলেজ এলাকার এক স্থানীয় জানান, বরিশাল নগরীতে যানজট এখন অসহনীয় অবস্থায় চলে গেছে। আর এ থেকে রক্ষা পেতে বিএমপি’র ট্রাফিক বিভাগ ও বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের সমন্বয় দরকার।

এ বিষয়ে বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রনজিৎ কুমার দত্ত জানান, নগরীতে যানজটের প্রধান কারণ অটোরিক্সা সচল থাকার বিষয়ে হাইকোর্টে আবেদন করা হবে। আর হাইকোর্ট যা রায় দেয়া হবে তা অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

//দখিনের মুখ পত্রিকা//


ফেসবুকে মন্তব্য করুন :

টি মন্তব্য
মন্তব্যে প্রকাশিত যেকোন কথা মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। Gournadi.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের কোন মিল নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে Gournadi.com কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নিবে না

আরো পোষ্ট...

Leave a Reply