গৌরনদী সংবাদ

মাহিলাড়া-শরিফাবাদ-বিল্বগ্রামের সরকারি গাছ কেটে নিলো প্রভাবশালীরা

এইচ,এম মাকসুদ আলীঃ বরিশালের গৌরনদী উপজেলার মাহিলাড়া ইউনিয়নের মাহিলাড়া- ভায়া পশ্চিম শরিফাবাদ-বিল্বগ্রাম সড়কের দু’পাশের সরকারি গাছ কেটে নেয়ার মহোৎসব শুরু হয়েছে। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের নির্দ্দেশে সরকারি দলের স্থানীয় কতিপয় নেতাকর্মী ও কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি গাছ কেটে নিয়ে যাচ্ছেন। গাছ ব্যবসায়ীরা গত ৩ সপ্তাহে ৬০ লক্ষাধিক টাকার সরকারি গাছ কেটে নিয়ে গেছেন। শুধুমাত্র গাছ কেটেই তারা ক্ষান্ত হননি সড়কের দু’পাশের মাটি খুড়ে গাছের শিকর পর্যন্ত তুলে নিয়ে গেছে গাছ ব্যবসায়ীরা। ফলে ওই ৭ কিলোমিটার সড়কই এখন ঝুঁকিপূর্ন সড়কে পরিনত হয়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোন মাথা ব্যথা নেই।

বরিশাল এলজিইডি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ক্ষুদ্রাকার পানিসম্পদ উন্নয়ন সেক্টর প্রকল্পের অধীনে ২০০২-০৩ অর্থবছরে গৌরনদী উপজেলার মাহিলাড়া ইউনিয়নের মাহিলাড়া ডিগ্রি কলেজের পশ্চিম পাশ থেকে – ভায়া পশ্চিম শরিফাবাদ ও জঙ্গলপট্টি- বিল্বগ্রাম হাটের ব্রিজ পর্যন্ত ৭ কিলোমিটার ভেড়িবাঁধ সড়কের দু’পাশে সামাজিক বনায়ন করার আবেদন করেন মাহিলাড়া ইউনিয়ন পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতি। ২০০২ সালের জানুয়ারি মাসে সওজ কর্তৃপক্ষ আবেদনকারী সমিতির পরিচালনা কমিটির সাথে সামাজিক বনায়নের চুক্তি সম্পাদন করেন। চুক্তি সম্পদনের পর এর আওতায় এলজিইডি’র অর্থায়নে সমিতির উদ্যোগে ওই সড়কের দুই পাশে রেইনট্রি, মেহগনি, কড়ই, শিশু, রাজকড়ইসহ বিভিন্ন প্রজাতির ৭ সহস্রাধিক গাছের চারা রোপণ করেন। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী দ্বিতীয় পক্ষ শতকরা ৫৫ ভাগ উপসত্ব, রাজস্ব খাতে শতকরা ১০ ভাগ, এলজিইডি বিভাগ শতকরা ১০ ভাগ, জমির মালিক শতকরা ২০ ভাগ, ইউপি পরিষদ শতকরা ৫ ভাগ ভোগ করবেন।

মাহিলাড়া ইউনিয়ন পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতির সভাপতি ও সাবেক ইউপি সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আনোয়ার হোসেন রাঢ়ী বলেন, এ সমিতির আওতায় ৪০৫ জন সদস্য রয়েছে। যারা এই সামাজিক বনায়নের বড় অংশের মালিক। আমাদের না জানিয়ে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের নির্দ্দেশে উপজেলার বিল্বগ্রাম এলাকার আ’লীগ নেতা গোপী রায়, জীবন পাল, প্রেমা পাল, বিপ্লব পাল, সুকণ্ঠ পাল, সুশীল পাল, বড় জীবন পাল, রশিদ খান, সুজন নন্দীসহ ৩০-৩৫ জনে সম্প্রতি বিল্বগ্রাম-জঙ্গলপট্টি পর্যন্ত ৩ কিলোমিটার ভেড়িবাঁধ সড়কের ছোট-বড় সহস্রাধিক গাছ বিক্রি করে দেন। এছাড়া উপজেলার শরিফাবাদ, পশ্চিম শরিফাবাদ, মাহিলাড়া, জঙ্গলপট্টি এই চারটি গ্রামের শহিদুল ইসলাম, মহিউদ্দিন, মিজানুর রহমান, তপন কুমার, নাসির উদ্দিন, আঃ মান্নান মৃধা, আলাউদ্দিন, ওমর আলী, লাল মিয়া, এচাহাক হোসেনসহ ৩৫-৪০ জন ব্যক্তি সম্প্রতি মাহিলাড়া ডিগ্রি কলেজের পশ্চিম পাশ থেকে ভায়া শরিফাবাদ-জঙ্গলপট্টি পর্যন্ত ৪ কিলোমিটার ভেড়িবাঁধ সড়কের দু’পাশের সামাজিক বনায়নের ছোট-বড় দেড় সহস্রাধিক গাছ বিক্রি করে দেন। স্থানীয় গাছ ব্যবসায়ী মোঃ হাসান, মোঃ সুলতান, মোঃ জহিরুল ইসলাম, মোঃ তৈয়ব আলী, মোঃ দুলাল, মোঃ মহিউদ্দিন, আঃ জব্বার, মোঃ শাহিন সরদার, মোঃ মাহাবুল হক, মেরাজ উদ্দিনসহ ২০-২৫ জনে ওই সড়কের গাছগুলো খরিদ করেন। গাছ ক্রেতারা গত ৩ সপ্তাহ ধরে গাছ কাটা শ্রমিক দিয়ে গাছগুলো কেটে নিয়ে যাচ্ছেন। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান সৈকত গুহ পিকলু গাছ বিক্রেতাদের কাছ থেকে ইউনিয়ন পরিষদের কথা বলে মোটা অংকের টাকা নিজের পকেটস্থ করেছেন বলে আনোয়ার রাঢ়ী অভিযোগ করেন।

মাহিলাড়া ইউপি চেয়ারম্যান পিকলু তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আনোয়ার রাঢ়ীর সাথে আমার ব্যক্তিগত বিরোধ রয়েছে। তিনি আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ রটাচ্ছেন। আমি কারো কাছ থেকে গাছ বিক্রির টাকা নেইনি ও ৭৪পিস কাটা গাছ জব্দ করেছি এবং গাছ কাটা বন্ধ করে দিয়েছি।

Exif_JPEG_420
Exif_JPEG_420

সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার বিল্বগ্রাম হাট ব্রিজ থেকে দক্ষিণে জঙ্গলপট্টি মাদ্রাসা পর্যন্ত সড়কের দু”পাশে সারি সারি গাছের গোড়া পড়ে আছে। এক কিলোমিটার সড়কে গোড়া গুনে দেখা যায়, ছোট-বড় ৩৮০টি গাছ কেটে নেওয়া হয়েছে। এছাড়া মহিলাড়া ডিগ্রি কলেজের পশ্চিম পাশ থেকে ভায়া পশ্চিম শরিফাবাদ হয়ে জঙ্গলপট্টি পর্যন্ত সড়কের দু’পাশে অনুরূপ ভাবে গাছ কেটে নিয়ে যাচ্ছে।

উপজেলা প্রশাসনের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে বিল্বগ্রাম এলাকার মেহেদী হাসান, কহিনুর বেগম, শরিফাবাদ গ্রামের মোঃ মনির হোসেন, শরিফাবাদ গ্রামের আরিফ হোসেনসহ কয়েকজনে বলেন, গত কয়েক দিন ধরে গাছ ব্যবসায়ীরা গাছ কাটা শ্রমিক দিয়ে নির্বিচারে গাছগুলো কাটছেন। এরপর গাছ ব্যবসায়ীরা খালে ট্রলার ভিড়িয়ে গাছগুলো অন্যত্র নিয়ে যাচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি জানলেও তাদের কোন মাথা ব্যথা নেই।

সরকারি গাছ বিক্রির অভিযোগ অস্বীকার করে গাছ বিক্রেতা স্থানীয় সুকন্ঠ পাল, রশিদ খান, আঃ মান্নান মৃধা, মিজানুর রহমান, নাসির উদ্দিন, মোঃ লাল মিয়া বলেন, আমাদের পৈতৃক সম্পত্তির ভেতর দিয়ে যাওয়া ভেড়িবাঁধ সড়কের পাশে লাগানো গাছ বিক্রি করেছি। দু’টি সড়কের পাশের এলাকার অনেকেই তাদের জমির পাশের সড়কের গাছ বিক্রি করেছেন। ক্রেতারা সেগুলো কেটে নিয়ে গেছেন। কেউ তাতে বাধা দেয়নি। তাই যার যার জমির পাশের গাছ তারাই বিক্রি করেছি। গাছ বিক্রির কোন টাকা ইউপি চেয়ারম্যানকে দেয়নি বলে গাছ বিক্রেতারা জানান।
গাছ ব্যবসায়ী মোঃ হাসান, মোঃ সুলতান আহম্মেদ বলেন, সড়কের পাশের জমির মালিকেরা নিজেদের গাছ দাবি করে বিক্রি করে দিয়েছেন। অনেক গাছ ব্যবসায়ীই সড়কের গাছ কিনেছে। দাম কম হওয়ায় অধিক মুনাফার আশায় আমরাও কিছু গাছ কিনেছি।

গৌরনদী উপজেলা বন বিভাগের কর্মকর্তা মনীন্দ্রনাথ হালদার বলেন, সড়কের গাছ কেটে নেওয়ার বিষয়ে আমরা কিছুই জানি না। কেউই কোনো অভিযোগও দেয়নি।

উপজেলা পরিবেশ ও বন উন্নয়ন কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ মাহাবুব আলম বলেন, কমিটির অনুমোদন ছাড়া সামাজিক বনায়নের গাছ কাটা অবৈধ। এ ব্যাপারে উপজেলা বন বিভাগের কর্মকর্তা মনীন্দ্রনাথ হালদারকে বিষয়টি খতিয়ে দেখে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার নির্দ্দেশ দিয়েছি।

আরও সংবাদ...

Leave a Reply

Back to top button