মুক্তিযুদ্ধ

চারদিকে আগুন দিলে সবাই ছোটাছুঁটি করছিল, ফিরে দেখি সব শেষ’

স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরও বরিশালের গৌরনদী উপজেলার রীরঙ্গনা বিভা রানী মজুমদার (৬১) মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পায়নি। ১৯৭১ সালের বীরঙ্গনা বিভা রানী আজ সংসারের চাকা সচল রাখতে মাঝে মধ্যে তাকে ধাত্রীর কাজ করতে হয়।

জীবনযুদ্ধে প্রতিবন্ধী সন্তান সাগর মজুমদার (২৮)কে নিয়ে তার আরেক সংগ্রাম। বীরাঙ্গনাকে নিয়ে ঘর করতে রাজি না হওয়ায় স্বামীও তাকে ত্যাগ করেছে। আর জীবনযুদ্ধের কঠিন বাস্তবতায় বৃদ্ধা বিভা রানী সন্তানকে নিয়ে সাগরে ভাসছেন। তিনি বলেন, সাগরকে নিয়ে আজ আমি সাগরে ভাসতাছি।

বরিশালের গৌরনদী উপজেলার টরকী চর এলাকায় বাবা উমেশ চন্দ্র মন্ডলের সাড়ে চার শতক জমিতে টিনের ঘর। এ টিনের ঘরেই একমাত্র ভাই উপেন্দ্র নাথ মন্ডলকে নিয়ে বিভা রানী মজুমদার সেলাই মেশিন চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ আসতেই বিভা রানী অনেকটা আনমনা হয়ে যান। বলতে থাকেন, আমার বাবা টরকীচরে বহুদিন ধরে বসবাস করেছেন। উনি ক্ষুদ্র ব্যবসা করতেন। এখানে আমরা ৪ বোন ও ১ ভাই ছিলাম। ১৯৭১ সালে আমি টরকী হাইস্কুলে অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী ছিলাম। জ্যৈষ্ঠ মাসে এখানে পাকিস্তানী মিলিটারীদের নিয়ে আসে স্থানীয় রাজাকাররা। চারিদিকে আগুন দিতে শুরু করে। লোকজন যে যেদিক পারে ছোটাছুঁটি করছিল।

আমার বাবা তখন পর্যন্ত বাড়িতে অবস্থান করেন। এমন সময় সবাই বাবাকে স্থান ত্যাগ করতে বললে বাবা আমাদের নিয়ে কালকিনির রমজানপুরের দিকে ছুটলেন। কিন্তু তখন আমরা দিকদ্বিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছিলাম। আমিসহ কয়েকজন আখক্ষেতের মাঠে রাজাকারদের হাতে ধরা পড়ে যাই। সেদিন ওদের হাত থেকে আমরা কেউ রেহাই পাইনি।

পরবর্তীতে আমাদেরকে বাবা খুঁজে ঘরে নিয়ে আসে। বাড়ি ফিরে দেখি সব শেষ। একমাত্র আমার চাচাদের বসত ঘরটি ব্যতিত আমাদের বাড়ির ১৪টি ঘর পাকিস্তানী হানাদাররা সম্পূর্ণ পুড়িয়ে দিয়েছে। বাবা দ্রুত শ্রাবন মাসে একই গ্রামের অনুকুল মজুমদার নামের একজনের সাথে আমার বিয়ে দেন। পরবর্তীতে আমরা দুটি পরিবারের ১০ জন টরকী থেকে নৌকাযোগে আটদিন পর ভারতে গিয়ে পৌঁছি। দেশ স্বাধীনের পর সবাই আবার দেশে ফিরে আসি। দেশে ফিরে আমার স্বামী যুদ্ধচলাকালীন সময়ে আমার ওপর রাজাকারদের নির্যাতনের কাহিনী জানতে পেরে হঠাৎ কিছু না জানিয়ে উধাও হয়ে যায়। পরবর্তীতে ছেলে সাগর জন্মাবার চার মাস পর (১৯৮৮ সালে) পূর্ণরায় ফিরে এসে আমাকে সে ত্যাগ করে ভারতে চলে যান। সেই থেকে আজ পর্যন্ত প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়ে কোন রকম বেঁচে আছি।

তিনি আরও বলেন, আমি আগে তাঁতে লুঙ্গি বুনতাম। ছোটবেলা থেকেই সেলাইয়ের কাজ করতাম। তাই এখন অর্ডারে কাপর-চোপর সেলাই করে জীবিকা নির্বাহ করছি। মাঝখানে স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবেও আমি ১০ বছর কাজ করেছি। যে কারণে আমাকে আসে পাশে ধাত্রীর কাজও করতে হয়। তখন বীরঙ্গনার বিষয়টি এলাকাবাসী জানলেও আমার অবিবাহিত বোনদের ও ছেলের সম্মানহানির জন্য লোকলজ্জায় বীরঙ্গনার ঘটনাটি স্থানীয় ৩/৪ জন মুক্তিযোদ্ধা ছাড়া কারও কাছে বলিনি।

ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, যুদ্ধের সময়ে সম্ভ্রম হারানোর কারণে আমার সংসার জীবন ভেঙ্গে গেছে। আমি বীরঙ্গনা হয়েও স্বাথীনতার ৪৫ বছর পরও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাইনি। সরকারি ভাবে আমি কোন সাহায্য সহযোগীতা পাইনি। এমনকি আমাদের কোন তালিকাও করা হয়নি। অথচ আমার জীবন কাহিনী স্থানীয় সকল মুক্তিযোদ্ধারা জানেন।

উপজেলার বার্থী ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার আলহ্বাজ আবদুল হালিম সরদার বলেন, বিভা রানী মজুমদার স্বীকৃতি পেতে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের এখন পর্যন্ত আবেদন করেননি। আবেদন করলে যাচাই বাছাই করে কেন্দ্র সুপারিশ পাঠানো হবে।


ফেসবুকে মন্তব্য করুন :

টি মন্তব্য
মন্তব্যে প্রকাশিত যেকোন কথা মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। Gournadi.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের কোন মিল নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে Gournadi.com কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নিবে না

Leave a Reply