উন্নয়ন সমুন্নয়ের গোলটেবিল বৈঠকে ॥ ধূমপান কমাতে-বাজেটে অতিরিক্ত কর আরোপের দাবি
ধূমপান কমানোর জন্য তামাকজাত পণ্যের ওপর করারোপের দাবি জানিয়েছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন সমুন্নয়। গতকাল রাজধানীর শেরাটন হোটেলে বাজেটে তামাকের ওপর কর আরোপ প্রসঙ্গে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এ দাবি জানান। কর আরোপের পাশাপাশি বক্তারা সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. জুলফিকার আলী এবং বিআইআইএসএসের রিসার্চ ফেলো ড. মাহফুজ কবির গোলটেবিল বৈঠকে মূল প্রবন্ধে বলেন, বাংলাদেশে তামাক ব্যবহারের কারণে প্রতিবছর ৫৭ হাজার মানুষ মারা যায়। এ ছাড়া প্রায় চার লাখ লোক পঙ্গুত্ব বরণ করে। বর্তমানে দেশের ৪৩ দশমিক ৩ শতাংশ লোক তামাক সেবন করে। এর মধ্যে ৫৮ শতাংশ পুরুষ এবং ২৮ দশমিক ৭ শতাংশ নারী। এসব বিষয় বিবেচনায় রেখে আসন্ন বাজেটে সিগারেটের ওপর ৭৯ শতাংশ এবং বিড়ির ওপর ২৬ শতাংশ হারে কর বৃদ্ধি প্রয়োজন বলে তাঁরা মত ব্যক্ত করেন।
বিড়ি-সিগারেটের ওপর অতিরিক্ত করারোপের ফলে বছরে ৯৬ থেকে ১৩৯ কোটি শলাকা সিগারেট কম ব্যবহার হবে এবং সরকার ৯০৩ কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব পাবে। আর বিড়ির ব্যবহার কমবে ১৬৮ কোটি শলাকা এবং রাজস্ব আয় হবে ৬৮ কোটি টাকা। এ ছাড়া ব্যবহার কমানোর জন্যও বিড়ির প্রতি প্যাকেটের ওপর ২ টাকা হারে করারোপেরও পরামর্শ দেন তাঁরা। আলোচনায় অংশ নিয়ে সংসদে অর্থ মন্ত্রণালয়সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি আ হ ম মোস্তফা কামাল বলেন, তামাকের ব্যবহার কমানোর জন্য স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি ড. আবুল বারকাত বলেন, বর্তমানে দেশের পাঁচ কোটি মানুষ ১০ হাজার কোটি শলাকার ওপর বিড়ি-সিগারেট ব্যবহার করছে। ফলে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে।
আর এসব তামাকজাত পণ্য থেকে সরকার রাজস্ব পাচ্ছে মাত্র তিন হাজার কোটি টাকা। ফলে বাংলাদেশের সার্বিক ক্ষতির পরিমাণ আট হাজার কোটি টাকা। তামাকের ওপর করারোপে রাজস্ব আয় বাড়লেও ব্যবহার খুব বেশি কমবে না মন্তব্য করে তিনি বলেন, স্বল্পমেয়াদে ৩৩ শতাংশ দাম বাড়ালে ১৪ শতাংশ ব্যবহার কমবে এবং ৫৩ শতাংশ রাজস্ব বাড়বে। সেই সঙ্গে আগামী ৪০ বছরে ২০ লাখ লোক অকাল মৃত্যু থেকে রক্ষা পাবে। ধূমপানের ব্যবহার কমানোর জন্য তিনি তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন জোরদার, নাগরিক সমাজকে সোচ্চার এবং পাঠ্যপুস্তকে ধূমপানের কুফল অন্তর্ভুক্ত করার পরামর্শ দেন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান বদিউর রহমান বলেন, রাজস্ব আয় বড় বিষয় না। সামাজিকভাবে মোকাবিলা করে তামাকের ব্যবহার কমাতে হবে। আর সরকার কি চায় তার ওপরই নির্ভর করছে তামাকের ওপর কর আরোপ হবে কি হবে না। দাম বাড়ালে সিগারেটের ব্যবহার আরো বাড়বে জানিয়ে তিনি বলেন, সিগারেট তখন ধনীদের খাবারে পরিণত হবে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ইসমাঈল হোসেন বলেন, সিগারেট শিল্প থাকবে কি থাকবে না তা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিকভাবে দেখতে হবে। তামাকের ওপর কর বসানোর বিরোধিতা করে সংসদ সদস্য ননী গোপাল মণ্ডল বলেন, ‘আমাদের দেশে যেখানে ৭০ শতাংশ ভোটার তামাক সেবন করে তাদের ভোটে নির্বাচিত হয়ে তাদের ওপর করের বোঝা চাপানো ঠিক হবে না। আর তামকের ওপর কর কতটুকু সফল তা ভাবতে হবে। তামাকের ওপর কর না বাড়িয়ে আমাদের সামাজিক পরিবেশের ওপর নজর দিতে হবে।’ আগামী ২০১০-২০১১ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে তামাকের ওপর অতিরিক্ত কর বসানো হচ্ছে। সংসদের অর্থমন্ত্রনালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি আহম মোস্তফা কামাল বলেন, যারা এখনও ধুমপান করেনা তাদের সচেতন করতে হবে।