কুয়াকাটা সাগর সৈকতের মরা ঝিনুক ওদের বাঁচিয়ে রেখেছে
কুয়াকাটার বিশাল সাগর সৈকত এবং চরে ভেসে আসা মরা ঝিনুক কুড়িয়ে বেঁচে আছে সেখানকার হতদরিদ্র সহস্রাধিক পরিবার। ব্যবসায়ীরা প্রতিদিন কমপক্ষে ১০ টন করে ঝিনুক দেশের পোল্ট্রি ফার্মগুলোতে বিক্রি করছেন। তাদের এ ব্যবসা চলে আসছে বছরের পর বছর। প্রতি বছর ভাদ্র থেকে কার্তিক মাস পর্যন্ত কুয়াকাটার অর্ধশত বর্গকিলোমিটার এলাকার সাগরের পাড়ে ভেসে আসে মরা ঝিনুক। প্রতিদিন প্রত্যুষে কুয়াকাটার লতাচাপালী ও ধুলাসর ইউনিয়নে ৩৬ কিলোমিটার এবং বরগুনার তালতলী, আশারচর, ফাতরার চরের ১৫ কিলোমিটার এলাকায় সহস্রাধিক শ্রমিক দিনভর ঝিনুক কুড়ানোর কাজে ব্যস্ত সময় কাটান। একটি, দু’টি করে প্রতিদিন ১০ টন ঝিনুক কুড়ানো হয় সাগর সৈকত কুয়াকাটার বিভিন্ন চরাঞ্চল এবং বীচ থেকে।
পুরুষের চেয়ে মহিলারাই ঝিনুক কুড়ানোর কাজ করেন বেশি। প্রতিদিন ১৫০ টাকা করে প্রতি শ্রমিককে মজুরি দেয়া হয়। এমনিতে অন্যান্য কাজে মজুরির হার বেশি। তবে ঝিনুক সংগ্রহের মৌসুম শুরু হলে এলাকার গরিব মানুষ, বিশেষ করে নারীরা ২০-৩০ জনের একটি গ্রুপ ঝিনুক কুড়ানোর কাজ শুরু করেন। আর এ জন্য তারা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আগাম কিছু অর্থ বা দাদন নেয়। ফলে
তাদের মজুরির পরিমাণ কমে যায়। দাদনের টাকা প্রতিদিন শ্রমিকদের কাছ থেকে কেটে রাখা হয়। দাদন নেয়ার সুযোগে শ্রমিকদের সত্যিকারের মজুরি দৈনিক ২৫০/৩০০ টাকা হলেও তারা তা দেন না বলে একাধিক শ্রমিক অভিযোগ করেন। কুড়ানো মজুরি যেমন মেলে ব্যবসায়ীর কাছ থেকেই তেমনি আবার অনেক ব্যবসায়ী ঝিনুক কিনেও থাকেন ঝিনুক কুড়ানিদের কাছ থেকে। এজন্য দাম দেয়া হয় বস্তাপ্রতি ৫০ টাকা করে। ওই একই বস্তা ব্যবসায়ীরা দেশের বিভিন্ন পোল্ট্রি ফার্মে মুরগির খাবার তৈরির জন্য বিক্রি করেন ১’শ টাকা করে। ঝিনুক ব্যবসায়ীরা একজোট হয়ে কাজ করে মজুরি নিয়ন্ত্রণ করেন। ফলে ব্যবসায়ীরা তারা যা দেয় তাই নিয়েই শ্রমিকদের সন্তুষ্ট থাকতে হয়।
কুয়াকাটা সাগরের জন্ম থেকেই এভাবে মরা ঝিনুক তীরে ও চরাঞ্চলে জমা হলেও তা সেভাবেই পড়ে থাকত। এরমধ্য থেকে কিছু ঝিনুক দিয়ে গলার মালা থেকে শুরু করে বিভিন্ন গহনা তৈরি করা হতো পর্যটকদের কাছে বিক্রি করার জন্য। গত ৫ বছর ধরে কুয়াকাটা সাগর সৈকত এবং চরাঞ্চল থেকে শুরু হয় ভেসে আসা ঝিনুক সংগ্রহ করার কাজ। পোল্ট্রি ফার্মে-এর চাহিদা থাকায় এক শ্রেণীর ব্যবসায়ীরা তা সংগ্রহ করে দেশের বিভিন্ন পোল্ট্রি ফার্মে উচ্চ মূল্যে সরবরাহ করে আসছে। এভাবে এক-দু’জন করে বর্তমানে অর্ধশতাধিক ব্যবসায়ী এ ব্যবসার সাথে জড়িত রয়েছেন।
ব্যবসায়ীরা সরকারকে তাদের ঝিনুক ব্যবসার জন্য কোনো রাজস্ব দেয় না। একটি সূত্রে জানা গেছে, কুয়াকাটার একটি প্রভাবশালী মহল এবং বন বিভাগ কর্মকর্তাদের যোগসাজসে ঝিনুকের ব্যবসা চলছে। বন বিভাগ কর্মকর্তারা কিছু টুপাইস কামিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযাগ করা হলেও বন বিভাগের খাজুরা বিটের কর্মকর্তারা বলেছেন, এই মরা ঝিনুকের বেচাকেনার সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আকন মোস্তফা জামান জানান, মরা ঝিনুক সংগ্রহে পরিবেশের উপর তেমন একটা প্রভাব পড়ে না। গভীর সমুদ্রে গবেষণাকারী বেসরকারি সংস্থা সেন্টার ফর ন্যাচারাল রিসোর্স স্টাডিজ (সিএনআরএস) এর কর্মকর্তা মোস্তফা রহমান জানান, সমুদ্র সৈকতের সৌন্দর্য রক্ষার জন্য ভাটার সময় বীচের ওয়াটার লেভেল থেকে ১৫/৩০ ফুট প্রশস্ত বেলাভূমি থেকে ঝিনুক সংগ্রহ না করলেই ভালো হয়। কারন ওটা বেলাভূমি ক্ষয়রোধে ভূমিকা রাখে।