সিডরে ক্ষতিগ্রস্থদের জন্য ॥ ইউএনডিপি’র অর্থায়নে গৃহ নির্মান কাজে ব্যাপক অনিয়ম ও দূর্নীতির অভিযোগ
সিডরে ক্ষতিগ্রস্থ দরিদ্র গৃহহীন মানুষকে গৃহ নির্মান করে দেয়ার জন্য ইউনাইটেড ন্যাশন ডেভলপমেন্ট প্রোগ্রাম (ইউ.এন.ডি.পি) কর্মসূচী গ্রহন করা হয়। এ প্রকল্পের আওতায় বরিশালের উজিরপুর উপজেলার সাতলা ও জল্লা ইউনিয়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য বেসরকারী সংস্থা ভোসডকে দায়িত্ব প্রদান করা হয়। সংস্থা ভোসডের বিরুদ্ধে ঘর নির্মানে নিন্মমানের উপকরন ব্যাবহার, কেরিংয়ের টাকা প্রদান না করাসহ বিভিন্ন দূর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব অনিয়ম ও দূর্নীতির মাধ্যমে ওই সংস্থা হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা।
সংশিষ্ট দপ্তর, স্থানীয় লোকজন ও ঘর পাওয়া দরিদ্র লোকজনের অভিযোগে জানা গেছে, ইউ.এন.ডি.পি বরিশালের উজিরপুর উপজেলার সাতলা ইউনিয়নে ৩ শত ২৬ টি ও জল্লা ইউনিয়নে ৪ শত ৩৭ টি ঘর নির্মান করে দেয়ার জন্য ২০০৯ সালের অক্টোবর মাসে ভোসডের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়। প্রতিটি ঘরের জন্য ১ লক্ষ ১৬ হাজার টাকা বরাদ্ধ করে ৭ শত ৬৩ টি ঘরের জন্য ইউ.এন.ডি.পি ভোসডকে ৮ কোটি ৮৫ লাক্ষ ৮হাজার টাকার কার্যাদেশ প্রদান করে। উজিরপুর উপজেলার বিলগাব বাড়ি গ্রামের বুদ্বেশ্বর দাসের স্ত্রী সাবিত্রী (৪০) জানান, সিডরে তার বসত ঘরটি সম্পূর্ন নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ায় আশ্রয়হীন হয়ে পড়ে। তিনি বলেন, আমাকে একটি ঘর দেয়া হয় কিন্তু ঘরটি তেরী করতে যে ইট কাট ব্যাবহার করা হয় তা খুবই খারাপ। নির্ধারিত সিমিন্ডের চেয়ে অনেক কম সিমেন্ড দেয়া হয়। ঘরের ছাউনির অবস্থা আরো খারাপ, ঘর নির্মানের পর এক মাস যেতে না যেতেই ঘরে বৃষ্টির পানি পরে। একইভাবে অভিযোগ করেন, উপজেলার জল্লা গ্রামের দিনমজুর মোঃ সহিদুল ইসলাম (৪৫) ভরত চন্দ্র বাড়ৈর পুত্র ভরেশ বাড়ৈ, লক্ষী বাড়ৈর পুত্র রবিন্দ্র বাড়ৈ (৫৫)
ভাউদার গ্রামের লাল মোহন হালদারের পুত্র রিমতি। বুদ্বেশ্বর দাসের স্ত্রী সাবিত্রী (৪০) বলেন, মোগো গরীবের কপাল লগে লগে যায়, সিডর মোগো ঘর দুয়ার লইয়া গ্যাছে। এই ঘর পাইয়া আশা করছিলাম মোগো মাথা গোজার ঠাই হইছে। এহন দেহি হেইডাও অয় নাই, ঘর দিয়া পানি পরে। সাতলা ইউনিয়নের সাতলা গ্রামের কার্তিক মন্ডলের স্ত্রী পারুল মন্ডল (৪৫), একই গ্রামের বিজয় মন্ডল (৩৫), পশ্চিম সাতলা গ্রামের অমল কুমারের স্ত্রী লক্ষী রানী (৩৮), শিবপুর গ্রামের আক্কেল হাওলাদারের স্ত্রী সেফালী বেগম (৪০), আজাহার বক্তিয়ারের পুত্র হালিম বক্তিয়ার (৪৫) সহ প্রায় সকলেই অভিযোগ করেন ঘর নির্মানের জন্য ইট, বালু, সিমেন্ট, টিন, কাটসহ যাবতীয় মালামাল প্রকল্প স্থানে পৌছে দিয়ে পূনাঙ্গভাবে ঘরটি ভোসডের তৈরী করে দেয়ার কথা ছিল, কিন্তু ঘর পাওয়া প্রতিটি পরিবারকে মালামাল পরিবহন (কেরিং) খরচ পরিশোধ করতে হয়েছে। তারা আরো অভিযোগ করেন, সাতলা এলাকার ভোসডের মাঠকর্মী মোঃ মিন্টু মিয়াকে পরিবহন খরচ ছাড়াও নগদ টাকা দিতে হয়েছে। ভোসডের লোকজন প্রতিটি পরিবারের কাছ থেকে ৫/৭ হাজার টাকা খরচ বাবদ আদায় করেন। স্থানীয়রা জানান, ঘর নির্মানকারী সংস্থা ভোসড শুধুমাত্র কেরিং খরচ দেখিয়েই ৫০ লাক্ষ হাতিয়ে নিয়েছে। জল্লা ইউনিয়নের ৬ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য গৌতম চন্দ্র (৪৫) এ প্রসংঙ্গে বলেন, গৃহ নির্মান কাজের সামগ্রী ও মান খুবই নিন্মমানের। স্থানীয় লোকজন একাধিকবার কাজের মাঠ পর্যায়ে তদারকি কাজে নিয়োজিত ফিল্ড সুপারভাইজার আব্দুর রহিমকে নিন্মমানের সামগ্রী ব্যবহারে বাঁধা প্রদান করলেও তা উপেক্ষা করে তিনি নিন্মমানের কাজ করেছে। ঘর পাওয়া লোকজনকে দিয়ে কেরিং খরচ আদায় করে নেয়। জলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ সহিদুল ইসলাম মলিক অভিযোগ করেন, ভোসড কর্তৃপক্ষ প্রকল্পটি বাস্তবায়নে খুবই অনিয়ম ও দূর্নীতি করেছে। একটি ঘর নির্মান করার জন্য ইউ.এন.ডি.পি ১ লক্ষ ১৬ হাজার টাকা বরাদ্ধ প্রদান করেছে। প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা ভোসড নিন্মমানের সামগ্রী দিয়ে সর্বোচ্চ ৬০থেকে ৭০হাজার টাকা ব্যায় করেছে। তারা কেরিং এর প্রায় ৫০ লক্ষ টাকাসহ নিন্মমানের সামগ্রী দিয়ে কাজ করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে আত্মসাত করেছে। অভিযোগের ব্যাপারে জল্লা ইউনিয়নের ফিল্ড সুপার ভাইজার আব্দুর রহিম ও সাতলা ইউনিয়নের মোঃ মিন্টু মিয়া নিন্মমানের সামগ্রী দিয়ে কাজ করার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, অর্থ গ্রহনের অভিযোগ সত্য নয়। প্রকল্পের মনিটরিং অফিসার মোঃ নজরুল ইসলামের কাছে অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, যথাযথভাবে তদারকির মাধ্যমে কাজ করা হয়। অভিযোগের সত্যতা নেই। ভোসডের বারশাল বিভাগের ইনচার্জ মহাদেব দাস এ প্রসংঙ্গে বলেন, ভোসডের লোকজন বেনীফিসিয়ারীদের কাছ থেকে টাকা নিয়েছে এ রকম কোন বিষয় আমার জানা নেই। নিন্মমানের কাজ সম্পর্কে তিনি বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। ইউনাইটেড ন্যাশন ডেভলপমেন্ট প্রোগ্রাম (ইউ.এন.ডি.পি)’র কনসালটেন্ড গোলাম রাব্বানীর কাছে নির্মান কাজের নিন্মমানের সামগ্রী ব্যবহার সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের দায়িত্ব ছিল কোয়ালিটি কন্ট্রোল করা। দূর্গম এলাকায় কাজ করার কারনে যতটা সম্ভব মান রক্ষার চেস্টা করেছি। ভোসডের লোকজনের টাকা আদায় প্রসংঙ্গে তিনি বলেন,কেরিং বাবত বা অন্য কোন অজুহাতে টাকা নেয়ার দায়দায়িত্ব ভোসড কর্তৃপক্ষের। তবে আমরা বিষয়টি জানার পরে সুবিধাভোগীদের টাকা না দেয়ার জন্য পরামর্শ দিয়েছিলাম।