একমাত্র নারী মুক্তিযোদ্ধা মনা রানীর খোঁজ নেয়নি কেউ

স্বাধীনতা দিবস উদযাপন উপলক্ষে গতকাল শুক্রবার উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা প্রদানসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলেও অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করে স্বাধীনতার বিজয় পতাকা ছিনিয়ে আনা বরিশালের গৌরনদী ও আগৈলঝাড়া উপজেলার একমাত্র নারী মুক্তিযোদ্ধা মনা রানী ব্যানার্জির খোঁজ নেয়নি কেউ।
গতকাল শুক্রবার দুপুরে মনা রানী ব্যানার্জির (৭৪) পয়সারহাট গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, নতুন প্রজন্মের মাঝে মুক্তিযুদ্ধের বিভিষিকাময় দিনগুলির কথা বর্ননা করছেন রোগাক্রান্ত নারী মুক্তিযোদ্ধা মনা রানী ব্যানার্জি। মনযোগ দিয়ে তার কথাগুলি শুনছেন তার নাতী-নাতনীসহ পাশ্ববর্তী বাড়ির শিশু-কিশোররা।একান্ত আলাপকালে মনা রানী ব্যানার্জী জানান যুদ্ধদিনের করুন কাহিনী, পয়সারহাট গ্রামের পল্লী চিকিৎসক ডাঃ বি.কে রনজিতের স্ত্রী মনা রানী ব্যানার্জি। দেশে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তার বড়পুত্র শ্যামল ব্যনার্জি ভারত থেকে মুক্তিযোদ্ধার ট্রেনিং নিয়ে দেশে ফিরে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করেন। তার স্বামী ডাঃ বি.কে রনজিত স্থানীয় আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার জন্য অতিগোপনে তৎকালীন গৌরনদী বর্তমান আগৈলঝাড়া উপজেলার আস্কর গ্রামে চিকিৎসালয় খোলেন। ওই চিকিৎসালয়ে ডাঃ বি.কে রনজিতকে সকল ধরনের সহযোগীতা করেন তার স্ত্রী মনা রানী ব্যানার্জি, বড় মেয়ে কবিতা রানী ব্যনার্জি ও মেঝ মেয়ে মমতা রানী ব্যানার্জি। স্থানীয় রাজাকারদের কাছে এ খবর পেয়ে পাক সেনারা একাধিকবার ডাঃ বি.কে রনজিতসহ তার স্ত্রী ও কন্যাকে ধরে আনার জন্য অভিযান চালিয়ে ব্যর্থ হয়। উপায়অন্তুর না পেয়ে মনা রানী এতদাঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের হেমায়েত বাহিনীর প্রধান হেমায়েত উদ্দিন ও গৌরনদীর মুক্তিযোদ্ধা সংগঠক সৈয়দ মনিরুল ইসলাম বুলেট ছিন্টুর স্মরনাপন্ন হন। তাদের আশ্বাসে মনা রানী ব্যনার্জি স্থানীয় ভাবে অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষন নিয়ে পাক হানাদারদের প্রতিরোধে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পরে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
দেশ স্বাধীনের পর বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে নারী মুক্তিযোদ্ধা মনা রানী ও তার স্বামী ডাঃ বি.কে রনজিতকে মুক্তিযোদ্ধার সম্মানি ভাতা দেয়া হলেও বিগত বিএনপি-জামায়াতের চারদলীয় জোট সরকারের আমলে তা বন্ধ করে দেয়া হয়। বর্তমান আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতা গ্রহনের পর নারী মুক্তিযোদ্ধা মনা রানী ব্যানার্জির সম্মানি ভাতা চালু করা হলেও তার স্বামী ডাঃ বি.কে রনজিত ও তার বড়পুত্র শ্যামল ব্যনার্জির ভাতা এখনও বন্ধ রয়েছে। দীর্ঘদিন থেকে মনা রানী ব্যনার্জি শ্বাশকষ্টজনিত রোগসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে অর্থাভাবে বিনা চিকিৎসায় রয়েছেন।
গৌরনদী ও আগৈলঝাড়া উপজেলার একমাত্র নারী মুক্তিযোদ্ধা মনা রানী ব্যনার্জি আক্ষেপ করে বলেন, সংসার জীবনে আমার ২ পুত্র ও ৩ কন্যা সন্তান রয়েছে। সংসারের কথা চিন্তা না করেই স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে দীর্ঘদিন আমি বরিশাল জেলা আওয়ামীলীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকাসহ স্থানীয় ইউপি সদস্যা হিসেবে সততার সাথে গুরু দায়িত্ব পালন করেছি। অর্থাভাবে এখন আমি বিনা চিকিৎসায় ধুকে ধুকে মরতে বসেছি। অথচ আজ কেউই আমার খোঁজ রাখেন না। তিনি আক্ষেপ করে আরো বলেন, মৃত্যুর পূর্বে আমার নাতীদের একটি সরকারি চাকুরী ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় দেখে যেতে পারলে মরেও শান্তি পেতাম।
Alrrights Reserve by : খোকন আহম্মেদ হীরা, আগৈলঝাড়া থেকে ফিরে