গৌরনদী সংবাদ

শখ থেক সফল কবতুর খামারী শহিদুল

বিধান সরকারঃ শুরু করেছিলেন এক জোড়া দিয়ে। পাঁচ বছরের ব্যবধানে নানা প্রজাতির দামি শতেক জোড়া কবুতর। শুধু কি তাই? পাশাপাশি ফেন্সি মুরগীর খামার গড়েছেন, সাথে পাখির দোকান, বিরানী হাউস আর রেষ্টুরেন্ট দিয়েছেন। এখন তৈরী করবেন বসতঘর। এসবই হয়েছে কবুতর বিক্রি করা আয়ে। এ স্বপ্নবাজ খামারী বরিশাল জেলার গৌরনদী পৌর এলাকার দক্ষিণ পালরদি গ্রামের শহিদুল ইসলাম (৩২)। শুধু নিজেই নয়; স্বপ্ন দেখিয়েছেন আরো জনাপঞ্চাশেক ব্যক্তিকে। যারা শহিদুলের কাছ থেকে কবুতর নিয়ে খামার গড়ে স্বাবলম্বী হয়েছেন। পড়ালেখার পাশাপাশি কেউবা কবুতর পালন করে হাত খরচা চালাচ্ছেন এমন সংখ্যাও কম নয়। তাহলে শুনুন শহীদুলের সাফল্যের নেপথ্যের কথা।

শখ থেকে সফল কবুতর খামারী গৌরনদীর শহিদুল ইসলাম

একসময় এই শহিদুলকে আমি পাগল বলতাম, কেননা, সে তার রানিং ব্যবসা ছেড়ে এই কবুতর সংগ্রহে নামে। প্রথমে শখ করে হলেও এখন সে পুরোদস্তুর ব্যবসায়ী। অভিনন্দন শহিদুল 🙂

Gepostet von Gournadi am Samstag, 19. Mai 2018

শুরুর বছর হলো ২০১২ সাল। চার হাজার টাকায় একজোড়া জ্যাকবিন কবুতর কিনেছিলেন শহিদুল। ছেলের আগ্রহ দেখে তার বাবা এসকান্দার আলী সরদার নিজের গোয়ালঘরটি ব্যবহার করতে দিয়েছিলেন। দিনে দিনে কবুতরের সংখ্যা বাড়তে থাকে। তবে ২০১৩ এবং ১০১৪ সালে দুই দফায় রাণীক্ষেত রোগের করণে অনেক কবুতর মারা গেলে লোকসানের মুখে পড়েন। সে সময় রোগ-ব্যাধি প্রতিকারে শহিদুলের সম্যক জ্ঞান ছিল না। আর প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তর তো তাদের গণনায়ই আনেনি। এজন্য হাল ছাড়েনি শহিদুল। এমন সময়ে ফরিদপুর, মাদরীপুর, খুলনা ও রাজধানীর কাপ্তান বাজার থেকে সংগ্রহ করা কবুতরের দোকানীদের কাছ থেকে পরামর্শ, আর নিজস্ব পদ্ধতি মিলিয়ে চিকিৎসা করতে থাকেন। এই ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার পর পিছে ফিরে তাকাতে হয়নি। চলছে সামনের পানে এগিয়ে চলা।

শহিদুল বলেন, তার খামারে হল্যান্ডের জ্যাকবিন, পাকিস্তানী বোখারা, ইন্ডিয়ান ইয়ালো পোটার, আমেরিকান স্যাটেল ফিল্ড ব্যাক, উজবেকিস্থানের টামলার মিলিয়ে ২০ প্রজাতির কবুতর রয়েছে। প্রকারভেদে এর মূল্য প্যারেন্টস জোড়া প্রতি ১৫ হাজার থেকে লাখ টাকার কাছাকাছি। এ ছাড়াও রেড চেকার, সব্জী চেকার, মাক্সী চেকার এই প্রজাতির কবুতর রয়েছে যার বিক্রি মূল্য শুরু হয়েছে ২ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত। তবে বছর দুয়েক হলো কবুতরের দাম পড়ে গেছে। বৈধ পথে কবুতর আমদানী-রপ্তানী বন্ধ থাকায় চোরাই পথে এর কারবার চলছে। এ জন্য দাম প্রায় অর্ধেকে নেমেছে।

শহিদুল জানান, খামারীদের কাছে দামী কবুতর অনেক জমা হয়েছে। রপ্তানী করতে পারলে উপযুক্ত দাম মিলতো। এখন চোরাই পথে বিকিকিনি হওয়াতে ক্রেতারা ইচ্ছা মাফিক দাম হাঁকে। তার খামারের কবুতর এখন বরগুনা, ঝালকাঠী, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুরের খামারীদের কাছে বিক্রি করেন। ঢাকা এবং চট্রগ্রামের পাশাপাশি সম্প্রতি গোপালগঞ্জে কবুতরের রেসিং ক্লাব গড়ে উঠেছে। বরিশালে এখনো এই ক্লাব নেই বলে রেস করে বাড়তি টাকা আয়ের পথ তৈরী হয়নি। কবুতরের রেস নিয়ে শহিদুলের বেশ আগ্রহ। সংগ্রহ করা পেপার কাটিং থেকে দেখালেন বিশ্বের দ্রুত গতির উইসান বোল্ট কবুতরটি বাংলাদেশী মুদ্রার ৩ কোটি ১২ লাখ টাকায় বিক্রি হয়েছে। তার খামারে থাকা রেস কবুতর নিয়ে রীতিমত কসরত করে থাকেন। এখন রেসিং ক্লাব গড়ে উঠলেই প্রতিযোগিতায় নামার ইচ্ছা তার।

এক সময়ের মোবাইল সার্ভিসিংয়ের কাজ করা শহিদুল কবুতর চাষে লাভের মুখ দেখায় ঐ পেশা বদল করেছেন। বছর দুয়েক আগেও প্রতি মাসে কবুতর বিক্রি করে লাখ টাকার ওপরে আয় করতেন। বর্তমানে যা অর্ধেকে নেমে এসেছে। এই টাকায় গৌরনদী পৌরশহরের বাসস্ট্যান্ডে একটি পাখির দোকান, একটি বিরানী হাউস, একটি রেস্টুরেন্ট গড়েছেন। সামনে ইচ্ছা আছে নিজ বসত ঘর তৈরী করার। শহিদুল হিসাব কষে দেখান কবুতরের খাবারে (ধান,গম, ভূট্টা, ইন্ড, বজরা, কুসুম ফুলের বীজ, চীনা) মাসে সর্বোচ্চ দেড়’শ টাকা আর ওষুধ ১০ টাকা মিলিয়ে গড়ে ১৬০ টাকা খরচ হয়। সেখানে একজোড়া কবুতরের বাচ্চা বিক্রি হয় ১ থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত। শহিদুলের একশ জোড়া কবুতর থেকে মাসে গড়ে ৩০ জোড়া বাচ্চা আসে। সফল কবুতর খামারী শহিদুল এখন কবুতরের পাশাপাশি ফাইটার, আঁচিল, সিল্কি, বেল্ডাস, পলিস ক্যাম্প ও ভারতের কেদারনাথ নামক সৌখিন মুরগীর খামার গড়েছেন। মুরগী থেকেও ভালো আয় হবে জানালেন তিনি।

শহিদুলের সাথে কথা বলার সময় পাশের বাড়ির গৃহবধূ কাঁকন দাস উপস্থিত হন। তিনি জানালেন, শহিদুলের কাছ থেকে এক জোড়া সৌখিন কবুতর কিনে যাত্রা শুরু করেছিলেন। এখন তার আট জোড়া কবুতর রয়েছে। এই দিয়ে বাড়তি আয় করতে পারছেন তিনি। স্কুল ছাত্র মো.সিফাত এখান থেকে কবুতর কিনে নিজের হাত খরচা নিজেই চালাতে পারেন। আর সংবাদকর্মী জুলফিকারও দাবী করলেন, শহিদুলের থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনিও কবুতরের চাষ করছেন। সময় দিতে পারলে কবুতর থেকে
তিনি আরো লাভ করতে পারতেন।

এক সময়ের সৌখিন অবস্থা থেকে বর্তমানে কবুতর পালন লাভজনক হওয়াতে প্রাণী সম্পদ বিভাগ এর প্রতি জোর দিচ্ছে বলে জানালেন, জেলা ভারপ্রাপ্ত প্রাণী সম্পাদ কর্মকর্তা ডা. নূরুল আলম। তার দেয়া তথ্য হলো চলতি বছরের ফেব্রুয়ারী মাসের জরিপ অনুযায়ী জেলায় ১ লাখ ৬০ হাজার ৩৭০ টি কবুতর রয়েছে। আর সরকার ভর্তুকী দিয়ে মাত্র ১০ টাকা মূল্যে ১০০ টি কবুতরের জন্য রাণীক্ষেত রোগের প্রতিষেধক টিকা দিচ্ছে। এই কর্মকর্তা আরো বলেন, কবুতরের জন্য ২ মাস অন্তর কৃমির ওষুধ আর বাচ্চার বয়স ৭ দিন হলে প্রথমবার চোখে ফোঁটা, এরপর ৩ মাস অন্তর রানের মাংসে রাণীক্ষেতের ভ্যাকসিন দিলেই যথেষ্ট। এই কর্মকর্তার সাথে কবুতর পালনে শহিদুল ইসলামের সাফল্য নিয়ে কথা বলার সময় গৌরনদী উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তাকে ফোন করে খোঁজ নিতে বলেন, যাতে করে তাদের সহায়তা পেয়ে কবুতর চাষে উদ্বুদ্ধ হয়ে খামারীরা দেশের গ্রামীণ আর্থ সমাজিক উন্নয়নে অবদান রাখতে পারেন।

লেখা বিধান সরকারের ফেসবুক থেকে সংগ্রহ করা ও ভিডিও একাত্তর টিভি থেকে


ফেসবুকে মন্তব্য করুন :

টি মন্তব্য
মন্তব্যে প্রকাশিত যেকোন কথা মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। Gournadi.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের কোন মিল নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে Gournadi.com কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নিবে না

আরো পোষ্ট...