ইন্টারনেটে আয় সবার দ্বারাই সম্ভব by আমিনুল ইসলাম সজীব
ইন্টারভিউ পোস্ট সম্পর্কে জানেন না এমন ব্লগার খুব কমই থাকার কথা। তবুও একটা ধারণা দিয়ে দিচ্ছি। ব্লগ রিলেশন বা ব্লগ সম্পর্ক হচ্ছে আপনি যে বিষয়ে ব্লগিং করছেন, সেই বিষয়ে অন্য যারা ব্লগিং করছে, তাদেরকে প্রতিযোগী ভেবে এড়িয়ে যাওয়ার পরিবর্তে তাদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক গড়ে তোলা। এতে লাভবান হবে দু’পক্ষই। লিংক আদান-প্রদান, নিয়মিত মন্তব্য করা ছাড়াও অনেকভাবে ব্লগ রিলেশন আগলে রাখা যায়। তার মধ্যে অন্যতম হলো অতিথি পোস্ট এবং ইন্টারভিউ। আপনার আশেপাশে (স্থানভিত্তিক নয়, বিষয়ভিত্তিক) যাদেরকে আপনি সফল ব্লগার মনে করেন, প্রয়োজনে তাদেরই একটি ইন্টারভিউ আপনি আপনার ব্লগে প্রকাশ করতে পারবেন। এতে করে আপনার ব্লগ আপডেট করা হলো, একই সঙ্গে ঐ ব্লগারের কাছ থেকেও কিছু ভিজিটর পাওয়া গেল। স্বাভাবিকভাবেই তিনি আপনার ইন্টারভিউ করা পোস্টটি শেয়ার করবেন তার বন্ধুদের সঙ্গে।
যাই হোক, এবার আসি মূল কথায়। হাসান ভাইকে আমি তার দৃষ্টিকোণ থেকে এমন কিছু প্রশ্নের জবাব দিতে বলেছি যেসব প্রশ্নের সম্মুখীন আমরা হর-হামেশাই হয়ে থাকি। আজ আপনাদের জন্য সেই পোস্টটির অনূদিত রূপ প্রকাশ করছি এই ব্লগে। আশা করছি ভালো লাগবে।
Hasan in the Hot Seat!
ধন্যবাদ হাসান ভাই আমাদেরকে সময় দেয়ার জন্য। প্রথমেই জানতে চাইবো, আপনার ব্লগিং জীবনের শুরুটা কোথায়?
পেশাগতভাবে আমি ওয়েবমাস্টার এবং সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন কনসালটেন্ট। আমি ব্লগিং নিতান্ত ব্যক্তিগত উৎসাহ থেকেই শুরু করি। এছাড়াও আমার ব্লগিংয়ের আরেকটা উদ্দেশ্য ছিল সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন চর্চা করা। যখন লক্ষ্য করলাম যে আমার ব্লগে ট্রাফিক বেশ ভালো পাচ্ছি, তখনই সিদ্ধান্ত নিই ব্লগ থেকে টাকা আয়ের।
তার মানে নিতান্ত শখের বশে ব্লগ শুরু করেই আজ আপনি এ ব্যাপারে সিরিয়াস। কিন্তু আপনি কি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ছিলেন না যে আপনি ব্যর্থ হতে পারেন?
[হেসে] সফলতার খুঁটিই হচ্ছে ব্যর্থতা। অবশ্যই প্রথম কিছু দিন আমার আয় বলতে কিছু ছিল না। আমি অনেক হতাশ হয়েছিলাম এবং ভাবতে শুরু করেছিলাম যে অনলাইন থেকে টাকা আয়ের বিষয়টা অবাস্তব। আমি আরও ভাবতাম যে, অনলাইন থেকে টাকা আয় ভাগ্যের ব্যাপার; সবাই তা পারে না।
তো এখন আপনি কী ভাবেন? অনলাইনে টাকা আয় যে কারো পক্ষেই সম্ভব?
সবাই অনলাইন থেকে টাকা আয় করতে পারে, তবে এখানে একটি ‘কিন্তু’ আছে। প্রথম প্রশ্ন হচ্ছে, আপনি কতটা মোটিভেটেড বা এ ব্যাপারে কতোটা উৎসাহিত? এটাই আসলে মূল ব্যাপার। এক্ষেত্রে তিনটা গুণ থাকা দরকার। ১. আপনি কি শিখতে পারেন? ২. আপনি কি কাজ করতে পারেন? এবং ৩. আপনি কি অপেক্ষা করতে পারেন? এ সবগুলো প্রশ্নের উত্তর যদি ‘হ্যাঁ’ হয়, শুধু তখনই একজন সফলতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছতে পারবেন।
কিন্তু তারপরও আমরা দেখি প্রচুর ব্লগার সফলতার দেখা পান না। সবাই নিশ্চয়ই অলস নন কিংবা অধৈর্য নন। সেক্ষেত্রে আপনার মতে ব্যর্থতার মূল কারণ কোনটি?
তারা তাদের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে না, এটাই কারণ। মনে করুন, আপনি একটি বিষয়ে ব্লগিং করছেন এবং আপনি আন্দাজ করতে পারছেন যে আপনি সাফল্য পাচ্ছেন না বা পাবেন না। এমতাবস্থায় ব্যর্থতা আপনাকে আক্রমণ করার আগেই আপনার উচিৎ হবে আপনার আগ্রহ ও জ্ঞান আছে এমন আরেকটি বিষয় খুঁজে বের করা এবং সে বিষয়ে ব্লগিং শুরু করা। আরেকটা কথা হচ্ছে এই যে, সাফল্য পাওয়ার আগে ব্লগিং সিরিয়াসলি নেয়া উচিৎ নয়*। কেননা, এক্ষেত্রে এমন একটি সুযোগ রয়েছে যে সাফল্য লাভের অতিরিক্ত আকাঙ্ক্ষা আপনাকে ব্যর্থতার দিকে নিয়ে যাবে।
আপনি প্রথম অ্যাডসেন্সের চেক গ্রহণ করেছেন কবে? আপনার মতে, ব্লগিং শুরু করার কতদিন পর প্রথম অ্যাডসেন্স চেকটা আসতে পারে?
আমি ব্লগিং শুরু করার তৃতীয় মাসে ৩৯৩.০৯ ডলারের অ্যাডসেন্স চেকটি পাই। তবে আমি আমার সফলতাকে পরিমাপ করি আমার ভিজিটর সংখ্যা দিয়ে; চেকের সংখ্যা বা টাকার অঙ্ক দিয়ে নয়। কখনো যদি আমার আয় কমে যায়, আমি খুব একটা ভাবি না। তবে কোনো মাসে যদি আমার ভিজিট কমে যায়, আমি বিষন্ন হয়ে পড়ি এবং ভিজিটর ফিরিয়ে আনতে আরো বেশি করে কাজ করি। আমার মতে, চেকের জন্য অপেক্ষা করা উচিৎ নয়। কারণ, আয়ের ব্যাপারে কেউ নিশ্চয়তা দিতে পারে না। তবে হ্যাঁ, একবার যদি আপনি অনেক বেশি ট্রাফিক পেতে শুরু করে, তাহলে সেই ব্লগ থেকে আপনি টাকা আয় করতে পারবেনই। তাই সবার উচিৎ ট্রাফিক বাড়ানোর উদ্দেশ্যে কঠোর পরিশ্রম করা।
৩৯৩.০৩ ডলার আয় করার সময় সেই প্রথম তিন মাসে আপনার মোট কয়টি ব্লগ ছিল?
আমার ধারণা তখন আমার ২/৩ টি ব্লগ ছিল। এটা আমার অ্যাডসেন্স ব্যবহার শুরুর পরের তৃতীয় মাসের ঘটনা। মূলত আমি ব্লগিং করছিলাম আরো অনেক আগে থেকেই। তাই এটা আমার জন্য খুব একটা কঠিন ছিল না।
অর্থাৎ আপনি অ্যাডসেন্স ব্যবহার করার আগে থেকেই ব্লগিংয়ে জড়িত ছিলেন। তবে আমরা দেখতে পাই যে শুধু অ্যাডসেন্স ব্যবহার করে একটি ব্লগ থেকে তেমন একটা আয় করা যায় না। এছাড়া আমরা পরামশও দিইনা এমন কোনো বিষয়ে ব্লগিং করতে যে বিষয়ে জ্ঞান বা আগ্রহ নেই। সেক্ষেত্রে যিনি শুধু একটি ব্লগে কাজ করেন, তার জন্য কি অ্যাডসেন্স থেকে অনেক টাকা আয়ের সম্ভাবনা কম?
আমি একাধিক ব্লগিং সমর্থন করি। কেননা, আপনি যদি একাধিক ব্লগ পরিচালনা করেন, তাহলে একটিতে ব্যর্থ হলে অপরটি খুব সহজেই চালিয়ে যেতে পারবেন। অন্যথায় আপনাকে আবার শুরু থেকে শুরু করতে হবে।
ধরুন, আমি ব্লগিংয়ে একেবারেই নতুন। ব্লগ থেকে আয় করতে চাইলে আমার জন্য আপনার প্রাথমিক পরামর্শ কী কী থাকবে?
- সফল ব্লগারদের অনুসরণ করুন।
- ব্লগের সৌন্দর্য ও শিল্প, তথা আর্ট শিখতে চেষ্টা করুন।
- আপনার বিষয় নির্বাচন করুন।
- সে বিষয়ের উপর গবেষণা করুন এবং যত বেশি সম্ভব জ্ঞান আহরণ করুন।
- ডোমেইন নেম নির্ধারণ করুন এবং যত দ্রুত সম্ভব কিনে ফেলুন।
- অনন্য (ইউনিক) লেখা প্রকাশ করতে থাকুন।
- টাকা আয়ের ব্যবস্থা করা শুরু করুন (Monetize)।
আপনি কি ব্লগারদের শুরুতেই ডোমেইন এবং হোস্টিং কেনার পরামর্শ দিচ্ছেন?
ডোমেইন মাত্র ৭০০ টাকার মধ্যে পাওয়া যায়। এক বছরের ৩৬৫ দিন দিয়ে এই টাকা ভাগ করলে প্রতিদিন ২ টাকার মতো পড়ে। নিজস্ব ডোমেইনে ব্লগিং করলে তা বেশ পেশাদার মনে হয়। অথচ শুধুমাত্র ফ্রি সাবডোমেইন ব্যবহারের কারণে আপনার চিত্র নষ্ট হয় অন্যদের সামনে। এছাড়াও কিছু টাকা খরচ করলে টাকা আয়ের প্রবণতা আপনার মধ্যে আপনা-আপনিই এসে যাবে।
আপনি কি মনে করেন অ্যাডসেন্স অনলাইনে আয়ে সর্বশ্রেষ্ঠ উপায়?
অবশ্যই। অ্যাডসেন্স সেটআপ করা যেমন সহজ, তেমনি সহজ এর মেইনট্যানেন্স। অ্যাডসেন্সের সর্বশ্রেষ্ঠ হওয়ার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।
কিন্তু দেখা যায় যে চেক পাওয়ার জন্য সর্বনিম্ন ১০০ ডলার আয় করতে হয়। এই পরিমাণ আয় করতে অনেকেরই অনেক বেশি সময় লেগে যায়। এটা কি একটি সমস্যা নয়?
আসলে আপনার যদি অনেক ট্রাফিক থাকে, তাহলে এই পরিমাণ টাকা আয় করতে খুব বেশি সময় লাগবে না। অনেক সময় আমি ১০০ ডলারের বেশি হলেও চেক হোল্ড করে রাখি এবং মোটামুটি বড় অঙ্ক হলে তারপর সেটাকে রিলিজ করি।
আজকাল বেশিরভাগ মানুষই প্রযুক্তি, অনলাইনে টাকা আয় ইত্যাদি এ জাতীয় বিষয়েই ব্লগ খুলছেন। এ ব্যাপারে আপনার কী মতামত?
এসব বিষয়ে কোনো সমস্যা নেই। তবে আমার পরামর্শ হচ্ছে বিষয় নির্বাচনে কিছুটা ভিন্নতা অনুসরণ করা। যেমন, আপনি মোবাইল নিয়ে ব্লগ করতে যাচ্ছেন। ভালো হবে যদি আপনি পুরো মোবাইল মার্কেটকে বাদ দিয়ে শুধু অ্যান্ড্রয়েড নিয়ে ব্লগিং করেন। এতে করে আপনি অনেক বেশি সুবিধা পাবেন।
ব্লগিংয়ে সবচেয়ে কঠিন কাজটি কী?
নিয়মিত ব্লগ আপডেট করা এবং সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজ করা। প্রতিযোগীরা ঘুমিয়ে নেই, তাই আপনাকে সবসময় কঠোর পরিশ্রম করতে হবে এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে।
আর সবচেয়ে সহজ এবং মজার কাজটি কী?
পোস্ট প্রকাশ করার পর মন্তব্য এবং ট্রাফিক পাওয়াটা আমি বেশ উপভোগ করি। এছাড়াও পাঠকদের প্রশ্নের উত্তর দিতেও আনন্দ পাই আমি। তবে সবচেয়ে বেশি আনন্দ পাই যখন হাতে চেক এসে উপস্থিত হয়।
আপনার মতে, ক্যারিয়ার বা পেশা হিসেবে ব্লগিং কেমন?
এটি খুবই কঠিন একটি বিষয়। কেউ কেউ ৩০০ ডলারেই সুখী হয়, কারো দরকার হয় লাখের। আসলে এটি নির্ভর করে আপনি কতোটা সফল এর উপর। যদি আপনি যথেষ্ট সফল এবং স্বাধীনভাবে কাজ করতে চান, তাহলে দৈনিক ১২ ঘণ্টা অফিসে কাজ করার কোনো মানে হয় না। তবে সাফল্য পাওয়ার আগে চাকরি ছাড়া কোনোমতেই ঠিক নয়।
তাহলে আপনি কেন ব্লগিংকে পেশা হিসেবে নিচ্ছেন না? আপনার আয়ও তো অনেক।
ব্লগ করাটা আমার শখ। আমি মাসিক প্রায় ৫০০ ডলার আয় করি। তবে আমি কখনো ব্লগিংকে ফুলটাইম পেশা হিসেবে নেয়ার ব্যাপারে চিন্তা করিনি। আমার ধারণা, আমি এখনো সে পর্যায়ে পৌঁছাইনি।
এখন বোঝা যাচ্ছে ব্লগিংকে পেশা হিসেবে নিতে হলে একজনকে কতোটা সফল হতে হয়। আপনাকে ধন্যবাদ আমাদের পাঠকদের জন্য সময় দেয়ায়।
উপসংহার
দৃষ্টি আকর্ষণঃ মূল ইন্টারভিউ থেকে বেশ কিছু অংশ বাদ দেয়া হয়েছে অনূদিত এই পোস্টে। আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রশ্নের উত্তর এবং নতুন ব্লগারদের জন্য হাসান ভাইয়ের সংক্ষিপ্ত ভাষায় গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শটি পড়তে মূল পোস্টটি পড়তে ভুলে যাবেন না যেন!
টীকাঃ * এখানে সিরিয়াস বলতে বোঝানো হয়েছে চাকরি ও অন্যান্য কাজকর্ম সব ছেড়ে দিয়ে ব্লগিং করাকে। সাফল্য পাওয়ার আগে ব্লগিংয়ের উপর সবটুকু সময় ব্যয় করা উচিৎ নয়। তবে হ্যাঁ, অন্য অর্থে, শুরু থেকেই আপনাকে ব্লগিংয়ের ব্যাপারে সিরিয়াস থাকতে হবে। ধারণা করতে হবে, আপনার ব্লগ আপনার ব্যবসা, এবং আপনি এই ব্যবসায়ে উদ্যোক্তা। শুধু তখনই আপনি সফলতার দেখা পাবেন। (আইসক্রীম প্রাপ্য
)
লিখেছেন আমিনুল ইসলাম সজীব
তিনি বেশ কয়েকটি বাংলা ও ইংরেজি ওয়েবসাইটে এবং জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রযুক্তির পাতায় নিয়মিত লিখছেন। বর্তমানে তিনি bdnews24.com এর তথ্য-প্রযুক্তি বিভাগে কর্মরত আছেন। তিনি নিয়মিতভাবে তার ইংরেজি ব্লগ Life with Technology তে প্রযুক্তি, ইন্টারনেট, নতুনদের জন্য ব্লগিং টিপস, ব্লগ ডেভেলপমেন্ট, সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন, ওয়েবসাইট রিভিউ ইত্যাদি নিয়ে ব্লগ লিখে থাকেন।
Source : http://bn.jinnatulhasan.com/2010/01/2840