গৌরনদীতে ফতোয়ার স্বীকার এক গৃহবধূ
শারিরীক নির্যাতন ॥ জোড়পূর্বক তালাক নামায় স্বাক্ষর ॥ অতঃপর গ্রাম থেকে বিতাড়িত
গৌরনদী॥ বরিশালের গৌরনদী উপজেলার বেজগাতি গ্রামে ফতোয়াবাজ সালিশদের রোষানলে এক গৃহবধূকে ধর্ষণের ঘটনায় প্রভাবশালী ধর্ষকের বিচার না করে ধর্ষিতা গৃহবধূকে শারিরীক নির্যাতন করা হয়েছে। এছাড়াও গৃহবধূর কাছ থেকে তার প্রথম স্বামীকে তালাক দেয়ার জন্য জোড়পূর্বক তালাক নামায় স্বাক্ষর নিয়ে সোমবার রাতে গ্রাম থেকে বিতারিত করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।
ওই গ্রামের ওমান প্রবাসী আব্দুর রব সরদারের স্ত্রী ও দুই সন্তানের জননী হালিমা বেগম (২৬) লিখিত অভিযোগে জানান, গত ৩০ মে রাতে তিনি তার দু’শিশু সন্তানকে নিয়ে প্রতিদিনের ন্যায় বসত ঘরে ঘুমাচ্ছিলেন। রাত সাড়ে দশটার দিকে পাশ্ববর্তী নন্দনপট্টি গ্রামের নুরু সন্যামাতের পুত্র সাইদুর রহমান কৌশলে তার ঘরে ঢুকে মুখে কাপর বেঁধে জোড়পূর্বক তাকে (গৃহবধূকে) ধর্ষণ করে। এক পর্যায়ে গৃহবধূর আত্মচিৎকারে বাড়ির লোকজনে এগিয়ে এসে ধর্ষককে আটক করে। পরবর্তীতে ধর্ষকের নিকট আত্মীয় প্রভাবশালী আওয়ামীলীগ নেতা পান্নু মৃধা বিচারের আশ্বাস দিয়ে ধর্ষককে তার জিম্মায় নিয়ে যায়। এ ঘটনায় গত সোমবার রাতে স্থানীয় সোমেদ সরদারের বাড়িতে এক সালিশ বৈঠকের আয়োজন করা হয়। সেখানে সালিশ হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পৌর ১ নং ওয়ার্ড আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক ইউনুস সিকদার, ইউনিয়ন আওয়ামীলীগ নেতা নিতাই লাল মন্ডল, আনোয়ার তালুকদার ও হাকিম সরদার।
প্রহসন মূলক সালিশ বৈঠকে উপস্থিত সালিশরা ফতোয়া দিয়ে ধর্ষিতা গৃহবধূকে গ্রাম থেকে বিতারিত করা ও প্রবাসী স্বামীকে না জানিয়ে তাকে তালাক দিয়ে ধর্ষক সাইদুরকে হালিমা বিবাহ করবে বলে সিদ্ধান্ত গ্রহন করে। সে মতে উপজেলা সদর থেকে নিকাহ রেজিষ্টার কাজী মাহফুজুর রহমানকে ডেকে আনা হয়। এ সময় গৃহবধূ তালাক নামায় স্বাক্ষর দিতে অপরাগতা প্রকাশ করলে তাকে শারিরীক নির্যাতনসহ বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি দেখিয়ে জোড়পূর্বক তালাক নামায় স্বাক্ষর নেয়া হয়। তিনি আরো অভিযোগ করেন, ফতোয়াবাজ সালিশ ও তার ভাসুর আব্দুল হাই সরদার ও হাকিম সরদার ওই রাতেই গৃহবধূর ব্যবহৃত স্বর্ণালংকারসহ সকল মালামাল রেখে ও বসত ঘরে তালাবদ্ধ করে গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দেয়। উপায়অন্তুর না পেয়ে গৃহবধূ তার দু’শিশু সন্তানকে নিয়ে ওই রাতেই পিতা একই উপজেলার কটকস্থল গ্রামের মান্নান ঘরামীর বাড়িতে আশ্রয় নেন।
সালিশ বৈঠকে উপস্থিত গ্রামপুলিশ জামাল ঘরামী, ইস্রাফিল হাওলাদারসহ একাধিক ব্যক্তিরা বলেন, ফতোয়াবাজ সালিশরা তালাক নামায় স্বাক্ষর করতে বললে গৃহবধূ হালিমা একাধিকবার সালিশ বৈঠক থেকে উঠে যাওয়াসহ তার প্রবাসী স্বামীকে বিষয়টি জানানোর আবেদন করেন। এ সময় ফতোয়াবাজরা তার (হালিমার) কথায় কোন কর্ণপাত না করে শারিরীক নির্যাতন করে জোড়পূর্বক তালাকনামায় স্বাক্ষর আদায় করে।
পৌর ১ নং ওয়ার্ড আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক ও সালিশ ইউনুস সিকদারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, সালিশ বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হালিমার প্রবাসী স্বামীকে তালাক দিয়ে ধর্ষক সাইদুরের সাথে বিবাহ দেয়ার জন্যই তালাক নামায় স্বাক্ষর নেয়া হয়েছে। পরবর্তীতে নান্নু মৃধা প্রভাব খাটিয়ে সালিশ বৈঠকে ধর্ষক সাইদুরকে হাজির করেননি। একইভাবে জানালেন, অপর সালিশ ও আওয়ামীলীগ নেতা নিতাই লাল মন্ডল।
গৌরনদী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ নুরুল ইসলাম-পিপিএম ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ফতোয়াবাজ সালিশরা ধর্ষকের বিচার না করে ধর্ষিতার কাছ থেকে জোড়পূর্বক তালাক নামায় স্বাক্ষর নেয়ার ঘটনাটি অমানবিক। এ ঘটনায় গৃহবধূ হালিমা বেগম বাদি হয়ে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে ধর্ষক ও সালিশদের ৬ জনকে আসামি করে থানায় মামলা দায়ের করেছেন। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এস.আই শাহজালাল জানান, আসামিদের গ্রেফতারের জন্য জোড় প্রচেষ্টা চলছে।